পুষ্টিকর খাদ্যের নিশ্চয়তা পেতে আর কত অপেক্ষা?
jugantor
পুষ্টিকর খাদ্যের নিশ্চয়তা পেতে আর কত অপেক্ষা?

  মনজু আরা বেগম  

২৭ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সুস্থভাবে বেঁচে থাকা ও জীবনধারণের জন্য প্রতিদিন যে খাবার খাচ্ছি তার অধিকাংশই বিষমিশ্রিত ভেজাল খাদ্য।

এসব ভেজাল খাদ্য খেয়ে আমরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছি প্রতিনিয়ত। একটা সময় ছিল যখন ছিল না আজকের মতো এত হিমাগার বা শীতলকরণ যন্ত্র। প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে একদিকে আমরা অনেক কিছুই পেয়েছি আবার জীবন থেকে অনেক কিছু হারিয়েছি এবং হারাচ্ছি।

সে সময় আমরা পেতাম টাটকা শাকসবজি, ফলমূল-এক কথায় সজীব সব খাবার। সেই খাবারের স্বাদ, পুষ্টিমান আর গন্ধের কথা মনে হলে আজও জিভে পানি আসে। জ্ঞান-বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির উন্নয়ন, উৎকর্ষতার সঙ্গে সঙ্গে মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশ ঘটছে।

উন্নয়ন আর উৎকর্ষতার বিকাশ ঘটলেও মানবতার বিকাশ ঘটছে না। বরং বলা যায় মানবতা হারিয়ে যাচ্ছে। প্রায়ক্ষেত্রে দেখা যায় মানবতা বর্জিত কার্যক্রম। মনুষ্যরূপী কিছু হায়েনার লোভ আর লালসার শিকার হয়ে প্রতিদিন আমরা বিষ মেশানো বিষাক্ত খাবার খেয়ে মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে অস্বাভাবিক মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছি।

ভেজালে সয়লাব আমাদের বাজার। অথচ উন্নত দেশগুলোতে এ ধরনের অনৈতিক কার্যকলাপের কথা তারা চিন্তাই করতে পারে না। খাদ্যে ভেজাল নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হলেও অবস্থার কোনো উন্নতি না হয়ে বরং আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে।

সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য পুষ্টিকর খাদ্য প্রয়োজন। শরীরে পুষ্টি এবং বুদ্ধিবৃত্তির জন্য আমরা আমাদের সন্তানদের সাধ্যের বাইরে হলেও বাজার থেকে অত্যন্ত চড়ামূল্যে পুষ্টিকর খাদ্য ভেবে কিনে খাওয়াচ্ছি। খাওয়ার অনুপযোগী এবং অস্বাস্ব্যকর পরিবেশে তৈরি বিষাক্ত এসব খাদ্যদ্রব্য খাওয়ার ফলে লিভার, কিডনি নষ্ট হচ্ছে। শরীরে নানা রকম জটিল রোগব্যাধির জন্ম নিচ্ছে বিশেষ করে ক্যানসার, কিডনি, হার্ট ফেইলিউর মতো মরণব্যাধির প্রকোপ অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গণমাধ্যমের কল্যাণে জানতে পারছি কতটা বিপন্ন আমাদের জীবন। কতটা অসহায় অবস্থায় প্রতিদিনই বিষাক্ত সব খাবার গ্রহণ করছি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী প্রতিবছর অন্তত ৬০ কোটি মানুষ ভেজাল ও দূষিত খাদ্য গ্রহণের ফলে অসুস্থ হয়। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) এক গবেষণা থেকে জানা যায়, ভেজাল খাদ্যের কারণে প্রতিবছর দেশে কমপক্ষে তিন লাখ মানুষ ক্যানসারে, ২ লাখ কিডনি এবং দেড় লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া ছাড়াও গর্ভবতী নারীরা ১৫ লাখ বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম দিচ্ছে। (৮ মার্চ ২১ দৈনিক যুগান্তর)। বিগত ৩ বছরে বিএসটিআই, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও র‌্যাবসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ৮ হাজার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে। এসব অভিযানে ভেজালের প্রমাণ পাওয়ায় ২৫ হাজার মামলা ও শতকোটি টাকা জরিমানা আদায় করলেও দেশে ভেজালের কারবারে কোনো হেরফের হচ্ছে না।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন আছে কিন্তু তার কোনো প্রয়োগ নেই বা বলা যায় তার কোনো বাস্তবায়ন নেই। এ আইনে ভেজাল ও নিুমানের পণ্য সরবরাহের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির কথা বলা থাকলেও তার কার্যকারিতা নেই। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এসব বিষয় দেখভাল করলেও সংস্থাটি চরম জনবল সংকটে কাজ করছে বলে পত্রিকান্তরে জানা যায়। রাজধানীতে বসবাসরত দুই কোটি মানুষের বাজার তদারকিতে রয়েছেন মাত্র পাঁচজন কর্মকর্তা (১৫.০৯.২১ যুগান্তর)। সংস্থাটির বিদ্যমান জনবল কাঠামোতে ২৪০ জনবলের মধ্যে ১৭ কোটি ভোক্তার অধিকার রক্ষায় মাঠ পর্যায়ে বাজার তদারকিতে রয়েছেন মাত্র ১০৮ জন কর্মকর্তা। এত স্বল্পসংখ্যক জনবল দ্বারা এত বিশাল বাজার নিয়ন্ত্রণ কীভাবে সম্ভব? এছাড়া দেশে খাদ্যদ্রব্যের মাননিয়ন্ত্রণের জন্য বিএসটিআই, পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, বিসিএসআইআরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানেও লোকবলের অভাব এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় ভেজাল নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম যথাযথভাবে হচ্ছে না। এ বিষয়টির দিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকার এমন কোনো খাবার নেই যাতে বিষ মেশানো হচ্ছে না। মাছ, মাংস, চাল, ডাল, আটা, ময়দা, ঘি, চিনি, শুঁটকি, তেল, পাউরুটি, কেক, শাকসবজি, গাজর, শিম, লেটুসপাতা, ক্যাপসিকাম, ফলমূল, কলা, আপেল, আনারস, আম, তরমুজসহ শিশুদের জীবন বাঁচানোর জন্য দুগ্ধজাত বিভিন্ন ধরনের খাদ্য। শিশুখাদ্যসহ দুগ্ধজাত খাদ্যে অলড্রিন নামক বিষাক্ত কীটনাশক পদার্থ মেশানো হচ্ছে। মসলা থেকে শুরু করে, সুগন্ধি, প্রসাধন সামগ্রীসহ এমন কোনো পণ্য নেই যাতে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ মেশানো হচ্ছে না। আটা, চিনি, ময়দার মধ্যে বিষাক্ত চকপাউডার, মরিচ হলুদের গুঁড়ার মধ্যে ইটের গুঁড়া, মাছ, মাংস সবজি, ফলমূলের মধ্যে ফরমালিন, কলা, টমেটো ইত্যাদি কার্বাইড দিয়ে পাকানো হচ্ছে যা বলে শেষ করা যাবে না। অথচ এসব ভেজালে ভরা বিষাক্ত খাদ্য অত্যন্ত চড়া দাম দিয়ে আমরা কিনে খাচ্ছি। রাসায়নিক পরীক্ষাগার না থাকায় স্থলবন্দরগুলোতে আমদানি করা ফলমূলের ফরমালিন পরীক্ষা করা হয় না। চট্টগ্রাম কাস্টমসে পরীক্ষাগার থাকলেও লোকবলের স্বল্পতায় পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে বলে পত্রিকান্তরে জানা যায়। দেশে আমদানিকৃত ফলমূল পরীক্ষা করতে সব স্থলবন্দরে রাসায়নিক পরীক্ষাগার নির্মাণ করতে ২০১২ সালে আদালত দেশের সব স্থল ও নৌবন্দরে ৬ মাসের মধ্যে রাসায়নিক পরীক্ষাগার স্থাপন এবং আমদানিকৃত সব ফলমূল কেমিক্যালমুক্ত করার বিষয়ে এনবিআরকে নির্দেশ দিলেও এর কোনো অগ্রগতি নেই। খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল দেওয়ার প্রধান কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা যায় প্রথমত শিক্ষার অভাব এবং দুর্নীতিগ্রস্ত মানসিকতা। প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত না হওয়ার কারণে যারা উৎপাদনকারী এবং ব্যবসায়ী তাদের মধ্যে ন্যায়-অন্যায়বোধ মানবিক গুণাবলী, সামাজিক দায়বদ্ধতা, ধর্মীয় অনুভূতি ইত্যাদি না থাকায় অবৈধ এবং অনৈতিক উপায়ে কিভাবে চটজলটি অর্থ উপার্জন করে গাড়ি-বাড়ির মালিক হওয়া যায় সে চেষ্টায় তারা মত্ত। অসাধু ব্যবসায়ীরা আমাদের জীবনকে প্রতি মুহূর্তে বিপন্ন করে তুলছে। তারা ভুলে যাচ্ছে, যে বিষ তারা মানুষকে খাওয়াচ্ছে চক্রাকারে সেই বিষের শিকার সে বা তার পরিবারের সদস্যরাও হচ্ছেন। আমরা জেনে শুনে বিষ পান করছি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছি। দেশে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সংঘবদ্ধভাবে অতি মুনাফার লোভে দিনের পর দিন খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল/ বিষ মেশাচ্ছে কিন্তু তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অপরাধের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ফলে আমাদের গড় আয়ু বেড়ে গেলেও ভেজাল খাদ্যগ্রহণের ফলে বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হওয়ায় আমাদের জীবনীশক্তি হ্রাস পাচ্ছে।

খাদ্যে ভেজাল রোধের জন্য জনস্বার্থে সরকারকে যত দ্রুত সম্ভব অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দেশে খাদ্যের মান যাচাই-বাছাইয়ের জন্য শুধু বিএসটিআই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, বিসিএসআইআর কিংবা আণবিক শক্তি কমিশনে নিয়োজিত স্বল্প সংখ্যক জনবলের ওপর নির্ভর না করে অধিক সংখ্যক ‘র‌্যাপিড একশন টাস্কফোর্স’ গঠন করে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক এবং দৃশ্যমান আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

আমরা সুস্থভাবে বাঁচার নিশ্চয়তা চাই। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে এ দেশের মানুষের এটাই এখন একমাত্র এবং অন্যতম চাওয়া।

মনজু আরা বেগম : গবেষক ও অর্থনীতি বিষয়ক বিশ্লেষক

monjuara2006@yahoo.com

পুষ্টিকর খাদ্যের নিশ্চয়তা পেতে আর কত অপেক্ষা?

 মনজু আরা বেগম 
২৭ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সুস্থভাবে বেঁচে থাকা ও জীবনধারণের জন্য প্রতিদিন যে খাবার খাচ্ছি তার অধিকাংশই বিষমিশ্রিত ভেজাল খাদ্য।

এসব ভেজাল খাদ্য খেয়ে আমরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছি প্রতিনিয়ত। একটা সময় ছিল যখন ছিল না আজকের মতো এত হিমাগার বা শীতলকরণ যন্ত্র। প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে একদিকে আমরা অনেক কিছুই পেয়েছি আবার জীবন থেকে অনেক কিছু হারিয়েছি এবং হারাচ্ছি।

সে সময় আমরা পেতাম টাটকা শাকসবজি, ফলমূল-এক কথায় সজীব সব খাবার। সেই খাবারের স্বাদ, পুষ্টিমান আর গন্ধের কথা মনে হলে আজও জিভে পানি আসে। জ্ঞান-বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির উন্নয়ন, উৎকর্ষতার সঙ্গে সঙ্গে মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশ ঘটছে।

উন্নয়ন আর উৎকর্ষতার বিকাশ ঘটলেও মানবতার বিকাশ ঘটছে না। বরং বলা যায় মানবতা হারিয়ে যাচ্ছে। প্রায়ক্ষেত্রে দেখা যায় মানবতা বর্জিত কার্যক্রম। মনুষ্যরূপী কিছু হায়েনার লোভ আর লালসার শিকার হয়ে প্রতিদিন আমরা বিষ মেশানো বিষাক্ত খাবার খেয়ে মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে অস্বাভাবিক মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছি।

ভেজালে সয়লাব আমাদের বাজার। অথচ উন্নত দেশগুলোতে এ ধরনের অনৈতিক কার্যকলাপের কথা তারা চিন্তাই করতে পারে না। খাদ্যে ভেজাল নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হলেও অবস্থার কোনো উন্নতি না হয়ে বরং আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে।

সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য পুষ্টিকর খাদ্য প্রয়োজন। শরীরে পুষ্টি এবং বুদ্ধিবৃত্তির জন্য আমরা আমাদের সন্তানদের সাধ্যের বাইরে হলেও বাজার থেকে অত্যন্ত চড়ামূল্যে পুষ্টিকর খাদ্য ভেবে কিনে খাওয়াচ্ছি। খাওয়ার অনুপযোগী এবং অস্বাস্ব্যকর পরিবেশে তৈরি বিষাক্ত এসব খাদ্যদ্রব্য খাওয়ার ফলে লিভার, কিডনি নষ্ট হচ্ছে। শরীরে নানা রকম জটিল রোগব্যাধির জন্ম নিচ্ছে বিশেষ করে ক্যানসার, কিডনি, হার্ট ফেইলিউর মতো মরণব্যাধির প্রকোপ অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গণমাধ্যমের কল্যাণে জানতে পারছি কতটা বিপন্ন আমাদের জীবন। কতটা অসহায় অবস্থায় প্রতিদিনই বিষাক্ত সব খাবার গ্রহণ করছি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী প্রতিবছর অন্তত ৬০ কোটি মানুষ ভেজাল ও দূষিত খাদ্য গ্রহণের ফলে অসুস্থ হয়। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) এক গবেষণা থেকে জানা যায়, ভেজাল খাদ্যের কারণে প্রতিবছর দেশে কমপক্ষে তিন লাখ মানুষ ক্যানসারে, ২ লাখ কিডনি এবং দেড় লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া ছাড়াও গর্ভবতী নারীরা ১৫ লাখ বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম দিচ্ছে। (৮ মার্চ ২১ দৈনিক যুগান্তর)। বিগত ৩ বছরে বিএসটিআই, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও র‌্যাবসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ৮ হাজার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে। এসব অভিযানে ভেজালের প্রমাণ পাওয়ায় ২৫ হাজার মামলা ও শতকোটি টাকা জরিমানা আদায় করলেও দেশে ভেজালের কারবারে কোনো হেরফের হচ্ছে না।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন আছে কিন্তু তার কোনো প্রয়োগ নেই বা বলা যায় তার কোনো বাস্তবায়ন নেই। এ আইনে ভেজাল ও নিুমানের পণ্য সরবরাহের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির কথা বলা থাকলেও তার কার্যকারিতা নেই। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এসব বিষয় দেখভাল করলেও সংস্থাটি চরম জনবল সংকটে কাজ করছে বলে পত্রিকান্তরে জানা যায়। রাজধানীতে বসবাসরত দুই কোটি মানুষের বাজার তদারকিতে রয়েছেন মাত্র পাঁচজন কর্মকর্তা (১৫.০৯.২১ যুগান্তর)। সংস্থাটির বিদ্যমান জনবল কাঠামোতে ২৪০ জনবলের মধ্যে ১৭ কোটি ভোক্তার অধিকার রক্ষায় মাঠ পর্যায়ে বাজার তদারকিতে রয়েছেন মাত্র ১০৮ জন কর্মকর্তা। এত স্বল্পসংখ্যক জনবল দ্বারা এত বিশাল বাজার নিয়ন্ত্রণ কীভাবে সম্ভব? এছাড়া দেশে খাদ্যদ্রব্যের মাননিয়ন্ত্রণের জন্য বিএসটিআই, পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, বিসিএসআইআরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানেও লোকবলের অভাব এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় ভেজাল নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম যথাযথভাবে হচ্ছে না। এ বিষয়টির দিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকার এমন কোনো খাবার নেই যাতে বিষ মেশানো হচ্ছে না। মাছ, মাংস, চাল, ডাল, আটা, ময়দা, ঘি, চিনি, শুঁটকি, তেল, পাউরুটি, কেক, শাকসবজি, গাজর, শিম, লেটুসপাতা, ক্যাপসিকাম, ফলমূল, কলা, আপেল, আনারস, আম, তরমুজসহ শিশুদের জীবন বাঁচানোর জন্য দুগ্ধজাত বিভিন্ন ধরনের খাদ্য। শিশুখাদ্যসহ দুগ্ধজাত খাদ্যে অলড্রিন নামক বিষাক্ত কীটনাশক পদার্থ মেশানো হচ্ছে। মসলা থেকে শুরু করে, সুগন্ধি, প্রসাধন সামগ্রীসহ এমন কোনো পণ্য নেই যাতে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ মেশানো হচ্ছে না। আটা, চিনি, ময়দার মধ্যে বিষাক্ত চকপাউডার, মরিচ হলুদের গুঁড়ার মধ্যে ইটের গুঁড়া, মাছ, মাংস সবজি, ফলমূলের মধ্যে ফরমালিন, কলা, টমেটো ইত্যাদি কার্বাইড দিয়ে পাকানো হচ্ছে যা বলে শেষ করা যাবে না। অথচ এসব ভেজালে ভরা বিষাক্ত খাদ্য অত্যন্ত চড়া দাম দিয়ে আমরা কিনে খাচ্ছি। রাসায়নিক পরীক্ষাগার না থাকায় স্থলবন্দরগুলোতে আমদানি করা ফলমূলের ফরমালিন পরীক্ষা করা হয় না। চট্টগ্রাম কাস্টমসে পরীক্ষাগার থাকলেও লোকবলের স্বল্পতায় পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে বলে পত্রিকান্তরে জানা যায়। দেশে আমদানিকৃত ফলমূল পরীক্ষা করতে সব স্থলবন্দরে রাসায়নিক পরীক্ষাগার নির্মাণ করতে ২০১২ সালে আদালত দেশের সব স্থল ও নৌবন্দরে ৬ মাসের মধ্যে রাসায়নিক পরীক্ষাগার স্থাপন এবং আমদানিকৃত সব ফলমূল কেমিক্যালমুক্ত করার বিষয়ে এনবিআরকে নির্দেশ দিলেও এর কোনো অগ্রগতি নেই। খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল দেওয়ার প্রধান কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা যায় প্রথমত শিক্ষার অভাব এবং দুর্নীতিগ্রস্ত মানসিকতা। প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত না হওয়ার কারণে যারা উৎপাদনকারী এবং ব্যবসায়ী তাদের মধ্যে ন্যায়-অন্যায়বোধ মানবিক গুণাবলী, সামাজিক দায়বদ্ধতা, ধর্মীয় অনুভূতি ইত্যাদি না থাকায় অবৈধ এবং অনৈতিক উপায়ে কিভাবে চটজলটি অর্থ উপার্জন করে গাড়ি-বাড়ির মালিক হওয়া যায় সে চেষ্টায় তারা মত্ত। অসাধু ব্যবসায়ীরা আমাদের জীবনকে প্রতি মুহূর্তে বিপন্ন করে তুলছে। তারা ভুলে যাচ্ছে, যে বিষ তারা মানুষকে খাওয়াচ্ছে চক্রাকারে সেই বিষের শিকার সে বা তার পরিবারের সদস্যরাও হচ্ছেন। আমরা জেনে শুনে বিষ পান করছি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছি। দেশে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সংঘবদ্ধভাবে অতি মুনাফার লোভে দিনের পর দিন খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল/ বিষ মেশাচ্ছে কিন্তু তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অপরাধের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ফলে আমাদের গড় আয়ু বেড়ে গেলেও ভেজাল খাদ্যগ্রহণের ফলে বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হওয়ায় আমাদের জীবনীশক্তি হ্রাস পাচ্ছে।

খাদ্যে ভেজাল রোধের জন্য জনস্বার্থে সরকারকে যত দ্রুত সম্ভব অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দেশে খাদ্যের মান যাচাই-বাছাইয়ের জন্য শুধু বিএসটিআই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, বিসিএসআইআর কিংবা আণবিক শক্তি কমিশনে নিয়োজিত স্বল্প সংখ্যক জনবলের ওপর নির্ভর না করে অধিক সংখ্যক ‘র‌্যাপিড একশন টাস্কফোর্স’ গঠন করে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক এবং দৃশ্যমান আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

আমরা সুস্থভাবে বাঁচার নিশ্চয়তা চাই। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে এ দেশের মানুষের এটাই এখন একমাত্র এবং অন্যতম চাওয়া।

মনজু আরা বেগম : গবেষক ও অর্থনীতি বিষয়ক বিশ্লেষক

monjuara2006@yahoo.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন