ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন কী
jugantor
ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন কী

  রেজাউল করিম খান  

১৬ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের প্রাজ্ঞজনরা প্রায়ই বলেন, ‘আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিই না।’ কথাটি সর্বাংশে সত্য নয় বলে আমি মনে করি। অতীতের অনেক ঘটনাকে আমরা পরবর্তীকালে মঞ্চস্থ হতে দেখেছি। ইতিহাসের অন্যতম প্রধান নির্মাতা রাজনীতি। তো সেই রাজনীতিতে কিছু বিষয়ের পুনরাবৃত্তি লক্ষণীয়। এ উপমহাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতাকেন্দ্রিক ধারাবাহিকতা এর প্রমাণ। ‘আমার পিতা ছিলেন, তাই আছি এবং থাকব’-এমন সত্য আমরা ইতিহাস থেকেই জানতে পারি। এক্ষেত্রে পতনের বিষয়টি সাধারণত বিবেচনায় নেওয়া হয় না। যূথবদ্ধ সমাজের পর সম্পদ অর্জন ও রক্ষার জন্য ব্যক্তির শক্তি প্রদর্শনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তারও পর রাজসিংহাসনে আরোহণের জন্য শক্তি, কৌশল, ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস সবাই জানেন। আর এগুলো বারবার হতে দেখা যায়। সুতরাং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। এছাড়া ইতিহাসের মন্দ দিকগুলো থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। সেই কারণেই ইতিহাসপাঠ প্রয়োজন।

প্রতিদিনই সমাজ, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির পরিবর্তন হচ্ছে। আজ আমরা যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক আবহাওয়ায় আছি, তা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ। পরিবর্তন সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকলে বর্তমান দূরবর্তী সীমায় পৌঁছানোর আশঙ্কা থাকে। সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিনিয়তই আমাদের ওপর নতুন নতুন নিয়মকানুন, আইন এমনকি জীবনযাপনের কৌশল চাপিয়ে দিচ্ছে। মানুষ তার ধর্ম, ভাষা, জাতীয়তাবোধ প্রভৃতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়। এগুলোর যে কোনো একটি বা একাধিকের সমষ্টিতে যে কোনো সময় বয়ে নিয়ে আসতে পারে মুক্তি অথবা চরম বিপর্যয়। হাজার বছরের ইতিহাসগাথায় সেই গল্পই লেখা হয়েছে। এটি অনুপ্রেরণা বা সাবধানতা দুভাবেই কাজ করতে পারে।

আমাদের প্রতিদিনের গল্পই আগামীকালের ইতিহাস। ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে হয় আমরা অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করছি অথবা অন্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছি। এ এক নিরন্তর অস্তিত্বের যুদ্ধ। এ যুদ্ধে যার ইতিহাসজ্ঞান যত, তার টিকে থাকার সম্ভাবনাও তত। ইতিহাসপাঠে কেউ কেউ একটু রোমাঞ্চ অনুভব করেন। খানিকটা পূর্বজন্মের ব্যাপার! ইতিহাস শুধু যে শেখায় তা নয়, অনুপ্রাণিত করে নিজেকে জানার; নিজেকে বোঝার একটি মাপকাঠি খুঁজে পাওয়া যায়। শুধু তথ্য নয়-দিন, তারিখ, সাল, মাস, রাজা, রানি, সাম্রাজ্য, জয়, পরাজয়, যুদ্ধ বা শান্তির সীমা অতিক্রম করেও ইতিহাস আপনাকে দিতে পারে আবিষ্কারের আনন্দ অথবা পাশবিকতার গ্লানি অনুভব করার সৎসাহস।

ইতিহাস হচ্ছে অতীত ঘটনা ও কার‌্যাবলির বিবরণ। অনেকেই ইতিহাসকে মানবিক এবং সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে একটি সেতুবন্ধ হিসাবে দেখেন। কারণ ইতিহাসে এ উভয়বিধ শাস্ত্র থেকেই পদ্ধতিগত সাহায্য ও বিভিন্ন উপাদান নেওয়া হয়। একটি শাস্ত্র হিসাবে ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অনেক উপবিভাগের নাম চলে আসে-দিনপঞ্জি, ইতিহাস-লিখন, কুলজি শাস্ত্র, পালিওগ্রাফি এবং ক্লায়ামেট্রিক্স। স্বাভাবিক প্রথা অনুসারে ইতিহাসবেত্তারা ইতিহাসের লিখিত উপাদানের মাধ্যমে বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেন; যদিও কেবল লিখিত উপাদান হতে ইতিহাসে সব তত্ত্ব উদ্ধার করা সম্ভব নয়। ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে যে উৎসগুলো বিবেচনা করা হয়, সেগুলোকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়-লিখিত, মৌখিক এবং শারীরিক বা প্রত্যক্ষকরণ। ইতিহাসবেত্তারা সাধারণত তিনটি উৎসই পরখ করে দেখেন। তবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস হিসাবে লিখিত উপাদান সর্বজন স্বীকৃত। এ উৎসটির সঙ্গে লিখন পদ্ধতির ইতিহাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

ইতিহাস হচ্ছে বিজয়ীর হাতে লেখা বিজিতের নামে একরাশ কুৎসা-কথাটি বলেছেন স্যার হুমায়ুন আজাদ। তবে ইতিহাস শুধু যে বিজয়ের বন্ধনা করে যায়, তা নয়; সেই বিজয়ের পেছনের গল্প এক এক করে বলে যায়, সঙ্গে বলে যায় অনেক ব্যর্থতা আর সফলতার গুণকীর্তন। আমাদের সেসব জানা দরকার। কারণ সফলতার আর ব্যর্থতার গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অনেক জীবন, যা আমাদের অনেক কিছু শেখায়। যে শিক্ষা আমাদের স্বশিক্ষার পথকে অনেকটাই সহজ করে তোলে। তবে হ্যাঁ, ইতিহাসের স্রোতধারায় বালুকারাশির মধ্যে স্বর্ণরেণুর মতো রাজনীতি বিজ্ঞান জমা হয়ে আছে।

বাংলাদেশের বাঙালিদের ইতিহাস আছে। আছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, একাত্তরের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস। হোক তা অসম্পূর্ণ। বিতর্ক থাকতেই পারে সেই ইতিহাস নিয়ে। এখন প্রয়োজন দেশের সব মানুষের সে ইতিহাস জানা। আমাদের ইতিহাস জ্ঞানের যে অভাব, তার এন্তার প্রমাণ রয়েছে। দেশের মানুষের বড় দুটি ঘটনা ভাষা আন্দোলন কিংবা স্বাধীনতাযুদ্ধের বিষয়ে ধারণা অস্পষ্ট। আমি সমাজের শীর্ষ পর্যায়ের লোকদের কাউকে কাউকে ’৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধের বছরকে ‘গণ্ডগোলের বছর’ সম্বোধন করতে শুনেছি। এ ধরনের অজ্ঞতা শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শিক্ষিত-নিরক্ষরভেদে দেশের বহু মানুষের মধ্যে রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এ গাঙ্গেয় ভূখণ্ডের মানুষ স্বাধীনতাযুদ্ধ করেছিল। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য একটাই-দীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠা আমাদের যে গৌরবময় অতীত আছে, ঐতিহ্য আছে, অর্থনৈতিক পরিকাঠামো আছে, নিজস্ব যে জীবনাচরণ সংস্কৃতি আছে, তা বাঁচানো ও সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণ করা। আমাদের ভাষা-সাহিত্য-সংগীত-নাটক হবে আমাদের জল-হাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার যুগে সবকিছু যেন হারিয়ে না যায়, বরং তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে; বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম তো সেজন্যই।

৫০ বছর হয়েছে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি; কিন্তু ইপ্সিত লক্ষ্যে বাংলাদেশ পৌঁছতে পারেনি। অধিকন্তু ক্রমান্বয়ে দেশটি একটি অবাসযোগ্য রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। প্রতিনিয়ত আমরা দেখছি, দেশের মানুষের মানবিক মূল্যবোধ ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে, মুখ থুবড়ে পড়ছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনৈতিক অবস্থাসহ রাষ্ট্রীয় সব কর্মকাণ্ড। দেশের এ অবস্থা কি চলতেই থাকবে? সবকিছুরই তো শেষ আছে। দেশের প্রতি দেশবাসীর ভালোবাসা তৈরির তাগিদ দিয়েছেন দেশের অভিজ্ঞজনরা। তারা বলছেন, দেশের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করতে হলে দেশকে ভালো করে জানতে হবে।

যে কোনো বিষয়েরই ইতিহাস না জানলে সেটি নিয়ে কোনোরকম ধারণা বা মতামত তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। আর ইতিহাস যত ভালো জানা যায়, মতামতের সূক্ষ্মতাও ততই বৃদ্ধি পায়। এ হিসাবে বিচার করলে ইতিহাসের গুরুত্ব অপরিসীম। ইতিহাস এককথায় বলতে গেলে আমাদের ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক। ইতিহাস কী শিক্ষা দেবে, তা নির্ভর করে আমরা কীভাবে ইতিহাস অধ্যয়ন করছি তার ওপর। শুধুই রাজাদের পারস্পরিক কলহের গল্প আর দিন-তারিখ মুখস্থ করে যেরকম প্রচলিত পদ্ধতিতে ইতিহাসের পাঠ দেওয়া হয়, সেটি থেকে আসলে খুব একটা শিক্ষণীয় কিছু পাওয়া যায় না। এ ধরনের সংকীর্ণ ইতিহাসপাঠ আসলে ক্ষমতার কেন্দ্র বা কেন্দ্রের আশপাশে ঘোরাঘুরি করতে থাকে।

ইতিহাসের পাঠ আমাদের জানায়-বর্তমানের বাস্তবতা হলো অতীতের অনেক ক্রমিক ও সমান্তরাল ঘটনার ফলাফল। এ ঘটনাগুলোর কোনোটির একটু হেরফের হলেই আজকের ব্যক্তিগত, সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বাস্তবতাগুলো ভিন্ন হতে পারত। নিজের পরিচয়গুলো নিয়ে অর্থহীন অহংকার বা লজ্জা এবং অন্যের পরিচয়গুলো নিয়ে ঈর্ষা বা অবজ্ঞা-এ দুই থেকেই মুক্তি মেলে, যদি কোত্থেকে, কীভাবে, কোন্ পথে এখানে এলাম আর বিকল্প সম্ভাবনাগুলো কী ছিল, এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকে। আর সে ধারণা দিতে পারে ইতিহাসপাঠ।

ইতিহাস পড়ে আরও বোঝা যায়, আজকের বাস্তবতাও ক্ষণস্থায়ী একটি বিষয় এবং ভবিষ্যৎ আদতে অননুমেয়। যেমন-একসময় মার্কিন দেশে কালোরা ও নারীরা ভোট দিতে পারত না। মজার ব্যাপার, সে সময় ওই নিয়মটাই ওদেশের লোকের কাছে সূর্য পূর্বদিকে ওঠার মতো স্বাভাবিক ঠেকত। ইতিহাস প্রশ্ন করতে বাধ্য করে, আজ আমাদের কাছে কী কী বিষয় এমন স্বাভাবিক লাগে, যেগুলো ৫০ বছর পরে লোকজন শুনে অবিশ্বাসে মাথা নাড়বে!

কার্ল মার্কস তার ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ নামক গ্রন্থে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, ইতিহাস কেবল কতকগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনার সংকলন বা কাহিনির বিন্যাস নয়। ইতিহাসের কোনো ঘটনা অন্য ঘটনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। ইতিহাসের আলোচ্য বিষয় সমগ্র জনসাধারণ; কোনো একক ব্যক্তি, বিশেষ রাজা, সম্রাট বা শাসক নয়।

রেজাউল করিম খান : সাংবাদিক

rezaul.bd1956@gmail.com

ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন কী

 রেজাউল করিম খান 
১৬ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের প্রাজ্ঞজনরা প্রায়ই বলেন, ‘আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিই না।’ কথাটি সর্বাংশে সত্য নয় বলে আমি মনে করি। অতীতের অনেক ঘটনাকে আমরা পরবর্তীকালে মঞ্চস্থ হতে দেখেছি। ইতিহাসের অন্যতম প্রধান নির্মাতা রাজনীতি। তো সেই রাজনীতিতে কিছু বিষয়ের পুনরাবৃত্তি লক্ষণীয়। এ উপমহাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতাকেন্দ্রিক ধারাবাহিকতা এর প্রমাণ। ‘আমার পিতা ছিলেন, তাই আছি এবং থাকব’-এমন সত্য আমরা ইতিহাস থেকেই জানতে পারি। এক্ষেত্রে পতনের বিষয়টি সাধারণত বিবেচনায় নেওয়া হয় না। যূথবদ্ধ সমাজের পর সম্পদ অর্জন ও রক্ষার জন্য ব্যক্তির শক্তি প্রদর্শনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তারও পর রাজসিংহাসনে আরোহণের জন্য শক্তি, কৌশল, ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস সবাই জানেন। আর এগুলো বারবার হতে দেখা যায়। সুতরাং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। এছাড়া ইতিহাসের মন্দ দিকগুলো থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। সেই কারণেই ইতিহাসপাঠ প্রয়োজন।

প্রতিদিনই সমাজ, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির পরিবর্তন হচ্ছে। আজ আমরা যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক আবহাওয়ায় আছি, তা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ। পরিবর্তন সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকলে বর্তমান দূরবর্তী সীমায় পৌঁছানোর আশঙ্কা থাকে। সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিনিয়তই আমাদের ওপর নতুন নতুন নিয়মকানুন, আইন এমনকি জীবনযাপনের কৌশল চাপিয়ে দিচ্ছে। মানুষ তার ধর্ম, ভাষা, জাতীয়তাবোধ প্রভৃতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়। এগুলোর যে কোনো একটি বা একাধিকের সমষ্টিতে যে কোনো সময় বয়ে নিয়ে আসতে পারে মুক্তি অথবা চরম বিপর্যয়। হাজার বছরের ইতিহাসগাথায় সেই গল্পই লেখা হয়েছে। এটি অনুপ্রেরণা বা সাবধানতা দুভাবেই কাজ করতে পারে।

আমাদের প্রতিদিনের গল্পই আগামীকালের ইতিহাস। ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে হয় আমরা অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করছি অথবা অন্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছি। এ এক নিরন্তর অস্তিত্বের যুদ্ধ। এ যুদ্ধে যার ইতিহাসজ্ঞান যত, তার টিকে থাকার সম্ভাবনাও তত। ইতিহাসপাঠে কেউ কেউ একটু রোমাঞ্চ অনুভব করেন। খানিকটা পূর্বজন্মের ব্যাপার! ইতিহাস শুধু যে শেখায় তা নয়, অনুপ্রাণিত করে নিজেকে জানার; নিজেকে বোঝার একটি মাপকাঠি খুঁজে পাওয়া যায়। শুধু তথ্য নয়-দিন, তারিখ, সাল, মাস, রাজা, রানি, সাম্রাজ্য, জয়, পরাজয়, যুদ্ধ বা শান্তির সীমা অতিক্রম করেও ইতিহাস আপনাকে দিতে পারে আবিষ্কারের আনন্দ অথবা পাশবিকতার গ্লানি অনুভব করার সৎসাহস।

ইতিহাস হচ্ছে অতীত ঘটনা ও কার‌্যাবলির বিবরণ। অনেকেই ইতিহাসকে মানবিক এবং সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে একটি সেতুবন্ধ হিসাবে দেখেন। কারণ ইতিহাসে এ উভয়বিধ শাস্ত্র থেকেই পদ্ধতিগত সাহায্য ও বিভিন্ন উপাদান নেওয়া হয়। একটি শাস্ত্র হিসাবে ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অনেক উপবিভাগের নাম চলে আসে-দিনপঞ্জি, ইতিহাস-লিখন, কুলজি শাস্ত্র, পালিওগ্রাফি এবং ক্লায়ামেট্রিক্স। স্বাভাবিক প্রথা অনুসারে ইতিহাসবেত্তারা ইতিহাসের লিখিত উপাদানের মাধ্যমে বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেন; যদিও কেবল লিখিত উপাদান হতে ইতিহাসে সব তত্ত্ব উদ্ধার করা সম্ভব নয়। ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে যে উৎসগুলো বিবেচনা করা হয়, সেগুলোকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়-লিখিত, মৌখিক এবং শারীরিক বা প্রত্যক্ষকরণ। ইতিহাসবেত্তারা সাধারণত তিনটি উৎসই পরখ করে দেখেন। তবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস হিসাবে লিখিত উপাদান সর্বজন স্বীকৃত। এ উৎসটির সঙ্গে লিখন পদ্ধতির ইতিহাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

ইতিহাস হচ্ছে বিজয়ীর হাতে লেখা বিজিতের নামে একরাশ কুৎসা-কথাটি বলেছেন স্যার হুমায়ুন আজাদ। তবে ইতিহাস শুধু যে বিজয়ের বন্ধনা করে যায়, তা নয়; সেই বিজয়ের পেছনের গল্প এক এক করে বলে যায়, সঙ্গে বলে যায় অনেক ব্যর্থতা আর সফলতার গুণকীর্তন। আমাদের সেসব জানা দরকার। কারণ সফলতার আর ব্যর্থতার গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অনেক জীবন, যা আমাদের অনেক কিছু শেখায়। যে শিক্ষা আমাদের স্বশিক্ষার পথকে অনেকটাই সহজ করে তোলে। তবে হ্যাঁ, ইতিহাসের স্রোতধারায় বালুকারাশির মধ্যে স্বর্ণরেণুর মতো রাজনীতি বিজ্ঞান জমা হয়ে আছে।

বাংলাদেশের বাঙালিদের ইতিহাস আছে। আছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, একাত্তরের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস। হোক তা অসম্পূর্ণ। বিতর্ক থাকতেই পারে সেই ইতিহাস নিয়ে। এখন প্রয়োজন দেশের সব মানুষের সে ইতিহাস জানা। আমাদের ইতিহাস জ্ঞানের যে অভাব, তার এন্তার প্রমাণ রয়েছে। দেশের মানুষের বড় দুটি ঘটনা ভাষা আন্দোলন কিংবা স্বাধীনতাযুদ্ধের বিষয়ে ধারণা অস্পষ্ট। আমি সমাজের শীর্ষ পর্যায়ের লোকদের কাউকে কাউকে ’৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধের বছরকে ‘গণ্ডগোলের বছর’ সম্বোধন করতে শুনেছি। এ ধরনের অজ্ঞতা শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শিক্ষিত-নিরক্ষরভেদে দেশের বহু মানুষের মধ্যে রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এ গাঙ্গেয় ভূখণ্ডের মানুষ স্বাধীনতাযুদ্ধ করেছিল। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য একটাই-দীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠা আমাদের যে গৌরবময় অতীত আছে, ঐতিহ্য আছে, অর্থনৈতিক পরিকাঠামো আছে, নিজস্ব যে জীবনাচরণ সংস্কৃতি আছে, তা বাঁচানো ও সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণ করা। আমাদের ভাষা-সাহিত্য-সংগীত-নাটক হবে আমাদের জল-হাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার যুগে সবকিছু যেন হারিয়ে না যায়, বরং তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে; বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম তো সেজন্যই।

৫০ বছর হয়েছে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি; কিন্তু ইপ্সিত লক্ষ্যে বাংলাদেশ পৌঁছতে পারেনি। অধিকন্তু ক্রমান্বয়ে দেশটি একটি অবাসযোগ্য রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। প্রতিনিয়ত আমরা দেখছি, দেশের মানুষের মানবিক মূল্যবোধ ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে, মুখ থুবড়ে পড়ছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনৈতিক অবস্থাসহ রাষ্ট্রীয় সব কর্মকাণ্ড। দেশের এ অবস্থা কি চলতেই থাকবে? সবকিছুরই তো শেষ আছে। দেশের প্রতি দেশবাসীর ভালোবাসা তৈরির তাগিদ দিয়েছেন দেশের অভিজ্ঞজনরা। তারা বলছেন, দেশের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করতে হলে দেশকে ভালো করে জানতে হবে।

যে কোনো বিষয়েরই ইতিহাস না জানলে সেটি নিয়ে কোনোরকম ধারণা বা মতামত তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। আর ইতিহাস যত ভালো জানা যায়, মতামতের সূক্ষ্মতাও ততই বৃদ্ধি পায়। এ হিসাবে বিচার করলে ইতিহাসের গুরুত্ব অপরিসীম। ইতিহাস এককথায় বলতে গেলে আমাদের ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক। ইতিহাস কী শিক্ষা দেবে, তা নির্ভর করে আমরা কীভাবে ইতিহাস অধ্যয়ন করছি তার ওপর। শুধুই রাজাদের পারস্পরিক কলহের গল্প আর দিন-তারিখ মুখস্থ করে যেরকম প্রচলিত পদ্ধতিতে ইতিহাসের পাঠ দেওয়া হয়, সেটি থেকে আসলে খুব একটা শিক্ষণীয় কিছু পাওয়া যায় না। এ ধরনের সংকীর্ণ ইতিহাসপাঠ আসলে ক্ষমতার কেন্দ্র বা কেন্দ্রের আশপাশে ঘোরাঘুরি করতে থাকে।

ইতিহাসের পাঠ আমাদের জানায়-বর্তমানের বাস্তবতা হলো অতীতের অনেক ক্রমিক ও সমান্তরাল ঘটনার ফলাফল। এ ঘটনাগুলোর কোনোটির একটু হেরফের হলেই আজকের ব্যক্তিগত, সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বাস্তবতাগুলো ভিন্ন হতে পারত। নিজের পরিচয়গুলো নিয়ে অর্থহীন অহংকার বা লজ্জা এবং অন্যের পরিচয়গুলো নিয়ে ঈর্ষা বা অবজ্ঞা-এ দুই থেকেই মুক্তি মেলে, যদি কোত্থেকে, কীভাবে, কোন্ পথে এখানে এলাম আর বিকল্প সম্ভাবনাগুলো কী ছিল, এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকে। আর সে ধারণা দিতে পারে ইতিহাসপাঠ।

ইতিহাস পড়ে আরও বোঝা যায়, আজকের বাস্তবতাও ক্ষণস্থায়ী একটি বিষয় এবং ভবিষ্যৎ আদতে অননুমেয়। যেমন-একসময় মার্কিন দেশে কালোরা ও নারীরা ভোট দিতে পারত না। মজার ব্যাপার, সে সময় ওই নিয়মটাই ওদেশের লোকের কাছে সূর্য পূর্বদিকে ওঠার মতো স্বাভাবিক ঠেকত। ইতিহাস প্রশ্ন করতে বাধ্য করে, আজ আমাদের কাছে কী কী বিষয় এমন স্বাভাবিক লাগে, যেগুলো ৫০ বছর পরে লোকজন শুনে অবিশ্বাসে মাথা নাড়বে!

কার্ল মার্কস তার ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ নামক গ্রন্থে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, ইতিহাস কেবল কতকগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনার সংকলন বা কাহিনির বিন্যাস নয়। ইতিহাসের কোনো ঘটনা অন্য ঘটনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। ইতিহাসের আলোচ্য বিষয় সমগ্র জনসাধারণ; কোনো একক ব্যক্তি, বিশেষ রাজা, সম্রাট বা শাসক নয়।

রেজাউল করিম খান : সাংবাদিক

rezaul.bd1956@gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন