সরকারি কর্মচারীদের জন্য অনৈতিক সুবিধা কেন?
jugantor
সরকারি কর্মচারীদের জন্য অনৈতিক সুবিধা কেন?

  মো. ফিরোজ মিয়া  

১৯ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ধর্ষণ, খুন, ডাকাতি, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, মাদক ব্যবসাসহ নৈতিক ঙ্খলনজনিত অপরাধে আদালত কর্র্র্র্তৃক মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত সরকারি কর্মচারীরা পেনশন পাচ্ছেন। এছাড়া দুর্নীতিসহ নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে আদালত কর্তৃক এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বা শতকোটি টাকা জরিমানা দণ্ডে দণ্ডিত সরকারি কর্মচারীরা চাকরিতে বহাল থাকবেন এবং দণ্ড ভোগ শেষে স্বপদে আসীন হবেন।

এটা কোনো কল্পকাহিনি নয় বা কোনো অলীক গল্পও নয়। এটাই বর্তমানে বাংলাদেশের আইনি বাস্তবতা। ২০১৮ সালে জারিকৃত সরকারি চাকরি আইন ও সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা-আপিল বিধিমালার বিধানবলে দণ্ডিত সরকারি কর্মচারীরা এসব অনৈতিক সুবিধা প্রাপ্তির অধিকারী হবেন। ইতোমধ্যে এসব অনৈতিক সুবিধার চাপেও পড়েছে দু-একটি প্রতিষ্ঠান।

খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, অনেকেরই হয়তো মনে আছে আশি কেজি গাজাসহ এক সরকারি কর্মচারীর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার কথা। যতটুকু জানা গেছে, এ কর্মচারীকে সংশ্লিষ্ট দপ্তর নিয়মমাফিক সাময়িক বরখাস্ত করে। আদালতে বর্তমানে মামলাটি চলমান এবং এ কর্মচারী জামিনে মুক্ত আছেন। কিন্তু বিপত্তি দেখা দিয়েছে কর্মচারী অবসর গ্রহণের বয়সে উপনীত হওয়ার কারণে। মাদক আইনের অধীন মামলাটির সঙ্গে সরকারি অর্থের কোনো সংশ্লেষ না থাকায় সরকারি চাকরি আইনের ৫১ ধারার বিধানমতে অবসর আদেশ জারিসহ তাকে অবসর সুবিধা প্রদান করতে হচ্ছে।

এছাড়া কর্মচারীও পেনশন সুবিধা প্রদানের জন্য দপ্তরের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। ওই দপ্তর উপায়ান্তর না দেখে মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ চায়, মন্ত্রণালয় সরকারি চাকরি আইনের ওই ধারার বিধান উল্লেখ করে অবসর সুবিধা প্রদানের পক্ষে মত দেয়। এমতাবস্থায় দপ্তর বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে আইনের এ অনৈতিক বিধানটি ব্যাখ্যা করি এবং এও জানাই যে, এখন আইনের এই ধারার দোহাই দিয়ে পেনশন সুবিধাদি মঞ্জুর করা হলে পরবর্তী পর্যায়ে যদি ওই কর্মচারী এক বছরের অধিক কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং সে পরিপ্রেক্ষিতে ৪২ ধারার বিধানমতে চাকরি থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত হিসাবে গণ্য হন, তাহলে পেনশন সুবিধাদি বাবদ কর্মচারীকে দেওয়া জনগণের কষ্টার্জিত লাখ লাখ টাকার কী হবে?

এই কর্মচারীর মতো অন্য কোনো সরকারি কর্মচারী ধর্ষণ, খুন, ডাকাতি ইত্যাদি অপরাধের মতো গুরুতর নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে মামলা চলাকালীন অবস্থায় কারাগারে থেকে বা জামিনে থেকে স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন জানালে বা অবসর গ্রহণের বয়সে উপনীত হয়ে অবসর সুবিধাদির আবেদন জানালে আইনের বিধানবলে ওই সরকারি কর্মচারী অবসর সুবিধা পাবেন, পরবর্তী পর্যায়ে তার মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড যাই হোক না কেন।

সরকারি চাকরি আইন কার্যকর হওয়ার পূর্ববর্তী বিধানমতে কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় মামলা বা ফৌজদারি মামলা চলমান থাকা অবস্থায় স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন করলে বা অবসর গ্রহণের বয়সে উপনীত হলেও অবসর সুবিধা পেতেন না। মামলার ফলাফলের ভিত্তিতে অবসর সুবিধাদির বিষয়টি নিষ্পত্তি হতো। অর্থাৎ বিভাগীয় মামলায় চাকরি থেকে অপসারণ বা চাকরি থেকে বরখাস্ত দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার ক্ষেত্রে কোনোরূপ অবসর সুবিধাদি পেতেন না। এছাড়া নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে ফৌজদারি মামলায় যে কোনো মাত্রার দণ্ডে দণ্ডিত হলেও অবসর সুবিধাদি পেতেন না।

ওই ভালো বিধান পরিবর্তন করে কেন এরূপ অনৈতিক সুবিধা প্রদানের বিধান করা হলো তার ব্যাখ্যা হয়তো আইন প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই দিতে পারবেন।

সরকারি চাকরি আইনের আরেকটি খারাপ নজিরের বিষয় নজরে এসেছে। কিছুদিন আগে এক ব্যক্তি ফোনে জানতে চান, তার এক আত্মীয় সরকারি কর্মচারী, দুদকের মামলায় তার দুই বছরের জেল হয় এবং পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা দণ্ড হয়, ফলে সে চাকরিচ্যুত হয়। পরবর্তী পর্যায়ে সে উচ্চতর আদালতে আপিল করলে উচ্চতর আদালত ওই সাজা পরিবর্তন করে কারাদণ্ডের মেয়াদ কমিয়ে ছয় মাস করেন এবং জরিমানার পরিমাণ বাড়িয়ে ৪০ লাখ টাকা করেন। ইতোমধ্যে ওই কর্মচারীর ছয় মাস জেল খাটা শেষ হয়েছে, জরিমানার ৪০ লাখ টাকাও পরিশোধ করা হয়েছে।

সরকারি চাকরি আইনের ৪২ ধারার বিধানমতে কারাদণ্ডের মেয়াদ এক বছরের কম হওয়ায় তার ওপর গুরুদণ্ড আরোপের কোনো সুযোগ না থাকায় সে তো এখনো চাকরিতে বহাল আছেন। এ ব্যাপারে আমার মন্তব্য জানতে চান। নিজে একজন সাবেক সরকারি কর্মচারী হওয়ায় নিজেকে ছোট মনে হলো এবং আমি এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে পারিনি। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের নীতির যদি এ পরিণতি হয়, তাহলে কী জবাব দেব? আইন প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা হয়তো এর জবাব দিতে পারবেন।

২০১৮ সালের আগে এরূপ ক্ষেত্রে চাকরিতে বহাল থাকার তো কোনো সুযোগ ছিল না। কেন আগের আইন বাতিল করে এরূপ অনৈতিক সুবিধার বিধান করা হলো, তা বুঝতে সত্যি কষ্ট হয়। সরকারের শুদ্ধাচার চর্চা, শুদ্ধাচারের জন্য পুরস্কার প্রদান এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স-এসবের সঙ্গে এরূপ অনৈতিক বিধান কি চলতে পারে?

এখানেই শেষ নয়, ২০১৮ সালের আগে কোনো সরকারি কর্মচারী দুর্নীতিপরায়ণ হিসাবে গণ্য হলে অর্থাৎ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করলে, প্রকাশ্য আয়ের সঙ্গে সংগতিবিহীন জীবনযাপন করলে বা দুর্নীতিপরায়ণ হিসাবে তার দুর্নাম থাকলে তাকে চাকরিতে বহাল রাখার সুযোগ ছিল না। ন্যূনতম শাস্তি ছিল চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর। অথচ ২০১৮ সালের শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিতে দুর্নীতিপরায়ণতার অপরাধের জন্য চাকরিতে বহাল রাখার সুযোগ তো রাখা হয়েছেই, উপরন্তু ন্যূনতম শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে তিরস্কার। এছাড়া দুর্নীতির পুনরাবৃত্তিরও সুযোগ রাখা হয়েছে।

কার স্বার্থে এরূপ বিধান? এতে তো সরকারি কর্মচারী এবং সরকার উভয়ের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হচ্ছে। দুর্নীতিপরায়ণ সরকারি কর্মচারীদের লালনপালনের দায়িত্ব নিশ্চয় সরকারের নয়। এতে করে দুর্নীতি প্রতিরোধের পরিবর্তে দুর্নীতি উৎসাহিত হবে।

আলোচ্য আইন ও বিধিটি নিয়ে যথেষ্ট সমালোচনা হয়েছে। তা সত্ত্বেও এটি সংশোধনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সরকারি চাকরি আইন সংশোধনের প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদে উঠেছিল। সংবাদমাধ্যমে যতদূর জানা যায়-ওই প্রস্তাবে এ লেখায় যেসব বিধানের উল্লেখ করা হয়েছে, তা সংশোধনের প্রস্তাব ছিল না। আশা করি, নীতিনির্ধারক মহল বিষয়গুলো ভেবে দেখবে।

আইন ও বিধি প্রণয়নের সময় অসতর্কতার কারণে কিছু অনিচ্ছাকৃত ভুল বা অসংগতি থাকতে পারে। কিন্তু যখন ওই ভুল ও অসংগতি নিয়ে প্রচুর সমালোচনা সত্ত্বেও তা সংশোধনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না, তখন জনমনে কী বার্তা পৌঁছায়?

মো. ফিরোজ মিয়া : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব, চাকরি ও আইন সংক্রান্ত গ্রন্থের লেখক

সরকারি কর্মচারীদের জন্য অনৈতিক সুবিধা কেন?

 মো. ফিরোজ মিয়া 
১৯ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ধর্ষণ, খুন, ডাকাতি, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, মাদক ব্যবসাসহ নৈতিক ঙ্খলনজনিত অপরাধে আদালত কর্র্র্র্তৃক মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত সরকারি কর্মচারীরা পেনশন পাচ্ছেন। এছাড়া দুর্নীতিসহ নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে আদালত কর্তৃক এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বা শতকোটি টাকা জরিমানা দণ্ডে দণ্ডিত সরকারি কর্মচারীরা চাকরিতে বহাল থাকবেন এবং দণ্ড ভোগ শেষে স্বপদে আসীন হবেন।

এটা কোনো কল্পকাহিনি নয় বা কোনো অলীক গল্পও নয়। এটাই বর্তমানে বাংলাদেশের আইনি বাস্তবতা। ২০১৮ সালে জারিকৃত সরকারি চাকরি আইন ও সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা-আপিল বিধিমালার বিধানবলে দণ্ডিত সরকারি কর্মচারীরা এসব অনৈতিক সুবিধা প্রাপ্তির অধিকারী হবেন। ইতোমধ্যে এসব অনৈতিক সুবিধার চাপেও পড়েছে দু-একটি প্রতিষ্ঠান।

খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, অনেকেরই হয়তো মনে আছে আশি কেজি গাজাসহ এক সরকারি কর্মচারীর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার কথা। যতটুকু জানা গেছে, এ কর্মচারীকে সংশ্লিষ্ট দপ্তর নিয়মমাফিক সাময়িক বরখাস্ত করে। আদালতে বর্তমানে মামলাটি চলমান এবং এ কর্মচারী জামিনে মুক্ত আছেন। কিন্তু বিপত্তি দেখা দিয়েছে কর্মচারী অবসর গ্রহণের বয়সে উপনীত হওয়ার কারণে। মাদক আইনের অধীন মামলাটির সঙ্গে সরকারি অর্থের কোনো সংশ্লেষ না থাকায় সরকারি চাকরি আইনের ৫১ ধারার বিধানমতে অবসর আদেশ জারিসহ তাকে অবসর সুবিধা প্রদান করতে হচ্ছে।

এছাড়া কর্মচারীও পেনশন সুবিধা প্রদানের জন্য দপ্তরের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। ওই দপ্তর উপায়ান্তর না দেখে মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ চায়, মন্ত্রণালয় সরকারি চাকরি আইনের ওই ধারার বিধান উল্লেখ করে অবসর সুবিধা প্রদানের পক্ষে মত দেয়। এমতাবস্থায় দপ্তর বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে আইনের এ অনৈতিক বিধানটি ব্যাখ্যা করি এবং এও জানাই যে, এখন আইনের এই ধারার দোহাই দিয়ে পেনশন সুবিধাদি মঞ্জুর করা হলে পরবর্তী পর্যায়ে যদি ওই কর্মচারী এক বছরের অধিক কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং সে পরিপ্রেক্ষিতে ৪২ ধারার বিধানমতে চাকরি থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত হিসাবে গণ্য হন, তাহলে পেনশন সুবিধাদি বাবদ কর্মচারীকে দেওয়া জনগণের কষ্টার্জিত লাখ লাখ টাকার কী হবে?

এই কর্মচারীর মতো অন্য কোনো সরকারি কর্মচারী ধর্ষণ, খুন, ডাকাতি ইত্যাদি অপরাধের মতো গুরুতর নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে মামলা চলাকালীন অবস্থায় কারাগারে থেকে বা জামিনে থেকে স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন জানালে বা অবসর গ্রহণের বয়সে উপনীত হয়ে অবসর সুবিধাদির আবেদন জানালে আইনের বিধানবলে ওই সরকারি কর্মচারী অবসর সুবিধা পাবেন, পরবর্তী পর্যায়ে তার মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড যাই হোক না কেন।

সরকারি চাকরি আইন কার্যকর হওয়ার পূর্ববর্তী বিধানমতে কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় মামলা বা ফৌজদারি মামলা চলমান থাকা অবস্থায় স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন করলে বা অবসর গ্রহণের বয়সে উপনীত হলেও অবসর সুবিধা পেতেন না। মামলার ফলাফলের ভিত্তিতে অবসর সুবিধাদির বিষয়টি নিষ্পত্তি হতো। অর্থাৎ বিভাগীয় মামলায় চাকরি থেকে অপসারণ বা চাকরি থেকে বরখাস্ত দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার ক্ষেত্রে কোনোরূপ অবসর সুবিধাদি পেতেন না। এছাড়া নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে ফৌজদারি মামলায় যে কোনো মাত্রার দণ্ডে দণ্ডিত হলেও অবসর সুবিধাদি পেতেন না।

ওই ভালো বিধান পরিবর্তন করে কেন এরূপ অনৈতিক সুবিধা প্রদানের বিধান করা হলো তার ব্যাখ্যা হয়তো আইন প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই দিতে পারবেন।

সরকারি চাকরি আইনের আরেকটি খারাপ নজিরের বিষয় নজরে এসেছে। কিছুদিন আগে এক ব্যক্তি ফোনে জানতে চান, তার এক আত্মীয় সরকারি কর্মচারী, দুদকের মামলায় তার দুই বছরের জেল হয় এবং পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা দণ্ড হয়, ফলে সে চাকরিচ্যুত হয়। পরবর্তী পর্যায়ে সে উচ্চতর আদালতে আপিল করলে উচ্চতর আদালত ওই সাজা পরিবর্তন করে কারাদণ্ডের মেয়াদ কমিয়ে ছয় মাস করেন এবং জরিমানার পরিমাণ বাড়িয়ে ৪০ লাখ টাকা করেন। ইতোমধ্যে ওই কর্মচারীর ছয় মাস জেল খাটা শেষ হয়েছে, জরিমানার ৪০ লাখ টাকাও পরিশোধ করা হয়েছে।

সরকারি চাকরি আইনের ৪২ ধারার বিধানমতে কারাদণ্ডের মেয়াদ এক বছরের কম হওয়ায় তার ওপর গুরুদণ্ড আরোপের কোনো সুযোগ না থাকায় সে তো এখনো চাকরিতে বহাল আছেন। এ ব্যাপারে আমার মন্তব্য জানতে চান। নিজে একজন সাবেক সরকারি কর্মচারী হওয়ায় নিজেকে ছোট মনে হলো এবং আমি এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে পারিনি। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের নীতির যদি এ পরিণতি হয়, তাহলে কী জবাব দেব? আইন প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা হয়তো এর জবাব দিতে পারবেন।

২০১৮ সালের আগে এরূপ ক্ষেত্রে চাকরিতে বহাল থাকার তো কোনো সুযোগ ছিল না। কেন আগের আইন বাতিল করে এরূপ অনৈতিক সুবিধার বিধান করা হলো, তা বুঝতে সত্যি কষ্ট হয়। সরকারের শুদ্ধাচার চর্চা, শুদ্ধাচারের জন্য পুরস্কার প্রদান এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স-এসবের সঙ্গে এরূপ অনৈতিক বিধান কি চলতে পারে?

এখানেই শেষ নয়, ২০১৮ সালের আগে কোনো সরকারি কর্মচারী দুর্নীতিপরায়ণ হিসাবে গণ্য হলে অর্থাৎ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করলে, প্রকাশ্য আয়ের সঙ্গে সংগতিবিহীন জীবনযাপন করলে বা দুর্নীতিপরায়ণ হিসাবে তার দুর্নাম থাকলে তাকে চাকরিতে বহাল রাখার সুযোগ ছিল না। ন্যূনতম শাস্তি ছিল চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর। অথচ ২০১৮ সালের শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিতে দুর্নীতিপরায়ণতার অপরাধের জন্য চাকরিতে বহাল রাখার সুযোগ তো রাখা হয়েছেই, উপরন্তু ন্যূনতম শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে তিরস্কার। এছাড়া দুর্নীতির পুনরাবৃত্তিরও সুযোগ রাখা হয়েছে।

কার স্বার্থে এরূপ বিধান? এতে তো সরকারি কর্মচারী এবং সরকার উভয়ের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হচ্ছে। দুর্নীতিপরায়ণ সরকারি কর্মচারীদের লালনপালনের দায়িত্ব নিশ্চয় সরকারের নয়। এতে করে দুর্নীতি প্রতিরোধের পরিবর্তে দুর্নীতি উৎসাহিত হবে।

আলোচ্য আইন ও বিধিটি নিয়ে যথেষ্ট সমালোচনা হয়েছে। তা সত্ত্বেও এটি সংশোধনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সরকারি চাকরি আইন সংশোধনের প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদে উঠেছিল। সংবাদমাধ্যমে যতদূর জানা যায়-ওই প্রস্তাবে এ লেখায় যেসব বিধানের উল্লেখ করা হয়েছে, তা সংশোধনের প্রস্তাব ছিল না। আশা করি, নীতিনির্ধারক মহল বিষয়গুলো ভেবে দেখবে।

আইন ও বিধি প্রণয়নের সময় অসতর্কতার কারণে কিছু অনিচ্ছাকৃত ভুল বা অসংগতি থাকতে পারে। কিন্তু যখন ওই ভুল ও অসংগতি নিয়ে প্রচুর সমালোচনা সত্ত্বেও তা সংশোধনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না, তখন জনমনে কী বার্তা পৌঁছায়?

মো. ফিরোজ মিয়া : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব, চাকরি ও আইন সংক্রান্ত গ্রন্থের লেখক

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন