সড়কে প্রাণঘাতী অব্যবস্থাপনার অবসান চাই
jugantor
সড়কে প্রাণঘাতী অব্যবস্থাপনার অবসান চাই

  মুঈদ রহমান  

১৬ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনা অতিমারি সারা বিশ্বকে থামিয়ে দিতে পারলেও থামাতে পারেনি বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনা; কমাতে পারেনি নিহত ও আহতের সংখ্যা। করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে ২০২১ সালে বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৮৫ দিন পরিবহণ চলাচল বন্ধ ছিল। তারপরও আগের বছরের তুলনায় নিহতের সংখ্যা বেড়েছে ১৭ শতাংশ, দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে ১৩ শতাংশ। এর জন্য সড়কপথের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। গত ৮ জানুয়ারি ঢাকায় নিরাপদ সড়ক নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশন তার বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, ২০২১ সালে দেশজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটে ৫ হাজার ৩৭১টি। দুর্ঘটনাগুলোয় নিহত হয়েছেন ৬ হাজার ২৮৪ জন এবং আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৪৬৮ জন। গণপরিবহণ বন্ধ থাকার ৮৫ দিন বাদ দিলে মৃত্যুর সংখ্যা গড়ে দৈনিক ২২ জনেরও বেশি। দুর্ঘটনাগুলোয় মৃত্যুর ২৫ শতাংশই ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। ১৮ শতাংশ চট্টগ্রাম বিভাগে। পরিবহণ বিশেষজ্ঞরা এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড বলে অভিহিত করছেন। ২০২১ সালের বছরজুড়ে শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে ৮০৩ জন। গেল বছর সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী নিহত হয় মে মাসে, সংখ্যা ৮৪। ফেব্রুয়ারিতে এ সংখ্যা ছিল ৮৩ আর জুনে সবচেয়ে কম ৫৩।

২০১৮ সালের ২৯ জুলাই থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে এসেছিল। সরকারের দেওয়া আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে তারা রাজপথ ছেড়ে যায়। কিন্তু গেল তিন বছরেও সরকার তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেনি বা রক্ষার চেষ্টা করেনি। বস্তুত সড়কপথের অনিয়ম নিয়ে যেটুকু বাদ-প্রতিবাদ হয়েছে, তা কেবল শিক্ষার্থীরাই করেছে। ২০২১ সালের ১৮ নভেম্বরও তারা পথে নেমেছিল। অর্ধেক বাস ভাড়ার দাবিতে করা ওই বিক্ষোভের মধ্যেই গাড়িচাপায় নিহত হয় নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান। ২০ দিনের টানা আন্দোলনের পরও এর সুফল মানুষ ভোগ করতে পারেনি।

সড়ক দুর্ঘনায় হতাহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে, আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে মানবসম্পদের। দুর্ঘটনায় মানবসম্পদের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের একটি আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া আছে। সেই প্রক্রিয়া মেনে করা মূল্যায়নে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বক্তব্য হলো, দুর্ঘটনার কারণে গেল বছর বাংলাদেশের মানবসম্পদের ক্ষতির পরিমাণ ৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি। তবে তথ্যের অভাবে যানবাহন কিংবা সম্পদের ক্ষতির হিসাব পাওয়া যায়নি।

সড়কে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা বেড়েছে। বর্তমানে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৩৫ লাখ ছাড়িয়ে গেছে, যা পাঁচ বছর আগে ৯ লাখের বেশি ছিল না। একই সঙ্গে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। গত বছরের তুলনায় দুর্ঘটনা বৃদ্ধির হার ৫০ শতাংশেরও বেশি। দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর হারও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ শতাংশের বেশি। লক্ষণীয় বিষয়, ২০২১ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ২ হাজার ২১৪ জনের মধ্যে বেশির ভাগের বয়স ছিল ১৪ থেকে ৪৫ বছর। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উঠতি বয়সি যুবকদের বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালনাই দুর্ঘটনা বৃদ্ধির কারণ।

সড়ক দুর্ঘটনার কারণ খুঁজতে গিয়ে যানবাহনের বেপরোয়া গতিকেই এক নম্বরে রাখা হয়েছে। গত বছর যত দুর্ঘটনা ঘটেছে, এর ৬২ শতাংশের জন্য দায়ী বেপরোয়া গতি। এ ধরনের গতির কারণে চালক তার গতিনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে তার পক্ষে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয় না। নেশাগ্রস্ত হয়ে যানবাহন চালানো এর একটি কারণ। আরেকটি কারণ চালকদের অদক্ষতা। কারণ ভালো সড়কে যানবাহনের গতি থাকে বেশি। সেই গতিতে গাড়ি চালাতে হলে যে দক্ষতা থাকা প্রয়োজন, তা আমাদের অনেক চালকেরই নেই। চালকদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নির্ধারণ না থাকা দুর্ঘটনার আরেকটি কারণ। যানজটের কারণে একজন চালককে নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার চেয়ে দুই-তিনগুণ বেশি সময় ধরে চালকের আসনে থাকতে হয়। এই বাড়তি শারীরিক ও মানসিক চাপ দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আমাদের মহাসড়কগুলোয় স্বল্প ও দ্রুত গতির যানবাহন একই সঙ্গে চলাচল করে। এটিও দুর্ঘটনার একটি কারণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মহাসড়কগুলোয় স্বল্প গতির যানবাহনের জন্য সার্ভিস রোড নির্মাণ করা প্রয়োজন। ফুটপাত হকারদের দখলে থাকা এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও দুর্ঘটনার কারণ। লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে বিআরটিএ-এর দুর্নীতির কারণে অদক্ষ চালক গাড়ি চালানোর অনুমোদন পাচ্ছে। এর সঙ্গে আছে ফিটনেস সার্টিফিকেটে অনিয়ম। এগুলোও সড়ক দুর্ঘটনার কারণ।

আমাদের সড়কগুলোর ধারণক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন, এদেশের সড়কগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমটি হলো জাতীয় মহাসড়ক, যা ‘এন’ দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। দ্বিতীয়টি হলো আঞ্চলিক সড়ক, যেগুলোকে আমরা ‘আর’ দিয়ে চিনতে পারি। তৃতীয়টি হলো জেলা সড়ক, যা ‘জেড’ দিয়ে চিহ্নিত করা। এই তিন ধরনের সড়কপথের মোট দৈর্ঘ্য ২১ হাজার কিলোমিটার। দেশে সড়কপথে যানবাহন চলাচলের অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। প্রাইভেট কার, বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, অটোরিকশাসহ ২০ রকম যানবাহনের নিবন্ধন দেয় বিআরটিএ। দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৪৫ লাখ। এর বাইরে কয়েক লাখ যানবাহন আছে, যাদের কোনো নিবন্ধন নেই। সব মিলে প্রায় ৫০ লাখ যানবাহন চলাচল করে থাকে এই ২১ হাজার কিলিামিটার পথে। অনেকেই মনে করেন, যানবাহনের এই সংখ্যা ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। সড়কের প্রস্থ না বাড়ালে এই চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হবে।

সড়কপথের সংস্কার নিয়ে কাজ করছে সড়ক বিভাগ। ২০২১-২২ সালের নেওয়া প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এবং সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা। যশোর-ঝিনাইদহ করিডরের সংস্কার হলো আরেকটি প্রকল্প। সব মিলে ২০২১-২২ সালে সড়ক খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৯ হাজার ৫২০ কোটি টাকা। অর্থ বরাদ্দের পরিমাণটা একেবারে অপর্যাপ্ত বলা যাবে না, বরং বলা চলে যথেষ্ট। তবে এ খাতে দুর্নীতি আর অব্যস্থাপনা আমাদের সুফল ভোগের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমন্বয়হীনতা, সিদ্ধান্তহীনতা ও উদাসীনতা।

সড়ক ব্যবস্থাপনায় এই তিন ‘হীনতা’র উপস্থিতি চোখের দেখা উদাহরণ থেকেই বলতে পারি। বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়কের পাশে। কুষ্টিয়া থেকে ২৫ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান। কিছুদিন আগে পর্যন্ত এই ২৫ কিলোমিটার রাস্তার প্রায় ১২ কিলোমিটার ছিল যান চলাচলের একেবারেই অনুপযোগী। ফলে যাত্রীদের ভোগান্তির অন্ত ছিল না। এ দুরবস্থা চলছিল ৭-৮ মাস ধরে। শেষদিকে এসে করোনাকালীন বন্ধের পর বিশ্ববিদ্যালয় খুলে যায়। ভোগান্তির শিকার হয় প্রায় ১৩ হাজার শিক্ষার্থী। সমাজের সচেতন শ্রেণি হিসাবে শিক্ষার্থীরা এ সংকট নিরসনের দাবিতে রাজপথে নামে। কর্মসূচি দিয়ে একদিন প্রায় তিন ঘণ্টা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখার পর কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ প্রশাসনের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেয়। তারপর মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে অচল সড়ক পুরো মাত্রায় সচল হয়ে যায়। আন্দোলনের মধ্যে যে সংস্কার মাত্র আধা মাসে সম্পন্ন করা সম্ভব হলো, তা ৭-৮ মাস করা হলো না কেন? এটা কি ওই তিন ‘হীনতা’র মধ্যে পড়ে না? নাকি আন্দোলন ছাড়া এদেশে কোনো প্রাপ্তি ঘটার সুযোগ নেই? নেই যে তার উদাহরণও আছে। কুষ্টিয়া-রাজশাহী মহাসড়কের প্রায় সবটুকু পথই যান চলাচলের উপযোগী, শুধু কুষ্টিয়াসংলগ্ন মাত্র ১২ কিলোমিটার পথ ছাড়া। কুষ্টিয়া-ভেড়ামারা সড়ক নামের এ অংশটি যান চলাচলের একেবারেই অনুপযোগী এবং এখানে প্রতিদিনই তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। মাত্র ১২ কিলোমিটারের এই সড়কপথটি পাড়ি দিতে সময় লাগে ৩ ঘণ্টা, যা স্বাভাবিক চলাচলের সময় ১৫ মিনিটের বেশি লাগত না। এই চরম দুর্ভোগ চলছে গত প্রায় ১০ মাস ধরে। যেহেতু কোনো বাদ-প্রতিবাদ নেই, তাই এর সমাধানও নেই। সড়ক বিভাগ নিজ দায়িত্বে সংস্কার করার প্রয়োজনবোধ করছে না। সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি তাদের অনুভূতিকে নাড়া দিতে অক্ষম।

জনগণের দেওয়া হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয় সড়ক খাতে। কিন্তু এ খাতে দুর্নীতি ও অব্যস্থাপনা দূর করতে না পারলে এর সুফল অধরাই থেকে যাবে। আমরা এর প্রতিকার চাই।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

সড়কে প্রাণঘাতী অব্যবস্থাপনার অবসান চাই

 মুঈদ রহমান 
১৬ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনা অতিমারি সারা বিশ্বকে থামিয়ে দিতে পারলেও থামাতে পারেনি বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনা; কমাতে পারেনি নিহত ও আহতের সংখ্যা। করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে ২০২১ সালে বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৮৫ দিন পরিবহণ চলাচল বন্ধ ছিল। তারপরও আগের বছরের তুলনায় নিহতের সংখ্যা বেড়েছে ১৭ শতাংশ, দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে ১৩ শতাংশ। এর জন্য সড়কপথের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। গত ৮ জানুয়ারি ঢাকায় নিরাপদ সড়ক নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশন তার বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, ২০২১ সালে দেশজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটে ৫ হাজার ৩৭১টি। দুর্ঘটনাগুলোয় নিহত হয়েছেন ৬ হাজার ২৮৪ জন এবং আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৪৬৮ জন। গণপরিবহণ বন্ধ থাকার ৮৫ দিন বাদ দিলে মৃত্যুর সংখ্যা গড়ে দৈনিক ২২ জনেরও বেশি। দুর্ঘটনাগুলোয় মৃত্যুর ২৫ শতাংশই ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। ১৮ শতাংশ চট্টগ্রাম বিভাগে। পরিবহণ বিশেষজ্ঞরা এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড বলে অভিহিত করছেন। ২০২১ সালের বছরজুড়ে শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে ৮০৩ জন। গেল বছর সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী নিহত হয় মে মাসে, সংখ্যা ৮৪। ফেব্রুয়ারিতে এ সংখ্যা ছিল ৮৩ আর জুনে সবচেয়ে কম ৫৩।

২০১৮ সালের ২৯ জুলাই থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে এসেছিল। সরকারের দেওয়া আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে তারা রাজপথ ছেড়ে যায়। কিন্তু গেল তিন বছরেও সরকার তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেনি বা রক্ষার চেষ্টা করেনি। বস্তুত সড়কপথের অনিয়ম নিয়ে যেটুকু বাদ-প্রতিবাদ হয়েছে, তা কেবল শিক্ষার্থীরাই করেছে। ২০২১ সালের ১৮ নভেম্বরও তারা পথে নেমেছিল। অর্ধেক বাস ভাড়ার দাবিতে করা ওই বিক্ষোভের মধ্যেই গাড়িচাপায় নিহত হয় নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান। ২০ দিনের টানা আন্দোলনের পরও এর সুফল মানুষ ভোগ করতে পারেনি।

সড়ক দুর্ঘনায় হতাহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে, আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে মানবসম্পদের। দুর্ঘটনায় মানবসম্পদের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের একটি আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া আছে। সেই প্রক্রিয়া মেনে করা মূল্যায়নে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বক্তব্য হলো, দুর্ঘটনার কারণে গেল বছর বাংলাদেশের মানবসম্পদের ক্ষতির পরিমাণ ৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি। তবে তথ্যের অভাবে যানবাহন কিংবা সম্পদের ক্ষতির হিসাব পাওয়া যায়নি।

সড়কে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা বেড়েছে। বর্তমানে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৩৫ লাখ ছাড়িয়ে গেছে, যা পাঁচ বছর আগে ৯ লাখের বেশি ছিল না। একই সঙ্গে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। গত বছরের তুলনায় দুর্ঘটনা বৃদ্ধির হার ৫০ শতাংশেরও বেশি। দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর হারও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ শতাংশের বেশি। লক্ষণীয় বিষয়, ২০২১ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ২ হাজার ২১৪ জনের মধ্যে বেশির ভাগের বয়স ছিল ১৪ থেকে ৪৫ বছর। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উঠতি বয়সি যুবকদের বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালনাই দুর্ঘটনা বৃদ্ধির কারণ।

সড়ক দুর্ঘটনার কারণ খুঁজতে গিয়ে যানবাহনের বেপরোয়া গতিকেই এক নম্বরে রাখা হয়েছে। গত বছর যত দুর্ঘটনা ঘটেছে, এর ৬২ শতাংশের জন্য দায়ী বেপরোয়া গতি। এ ধরনের গতির কারণে চালক তার গতিনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে তার পক্ষে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয় না। নেশাগ্রস্ত হয়ে যানবাহন চালানো এর একটি কারণ। আরেকটি কারণ চালকদের অদক্ষতা। কারণ ভালো সড়কে যানবাহনের গতি থাকে বেশি। সেই গতিতে গাড়ি চালাতে হলে যে দক্ষতা থাকা প্রয়োজন, তা আমাদের অনেক চালকেরই নেই। চালকদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নির্ধারণ না থাকা দুর্ঘটনার আরেকটি কারণ। যানজটের কারণে একজন চালককে নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার চেয়ে দুই-তিনগুণ বেশি সময় ধরে চালকের আসনে থাকতে হয়। এই বাড়তি শারীরিক ও মানসিক চাপ দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আমাদের মহাসড়কগুলোয় স্বল্প ও দ্রুত গতির যানবাহন একই সঙ্গে চলাচল করে। এটিও দুর্ঘটনার একটি কারণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মহাসড়কগুলোয় স্বল্প গতির যানবাহনের জন্য সার্ভিস রোড নির্মাণ করা প্রয়োজন। ফুটপাত হকারদের দখলে থাকা এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও দুর্ঘটনার কারণ। লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে বিআরটিএ-এর দুর্নীতির কারণে অদক্ষ চালক গাড়ি চালানোর অনুমোদন পাচ্ছে। এর সঙ্গে আছে ফিটনেস সার্টিফিকেটে অনিয়ম। এগুলোও সড়ক দুর্ঘটনার কারণ।

আমাদের সড়কগুলোর ধারণক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন, এদেশের সড়কগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমটি হলো জাতীয় মহাসড়ক, যা ‘এন’ দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। দ্বিতীয়টি হলো আঞ্চলিক সড়ক, যেগুলোকে আমরা ‘আর’ দিয়ে চিনতে পারি। তৃতীয়টি হলো জেলা সড়ক, যা ‘জেড’ দিয়ে চিহ্নিত করা। এই তিন ধরনের সড়কপথের মোট দৈর্ঘ্য ২১ হাজার কিলোমিটার। দেশে সড়কপথে যানবাহন চলাচলের অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। প্রাইভেট কার, বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, অটোরিকশাসহ ২০ রকম যানবাহনের নিবন্ধন দেয় বিআরটিএ। দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৪৫ লাখ। এর বাইরে কয়েক লাখ যানবাহন আছে, যাদের কোনো নিবন্ধন নেই। সব মিলে প্রায় ৫০ লাখ যানবাহন চলাচল করে থাকে এই ২১ হাজার কিলিামিটার পথে। অনেকেই মনে করেন, যানবাহনের এই সংখ্যা ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। সড়কের প্রস্থ না বাড়ালে এই চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হবে।

সড়কপথের সংস্কার নিয়ে কাজ করছে সড়ক বিভাগ। ২০২১-২২ সালের নেওয়া প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এবং সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা। যশোর-ঝিনাইদহ করিডরের সংস্কার হলো আরেকটি প্রকল্প। সব মিলে ২০২১-২২ সালে সড়ক খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৯ হাজার ৫২০ কোটি টাকা। অর্থ বরাদ্দের পরিমাণটা একেবারে অপর্যাপ্ত বলা যাবে না, বরং বলা চলে যথেষ্ট। তবে এ খাতে দুর্নীতি আর অব্যস্থাপনা আমাদের সুফল ভোগের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমন্বয়হীনতা, সিদ্ধান্তহীনতা ও উদাসীনতা।

সড়ক ব্যবস্থাপনায় এই তিন ‘হীনতা’র উপস্থিতি চোখের দেখা উদাহরণ থেকেই বলতে পারি। বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়কের পাশে। কুষ্টিয়া থেকে ২৫ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান। কিছুদিন আগে পর্যন্ত এই ২৫ কিলোমিটার রাস্তার প্রায় ১২ কিলোমিটার ছিল যান চলাচলের একেবারেই অনুপযোগী। ফলে যাত্রীদের ভোগান্তির অন্ত ছিল না। এ দুরবস্থা চলছিল ৭-৮ মাস ধরে। শেষদিকে এসে করোনাকালীন বন্ধের পর বিশ্ববিদ্যালয় খুলে যায়। ভোগান্তির শিকার হয় প্রায় ১৩ হাজার শিক্ষার্থী। সমাজের সচেতন শ্রেণি হিসাবে শিক্ষার্থীরা এ সংকট নিরসনের দাবিতে রাজপথে নামে। কর্মসূচি দিয়ে একদিন প্রায় তিন ঘণ্টা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখার পর কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ প্রশাসনের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেয়। তারপর মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে অচল সড়ক পুরো মাত্রায় সচল হয়ে যায়। আন্দোলনের মধ্যে যে সংস্কার মাত্র আধা মাসে সম্পন্ন করা সম্ভব হলো, তা ৭-৮ মাস করা হলো না কেন? এটা কি ওই তিন ‘হীনতা’র মধ্যে পড়ে না? নাকি আন্দোলন ছাড়া এদেশে কোনো প্রাপ্তি ঘটার সুযোগ নেই? নেই যে তার উদাহরণও আছে। কুষ্টিয়া-রাজশাহী মহাসড়কের প্রায় সবটুকু পথই যান চলাচলের উপযোগী, শুধু কুষ্টিয়াসংলগ্ন মাত্র ১২ কিলোমিটার পথ ছাড়া। কুষ্টিয়া-ভেড়ামারা সড়ক নামের এ অংশটি যান চলাচলের একেবারেই অনুপযোগী এবং এখানে প্রতিদিনই তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। মাত্র ১২ কিলোমিটারের এই সড়কপথটি পাড়ি দিতে সময় লাগে ৩ ঘণ্টা, যা স্বাভাবিক চলাচলের সময় ১৫ মিনিটের বেশি লাগত না। এই চরম দুর্ভোগ চলছে গত প্রায় ১০ মাস ধরে। যেহেতু কোনো বাদ-প্রতিবাদ নেই, তাই এর সমাধানও নেই। সড়ক বিভাগ নিজ দায়িত্বে সংস্কার করার প্রয়োজনবোধ করছে না। সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি তাদের অনুভূতিকে নাড়া দিতে অক্ষম।

জনগণের দেওয়া হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয় সড়ক খাতে। কিন্তু এ খাতে দুর্নীতি ও অব্যস্থাপনা দূর করতে না পারলে এর সুফল অধরাই থেকে যাবে। আমরা এর প্রতিকার চাই।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন