আপত্তি ও সুপারিশ বিবেচনায় নেওয়া হোক
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
আপত্তি ও সুপারিশ বিবেচনায় নেওয়া হোক

  আবদুল লতিফ মণ্ডল  

২৬ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ১৭ জানুয়ারি মন্ত্রিসভা অনুমোদিত আইনের খসড়াকে ভিত্তি করে তৈরি ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল-২০২২’ গত ২৩ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বিলটি উপস্থাপন করেন।

বিলটি সংসদে তোলার পর নিয়মানুযায়ী সেটি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য এক সপ্তাহের সময় দিয়ে আইন ও সংসদীয় বিষয়াবলি সম্পর্কিত সংসদের স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। সংসদীয় কমিটি প্রতিবেদন দেওয়ার পর বিলটি পাশের জন্য তোলা হবে।

আইনটি প্রণয়নের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কে বিলে বলা হয়েছে, ‘প্রস্তাবিত বিলটি আইনে পরিণত হলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগদান স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হবে, গণতন্ত্র সুসংহত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে এবং জনস্বার্থ সমুন্নত হবে মর্মে আশা করা যায়।’ এদিকে মন্ত্রিসভা অনুমোদিত খসড়া আইনটির বৈশিষ্ট্যাবলি মিডিয়ায় প্রকাশিত হলে তা নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দল, আইন বিশেষজ্ঞ, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার, সুশীলসমাজের সদস্যরা বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। বিলটির বৈশিষ্ট্যাবলি এবং এটির ওপর যেসব বিরূপ মন্তব্য ও সুপারিশ এসেছে তা পর্যালোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অনধিক চারজন কমিশনার নিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের বিধান রয়েছে। আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করবেন মর্মেও সংবিধানে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। দেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত তিনটি রাজনৈতিক দল-আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি ইতঃপূর্বে সিইসি ও অন্যান্য কমিশনার নিয়োগদানে কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

ইসি গঠনে আইন প্রণয়নে বিরোধী রাজনৈতিক দল, আইন বিশেষজ্ঞ, সুশীলসমাজ ও মিডিয়ার জোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন ২০২২’ প্রণয়নে উদ্যোগ নিয়েছে। যে কারণেই হোক, আইনটি প্রণয়নে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার দাবিদার।

জাতীয় সংসদে উত্থাপিত বিলটির বৈশিষ্ট্যাবলির মধ্যে হয়েছে-এক. প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ দিতে একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হবে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নিয়ে গঠিত ছয় সদস্যবিশিষ্ট অনুসন্ধান কমিটির প্রধান হবেন প্রধান বিচারপতি মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারক। সদস্য হিসাবে থাকবেন প্রধান বিচারপতি মনোনীত হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান এবং রাষ্ট্রপতি মনোনীত দুইজন বিশিষ্ট নাগরিক।

দুই. অনুসন্ধান (সার্চ) কমিটি স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করে দায়িত্ব পালন করবে। আইনে বেঁধে দেওয়া যোগ্যতা, অযোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সুনাম বিবেচনা করে সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে। অনুসন্ধান কমিটি সিইসি ও কমিশনারদের প্রতি পদের জন্য দুইজন করে ব্যক্তির নাম সুপারিশ করবে। কমিটি গঠনের ১০ কার্যদিবসের মধ্যে সুপারিশ রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দিতে হবে।

তিন. সার্চ কমিটি সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার পদে যোগ্যদের অনুসন্ধানের জন্য রাজনৈতিক দল এবং পেশাজীবী সংগঠনের কাছ থেকে নাম আহ্বান করতে পারবে।

চার. সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার পদে কাউকে সুপারিশ করতে অনুসন্ধান কমিটি যেসব যোগ্যতা বিবেচনায় নেবে সেগুলো হলো-(ক) তাকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে, (খ) তার বয়স কমপক্ষে পঞ্চাশ বছর হতে হবে, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি, বিচার বিভাগীয়, আধা সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও অন্যান্য পেশায় তার ন্যূনতম ২০ বছর কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

পাঁচ. দেউলিয়া ঘোষিত, বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করা, বা আনুগত্য প্রকাশ করা, নৈতিক স্খলনজনিত, ফৌজদারি অপরাধে যে কোনো মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাজাপ্রাপ্ত এবং আইনের দ্বারা পদাধিকারীকে অযোগ্য ঘোষণা করছে না-এমন পদ ব্যতীত প্রজাতন্ত্রের কর্মে লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত কোনো ব্যক্তি সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগ পাওয়ার অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।

ছয়. সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগদানের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ইতঃপূর্বে গঠিত অনুসন্ধান কমিটির ও তৎকর্তৃক সম্পাদিত কার‌্যাবলি এবং ওই অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সিইসি ও নির্বাচন কমিশনারের নিয়োগ বৈধ ছিল বলে গণ্য হবে এবং এ বিষয়ে কোনো আদালতে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।

সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের খসড়া আইন নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত আইনের খসড়াটি বিল আকারে সংসদে উত্থাপনের আগেই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে সরকার যে আইন করছে, তা জাতির সঙ্গে আরেকটি নাটক। জাতীয় সংসদে বিলটি উত্থাপনের দিন এর বিরোধিতা করে বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ বলেছেন, এটি আইনসিদ্ধ নয়। যে বিলটি আনা হয়েছে তা জনগণের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক দলগুলোর এবং সুশীলসমাজের প্রত্যাশার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তিনি বিলটি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।

সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদা বলেছেন, মনে হচ্ছে খসড়া আইনে অনেক অপূর্ণতা রয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, এটি শুধু সার্চ কমিটি গঠনের জন্য করা হয়েছে। সত্যিকার অর্থে বর্তমান সংসদে জনপ্রতিনিধিত্ব নেই। তাই প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে এ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সবার মতামতের ভিত্তিতে খসড়া আইনটি চূড়ান্ত করা উচিত।

গত ২৩ জানুয়ারি সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, জনগণের সঙ্গে ছলচাতুরী করতে সরকার ইসি আইন বেছে নিয়েছে, এটা তো হতে পারে না। সরকার আগামী নির্বাচনে জয়ের জন্য এটি করেছে। সরকার মনোনীত সার্চ কমিটির মাধ্যমে সরকারের পছন্দের ইসি গঠন হবে। সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, সার্চ কমিটির প্রস্তাবিত নামের তালিকা প্রকাশ করা না হলে তাদের নিয়ে বিতর্কের সুযোগ থাকছে না। জাতীয় সংসদে এসব নাম নিয়ে আলোচনার ব্যবস্থা থাকা দরকার। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, ইসি নিয়োগের প্রক্রিয়া আরও অংশগ্রহণমূলক করা দরকার।

অনুসন্ধান কমিটি গঠনে বিরোধিতার মূল কারণ হলো সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত এ কমিটিতে সাধারণত সরকারের পছন্দসই ব্যক্তিদেরই সিইসি ও কমিশনার পদে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব ওঠে। বর্তমান ও তার অব্যবহিত পূর্বের ইসি গঠনে অনুসন্ধান কমিটি তা-ই করেছে। এবারও যে এ অবস্থার পুনরাবৃত্তি হবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? কথায় আছে, ‘Example is better than precept’, অর্থাৎ নীতিবাক্যের চেয়ে উদাহরণ ভালো।

আমাদের পাশের দেশ শ্রীলংকায় ২০০১ সালে সংবিধান সংশোধনের পর স্পিকারের নেতৃত্বে গঠিত সাংবিধানিক কাউন্সিলের (constitutional council) সুপারিশক্রমেই রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগদানের ব্যবস্থা চালু হয়। এ কাউন্সিলে যাদের সদস্য হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় তারা হলেন-প্রধানমন্ত্রী, সংসদে বিরোধী দলের নেতা, রাষ্ট্রপতি মনোনীত একজন ব্যক্তি, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার যৌথ সুপারিশক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগকৃত পাঁচজন ব্যক্তি এবং সংসদের অধিকাংশ সদস্য মনোনীত একজন সদস্য।

২০১১ সালে সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সাংবিধানিক কাউন্সিলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পার্লামেন্টারি কাউন্সিল। নেপালের বর্তমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত সাংবিধানিক কাউন্সিলের অন্য সদস্যরা হলেন-প্রধান বিচারপতি, স্পিকার, সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা, ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সভাপতি এবং ডেপুটি স্পিকার। এ কাউন্সিল বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগদানে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করে।

আমাদের নির্বাচন কমিশন গঠন আইনে অনুসন্ধান কমিটির বিধান অপরিহার্য মনে হলে এটিকে আরও অংশগ্রহণমূলক করা দরকার। প্রস্তাবিত অনুসন্ধান কমিটিতে রাষ্ট্রপতি মনোনীত দুইজন বিশিষ্ট নাগরিককে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশক্রমেই রাষ্ট্রপতিকে এ দুজনের মনোনয়ন দিতে হবে। তারা স্বাভাবিকভাবেই শাসক দলের ভাবধারা ও আদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তি হবেন। তাই তাদের স্থলে প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দল-আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি মনোনীত তিনজন বিশিষ্ট নাগরিককে (প্রত্যেক দল থেকে একজন করে) অনুসন্ধান কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। মোট কথা, নির্বাচন কমিশনে সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক করতে হবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

স্বদেশ ভাবনা

আপত্তি ও সুপারিশ বিবেচনায় নেওয়া হোক

 আবদুল লতিফ মণ্ডল 
২৬ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ১৭ জানুয়ারি মন্ত্রিসভা অনুমোদিত আইনের খসড়াকে ভিত্তি করে তৈরি ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল-২০২২’ গত ২৩ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বিলটি উপস্থাপন করেন।

বিলটি সংসদে তোলার পর নিয়মানুযায়ী সেটি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য এক সপ্তাহের সময় দিয়ে আইন ও সংসদীয় বিষয়াবলি সম্পর্কিত সংসদের স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। সংসদীয় কমিটি প্রতিবেদন দেওয়ার পর বিলটি পাশের জন্য তোলা হবে।

আইনটি প্রণয়নের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কে বিলে বলা হয়েছে, ‘প্রস্তাবিত বিলটি আইনে পরিণত হলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগদান স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হবে, গণতন্ত্র সুসংহত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে এবং জনস্বার্থ সমুন্নত হবে মর্মে আশা করা যায়।’ এদিকে মন্ত্রিসভা অনুমোদিত খসড়া আইনটির বৈশিষ্ট্যাবলি মিডিয়ায় প্রকাশিত হলে তা নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দল, আইন বিশেষজ্ঞ, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার, সুশীলসমাজের সদস্যরা বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। বিলটির বৈশিষ্ট্যাবলি এবং এটির ওপর যেসব বিরূপ মন্তব্য ও সুপারিশ এসেছে তা পর্যালোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অনধিক চারজন কমিশনার নিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের বিধান রয়েছে। আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করবেন মর্মেও সংবিধানে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। দেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত তিনটি রাজনৈতিক দল-আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি ইতঃপূর্বে সিইসি ও অন্যান্য কমিশনার নিয়োগদানে কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

ইসি গঠনে আইন প্রণয়নে বিরোধী রাজনৈতিক দল, আইন বিশেষজ্ঞ, সুশীলসমাজ ও মিডিয়ার জোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন ২০২২’ প্রণয়নে উদ্যোগ নিয়েছে। যে কারণেই হোক, আইনটি প্রণয়নে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার দাবিদার।

জাতীয় সংসদে উত্থাপিত বিলটির বৈশিষ্ট্যাবলির মধ্যে হয়েছে-এক. প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ দিতে একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হবে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নিয়ে গঠিত ছয় সদস্যবিশিষ্ট অনুসন্ধান কমিটির প্রধান হবেন প্রধান বিচারপতি মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারক। সদস্য হিসাবে থাকবেন প্রধান বিচারপতি মনোনীত হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান এবং রাষ্ট্রপতি মনোনীত দুইজন বিশিষ্ট নাগরিক।

দুই. অনুসন্ধান (সার্চ) কমিটি স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করে দায়িত্ব পালন করবে। আইনে বেঁধে দেওয়া যোগ্যতা, অযোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সুনাম বিবেচনা করে সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে। অনুসন্ধান কমিটি সিইসি ও কমিশনারদের প্রতি পদের জন্য দুইজন করে ব্যক্তির নাম সুপারিশ করবে। কমিটি গঠনের ১০ কার্যদিবসের মধ্যে সুপারিশ রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দিতে হবে।

তিন. সার্চ কমিটি সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার পদে যোগ্যদের অনুসন্ধানের জন্য রাজনৈতিক দল এবং পেশাজীবী সংগঠনের কাছ থেকে নাম আহ্বান করতে পারবে।

চার. সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার পদে কাউকে সুপারিশ করতে অনুসন্ধান কমিটি যেসব যোগ্যতা বিবেচনায় নেবে সেগুলো হলো-(ক) তাকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে, (খ) তার বয়স কমপক্ষে পঞ্চাশ বছর হতে হবে, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি, বিচার বিভাগীয়, আধা সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও অন্যান্য পেশায় তার ন্যূনতম ২০ বছর কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

পাঁচ. দেউলিয়া ঘোষিত, বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করা, বা আনুগত্য প্রকাশ করা, নৈতিক স্খলনজনিত, ফৌজদারি অপরাধে যে কোনো মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাজাপ্রাপ্ত এবং আইনের দ্বারা পদাধিকারীকে অযোগ্য ঘোষণা করছে না-এমন পদ ব্যতীত প্রজাতন্ত্রের কর্মে লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত কোনো ব্যক্তি সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগ পাওয়ার অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।

ছয়. সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগদানের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ইতঃপূর্বে গঠিত অনুসন্ধান কমিটির ও তৎকর্তৃক সম্পাদিত কার‌্যাবলি এবং ওই অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সিইসি ও নির্বাচন কমিশনারের নিয়োগ বৈধ ছিল বলে গণ্য হবে এবং এ বিষয়ে কোনো আদালতে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।

সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের খসড়া আইন নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত আইনের খসড়াটি বিল আকারে সংসদে উত্থাপনের আগেই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে সরকার যে আইন করছে, তা জাতির সঙ্গে আরেকটি নাটক। জাতীয় সংসদে বিলটি উত্থাপনের দিন এর বিরোধিতা করে বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ বলেছেন, এটি আইনসিদ্ধ নয়। যে বিলটি আনা হয়েছে তা জনগণের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক দলগুলোর এবং সুশীলসমাজের প্রত্যাশার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তিনি বিলটি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।

সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদা বলেছেন, মনে হচ্ছে খসড়া আইনে অনেক অপূর্ণতা রয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, এটি শুধু সার্চ কমিটি গঠনের জন্য করা হয়েছে। সত্যিকার অর্থে বর্তমান সংসদে জনপ্রতিনিধিত্ব নেই। তাই প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে এ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সবার মতামতের ভিত্তিতে খসড়া আইনটি চূড়ান্ত করা উচিত।

গত ২৩ জানুয়ারি সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, জনগণের সঙ্গে ছলচাতুরী করতে সরকার ইসি আইন বেছে নিয়েছে, এটা তো হতে পারে না। সরকার আগামী নির্বাচনে জয়ের জন্য এটি করেছে। সরকার মনোনীত সার্চ কমিটির মাধ্যমে সরকারের পছন্দের ইসি গঠন হবে। সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, সার্চ কমিটির প্রস্তাবিত নামের তালিকা প্রকাশ করা না হলে তাদের নিয়ে বিতর্কের সুযোগ থাকছে না। জাতীয় সংসদে এসব নাম নিয়ে আলোচনার ব্যবস্থা থাকা দরকার। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, ইসি নিয়োগের প্রক্রিয়া আরও অংশগ্রহণমূলক করা দরকার।

অনুসন্ধান কমিটি গঠনে বিরোধিতার মূল কারণ হলো সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত এ কমিটিতে সাধারণত সরকারের পছন্দসই ব্যক্তিদেরই সিইসি ও কমিশনার পদে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব ওঠে। বর্তমান ও তার অব্যবহিত পূর্বের ইসি গঠনে অনুসন্ধান কমিটি তা-ই করেছে। এবারও যে এ অবস্থার পুনরাবৃত্তি হবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? কথায় আছে, ‘Example is better than precept’, অর্থাৎ নীতিবাক্যের চেয়ে উদাহরণ ভালো।

আমাদের পাশের দেশ শ্রীলংকায় ২০০১ সালে সংবিধান সংশোধনের পর স্পিকারের নেতৃত্বে গঠিত সাংবিধানিক কাউন্সিলের (constitutional council) সুপারিশক্রমেই রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগদানের ব্যবস্থা চালু হয়। এ কাউন্সিলে যাদের সদস্য হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় তারা হলেন-প্রধানমন্ত্রী, সংসদে বিরোধী দলের নেতা, রাষ্ট্রপতি মনোনীত একজন ব্যক্তি, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার যৌথ সুপারিশক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগকৃত পাঁচজন ব্যক্তি এবং সংসদের অধিকাংশ সদস্য মনোনীত একজন সদস্য।

২০১১ সালে সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সাংবিধানিক কাউন্সিলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পার্লামেন্টারি কাউন্সিল। নেপালের বর্তমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত সাংবিধানিক কাউন্সিলের অন্য সদস্যরা হলেন-প্রধান বিচারপতি, স্পিকার, সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা, ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সভাপতি এবং ডেপুটি স্পিকার। এ কাউন্সিল বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগদানে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করে।

আমাদের নির্বাচন কমিশন গঠন আইনে অনুসন্ধান কমিটির বিধান অপরিহার্য মনে হলে এটিকে আরও অংশগ্রহণমূলক করা দরকার। প্রস্তাবিত অনুসন্ধান কমিটিতে রাষ্ট্রপতি মনোনীত দুইজন বিশিষ্ট নাগরিককে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশক্রমেই রাষ্ট্রপতিকে এ দুজনের মনোনয়ন দিতে হবে। তারা স্বাভাবিকভাবেই শাসক দলের ভাবধারা ও আদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তি হবেন। তাই তাদের স্থলে প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দল-আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি মনোনীত তিনজন বিশিষ্ট নাগরিককে (প্রত্যেক দল থেকে একজন করে) অনুসন্ধান কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। মোট কথা, নির্বাচন কমিশনে সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক করতে হবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন