কেমন বাজেট চাই
jugantor
কেমন বাজেট চাই

  মো. ফরিদ উদ্দিন  

১৪ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জনগণের সার্বিক উন্নয়ন ও কল্যাণে আধুনিক রাষ্ট্রকে বহুমুখী উন্নয়ন কাজ করতে হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, প্রতিরক্ষা, ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামোর উন্নয়ন, জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, সামাজিক কল্যাণমূলক কাজ ও সম্পদের বণ্টনের মাধ্যমে সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়ন, যথাযথ আর্থিক ও রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, উন্নয়নের জন্য সম্পদ আহরণ ইত্যাদি।

সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও কর্মসূচির মাধ্যমেই এটি করা সম্ভব। একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশও তার প্রেক্ষিত, পঞ্চবার্ষিক ও বার্ষিক পরিকল্পনা বা কর্মসূচির মাধ্যমে এসব কাজ করছে। এ পরিকল্পনা বা কর্মসূচি প্রণয়নের আগে সমাজ ও অর্থনীতি কেমন বা কোথায় ছিল বা আছে ইত্যাদি যাচাই করা হয়। এ যাচাইয়ের ভিত্তিতে ভবিষ্যতের স্বপ্ন (ভিশন), লক্ষ্য, কৌশল ও কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়।

বাংলাদেশ এসব পরিকল্পনা ও কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে উন্নয়নের পথে অগ্রসর হচ্ছে। এখানে বার্ষিক পরিকল্পনা বার্ষিক বাজেটের মাধ্যমে প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হয়। প্রেক্ষিত, পঞ্চবার্ষিক বা বার্ষিক-যা-ই বলা হোক, যে কোনো পরিকল্পনার লক্ষ্য ও উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য যথাযথ মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি অপরিহার্য। পর্যাপ্ত রাজস্ব আহরণ ও আহরিত রাজস্বের যথাযথ ব্যয় শুধু রাজস্ব নীতি নয়, যে কোনো পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্য।

প্রয়োজনীয় রাজস্ব আহরণ ছাড়াও শিল্প ও বাণিজ্য উন্নয়নে যথোপযুক্ত শুল্ক ও কর নীতি প্রণয়নও রাজস্ব নীতি তথা বার্ষিক পরিকল্পনা/বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। আমাদের দেশের বার্ষিক বাজেটে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীন ১. আমদানি শুল্ক ও কর, ২. স্থানীয় মূল্য সংযোজন কর, (মূসক/ভ্যাট) সম্পূরক শুল্ক, টার্নওভার কর, ৩. আয়কর, করপোরেট কর-এ তিন রকম কর বিষয়েও প্রস্তাবনা প্রণয়নপূর্বক জাতীয় সংসদের বিবেচনা তথা অনুমোদনের জন্য পেশ করা হয়।

শুল্ক ও কর সংক্রান্ত এসব প্রস্তাব সাধারণত এর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত শিল্প খাত, ব্যবসায়ী, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন অংশীজনের থেকে প্রাপ্ত প্রস্তাবাবলি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সরকারের অনুসৃত নীতিতে যথোপযুক্ত মনে হলে সেভাবে পেশ করা হয়। এভাবে বাছাই করতে গিয়ে দেখা যায়-অনেক ভালো প্রস্তাবে সরকারের সম্মতি বা বিবেচনা পাওয়া যায় না।

এর কারণ, রাজস্ব প্রভাব বিষয়ে সরকারের রক্ষণশীল মানসিকতা। সরকার মনে করে, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী বা সুশীল সমাজের ভালো বা উত্তম প্রস্তাব বিবেচনা করা হলে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আহরণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্যবসা-বিনিয়োগে প্রস্তাব যত ভালোই হোক, সরকারের দৃষ্টিতে তা যদি রাজস্ব সহায়ক না হয়, তাহলে সরকার সাধারণত এমন ধরনের কর প্রস্তাব বিবেচনায় নিতে চায় না।

২.

আসন্ন ২০২২-২০২৩ অর্থবছর বিভিন্ন কারণে বিগত সময়ের তুলনায় ভিন্ন। এ বছর একদিকে আন্তর্জাতিক পরিবেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা, অস্বাভাবিকতা যেমন প্রকট, তেমনি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও মুদ্রাস্ফীতিসহ বহুমুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। কাজেই এ অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক ও কর সংক্রান্ত প্রস্তাবাবলি প্রণয়নে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের বিভিন্ন বিষয় যেমন-আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্যের ও ডলারের মূল্য বৃদ্ধি, এ বৃদ্ধির সঙ্গে স্থানীয় বাজারের মুদ্রাস্ফীতির ফলস্বরূপ নিম্ন আয়ের মানুষসহ নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্তের আয় সংকোচন এবং আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অসামঞ্জস্যতা বৃদ্ধি ইত্যাদি বিবেচনায় রাখতে হবে।

তাছাড়া, নিম্নআয়ের মানুষের টিকে থাকার স্বার্থে পরোক্ষ করের ওপর দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা নির্ভরতা কমাতে হবে। অন্যদিকে বাজেটের মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় রাজস্ব আয় অনেক কম। ফলে বাজেট ঘাটতি হচ্ছে। এ অবস্থায় রাজস্ব আয় বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। অধিকন্তু, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ করবে। সে কারণে দেশের আমদানি শুল্ক, কর, স্থানীয় ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক ও আয়কর এবং করপোরেট করে আন্তর্জাতিক মানের দিক থেকে যেসব অসঙ্গতি আছে, তা আগামী চার বছরের মধ্যে যথাসম্ভব যৌক্তিকীকরণ করতে হবে।

৩.

উপর্যুক্ত প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় রেখে আসন্ন ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের বাজেটে আমদানি শুল্ক ও কর, স্থানীয় পণ্য ও সেবার ওপর প্রযোজ্য মূসক-ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক ও আয়কর এবং করপোরেট কর হারে যথাযথ পরিবর্তন ও এর ব্যবস্থাপনায় পর্যায়ক্রমে গুণগত পরিবর্তন আনার সুস্পষ্ট ঘোষণা ও অঙ্গীকার থাকবে বলে প্রত্যাশা।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়-আমদানি পর্যায়ে বর্তমানে পাঁচ ধরনের শুল্ক ও কর প্রযোজ্য আছে। এসব হচ্ছে-কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, আগাম কর, অগ্রিম আয়কর। কাস্টমস শুল্ক আবার ছয় প্রকার-শূন্য (০) হার, ১ শতাংশ, ৫ শতাংশ, ১০ শতাংশ, ১৫ শতাংশ, ২৫ শতাংশ। এ ছাড়া কতিপয় পণ্যে স্পেসিফিক শুল্ক আছে। ২৫ শতাংশ কাস্টমস শুল্কযোগ্য অধিকাংশ পণ্যে ৩ শতাংশ, কতিপয় পণ্যে ৫, ১০, ১৫ শতাংশ হারে রেগুলেটরি ডিউটিও কার্যকর আছে। আমদানির প্রায় ২৬ শতাংশ পণ্যে ৫, ১০, ২০, ৩০, ৪৫, ৬০, ১০০, ২০০, ৩৫০ ইত্যাদি হারে সম্পূরক শুল্ক আছে।

তাছাড়া কতিপয় পণ্য ছাড়া দেশীয় ভোগের জন্য আমদানিকৃত অধিকাংশ পণ্যে ১৫ শতাংশ মূসক-ভ্যাট আছে। নিবন্ধিত উৎপাদকের আমদানিকৃত কাঁচামালসহ বিভিন্ন পণ্যে ৩ শতাংশ হারে আগাম কর প্রযোজ্য। বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে এ হার হচ্ছে ৫ শতাংশ। আগাম কর ও অগ্রিম আয়কর আমদানি পর্যায়ের কর নয়। এ দুটি স্থানীয় ভ্যাট ও আয়করের কর।

আমদানি পর্যায়ে এসব কর আদায়, গণহারে রেগুলেটরি ডিউটি এবং সম্পূরক শুল্ক আরোপ কোনো উত্তম চর্চা নয়। আমদানি পর্যায়ে এ পাঁচ রকম শুল্ক ও কর আরোপিত থাকায় কর ফাঁকির প্রবণতা ব্যাপক। এতে মিথ্যা ঘোষণা, রাজস্ব ফাঁকি ও মানি লন্ডারিং এবং ফলস্বরূপ দুর্নীতি ও হয়রানিও অনেক। কাজেই এসব শুল্ক ও করের সংস্কার অনিবার্য।

৪.

মূসক বা ভ্যাট ব্যবস্থায়ও অনেক বিকৃতি বা সমস্যা আছে। আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির সঙ্গে সঙ্গতি না রেখে দেশে উৎপাদিত পণ্য বা সেবার বিভিন্ন লেনদেন পর্যায়ে প্রধানত শূন্য (০), ২.৫, ৫, ১০, ১৫ শতাংশ হারে বহু হারবিশিষ্ট মূসক-ভ্যাট আরোপিত আছে। এর মধ্যে স্টান্ডার্ড হার হচ্ছে ১৫ শতাংশ। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্তর, কর পরিপালন হার, সর্বস্তরের মানুষের নিম্নআয় ও ফাঁকির ব্যাপকতা ইত্যাদির বিবেচনায় এ দেশে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বেশি বলেই গণ্য।

এভাবে একদিকে ১৫ শতাংশ স্ট্যান্ডার্ড হার, অন্যদিকে বহু হার মানে করের পুনঃপৌনিকতা অর্থাৎ করের ওপর করের প্রাধান্য। বৃহৎ করদাতারাই শুধু এ সিস্টেমের সুবিধা কিছুটা ভোগ করে। বৃহৎ করদাতাদের নিচে অবস্থানকারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাত অর্থাৎ এসএমই খাতভুক্ত অধিকাংশের ক্ষেত্রে ওই বহু হার হচ্ছে করের ওপর কর। এতে তাদের প্রতিযোগিতা ক্ষমতা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে; ভ্যাট পরিপালনে অনীহা অথবা ফাঁকি বাড়ছে। ভ্যাটের বহু হারের পাশাপাশি অনেক পণ্যে আন্তর্জাতিক নিয়মনীতিবহির্ভূতভাবে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা আছে।

শুধু তা-ই নয়, আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির বাইরে গিয়ে অনেক পণ্যে বিভিন্ন হারে ভ্যাট উৎস কর হিসাবে আরোপিত আছে। উৎস কর খাত থেকেই স্থানীয় ভ্যাটে বর্তমানে বেশি রাজস্ব আসে। তাছাড়া, অতি ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তাদের সামর্থ্যরে বাইরে গিয়ে ৪ শতাংশ হারে টার্নওভার কর আরোপিত আছে। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ কর স্বাভাবিক নয়।

৫.

আয়কর ও করপোরেট করের ক্ষেত্রেও একই রকম অনিয়ম ও বিকৃতি চলে আসছে। এ করের মূল কথা হচ্ছে, প্রকৃত আয়ের ভিত্তিতে কর প্রদান। যার যত আয় তার ততো কর। কিন্তু আমাদের দেশে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির কথা মাথায় রেখে আয়কর নীতির মৌলিক বৈশিষ্ট্য থেকে সরে এসে অসংখ্য পণ্য, সেবা খাতে অগ্রিম আয়কর, উৎস কর আরোপিত আছে। এর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, এসব অগ্রিম কর বা উৎস করের মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে করদাতার প্রকৃত আয় বা লাভ লোকসানের ভিত্তিতে প্রদেয় করের সঙ্গে সমন্বয় করতেও দেওয়া হয় না। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট খাতের সাধারণ লাভের সঙ্গে সঙ্গতি না রেখেই এসব অগ্রিম কর বা উৎসে কর অতি উচ্চহারে ধার্য করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে এ কর প্রত্যক্ষ কর না হয়ে পরোক্ষ কর হিসাবে আদায় হচ্ছে। এতে একদিকে প্রকৃত করদাতাকে কর দিতে হচ্ছে না, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট পণ্য বা সেবামূল্য বৃদ্ধি পেয়ে সাধারণ ভোক্তাদের ভোগব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। প্রকৃতপক্ষে এ অবস্থা রাজস্ব, বিনিয়োগ, ভোক্তা ও স্বচ্ছতার জন্য মোটেই ভালো নয়। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের পর এ অবস্থা রাখা যাবে না।

৬.

বর্ণিত প্রেক্ষাপটে আমদানি পর্যায়ে বর্তমানে প্রযোজ্য শুল্ক ও কর আগামী চার বছরের (২০২৬ সালের) মধ্যে আন্তর্জাতিক মানে ও দেশীয় শিল্প ও বাণিজ্যের স্বার্থে পর্যায়ক্রমে যৌক্তিকীকরণ করতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রথমেই দেশীয় শিল্প ও বিনিয়োগের যৌক্তিক প্রতিরক্ষণ ক্ষমতা সংরক্ষণ করতে হবে। শূন্য হারবিশিষ্ট পণ্যগুলোর তালিকা পরীক্ষাপূর্বক যৌক্তিকীকরণ করা দরকার। শিল্প, বাণিজ্য, বস্ত্র মন্ত্রণালয়, ট্যারিফ কমিশনসহ এফবিসিসিআইকে নিয়ে এ কাজটি করা হলে ভালো হবে।

তাছাড়া প্রাথমিকভাবে এ বছর ৩ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি প্রত্যাহার করা যেতে পারে। MFN/National Policy-এর বাইরে গিয়ে অসংখ্য পণ্যে অযৌক্তিকভাবে আরোপিত সম্পূরক শুল্ক সংখ্যায় ও হারে হ্রাস করা সমীচীন হবে। আগাম কর-শিল্পের ক্ষেত্রে ৩ শতাংশের জায়গায় এ বছর ২ শতাংশ, পরবর্তী বছরগুলোতে ১ শতাংশ করে হ্রাসপূর্বক তিন বছরের মধ্যে তুলে দেওয়া যায়।

উপরোক্ত প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করা হলে রাজস্বসহ কোনো খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে কাস্টমস শুল্ক ও আরডি দিয়ে তা সংশোধন বা যৌক্তিকীকরণ করা যায়। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক রীতিবহির্ভূত ও মানি লন্ডারিংয়ে সহায়ক মিনিমাম ভ্যালু শীর্ষক প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহার করা যায়। এতে রাজস্ব হ্রাস পাবে না, বরং মিথ্যা ঘোষণার প্রবণতা ও মামলা হ্রাস পাবে। তদুপরি বাংলা ভাষায় প্রণীত নতুন কাস্টমস অ্যাক্টটি জাতীয় সংসদের অনুমোদন নিয়ে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

৭.

স্থানীয় মূসক-ভ্যাটকে বর্তমানের বহুমুখী বিকৃতি থেকে মুক্ত করতে হবে। সে লক্ষ্যে বর্তমানে প্রযোজ্য বহু হার হ্রাস করে সর্বোচ্চ চারটি হার করা যেতে পারে। বর্তমানের স্ট্যান্ডার্ড হার ১৫ শতাংশ বাংলাদেশের জন্য অনেক বেশি। দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, সিংগাপুর ইত্যাদি দেশের হারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আমাদের দেশে স্ট্যান্ডার্ড ভ্যাটহার সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ হওয়া উচিত। এতে রাজস্ব আয় হ্রাস পাবে না, বরং স্বেচ্ছায় পরিপালন হার বর্তমানের গড় ৩৫-৪০ শতাংশের স্থলে ৮০-৮৫ শতাংশে উন্নীত হবে।

মূসক-ভ্যাট সিস্টেমের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ উৎস কর, আগাম কর পর্যায়ক্রমে আগামী চার বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ তুলে দিতে হবে। এতে মূসক-ভ্যাট ব্যবস্থার বিকৃতি কমে যাবে। স্থানীয় পণ্য ও সেবার ওপর সম্পূরক শুল্ক শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিতে অশোভনীয়, সামাজিকভাবে অনভিপ্রেত এবং অতি বিলাস প্রকৃতির পণ্যে সীমাবদ্ধ রেখে অপরাপর পণ্য, সেবা থেকে তুলে দেওয়া দরকার। ভ্যাটের পদ্ধতিগত বিষয়গুলোও সংস্কার করা দরকার। উল্লিখিত নিরিখে ভ্যাট আইনকে নতুন করে প্রণয়ন করতে হবে।

৮.

২০২৬ সালকে বিবেচনায় রেখে আয়কর ও করপোরেট করের ক্ষেত্রে বর্তমানের প্রায় অচল ও অকার্যকর ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশ বাতিলপূর্বক তদস্থলে করারোপের আদর্শিক নীতিমালা (Principles of Taxation) ভিত্তিক, সহজ-সরল বাংলা ভাষায় একটি আধুনিক আয়কর আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন করা দরকার। বাজেটে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকা দরকার। উল্লেখ্য, সম্প্রতি বাংলা ভাষায় প্রণীত নতুন খসড়া আয়কর আইনটি ১৯৮৪ সালের অধ্যাদেশের অনুবাদ মাত্র বিধায় তা দিয়ে আদর্শ আয়কর আইনের প্রয়োজন পূরণ হবে না।

তাছাড়া বর্তমানের অসংখ্য অগ্রিম কর, উৎসে কর পর্যায়ক্রমে তুলে দিয়ে তদস্থলে আয়কর নীতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে প্রকৃত আয়ের ভিত্তিতে কর আদায়ের বিধান করা দরকার। এতে বিনিয়োগকারীরা উৎসাহিত হবে। সাধারণ মানুষের ওপর অগ্রিম কর ও উৎসে করের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। অগ্রিম কর ও উৎস করগুলোর হার প্রতিটি খাতের সাধারণ লাভ/প্রফিট হারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পুনঃধার্য করতে হবে। বিনিয়োগের সঙ্গে করপোরেট কর হারও যুক্তিযুক্ত করতে হবে। অব্যাহতি খাতগুলো পুনঃপর্যালোচনাপূর্বক বর্তমান পরিস্থিতিতে তা যৌক্তিকীকরণ করা সমীচীন হবে।

৯.

রাজস্বনীতি তথা আমদানি শুল্ক ও কর, স্থানীয় মূসক-ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক, আয়কর ও করপোরেট কর হার সংক্রান্ত উপরোক্ত প্রস্তাব প্রণয়ন ও অনুমোদনই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার ওই নীতিমালার বাস্তবায়ন কীভাবে হচ্ছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশের আমদানি শুল্ক ও কর, স্থানীয় মূসক-ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক এবং আয়কর ও করপোরেট কর সংক্রান্ত নীতিমালা, আইন, বিধির ব্যবস্থাপনায় আমরা তুলনীয় অন্যান্য দেশের থেকে অনেক পিছিয়ে আছি। এর সমাধানে কর ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

এ লক্ষ্যে বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) ও মাঝারি করদাতা ইউনিট (এমটিইউ) সৃষ্টি, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) এখতিয়ার বৃদ্ধি ছাড়াও কাল বিলম্ব না করে ডিজিটালি কানেক্টেড স্বয়ংসম্পূর্ণ সমন্বিত অটোমেটেড রাজস্ব ব্যবস্থাপনা চালু করা অত্যাবশ্যক। এ জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আধুনিকায়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের সুদৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকা দরকার। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ এখনো খুবই পিছিয়ে আছে।

কাস্টমসে এসাইকুডা নামক ডিজিটাল সিস্টেম থাকলেও তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। অন্যদিকে মূসক-ভ্যাট ও আয়কর বিভাগ এ ক্ষেত্রে খুব বেশি পিছিয়ে আছে। সমন্বিত ডিজিটাল সিস্টেমে করদাতা প্রোফাইল ও গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক আধুনিক ঝুঁকি ও নিরীক্ষা ব্যবস্থাপনাও অবশ্যই থাকতে হবে। তাছাড়া রাজস্ব আয় আয়কর খাত থেকে সর্বোচ্চ, তারপর স্থানীয় মূসক-ভ্যাট ও পরিশেষে আমদানি শুল্ক ও কর-এ হারে আসতে হবে। এসব পদক্ষেপ নিলে অদূর ভবিষ্যতে রাজস্ব আয়, তথা কর জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি পাবে। কর সংস্কৃতির উন্নতি হবে। অর্থনৈতিক বৈষম্য, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ব্যাপ্তি হ্রাস পাবে বলে আশা করা যায়।

মো. ফরিদ উদ্দিন : সাবেক সদস্য, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড

কেমন বাজেট চাই

 মো. ফরিদ উদ্দিন 
১৪ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জনগণের সার্বিক উন্নয়ন ও কল্যাণে আধুনিক রাষ্ট্রকে বহুমুখী উন্নয়ন কাজ করতে হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, প্রতিরক্ষা, ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামোর উন্নয়ন, জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, সামাজিক কল্যাণমূলক কাজ ও সম্পদের বণ্টনের মাধ্যমে সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়ন, যথাযথ আর্থিক ও রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, উন্নয়নের জন্য সম্পদ আহরণ ইত্যাদি।

সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও কর্মসূচির মাধ্যমেই এটি করা সম্ভব। একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশও তার প্রেক্ষিত, পঞ্চবার্ষিক ও বার্ষিক পরিকল্পনা বা কর্মসূচির মাধ্যমে এসব কাজ করছে। এ পরিকল্পনা বা কর্মসূচি প্রণয়নের আগে সমাজ ও অর্থনীতি কেমন বা কোথায় ছিল বা আছে ইত্যাদি যাচাই করা হয়। এ যাচাইয়ের ভিত্তিতে ভবিষ্যতের স্বপ্ন (ভিশন), লক্ষ্য, কৌশল ও কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়।

বাংলাদেশ এসব পরিকল্পনা ও কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে উন্নয়নের পথে অগ্রসর হচ্ছে। এখানে বার্ষিক পরিকল্পনা বার্ষিক বাজেটের মাধ্যমে প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হয়। প্রেক্ষিত, পঞ্চবার্ষিক বা বার্ষিক-যা-ই বলা হোক, যে কোনো পরিকল্পনার লক্ষ্য ও উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য যথাযথ মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি অপরিহার্য। পর্যাপ্ত রাজস্ব আহরণ ও আহরিত রাজস্বের যথাযথ ব্যয় শুধু রাজস্ব নীতি নয়, যে কোনো পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্য।

প্রয়োজনীয় রাজস্ব আহরণ ছাড়াও শিল্প ও বাণিজ্য উন্নয়নে যথোপযুক্ত শুল্ক ও কর নীতি প্রণয়নও রাজস্ব নীতি তথা বার্ষিক পরিকল্পনা/বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। আমাদের দেশের বার্ষিক বাজেটে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীন ১. আমদানি শুল্ক ও কর, ২. স্থানীয় মূল্য সংযোজন কর, (মূসক/ভ্যাট) সম্পূরক শুল্ক, টার্নওভার কর, ৩. আয়কর, করপোরেট কর-এ তিন রকম কর বিষয়েও প্রস্তাবনা প্রণয়নপূর্বক জাতীয় সংসদের বিবেচনা তথা অনুমোদনের জন্য পেশ করা হয়।

শুল্ক ও কর সংক্রান্ত এসব প্রস্তাব সাধারণত এর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত শিল্প খাত, ব্যবসায়ী, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন অংশীজনের থেকে প্রাপ্ত প্রস্তাবাবলি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সরকারের অনুসৃত নীতিতে যথোপযুক্ত মনে হলে সেভাবে পেশ করা হয়। এভাবে বাছাই করতে গিয়ে দেখা যায়-অনেক ভালো প্রস্তাবে সরকারের সম্মতি বা বিবেচনা পাওয়া যায় না।

এর কারণ, রাজস্ব প্রভাব বিষয়ে সরকারের রক্ষণশীল মানসিকতা। সরকার মনে করে, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী বা সুশীল সমাজের ভালো বা উত্তম প্রস্তাব বিবেচনা করা হলে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আহরণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্যবসা-বিনিয়োগে প্রস্তাব যত ভালোই হোক, সরকারের দৃষ্টিতে তা যদি রাজস্ব সহায়ক না হয়, তাহলে সরকার সাধারণত এমন ধরনের কর প্রস্তাব বিবেচনায় নিতে চায় না।

২.

আসন্ন ২০২২-২০২৩ অর্থবছর বিভিন্ন কারণে বিগত সময়ের তুলনায় ভিন্ন। এ বছর একদিকে আন্তর্জাতিক পরিবেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা, অস্বাভাবিকতা যেমন প্রকট, তেমনি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও মুদ্রাস্ফীতিসহ বহুমুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। কাজেই এ অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক ও কর সংক্রান্ত প্রস্তাবাবলি প্রণয়নে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের বিভিন্ন বিষয় যেমন-আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্যের ও ডলারের মূল্য বৃদ্ধি, এ বৃদ্ধির সঙ্গে স্থানীয় বাজারের মুদ্রাস্ফীতির ফলস্বরূপ নিম্ন আয়ের মানুষসহ নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্তের আয় সংকোচন এবং আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অসামঞ্জস্যতা বৃদ্ধি ইত্যাদি বিবেচনায় রাখতে হবে।

তাছাড়া, নিম্নআয়ের মানুষের টিকে থাকার স্বার্থে পরোক্ষ করের ওপর দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা নির্ভরতা কমাতে হবে। অন্যদিকে বাজেটের মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় রাজস্ব আয় অনেক কম। ফলে বাজেট ঘাটতি হচ্ছে। এ অবস্থায় রাজস্ব আয় বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। অধিকন্তু, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ করবে। সে কারণে দেশের আমদানি শুল্ক, কর, স্থানীয় ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক ও আয়কর এবং করপোরেট করে আন্তর্জাতিক মানের দিক থেকে যেসব অসঙ্গতি আছে, তা আগামী চার বছরের মধ্যে যথাসম্ভব যৌক্তিকীকরণ করতে হবে।

৩.

উপর্যুক্ত প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় রেখে আসন্ন ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের বাজেটে আমদানি শুল্ক ও কর, স্থানীয় পণ্য ও সেবার ওপর প্রযোজ্য মূসক-ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক ও আয়কর এবং করপোরেট কর হারে যথাযথ পরিবর্তন ও এর ব্যবস্থাপনায় পর্যায়ক্রমে গুণগত পরিবর্তন আনার সুস্পষ্ট ঘোষণা ও অঙ্গীকার থাকবে বলে প্রত্যাশা।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়-আমদানি পর্যায়ে বর্তমানে পাঁচ ধরনের শুল্ক ও কর প্রযোজ্য আছে। এসব হচ্ছে-কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, আগাম কর, অগ্রিম আয়কর। কাস্টমস শুল্ক আবার ছয় প্রকার-শূন্য (০) হার, ১ শতাংশ, ৫ শতাংশ, ১০ শতাংশ, ১৫ শতাংশ, ২৫ শতাংশ। এ ছাড়া কতিপয় পণ্যে স্পেসিফিক শুল্ক আছে। ২৫ শতাংশ কাস্টমস শুল্কযোগ্য অধিকাংশ পণ্যে ৩ শতাংশ, কতিপয় পণ্যে ৫, ১০, ১৫ শতাংশ হারে রেগুলেটরি ডিউটিও কার্যকর আছে। আমদানির প্রায় ২৬ শতাংশ পণ্যে ৫, ১০, ২০, ৩০, ৪৫, ৬০, ১০০, ২০০, ৩৫০ ইত্যাদি হারে সম্পূরক শুল্ক আছে।

তাছাড়া কতিপয় পণ্য ছাড়া দেশীয় ভোগের জন্য আমদানিকৃত অধিকাংশ পণ্যে ১৫ শতাংশ মূসক-ভ্যাট আছে। নিবন্ধিত উৎপাদকের আমদানিকৃত কাঁচামালসহ বিভিন্ন পণ্যে ৩ শতাংশ হারে আগাম কর প্রযোজ্য। বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে এ হার হচ্ছে ৫ শতাংশ। আগাম কর ও অগ্রিম আয়কর আমদানি পর্যায়ের কর নয়। এ দুটি স্থানীয় ভ্যাট ও আয়করের কর।

আমদানি পর্যায়ে এসব কর আদায়, গণহারে রেগুলেটরি ডিউটি এবং সম্পূরক শুল্ক আরোপ কোনো উত্তম চর্চা নয়। আমদানি পর্যায়ে এ পাঁচ রকম শুল্ক ও কর আরোপিত থাকায় কর ফাঁকির প্রবণতা ব্যাপক। এতে মিথ্যা ঘোষণা, রাজস্ব ফাঁকি ও মানি লন্ডারিং এবং ফলস্বরূপ দুর্নীতি ও হয়রানিও অনেক। কাজেই এসব শুল্ক ও করের সংস্কার অনিবার্য।

৪.

মূসক বা ভ্যাট ব্যবস্থায়ও অনেক বিকৃতি বা সমস্যা আছে। আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির সঙ্গে সঙ্গতি না রেখে দেশে উৎপাদিত পণ্য বা সেবার বিভিন্ন লেনদেন পর্যায়ে প্রধানত শূন্য (০), ২.৫, ৫, ১০, ১৫ শতাংশ হারে বহু হারবিশিষ্ট মূসক-ভ্যাট আরোপিত আছে। এর মধ্যে স্টান্ডার্ড হার হচ্ছে ১৫ শতাংশ। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্তর, কর পরিপালন হার, সর্বস্তরের মানুষের নিম্নআয় ও ফাঁকির ব্যাপকতা ইত্যাদির বিবেচনায় এ দেশে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বেশি বলেই গণ্য।

এভাবে একদিকে ১৫ শতাংশ স্ট্যান্ডার্ড হার, অন্যদিকে বহু হার মানে করের পুনঃপৌনিকতা অর্থাৎ করের ওপর করের প্রাধান্য। বৃহৎ করদাতারাই শুধু এ সিস্টেমের সুবিধা কিছুটা ভোগ করে। বৃহৎ করদাতাদের নিচে অবস্থানকারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাত অর্থাৎ এসএমই খাতভুক্ত অধিকাংশের ক্ষেত্রে ওই বহু হার হচ্ছে করের ওপর কর। এতে তাদের প্রতিযোগিতা ক্ষমতা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে; ভ্যাট পরিপালনে অনীহা অথবা ফাঁকি বাড়ছে। ভ্যাটের বহু হারের পাশাপাশি অনেক পণ্যে আন্তর্জাতিক নিয়মনীতিবহির্ভূতভাবে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা আছে।

শুধু তা-ই নয়, আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির বাইরে গিয়ে অনেক পণ্যে বিভিন্ন হারে ভ্যাট উৎস কর হিসাবে আরোপিত আছে। উৎস কর খাত থেকেই স্থানীয় ভ্যাটে বর্তমানে বেশি রাজস্ব আসে। তাছাড়া, অতি ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তাদের সামর্থ্যরে বাইরে গিয়ে ৪ শতাংশ হারে টার্নওভার কর আরোপিত আছে। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ কর স্বাভাবিক নয়।

৫.

আয়কর ও করপোরেট করের ক্ষেত্রেও একই রকম অনিয়ম ও বিকৃতি চলে আসছে। এ করের মূল কথা হচ্ছে, প্রকৃত আয়ের ভিত্তিতে কর প্রদান। যার যত আয় তার ততো কর। কিন্তু আমাদের দেশে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির কথা মাথায় রেখে আয়কর নীতির মৌলিক বৈশিষ্ট্য থেকে সরে এসে অসংখ্য পণ্য, সেবা খাতে অগ্রিম আয়কর, উৎস কর আরোপিত আছে। এর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, এসব অগ্রিম কর বা উৎস করের মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে করদাতার প্রকৃত আয় বা লাভ লোকসানের ভিত্তিতে প্রদেয় করের সঙ্গে সমন্বয় করতেও দেওয়া হয় না। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট খাতের সাধারণ লাভের সঙ্গে সঙ্গতি না রেখেই এসব অগ্রিম কর বা উৎসে কর অতি উচ্চহারে ধার্য করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে এ কর প্রত্যক্ষ কর না হয়ে পরোক্ষ কর হিসাবে আদায় হচ্ছে। এতে একদিকে প্রকৃত করদাতাকে কর দিতে হচ্ছে না, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট পণ্য বা সেবামূল্য বৃদ্ধি পেয়ে সাধারণ ভোক্তাদের ভোগব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। প্রকৃতপক্ষে এ অবস্থা রাজস্ব, বিনিয়োগ, ভোক্তা ও স্বচ্ছতার জন্য মোটেই ভালো নয়। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের পর এ অবস্থা রাখা যাবে না।

৬.

বর্ণিত প্রেক্ষাপটে আমদানি পর্যায়ে বর্তমানে প্রযোজ্য শুল্ক ও কর আগামী চার বছরের (২০২৬ সালের) মধ্যে আন্তর্জাতিক মানে ও দেশীয় শিল্প ও বাণিজ্যের স্বার্থে পর্যায়ক্রমে যৌক্তিকীকরণ করতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রথমেই দেশীয় শিল্প ও বিনিয়োগের যৌক্তিক প্রতিরক্ষণ ক্ষমতা সংরক্ষণ করতে হবে। শূন্য হারবিশিষ্ট পণ্যগুলোর তালিকা পরীক্ষাপূর্বক যৌক্তিকীকরণ করা দরকার। শিল্প, বাণিজ্য, বস্ত্র মন্ত্রণালয়, ট্যারিফ কমিশনসহ এফবিসিসিআইকে নিয়ে এ কাজটি করা হলে ভালো হবে।

তাছাড়া প্রাথমিকভাবে এ বছর ৩ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি প্রত্যাহার করা যেতে পারে। MFN/National Policy-এর বাইরে গিয়ে অসংখ্য পণ্যে অযৌক্তিকভাবে আরোপিত সম্পূরক শুল্ক সংখ্যায় ও হারে হ্রাস করা সমীচীন হবে। আগাম কর-শিল্পের ক্ষেত্রে ৩ শতাংশের জায়গায় এ বছর ২ শতাংশ, পরবর্তী বছরগুলোতে ১ শতাংশ করে হ্রাসপূর্বক তিন বছরের মধ্যে তুলে দেওয়া যায়।

উপরোক্ত প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করা হলে রাজস্বসহ কোনো খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে কাস্টমস শুল্ক ও আরডি দিয়ে তা সংশোধন বা যৌক্তিকীকরণ করা যায়। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক রীতিবহির্ভূত ও মানি লন্ডারিংয়ে সহায়ক মিনিমাম ভ্যালু শীর্ষক প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহার করা যায়। এতে রাজস্ব হ্রাস পাবে না, বরং মিথ্যা ঘোষণার প্রবণতা ও মামলা হ্রাস পাবে। তদুপরি বাংলা ভাষায় প্রণীত নতুন কাস্টমস অ্যাক্টটি জাতীয় সংসদের অনুমোদন নিয়ে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

৭.

স্থানীয় মূসক-ভ্যাটকে বর্তমানের বহুমুখী বিকৃতি থেকে মুক্ত করতে হবে। সে লক্ষ্যে বর্তমানে প্রযোজ্য বহু হার হ্রাস করে সর্বোচ্চ চারটি হার করা যেতে পারে। বর্তমানের স্ট্যান্ডার্ড হার ১৫ শতাংশ বাংলাদেশের জন্য অনেক বেশি। দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, সিংগাপুর ইত্যাদি দেশের হারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আমাদের দেশে স্ট্যান্ডার্ড ভ্যাটহার সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ হওয়া উচিত। এতে রাজস্ব আয় হ্রাস পাবে না, বরং স্বেচ্ছায় পরিপালন হার বর্তমানের গড় ৩৫-৪০ শতাংশের স্থলে ৮০-৮৫ শতাংশে উন্নীত হবে।

মূসক-ভ্যাট সিস্টেমের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ উৎস কর, আগাম কর পর্যায়ক্রমে আগামী চার বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ তুলে দিতে হবে। এতে মূসক-ভ্যাট ব্যবস্থার বিকৃতি কমে যাবে। স্থানীয় পণ্য ও সেবার ওপর সম্পূরক শুল্ক শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিতে অশোভনীয়, সামাজিকভাবে অনভিপ্রেত এবং অতি বিলাস প্রকৃতির পণ্যে সীমাবদ্ধ রেখে অপরাপর পণ্য, সেবা থেকে তুলে দেওয়া দরকার। ভ্যাটের পদ্ধতিগত বিষয়গুলোও সংস্কার করা দরকার। উল্লিখিত নিরিখে ভ্যাট আইনকে নতুন করে প্রণয়ন করতে হবে।

৮.

২০২৬ সালকে বিবেচনায় রেখে আয়কর ও করপোরেট করের ক্ষেত্রে বর্তমানের প্রায় অচল ও অকার্যকর ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশ বাতিলপূর্বক তদস্থলে করারোপের আদর্শিক নীতিমালা (Principles of Taxation) ভিত্তিক, সহজ-সরল বাংলা ভাষায় একটি আধুনিক আয়কর আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন করা দরকার। বাজেটে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকা দরকার। উল্লেখ্য, সম্প্রতি বাংলা ভাষায় প্রণীত নতুন খসড়া আয়কর আইনটি ১৯৮৪ সালের অধ্যাদেশের অনুবাদ মাত্র বিধায় তা দিয়ে আদর্শ আয়কর আইনের প্রয়োজন পূরণ হবে না।

তাছাড়া বর্তমানের অসংখ্য অগ্রিম কর, উৎসে কর পর্যায়ক্রমে তুলে দিয়ে তদস্থলে আয়কর নীতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে প্রকৃত আয়ের ভিত্তিতে কর আদায়ের বিধান করা দরকার। এতে বিনিয়োগকারীরা উৎসাহিত হবে। সাধারণ মানুষের ওপর অগ্রিম কর ও উৎসে করের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। অগ্রিম কর ও উৎস করগুলোর হার প্রতিটি খাতের সাধারণ লাভ/প্রফিট হারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পুনঃধার্য করতে হবে। বিনিয়োগের সঙ্গে করপোরেট কর হারও যুক্তিযুক্ত করতে হবে। অব্যাহতি খাতগুলো পুনঃপর্যালোচনাপূর্বক বর্তমান পরিস্থিতিতে তা যৌক্তিকীকরণ করা সমীচীন হবে।

৯.

রাজস্বনীতি তথা আমদানি শুল্ক ও কর, স্থানীয় মূসক-ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক, আয়কর ও করপোরেট কর হার সংক্রান্ত উপরোক্ত প্রস্তাব প্রণয়ন ও অনুমোদনই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার ওই নীতিমালার বাস্তবায়ন কীভাবে হচ্ছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশের আমদানি শুল্ক ও কর, স্থানীয় মূসক-ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক এবং আয়কর ও করপোরেট কর সংক্রান্ত নীতিমালা, আইন, বিধির ব্যবস্থাপনায় আমরা তুলনীয় অন্যান্য দেশের থেকে অনেক পিছিয়ে আছি। এর সমাধানে কর ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

এ লক্ষ্যে বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) ও মাঝারি করদাতা ইউনিট (এমটিইউ) সৃষ্টি, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) এখতিয়ার বৃদ্ধি ছাড়াও কাল বিলম্ব না করে ডিজিটালি কানেক্টেড স্বয়ংসম্পূর্ণ সমন্বিত অটোমেটেড রাজস্ব ব্যবস্থাপনা চালু করা অত্যাবশ্যক। এ জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আধুনিকায়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের সুদৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকা দরকার। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ এখনো খুবই পিছিয়ে আছে।

কাস্টমসে এসাইকুডা নামক ডিজিটাল সিস্টেম থাকলেও তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। অন্যদিকে মূসক-ভ্যাট ও আয়কর বিভাগ এ ক্ষেত্রে খুব বেশি পিছিয়ে আছে। সমন্বিত ডিজিটাল সিস্টেমে করদাতা প্রোফাইল ও গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক আধুনিক ঝুঁকি ও নিরীক্ষা ব্যবস্থাপনাও অবশ্যই থাকতে হবে। তাছাড়া রাজস্ব আয় আয়কর খাত থেকে সর্বোচ্চ, তারপর স্থানীয় মূসক-ভ্যাট ও পরিশেষে আমদানি শুল্ক ও কর-এ হারে আসতে হবে। এসব পদক্ষেপ নিলে অদূর ভবিষ্যতে রাজস্ব আয়, তথা কর জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি পাবে। কর সংস্কৃতির উন্নতি হবে। অর্থনৈতিক বৈষম্য, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ব্যাপ্তি হ্রাস পাবে বলে আশা করা যায়।

মো. ফরিদ উদ্দিন : সাবেক সদস্য, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন