বিস্তারিত তদন্ত হওয়া দরকার
jugantor
বিস্তারিত তদন্ত হওয়া দরকার

  বদিউর রহমান  

১৭ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বহুল আলোচিত ব্যক্তি প্রশান্ত কুমার হালদারের (পিকে হালদার) জালিয়াতির বিষয়টি বিশ্লেষণের আগে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে অবক্ষয় সৃষ্টি হয়েছে; অতীতে জালিয়াতির যেসব দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে; মানুষের নীতি-নৈতিকতার চর্চায় যে পরিবর্তন এসেছে, সেদিকেও দৃষ্টি দেওয়া দরকার। আমাদের সমাজে দুর্নীতি এমনভাবে বিস্তার লাভ করেছে যে এটি বড় উদ্বেগের বিষয়।

একজন সাধারণ কর্মচারীর দুর্নীতি-জালিয়াতি আর একজন উচ্চশিক্ষিত, উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির দুর্নীতি-জালিয়াতি এক দৃষ্টিতে দেখার কোনো অবকাশ নেই। মানুষ যে কোনো দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখতে চায়। এর ব্যত্যয় ঘটলে মানুষ হতাশ হয়। অতীতের আলোচিত-সমালোচিত সব দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে কি? এক্ষেত্রে বিলম্ব হলে এর কারণও মানুষকে জানানো দরকার। বস্তুত দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে সাধারণ মানুষ হতাশ হয়, একইসঙ্গে নতুন দুর্নীতিবাজরা উৎসাহিত হয়।

আমরা লক্ষ করেছি, দুর্নীতি-জালিয়াতির ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন পিকে হালদার। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। একজন ব্যক্তি কী করে দেশের আর্থিক খাতে এমন জোরালো থাবা দিতে পারলেন, এটি এখন বিশেষ আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বস্তুত একজন ব্যক্তি যে এত বড় জালিয়াতি করে পালিয়ে বেড়াতে পারেন, এ বিষয়েও নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন পিকে হালদার। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পিকে হালদারের গ্রেফতারের খবরে জনমনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। সবাই আশা করছে, তাকে অতি দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। দেশে ফিরিয়ে আনার পর পিকে হালদার নতুন করে কোনো কৌশল অবলম্বন করে দণ্ড লঘু করা বা পার পাওয়ার চেষ্টা করবেন কিনা, সেদিকেও রয়েছে মানুষের সতর্ক দৃষ্টি।

আমরা জানি, যে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ ঋণ নেওয়ার যথাযথ নিয়ম রয়েছে। এসব প্রক্রিয়ায় এত বেশি নিয়মকানুন রয়েছে যে, কোনো কোনো গ্রাহক ঋণ উত্তোলন করতে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ম-কানুনগুলোকে বাড়াবাড়িও মনে করেন। বিষয়টি আরও একটু স্পষ্ট করা দরকার। একজন গ্রাহক ব্যাংক থেকে অর্থ ঋণ নিতে গেলে ব্যাংক গ্রাহকের কাছ থেকে এমনভাবে সম্পত্তির দলিল গ্রহণ করেন যে, কোনো কারণে গ্রাহক ব্যাংকের ঋণ সময়মতো শোধ করতে অক্ষম হলে বা গ্রাহক মারা গেলে বন্ধক রাখা সেই সম্পত্তি বিক্রি করে ব্যাংক গ্রাহককে দেওয়া অর্থ আদায় করতে পারে। এরপরও রয়েছে আরও নানাবিধ নিয়ম-কানুন। যেমন ঋণগ্রহীতা বয়সে প্রবীণ হলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ঋণগ্রহীতার বাইরেও এক বা একাধিক ব্যক্তিকে সিকিউরিটি হিসাবে যুক্ত রাখে, যাতে গ্রাহক ঋণ শোধে অক্ষম হলে বা মারা গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সহযোগিতায় ব্যাংকের ঋণ আদায় সহজ হয়।

এ ক্ষেত্রে ভুয়া দলিলাদি প্রদান করা হলে তা যাচাই-বাছাইয়েরও বিশেষ প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু আমরা অবাক হয়ে যাই দেখে যে, পিকে হালদার একের পর এক অনিয়ম করেছেন; অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। অস্তিত্বহীন কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য কেউ ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করলে ভুয়া দলিলের বিষয়টি ধরা পড়তে বেশি সময় লাগে না। অথচ পিকে হালদার কী এমন জাদু জানতেন যে তিনি একের পর এক অনিয়ম ও জালিয়াতি করলেন, অথচ কেউ বুঝতে পারলেন না?

ইতোমধ্যে জানা গেছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের ক্ষেত্রে পিকে হালদার তার আত্মীয় ও বন্ধু-বান্ধবসহ কয়েক ডজন ব্যক্তিকে ব্যবহার করেছেন। এ সহযোগীদের নিয়েই তিনি আর্থিক খাতে এ জালিয়াতি করতে সক্ষম হয়েছেন। পিকে হালদারের সহযোগীদের মধ্যেও কেউ কেউ ছিলেন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কেউ কেউ প্রভাবশালী। পিকে হালদার ও তার সহযোগীদের প্রভাব ও কূটকৌশলে এ বিপুল অঙ্গের অর্থ নয়ছয় করা হলো আর আমাদের এত এত সংস্থার কেউ তা বুঝতে পারলেন না, এটি বিস্ময়কর।

পিকে হালদার বিপুল পরিমাণ অর্থ কেবল আত্মসাৎই করেননি, আত্মসাৎকৃত বিপুল অঙ্কের অর্থ বিদেশেও পাচার করেছেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন। প্রশ্ন হলো, একজন ব্যক্তি উচ্চপদে কর্মরত থাকলেই কি কৌশলে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা সম্ভব? ধারণা করা হচ্ছে, আত্মসাৎকৃত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

পিকে হালদারের সব বেআইনি কাজে কারা কীভাবে সহায়তা করেছে, তার বিস্তারিত তদন্ত হওয়া দরকার। তা না হলে দেশে নতুন করে আরও অনেকে এমন অপরাধে যুক্ত হতে উৎসাহী হবে। জানা গেছে, কাগুজে কিছু প্রতিষ্ঠান তৈরি করে পিকে হালদার আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল অর্থ ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। একের পর এক জালিয়াতি করলেও পিকে হালদারের অনিয়মগুলো কেন কারও চোখে ধরা পড়ল না, তা নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই।

জানা গেছে, পিকে হালদার একজন দর্জির ছেলে। তার মা ছিলেন স্কুলশিক্ষক। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে ডিগ্রি অর্জনের কারণে তার ওপর এলাকাবাসীর প্রত্যাশা অনেক বাড়লেও পিকে হালদার মানুষের সে আশা তো পূরণ করলেনই না, বরং তিনি এমন কাজ করলেন যে, এলাকাবাসী এখন তার কর্মকাণ্ড নিয়ে লজ্জিত।

পিকে হালদারের গ্রেফতারের খবরে দেশে অতীতে যারা বিভিন্ন অপরাধের কারণে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছিলেন, তাদের নাম এবং কর্মকাণ্ড আবারও আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এমন প্রশ্নও দেখা দিয়েছে যে, নতুন কোনো বড় ঘটনার খবর প্রকাশের পরপর পিকে হালদার বিষয়ক আলোচনা কি স্তিমিত হয়ে যাবে? দেশের মানুষ স্বস্তি চায়। মানুষ এমন অপরাধীর নাম শুনতে চায় না। যে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে, মানুষ এটাই দেখতে চায়। অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে দেরি করা হলে মানুষ হতাশ হয়।

দেশে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকলে সরকারের বিভিন্ন কাজের জোরালো সমালোচনা করলে দেশে অপরাধের মাত্রা কমবে, মানুষ এমনটাই মনে করে। বড় অপরাধের ঘটনায় লঘুদণ্ড প্রদান করা হলে অন্য অপরাধীরা উৎসাহী হতে পারে। বস্তুত কোনো অপরাধীই যাতে পার পেতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। পিকে হালদারকে যেহেতু ভারতে গ্রেফতার করা হয়েছে, তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে একটি বিশেষ প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হবে। তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ নেওয়া হবে, মানুষ তা-ই দেখতে চায়।

পিকে হালদারসহ তাকে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাদের সবাইকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে, দেশের মানুষ এটাই চায়। অপরাধীরা যাতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা না পায় তা নিশ্চিত করা জরুরি। সব ধরনের দুর্নীতি, অনিয়ম ও জালিয়াতি ঠেকাতে দেশে সর্বক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করা দরকার। দুর্নীতিবাজদের সামাজিকভাবেও বয়কট করতে হবে।

বদিউর রহমান : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

বিস্তারিত তদন্ত হওয়া দরকার

 বদিউর রহমান 
১৭ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বহুল আলোচিত ব্যক্তি প্রশান্ত কুমার হালদারের (পিকে হালদার) জালিয়াতির বিষয়টি বিশ্লেষণের আগে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে অবক্ষয় সৃষ্টি হয়েছে; অতীতে জালিয়াতির যেসব দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে; মানুষের নীতি-নৈতিকতার চর্চায় যে পরিবর্তন এসেছে, সেদিকেও দৃষ্টি দেওয়া দরকার। আমাদের সমাজে দুর্নীতি এমনভাবে বিস্তার লাভ করেছে যে এটি বড় উদ্বেগের বিষয়।

একজন সাধারণ কর্মচারীর দুর্নীতি-জালিয়াতি আর একজন উচ্চশিক্ষিত, উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির দুর্নীতি-জালিয়াতি এক দৃষ্টিতে দেখার কোনো অবকাশ নেই। মানুষ যে কোনো দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখতে চায়। এর ব্যত্যয় ঘটলে মানুষ হতাশ হয়। অতীতের আলোচিত-সমালোচিত সব দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে কি? এক্ষেত্রে বিলম্ব হলে এর কারণও মানুষকে জানানো দরকার। বস্তুত দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে সাধারণ মানুষ হতাশ হয়, একইসঙ্গে নতুন দুর্নীতিবাজরা উৎসাহিত হয়।

আমরা লক্ষ করেছি, দুর্নীতি-জালিয়াতির ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন পিকে হালদার। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। একজন ব্যক্তি কী করে দেশের আর্থিক খাতে এমন জোরালো থাবা দিতে পারলেন, এটি এখন বিশেষ আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বস্তুত একজন ব্যক্তি যে এত বড় জালিয়াতি করে পালিয়ে বেড়াতে পারেন, এ বিষয়েও নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন পিকে হালদার। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পিকে হালদারের গ্রেফতারের খবরে জনমনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। সবাই আশা করছে, তাকে অতি দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। দেশে ফিরিয়ে আনার পর পিকে হালদার নতুন করে কোনো কৌশল অবলম্বন করে দণ্ড লঘু করা বা পার পাওয়ার চেষ্টা করবেন কিনা, সেদিকেও রয়েছে মানুষের সতর্ক দৃষ্টি।

আমরা জানি, যে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ ঋণ নেওয়ার যথাযথ নিয়ম রয়েছে। এসব প্রক্রিয়ায় এত বেশি নিয়মকানুন রয়েছে যে, কোনো কোনো গ্রাহক ঋণ উত্তোলন করতে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ম-কানুনগুলোকে বাড়াবাড়িও মনে করেন। বিষয়টি আরও একটু স্পষ্ট করা দরকার। একজন গ্রাহক ব্যাংক থেকে অর্থ ঋণ নিতে গেলে ব্যাংক গ্রাহকের কাছ থেকে এমনভাবে সম্পত্তির দলিল গ্রহণ করেন যে, কোনো কারণে গ্রাহক ব্যাংকের ঋণ সময়মতো শোধ করতে অক্ষম হলে বা গ্রাহক মারা গেলে বন্ধক রাখা সেই সম্পত্তি বিক্রি করে ব্যাংক গ্রাহককে দেওয়া অর্থ আদায় করতে পারে। এরপরও রয়েছে আরও নানাবিধ নিয়ম-কানুন। যেমন ঋণগ্রহীতা বয়সে প্রবীণ হলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ঋণগ্রহীতার বাইরেও এক বা একাধিক ব্যক্তিকে সিকিউরিটি হিসাবে যুক্ত রাখে, যাতে গ্রাহক ঋণ শোধে অক্ষম হলে বা মারা গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সহযোগিতায় ব্যাংকের ঋণ আদায় সহজ হয়।

এ ক্ষেত্রে ভুয়া দলিলাদি প্রদান করা হলে তা যাচাই-বাছাইয়েরও বিশেষ প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু আমরা অবাক হয়ে যাই দেখে যে, পিকে হালদার একের পর এক অনিয়ম করেছেন; অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। অস্তিত্বহীন কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য কেউ ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করলে ভুয়া দলিলের বিষয়টি ধরা পড়তে বেশি সময় লাগে না। অথচ পিকে হালদার কী এমন জাদু জানতেন যে তিনি একের পর এক অনিয়ম ও জালিয়াতি করলেন, অথচ কেউ বুঝতে পারলেন না?

ইতোমধ্যে জানা গেছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের ক্ষেত্রে পিকে হালদার তার আত্মীয় ও বন্ধু-বান্ধবসহ কয়েক ডজন ব্যক্তিকে ব্যবহার করেছেন। এ সহযোগীদের নিয়েই তিনি আর্থিক খাতে এ জালিয়াতি করতে সক্ষম হয়েছেন। পিকে হালদারের সহযোগীদের মধ্যেও কেউ কেউ ছিলেন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কেউ কেউ প্রভাবশালী। পিকে হালদার ও তার সহযোগীদের প্রভাব ও কূটকৌশলে এ বিপুল অঙ্গের অর্থ নয়ছয় করা হলো আর আমাদের এত এত সংস্থার কেউ তা বুঝতে পারলেন না, এটি বিস্ময়কর।

পিকে হালদার বিপুল পরিমাণ অর্থ কেবল আত্মসাৎই করেননি, আত্মসাৎকৃত বিপুল অঙ্কের অর্থ বিদেশেও পাচার করেছেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন। প্রশ্ন হলো, একজন ব্যক্তি উচ্চপদে কর্মরত থাকলেই কি কৌশলে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা সম্ভব? ধারণা করা হচ্ছে, আত্মসাৎকৃত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

পিকে হালদারের সব বেআইনি কাজে কারা কীভাবে সহায়তা করেছে, তার বিস্তারিত তদন্ত হওয়া দরকার। তা না হলে দেশে নতুন করে আরও অনেকে এমন অপরাধে যুক্ত হতে উৎসাহী হবে। জানা গেছে, কাগুজে কিছু প্রতিষ্ঠান তৈরি করে পিকে হালদার আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল অর্থ ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। একের পর এক জালিয়াতি করলেও পিকে হালদারের অনিয়মগুলো কেন কারও চোখে ধরা পড়ল না, তা নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই।

জানা গেছে, পিকে হালদার একজন দর্জির ছেলে। তার মা ছিলেন স্কুলশিক্ষক। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে ডিগ্রি অর্জনের কারণে তার ওপর এলাকাবাসীর প্রত্যাশা অনেক বাড়লেও পিকে হালদার মানুষের সে আশা তো পূরণ করলেনই না, বরং তিনি এমন কাজ করলেন যে, এলাকাবাসী এখন তার কর্মকাণ্ড নিয়ে লজ্জিত।

পিকে হালদারের গ্রেফতারের খবরে দেশে অতীতে যারা বিভিন্ন অপরাধের কারণে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছিলেন, তাদের নাম এবং কর্মকাণ্ড আবারও আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এমন প্রশ্নও দেখা দিয়েছে যে, নতুন কোনো বড় ঘটনার খবর প্রকাশের পরপর পিকে হালদার বিষয়ক আলোচনা কি স্তিমিত হয়ে যাবে? দেশের মানুষ স্বস্তি চায়। মানুষ এমন অপরাধীর নাম শুনতে চায় না। যে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে, মানুষ এটাই দেখতে চায়। অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে দেরি করা হলে মানুষ হতাশ হয়।

দেশে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকলে সরকারের বিভিন্ন কাজের জোরালো সমালোচনা করলে দেশে অপরাধের মাত্রা কমবে, মানুষ এমনটাই মনে করে। বড় অপরাধের ঘটনায় লঘুদণ্ড প্রদান করা হলে অন্য অপরাধীরা উৎসাহী হতে পারে। বস্তুত কোনো অপরাধীই যাতে পার পেতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। পিকে হালদারকে যেহেতু ভারতে গ্রেফতার করা হয়েছে, তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে একটি বিশেষ প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হবে। তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ নেওয়া হবে, মানুষ তা-ই দেখতে চায়।

পিকে হালদারসহ তাকে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাদের সবাইকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে, দেশের মানুষ এটাই চায়। অপরাধীরা যাতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা না পায় তা নিশ্চিত করা জরুরি। সব ধরনের দুর্নীতি, অনিয়ম ও জালিয়াতি ঠেকাতে দেশে সর্বক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করা দরকার। দুর্নীতিবাজদের সামাজিকভাবেও বয়কট করতে হবে।

বদিউর রহমান : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন