সংকটটা রাজনৈতিক নয়, সংকট আসলে সাংস্কৃতিক
jugantor
জাত নিমের পাতা
সংকটটা রাজনৈতিক নয়, সংকট আসলে সাংস্কৃতিক

  মাহবুব কামাল  

১৯ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের অধিকাংশ রাজনীতিকের সাংস্কৃতিক দৈন্যদশায় আমি এতটাই আহত ও বিরক্ত যে, আমার ফোনে একটা অ্যান্সারিং মেশিন বসাতে চাচ্ছি। সেখানে বেজে উঠবে-If you are not a politician, keep your message. I will soon be back to answer you. বাংলা করলে দাঁড়ায়-আপনি যদি রাজনীতিক না হন, তাহলে আপনার বার্তাটি রাখুন। আমি শিগ্গির ফিরে এসে আপনার কথার উত্তর দেব। হ্যাঁ, আমি সাধারণভাবে (generally) রাজনীতিকদের সঙ্গে কথা বলতে আগহী নই। এ অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে তাদের রাজনীতির কারণে নয়; তাদের সাংস্কৃতিক চেতনার মানই (cultural standard) আমাকে এতটা অভদ্র করে তুলেছে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত উন্নত সংস্কৃতি, রাজনীতি হচ্ছে তা অর্জনের উপায়। বলা বাহুল্য, সংস্কৃতির এই লক্ষ্য হারিয়ে রাজনীতি এতটা দূষিত হয়ে পড়েছে।

বলতেই হবে, উন্নত সংস্কৃতি অনেক পরে, সংস্কৃতির ন্যূনতম উপাদানগুলোও আমাদের রাজনীতিকদের কথায়, কাজে, আচরণে প্রতিফলিত হচ্ছে না। এবং আরও বলা দরকার, আমাদের মূল সংকটটি রাজনৈতিক নয়, এই সংকট সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সংকটগুলো সংস্কৃতির সংকট থেকেই উদ্ভূত হচ্ছে মাত্র। আমাদের জাতীয় সংকটকে রাজনৈতিক সংকট হিসাবে দেখাটা এক বড় ভুল সিদ্ধান্ত। সেটা ব্যাখ্যা করছি পরে, তার আগে মানুষ কীভাবে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছে, সেটা বোঝার জন্য নিচের কাল্পনিক ঘটনাটি একটু পড়ে দেখুন।

এক পতঙ্গবিজ্ঞানী ফড়িং নিয়ে গবেষণা করছেন। তো তিনি ফড়িংয়ের একটি পাখা ছিঁড়ে ফেলে তাকে বললেন-ওড়ো দেখি। ফড়িংটি কোনোক্রমে ভারসাম্যহীনভাবে উড়তে লাগলো। এবার তিনি আরেকটি ফড়িংয়ের দুটো পাখাই ছিঁড়ে ফেলে বললেন-ওড়ো দেখি। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই ফড়িংটি ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল। অতঃপর সেই পতঙ্গবিজ্ঞানী সিদ্ধান্ত টানলেন-ফড়িংয়ের দুটো পাখাই ছিঁড়ে ফেললে সে কানে শুনতে পারে না।

এবার আসি। নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও আমাদের রাজনীতিকরা সেই নির্বাচনে হেরে গেলে ফলাফল মানতে চান না। প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন। এখন নির্বাচন যেহেতু একটি রাজনৈতিক প্রপঞ্চ (phenomenon), তাই আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, নির্বাচনে ফলাফল মেনে না নেওয়ার সংকটটি রাজনৈতিক। কিন্তু না, প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নেওয়াই বড় কথা, হার-জিৎ সমস্যা নয়-এই উন্নত সাংস্কৃতিক বোধের অভাবেই ওই পরাজিত প্রার্থী অমন আচরণ করেছেন। অর্থাৎ সংকটটি আদতে সাংস্কৃতিক। মাঝে-মধ্যে আমার মধ্যে একটা চিন্তা কাজ করে। চিন্তাটা এমন যে, আমি কোনো এক নির্বাচনে এমপি পদে অংশ নেবো। জানি, নির্ঘাত হেরে যাবো। ফলাফল ঘোষণার পর আমি বের করবো একটি মিছিল। সেটা পরাজয় মিছিল। বিজয়ীরাই কেবল আনন্দময় বিজয় মিছিল করবেন, তা-তো হয় না। পরাজয় মিছিলে আমরা আনন্দ করবো এবং মিছিল শেষে সমাবেশে বক্তৃতা করবো-বিজয়ী প্রার্থীরই কেবল আনন্দ করার অধিকার নেই, পরাজিত প্রার্থীরও আছে এই অধিকার।

এ পর্যায়ে নির্বাচনে হেরে গিয়ে রাজনীতিক যে কত উন্নত সংস্কৃতির পরিচয় দিতে পারেন, তার একটা উদাহরণ দিই। রাজনীতিক মহোদয় অবশ্যই বাংলাদেশের নন, তিনি ব্রিটিশ। ১৯৭০ সাল। ব্রিটেনে নির্বাচন হচ্ছে। ক্ষমতায় আসীন লেবার পার্টি এবং প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসন। বিরোধী দলে রয়েছে কনজারভেটিভ পার্টি এবং দলটির নেতা এডওয়ার্ড হিথ। তো ভোটগ্রহণ চলাকালেই উইলসন বুঝতে পারলেন, তার দল হেরে যাচ্ছে। এটা বুঝতে পেরে, অবিশ্বাস্যই বলতে হবে, তিনি রানীর কাছে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দিলেন। রানী বললেন-ফলাফল তো হয়নি, আপনি পদত্যাগ করছেন কেন? উইলসন জবাব দিলেন-আমার বোঝা হয়ে গেছে কী ঘটতে যাচ্ছে। এরপর তিনি চলে এলেন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন দশ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে এবং তল্পিতল্পাসহ বেরিয়ে এলেন। ওদিকে ফলাফল ঘোষণার পর এডওয়ার্ড হিথ দেখা করতে চান উইলসনের সঙ্গে। কিন্তু তিনি তাকে খুঁজে পাচ্ছেন না কোথাও-ডাউনিং স্ট্রিটে গিয়ে দেখলেন, তিনি ছেড়ে চলে গেছেন তার সরকারি বাসভবন। খুঁজতে খুঁজতে হিথ তাকে পেয়ে গেলেন এক রেস্টুরেন্টে। সেখানে তিনি সস্ত্রীক চা খাচ্ছেন। হিথকে দেখামাত্রই উইলসন তাকে কংগ্রাচুলেট করে বসতে বললেন। হিথ বললেন-আপনি এখানে কী করছেন? উইলসন বললেন, আমি বসে বসে এক সমস্যা নিয়ে ভাবছি। কোথায় গিয়ে উঠবো? লন্ডনে তো আমার কোনো বাড়ি নেই। হিথ বললেন-আরে এটা কোনো সমস্যা? আপনি চেকার্সে আমার কান্ট্রি হোমে (গ্রামের বাড়ি) গিয়ে থাকুন না। উইলসন সেখানেই গিয়ে উঠলেন। হ্যাঁ, দু’জনের মধ্যে তখন কোনোই পার্থক্য নেই। পার্থক্য শুধু-একজন ভাবী প্রধানমন্ত্রী, আরেজকন হার ম্যাজেস্টি’স লয়্যাল অপোজিশন লিডার। পাঠক, আর বেশি কিছু বলার দরকার আছে কি?

এ দেশে ক্ষমতায় টিকে থাকা ও যেনতেন প্রকারে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা-যেটাকে আমরা বলছি রাজনৈতিক সংকট, সেটাও আসলে সাংস্কৃতিক সংকট। এডওয়ার্ড হিথ যেভাবে বিরোধীদলীয় নেতাকে সম্মান দেখিয়েছেন, তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেই উন্নত সংস্কৃতি আমরাও দেখাতে পারলে ক্ষমতার এই বিশ্রী দ্বন্দ্ব থাকতো না। এদেশে নির্বাচনে বিজয়ীরা পুরো দেশটাকেই ভোগ করার সুযোগ পায় এবং বিরোধীরা এর কোনো ভাগ পায় না বলেই ক্ষমতা নিয়ে এত অপতৎপরতা। বিরোধী দলের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা গেলেই কেবল এই দৃশ্য অপসারিত হতে পারে এবং সেজন্য দরকার উন্নত সাংস্কৃতিক চেতনা।

এদেশের যেদিকেই তাকানো যাবে, দেখা যাবে সাংস্কৃতিক সংকট। পাঠককে প্রশ্ন করি-দুই নেত্রী যে পরস্পর কথা বলতেন না, এটা কি রাজনৈতিক সংকট, নাকি সাংস্কৃতিক? অবশ্যই সাংস্কৃতিক। এই রে, একটা বড় সাংস্কৃতিক সংকটের কথা ভুলে যাচ্ছিলাম। এই যে ধরেন, ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালীদের মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা, যেটাকে এক কথায় তৈলায়ন (oiling) বলা যায়, এটা কি রাজনৈতিক কৌশল, নাকি অপসংস্কৃতি? একজন প্রকৃত সংস্কৃতিবান কখনোই কাউকে মাত্রার বাইরে প্রশংসা করবেন না। ২১ ফেব্রুয়ারি যখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে ঘোষিত হলো, তখন এক বুদ্ধিজীবী শেখ হাসিনাকে ভাষাকন্যা উপাধি দিয়েছিলেন। তখন এক লেখায় আমি প্রশ্ন রেখেছিলাম-ভাষাকন্যা বলতে আসলে কী বোঝায়? রূপকথায় আমরা মৎস্যকন্যা পড়েছিলাম। এর অর্থ অর্ধেক মৎস্য, অর্ধেক মানবী। ভাষাকন্যা কি তাহলে অর্ধেক ভাষা, অর্ধেক কন্যা? প্রধানমন্ত্রীকে প্রশংসা করতে আপত্তি নেই। সাহসী পদক্ষেপ কিংবা বড় ধরনের উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিলে তাকে প্রশংসা করা যায় বৈকি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার সাহসী সিদ্ধান্ত কিংবা গৃহহীনদের জন্য গৃহের ব্যবস্থা করার উদ্ভাবনী পদক্ষেপ-এসব ইস্যুতে প্রশংসা করলে দোষের কিছু নেই। কিন্তু কথায় কথায় ‘দেশরত্ন’, ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ ইত্যাদি ব্যবহার করা সংস্কৃতিসম্মত নয়। অতিউৎসাহ মানসিক ক্ষুদ্রতারই অন্যরূপ। পাখি যত ক্ষুদ্র, কিচিরমিচির তত বেশি। অনুপাত জ্ঞান (sense of proportion) মানুষকে আকর্ষণীয় করে তোলে। যুগান্তরের সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করি বলে প্রতিদিন লেখকদের কলাম এডিট করতে হয়। অনেকে তাদের লেখায় সরকারের আনুকূল্যের আশায় এত তেল ঢালেন যে, সেই তেল ঝরাতে সহকর্মী আসিফ রশীদ ও আমার ঘাম ঝরে যায়।

এদেশের রাজনীতিকরা সংস্কৃতি কী সেটাই বোঝেন না, রাজনৈতিক সংস্কৃতি (political culture) তো অনেক পরে। সংস্কৃতি হলো শিক্ষাচর্চার ফলে পাওয়া মানসিক বিকাশ, যদিও অনেকে সংস্কৃতি বলতে হারমোনিয়াম ও তবলা বুঝে থাকেন। যা হোক, রাজনৈতিক সংস্কৃতি আরও অনেক উঁচুমানের বিষয়। এক কথায়, এটা হলো জনগণকে অগ্রগতির পথ দেখানোর যোগ্যতা। এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হলো-কথায় কথায় নেত্রী অথবা ম্যাডাম বলা। এদেশে গণতন্ত্রের অর্থও পাল্টে গেছে। গণতন্ত্র হলো একত্রে বসবাস করার শিল্প। অথচ বাংলাদেশে গণতন্ত্র মানে ভাগ ভাগ হয়ে যুদ্ধ করা।

পাঠক কি লক্ষ করেছেন, এদেশের রাজনীতিকদের সেন্স অব হিউমার অর্থাৎ রসবোধ বলতে কিছু নেই। অথচ রসবোধ উন্নত সংস্কৃতিরই এক বড় উপাদান, যা মানুষকে আকৃষ্ট করে। রাজনীতিকের মূল লক্ষ্য যেহেতু মানুষকে তার দিকে আকৃষ্ট করা, তাই রসবোধ থাকা তাদের জন্য অতি প্রয়োজনীয় একটি গুণ। রোনাল্ড রিগান যখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তখন সেদেশে গর্ভপাত বিষয়ে তুমুল বিতর্ক চলছিল। রেগান ছিলেন গর্ভপাতবিরোধী। তো তিনি এক সমাবেশে বললেন-আমি খেয়াল করে দেখেছি, যারা গর্ভপাতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তাদের সবাই একদিন জন্মগ্রহণ করেছিলেন! এই অসামান্য সেন্স অফ হিউমারের কারণে তার জনপ্রিয়তার রেটিং বেড়ে গিয়েছিল। বিরোধীদের আক্রমণ করারও একটা শিল্প থাকে, সেই শিল্পের ধারেকাছেও নেই এদেশের রাজনীতিকরা। তারা শুধু পারেন খিস্তিখেউর। আর শিক্ষা-দীক্ষা? অনেকদিন আগে এক এমপি ছাত্রসমাজের এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন-তোমরা শেক্সপিয়রের মতো বিজ্ঞানী হও! তিনি যে বলেননি তোমরা গান্ধীর মতো সন্ত্রাসী হও-সেটাই যথেষ্ট। শিক্ষার কথা যখন উঠলই, তখন আরেকটু বলি। এক বিদগ্ধ বিখ্যাত ব্যক্তি বলেছিলেন-বৃষ্টির দিন অথচ পড়তে জানে না, তার মতো হতভাগা আর কেউ নেই। আমাদের রাজনীতিকরা পড়েন না বলে উপরের চমৎকার কথাটিও পড়তে পারেননি।

এদেশে যোগ্য প্রচার পায় না, প্রচারই যোগ্য বানায়। আর তাই প্রচারের গুণে সংস্কৃতিহীন ব্যক্তিরাই রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তি হয়ে পড়েছেন। তারা নিজেরা যেহেতু সংস্কৃতিহীন জীব, তাই নেতৃত্ব দিয়ে জনতাকে সংস্কৃতিশীল হিসাবে গড়ে তোলা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে বাংলাদেশে জনতার বড় অংশটিই সংস্কৃতিহীন থেকে যাচ্ছে, যে কারণে চারদিকে এত নৈরাজ্য।

এই কলামটি লিখছি রংপুর শহরের ছড়াকার ও সংস্কৃতিকর্মী অনুজপ্রতিম আশাফা সেলিমের চাপাচাপিতে। তিনি নিশ্চয়ই লেখাটিতে সমাধানের পথও খুঁজতে চাইবেন। তাকে বলি, আসলে সংকট বলতে কিছু নেই। এটা হলো পরিস্থিতি, আমরা পরিস্থিতিকে সংকট আখ্যা দিয়ে থাকি। দরকার এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো। এ পরিবর্তন দুভাবে হতে পারে। একটা হলো, বিবর্তনের (evolution) ধারায় পরিবর্তন। ডাচ (নেদারল্যান্ডসের অধিবাসী) ও ডেনিশরা (ডেনমার্কের অধিবাসী) যেভাবে বিবর্তিত হয়ে সুসভ্য হয়েছে। কয়েকশ বছর আগে তারা ছিল সংস্কৃতিহীন, অসভ্য জাতি। জলদস্যুতা ছিল তাদের জীবিকা। বিবর্তনের ধারায় এখন তারা ঈর্ষণীয়ভাবে সুসভ্য। এটা হলো পরিস্থিতি পাল্টানোর দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। আরেকটা হচ্ছে শর্টকাট রাস্তা। আর সেটা হলো চীনের মতো একটা সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটানো, যে বিপ্লব মানুষের মনোজগতে নিয়ে আসবে নতুন চিন্তা, নতুন প্রেরণা, নতুন জীবনাচরণ। অতঃপর আমাদের ঠিক করতে হবে, আমরা দীর্ঘমেয়াদে যাবো, নাকি শর্টকাটের রাস্তা ধরবো। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটাতে হলে সেই বিপ্লবের নেতৃত্ব দেবেন কে বা কারা? তাড়াহুড়োর কিছু নেই, এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো আমরা আগামীর কোনো এক লেখায়।

মাহবুব কামাল : সাংবাদিক

mahbubkamal08@yahoo.com

জাত নিমের পাতা

সংকটটা রাজনৈতিক নয়, সংকট আসলে সাংস্কৃতিক

 মাহবুব কামাল 
১৯ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের অধিকাংশ রাজনীতিকের সাংস্কৃতিক দৈন্যদশায় আমি এতটাই আহত ও বিরক্ত যে, আমার ফোনে একটা অ্যান্সারিং মেশিন বসাতে চাচ্ছি। সেখানে বেজে উঠবে-If you are not a politician, keep your message. I will soon be back to answer you. বাংলা করলে দাঁড়ায়-আপনি যদি রাজনীতিক না হন, তাহলে আপনার বার্তাটি রাখুন। আমি শিগ্গির ফিরে এসে আপনার কথার উত্তর দেব। হ্যাঁ, আমি সাধারণভাবে (generally) রাজনীতিকদের সঙ্গে কথা বলতে আগহী নই। এ অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে তাদের রাজনীতির কারণে নয়; তাদের সাংস্কৃতিক চেতনার মানই (cultural standard) আমাকে এতটা অভদ্র করে তুলেছে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত উন্নত সংস্কৃতি, রাজনীতি হচ্ছে তা অর্জনের উপায়। বলা বাহুল্য, সংস্কৃতির এই লক্ষ্য হারিয়ে রাজনীতি এতটা দূষিত হয়ে পড়েছে।

বলতেই হবে, উন্নত সংস্কৃতি অনেক পরে, সংস্কৃতির ন্যূনতম উপাদানগুলোও আমাদের রাজনীতিকদের কথায়, কাজে, আচরণে প্রতিফলিত হচ্ছে না। এবং আরও বলা দরকার, আমাদের মূল সংকটটি রাজনৈতিক নয়, এই সংকট সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সংকটগুলো সংস্কৃতির সংকট থেকেই উদ্ভূত হচ্ছে মাত্র। আমাদের জাতীয় সংকটকে রাজনৈতিক সংকট হিসাবে দেখাটা এক বড় ভুল সিদ্ধান্ত। সেটা ব্যাখ্যা করছি পরে, তার আগে মানুষ কীভাবে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছে, সেটা বোঝার জন্য নিচের কাল্পনিক ঘটনাটি একটু পড়ে দেখুন।

এক পতঙ্গবিজ্ঞানী ফড়িং নিয়ে গবেষণা করছেন। তো তিনি ফড়িংয়ের একটি পাখা ছিঁড়ে ফেলে তাকে বললেন-ওড়ো দেখি। ফড়িংটি কোনোক্রমে ভারসাম্যহীনভাবে উড়তে লাগলো। এবার তিনি আরেকটি ফড়িংয়ের দুটো পাখাই ছিঁড়ে ফেলে বললেন-ওড়ো দেখি। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই ফড়িংটি ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল। অতঃপর সেই পতঙ্গবিজ্ঞানী সিদ্ধান্ত টানলেন-ফড়িংয়ের দুটো পাখাই ছিঁড়ে ফেললে সে কানে শুনতে পারে না।

এবার আসি। নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও আমাদের রাজনীতিকরা সেই নির্বাচনে হেরে গেলে ফলাফল মানতে চান না। প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন। এখন নির্বাচন যেহেতু একটি রাজনৈতিক প্রপঞ্চ (phenomenon), তাই আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, নির্বাচনে ফলাফল মেনে না নেওয়ার সংকটটি রাজনৈতিক। কিন্তু না, প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নেওয়াই বড় কথা, হার-জিৎ সমস্যা নয়-এই উন্নত সাংস্কৃতিক বোধের অভাবেই ওই পরাজিত প্রার্থী অমন আচরণ করেছেন। অর্থাৎ সংকটটি আদতে সাংস্কৃতিক। মাঝে-মধ্যে আমার মধ্যে একটা চিন্তা কাজ করে। চিন্তাটা এমন যে, আমি কোনো এক নির্বাচনে এমপি পদে অংশ নেবো। জানি, নির্ঘাত হেরে যাবো। ফলাফল ঘোষণার পর আমি বের করবো একটি মিছিল। সেটা পরাজয় মিছিল। বিজয়ীরাই কেবল আনন্দময় বিজয় মিছিল করবেন, তা-তো হয় না। পরাজয় মিছিলে আমরা আনন্দ করবো এবং মিছিল শেষে সমাবেশে বক্তৃতা করবো-বিজয়ী প্রার্থীরই কেবল আনন্দ করার অধিকার নেই, পরাজিত প্রার্থীরও আছে এই অধিকার।

এ পর্যায়ে নির্বাচনে হেরে গিয়ে রাজনীতিক যে কত উন্নত সংস্কৃতির পরিচয় দিতে পারেন, তার একটা উদাহরণ দিই। রাজনীতিক মহোদয় অবশ্যই বাংলাদেশের নন, তিনি ব্রিটিশ। ১৯৭০ সাল। ব্রিটেনে নির্বাচন হচ্ছে। ক্ষমতায় আসীন লেবার পার্টি এবং প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসন। বিরোধী দলে রয়েছে কনজারভেটিভ পার্টি এবং দলটির নেতা এডওয়ার্ড হিথ। তো ভোটগ্রহণ চলাকালেই উইলসন বুঝতে পারলেন, তার দল হেরে যাচ্ছে। এটা বুঝতে পেরে, অবিশ্বাস্যই বলতে হবে, তিনি রানীর কাছে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দিলেন। রানী বললেন-ফলাফল তো হয়নি, আপনি পদত্যাগ করছেন কেন? উইলসন জবাব দিলেন-আমার বোঝা হয়ে গেছে কী ঘটতে যাচ্ছে। এরপর তিনি চলে এলেন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন দশ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে এবং তল্পিতল্পাসহ বেরিয়ে এলেন। ওদিকে ফলাফল ঘোষণার পর এডওয়ার্ড হিথ দেখা করতে চান উইলসনের সঙ্গে। কিন্তু তিনি তাকে খুঁজে পাচ্ছেন না কোথাও-ডাউনিং স্ট্রিটে গিয়ে দেখলেন, তিনি ছেড়ে চলে গেছেন তার সরকারি বাসভবন। খুঁজতে খুঁজতে হিথ তাকে পেয়ে গেলেন এক রেস্টুরেন্টে। সেখানে তিনি সস্ত্রীক চা খাচ্ছেন। হিথকে দেখামাত্রই উইলসন তাকে কংগ্রাচুলেট করে বসতে বললেন। হিথ বললেন-আপনি এখানে কী করছেন? উইলসন বললেন, আমি বসে বসে এক সমস্যা নিয়ে ভাবছি। কোথায় গিয়ে উঠবো? লন্ডনে তো আমার কোনো বাড়ি নেই। হিথ বললেন-আরে এটা কোনো সমস্যা? আপনি চেকার্সে আমার কান্ট্রি হোমে (গ্রামের বাড়ি) গিয়ে থাকুন না। উইলসন সেখানেই গিয়ে উঠলেন। হ্যাঁ, দু’জনের মধ্যে তখন কোনোই পার্থক্য নেই। পার্থক্য শুধু-একজন ভাবী প্রধানমন্ত্রী, আরেজকন হার ম্যাজেস্টি’স লয়্যাল অপোজিশন লিডার। পাঠক, আর বেশি কিছু বলার দরকার আছে কি?

এ দেশে ক্ষমতায় টিকে থাকা ও যেনতেন প্রকারে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা-যেটাকে আমরা বলছি রাজনৈতিক সংকট, সেটাও আসলে সাংস্কৃতিক সংকট। এডওয়ার্ড হিথ যেভাবে বিরোধীদলীয় নেতাকে সম্মান দেখিয়েছেন, তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেই উন্নত সংস্কৃতি আমরাও দেখাতে পারলে ক্ষমতার এই বিশ্রী দ্বন্দ্ব থাকতো না। এদেশে নির্বাচনে বিজয়ীরা পুরো দেশটাকেই ভোগ করার সুযোগ পায় এবং বিরোধীরা এর কোনো ভাগ পায় না বলেই ক্ষমতা নিয়ে এত অপতৎপরতা। বিরোধী দলের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা গেলেই কেবল এই দৃশ্য অপসারিত হতে পারে এবং সেজন্য দরকার উন্নত সাংস্কৃতিক চেতনা।

এদেশের যেদিকেই তাকানো যাবে, দেখা যাবে সাংস্কৃতিক সংকট। পাঠককে প্রশ্ন করি-দুই নেত্রী যে পরস্পর কথা বলতেন না, এটা কি রাজনৈতিক সংকট, নাকি সাংস্কৃতিক? অবশ্যই সাংস্কৃতিক। এই রে, একটা বড় সাংস্কৃতিক সংকটের কথা ভুলে যাচ্ছিলাম। এই যে ধরেন, ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালীদের মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা, যেটাকে এক কথায় তৈলায়ন (oiling) বলা যায়, এটা কি রাজনৈতিক কৌশল, নাকি অপসংস্কৃতি? একজন প্রকৃত সংস্কৃতিবান কখনোই কাউকে মাত্রার বাইরে প্রশংসা করবেন না। ২১ ফেব্রুয়ারি যখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে ঘোষিত হলো, তখন এক বুদ্ধিজীবী শেখ হাসিনাকে ভাষাকন্যা উপাধি দিয়েছিলেন। তখন এক লেখায় আমি প্রশ্ন রেখেছিলাম-ভাষাকন্যা বলতে আসলে কী বোঝায়? রূপকথায় আমরা মৎস্যকন্যা পড়েছিলাম। এর অর্থ অর্ধেক মৎস্য, অর্ধেক মানবী। ভাষাকন্যা কি তাহলে অর্ধেক ভাষা, অর্ধেক কন্যা? প্রধানমন্ত্রীকে প্রশংসা করতে আপত্তি নেই। সাহসী পদক্ষেপ কিংবা বড় ধরনের উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিলে তাকে প্রশংসা করা যায় বৈকি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার সাহসী সিদ্ধান্ত কিংবা গৃহহীনদের জন্য গৃহের ব্যবস্থা করার উদ্ভাবনী পদক্ষেপ-এসব ইস্যুতে প্রশংসা করলে দোষের কিছু নেই। কিন্তু কথায় কথায় ‘দেশরত্ন’, ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ ইত্যাদি ব্যবহার করা সংস্কৃতিসম্মত নয়। অতিউৎসাহ মানসিক ক্ষুদ্রতারই অন্যরূপ। পাখি যত ক্ষুদ্র, কিচিরমিচির তত বেশি। অনুপাত জ্ঞান (sense of proportion) মানুষকে আকর্ষণীয় করে তোলে। যুগান্তরের সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করি বলে প্রতিদিন লেখকদের কলাম এডিট করতে হয়। অনেকে তাদের লেখায় সরকারের আনুকূল্যের আশায় এত তেল ঢালেন যে, সেই তেল ঝরাতে সহকর্মী আসিফ রশীদ ও আমার ঘাম ঝরে যায়।

এদেশের রাজনীতিকরা সংস্কৃতি কী সেটাই বোঝেন না, রাজনৈতিক সংস্কৃতি (political culture) তো অনেক পরে। সংস্কৃতি হলো শিক্ষাচর্চার ফলে পাওয়া মানসিক বিকাশ, যদিও অনেকে সংস্কৃতি বলতে হারমোনিয়াম ও তবলা বুঝে থাকেন। যা হোক, রাজনৈতিক সংস্কৃতি আরও অনেক উঁচুমানের বিষয়। এক কথায়, এটা হলো জনগণকে অগ্রগতির পথ দেখানোর যোগ্যতা। এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হলো-কথায় কথায় নেত্রী অথবা ম্যাডাম বলা। এদেশে গণতন্ত্রের অর্থও পাল্টে গেছে। গণতন্ত্র হলো একত্রে বসবাস করার শিল্প। অথচ বাংলাদেশে গণতন্ত্র মানে ভাগ ভাগ হয়ে যুদ্ধ করা।

পাঠক কি লক্ষ করেছেন, এদেশের রাজনীতিকদের সেন্স অব হিউমার অর্থাৎ রসবোধ বলতে কিছু নেই। অথচ রসবোধ উন্নত সংস্কৃতিরই এক বড় উপাদান, যা মানুষকে আকৃষ্ট করে। রাজনীতিকের মূল লক্ষ্য যেহেতু মানুষকে তার দিকে আকৃষ্ট করা, তাই রসবোধ থাকা তাদের জন্য অতি প্রয়োজনীয় একটি গুণ। রোনাল্ড রিগান যখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তখন সেদেশে গর্ভপাত বিষয়ে তুমুল বিতর্ক চলছিল। রেগান ছিলেন গর্ভপাতবিরোধী। তো তিনি এক সমাবেশে বললেন-আমি খেয়াল করে দেখেছি, যারা গর্ভপাতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তাদের সবাই একদিন জন্মগ্রহণ করেছিলেন! এই অসামান্য সেন্স অফ হিউমারের কারণে তার জনপ্রিয়তার রেটিং বেড়ে গিয়েছিল। বিরোধীদের আক্রমণ করারও একটা শিল্প থাকে, সেই শিল্পের ধারেকাছেও নেই এদেশের রাজনীতিকরা। তারা শুধু পারেন খিস্তিখেউর। আর শিক্ষা-দীক্ষা? অনেকদিন আগে এক এমপি ছাত্রসমাজের এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন-তোমরা শেক্সপিয়রের মতো বিজ্ঞানী হও! তিনি যে বলেননি তোমরা গান্ধীর মতো সন্ত্রাসী হও-সেটাই যথেষ্ট। শিক্ষার কথা যখন উঠলই, তখন আরেকটু বলি। এক বিদগ্ধ বিখ্যাত ব্যক্তি বলেছিলেন-বৃষ্টির দিন অথচ পড়তে জানে না, তার মতো হতভাগা আর কেউ নেই। আমাদের রাজনীতিকরা পড়েন না বলে উপরের চমৎকার কথাটিও পড়তে পারেননি।

এদেশে যোগ্য প্রচার পায় না, প্রচারই যোগ্য বানায়। আর তাই প্রচারের গুণে সংস্কৃতিহীন ব্যক্তিরাই রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তি হয়ে পড়েছেন। তারা নিজেরা যেহেতু সংস্কৃতিহীন জীব, তাই নেতৃত্ব দিয়ে জনতাকে সংস্কৃতিশীল হিসাবে গড়ে তোলা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে বাংলাদেশে জনতার বড় অংশটিই সংস্কৃতিহীন থেকে যাচ্ছে, যে কারণে চারদিকে এত নৈরাজ্য।

এই কলামটি লিখছি রংপুর শহরের ছড়াকার ও সংস্কৃতিকর্মী অনুজপ্রতিম আশাফা সেলিমের চাপাচাপিতে। তিনি নিশ্চয়ই লেখাটিতে সমাধানের পথও খুঁজতে চাইবেন। তাকে বলি, আসলে সংকট বলতে কিছু নেই। এটা হলো পরিস্থিতি, আমরা পরিস্থিতিকে সংকট আখ্যা দিয়ে থাকি। দরকার এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো। এ পরিবর্তন দুভাবে হতে পারে। একটা হলো, বিবর্তনের (evolution) ধারায় পরিবর্তন। ডাচ (নেদারল্যান্ডসের অধিবাসী) ও ডেনিশরা (ডেনমার্কের অধিবাসী) যেভাবে বিবর্তিত হয়ে সুসভ্য হয়েছে। কয়েকশ বছর আগে তারা ছিল সংস্কৃতিহীন, অসভ্য জাতি। জলদস্যুতা ছিল তাদের জীবিকা। বিবর্তনের ধারায় এখন তারা ঈর্ষণীয়ভাবে সুসভ্য। এটা হলো পরিস্থিতি পাল্টানোর দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। আরেকটা হচ্ছে শর্টকাট রাস্তা। আর সেটা হলো চীনের মতো একটা সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটানো, যে বিপ্লব মানুষের মনোজগতে নিয়ে আসবে নতুন চিন্তা, নতুন প্রেরণা, নতুন জীবনাচরণ। অতঃপর আমাদের ঠিক করতে হবে, আমরা দীর্ঘমেয়াদে যাবো, নাকি শর্টকাটের রাস্তা ধরবো। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটাতে হলে সেই বিপ্লবের নেতৃত্ব দেবেন কে বা কারা? তাড়াহুড়োর কিছু নেই, এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো আমরা আগামীর কোনো এক লেখায়।

মাহবুব কামাল : সাংবাদিক

mahbubkamal08@yahoo.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন