ইসি গঠনে আইন হচ্ছে, তবে...
jugantor
ইসি গঠনে আইন হচ্ছে, তবে...

  মুঈদ রহমান  

২৩ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইসি গঠনে আইন হচ্ছে, তবে...

গত সোমবার মন্ত্রিসভা নির্বাচন কমিশন গঠন সংক্রান্ত একটি আইনের খসড়ার অনুমোদন দেয়। নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক ও সুধী সমাজে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্নের অবতারণা হচ্ছিল। নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে আমাদের ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলা আছে, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া এবং রাষ্ট্রপতি সময়ে সময়ে যেরূপ নির্দেশ করিবেন, সেইরূপ সংখ্যক অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।’ তার মানে হলো, সে সময়ে কমিশনের সদস্য সংখ্যা নির্ধারণ করা ছিল না। তারপর ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে শুধু কমিশনের সদস্য সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়। বলা হয়, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোন আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।’

কিন্তু বিগত পাঁচ দশকেও সংবিধানে যে আইন প্রণয়নের কথা বলা আছে, তার দিকে দৃষ্টি দেওয়া হয়নি। যে দল যখন ক্ষমতায় এসেছে, সে দলের রাষ্ট্রপতি সেভাবেই নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন; প্রক্রিয়া-পদ্ধতি ছিল নিজ নিজ আবিষ্কার। বর্তমান রাষ্ট্রপতি গত ২০ ডিসেম্বর থেকে নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসেন। বিএনপি ছাড়া আমন্ত্রিত প্রায় সব দলই সংলাপে অংশ নেয়। সংলাপে সরকারি দল আওয়ামী লীগসহ একাধিক রাজনৈতিক দল ইসি গঠনে সংবিধান মোতাবেক আইন প্রণয়নের কথা উল্লেখ করে। অবশেষে মন্ত্রিপরিষদে ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন-২০২২’ নামে আইনের একটি খসড়া অনুমোদিত হয়। ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। তবে নতুন আইনে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করা যাবে কিনা তা বলা যাচ্ছে না। কারণ আশা করা যাচ্ছে, আজ ২৩ জানুয়ারি জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে বিলটি উত্থাপিত হবে। সেদিনই বিলটি যাবে মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে। সেখান থেকে সংসদে গিয়ে তা পাশ হবে। এই প্রক্রিয়ায় সময়ের প্রয়োজন হবে। তাই ধারণা করা হচ্ছে, এবারের কমিশন গেলবারের মতোই গঠন করা হবে এবং পরবর্তী কমিশন প্রণীত আইনের আলোকে হতে পারে।

৯টি ধারা সংবলিত আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ দিতে একটা ছয় সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি (সার্চ কমিটি) গঠন করা হবে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনে গঠিত অনুসন্ধান কমিটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার পদে যোগ্য প্রার্থীদের নাম সুপারিশ করবে। রাষ্ট্রপতি উপযুক্তদের নিয়োগ দেবেন। এর সাচিবিক সহযোগিতার দায়িত্ব পালন করবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সার্চ কমিটি কাদের দ্বারা গঠিত হবে তার কথা খসড়ায় উল্লেখ আছে। বলা আছে, নির্বাচন কমিশন গঠনে অনুসন্ধান কমিটিতে বিচারকদের মধ্য থেকে দুজন থাকবেন। এই দুজন হলেন, বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি মনোনীত সুপ্রিমকোর্টে আপিল বিভাগের একজন বিচারক ও অপরজন হলেন হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক। এ দুজনের সঙ্গে সদস্য হিসাবে আরও যে চারজন থাকবেন তারা হলেন, কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল, পিএসসির চেয়ারম্যান এবং রাষ্ট্রপতির মনোনীত দুজন বিশিষ্ট নাগরিক। আপিল বিভাগের যে বিচারপতিকে মনোনয়ন দেওয়া হবে তিনি হবেন সার্চ কমিটির চেয়ারম্যান। সার্চ কমিটির কার্যপদ্ধতি তারা নিজেরাই ঠিক করবেন। তবে ছয় সদস্যের মধ্যে কমপক্ষে তিন সদস্যের উপস্থিতিতে কোরাম পূর্ণ হবে। সিদ্ধান্ত প্রয়োজনে ভোটাভুটিতে গৃহীত হবে। কোনো সিদ্ধান্তের বেলায় সমান ভোট হলে সভাপতি নির্ণায়ক ভোট দিয়ে সমাধা করবেন। তবে সভাপতি বৈঠকে উপস্থিত না থাকলে কে সভাপতিত্ব করবেন তার সুস্পষ্ট উল্লেখ নেই। সেক্ষেত্রে তা হয়তো প্রচলিত রীতি অনুসারেই হবে।

অনুসন্ধান কমিটির কাজ কী হবে তার উল্লেখ আছে ৪ ধারায়। সেখানে বলা হয়েছে, অনুসন্ধান কমিটি কমিশনের সদস্য সুপারিশের ক্ষেত্রে সততা, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করবে। যাদের নাম সুপারিশ করা হবে তাদের সুনাম, যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যেন কোনো প্রশ্ন না থাকে। প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে দুটি করে নাম প্রস্তাব করতে পারবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ আমাদের নির্বাচন কমিশনের সদস্য সংখ্যা ৫। সেই হিসাবে সার্চ কমিটি সর্বোচ্চ ১০ জনের নাম সুপারিশ আকারে পাঠাতে পারবে। আইনের খসড়ার কোন ধরনের নাগরিক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা কমিশনার হতে পারবেন আর কারা পারবেন না তার একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কিংবা কমিশনার হতে হলে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে; বয়স হতে হবে কমপক্ষে ৫০ বছর; কোনো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি, আধাসরকারি বা বেসরকারি বা বিচার বিভাগীয় পদে কমপক্ষে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কারা হতে পারবেন না তার কথাও বলা হয়েছে। সেখানে আছে, আদালতের মাধ্যমে কেউ যদি অপ্রকৃতিস্থ ঘোষিত হন, কেউ যদি দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার পর দেউলিয়া অবস্থা থেকে মুক্ত না হন, অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব অর্জন করেন বা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন, নৈতিক স্খলন এবং সেক্ষেত্রে যদি ফৌজদারি অপরাধে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে দণ্ডিত হলে, রাষ্ট্রীয় কোনো পদে থাকলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনার হতে পারবেন না। আস্থার সংকটকালে ধারাগুলোর কার্যকারিতা কতখানি হবে তা নিয়ে তো প্রশ্ন থাকছেই, তবে কাগজে-কলমে যা লেখা আছে, একটি ধারা বাদে, তা নিয়ে খুব বেশি অভিযোগের সুযোগ নেই। কিন্তু জটিলতার গন্ধ পাওয়া যায় শেষ ধারা অর্থাৎ ৯ নম্বর ধারায় এসে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগদানের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ইতঃপূর্বে গঠিত অনুসন্ধান কমিটি ও তৎকর্তৃক সম্পাদিত কার‌্যাবলি এবং উক্ত অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারের নিয়োগ বৈধ ছিল বলিয়া গণ্য হইবে এবং উক্ত বিষয়ে কোনো আদালতে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।’ এ ধরনের ধারাকে অনেকেই গণতন্ত্রের পরিপন্থি বলে মনে করছেন। এর মাধ্যমে যে কোনো অপরাধ ও অপরাধীকে সুরক্ষা দেওয়া হয়। বাংলাদেশে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধানকে কলুষিত করা হয়েছিল। অপরাধীদের সুরক্ষার সেই আইনটি হয়েছিল অগণতান্ত্রিক সরকারের আমলে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তার অনুরূপ আইন কাঙ্ক্ষিত নয়। অতীতের যে কোনো অভিযোগ নিয়ে যে কোনো নাগরিক আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন। এটা তার নাগরিক অধিকার। অভিযোগের মেরিট-ডিমেরিট, গ্রহণযোগ্যতা, অগ্রহণযোগ্যতা দেখবে আদালত। অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে তা খারিজ হয়ে যাবে। আগে থেকে দায়মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা মানে ‘ডালমে কুচ কালা হ্যায়’। অতীতে কোনো ব্যক্তির কারণে যদি নির্বাচনি ব্যবস্থার কোনো ক্ষতি হয়ে থাকে তাহলে তার প্রতিকার চাওয়া তো অন্যায় কিছু নয়। আর প্রতিকার চাওয়ার সবচেয়ে আইনি প্রতিষ্ঠান হলো আদালত। সেই আদালতের শরণাপন্ন হওয়া থেকে আইনগতভাবে কাউকে বিরত রাখা গণতান্ত্রিক রীতির মধ্যে পড়ে না।

শুরুতেই বলেছি, নির্বাচন কমিশন গঠনে একটি আইন হোক-এমন দাবি দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ও সুশীল সমাজ করে আসছিল। সেক্ষেত্রে আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দিয়ে আওয়ামী লীগ প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এ আইন নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে কিনা? বিএনপিও একটি আইন চেয়েছিল; কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা দেয়নি। সে সুযোগটি কাজে লাগিয়েছে সরকার। এখন বিএনপির বক্তব্য হলো, ‘আমরা যেহেতু সরকারের পদত্যাগ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া নির্বাচনে যাব না, তাই এ সরকারের আমলে নেওয়া কোনো আইনের প্রতিই আমাদের সমর্থন নেই।’ বিকল্প হিসাবে বিএনপি কোন পথ অনুসরণ করবে তা ভবিষ্যৎই বলতে পারবে। তবে আমরা সাধারণ মানুষ মনে করি, নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার দায়িত্বটি সরকারের। বাংলাদেশের কোনো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানই সরকারের প্রভাব বলয়ের বাইরে দেখা যায়নি। প্রভাব বজায় রাখার বাস্তবতা নিয়ে যে প্রক্রিয়াতেই কমিশন গঠন করা হোক না কেন, তাতে করে আস্থা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তারপরও ৫০ বছর পর ইসি গঠনসংক্রান্ত একটি আইন প্রণয়নের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

ইসি গঠনে আইন হচ্ছে, তবে...

 মুঈদ রহমান 
২৩ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
ইসি গঠনে আইন হচ্ছে, তবে...
ফাইল ছবি

গত সোমবার মন্ত্রিসভা নির্বাচন কমিশন গঠন সংক্রান্ত একটি আইনের খসড়ার অনুমোদন দেয়। নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক ও সুধী সমাজে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্নের অবতারণা হচ্ছিল। নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে আমাদের ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলা আছে, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া এবং রাষ্ট্রপতি সময়ে সময়ে যেরূপ নির্দেশ করিবেন, সেইরূপ সংখ্যক অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।’ তার মানে হলো, সে সময়ে কমিশনের সদস্য সংখ্যা নির্ধারণ করা ছিল না। তারপর ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে শুধু কমিশনের সদস্য সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়। বলা হয়, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোন আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।’

কিন্তু বিগত পাঁচ দশকেও সংবিধানে যে আইন প্রণয়নের কথা বলা আছে, তার দিকে দৃষ্টি দেওয়া হয়নি। যে দল যখন ক্ষমতায় এসেছে, সে দলের রাষ্ট্রপতি সেভাবেই নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন; প্রক্রিয়া-পদ্ধতি ছিল নিজ নিজ আবিষ্কার। বর্তমান রাষ্ট্রপতি গত ২০ ডিসেম্বর থেকে নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসেন। বিএনপি ছাড়া আমন্ত্রিত প্রায় সব দলই সংলাপে অংশ নেয়। সংলাপে সরকারি দল আওয়ামী লীগসহ একাধিক রাজনৈতিক দল ইসি গঠনে সংবিধান মোতাবেক আইন প্রণয়নের কথা উল্লেখ করে। অবশেষে মন্ত্রিপরিষদে ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন-২০২২’ নামে আইনের একটি খসড়া অনুমোদিত হয়। ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। তবে নতুন আইনে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করা যাবে কিনা তা বলা যাচ্ছে না। কারণ আশা করা যাচ্ছে, আজ ২৩ জানুয়ারি জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে বিলটি উত্থাপিত হবে। সেদিনই বিলটি যাবে মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে। সেখান থেকে সংসদে গিয়ে তা পাশ হবে। এই প্রক্রিয়ায় সময়ের প্রয়োজন হবে। তাই ধারণা করা হচ্ছে, এবারের কমিশন গেলবারের মতোই গঠন করা হবে এবং পরবর্তী কমিশন প্রণীত আইনের আলোকে হতে পারে।

৯টি ধারা সংবলিত আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ দিতে একটা ছয় সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি (সার্চ কমিটি) গঠন করা হবে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনে গঠিত অনুসন্ধান কমিটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার পদে যোগ্য প্রার্থীদের নাম সুপারিশ করবে। রাষ্ট্রপতি উপযুক্তদের নিয়োগ দেবেন। এর সাচিবিক সহযোগিতার দায়িত্ব পালন করবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সার্চ কমিটি কাদের দ্বারা গঠিত হবে তার কথা খসড়ায় উল্লেখ আছে। বলা আছে, নির্বাচন কমিশন গঠনে অনুসন্ধান কমিটিতে বিচারকদের মধ্য থেকে দুজন থাকবেন। এই দুজন হলেন, বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি মনোনীত সুপ্রিমকোর্টে আপিল বিভাগের একজন বিচারক ও অপরজন হলেন হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক। এ দুজনের সঙ্গে সদস্য হিসাবে আরও যে চারজন থাকবেন তারা হলেন, কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল, পিএসসির চেয়ারম্যান এবং রাষ্ট্রপতির মনোনীত দুজন বিশিষ্ট নাগরিক। আপিল বিভাগের যে বিচারপতিকে মনোনয়ন দেওয়া হবে তিনি হবেন সার্চ কমিটির চেয়ারম্যান। সার্চ কমিটির কার্যপদ্ধতি তারা নিজেরাই ঠিক করবেন। তবে ছয় সদস্যের মধ্যে কমপক্ষে তিন সদস্যের উপস্থিতিতে কোরাম পূর্ণ হবে। সিদ্ধান্ত প্রয়োজনে ভোটাভুটিতে গৃহীত হবে। কোনো সিদ্ধান্তের বেলায় সমান ভোট হলে সভাপতি নির্ণায়ক ভোট দিয়ে সমাধা করবেন। তবে সভাপতি বৈঠকে উপস্থিত না থাকলে কে সভাপতিত্ব করবেন তার সুস্পষ্ট উল্লেখ নেই। সেক্ষেত্রে তা হয়তো প্রচলিত রীতি অনুসারেই হবে।

অনুসন্ধান কমিটির কাজ কী হবে তার উল্লেখ আছে ৪ ধারায়। সেখানে বলা হয়েছে, অনুসন্ধান কমিটি কমিশনের সদস্য সুপারিশের ক্ষেত্রে সততা, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করবে। যাদের নাম সুপারিশ করা হবে তাদের সুনাম, যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যেন কোনো প্রশ্ন না থাকে। প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে দুটি করে নাম প্রস্তাব করতে পারবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ আমাদের নির্বাচন কমিশনের সদস্য সংখ্যা ৫। সেই হিসাবে সার্চ কমিটি সর্বোচ্চ ১০ জনের নাম সুপারিশ আকারে পাঠাতে পারবে। আইনের খসড়ার কোন ধরনের নাগরিক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা কমিশনার হতে পারবেন আর কারা পারবেন না তার একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কিংবা কমিশনার হতে হলে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে; বয়স হতে হবে কমপক্ষে ৫০ বছর; কোনো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি, আধাসরকারি বা বেসরকারি বা বিচার বিভাগীয় পদে কমপক্ষে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কারা হতে পারবেন না তার কথাও বলা হয়েছে। সেখানে আছে, আদালতের মাধ্যমে কেউ যদি অপ্রকৃতিস্থ ঘোষিত হন, কেউ যদি দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার পর দেউলিয়া অবস্থা থেকে মুক্ত না হন, অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব অর্জন করেন বা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন, নৈতিক স্খলন এবং সেক্ষেত্রে যদি ফৌজদারি অপরাধে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে দণ্ডিত হলে, রাষ্ট্রীয় কোনো পদে থাকলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনার হতে পারবেন না। আস্থার সংকটকালে ধারাগুলোর কার্যকারিতা কতখানি হবে তা নিয়ে তো প্রশ্ন থাকছেই, তবে কাগজে-কলমে যা লেখা আছে, একটি ধারা বাদে, তা নিয়ে খুব বেশি অভিযোগের সুযোগ নেই। কিন্তু জটিলতার গন্ধ পাওয়া যায় শেষ ধারা অর্থাৎ ৯ নম্বর ধারায় এসে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগদানের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ইতঃপূর্বে গঠিত অনুসন্ধান কমিটি ও তৎকর্তৃক সম্পাদিত কার‌্যাবলি এবং উক্ত অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারের নিয়োগ বৈধ ছিল বলিয়া গণ্য হইবে এবং উক্ত বিষয়ে কোনো আদালতে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।’ এ ধরনের ধারাকে অনেকেই গণতন্ত্রের পরিপন্থি বলে মনে করছেন। এর মাধ্যমে যে কোনো অপরাধ ও অপরাধীকে সুরক্ষা দেওয়া হয়। বাংলাদেশে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধানকে কলুষিত করা হয়েছিল। অপরাধীদের সুরক্ষার সেই আইনটি হয়েছিল অগণতান্ত্রিক সরকারের আমলে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তার অনুরূপ আইন কাঙ্ক্ষিত নয়। অতীতের যে কোনো অভিযোগ নিয়ে যে কোনো নাগরিক আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন। এটা তার নাগরিক অধিকার। অভিযোগের মেরিট-ডিমেরিট, গ্রহণযোগ্যতা, অগ্রহণযোগ্যতা দেখবে আদালত। অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে তা খারিজ হয়ে যাবে। আগে থেকে দায়মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা মানে ‘ডালমে কুচ কালা হ্যায়’। অতীতে কোনো ব্যক্তির কারণে যদি নির্বাচনি ব্যবস্থার কোনো ক্ষতি হয়ে থাকে তাহলে তার প্রতিকার চাওয়া তো অন্যায় কিছু নয়। আর প্রতিকার চাওয়ার সবচেয়ে আইনি প্রতিষ্ঠান হলো আদালত। সেই আদালতের শরণাপন্ন হওয়া থেকে আইনগতভাবে কাউকে বিরত রাখা গণতান্ত্রিক রীতির মধ্যে পড়ে না।

শুরুতেই বলেছি, নির্বাচন কমিশন গঠনে একটি আইন হোক-এমন দাবি দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ও সুশীল সমাজ করে আসছিল। সেক্ষেত্রে আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দিয়ে আওয়ামী লীগ প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এ আইন নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে কিনা? বিএনপিও একটি আইন চেয়েছিল; কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা দেয়নি। সে সুযোগটি কাজে লাগিয়েছে সরকার। এখন বিএনপির বক্তব্য হলো, ‘আমরা যেহেতু সরকারের পদত্যাগ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া নির্বাচনে যাব না, তাই এ সরকারের আমলে নেওয়া কোনো আইনের প্রতিই আমাদের সমর্থন নেই।’ বিকল্প হিসাবে বিএনপি কোন পথ অনুসরণ করবে তা ভবিষ্যৎই বলতে পারবে। তবে আমরা সাধারণ মানুষ মনে করি, নির্বাচনি ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার দায়িত্বটি সরকারের। বাংলাদেশের কোনো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানই সরকারের প্রভাব বলয়ের বাইরে দেখা যায়নি। প্রভাব বজায় রাখার বাস্তবতা নিয়ে যে প্রক্রিয়াতেই কমিশন গঠন করা হোক না কেন, তাতে করে আস্থা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তারপরও ৫০ বছর পর ইসি গঠনসংক্রান্ত একটি আইন প্রণয়নের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন