সুশৃঙ্খল জীবনযাপন হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়
jugantor
সুশৃঙ্খল জীবনযাপন হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়

  ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ  

২২ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চিকিৎসকদের শপথ নিতে হয়, তারা কারও ক্ষতি করবেন না বা তাদের দ্বারা কারও কোনো ক্ষতি হবে না। পেশাগত জীবনে তারা আরও একটি অঘোষিত নিয়ম মেনে চলেন; তা হলো দেখা বা জানা সত্ত্বেও চিকিৎসকরা তাদের সহকর্মীদের ভুলভ্রান্তি, অবজ্ঞা, অবহেলা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নীরব থাকেন বা এড়িয়ে চলেন। চিকিৎসকরা ভুল হলে তা প্রায়ই স্বীকার করতে চান না। চিকিৎসা পেশার জন্য এটি একটি বড় ধরনের বিপজ্জনক সমস্যা। যুক্তরাষ্ট্রের সার্জনরা প্রতি সপ্তাহে অন্তত ৪০ বার ভুল অঙ্গপ্রত্যঙ্গে অস্ত্রোপচার করে থাকেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রায় ২৫ শতাংশ রোগী চিকিৎসক বা নার্সদের কোনো না কোনো ভুলভ্রান্তির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হন। চিকিৎসক কর্তৃক চিকিৎসাসংক্রান্ত ভুলভ্রান্তিকে যদি রোগ ধরা হয়, তবে এ রোগ হবে যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের মৃত্যুর মধ্যে ষষ্ঠ প্রধান মৃত্যুর কারণ।

শিক্ষাদীক্ষা, জ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার কারণে চিকিৎসকদের মধ্যে একধরনের অহংবোধ জন্ম নেয়। এ অহংবোধ চিকিৎসকদের সত্যকে সত্য, মিথ্যাকে মিথ্যা বলতে প্রায়ই বিরত রাখে। এ কর্তৃত্ববাদী মনোভাবের কারণে মানুষ চিকিৎসকদের কাছ থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বৈজ্ঞানিক সত্যগুলো জানার সুবিধা থেকে অধিকাংশ সময় বঞ্চিত হয়। ফলে সত্য প্রকাশ না পাওয়ার কারণে চরম মূল্য দিতে হয় মানুষকে। অতি সম্প্রতি বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ একজন চিকিৎসক ড. ডি. লান্ডেল, এম. ডি. শেষ পর্যন্ত তার দীর্ঘদিনের ভুলের কথা অকপটে স্বীকার করলেন এবং বিশ্ববাসীকে জানালেন, স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের আসল কারণ। ড. ডি. লান্ডেল তার দীর্ঘ ২৫ বছরের পেশাগত জীবনে প্রায় ৫ হাজার বাইপাস সার্জারি করেছেন। তিনি বলেছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রকৃত সত্যের আলোকে এখন সময় এসেছে আসল কথা মানুষকে জানানো। চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকরা যুগ যুগ বলে এসেছেন, রক্তে মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণের কোলেস্টেরলের কারণে হার্ট অ্যাটাক হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে চিকিৎসকরা অনন্তকাল থেকে রোগীদের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমানো এবং চর্বিজাতীয় খাবার না খেতে পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন। চিকিৎসকদের ধারণা-চর্বিজাতীয় খাবার কম খেলে এমনিতেই রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে আসবে। কিন্তু এ ধারণা সত্যি নয়। কারণ শরীরে কোলেস্টেরল বৃদ্ধির মূল কারণ চর্বিজাতীয় খাবার নয় বরং অত্যাধিক পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাজাতীয় খাবার খাওয়া। শরীরের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কোলেস্টেরল লিভারে গ্লুকোজ থেকে সংশ্লেষণের মাধ্যমে তৈরি হয়ে থাকে। বাকি কোলেস্টেরল আসে কোলেস্টেরলসমৃদ্ধ খাবার থেকে। অদ্যাবধি কোলেস্টেরল এবং সম্পৃক্ত চর্বি হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের কারণ নয়-এ কথা বলা চিকিৎসাশাস্ত্রে অপরাধ বলে গণ্য করা হতো। কিন্তু এখন আর সেই থিয়োরি নৈতিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে হালে পানি পাচ্ছে না।

মাত্র কয়েক বছর আগে আবিষ্কৃত হলো-হৃৎপিণ্ডের শিরা-উপশিরার দেওয়ালে প্রদাহ সৃষ্টিই হৃদ্রোগের মূল কারণ। মস্তিষ্কের শিরা-উপশিরার দেওয়ালে অনুরূপ প্রদাহ সৃষ্টি স্ট্রোকের কারণ। সনাতনী ধারায় চিকিৎসকরা যেভাবে খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়ে আসছেন, তাতে মানুষের মধ্যে মহামারি আকারে ওজন বাড়তে থাকল আর সৃষ্টি হলো জটিল রোগ ডায়াবেটিস। এ সমস্যা হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ভয়াবহতাকে আরও জটিল করে তুলল। শুধু তাই নয়, ভুল খাদ্যাভ্যাসের ফলে সৃষ্ট বিভিন্ন জটিল রোগের কারণে একদিকে যেমন বাড়ল ভোগান্তি, অসুস্থতা, মৃত্যুহার, অন্যদিকে এসব স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবিলায় অর্থনৈতিক চাপ সরকারের ওপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা রূপে আবির্ভূত হলো।

রোগীর স্বাস্থ্য সমস্যা বুঝতে ওষুধ কোম্পানিগুলো দেরি করে না। রোগ সৃষ্টির আগেই অলৌকিকভাবে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে বা ভাগ্য যাচাই করে অনেক সময় ওষুধ কোম্পানিগুলো হরেক রকম ওষুধ আবিষ্কার করে ফেলে। এ ক্ষেত্রেও তাই হলো। চিকিৎসকরা মানুষকে পরামর্শ দিল-চর্বি খাওয়া বন্ধ করে দিতে আর রক্তে কোলেস্টেরল কমানোর জন্য ওষুধ কোম্পানিগুলো আবিষ্কার করে ফেলল স্ট্যাটিন গ্রুপের অসংখ্য জাদুর ওষুধ। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ শতাংশ মানুষ কম চর্বি খাওয়া আর অধিক পরিমাণে স্ট্যাটিন গ্রুপের ওষুধ খাওয়া শুরু করল। এতৎসত্ত্বেও বছরের পর বছর স্ট্রোক আর হৃদ্রোগের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুহার বেড়েই চলল। রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমা সত্ত্বেও এত অধিকহারে কেন মানুষ মারা যাচ্ছে, তা নিয়ে চিকিৎসকরা খুব বেশি একটা মাথা ঘামালেন না। এ নিয়ে চিন্তাভাবনা করলেও সম্ভবত ব্যবসায়িক কারণে চিকিৎসকরা মুখ খুলতে সাহস পেলেন না। এর অর্থ দাঁড়ায়, স্ট্রোক বা হৃদ্রোগের জন্য সরাসরি কোলেস্টেরল বা সম্পৃক্ত চর্বি দায়ী নয়। হৃৎপিণ্ড বা মস্তিষ্কের শিরা-উপশিরার দেওয়ালগুলো প্রদাহে আক্রান্ত হলে এবং প্রদাহের কারণে আহত বা ক্ষত সৃষ্টি হলে এসব স্থানে কোলেস্টেরল, প্লাটিলেট ও আঁশজাতীয় পদার্থ আটকা পড়ে। এ থেকে শুরু হয় মূল সমস্যা, যাকে সহজ ভাষায় বলা হয় স্ট্রোক ও হৃদ্রোগ।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষ হৃদ্রোগে ভোগে। ২ কোটি মানুষ ডায়াবেটিস এবং ৫ কোটি ৭০ লাখ মানুষ প্রি-ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। প্রতিবছর এ স্বাস্থ্য সমস্যা ক্রমাগত অধিক হারে তরুণ-তরুণীদের আক্রান্ত করছে। ফিরে যাই কোলেস্টেরল মিথে। এতক্ষণ যা বলা হলো, তার মর্মার্থ এ রকম। হৃৎপিণ্ডের শিরা-উপশিরা প্রদাহে আক্রান্ত না হলে শিরা-উপশিরার দেওয়ালে কোলেস্টেরল না জমে বা আটকা না পড়ে প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই রক্তপ্রবাহে প্রকৃতিগতভাবে ভেসে বেড়ায়, হৃদ্রোগ বা স্ট্রোক তৈরি করে না। কোলেস্টেরল হলো শরীরের জন্য এক মহামূল্যবান রাসায়নিক যৌগ। আমাদের শরীরে কয়েকশ কোটি সেল বা কোষপ্রাচীর তৈরির জন্য কোলেস্টেরল প্রয়োজন হয়। কোলেস্টেরলের অভাবে কোষপ্রাচীর ঠিকমতো তৈরি হতে পারে না। অথচ ভালো-মন্দ বিচার না করেই এ প্রয়োজনীয় উপকরণটি কমানোর জন্য মানুষকে মুড়ি-মুড়কির মতো ওষুধ খেতে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসকরা।

শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। শরীর ভাইরাস, জীবাণু বা অন্যান্য বহিরাগত পদার্থ দ্বারা আক্রান্ত হলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রদাহের সৃষ্টি হয় এবং তার প্রতিক্রিয়ায় শরীরের প্রতিরক্ষার নিমিত্তে তৈরি হয় অ্যান্টিবডিসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবজ। শরীরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দ্বারা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও অনান্য বহিরাগত পদার্থের আক্রমণ প্রতিহত করা গেলে প্রদাহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেরে যায়; কিন্তু প্রদাহের আক্রমণ যদি ক্রমাগত চলতে থাকে এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে শিরা-উপশিরার দেওয়ালে কোলেস্টেরল, আঁশ ও প্লাটিলেট জমে গিয়ে শিরা-উপশিরায় রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। রক্তের চাপ বাড়লে শিরা-উপশিরাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ঘটে ও রোগী মারা যায় বা অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় স্ট্রোক। শিরা-উপশিরা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে হৃৎপিণ্ডের কোনো অংশে অক্সিজেন ও অ্যানজাইমের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় বলে কোষ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় বা মারা যায়। এ অবস্থাকে বিজ্ঞানের ভাষায় মাইওকার্ডিয়াল ইনফার্কশন এবং সহজ ভাষায় বোঝার জন্য হার্ট অ্যাটাক বলা হয়।

স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের জন্য দায়ী প্রদাহসৃষ্টিকারী রাসায়নিক যৌগগুলো কী কী তা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। এসব কালপ্রিট রাসায়নিক যৌগগুলো আমাদের অতি পরিচিত এবং অনেকের কাছে অতি প্রিয় বস্তু, যা না হলে তাদের জীবন অচল হয়ে যায়। প্রথমত, ধূমপান থেকে নির্গত নিকোটিন ও অন্যান্য উপকরণ যা হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্কের শিরা-উপশিরার প্রদাহের জন্য মূল ভূমিকা পালন করে থাকে। আমাদের দৈনন্দিন খাবারে সম্পৃক্ত চর্বি (saturated fat) স্বল্পতা ও শিরা-উপশিরার প্রদাহের অন্য এক প্রধান কারণ। এতকাল আমরা জেনে এসেছি, সম্পৃক্ত চর্বির স্বল্পতা ও অসম্পৃক্ত চর্বি বা তেলের আধিক্য স্বাস্থ্যসম্মত। কর্ন, সানফ্লাওয়ার ও সয়াবিন তেল এবং বহু প্রক্রিয়াজাত খাবারে রয়েছে ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড। অত্যাধিক মাত্রায় ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড গ্রহণ স্বাস্থ্যসম্মত নয়। কারণ, মাত্রারিক্ত ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড থেকে শরীরে সাইটোকাইন নামক এক ধরনের রাসায়নিক যৌগ তৈরি হয়। সাইটোকাইন যৌগগুলো শিরা-উপশিরার প্রদাহ সৃষ্টিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। শরীরের কোষপুঞ্জিতে ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ কমিয়ে আনার জন্য আমাদের দরকার ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা। ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড কোষ থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড বের করে দিয়ে দুটো অ্যাসিডের স্বাস্থ্যসম্মত ভারসাম্য তৈরি করে।

বর্তমানে আমেরিকানরা যেসব খাবার খায়, তাতে ওমেগা-৬ ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের অনুপাত হলো ১৫:১ থেকে ৩০:১। এতে বোঝা যায়, ওমেগা-৩ এর পরিবর্তে ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিডের আধিক্যের কারণে মাত্রাতিরিক্ত সাইটোকাইন তৈরির ফলে শিরা-উপশিরায় প্রদাহ সৃষ্টির কারণে আমেরিকানরা এত অধিক হারে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হচ্ছে। ওমেগা-৬ ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের স্বাস্থ্যসম্মত অনুপাত হওয়া উচিত ৩:১। সুস্থ শরীর, মস্তিষ্ক ও হৃৎপিণ্ডের জন্য আমাদের ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ মাছের তেল, তিসির তেল, হেরিং ও সার্ডিনের তেল, কডলিভার তেল, সেমন ও ম্যাকারেল মাছ, বাদাম, বাটার নাট, ফলমূল, সবুজ শাকসবজি বেশি বেশি খাওয়া উচিত।

শরীর, মস্তিষ্ক ও হৃৎপিণ্ডকে সুস্থ রাখার জন্য পরিশোধিত চিনি, পরিশোধিত আটা, ময়দা এবং এসব শর্করা থেকে প্রস্তুত যাবতীয় প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খেতে হবে বা পরিহার করতে হবে। শিরা-উপশিরার প্রদাহ সৃষ্টির ক্ষেত্রে চিনি বা বিভিন্ন শর্করা বা চিনিসমৃদ্ধ খাবার এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। পরিশোধিত চিনি বেশি খাওয়া হলে তা অতি দ্রুত রক্ত প্রবাহে পৌঁছে যায়। ইনসুলিন এই চিনি বা অন্যান্য শর্করা থেকে উৎপন্ন গ্লুকোজকে কোষে পাঠিয়ে দেয় অথবা লিভারে গ্লাইকোজেন হিসাবে সঞ্চিত রাখে। মনে রাখা দরকার, সীমিত ইনসুলিনের গ্লুকোজ মেটাবলিজমের (রাসায়নিক রূপান্তর) ক্ষমতাও সীমিত। মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে চিনি বা শর্করা গ্রহণ করলে অব্যবহৃত গ্লুকোজ কোষ বা লিভারে জমা না হয়ে রক্তে ভেসে বেড়ায়। রক্তে ভেসে বেড়ানো কোটি কোটি গ্লুকোজ অণু শিরা-উপশিরার দেওয়ালে অনবরত আঘাত হানে, আহত করে এবং পরিণতিতে প্রদাহ ও ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এ কারণেই ডায়াবেটিসের রোগীরা অত্যাধিকভাবে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের শিকার হয়।

আগেই বলা হয়েছে, ড. লান্ডেল তার ২৫ বছরের পেশাগত জীবনে প্রায় ৫ হাজার বাইপাস সার্জারি করেছেন। তিনি বাইপাসের প্রত্যেক রোগীর ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে পেয়েছেন, শিরা-উপশিরার প্রদাহই ছিল তাদের হার্ট অ্যাটাকের মূল কারণ। দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহের কারণে আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত শিরা-উপশিরায় কোলেস্টেরল, আঁশ ও প্লাটিলেট জমে গিয়ে সৃষ্টি করেছে ইশকিমিয়া ও মাইওকার্ডিয়াল ইনফার্কশন এবং ফলস্বরূপ হার্ট অ্যাটাক।

স্ট্রোক ও হৃদ্রোগের কারণ, প্রতিরোধ ও প্রতিকার সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য আবিষ্কৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনধারা, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন স্ট্রোক ও হৃদ্রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং মৃত্যুহার কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। রোগ হয়ে গেলে সুস্থতা বা জীবনরক্ষার জন্য আমাদের প্রতিকার খুঁজতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কার্যকর বা আংশিক কার্যকর হলেও রোগ প্রতিকারের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত চিকিৎসা, অ্যানজিওপ্লাস্টি বা বাইপাস সার্জারির মতো ইন্টারভেনশন সব সময় সুফল বয়ে আনে না। তাই প্রতিকারের চেয়ে রোগ বা রোগের কারণগুলো প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করাই চিকিৎসাশাস্ত্রের মূল লক্ষ্য থেকে যায়। তবে স্ট্রোক বা হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে গেলে তখন প্রতিকারে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো বিকল্প থাকে না।

স্ট্রোক ও হৃদ্রোগ প্রতিকারে গত তিন দশকে বিভিন্ন কার্যকর ওষুধ আবিষ্কারে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ইশকিমিয়া ও মাইওকার্ডিয়াল ইনফার্কশন প্রতিকারে অ্যানজিওপ্লাস্টি ও বাইপাস সার্জারি বিশ্বজুড়ে সাফল্যজনক চিকিৎসা হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছে, যদিও এসব ইন্টারভেনশনের কারণে পরে অনেক ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।

অবজ্ঞা, অবহেলা, সময়মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করা, পরিমিত পুষ্টিকর সুষম খাবার না খাওয়া, ধূমপান পরিহার না করা, ব্যায়াম না করা, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান না করা, লাইফস্টাইলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আনা, দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনযাপন করতে না পারার কারণে আমরা স্ট্রোক ও হৃদ্রোগের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হই। সুস্থ থাকা আল্লাহর এক বিশেষ নিয়ামত। তাই নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন ও লাইফস্টাইল পরিবর্তন করে সবাই সুস্থ থাকার ব্রত গ্রহণ করবেন-এটাই প্রত্যাশা করি।

ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ফার্মেসি বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

drmuniruddin@gmail.com

সুশৃঙ্খল জীবনযাপন হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়

 ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ 
২২ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চিকিৎসকদের শপথ নিতে হয়, তারা কারও ক্ষতি করবেন না বা তাদের দ্বারা কারও কোনো ক্ষতি হবে না। পেশাগত জীবনে তারা আরও একটি অঘোষিত নিয়ম মেনে চলেন; তা হলো দেখা বা জানা সত্ত্বেও চিকিৎসকরা তাদের সহকর্মীদের ভুলভ্রান্তি, অবজ্ঞা, অবহেলা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নীরব থাকেন বা এড়িয়ে চলেন। চিকিৎসকরা ভুল হলে তা প্রায়ই স্বীকার করতে চান না। চিকিৎসা পেশার জন্য এটি একটি বড় ধরনের বিপজ্জনক সমস্যা। যুক্তরাষ্ট্রের সার্জনরা প্রতি সপ্তাহে অন্তত ৪০ বার ভুল অঙ্গপ্রত্যঙ্গে অস্ত্রোপচার করে থাকেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রায় ২৫ শতাংশ রোগী চিকিৎসক বা নার্সদের কোনো না কোনো ভুলভ্রান্তির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হন। চিকিৎসক কর্তৃক চিকিৎসাসংক্রান্ত ভুলভ্রান্তিকে যদি রোগ ধরা হয়, তবে এ রোগ হবে যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের মৃত্যুর মধ্যে ষষ্ঠ প্রধান মৃত্যুর কারণ।

শিক্ষাদীক্ষা, জ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার কারণে চিকিৎসকদের মধ্যে একধরনের অহংবোধ জন্ম নেয়। এ অহংবোধ চিকিৎসকদের সত্যকে সত্য, মিথ্যাকে মিথ্যা বলতে প্রায়ই বিরত রাখে। এ কর্তৃত্ববাদী মনোভাবের কারণে মানুষ চিকিৎসকদের কাছ থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বৈজ্ঞানিক সত্যগুলো জানার সুবিধা থেকে অধিকাংশ সময় বঞ্চিত হয়। ফলে সত্য প্রকাশ না পাওয়ার কারণে চরম মূল্য দিতে হয় মানুষকে। অতি সম্প্রতি বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ একজন চিকিৎসক ড. ডি. লান্ডেল, এম. ডি. শেষ পর্যন্ত তার দীর্ঘদিনের ভুলের কথা অকপটে স্বীকার করলেন এবং বিশ্ববাসীকে জানালেন, স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের আসল কারণ। ড. ডি. লান্ডেল তার দীর্ঘ ২৫ বছরের পেশাগত জীবনে প্রায় ৫ হাজার বাইপাস সার্জারি করেছেন। তিনি বলেছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রকৃত সত্যের আলোকে এখন সময় এসেছে আসল কথা মানুষকে জানানো। চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকরা যুগ যুগ বলে এসেছেন, রক্তে মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণের কোলেস্টেরলের কারণে হার্ট অ্যাটাক হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে চিকিৎসকরা অনন্তকাল থেকে রোগীদের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমানো এবং চর্বিজাতীয় খাবার না খেতে পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন। চিকিৎসকদের ধারণা-চর্বিজাতীয় খাবার কম খেলে এমনিতেই রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে আসবে। কিন্তু এ ধারণা সত্যি নয়। কারণ শরীরে কোলেস্টেরল বৃদ্ধির মূল কারণ চর্বিজাতীয় খাবার নয় বরং অত্যাধিক পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাজাতীয় খাবার খাওয়া। শরীরের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কোলেস্টেরল লিভারে গ্লুকোজ থেকে সংশ্লেষণের মাধ্যমে তৈরি হয়ে থাকে। বাকি কোলেস্টেরল আসে কোলেস্টেরলসমৃদ্ধ খাবার থেকে। অদ্যাবধি কোলেস্টেরল এবং সম্পৃক্ত চর্বি হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের কারণ নয়-এ কথা বলা চিকিৎসাশাস্ত্রে অপরাধ বলে গণ্য করা হতো। কিন্তু এখন আর সেই থিয়োরি নৈতিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে হালে পানি পাচ্ছে না।

মাত্র কয়েক বছর আগে আবিষ্কৃত হলো-হৃৎপিণ্ডের শিরা-উপশিরার দেওয়ালে প্রদাহ সৃষ্টিই হৃদ্রোগের মূল কারণ। মস্তিষ্কের শিরা-উপশিরার দেওয়ালে অনুরূপ প্রদাহ সৃষ্টি স্ট্রোকের কারণ। সনাতনী ধারায় চিকিৎসকরা যেভাবে খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়ে আসছেন, তাতে মানুষের মধ্যে মহামারি আকারে ওজন বাড়তে থাকল আর সৃষ্টি হলো জটিল রোগ ডায়াবেটিস। এ সমস্যা হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ভয়াবহতাকে আরও জটিল করে তুলল। শুধু তাই নয়, ভুল খাদ্যাভ্যাসের ফলে সৃষ্ট বিভিন্ন জটিল রোগের কারণে একদিকে যেমন বাড়ল ভোগান্তি, অসুস্থতা, মৃত্যুহার, অন্যদিকে এসব স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবিলায় অর্থনৈতিক চাপ সরকারের ওপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা রূপে আবির্ভূত হলো।

রোগীর স্বাস্থ্য সমস্যা বুঝতে ওষুধ কোম্পানিগুলো দেরি করে না। রোগ সৃষ্টির আগেই অলৌকিকভাবে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে বা ভাগ্য যাচাই করে অনেক সময় ওষুধ কোম্পানিগুলো হরেক রকম ওষুধ আবিষ্কার করে ফেলে। এ ক্ষেত্রেও তাই হলো। চিকিৎসকরা মানুষকে পরামর্শ দিল-চর্বি খাওয়া বন্ধ করে দিতে আর রক্তে কোলেস্টেরল কমানোর জন্য ওষুধ কোম্পানিগুলো আবিষ্কার করে ফেলল স্ট্যাটিন গ্রুপের অসংখ্য জাদুর ওষুধ। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ শতাংশ মানুষ কম চর্বি খাওয়া আর অধিক পরিমাণে স্ট্যাটিন গ্রুপের ওষুধ খাওয়া শুরু করল। এতৎসত্ত্বেও বছরের পর বছর স্ট্রোক আর হৃদ্রোগের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুহার বেড়েই চলল। রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমা সত্ত্বেও এত অধিকহারে কেন মানুষ মারা যাচ্ছে, তা নিয়ে চিকিৎসকরা খুব বেশি একটা মাথা ঘামালেন না। এ নিয়ে চিন্তাভাবনা করলেও সম্ভবত ব্যবসায়িক কারণে চিকিৎসকরা মুখ খুলতে সাহস পেলেন না। এর অর্থ দাঁড়ায়, স্ট্রোক বা হৃদ্রোগের জন্য সরাসরি কোলেস্টেরল বা সম্পৃক্ত চর্বি দায়ী নয়। হৃৎপিণ্ড বা মস্তিষ্কের শিরা-উপশিরার দেওয়ালগুলো প্রদাহে আক্রান্ত হলে এবং প্রদাহের কারণে আহত বা ক্ষত সৃষ্টি হলে এসব স্থানে কোলেস্টেরল, প্লাটিলেট ও আঁশজাতীয় পদার্থ আটকা পড়ে। এ থেকে শুরু হয় মূল সমস্যা, যাকে সহজ ভাষায় বলা হয় স্ট্রোক ও হৃদ্রোগ।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষ হৃদ্রোগে ভোগে। ২ কোটি মানুষ ডায়াবেটিস এবং ৫ কোটি ৭০ লাখ মানুষ প্রি-ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। প্রতিবছর এ স্বাস্থ্য সমস্যা ক্রমাগত অধিক হারে তরুণ-তরুণীদের আক্রান্ত করছে। ফিরে যাই কোলেস্টেরল মিথে। এতক্ষণ যা বলা হলো, তার মর্মার্থ এ রকম। হৃৎপিণ্ডের শিরা-উপশিরা প্রদাহে আক্রান্ত না হলে শিরা-উপশিরার দেওয়ালে কোলেস্টেরল না জমে বা আটকা না পড়ে প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই রক্তপ্রবাহে প্রকৃতিগতভাবে ভেসে বেড়ায়, হৃদ্রোগ বা স্ট্রোক তৈরি করে না। কোলেস্টেরল হলো শরীরের জন্য এক মহামূল্যবান রাসায়নিক যৌগ। আমাদের শরীরে কয়েকশ কোটি সেল বা কোষপ্রাচীর তৈরির জন্য কোলেস্টেরল প্রয়োজন হয়। কোলেস্টেরলের অভাবে কোষপ্রাচীর ঠিকমতো তৈরি হতে পারে না। অথচ ভালো-মন্দ বিচার না করেই এ প্রয়োজনীয় উপকরণটি কমানোর জন্য মানুষকে মুড়ি-মুড়কির মতো ওষুধ খেতে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসকরা।

শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। শরীর ভাইরাস, জীবাণু বা অন্যান্য বহিরাগত পদার্থ দ্বারা আক্রান্ত হলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রদাহের সৃষ্টি হয় এবং তার প্রতিক্রিয়ায় শরীরের প্রতিরক্ষার নিমিত্তে তৈরি হয় অ্যান্টিবডিসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবজ। শরীরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দ্বারা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও অনান্য বহিরাগত পদার্থের আক্রমণ প্রতিহত করা গেলে প্রদাহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেরে যায়; কিন্তু প্রদাহের আক্রমণ যদি ক্রমাগত চলতে থাকে এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে শিরা-উপশিরার দেওয়ালে কোলেস্টেরল, আঁশ ও প্লাটিলেট জমে গিয়ে শিরা-উপশিরায় রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। রক্তের চাপ বাড়লে শিরা-উপশিরাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ঘটে ও রোগী মারা যায় বা অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় স্ট্রোক। শিরা-উপশিরা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে হৃৎপিণ্ডের কোনো অংশে অক্সিজেন ও অ্যানজাইমের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় বলে কোষ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় বা মারা যায়। এ অবস্থাকে বিজ্ঞানের ভাষায় মাইওকার্ডিয়াল ইনফার্কশন এবং সহজ ভাষায় বোঝার জন্য হার্ট অ্যাটাক বলা হয়।

স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের জন্য দায়ী প্রদাহসৃষ্টিকারী রাসায়নিক যৌগগুলো কী কী তা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। এসব কালপ্রিট রাসায়নিক যৌগগুলো আমাদের অতি পরিচিত এবং অনেকের কাছে অতি প্রিয় বস্তু, যা না হলে তাদের জীবন অচল হয়ে যায়। প্রথমত, ধূমপান থেকে নির্গত নিকোটিন ও অন্যান্য উপকরণ যা হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্কের শিরা-উপশিরার প্রদাহের জন্য মূল ভূমিকা পালন করে থাকে। আমাদের দৈনন্দিন খাবারে সম্পৃক্ত চর্বি (saturated fat) স্বল্পতা ও শিরা-উপশিরার প্রদাহের অন্য এক প্রধান কারণ। এতকাল আমরা জেনে এসেছি, সম্পৃক্ত চর্বির স্বল্পতা ও অসম্পৃক্ত চর্বি বা তেলের আধিক্য স্বাস্থ্যসম্মত। কর্ন, সানফ্লাওয়ার ও সয়াবিন তেল এবং বহু প্রক্রিয়াজাত খাবারে রয়েছে ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড। অত্যাধিক মাত্রায় ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড গ্রহণ স্বাস্থ্যসম্মত নয়। কারণ, মাত্রারিক্ত ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড থেকে শরীরে সাইটোকাইন নামক এক ধরনের রাসায়নিক যৌগ তৈরি হয়। সাইটোকাইন যৌগগুলো শিরা-উপশিরার প্রদাহ সৃষ্টিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। শরীরের কোষপুঞ্জিতে ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ কমিয়ে আনার জন্য আমাদের দরকার ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা। ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড কোষ থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড বের করে দিয়ে দুটো অ্যাসিডের স্বাস্থ্যসম্মত ভারসাম্য তৈরি করে।

বর্তমানে আমেরিকানরা যেসব খাবার খায়, তাতে ওমেগা-৬ ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের অনুপাত হলো ১৫:১ থেকে ৩০:১। এতে বোঝা যায়, ওমেগা-৩ এর পরিবর্তে ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিডের আধিক্যের কারণে মাত্রাতিরিক্ত সাইটোকাইন তৈরির ফলে শিরা-উপশিরায় প্রদাহ সৃষ্টির কারণে আমেরিকানরা এত অধিক হারে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হচ্ছে। ওমেগা-৬ ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের স্বাস্থ্যসম্মত অনুপাত হওয়া উচিত ৩:১। সুস্থ শরীর, মস্তিষ্ক ও হৃৎপিণ্ডের জন্য আমাদের ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ মাছের তেল, তিসির তেল, হেরিং ও সার্ডিনের তেল, কডলিভার তেল, সেমন ও ম্যাকারেল মাছ, বাদাম, বাটার নাট, ফলমূল, সবুজ শাকসবজি বেশি বেশি খাওয়া উচিত।

শরীর, মস্তিষ্ক ও হৃৎপিণ্ডকে সুস্থ রাখার জন্য পরিশোধিত চিনি, পরিশোধিত আটা, ময়দা এবং এসব শর্করা থেকে প্রস্তুত যাবতীয় প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খেতে হবে বা পরিহার করতে হবে। শিরা-উপশিরার প্রদাহ সৃষ্টির ক্ষেত্রে চিনি বা বিভিন্ন শর্করা বা চিনিসমৃদ্ধ খাবার এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। পরিশোধিত চিনি বেশি খাওয়া হলে তা অতি দ্রুত রক্ত প্রবাহে পৌঁছে যায়। ইনসুলিন এই চিনি বা অন্যান্য শর্করা থেকে উৎপন্ন গ্লুকোজকে কোষে পাঠিয়ে দেয় অথবা লিভারে গ্লাইকোজেন হিসাবে সঞ্চিত রাখে। মনে রাখা দরকার, সীমিত ইনসুলিনের গ্লুকোজ মেটাবলিজমের (রাসায়নিক রূপান্তর) ক্ষমতাও সীমিত। মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে চিনি বা শর্করা গ্রহণ করলে অব্যবহৃত গ্লুকোজ কোষ বা লিভারে জমা না হয়ে রক্তে ভেসে বেড়ায়। রক্তে ভেসে বেড়ানো কোটি কোটি গ্লুকোজ অণু শিরা-উপশিরার দেওয়ালে অনবরত আঘাত হানে, আহত করে এবং পরিণতিতে প্রদাহ ও ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এ কারণেই ডায়াবেটিসের রোগীরা অত্যাধিকভাবে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের শিকার হয়।

আগেই বলা হয়েছে, ড. লান্ডেল তার ২৫ বছরের পেশাগত জীবনে প্রায় ৫ হাজার বাইপাস সার্জারি করেছেন। তিনি বাইপাসের প্রত্যেক রোগীর ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে পেয়েছেন, শিরা-উপশিরার প্রদাহই ছিল তাদের হার্ট অ্যাটাকের মূল কারণ। দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহের কারণে আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত শিরা-উপশিরায় কোলেস্টেরল, আঁশ ও প্লাটিলেট জমে গিয়ে সৃষ্টি করেছে ইশকিমিয়া ও মাইওকার্ডিয়াল ইনফার্কশন এবং ফলস্বরূপ হার্ট অ্যাটাক।

স্ট্রোক ও হৃদ্রোগের কারণ, প্রতিরোধ ও প্রতিকার সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য আবিষ্কৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনধারা, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন স্ট্রোক ও হৃদ্রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং মৃত্যুহার কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। রোগ হয়ে গেলে সুস্থতা বা জীবনরক্ষার জন্য আমাদের প্রতিকার খুঁজতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কার্যকর বা আংশিক কার্যকর হলেও রোগ প্রতিকারের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত চিকিৎসা, অ্যানজিওপ্লাস্টি বা বাইপাস সার্জারির মতো ইন্টারভেনশন সব সময় সুফল বয়ে আনে না। তাই প্রতিকারের চেয়ে রোগ বা রোগের কারণগুলো প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করাই চিকিৎসাশাস্ত্রের মূল লক্ষ্য থেকে যায়। তবে স্ট্রোক বা হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে গেলে তখন প্রতিকারে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো বিকল্প থাকে না।

স্ট্রোক ও হৃদ্রোগ প্রতিকারে গত তিন দশকে বিভিন্ন কার্যকর ওষুধ আবিষ্কারে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ইশকিমিয়া ও মাইওকার্ডিয়াল ইনফার্কশন প্রতিকারে অ্যানজিওপ্লাস্টি ও বাইপাস সার্জারি বিশ্বজুড়ে সাফল্যজনক চিকিৎসা হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছে, যদিও এসব ইন্টারভেনশনের কারণে পরে অনেক ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।

অবজ্ঞা, অবহেলা, সময়মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করা, পরিমিত পুষ্টিকর সুষম খাবার না খাওয়া, ধূমপান পরিহার না করা, ব্যায়াম না করা, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান না করা, লাইফস্টাইলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আনা, দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনযাপন করতে না পারার কারণে আমরা স্ট্রোক ও হৃদ্রোগের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হই। সুস্থ থাকা আল্লাহর এক বিশেষ নিয়ামত। তাই নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন ও লাইফস্টাইল পরিবর্তন করে সবাই সুস্থ থাকার ব্রত গ্রহণ করবেন-এটাই প্রত্যাশা করি।

ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ফার্মেসি বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

drmuniruddin@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন