ফিরে দেখা সেই দিনটি

  ড. এম এ মাননান ১০ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন
বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে জাতির প্রাণঢালা সংবর্ধনা।

বছর-তারিখ মনে আছে, দিনটির নাম মনে নেই। পৌষের শীতের টনটনে পরশ। সূর্য তখন মধ্য গগনে। বলাকা সিনেমা হলের দক্ষিণ পাশের একটি অখ্যাত রেস্তোরাঁয় তিন বন্ধু মিলে দুপুরের আহার সেরে ছুটলাম রেসকোর্স ময়দানের (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) দিকে। দ্রুত যেতে হবে, নইলে সামনে জায়গা পাওয়া যাবে না। ভাগ্য ভালো, রেসকোর্সের পশ্চিম-উত্তর দিকের রেসের ঘোড়া রাখার জিমখানা পার হয়ে একটু পূর্ব দিকে যেতেই বাঁশের ঘেরের কিনারেই জায়গা পেয়ে গেলাম। বসে গেলাম সবুজ ঘাসের বিছানায়। ডানে-বাঁয়ে অগণিত লোকজন আসছে, বসছে। যেন লাখো লাখো মানুষের ঢল নেমেছে রেসকোর্স ময়দানে। এত মানুষ অথচ তেমন কোনো হইহুল্লোড় নেই। সবার চেহারায় এক রকম উদ্বেগ। পাশের একজন মধ্য-বয়সী খোঁচাখোঁচা দাড়িবিশিষ্ট শান্তশিষ্ট মানুষ জিজ্ঞেস করলেন, বঙ্গবন্ধু আসবেন তো? কোনো ঝামেলা হবে না তো? জানেন কিছু, ভাই? তাকে কি জবাব দেব, আমিই তো জানি না কিছু। উৎকণ্ঠা তো আমার মধ্যেও।

যে দিনের কথা বলছি, সে দিনটি ছিল ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। বঙ্গবন্ধু পরাজিত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বিজয়দৃপ্ত পা রাখবেন আজ লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত পরাজিত হানাদার বাহিনীর ছেড়ে যাওয়া মুক্ত-স্বাধীন বাংলাদেশে, নিজের প্রিয় মাতৃভূমিতে। রেডিও’র খবরে জেনেছি, তার সঙ্গে থাকবেন ড. কামাল হোসেন, যিনি নিজেও সে দেশের কারাগারে ছিলেন বন্দি। খবরে বলা হল, ৮ জানুয়ারি কারাগার থেকে মুক্তির পর প্রথমে তিনি লন্ডন যাবেন এবং পরে দিল্লি হয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে পা রাখবেন।

১৯৭১ এর ২৫ মার্চ গভীর রাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার পরপরই বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানি শাসকরা তাকে ধানমণ্ডির বাড়ি থেকে বন্দি করে পাকিস্তানে নিয়ে জেনারেল নিয়াজীর এলাকায় মিয়ানওয়ালী কারাগারে নয় মাস আটকে রাখেন। সেই কারাগারে তার ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। জেলখানার কুঠুরির সামনে তাকে হত্যা করে মাটিচাপা দেয়ার জন্য সামরিক জান্তা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে পরাজিত শাসকগোষ্ঠী কবরও খুঁড়ে রেখেছিল। বিশ্ব জনমতের চাপে তাকে ২৯০ দিনের বন্দিজীবন থেকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল তখনকার পাকি শাসকরা। সারা জগতের বিস্ময় অদম্য এই নেতার আগে থেকে দেয়া নির্দেশের ভিত্তিতেই সারা বাংলার মানুষ দেশকে হানাদারমুক্ত করার লক্ষ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তিযুদ্ধে।

পাকিস্তানের হরিপুর জেলখানা থেকে মুক্তি পাওয়া ড. কামাল হোসেনসহ লন্ডনে নেমেই বঙ্গবন্ধু প্রথমে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে দেখা করেন, ইনি সেই ব্যক্তি যিনি মহাপ্রতাপশালী ব্রিটেনের সরকারপ্রধান হয়েও বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে তার অফিসের বাইরে এসে নিজ হাতে গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থেকে তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। লন্ডনের বিখ্যাত ক্লারিজেস হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে কান্নাভেজা কণ্ঠে জাতির জনক বর্ণনা দেন কীভাবে পাকিস্তানি শাসকরা তাকে ফাঁসিতে ঝুলানোর ঘৃণ্য চক্রান্ত করেছিল। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, তারা তাকে বাঁচতে দেবে না। কিন্তু দীর্ঘ আঠারো বছর পরাধীন বাংলার কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে থাকা ভয়লেশহীন বাংলাদেশের মুক্তির অগ্রদূত তাতে একটুও ভীত হননি। মনেপ্রাণে তিনি চেয়েছিলেন বাংলাদেশ মুক্ত হোক, এদেশের নির্যাতিত মানুষগুলো শান্তিতে থাকুক। লন্ডন থেকে বঙ্গবন্ধু দিল্লিতে যান এবং দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে জনতার উদ্দেশে মোহনীয় ভাষণ দেন। পাশে ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, যিনি মুক্তিযুদ্ধকালে এক কোটি বাংলাদেশিকে শুধু আশ্রয় দিয়েই ক্ষান্ত হননি, যুদ্ধক্ষেত্রে মুক্তিবাহিনীকে ভারতীয় সেনাবাহিনী দিয়ে সাহায্য করেছেন এবং সারা বিশ্বে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য তৎপরতাও চালিয়েছেন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য তিনিই ৬৭ দেশের সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধানকে চিঠি দিয়েছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও পাঁচটি ইউরোপীয় দেশ সফর করে বিশ্ব জনমত বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশের পক্ষে এনেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতই ছিল বাংলাদেশের একমাত্র অকৃত্রিম বন্ধু। এ বন্ধুত্বের পেছনে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেছেন সমসাময়িক বিশ্বের লৌহমানবী ইন্দিরা গান্ধী।

তারপর এলো সে মাহেন্দ্রক্ষণ। দীর্ঘ ১০ মাস শত্রুদেশে কারাভোগের পর কাণ্ডারীর দেশে ফেরার পালা। কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে নেমে বঙ্গবন্ধু দেখলেন পাগলপারা দেশবাসী বিমানবন্দর চত্বরে উপচে পড়েছে তাকে এক নজর দেখার জন্য। তার চোখের জল কপোল বেয়ে ঝরছে আর তিনি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে সঙ্গে নিয়ে উদ্বেলিত হৃদয়ে হাত নেড়ে নেড়ে বিশাল জনতাকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর লাল-নীল রঙের উদাম ট্রাকে চড়ে পেছনে আর পাশে লাখো জনতার ভেতর দিয়ে বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছলেন যেখানে কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল লাখো মানুষ, মুখে গগনবিদারী স্লোগান ‘জয় বাংলা’, সে-ই আবেগমাখা স্লোগান যা বুকে ধারণ করে দীর্ঘ নয় মাস নিরস্ত্র বাঙালিরা অসম যুদ্ধে লিপ্ত ছিল বিশ্বের অন্যতম দক্ষ চৌকস সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে অভিষিক্ত বঙ্গবন্ধুর দেশে ফেরা বাঙালি জাতির জন্য ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রেরণাদায়ক। দেশ তখন পুরোপুরি বিধ্বস্ত। রাস্তাঘাট, রেলপথ, বন্দর, হাট-বাজার, পুল-কালভার্ট ইত্যাদি সবকিছু হানাদার বাহিনী পরাজয়ের শেষ মুহূর্তে ধ্বংস করে দিয়েছে। পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করে তারা অর্থনীতি, শিল্প-কারখানা, কৃষি, বাণিজ্য কেন্দ্র, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো নির্বিচারে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বাণিজ্যিক ব্যংকগুলোতে রক্ষিত কারেন্সি নোট পুড়িয়ে দিয়ে মুদ্রাবাজার অচল করে দিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারাসহ এক কোটি নাগরিক তাদের দুঃসময়ের আশ্রয়স্থল ভারত থেকে নিজ ভূমে ফেরত আসা শুরু করেছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে নিত্যপণ্যের দাম হঠাৎ করেই বেড়ে আকাশচুম্বী হয়েছে। অন্য অনেক দেশের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে আকাল। এমনি একটি দুঃসময়ে সেই মহামানব বন্দিদশা থেকে ফিরে এলেন নিজ ভূমিতে, যার জন্য অধীর আগ্রহে থেকেছেন বাংলাদেশের যুদ্ধক্লান্ত নিপীড়িত সর্বহারা মানুষগুলো।

রেসকোর্স ময়দানে তিলধারণের ঠাঁই নেই। চারদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ। সেই মানুষের ভিড়ে আমিও ছিলাম একজন। ঠিক মঞ্চের সামনে যেখানে বাঁশ দিয়ে ঘেরাও করে রাখা হয়েছিল। সঙ্গে ছিল জিন্নাহ হলের (পরবর্তী সময় মাস্টারদা সূর্যসেন হল) অনার্স ফাইনাল ইয়ারের তিন সহপাঠী। অধীর আগ্রহে আমরা অপেক্ষা করছিলাম কখন সেই জীবন্ত ইতিহাসের মহানায়ক আসবেন আমাদের সামনে, কখন দেখতে পাব তাকে, কখন শুনব তার অমিয় ভাষণ ঠিক সেই দিনের (৭ মার্চ ১৯৭১) মতো, যেদিন তিনি একই জায়গার মঞ্চেই কবিত্বময় অলিখিত ভাষণটি দিয়েছিলেন (যা ২০১৭ সালে ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃত)। ভাবনা তখন আমার যেন পাখা মেলে ভাসছে : রাজনীতির কবি কি ৭ মার্চের মতোই অলিখিত ভাষণ দেবেন, তিনি আজ স্বাধীন বাংলাদেশে কি আগের মতোই অগ্নিঝরা বক্তব্য রাখবেন, তার সেই বজ্রকণ্ঠ কি আজও আগের মতোই তেজোদীপ্ত আছে, আজও কি তার কণ্ঠ থেকে ভেসে আসবে আগুনের ফুলকি, তার কাছ থেকে কি আমরা আগের মতোই কবিত্বময় গদ্য-ভাষণের অনুরণন শুনব, তিনি কি আজ লাখ লাখ সমাগতের জরাজীর্ণ দেশটির পুনর্গঠনের জন্য আশা জাগানিয়া নির্দেশনা দেবেন, তার আজকের ভাষণের মধ্য দিয়েই কি বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের আরেকটি আলোকিত অধ্যায় রচিত হবে? শুধুই ভাবনা, রাজনীতির মুকুটহীন সম্রাট আজ এলে কী বলবেন! বিজয়ের মাত্র ২৫ দিন পর আমরা কি প্রবেশ করতে যাচ্ছি নবগঠিত রাষ্ট্রটির এক আলোকিত অধ্যায়ে? চতুর্দিকে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে মুখরিত ময়দানে আমার ভাবনাগুলোও মনে হয় যেন গগনজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এ ভাবনার মধ্যেই বিকেলের পড়ন্ত বেলায় হঠাৎ কানে এলো গগনবিদারী হর্ষোল্লাস, যা গড়িয়ে পড়ছে সারা ময়দানের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত।

তিনি এলেন বীরের বেশে, মঞ্চে উঠলেন, ভেজা কণ্ঠে সবাইকে অভিবাদন জানালেন। চোখ মুছতে মুছতে অশ্রুবিগলিত কণ্ঠে অনেক কথার মাঝে স্বাধীন বাংলাদেশের পুনর্গঠনের রূপরেখা ব্যাখ্যার পর সবাইকে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগের আহ্বান জানালেন। সেই আগের মতোই দৃঢ় কণ্ঠ। ভাষণ সংক্ষিপ্ত; কিন্তু সে ভাষণে প্রস্ফুটিত রাষ্ট্রনায়কোচিত দূরদৃষ্টি। এজন্যই তিনি বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা।

জীবন্ত কিংবদন্তি জাতির পিতা সব বাঙালির মুক্তির দিশারী স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ঘৃণ্য পশুতুল্য বিভীষণদের চক্রান্তে অকালে শহীদ হয়েও আমাদের মাঝে আছেন অমর হয়ে। তিনি থাকবেন সবার হৃদয়ে চিরকাল। বাংলার মানুষ কখনও ভুলবে না এ মহামানবকে যত দিন সূর্য উঠবে পূর্বদিকে, লোনা জলরাশিতে সিক্ত থাকবে সাগর-মহাসাগর, নীল গগণের বিস্তৃত জমিনে জ্বলজ্বল করতে থাকবে লক্ষ তারা, থাকবে মৌসুমি হাওয়ায় ধবল-কৃষ্ণ মেঘের আনাগোনা, ঝরো ঝরো বৃষ্টিতে নদীতে নাচবে জলতরঙ্গ। তিনি থাকবেন কবির কবিতায়, শিল্পীর ক্যানভাসে, গায়কের কণ্ঠে, লেখকের লেখনীতে, স্থপতির ভাস্কর্যে, ভাটিয়ালির সুরে, মাঝির বৈঠার বাজনায় আর ইতিহাসের পত্রে পত্রে। ব্যক্তিগতভাবে মাগফিরাত কামনা করছি এই মহামানবের বিদেহী আত্মার যার অকৃত্রিম আত্মত্যাগ ও বিশাল নেতৃত্ব আমাদের এনে দিয়েছে স্বাধীন বাংলায় আজকের অবস্থানে।

অধ্যাপক ড. এম এ মাননান : উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter