কূটনীতিতে ধোঁয়াশা : এক ফরেন সেক্রেটারির কূটনৈতিক জীবন
jugantor
একাত্তরের ঝর্নাতলায়
কূটনীতিতে ধোঁয়াশা : এক ফরেন সেক্রেটারির কূটনৈতিক জীবন

  মহিউদ্দিন আহমদ  

২৪ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কূটনীতিতে ধোঁয়াশা : এক ফরেন সেক্রেটারির কূটনৈতিক জীবন

এ ফরেন সেক্রেটারির নাম হেমায়েত উদ্দিন। তিনি ২০০৫-এর মার্চ থেকে ২০০৬-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত আমাদের ফরেন সেক্রেটারি ছিলেন। ফরেন সার্ভিস থেকে অবসর নিয়ে তিনি গেলেন জেদ্দায় ‘ওআইসি’-অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনে, একজন ডাইরেক্টর জেনারেল হিসাবে। তিনি সম্প্রতি তার দ্বিতীয় বইটি প্রকাশ করেছেন। গুলশানের গ্রেগরিয়ান ক্লাবে গত ২৬ ডিসেম্বর বিকালে তার এ বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানটি হয়ে গেল। পাঁচ-ছয়জন সাবেক ও বর্তমান মন্ত্রীসহ প্রায় ৬০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

হেমায়েতের এ বইটির নাম ‘diplomacy in obscurity, a memoir’. হেমায়েতের প্রথম বইটির নাম, ‘A Neighbourly Affair : Assignment India’. হেমায়েতের প্রথম বইটিতে ভারতে তার হাইকমিশনার থাকাকালীন অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে। এর আগে হেমায়েত থাইল্যান্ডেও আমাদের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তারও আগে হেমায়েত কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন আমাদের ব্রাসেলস, ওয়াশিংটন এবং বেইজিং দূতাবাসেও। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও তিনি ডাইরেক্টর, ডাইরেক্টর জেনারেল এবং ফরেন সেক্রেটারি পদে কাজ করেছেন।

দুটি বইয়ের প্রকাশক হচ্ছে ইউপিএল। তার সাম্প্রতিক বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ২০৯, ২০টি চ্যাপ্টারে বিভক্ত। বইটির দাম রাখা হয়েছে ৮০০ টাকা। প্রচ্ছদ, ছাপা এবং কাগজের কোয়ালিটি উন্নতমানের। বইটি দেখলে হাতে নিয়ে দেখতে ইচ্ছা করবে। তারপর পড়া শুরু করলে শেষ না করে ছাড়তে ইচ্ছা করবে না। হেমায়েত ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুলের ছাত্র ছিলেন; সুতরাং তার কূটনৈতিক জীবনের ইংরেজিতে বিচিত্র সব বর্ণনা আমার কাছে আরও বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। বইটির বাংলা শিরোনাম আমি যেমন ভালো এবং যথার্থ মনে করেছি, তা ওপরে আমার আজকের কলামের শিরোনামে ব্যবহার করেছি। বইটি সম্পর্কে পরের দিকে আরও কিছু কথা আছে। তবে এখন একটি ঘটনার কথা বলি।

২.

আমাদের দেশে এখন হাইপার ডিপ্লোমেসির কিছু আলামত দেখতে পাচ্ছি। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এবং তাদের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট গত ১০ ডিসেম্বর আমাদের র‌্যাব এবং তার শীর্ষস্থানীয় সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর আমাদের অনেক নেতা-মন্ত্রী এ হাইপার-ডিপ্লোমেসি চালাচ্ছেন। বেশি তৎপরতা চালাচ্ছেন আমাদের তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। এ নেতা-মন্ত্রীরা প্রথম দিকে আমেরিকাকে বড় বড় হুমকি-ধমকি দিয়ে এখন নুইয়ে গেছেন বলে মনে হচ্ছে।

এ নেতা-মন্ত্রীদের একটি বয়ান হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতা প্রত্যাশিতভাবে তেমন অ্যাক্টিভ ছিল না; তাই র‌্যাব এবং তার শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের ওপর আমেরিকার স্যাংশন ঠেকাতে পারেনি আমাদের দূতাবাস। ‘বাংলাদেশে মানবাধিকারের তেমন কোনো লংঘন ঘটেনি’-এ কথাগুলোও মার্কিন কর্মকর্তাদের সঠিকভাবে বোঝানো হয়নি; তাই তারা ‘র‌্যাব’কে নিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে!

আমি আমার আগের অনেক কলামে চিৎকার করে বারবার বলেছি যে, ঢাকা শহরে যে প্রায় ৭০টির মতো আবাসিক দূতাবাস আছে, বাংলাদেশে আসলে কী ঘটছে; তাদের রাষ্ট্রদূতরা কি তা সরেজমিন দেখছেন না? বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থার বর্ণনা দিয়ে এ রাষ্ট্রদূতরা কি তাদের সরকারের কাছে নিয়মিত রিপোর্ট পাঠাচ্ছেন না?

এ প্রসঙ্গেই ঘটনাটির উল্লেখ। আমাদের অনেকেই জানি, ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট কার্টারের মধ্যস্থতায় মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদত ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী মেনাহেম বেগিনের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়েছিল আমেরিকান প্রেসিডেন্টের অবকাশ কেন্দ্র ক্যাম্প ডেভিডে। প্রতিবাদে এবং নিন্দায় তখন ওআইসির সব দেশ মিসরের বিরুদ্ধে কিছু কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। প্রায় সব ইসলামী দেশ তখন মিসর থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহার করে নেয়। আমাদের তেমন কিছু করতে হলো না; কারণ, মিসরে আমাদের রাষ্ট্রদূত আরশাদুজ্জমান আগেই ওআইসির অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল হিসাবে নিয়োগ পেয়ে জেদ্দায় চলে গিয়েছিলেন। তিনি জেদ্দায় চলে যাওয়ার পর কায়রোতে আমাদের রাষ্ট্রদূতের পদ খালিই পড়েছিল। পদটি অনেকদিনই খালি পড়ে থাকল; আমাদের দিক থেকে এ পদটি পূরণে কোনো তাগিদ ছিল না; অন্য কোনো পক্ষ থেকেও কোনো চাপ ছিল না। কেউ প্রশ্ন করলে আমরা বরং বলতাম, আমরা তো ওআইসির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছি। কিন্তু ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ কারণে আমাদের ওপর এক অপ্রত্যাশিত চাপ এসে পড়ল।

১৯৮১ সালের মে মাসে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে একদল সেনাসদস্যের হাতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর জেনারেল এরশাদ, মেজর জেনারেল মীর শওকত আলীকে লেফটেনেন্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে অবসরে পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু অবসরে পাঠিয়ে দিয়েও জেনারেল এরশাদ নিশ্চিত এবং নিরাপদ হতে পারলেন না; তাকে বিদেশে পাঠাতে হবে।

কোথায় পাঠানো যায়? একটু খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, মিসরে রাষ্ট্রদূতের পদটি খালি আছে অনেকদিন ধরে। সুতরাং কায়রোই সই। জেনারেল শওকত আলীকে কায়রোতে পাঠানোর ব্যবস্থা নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হলো। কিন্তু চাপ দিলেই তো হলো না; আন্তর্জাতিক আইনকানুন মোতাবেক রাষ্ট্রদূত এবং সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে ‘হোস্ট’ দেশের পূর্বানুমতির (Agrement; উচ্চারণ-‘এগ্রেমো’) বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সুতরাং মিসরীয় সরকার থেকে সেই অনুমতি জোগাড় করা প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়াল তখন। কায়রোতে তখন আমাদের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ছিলেন সিএম শফি সামী (পরে আমাদের ফরেন সেক্রেটারি)। যত দ্রুত সম্ভব মিসরীয়দের অনুমতি জোগাড় করে তা ঢাকা পাঠাতে তার কাছে নির্দেশ গেল।

শফি সামি গেলেন মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে, জেনারেল শওকতের জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে; পাশাপাশি মুখে বর্ণনা করলেন জেনারেল শওকতের আরও আরও সব যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং গুণাগুণ। শফি সামীর সব কথা শুনে এবং জীবনবৃত্তান্ত পড়ে মিসরীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা শফি সামীকে বললেন, ব্রাদার, ঢাকায় আমাদের রাষ্ট্রদূতের রিপোর্ট থেকে তোমাদের এ জেনারেলের কথা আমরা আগে থেকেই জানি। তাকে কেন তোমাদের দেশ থেকে দ্রুত সরানো দরকার, তাও আমরা জানি। আর জেনারেল শওকতকে সরানোর জন্য তোমাদের কাছে আছে কায়রোর এ শূন্য পদটি। সুতরাং তাকে যে এখানেই পাঠাতে হবে, তাতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। আমরা যত দ্রুত সম্ভব অনুমতিপত্র তোমাদের দেব। তারপর বাংলাদেশ অনুমতিপত্র পেল এবং জেনারেল শওকতও মিসরে আমাদের রাষ্ট্রদূত হিসাবে গেলেন।

আশা করি, পাঠক বুঝতে পেরেছেন, ঢাকায় যেসব রাষ্ট্রদূত কাজ করেন, তারা ঠিকই বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের সরকারকে নিয়মিত অবহিত রাখেন। আরও একটু ব্যাখ্যা করে বলা যায়, ওয়াশিংটনে আমাদের রাষ্ট্রদূতের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের চাইতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ঢাকায় তাদের নিজস্ব লোক; তাদের রাষ্ট্রদূতের রিপোর্টকেই তো বেশি বিশ্বাস করার কথা। আমেরিকা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতরা নানাভাবে বাংলাদেশে মানবাধিকারের চরম লংঘনের উল্লেখ বারবার করেছেন; কিন্তু আমাদের নেতা-মন্ত্রীরা এসব হুঁশিয়ারিকে এত বছর গ্রাহ্যই করলেন না! আর এখন তারাই বাতাস গরম করে চলেছেন!

৩.

হেমায়েত তার আলোচ্য বইটিতে তার দীর্ঘ কূটনৈতিক জীবনের কোনো তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা লেখেননি। আমার ধারণা, তিনি ইচ্ছে করেই তা এড়িয়ে গেছেন। বিদেশে আমাদের মিশনে কাজ করেছেন; কিন্তু বিদেশ সফরকারী আমাদের নেতা-মন্ত্রীদের চোটপাটের সম্মুখীন হননি দূতাবাসে কর্মরত আমাদের কর্মকর্তারা, তা হতেই পারে না। আমার খুব মনে পড়ে, ১৯৯১-৯২ সালে আমি যখন নিউইয়র্কে আমাদের জাতিসংঘ মিশনে কাজ করছিলাম, তখন এক বিএনপি নেতা আমাকে নিউইয়র্কে তার থাকার ঠিকানা এবং টেলিফোন নম্বর লিখে রাখতে নির্দেশ দিলেন। লিখে রেখে কী হবে, জিজ্ঞাসা করলে তিনি জবাব দিলেন-প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তাকে ঢাকা থেকে নিউইয়র্কে টেলিফোন করতে পারেন। তাই তার ঠিকানা, টেলিফোন নম্বর আমার জেনে রাখা ভালো। বুঝলাম, তিনি আমাকে তার গুরুত্ব বোঝাচ্ছেন।

হেমায়েত তার বইতে বাংলাদেশে টাটা গ্রুপের তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার সম্ভাব্য বিনিয়োগের প্রাথমিক আলাপ-আলোচনার কথা হালকাভাবে উল্লেখ করেছেন। এ উদ্দেশ্যে রতন টাটার বাংলাদেশ সফরের কথাও তিনি বলেছেন। কিন্তু ‘সারপ্রাইজ অ্যান্ড মোর সারপ্রাইজ’, রতন টাটার ২০০৪ সালের অক্টোবরে তিন দিনের বাংলাদেশ সফরকালে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তার সঙ্গে দেখাই করলেন না!

টাটা গ্রুপের সঙ্গে বিনিয়োগ প্রস্তাব যে বিফলে গেল, তার যুক্তিসংগত কারণ ছিল বলে আমি মনে করি। টাটা গ্রুপ তখন একটি নির্দিষ্ট মূল্যে ৩০ বছর ধরে গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা চেয়েছিল; বাংলাদেশের পক্ষে এমন প্রস্তাবে রাজি হওয়া আত্মঘাতী হতো। কিন্তু রতন টাটার সঙ্গে খালেদা জিয়া দেখাই করলেন না, তার কোনো ব্যাখ্যা তখন বা তার পরও পাওয়া যায়নি।

এ প্রসঙ্গে একটি প্রশ্ন তুলতেই হয়। আমাদের ক্ষমতাসীন সরকারের নেতা-মন্ত্রীরা মুখ খোলার সুযোগ পেলেই সফরকারী বিদেশি বিশিষ্টজনদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার কত কত সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, তার লোভনীয় বর্ণনা দিতে থাকেন। হেমায়েতের বইটি পড়তে পড়তে আমার মনে প্রশ্ন জাগল-এত কাছের এত বড় প্রতিবেশী দেশ; এ দেশের এতসব বড় বড় শিল্প গ্রুপ টাটা, বিরলা, আদানি, মুকেশ আম্বানি-এরা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী নয়? বাংলাদেশের পুঁজিবাদী নামের লুণ্ঠনকারীরা বিষয়টি কি একটু ভেবে দেখবেন?

বাংলাদেশের সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বিএনপি-জামায়াত জামানায় ২০০৪ সালে ওআইসির মহাসচিব পদে প্রার্থী হয়ে কীভাবে গো-হারা হারলেন, তার সংক্ষিপ্ত উল্লেখও আছে বইটিতে। হেমায়েত পরে এ সংস্থায় ডাইরেক্টর জেনারেল ছিলেন, তাই তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিতে পারতেন। এ পরাজয়ের আগে খালেদা জিয়া খুব সম্ভব ১৯৯৪ সালে রোমে বিশ্ব খাদ্য সংস্থায় ডাইরেক্টর জেনারেল পদে তখনকার এক সচিব এবং সিএসপি সালাহউদ্দিন আহমেদকে প্রার্থী করে ১৬৯ ভোটের মধ্যে প্রথম রাউন্ডে দুই ভোট এবং দ্বিতীয় রাউন্ডে এক ভোট পেয়েছিলেন। বাংলাদেশের কূটনীতিতে এ দুটি উদাহরণ আমাদের দেশের জন্য কলঙ্ক হয়ে থাকল; কিন্তু এমন কলঙ্ক কাদের সৃষ্টি ছিল? কোনো পেশাদার কূটনীতিবিদ এ দুজনের কাউকেই প্রার্থী করতে সম্মতি দিতেন না।

৪.

বইটিতে হেমায়েত তার ফরেন সেক্রেটারির জীবন নিয়ে কিছু লেখেননি; অথচ ফরেন সেক্রেটারি হিসাবে তার এ দুই বছরের কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে একটি আলাদা বই হতে পারত। আপাতত বই না হলেও একটি চ্যাপ্টার খুব প্রত্যাশিত ছিল। আশা করি, হেমায়েত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন। আমার ভাবতে খুব খারাপ লাগে, ফরেন সার্ভিসে যারা কাজ করেছেন, তাদের মাত্র পাঁচ-ছয়জন বই লিখেছেন। কিন্তু এ কয়েকজন ছাড়া আরও কয়েকশ কর্মকর্তা তাদের কূটনৈতিক জীবনের তিক্ত-মধুর অভিজ্ঞতাগুলো তুলে ধরেননি। এতে দেশের প্রতিপক্ষ গ্রুপগুলো সুযোগ নিচ্ছে।

হেমায়েত উদ্দিন একটি সুখপাঠ্য বই লিখেছেন, সেজন্য তাকে আন্তরিক অভিনন্দন ও ধন্যবাদ। আশা করি, আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়/ফরেন সার্ভিস একাডেমি এ বইটির কয়েকশ কপি কিনবে এবং কপিগুলো উদারভাবে বিলি-বণ্টনও করবে। তবে এজন্য বইটির দামও কমানো দরকার।

‘শিউলিতলা’, উত্তরা ; শনিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২২

মহিউদ্দিন আহমদ : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব, কলাম লেখক

একাত্তরের ঝর্নাতলায়

কূটনীতিতে ধোঁয়াশা : এক ফরেন সেক্রেটারির কূটনৈতিক জীবন

 মহিউদ্দিন আহমদ 
২৪ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
কূটনীতিতে ধোঁয়াশা : এক ফরেন সেক্রেটারির কূটনৈতিক জীবন
গুলশানের গ্রেগরিয়ান ক্লাবে গত ২৬ ডিসেম্বর বিকালে হেমায়েত উদ্দিনের বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠান। ফাইল ছবি

এ ফরেন সেক্রেটারির নাম হেমায়েত উদ্দিন। তিনি ২০০৫-এর মার্চ থেকে ২০০৬-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত আমাদের ফরেন সেক্রেটারি ছিলেন। ফরেন সার্ভিস থেকে অবসর নিয়ে তিনি গেলেন জেদ্দায় ‘ওআইসি’-অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনে, একজন ডাইরেক্টর জেনারেল হিসাবে। তিনি সম্প্রতি তার দ্বিতীয় বইটি প্রকাশ করেছেন। গুলশানের গ্রেগরিয়ান ক্লাবে গত ২৬ ডিসেম্বর বিকালে তার এ বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানটি হয়ে গেল। পাঁচ-ছয়জন সাবেক ও বর্তমান মন্ত্রীসহ প্রায় ৬০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

হেমায়েতের এ বইটির নাম ‘diplomacy in obscurity, a memoir’. হেমায়েতের প্রথম বইটির নাম, ‘A Neighbourly Affair : Assignment India’. হেমায়েতের প্রথম বইটিতে ভারতে তার হাইকমিশনার থাকাকালীন অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে। এর আগে হেমায়েত থাইল্যান্ডেও আমাদের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তারও আগে হেমায়েত কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন আমাদের ব্রাসেলস, ওয়াশিংটন এবং বেইজিং দূতাবাসেও। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও তিনি ডাইরেক্টর, ডাইরেক্টর জেনারেল এবং ফরেন সেক্রেটারি পদে কাজ করেছেন।

দুটি বইয়ের প্রকাশক হচ্ছে ইউপিএল। তার সাম্প্রতিক বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ২০৯, ২০টি চ্যাপ্টারে বিভক্ত। বইটির দাম রাখা হয়েছে ৮০০ টাকা। প্রচ্ছদ, ছাপা এবং কাগজের কোয়ালিটি উন্নতমানের। বইটি দেখলে হাতে নিয়ে দেখতে ইচ্ছা করবে। তারপর পড়া শুরু করলে শেষ না করে ছাড়তে ইচ্ছা করবে না। হেমায়েত ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুলের ছাত্র ছিলেন; সুতরাং তার কূটনৈতিক জীবনের ইংরেজিতে বিচিত্র সব বর্ণনা আমার কাছে আরও বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। বইটির বাংলা শিরোনাম আমি যেমন ভালো এবং যথার্থ মনে করেছি, তা ওপরে আমার আজকের কলামের শিরোনামে ব্যবহার করেছি। বইটি সম্পর্কে পরের দিকে আরও কিছু কথা আছে। তবে এখন একটি ঘটনার কথা বলি।

২.

আমাদের দেশে এখন হাইপার ডিপ্লোমেসির কিছু আলামত দেখতে পাচ্ছি। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এবং তাদের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট গত ১০ ডিসেম্বর আমাদের র‌্যাব এবং তার শীর্ষস্থানীয় সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর আমাদের অনেক নেতা-মন্ত্রী এ হাইপার-ডিপ্লোমেসি চালাচ্ছেন। বেশি তৎপরতা চালাচ্ছেন আমাদের তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। এ নেতা-মন্ত্রীরা প্রথম দিকে আমেরিকাকে বড় বড় হুমকি-ধমকি দিয়ে এখন নুইয়ে গেছেন বলে মনে হচ্ছে।

এ নেতা-মন্ত্রীদের একটি বয়ান হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতা প্রত্যাশিতভাবে তেমন অ্যাক্টিভ ছিল না; তাই র‌্যাব এবং তার শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের ওপর আমেরিকার স্যাংশন ঠেকাতে পারেনি আমাদের দূতাবাস। ‘বাংলাদেশে মানবাধিকারের তেমন কোনো লংঘন ঘটেনি’-এ কথাগুলোও মার্কিন কর্মকর্তাদের সঠিকভাবে বোঝানো হয়নি; তাই তারা ‘র‌্যাব’কে নিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে!

আমি আমার আগের অনেক কলামে চিৎকার করে বারবার বলেছি যে, ঢাকা শহরে যে প্রায় ৭০টির মতো আবাসিক দূতাবাস আছে, বাংলাদেশে আসলে কী ঘটছে; তাদের রাষ্ট্রদূতরা কি তা সরেজমিন দেখছেন না? বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থার বর্ণনা দিয়ে এ রাষ্ট্রদূতরা কি তাদের সরকারের কাছে নিয়মিত রিপোর্ট পাঠাচ্ছেন না?

এ প্রসঙ্গেই ঘটনাটির উল্লেখ। আমাদের অনেকেই জানি, ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট কার্টারের মধ্যস্থতায় মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদত ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী মেনাহেম বেগিনের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়েছিল আমেরিকান প্রেসিডেন্টের অবকাশ কেন্দ্র ক্যাম্প ডেভিডে। প্রতিবাদে এবং নিন্দায় তখন ওআইসির সব দেশ মিসরের বিরুদ্ধে কিছু কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। প্রায় সব ইসলামী দেশ তখন মিসর থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহার করে নেয়। আমাদের তেমন কিছু করতে হলো না; কারণ, মিসরে আমাদের রাষ্ট্রদূত আরশাদুজ্জমান আগেই ওআইসির অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল হিসাবে নিয়োগ পেয়ে জেদ্দায় চলে গিয়েছিলেন। তিনি জেদ্দায় চলে যাওয়ার পর কায়রোতে আমাদের রাষ্ট্রদূতের পদ খালিই পড়েছিল। পদটি অনেকদিনই খালি পড়ে থাকল; আমাদের দিক থেকে এ পদটি পূরণে কোনো তাগিদ ছিল না; অন্য কোনো পক্ষ থেকেও কোনো চাপ ছিল না। কেউ প্রশ্ন করলে আমরা বরং বলতাম, আমরা তো ওআইসির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছি। কিন্তু ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ কারণে আমাদের ওপর এক অপ্রত্যাশিত চাপ এসে পড়ল।

১৯৮১ সালের মে মাসে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে একদল সেনাসদস্যের হাতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর জেনারেল এরশাদ, মেজর জেনারেল মীর শওকত আলীকে লেফটেনেন্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে অবসরে পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু অবসরে পাঠিয়ে দিয়েও জেনারেল এরশাদ নিশ্চিত এবং নিরাপদ হতে পারলেন না; তাকে বিদেশে পাঠাতে হবে।

কোথায় পাঠানো যায়? একটু খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, মিসরে রাষ্ট্রদূতের পদটি খালি আছে অনেকদিন ধরে। সুতরাং কায়রোই সই। জেনারেল শওকত আলীকে কায়রোতে পাঠানোর ব্যবস্থা নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হলো। কিন্তু চাপ দিলেই তো হলো না; আন্তর্জাতিক আইনকানুন মোতাবেক রাষ্ট্রদূত এবং সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে ‘হোস্ট’ দেশের পূর্বানুমতির (Agrement; উচ্চারণ-‘এগ্রেমো’) বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সুতরাং মিসরীয় সরকার থেকে সেই অনুমতি জোগাড় করা প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়াল তখন। কায়রোতে তখন আমাদের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ছিলেন সিএম শফি সামী (পরে আমাদের ফরেন সেক্রেটারি)। যত দ্রুত সম্ভব মিসরীয়দের অনুমতি জোগাড় করে তা ঢাকা পাঠাতে তার কাছে নির্দেশ গেল।

শফি সামি গেলেন মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে, জেনারেল শওকতের জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে; পাশাপাশি মুখে বর্ণনা করলেন জেনারেল শওকতের আরও আরও সব যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং গুণাগুণ। শফি সামীর সব কথা শুনে এবং জীবনবৃত্তান্ত পড়ে মিসরীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা শফি সামীকে বললেন, ব্রাদার, ঢাকায় আমাদের রাষ্ট্রদূতের রিপোর্ট থেকে তোমাদের এ জেনারেলের কথা আমরা আগে থেকেই জানি। তাকে কেন তোমাদের দেশ থেকে দ্রুত সরানো দরকার, তাও আমরা জানি। আর জেনারেল শওকতকে সরানোর জন্য তোমাদের কাছে আছে কায়রোর এ শূন্য পদটি। সুতরাং তাকে যে এখানেই পাঠাতে হবে, তাতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। আমরা যত দ্রুত সম্ভব অনুমতিপত্র তোমাদের দেব। তারপর বাংলাদেশ অনুমতিপত্র পেল এবং জেনারেল শওকতও মিসরে আমাদের রাষ্ট্রদূত হিসাবে গেলেন।

আশা করি, পাঠক বুঝতে পেরেছেন, ঢাকায় যেসব রাষ্ট্রদূত কাজ করেন, তারা ঠিকই বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের সরকারকে নিয়মিত অবহিত রাখেন। আরও একটু ব্যাখ্যা করে বলা যায়, ওয়াশিংটনে আমাদের রাষ্ট্রদূতের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের চাইতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ঢাকায় তাদের নিজস্ব লোক; তাদের রাষ্ট্রদূতের রিপোর্টকেই তো বেশি বিশ্বাস করার কথা। আমেরিকা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতরা নানাভাবে বাংলাদেশে মানবাধিকারের চরম লংঘনের উল্লেখ বারবার করেছেন; কিন্তু আমাদের নেতা-মন্ত্রীরা এসব হুঁশিয়ারিকে এত বছর গ্রাহ্যই করলেন না! আর এখন তারাই বাতাস গরম করে চলেছেন!

৩.

হেমায়েত তার আলোচ্য বইটিতে তার দীর্ঘ কূটনৈতিক জীবনের কোনো তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা লেখেননি। আমার ধারণা, তিনি ইচ্ছে করেই তা এড়িয়ে গেছেন। বিদেশে আমাদের মিশনে কাজ করেছেন; কিন্তু বিদেশ সফরকারী আমাদের নেতা-মন্ত্রীদের চোটপাটের সম্মুখীন হননি দূতাবাসে কর্মরত আমাদের কর্মকর্তারা, তা হতেই পারে না। আমার খুব মনে পড়ে, ১৯৯১-৯২ সালে আমি যখন নিউইয়র্কে আমাদের জাতিসংঘ মিশনে কাজ করছিলাম, তখন এক বিএনপি নেতা আমাকে নিউইয়র্কে তার থাকার ঠিকানা এবং টেলিফোন নম্বর লিখে রাখতে নির্দেশ দিলেন। লিখে রেখে কী হবে, জিজ্ঞাসা করলে তিনি জবাব দিলেন-প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তাকে ঢাকা থেকে নিউইয়র্কে টেলিফোন করতে পারেন। তাই তার ঠিকানা, টেলিফোন নম্বর আমার জেনে রাখা ভালো। বুঝলাম, তিনি আমাকে তার গুরুত্ব বোঝাচ্ছেন।

হেমায়েত তার বইতে বাংলাদেশে টাটা গ্রুপের তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার সম্ভাব্য বিনিয়োগের প্রাথমিক আলাপ-আলোচনার কথা হালকাভাবে উল্লেখ করেছেন। এ উদ্দেশ্যে রতন টাটার বাংলাদেশ সফরের কথাও তিনি বলেছেন। কিন্তু ‘সারপ্রাইজ অ্যান্ড মোর সারপ্রাইজ’, রতন টাটার ২০০৪ সালের অক্টোবরে তিন দিনের বাংলাদেশ সফরকালে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তার সঙ্গে দেখাই করলেন না!

টাটা গ্রুপের সঙ্গে বিনিয়োগ প্রস্তাব যে বিফলে গেল, তার যুক্তিসংগত কারণ ছিল বলে আমি মনে করি। টাটা গ্রুপ তখন একটি নির্দিষ্ট মূল্যে ৩০ বছর ধরে গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা চেয়েছিল; বাংলাদেশের পক্ষে এমন প্রস্তাবে রাজি হওয়া আত্মঘাতী হতো। কিন্তু রতন টাটার সঙ্গে খালেদা জিয়া দেখাই করলেন না, তার কোনো ব্যাখ্যা তখন বা তার পরও পাওয়া যায়নি।

এ প্রসঙ্গে একটি প্রশ্ন তুলতেই হয়। আমাদের ক্ষমতাসীন সরকারের নেতা-মন্ত্রীরা মুখ খোলার সুযোগ পেলেই সফরকারী বিদেশি বিশিষ্টজনদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার কত কত সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, তার লোভনীয় বর্ণনা দিতে থাকেন। হেমায়েতের বইটি পড়তে পড়তে আমার মনে প্রশ্ন জাগল-এত কাছের এত বড় প্রতিবেশী দেশ; এ দেশের এতসব বড় বড় শিল্প গ্রুপ টাটা, বিরলা, আদানি, মুকেশ আম্বানি-এরা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী নয়? বাংলাদেশের পুঁজিবাদী নামের লুণ্ঠনকারীরা বিষয়টি কি একটু ভেবে দেখবেন?

বাংলাদেশের সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বিএনপি-জামায়াত জামানায় ২০০৪ সালে ওআইসির মহাসচিব পদে প্রার্থী হয়ে কীভাবে গো-হারা হারলেন, তার সংক্ষিপ্ত উল্লেখও আছে বইটিতে। হেমায়েত পরে এ সংস্থায় ডাইরেক্টর জেনারেল ছিলেন, তাই তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিতে পারতেন। এ পরাজয়ের আগে খালেদা জিয়া খুব সম্ভব ১৯৯৪ সালে রোমে বিশ্ব খাদ্য সংস্থায় ডাইরেক্টর জেনারেল পদে তখনকার এক সচিব এবং সিএসপি সালাহউদ্দিন আহমেদকে প্রার্থী করে ১৬৯ ভোটের মধ্যে প্রথম রাউন্ডে দুই ভোট এবং দ্বিতীয় রাউন্ডে এক ভোট পেয়েছিলেন। বাংলাদেশের কূটনীতিতে এ দুটি উদাহরণ আমাদের দেশের জন্য কলঙ্ক হয়ে থাকল; কিন্তু এমন কলঙ্ক কাদের সৃষ্টি ছিল? কোনো পেশাদার কূটনীতিবিদ এ দুজনের কাউকেই প্রার্থী করতে সম্মতি দিতেন না।

৪.

বইটিতে হেমায়েত তার ফরেন সেক্রেটারির জীবন নিয়ে কিছু লেখেননি; অথচ ফরেন সেক্রেটারি হিসাবে তার এ দুই বছরের কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে একটি আলাদা বই হতে পারত। আপাতত বই না হলেও একটি চ্যাপ্টার খুব প্রত্যাশিত ছিল। আশা করি, হেমায়েত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন। আমার ভাবতে খুব খারাপ লাগে, ফরেন সার্ভিসে যারা কাজ করেছেন, তাদের মাত্র পাঁচ-ছয়জন বই লিখেছেন। কিন্তু এ কয়েকজন ছাড়া আরও কয়েকশ কর্মকর্তা তাদের কূটনৈতিক জীবনের তিক্ত-মধুর অভিজ্ঞতাগুলো তুলে ধরেননি। এতে দেশের প্রতিপক্ষ গ্রুপগুলো সুযোগ নিচ্ছে।

হেমায়েত উদ্দিন একটি সুখপাঠ্য বই লিখেছেন, সেজন্য তাকে আন্তরিক অভিনন্দন ও ধন্যবাদ। আশা করি, আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়/ফরেন সার্ভিস একাডেমি এ বইটির কয়েকশ কপি কিনবে এবং কপিগুলো উদারভাবে বিলি-বণ্টনও করবে। তবে এজন্য বইটির দামও কমানো দরকার।

‘শিউলিতলা’, উত্তরা ; শনিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২২

মহিউদ্দিন আহমদ : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব, কলাম লেখক

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন