অবরোধ সত্ত্বেও বিশ্বসেরা অর্থনীতির দেশের তালিকায় ইরান
jugantor
অবরোধ সত্ত্বেও বিশ্বসেরা অর্থনীতির দেশের তালিকায় ইরান

  সাইদুল ইসলাম  

২১ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কথা কারও অজানা নয়। ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের পর থেকেই দেশটি বিশ্বের বৃহৎ পরাশক্তি ও তার মিত্রদের নানা ষড়যন্ত্র ও অবরোধ মোকাবিলা করে এলেও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে দেশটির ওপর ইতিহাসের কঠিনতম অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

কিন্তু শত্রুদের চাপিয়ে দেওয়া এসব অবরোধ ও কূটকৌশলের কাছে নতজানু হওয়া তো দূরের কথা, বরং খাঁটি ইসলামের অদম্য শক্তির বলে দিনকে দিন ভেতরে ও বাইরে এবং বিশ্ব-অঙ্গনে ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে ইসলামি বিপ্লবের দেশ ইরান।

দেশটি আজ বিশ্বের সব স্বাধীনতাকামী জাতির জন্য উন্নয়নের এক রোল মডেল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ তালিকায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোর তালিকায় উঠে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি। দেশটির আগে আছে মাত্র ১৯টি দেশ। আইএমএফের তালিকায় ২০তম অবস্থানে উঠে এসেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও অর্থনীতির আকার বিচারে পোল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম ও অস্ট্রিয়ার মতো দেশের চেয়েও ইরান এখন এগিয়ে।

ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা ৮ মে এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়, ২০২১ সালে ইরানের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, সমতা বা পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি (পিপিপি) সমন্বয়ের মাধ্যমে মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সর্বশেষ এ তালিকা করেছে।

আইএমএফের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, পিপিপিকে ভিত্তি ধরেই ২০২১ সালে ইরানের জিডিপি ছিল ১ লাখ ৪৩ হাজার ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক এ সংস্থাটির অনুমান, ২০২২ সালে ইরানের জিডিপির আকার আরও ১৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলার বেড়ে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে দাঁড়াবে।

আইএমএফের দেওয়া উল্লিখিত এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, কয়েক বছর ধরে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এ সময়ে ইরানের অর্থনীতির আকার বেড়েছে। ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের ১৭৩টি দেশের চেয়ে সে বছর ইরানের অর্থনীতির আকার ছিল বড়। আইএমএফের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিপিপির ভিত্তিতে ২০২১ সালে বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতি ছিল চীন। চীনের পর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওই বছর চীনের জিডিপি ছিল আনুমানিক ২৭ লাখ ২০ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি ছিল ২২ লাখ ৯৯ হাজার ৭০০ কোটি মার্কিন ডলার।

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন উন্নয়ন সূচকে শক্তিশালী অবস্থান বলে দিচ্ছে ইরান কতটা অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে। শিক্ষা, বিজ্ঞান, উদ্ভাবন, প্রযুক্তিগত উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখন বিশ্বে নেতৃস্থানীয় দেশের তালিকায় রয়েছে দেশটি। আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বর্তমানে ইরানের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। ন্যানো প্রযুক্তিতে দেশটির অবস্থান বিশ্বে তৃতীয়। সামরিক শক্তির দিক থেকে ইরানের অবস্থান বিশ্বে ষষ্ঠ, সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ শিল্পে ষষ্ঠ, অ্যারোস্পেস, সামরিক ও বেসামরিক বিমান শিল্প, কৃত্রিম উপগ্রহ ও মহাকাশ সংক্রান্ত প্রযুক্তিতে অষ্টম, চিকিৎসা খাতে দশম, কৃষিতে দশম এবং শিল্প খাতে ইরানের অবস্থান বিশ্বে ১৯তম।

ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর অর্থনৈতিক খাতসহ কোনো কোনো খাতে ইরানি জনগণ বাইরের শত্রুর নজিরবিহীন বাধা আর নিষেধাজ্ঞার কারণে বেশ অসুবিধা ও হয়রানির শিকার হলেও এ সবকিছু দেশটির অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারেনি মোটেও। বরং এসব বাধা ও নিষেধাজ্ঞা ইরানের জন্য শাপে বরে পরিণত হচ্ছে এবং যেসব খাতেই বাধা আসছে, দেশটি সেসব খাতে হয়ে উঠছে স্বয়ংসম্পূর্ণ।

পাশ্চাত্যের ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের তেল রপ্তানির আয় কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও বা রপ্তানি আয়ের অর্থের প্রবাহ দেশে আসতে দেরি হলেও ইরান পণ্যের বিনিময়ে পণ্য প্রদান ব্যবস্থাসহ নানা ধরনের বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করে এ সমস্যার সমাধান করছে। এ ছাড়াও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যসহ তেলবহির্ভূত নানা পণ্যের রপ্তানি বাড়িয়ে দিয়ে ইরান তার অর্থনীতিকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের নির্ভরতা থেকে অনেকাংশে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছে। এভাবে পাশ্চাত্যের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি হয়ে উঠছে বহুমুখী, বিচিত্রময় ও স্বনির্ভর।

ইসলামি বিপ্লবের ৪৩তম বিজয়বার্ষিকী সামনে রেখে দেশটিতে এবার অসংখ্য উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়। ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি ৬ ফেব্রুয়ারি এক ভিডিও কনফারেন্সে সারা দেশে ১৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগসহ ৪৮টি বড় শিল্প প্রকল্প শুরু করার নির্দেশ দেন। প্রকল্পগুলো দেশের বিভিন্ন প্রদেশের ২৭টি শহরে বাস্তবায়িত হতে চলেছে। এ ছাড়া দেশব্যাপী ৪৬৮টি শিল্প ও খনি প্রকল্প, ৪৮৪টি পরিবহণ প্রকল্প, ২ হাজার ৯৫০টি শিক্ষামূলক প্রকল্প এবং অসংখ্য সামুদ্রিক ও পরিবহণ প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়।

সাইদুল ইসলাম : লেখক ও প্রাবন্ধিক

অবরোধ সত্ত্বেও বিশ্বসেরা অর্থনীতির দেশের তালিকায় ইরান

 সাইদুল ইসলাম 
২১ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কথা কারও অজানা নয়। ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের পর থেকেই দেশটি বিশ্বের বৃহৎ পরাশক্তি ও তার মিত্রদের নানা ষড়যন্ত্র ও অবরোধ মোকাবিলা করে এলেও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে দেশটির ওপর ইতিহাসের কঠিনতম অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

কিন্তু শত্রুদের চাপিয়ে দেওয়া এসব অবরোধ ও কূটকৌশলের কাছে নতজানু হওয়া তো দূরের কথা, বরং খাঁটি ইসলামের অদম্য শক্তির বলে দিনকে দিন ভেতরে ও বাইরে এবং বিশ্ব-অঙ্গনে ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে ইসলামি বিপ্লবের দেশ ইরান।

দেশটি আজ বিশ্বের সব স্বাধীনতাকামী জাতির জন্য উন্নয়নের এক রোল মডেল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ তালিকায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোর তালিকায় উঠে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি। দেশটির আগে আছে মাত্র ১৯টি দেশ। আইএমএফের তালিকায় ২০তম অবস্থানে উঠে এসেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও অর্থনীতির আকার বিচারে পোল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম ও অস্ট্রিয়ার মতো দেশের চেয়েও ইরান এখন এগিয়ে।

ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা ৮ মে এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়, ২০২১ সালে ইরানের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, সমতা বা পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি (পিপিপি) সমন্বয়ের মাধ্যমে মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সর্বশেষ এ তালিকা করেছে।

আইএমএফের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, পিপিপিকে ভিত্তি ধরেই ২০২১ সালে ইরানের জিডিপি ছিল ১ লাখ ৪৩ হাজার ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক এ সংস্থাটির অনুমান, ২০২২ সালে ইরানের জিডিপির আকার আরও ১৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলার বেড়ে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে দাঁড়াবে।

আইএমএফের দেওয়া উল্লিখিত এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, কয়েক বছর ধরে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এ সময়ে ইরানের অর্থনীতির আকার বেড়েছে। ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের ১৭৩টি দেশের চেয়ে সে বছর ইরানের অর্থনীতির আকার ছিল বড়। আইএমএফের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিপিপির ভিত্তিতে ২০২১ সালে বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতি ছিল চীন। চীনের পর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওই বছর চীনের জিডিপি ছিল আনুমানিক ২৭ লাখ ২০ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি ছিল ২২ লাখ ৯৯ হাজার ৭০০ কোটি মার্কিন ডলার।

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন উন্নয়ন সূচকে শক্তিশালী অবস্থান বলে দিচ্ছে ইরান কতটা অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে। শিক্ষা, বিজ্ঞান, উদ্ভাবন, প্রযুক্তিগত উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখন বিশ্বে নেতৃস্থানীয় দেশের তালিকায় রয়েছে দেশটি। আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বর্তমানে ইরানের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। ন্যানো প্রযুক্তিতে দেশটির অবস্থান বিশ্বে তৃতীয়। সামরিক শক্তির দিক থেকে ইরানের অবস্থান বিশ্বে ষষ্ঠ, সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ শিল্পে ষষ্ঠ, অ্যারোস্পেস, সামরিক ও বেসামরিক বিমান শিল্প, কৃত্রিম উপগ্রহ ও মহাকাশ সংক্রান্ত প্রযুক্তিতে অষ্টম, চিকিৎসা খাতে দশম, কৃষিতে দশম এবং শিল্প খাতে ইরানের অবস্থান বিশ্বে ১৯তম।

ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর অর্থনৈতিক খাতসহ কোনো কোনো খাতে ইরানি জনগণ বাইরের শত্রুর নজিরবিহীন বাধা আর নিষেধাজ্ঞার কারণে বেশ অসুবিধা ও হয়রানির শিকার হলেও এ সবকিছু দেশটির অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারেনি মোটেও। বরং এসব বাধা ও নিষেধাজ্ঞা ইরানের জন্য শাপে বরে পরিণত হচ্ছে এবং যেসব খাতেই বাধা আসছে, দেশটি সেসব খাতে হয়ে উঠছে স্বয়ংসম্পূর্ণ।

পাশ্চাত্যের ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের তেল রপ্তানির আয় কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও বা রপ্তানি আয়ের অর্থের প্রবাহ দেশে আসতে দেরি হলেও ইরান পণ্যের বিনিময়ে পণ্য প্রদান ব্যবস্থাসহ নানা ধরনের বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করে এ সমস্যার সমাধান করছে। এ ছাড়াও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যসহ তেলবহির্ভূত নানা পণ্যের রপ্তানি বাড়িয়ে দিয়ে ইরান তার অর্থনীতিকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের নির্ভরতা থেকে অনেকাংশে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছে। এভাবে পাশ্চাত্যের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি হয়ে উঠছে বহুমুখী, বিচিত্রময় ও স্বনির্ভর।

ইসলামি বিপ্লবের ৪৩তম বিজয়বার্ষিকী সামনে রেখে দেশটিতে এবার অসংখ্য উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়। ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি ৬ ফেব্রুয়ারি এক ভিডিও কনফারেন্সে সারা দেশে ১৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগসহ ৪৮টি বড় শিল্প প্রকল্প শুরু করার নির্দেশ দেন। প্রকল্পগুলো দেশের বিভিন্ন প্রদেশের ২৭টি শহরে বাস্তবায়িত হতে চলেছে। এ ছাড়া দেশব্যাপী ৪৬৮টি শিল্প ও খনি প্রকল্প, ৪৮৪টি পরিবহণ প্রকল্প, ২ হাজার ৯৫০টি শিক্ষামূলক প্রকল্প এবং অসংখ্য সামুদ্রিক ও পরিবহণ প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়।

সাইদুল ইসলাম : লেখক ও প্রাবন্ধিক

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন