করবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে

প্রকাশ : ২২ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মো. মনোহর আলী

প্রতীকি ছবি

বাজেট ২০১৮-১৯ আসন্ন। আমাদের সামনে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের স্বপ্ন। তাই এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমাদের প্রচুর ব্যয়ের জন্য অধিক রাজস্বের প্রয়োজন। এ ব্যাপারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উদ্দেশে কিছু সুপারিশ পেশ করছি :

১. জনসংখ্যার অনুপাতে করদাতার সংখ্যা ও কর জিডিপি সন্তোষজনক নয়। তাই কেন্দ্রীয় জরিপ অঞ্চলকে কাজে লাগাতে হবে। সেখানে অর্ধশত পরিদর্শক আছে। এজন্য নতুন করদাতা পুরো বছর যাচাই করা একান্তই প্রয়োজন।

২. নতুন ই-টিন পদ্ধতির অধিক্ষেত্র পুরনো। তাই এটি হালনাগাদ শুরু করতে হবে। কারণ, বর্তমান ঠিকানা অনুযায়ী ই-টিন পুরনো ঠিকানায় পাওয়া যায়। ফলে অধিক্ষেত্র বদলি হয়ে অন্য ঠিকানায় চলে যায়। এজন্য করদাতাকে কর নেটে আনা যায় না। সুতরাং ই-টিনের অধিক্ষেত্র হালনাগাদ করে নতুন ই-টিন দিতে হবে।

৩. কর বিভাগের অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা ও পদোন্নতির নিশ্চয়তা ছাড়া কাজ করানো যায় না। একজন কর্মকর্তাকে দিয়ে ৪টি রেঞ্জ চালানো সঠিক নয়। কারণ রেঞ্জ কর্মকর্তা কর্তৃক সঠিক মনিটরিং না হলে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি ও দ্রুত কর আদায় সন্তোষজনক হয় না। এ ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

৪. স্বনির্ধারণী মামলায় করদাতারা অসহায়। কারণ পেশকার, পরিদর্শক, কর্মকর্তা, রেঞ্জ ও কমিশনার পর্যন্ত নথি চালাচালির জন্য করদাতারা অখুশি। তাই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে মামলা নিষ্পত্তির সম্পূর্ণ দায়িত্ব দিতে হবে এবং এক্ষেত্রে চূড়ান্ত ক্ষমতার সীমা থাকা উচিত।

৫. অফিসে গেলে মনে হয় করদাতা ক্রেতা ও অফিসের লোকজন দোকানদার। তাই ক্রেতাকে নানাভাবে পকেট হাতড়ানোর জন্য এবং দোকানদারদের বাহানার কারণে করদাতা দোকানে যেতে নারাজ। এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নজর দিতে হবে।

৬. জমি ও বাড়ির বিক্রয় মূল্য অগ্নিচূড়া। তাই মূলধন বিক্রয় শহরে ১০ শতাংশ ও বাইরে ৫ শতাংশ উৎসে কর খুবই ফলপ্রসূ হবে। কারণ বাড়িঘর নির্মিত হচ্ছে ব্যাঙের ছাতার মতো।

৭. যানবাহন ও পরিবহন খাতে যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ২০০ গাড়ি রাস্তায় আসে। নিবন্ধন বেশি অথচ ফিটনেস নেয় কমসংখ্যক। এ ব্যাপারে যাচাই করে ব্যবস্থা নিতে হবে। গাড়ির উৎসে কর হার ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার, ২০ থেকে ২৫, ২৫ থেকে ৩০, ৩০ থেকে ৩৫, ৩৫ থেকে ৪০, ৪০ থেকে ৪৫, ৪৫ থেকে ৫০ এভাবে ঊর্ধ্বমুখী হলে রাজস্ব বৃদ্ধি হবে। অনুরূপ বাস, ট্রাক, লঞ্চ ও স্টিমার ইত্যাদির কর হার বাড়াতে হবে।

৮. স্বর্ণ, মিষ্টি ও ফাস্টফুডের দোকান অসংখ্য। অথচ এক্ষেত্রে আয়কর ও ভ্যাট নিুমুখী। এটা যাচাই করা হয়নি। এটা যাচাই করা প্রয়োজন।

৯. বিলাস দ্রব্যের ওপর আমদানি খাতে আয়কর ও ভ্যাট বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। তবে মূলধন যন্ত্রপাতি ও ওষুধের কাঁচামালের ওপর কর শূন্য হওয়া উচিত। রফতানি খাতে উৎসে কর থাকলে বিদেশি বাজার ধরা কঠিন হবে। চীনে রফতানি খাতকে উৎসাহিত করতে উৎপাদন মূল্যের কমে রফতানি করা হয়। সরকার ডাম্পিংয়ের জন্য ভর্তুকি দেয়। তাই রফতানি খাতকে ভর্তুকি দিলে রফতানি আয় বৃদ্ধি পাবে।

১০. ব্যক্তিগত আয়কর সীমা ৩ লাখ করা উচিত। কারণ দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া ও অন্যান্য খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া পরবর্তী কর ধাপের স্তর বৃদ্ধি পেলে কারদাতা কর প্রদানে উৎসাহী হবে। সারচার্জের জন্য মূলধন ৩ কোটি টাকা করা উচিত। ফলে করদাতা পুঁজি দেখাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে।

১১. আপিল ট্রাইব্যুনাল, হাইকোর্ট ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি মামলা নিষ্পত্তির দ্রুত লক্ষ্যে ৫, ১০ ও ১৫ শতাংশ কর জমা দিতে আইন পরিবর্তন করা প্রয়োজন, নতুবা মামলার জট কমবে না। এ ব্যাপারে হাইকোর্টের জন্য বিশেষ কোর্ট গঠন করে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি হলে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে। তবে ওই বেঞ্চে আয়কর বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার থাকা উচিত।

১২. রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য হালখাতার মতো এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য টিফিন ও উৎসাহ বোনাস প্রদান করা উচিত। এর ফলে লক্ষ্যমাত্রা ৩৫ শতাংশ হতে পারে। এছাড়া বন্ধের দিন তাদের কাজ করতে উৎসাহ দিতে হবে।

শেষ কথা, কর অবকাঠামো দ্রুত বৃদ্ধি করে করদাতার জন্য করবান্ধব পরিবেশ অবশ্যই সৃষ্টি করতে হবে।

মো. মনোহর আলী : সাবেক কর কমিশনার, ঢাকা