আমনের ভরা মৌসুমে চালের দাম বাড়ছে কেন?
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
আমনের ভরা মৌসুমে চালের দাম বাড়ছে কেন?

  আবদুল লতিফ মণ্ডল  

০৮ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে চালের ক্রেতা-ভোক্তারা আশা করেছিলেন, আমন ধান কাটার মৌসুমে বাজারে সব ধরনের চালের দাম কমবে। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। বরং আমনের ভরা মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে এবং এ বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

চাল থেকে তৈরি ভাত দেশের কম-বেশি ৯০ শতাংশ মানুষের প্রধান খাদ্য। তাই আমনের ভরা মৌসুমে চালের দাম কেন বাড়ছে এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে চালের দাম ক্রেতা-ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে সরকারকে কেন এখনই উদ্যোগ নিতে হবে, তা আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

৪ ডিসেম্বর যুগান্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামে ভরা মৌসুমে আরেক দফা বেড়েছে চালের দাম। প্রতি বস্তা চালের দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বাড়ল। মোটা ও সরু সব ধরনের চালের দাম কেজিপ্রতি দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক সপ্তাহে জিরাশাইল সিদ্ধ চাল বস্তাপ্রতি বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৮৫০ টাকায়। এখন ১০০ টাকা বেড়ে গিয়ে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৯৫০ টাকায়। এ ছাড়া মিনিকেট সিদ্ধ ১৫০ টাকা বেড়ে ২ হাজার ৬৫০ টাকা, পাইজাম সিদ্ধ বস্তায় ৫০ টাকা বেড়ে ২ হাজার ৩৫০ টাকা, কাটারিভোগ সিদ্ধ ২০০ টাকা বেড়ে ৩ হাজার ২০০ টাকা, কাটারিভোগ আতপ বস্তাপ্রতি ৩০০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৩০০ টাকায়, মিনিকেট আতপ ১০০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ টাকায় এবং পাইজাম আতপ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩৫০ টাকায়। ৫ ডিসেম্বর অন্য একটি দৈনিকের খবরে বলা হয়েছে, চাল উৎপাদনের জন্য প্রসিদ্ধ উত্তরাঞ্চলের নওগাঁয় গত এক সপ্তাহে সরু ও মাঝারি চালের দাম বেড়েছে। নন-শর্টার জিরা ও কাটারি চাল এবং বিআর-২৮ ও বিআর-২৯ জাতের চালের দাম কেজিতে তিন টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ৬ ডিসেম্বর আরেকটি দৈনিকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশে চালের দাম বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) ১০০-২৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গত সপ্তাহের শেষদিকে অন্যান্য সূত্রে প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, রাজধানীর বাজারে বেড়েছে চালের দাম। বাজারে সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৮ থেকে ৬৮ টাকা, মাঝারি চাল ৪৮ থেকে ৫৫ টাকা এবং মোটা চাল ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা কেজি দরে। আর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য মোতাবেক ২ ডিসেম্বর মোটা সিদ্ধ চালের খুচরা মূল্য ছিল প্রতি কেজি ৪৪ থেকে ৪৮ টাকা।

দেশে উৎপাদিত চালের ৫৫ শতাংশ আসে বোরো থেকে। দেশে চাল উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আমন। ২০১৭-১৮, ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে যখন বোরো চাল উৎপাদনের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১ কোটি ৯৫ লাখ ৭৬ হাজার, ২ কোটি ৩ লাখ ৮৯ হাজার এবং ২ কোটি ১ লাখ ৮১ হাজার টন, তখন ওইসব অর্থবছরে আমন চালের উৎপাদন দাঁড়িয়েছিল যথাক্রমে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৯৪ হাজার, ১ কোটি ৪০ লাখ ৫৫ হাজার এবং ১ কোটি ৫৫ লাখ টন (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা, ২০২১)। লক্ষ্যমাত্রার (৫৫.৭৭ লাখ হেক্টর) চেয়ে বেশি পরিমাণ (৫৬.২০ লাখ হেক্টর) জমিতে আমনের চাষ হওয়ায় এবং বড় রকমের বন্যা না দেখা দেওয়ায় এবার আমন চাল উৎপাদনের পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রা (১.৫৬ কোটি টন) ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সরকারিভাবে বলা হচ্ছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, আমনের ভালো উৎপাদন এবং চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই-৫ ডিসেম্বর সময়কালে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ৮ লাখ ২৫ হাজার টন চাল আমদানি হওয়া সত্ত্বেও চালের আকাশছোঁয়া দাম কেন? চাল ব্যবসায়ীদের বরাত দিয়ে উপর্যুক্ত প্রতিবেদনগুলোতে আমনের ভরা মৌসুমে চালের দামবৃদ্ধির কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো- ক. নভেম্বরে সরকার ডিজেলের দাম বৃদ্ধি করায় চাল পরিবহণ ভাড়া বৃদ্ধি; খ. ডিজেলের দামবৃদ্ধিতে মিলে চালের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি; গ. বাড়তি দামে বিক্রির আশায় বড় ও মাঝারি কৃষকের ধান ধরে রাখা, যা বাজারে কিছুটা ধানের সংকট সৃষ্টি করেছে; ঘ. ২৮ অক্টোবরের পর থেকে চাল আমদানিতে শুল্ক হার হ্রাসের সুবিধা প্রদান না করা।

তবে চালের মূল্যবৃদ্ধিতে উপর্যুক্ত কারণগুলো কতটা কার্যকর তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়লেও চালের দাম বেড়েছে অনেক বেশি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দাম ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। তাই চালের দামবৃদ্ধিতে ডিজেলের দামবৃদ্ধির প্রভাব খুবই সামান্য। দ্বিতীয়ত, উৎপাদিত ধানের মজুতে বড় ও মাঝারি কৃষকের অংশ থাকে কম-বেশি ২০ শতাংশ। এক গবেষণা রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জুনে ধানের মজুতে কৃষকের অংশ ছিল ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ। এখানে কৃষক বলতে বড় ও মাঝারি কৃষককে বোঝানো হচ্ছে। কারণ কৃষক পরিবারগুলোর বৃহত্তর অংশ ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষিদের ঘরে মৌসুম শেষে বিক্রির জন্য কোনো ধান থাকে না। বাকি ৮০ শতাংশের মধ্যে ৬০ শতাংশের কিছুটা বেশি মজুত থাকে চালকল মালিকদের কাছে। অবশিষ্ট কম-বেশি ২০ শতাংশ মজুত থাকে ধান ব্যবসায়ীদের কাছে। ২৮ নভেম্বর একটি দৈনিকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ধান-চালের বড় বড় মোকাম ও হাটবাজারগুলোতে এখন নতুন আমন ধানের ব্যাপক সরবরাহ। প্রতিদিনই হাট-বাজারগুলোতে ধান-চালের এ সরবরাহ বাড়ছে। অন্য একটি সূত্রে বলা হয়েছে, সরবরাহ বাড়ায় নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে নওগাঁর হাটে আমন ধানের দাম কমে গেছে। এ মূল্যহ্রাস মণপ্রতি ৩০ থেকে ৪০ টাকা। সুতরাং কৃষকের কাছে থাকা স্বল্প পরিমাণ ধানের মজুত চালের দামবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করেছে বলে মনে হয় না। তৃতীয়ত, ধান কাটা-মাড়াই মৌসুমে ধানের দাম হঠাৎ পড়ে যাওয়ায় ধানচাষিরা যাতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেজন্য অক্টোবর-পরবর্তী সময়ে চাল আমদানিতে শুল্ক হার হ্রাসের সুবিধা প্রদান না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে ইতোমধ্যেই ৮ লাখ টনের বেশি চাল আমদানি হয়েছে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, চালের দামবৃদ্ধির পেছনে অন্য কারণ রয়েছে। সরকার অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে চাল সংগ্রহে পুরোপুরি চালকল মালিকদের ওপর নির্ভরশীল। সরকার চলতি আমন মৌসুমে ৩ লাখ টন ধান এবং ৫ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা চালের আকারে ৭ লাখ টনের কিছুটা বেশিতে দাঁড়াবে। এর পুরোটাই সরবরাহ করবেন চালকল মালিকরা। সরকারকে চাল সরবরাহ ছাড়া তারা ধান কাটা-মাড়াই মৌসুম শেষে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে লাভের অঙ্ক বাড়াতে মৌসুম চলাকালে সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে প্রচুর ধান কিনে মজুত করেন। এ কাজে তাদের বেশি করে উৎসাহিত করে থাকতে পারে করোনাভাইরাসের নতুন ধরনের আবির্ভাব।

আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার প্রায় ৪০টি দেশে করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রন ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এর সংক্রমণ ঘটেছে। বাংলাদেশও ওমিক্রনের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাবে বলে মনে হয় না। ওমিক্রনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বেড়ে চলেছে কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা। এতে বিশ্বব্যাপী পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীরা ব্যাপকভাবে ধান-চাল মজুত করছেন বলে বিজ্ঞজনরা মনে করেন, যা বিশেষ করে চালের বাজারকে অস্থির করে তুলেছে।

একটি পরিবারে মাসিক যে ব্যয় হয়, তার প্রায় অর্ধেক চলে যায় খাদ্য সংগ্রহে। বিবিএসের প্রাথমিক হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে (এইচআইইএস) ২০১৬ মোতাবেক, জাতীয় পর্যায়ে একটি পরিবারের মাসিক মোট ব্যয়ের ৪৭ দশমিক ৭০ শতাংশ খরচ হয় খাদ্যে। গ্রামাঞ্চলে খাদ্যে ব্যয় হয় ৫০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে খাদ্যে ব্যয়ের পরিমাণ ৪২ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এর অর্থ দাঁড়ায়, গ্রামে বসবাসকারী কম-বেশি ৭০ শতাংশ মানুষ খাদ্যে বেশি ব্যয় করেন। আর সাধারণ মানুষ খাদ্যে যে ব্যয় করেন, তার কম-বেশি ৮০ শতাংশ চালে। বিআইডিএসের এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, খাদ্য-মূল্যস্ফীতি বাড়লে ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ হতদরিদ্র পরিবারই চালের ভোগ কমিয়ে দেয়। দরিদ্র পরিবারের বেলায় এ হার ৬৬ শতাংশ। তাই মোটা চালের দাম উচ্চহারে বৃদ্ধি পেলে তাদের খাদ্যনিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়ে।

শুধু দরিদ্র ও হতদরিদ্ররা নন, চালের দামবৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত হন মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তরাও, বিশেষ করে যাদের আয় নির্দিষ্ট। চালের দামে ঊর্ধ্বগতির কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের আমিষজাতীয় খাবার কেনা অনেকটা কমিয়ে দিতে হয়। এতে তাদের পরিবারে, বিশেষ করে শিশু ও মহিলাদের পুষ্টির অভাব ঘটে। এতে অবনতি ঘটে তাদের স্বাস্থ্যের। তাছাড়া এসব পরিবারকে কমিয়ে দিতে হয় শিক্ষা খাতে ব্যয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থীরা। সংকুচিত করতে হয় তাদের পরিবারের স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই খাদ্যের, বিশেষ করে চালের মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের কাছে ভীতি হয়ে দেখা দেয়।

চালের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। এটি এখন বিশেষভাবে জরুরি হয়ে পড়েছে এ কারণে যে, গত প্রায় দুবছর ধরে করোনা সংক্রমণের কারণে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মানুষের আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে। এজন্য যা করণীয় তা হলো- এক. অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে সরকার আমন সংগ্রহের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তা অর্জনে সার্বিক প্রচেষ্টা নিতে হবে। দুই. হ্রাসকৃত শুল্কহারে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে আরও ৫-৭ লাখ টন চাল আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে। তিন. খাদ্য ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হতে হবে। চার. খাদ্যনিরাপত্তার হুমকি থেকে রক্ষা করতে নিম্নআয়ের মানুষের আয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিতে হবে। পাঁচ. করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রনের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচি জোরদারকরণসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে হবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক খাদ্য সচিব, কলাম লেখক

[email protected]

স্বদেশ ভাবনা

আমনের ভরা মৌসুমে চালের দাম বাড়ছে কেন?

 আবদুল লতিফ মণ্ডল 
০৮ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে চালের ক্রেতা-ভোক্তারা আশা করেছিলেন, আমন ধান কাটার মৌসুমে বাজারে সব ধরনের চালের দাম কমবে। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। বরং আমনের ভরা মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে এবং এ বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

চাল থেকে তৈরি ভাত দেশের কম-বেশি ৯০ শতাংশ মানুষের প্রধান খাদ্য। তাই আমনের ভরা মৌসুমে চালের দাম কেন বাড়ছে এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে চালের দাম ক্রেতা-ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে সরকারকে কেন এখনই উদ্যোগ নিতে হবে, তা আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

৪ ডিসেম্বর যুগান্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামে ভরা মৌসুমে আরেক দফা বেড়েছে চালের দাম। প্রতি বস্তা চালের দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বাড়ল। মোটা ও সরু সব ধরনের চালের দাম কেজিপ্রতি দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক সপ্তাহে জিরাশাইল সিদ্ধ চাল বস্তাপ্রতি বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৮৫০ টাকায়। এখন ১০০ টাকা বেড়ে গিয়ে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৯৫০ টাকায়। এ ছাড়া মিনিকেট সিদ্ধ ১৫০ টাকা বেড়ে ২ হাজার ৬৫০ টাকা, পাইজাম সিদ্ধ বস্তায় ৫০ টাকা বেড়ে ২ হাজার ৩৫০ টাকা, কাটারিভোগ সিদ্ধ ২০০ টাকা বেড়ে ৩ হাজার ২০০ টাকা, কাটারিভোগ আতপ বস্তাপ্রতি ৩০০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৩০০ টাকায়, মিনিকেট আতপ ১০০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ টাকায় এবং পাইজাম আতপ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩৫০ টাকায়। ৫ ডিসেম্বর অন্য একটি দৈনিকের খবরে বলা হয়েছে, চাল উৎপাদনের জন্য প্রসিদ্ধ উত্তরাঞ্চলের নওগাঁয় গত এক সপ্তাহে সরু ও মাঝারি চালের দাম বেড়েছে। নন-শর্টার জিরা ও কাটারি চাল এবং বিআর-২৮ ও বিআর-২৯ জাতের চালের দাম কেজিতে তিন টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ৬ ডিসেম্বর আরেকটি দৈনিকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশে চালের দাম বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) ১০০-২৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গত সপ্তাহের শেষদিকে অন্যান্য সূত্রে প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, রাজধানীর বাজারে বেড়েছে চালের দাম। বাজারে সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৮ থেকে ৬৮ টাকা, মাঝারি চাল ৪৮ থেকে ৫৫ টাকা এবং মোটা চাল ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা কেজি দরে। আর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য মোতাবেক ২ ডিসেম্বর মোটা সিদ্ধ চালের খুচরা মূল্য ছিল প্রতি কেজি ৪৪ থেকে ৪৮ টাকা।

দেশে উৎপাদিত চালের ৫৫ শতাংশ আসে বোরো থেকে। দেশে চাল উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আমন। ২০১৭-১৮, ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে যখন বোরো চাল উৎপাদনের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১ কোটি ৯৫ লাখ ৭৬ হাজার, ২ কোটি ৩ লাখ ৮৯ হাজার এবং ২ কোটি ১ লাখ ৮১ হাজার টন, তখন ওইসব অর্থবছরে আমন চালের উৎপাদন দাঁড়িয়েছিল যথাক্রমে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৯৪ হাজার, ১ কোটি ৪০ লাখ ৫৫ হাজার এবং ১ কোটি ৫৫ লাখ টন (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা, ২০২১)। লক্ষ্যমাত্রার (৫৫.৭৭ লাখ হেক্টর) চেয়ে বেশি পরিমাণ (৫৬.২০ লাখ হেক্টর) জমিতে আমনের চাষ হওয়ায় এবং বড় রকমের বন্যা না দেখা দেওয়ায় এবার আমন চাল উৎপাদনের পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রা (১.৫৬ কোটি টন) ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সরকারিভাবে বলা হচ্ছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, আমনের ভালো উৎপাদন এবং চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই-৫ ডিসেম্বর সময়কালে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ৮ লাখ ২৫ হাজার টন চাল আমদানি হওয়া সত্ত্বেও চালের আকাশছোঁয়া দাম কেন? চাল ব্যবসায়ীদের বরাত দিয়ে উপর্যুক্ত প্রতিবেদনগুলোতে আমনের ভরা মৌসুমে চালের দামবৃদ্ধির কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো- ক. নভেম্বরে সরকার ডিজেলের দাম বৃদ্ধি করায় চাল পরিবহণ ভাড়া বৃদ্ধি; খ. ডিজেলের দামবৃদ্ধিতে মিলে চালের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি; গ. বাড়তি দামে বিক্রির আশায় বড় ও মাঝারি কৃষকের ধান ধরে রাখা, যা বাজারে কিছুটা ধানের সংকট সৃষ্টি করেছে; ঘ. ২৮ অক্টোবরের পর থেকে চাল আমদানিতে শুল্ক হার হ্রাসের সুবিধা প্রদান না করা।

তবে চালের মূল্যবৃদ্ধিতে উপর্যুক্ত কারণগুলো কতটা কার্যকর তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়লেও চালের দাম বেড়েছে অনেক বেশি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দাম ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। তাই চালের দামবৃদ্ধিতে ডিজেলের দামবৃদ্ধির প্রভাব খুবই সামান্য। দ্বিতীয়ত, উৎপাদিত ধানের মজুতে বড় ও মাঝারি কৃষকের অংশ থাকে কম-বেশি ২০ শতাংশ। এক গবেষণা রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জুনে ধানের মজুতে কৃষকের অংশ ছিল ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ। এখানে কৃষক বলতে বড় ও মাঝারি কৃষককে বোঝানো হচ্ছে। কারণ কৃষক পরিবারগুলোর বৃহত্তর অংশ ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষিদের ঘরে মৌসুম শেষে বিক্রির জন্য কোনো ধান থাকে না। বাকি ৮০ শতাংশের মধ্যে ৬০ শতাংশের কিছুটা বেশি মজুত থাকে চালকল মালিকদের কাছে। অবশিষ্ট কম-বেশি ২০ শতাংশ মজুত থাকে ধান ব্যবসায়ীদের কাছে। ২৮ নভেম্বর একটি দৈনিকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ধান-চালের বড় বড় মোকাম ও হাটবাজারগুলোতে এখন নতুন আমন ধানের ব্যাপক সরবরাহ। প্রতিদিনই হাট-বাজারগুলোতে ধান-চালের এ সরবরাহ বাড়ছে। অন্য একটি সূত্রে বলা হয়েছে, সরবরাহ বাড়ায় নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে নওগাঁর হাটে আমন ধানের দাম কমে গেছে। এ মূল্যহ্রাস মণপ্রতি ৩০ থেকে ৪০ টাকা। সুতরাং কৃষকের কাছে থাকা স্বল্প পরিমাণ ধানের মজুত চালের দামবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করেছে বলে মনে হয় না। তৃতীয়ত, ধান কাটা-মাড়াই মৌসুমে ধানের দাম হঠাৎ পড়ে যাওয়ায় ধানচাষিরা যাতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেজন্য অক্টোবর-পরবর্তী সময়ে চাল আমদানিতে শুল্ক হার হ্রাসের সুবিধা প্রদান না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে ইতোমধ্যেই ৮ লাখ টনের বেশি চাল আমদানি হয়েছে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, চালের দামবৃদ্ধির পেছনে অন্য কারণ রয়েছে। সরকার অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে চাল সংগ্রহে পুরোপুরি চালকল মালিকদের ওপর নির্ভরশীল। সরকার চলতি আমন মৌসুমে ৩ লাখ টন ধান এবং ৫ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা চালের আকারে ৭ লাখ টনের কিছুটা বেশিতে দাঁড়াবে। এর পুরোটাই সরবরাহ করবেন চালকল মালিকরা। সরকারকে চাল সরবরাহ ছাড়া তারা ধান কাটা-মাড়াই মৌসুম শেষে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে লাভের অঙ্ক বাড়াতে মৌসুম চলাকালে সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে প্রচুর ধান কিনে মজুত করেন। এ কাজে তাদের বেশি করে উৎসাহিত করে থাকতে পারে করোনাভাইরাসের নতুন ধরনের আবির্ভাব।

আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার প্রায় ৪০টি দেশে করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রন ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এর সংক্রমণ ঘটেছে। বাংলাদেশও ওমিক্রনের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাবে বলে মনে হয় না। ওমিক্রনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বেড়ে চলেছে কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা। এতে বিশ্বব্যাপী পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীরা ব্যাপকভাবে ধান-চাল মজুত করছেন বলে বিজ্ঞজনরা মনে করেন, যা বিশেষ করে চালের বাজারকে অস্থির করে তুলেছে।

একটি পরিবারে মাসিক যে ব্যয় হয়, তার প্রায় অর্ধেক চলে যায় খাদ্য সংগ্রহে। বিবিএসের প্রাথমিক হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে (এইচআইইএস) ২০১৬ মোতাবেক, জাতীয় পর্যায়ে একটি পরিবারের মাসিক মোট ব্যয়ের ৪৭ দশমিক ৭০ শতাংশ খরচ হয় খাদ্যে। গ্রামাঞ্চলে খাদ্যে ব্যয় হয় ৫০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে খাদ্যে ব্যয়ের পরিমাণ ৪২ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এর অর্থ দাঁড়ায়, গ্রামে বসবাসকারী কম-বেশি ৭০ শতাংশ মানুষ খাদ্যে বেশি ব্যয় করেন। আর সাধারণ মানুষ খাদ্যে যে ব্যয় করেন, তার কম-বেশি ৮০ শতাংশ চালে। বিআইডিএসের এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, খাদ্য-মূল্যস্ফীতি বাড়লে ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ হতদরিদ্র পরিবারই চালের ভোগ কমিয়ে দেয়। দরিদ্র পরিবারের বেলায় এ হার ৬৬ শতাংশ। তাই মোটা চালের দাম উচ্চহারে বৃদ্ধি পেলে তাদের খাদ্যনিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়ে।

শুধু দরিদ্র ও হতদরিদ্ররা নন, চালের দামবৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত হন মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তরাও, বিশেষ করে যাদের আয় নির্দিষ্ট। চালের দামে ঊর্ধ্বগতির কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের আমিষজাতীয় খাবার কেনা অনেকটা কমিয়ে দিতে হয়। এতে তাদের পরিবারে, বিশেষ করে শিশু ও মহিলাদের পুষ্টির অভাব ঘটে। এতে অবনতি ঘটে তাদের স্বাস্থ্যের। তাছাড়া এসব পরিবারকে কমিয়ে দিতে হয় শিক্ষা খাতে ব্যয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থীরা। সংকুচিত করতে হয় তাদের পরিবারের স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই খাদ্যের, বিশেষ করে চালের মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের কাছে ভীতি হয়ে দেখা দেয়।

চালের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। এটি এখন বিশেষভাবে জরুরি হয়ে পড়েছে এ কারণে যে, গত প্রায় দুবছর ধরে করোনা সংক্রমণের কারণে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মানুষের আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে। এজন্য যা করণীয় তা হলো- এক. অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে সরকার আমন সংগ্রহের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তা অর্জনে সার্বিক প্রচেষ্টা নিতে হবে। দুই. হ্রাসকৃত শুল্কহারে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে আরও ৫-৭ লাখ টন চাল আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে। তিন. খাদ্য ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হতে হবে। চার. খাদ্যনিরাপত্তার হুমকি থেকে রক্ষা করতে নিম্নআয়ের মানুষের আয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিতে হবে। পাঁচ. করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রনের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচি জোরদারকরণসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে হবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক খাদ্য সচিব, কলাম লেখক

[email protected]

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন