দূর্বাঘাসও ফেলনা নয়
jugantor
দূর্বাঘাসও ফেলনা নয়

  ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম  

২৫ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমরা অনেকেই জানি, গলফ খেলার মাঠের জন্য দূর্বাঘাসের প্রয়োজন হয়। আরও অনেক ক্ষেত্রেই এ ঘাসের গুরুত্ব রয়েছে। প্রথমে গলফের কথায় আসি। গলফ মাঠের নির্দিষ্ট কোনো আকৃতি থাকে না। বাংলাদেশে ১৪টি গলফ কোর্স রয়েছে। প্রতিটি গলফ কোর্সের আলাদা বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য বিদ্যমান।

যে কোনো বয়সের পুরুষ ও নারী গলফ খেলতে পারে। সাধারণত যে গলফার বলটিকে কম শটে গর্তে ফেলতে পারেন, তিনি তুলনামূলক ভালো খেলোয়াড়। গলফ মাঠের টি, বাংকার, পেনালটি ও পাটিং গ্রিন এরিয়া ছাড়া সব জায়গা ‘জেনারেল এরিয়া’ নামে পরিচিত। মাঠে বিদ্যমান টি, রাফ, ফেয়ারওয়ে ও গ্রিন এরিয়া কার্পেটের মতো ঘাস দ্বারা আবৃত থাকে। গলফ মাঠের এসব জেনারেল এরিয়ায় দূর্বাঘাস ছাড়াও অন্যান্য ঘাসের সমারোহ বিভিন্ন উচ্চতায় দৃশ্যমান থাকে।

এবার আসি দূর্বাঘাসের অন্যান্য গুরুত্ব প্রসঙ্গে। ফসলের মাঠে এ ঘাস আগাছা হিসাবে পরিচিত। কৃষিবিদদের মতে, ফসলের মাঠে যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত গাছ জন্মায়, সেটিকে আগাছা হিসাবে ধরে নেওয়া হয়। ওই আগাছা দমনের জন্য আগাছানাশক প্রয়োগ করা হয়। অনেক সময় ম্যানুয়ালিও আগাছা দমন করা যেতে পারে। দূর্বাঘাস পশুর খাদ্য হিসাবে ব্যবহার ছাড়াও গবেষণায় দেখা যায়, এ ঘাসের জুসে মানুষের জন্যও বহু উপকার রয়েছে।

দূর্বাঘাসের জুস অ্যালকালিং এজেস্ট হিসাবে পাকস্থলীর অ্যাসিডিটি ও আলসার কমাতে সাহায্য করে। অন্যদিকে এ ঘাসের জুস দাঁত ও হাড়ের গঠন মজবুতে সাহায্য করতে পারে। দূর্বাঘাসের জুস মানবদেহে লিভার ও কোষের ভেতর বিষাক্ত দ্রব্যের উপস্থিতি কমাতে সাহায্য করতে পারে। মানবদেহে রেড ব্লাড সেলসে (আরবিসি) অক্সিজেনের সরবরাহ নিশ্চিতকরণে সাহায্য করে থাকে। উল্লেখ্য, যদি মানবদেহে কোনো কারণে আরবিসির পরিমাণ কমে যায়, তাহলে অ্যানিমিয়া দেখা দিতে পারে।

গবেষণায় দেখা যায়, দূর্বাঘাসের জুসে প্রায় ৬৫ শতাংশ ক্লোরোফিল রয়েছে, যা মানবদেহের হিমোগ্লোবিন ও আরবিসির পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। গবেষণায় আরও দেখা যায়, দূর্বাঘাসের জুস মানবদেহের রক্তে সুগারের পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে। রক্তে সুগারের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ডায়াবেটিসের লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বে বছরে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ ডায়াবেটিস রোগে মারা যায়। এছাড়া এ রোগ হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, নার্ভা সিস্টেম ও কিডনির ক্ষতিসহ চোখের মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখে।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, দূর্বাঘাসের জুস মানবদেহের বিষাক্ততা কমিয়েও পানির পরিমাণ বেশি সময় ধরে রাখতে সাহায্য করে। আবার তা ইউরেনারি ট্রাক্টের সংক্রমণ ও কিডনিতে পাথর সৃষ্টিতে বাধা প্রদান করতে পারে। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, দূর্বাঘাসের জুস ফুসফুস পরিষ্কারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, যা পরবর্তীকালে মানুষকে ক্যানসারের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে।

অন্যদিকে মানুষের শরীরের কোনো অংশ কেটে গেলে যদি কেউ দূর্বাঘাসের রস ওই কেটে যাওয়া স্থানে লাগাতে পারে, তাহলে দ্রতগতিতে রক্ত বের হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। দূর্বাঘাসের জুস স্কিন মসৃণ করতেও সহায়তা করে থাকে। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় আরও দেখা যায়, দূর্বাঘাসের জুসে প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে থাকে। মোটা দাগে বলা যায়, দূর্বাঘাস ফসলের জমিতে আগাছা হলেও এটি স্বাস্থ্যগত দিক দিয়ে ব্যাপক ঔষধি গুণসম্পন্ন। আবার খেলার মাঠে সৌন্দর্যবর্ধন ও লনে টার্ফ হিসাবেও দূর্বাঘাসের ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে।

দূর্বাঘাস ইংরেজিতে Burmuda grass নামে পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম Cynodone dactylone। সারা বিশ্বে ৫০টির বেশি বিভিন্ন প্রজাতির দূর্বাঘাস রয়েছে, যা বীজের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে থাকে। অন্যদিকে হাইব্রিড প্রজাতির দূর্বাঘাস, যা স্থানীয় প্রজাতির সঙ্গে ক্রসের মাধ্যমে উৎপাদিত হতে পারে, তা ভেজেটেটিভ অংশের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে থাকে।

দূর্বাঘাস গরমসহিষ্ণু হওয়ায় উষ্ণ অঞ্চলে বেশি জন্মায়। অন্যদিকে শীতপ্রধান অঞ্চলে বৃদ্ধি কম হওয়ায় গলফ কোর্সে অন্য প্রজাতির দূর্বাঘাস পরিলক্ষিত হয়। উদাহরণস্বরূপ বেন্ট, ফেসকো ও রাইঘাস শীতপ্রধান অঞ্চলের গলফ কোর্সে বেশি দেখা যায়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন গলফ কোর্সে ওই প্রজাতির ঘাসই বেশি পরিলক্ষিত হয়। শীতপ্রধান অঞ্চলে ওই প্রজাতির ঘাসগুলোর কার্পেটিংও তুলনামূলকভাবে ভালো হয়। বাংলাদেশের গলফ কোর্সগুলোয় বেশির ভাগ সময় স্থানীয় জাতের দূর্বাঘাসের বৈচিত্র্য বেশি দেখা যায়। যদিও এ ঘাসের রক্ষণবেক্ষণ অনেকটা কঠিন।

দূর্বাঘাস সাধারণত বহুবর্ষজীবী। প্রাকৃতিকভাবে এটি স্টোলনের মাধ্যমে মাটির সমান্তরালে কার্পেটের মতো আকার তৈরি করতে সক্ষম। যদিও কার্পেটিং ঘাসের কাটিংয়ের ওপর অনেকটা নির্ভর করে। ওই ঘাসটি ১০ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, দূর্বাঘাসের শিকড় ৬ ফুট মাটির নিচ পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারে। যদিও প্রায় ৮০ শতাংশ দূর্বাঘাসের শিকড় ৬ ইঞ্চি মাটির গভীরতা পর্যন্ত যেতে পারে। উল্লেখ্য, দূর্বাঘাসের শিকড়ের দৈর্ঘ্য মাটির গঠনের ওপর নির্ভর করে। দূর্বা অনেকটা খরা সহনশীল জাতের ঘাস। অতিরিক্ত পানি ও ছায়া উভয়ই দূর্বাঘাসের জন্য ক্ষতিকর।

সেজন্য সপ্তাহে কমপক্ষে ১ থেকে ১ দশমিক ২৫ ইঞ্চি সেচের প্রয়োজন। দূর্বাঘাসের বৃদ্ধির জন্য মাটিতে কমপক্ষে ৫ থেকে ১০ শতাংশ আর্দ্রতা থাকা উচিত। যদি আর্দ্রতা ৫ শতাংশের নিচে নেমে যায়, তাহলে সেচ দেওয়া অত্যাবশ্যক। নতুবা ঘাস উল্টিং হয়ে মারা যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার দূর্বাঘাসের বৃদ্ধির জন্য মাটির গুণাগুণেরও যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। আদর্শ মাটিতে ৪৫ শতাংশ মিনারেল, ৫ শতাংশ জৈব পদার্থ, ২৫ শতাংশ পানি ও ২৫ শতাংশ বাতাস থাকা উচিত।

যদি কোনো কারণে একটি উপাদানের ভিন্নতা দেখা দেয়, তাহলে ফসলের মতো দূর্বাঘাসেরও বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। দূর্বাঘাসের বৃদ্ধির জন্য মাটিতে ৪০ শতাংশ বালি, ৪০ শতাংশ পলি ও ২০ শতাংশ কাদা থাকা উচিত। অন্যদিকে দূর্বাঘাসে রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণও দেখা যায়। গ্রেব্ল্যাক, পাউডারি, রিং, রাস্ট ও অ্যানথ্রাকনোসসহ ছত্রাকজনিত বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব দূর্বাঘাসে দেখা যায়। এছাড়া এ ঘাসে কাটওয়ার্ম, হোয়াইট গ্রাবস, আর্মিওয়াম এবং কেঁচোসহ বহু প্রজাতির পোকামাকড়ের আক্রমণও পরিলক্ষিত হয়। এসব রোগ ও পোকামাকড় দমনের জন্য সুপারিশকৃত ছত্রাকনাশক ও কীটনাশক প্রয়োগ করা যেতে পারে।

পরিশেষে বলা যেতে পারে, দূর্বাঘাস গলফ খেলার মাঠ ও সৌন্দর্যবর্ধন ছাড়াও ঔষধি গুণাগুণের জন্য বাড়ির আশপাশে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম : সহযোগী অধ্যাপক, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়; সদস্য, বিওএফ গলফ ক্লাব, গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট

mohammad.alam@wsu.edu

দূর্বাঘাসও ফেলনা নয়

 ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম 
২৫ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমরা অনেকেই জানি, গলফ খেলার মাঠের জন্য দূর্বাঘাসের প্রয়োজন হয়। আরও অনেক ক্ষেত্রেই এ ঘাসের গুরুত্ব রয়েছে। প্রথমে গলফের কথায় আসি। গলফ মাঠের নির্দিষ্ট কোনো আকৃতি থাকে না। বাংলাদেশে ১৪টি গলফ কোর্স রয়েছে। প্রতিটি গলফ কোর্সের আলাদা বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য বিদ্যমান।

যে কোনো বয়সের পুরুষ ও নারী গলফ খেলতে পারে। সাধারণত যে গলফার বলটিকে কম শটে গর্তে ফেলতে পারেন, তিনি তুলনামূলক ভালো খেলোয়াড়। গলফ মাঠের টি, বাংকার, পেনালটি ও পাটিং গ্রিন এরিয়া ছাড়া সব জায়গা ‘জেনারেল এরিয়া’ নামে পরিচিত। মাঠে বিদ্যমান টি, রাফ, ফেয়ারওয়ে ও গ্রিন এরিয়া কার্পেটের মতো ঘাস দ্বারা আবৃত থাকে। গলফ মাঠের এসব জেনারেল এরিয়ায় দূর্বাঘাস ছাড়াও অন্যান্য ঘাসের সমারোহ বিভিন্ন উচ্চতায় দৃশ্যমান থাকে।

এবার আসি দূর্বাঘাসের অন্যান্য গুরুত্ব প্রসঙ্গে। ফসলের মাঠে এ ঘাস আগাছা হিসাবে পরিচিত। কৃষিবিদদের মতে, ফসলের মাঠে যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত গাছ জন্মায়, সেটিকে আগাছা হিসাবে ধরে নেওয়া হয়। ওই আগাছা দমনের জন্য আগাছানাশক প্রয়োগ করা হয়। অনেক সময় ম্যানুয়ালিও আগাছা দমন করা যেতে পারে। দূর্বাঘাস পশুর খাদ্য হিসাবে ব্যবহার ছাড়াও গবেষণায় দেখা যায়, এ ঘাসের জুসে মানুষের জন্যও বহু উপকার রয়েছে।

দূর্বাঘাসের জুস অ্যালকালিং এজেস্ট হিসাবে পাকস্থলীর অ্যাসিডিটি ও আলসার কমাতে সাহায্য করে। অন্যদিকে এ ঘাসের জুস দাঁত ও হাড়ের গঠন মজবুতে সাহায্য করতে পারে। দূর্বাঘাসের জুস মানবদেহে লিভার ও কোষের ভেতর বিষাক্ত দ্রব্যের উপস্থিতি কমাতে সাহায্য করতে পারে। মানবদেহে রেড ব্লাড সেলসে (আরবিসি) অক্সিজেনের সরবরাহ নিশ্চিতকরণে সাহায্য করে থাকে। উল্লেখ্য, যদি মানবদেহে কোনো কারণে আরবিসির পরিমাণ কমে যায়, তাহলে অ্যানিমিয়া দেখা দিতে পারে।

গবেষণায় দেখা যায়, দূর্বাঘাসের জুসে প্রায় ৬৫ শতাংশ ক্লোরোফিল রয়েছে, যা মানবদেহের হিমোগ্লোবিন ও আরবিসির পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। গবেষণায় আরও দেখা যায়, দূর্বাঘাসের জুস মানবদেহের রক্তে সুগারের পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে। রক্তে সুগারের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ডায়াবেটিসের লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বে বছরে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ ডায়াবেটিস রোগে মারা যায়। এছাড়া এ রোগ হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, নার্ভা সিস্টেম ও কিডনির ক্ষতিসহ চোখের মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখে।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, দূর্বাঘাসের জুস মানবদেহের বিষাক্ততা কমিয়েও পানির পরিমাণ বেশি সময় ধরে রাখতে সাহায্য করে। আবার তা ইউরেনারি ট্রাক্টের সংক্রমণ ও কিডনিতে পাথর সৃষ্টিতে বাধা প্রদান করতে পারে। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, দূর্বাঘাসের জুস ফুসফুস পরিষ্কারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, যা পরবর্তীকালে মানুষকে ক্যানসারের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে।

অন্যদিকে মানুষের শরীরের কোনো অংশ কেটে গেলে যদি কেউ দূর্বাঘাসের রস ওই কেটে যাওয়া স্থানে লাগাতে পারে, তাহলে দ্রতগতিতে রক্ত বের হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। দূর্বাঘাসের জুস স্কিন মসৃণ করতেও সহায়তা করে থাকে। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় আরও দেখা যায়, দূর্বাঘাসের জুসে প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে থাকে। মোটা দাগে বলা যায়, দূর্বাঘাস ফসলের জমিতে আগাছা হলেও এটি স্বাস্থ্যগত দিক দিয়ে ব্যাপক ঔষধি গুণসম্পন্ন। আবার খেলার মাঠে সৌন্দর্যবর্ধন ও লনে টার্ফ হিসাবেও দূর্বাঘাসের ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে।

দূর্বাঘাস ইংরেজিতে Burmuda grass নামে পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম Cynodone dactylone। সারা বিশ্বে ৫০টির বেশি বিভিন্ন প্রজাতির দূর্বাঘাস রয়েছে, যা বীজের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে থাকে। অন্যদিকে হাইব্রিড প্রজাতির দূর্বাঘাস, যা স্থানীয় প্রজাতির সঙ্গে ক্রসের মাধ্যমে উৎপাদিত হতে পারে, তা ভেজেটেটিভ অংশের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে থাকে।

দূর্বাঘাস গরমসহিষ্ণু হওয়ায় উষ্ণ অঞ্চলে বেশি জন্মায়। অন্যদিকে শীতপ্রধান অঞ্চলে বৃদ্ধি কম হওয়ায় গলফ কোর্সে অন্য প্রজাতির দূর্বাঘাস পরিলক্ষিত হয়। উদাহরণস্বরূপ বেন্ট, ফেসকো ও রাইঘাস শীতপ্রধান অঞ্চলের গলফ কোর্সে বেশি দেখা যায়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন গলফ কোর্সে ওই প্রজাতির ঘাসই বেশি পরিলক্ষিত হয়। শীতপ্রধান অঞ্চলে ওই প্রজাতির ঘাসগুলোর কার্পেটিংও তুলনামূলকভাবে ভালো হয়। বাংলাদেশের গলফ কোর্সগুলোয় বেশির ভাগ সময় স্থানীয় জাতের দূর্বাঘাসের বৈচিত্র্য বেশি দেখা যায়। যদিও এ ঘাসের রক্ষণবেক্ষণ অনেকটা কঠিন।

দূর্বাঘাস সাধারণত বহুবর্ষজীবী। প্রাকৃতিকভাবে এটি স্টোলনের মাধ্যমে মাটির সমান্তরালে কার্পেটের মতো আকার তৈরি করতে সক্ষম। যদিও কার্পেটিং ঘাসের কাটিংয়ের ওপর অনেকটা নির্ভর করে। ওই ঘাসটি ১০ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, দূর্বাঘাসের শিকড় ৬ ফুট মাটির নিচ পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারে। যদিও প্রায় ৮০ শতাংশ দূর্বাঘাসের শিকড় ৬ ইঞ্চি মাটির গভীরতা পর্যন্ত যেতে পারে। উল্লেখ্য, দূর্বাঘাসের শিকড়ের দৈর্ঘ্য মাটির গঠনের ওপর নির্ভর করে। দূর্বা অনেকটা খরা সহনশীল জাতের ঘাস। অতিরিক্ত পানি ও ছায়া উভয়ই দূর্বাঘাসের জন্য ক্ষতিকর।

সেজন্য সপ্তাহে কমপক্ষে ১ থেকে ১ দশমিক ২৫ ইঞ্চি সেচের প্রয়োজন। দূর্বাঘাসের বৃদ্ধির জন্য মাটিতে কমপক্ষে ৫ থেকে ১০ শতাংশ আর্দ্রতা থাকা উচিত। যদি আর্দ্রতা ৫ শতাংশের নিচে নেমে যায়, তাহলে সেচ দেওয়া অত্যাবশ্যক। নতুবা ঘাস উল্টিং হয়ে মারা যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার দূর্বাঘাসের বৃদ্ধির জন্য মাটির গুণাগুণেরও যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। আদর্শ মাটিতে ৪৫ শতাংশ মিনারেল, ৫ শতাংশ জৈব পদার্থ, ২৫ শতাংশ পানি ও ২৫ শতাংশ বাতাস থাকা উচিত।

যদি কোনো কারণে একটি উপাদানের ভিন্নতা দেখা দেয়, তাহলে ফসলের মতো দূর্বাঘাসেরও বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। দূর্বাঘাসের বৃদ্ধির জন্য মাটিতে ৪০ শতাংশ বালি, ৪০ শতাংশ পলি ও ২০ শতাংশ কাদা থাকা উচিত। অন্যদিকে দূর্বাঘাসে রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণও দেখা যায়। গ্রেব্ল্যাক, পাউডারি, রিং, রাস্ট ও অ্যানথ্রাকনোসসহ ছত্রাকজনিত বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব দূর্বাঘাসে দেখা যায়। এছাড়া এ ঘাসে কাটওয়ার্ম, হোয়াইট গ্রাবস, আর্মিওয়াম এবং কেঁচোসহ বহু প্রজাতির পোকামাকড়ের আক্রমণও পরিলক্ষিত হয়। এসব রোগ ও পোকামাকড় দমনের জন্য সুপারিশকৃত ছত্রাকনাশক ও কীটনাশক প্রয়োগ করা যেতে পারে।

পরিশেষে বলা যেতে পারে, দূর্বাঘাস গলফ খেলার মাঠ ও সৌন্দর্যবর্ধন ছাড়াও ঔষধি গুণাগুণের জন্য বাড়ির আশপাশে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম : সহযোগী অধ্যাপক, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়; সদস্য, বিওএফ গলফ ক্লাব, গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট

mohammad.alam@wsu.edu

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন