বাজার অস্থিরতা : নেপথ্য চিত্র ও করণীয়
jugantor
বাজার অস্থিরতা : নেপথ্য চিত্র ও করণীয়

  তন্ময় চৌধুরী  

২২ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বায়নের এ যুগে জাতীয় বা আঞ্চলিক যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বা অনিয়ন্ত্রিত পরিবর্তন পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অভাবনীয় পরিবর্তন আনতে পারে, যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সব দেশকেই প্রভাবিত করে। আগে থেকে বিদ্যমান মহামারি-প্ররোচিত অর্থনৈতিক ধাক্কা এবং আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে বিরাজমান নানামুখী সংঘাতের দরুন বিশ্বব্যাপী পণ্যের সরবরাহ এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। ফলে বিশ্বব্যাপী অসম গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের মূল্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যে কয়েকটি ভোগ্যপণ্যের দাম সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে সয়াবিন ও পাম তেল। মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণ করাও নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশে গত রমজানের শুরু থেকেই সয়াবিন তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে অস্থির হয়ে ওঠে বাজার। কিন্তু ঈদ-পরবর্তী সময়ে সয়াবিন তেলের দাম আবার বাড়ানোর পর এবার তা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশের বাজারে সয়াবিন তেল ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের হঠাৎ এ অস্বাভাবিক দামবৃদ্ধির পেছনে কাজ করছে অনেক ফ্যাক্টর। এসব সম্পর্কে ধারণা রাখা নাগরিক হিসাবে আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্বও বটে।

দামবৃদ্ধির নেপথ্য কারণগুলো

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্য যুদ্ধের সময় থেকেই ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ছিল। এরপর করোনা মহামারির প্রভাবে পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে ব্যাঘাত ঘটার ফলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। তবে ফেব্রুয়ারি মাসের ইউক্রেন সংকটের পর পরিস্থিতি দ্রুত শোচনীয় হতে শুরু করে। এর ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেক তেল উৎপাদনকারী দেশ উত্তোলন না বাড়িয়ে উলটো তাদের স্বার্থ উদ্ধারে শর্ত জুড়ে দিচ্ছে। ফলে গোটা বিশ্বে সয়াবিনের ডিমান্ড-সাপ্লাইয়ে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর ফলাফল হলো, ভোগ্যপণ্যের লাগামহীন দামবৃদ্ধি।

বিশ্বের প্রায় ৭৫ শতাংশ সানফ্লাওয়ার অয়েলের উৎপাদক রাশিয়া ও ইউক্রেন। যুদ্ধ শুরু হলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সানফ্লাওয়ার অয়েলের সাপ্লাই চেন, যাতে ইউক্রেনের প্রায় ৯৫ শতাংশ রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় সানফ্লাওয়ারের দাম এবং বিকল্প হিসাবে বাড়তে থাকে সয়াবিন ও পাম অয়েলের চাহিদা। এর মধ্যে পাম তেলের সবচেয়ে বড় উৎপাদনকারী, শতকরা বিচারে যা প্রায় ৬০ শতাংশ, ও রপ্তানিকারক দেশ ইন্দোনেশিয়া তাদের নিজস্ব বাজারে তেলের দামবৃদ্ধির কারণে ২৮ এপ্রিল তা অনির্দিষ্টকালের জন্য রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করে। এরপর বিশ্ববাজারে পাম তেলের দাম ৫০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যায়। যদিও ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত পাম তেল উৎপাদনকারী দেশ, সেহেতু উদ্ভূত তেল সংকট বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইনে নাজুক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, করোনাকালীন কর্মী সংকটের কারণে দ্বিতীয় প্রধান সরবরাহকারী দেশ মালয়েশিয়াও আশানুরূপ তেল উৎপাদনে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে বাজারে পাম অয়েলের ঘাটতির কারণে চাহিদা বেড়ে যায় সয়াবিন তেলের। কিন্তু খরার কারণে সয়াবিনের মূল উৎপাদক লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয় গত এক বছরে উৎপাদন বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্চেই আর্জেন্টিনা সয়াবিন তেল রপ্তানি সীমিত করার ঘোষণা দিয়ে রপ্তানি বিরতিতে চলে গিয়েছিল। ফলস্বরূপ, এপ্রিলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ২২ শতাংশ বেড়ে প্রতি মেট্রিক টন দাম ১৪৯৭ ডলারে ওঠে, যা মাসের শেষে গিয়ে ১৯১৯ ডলারে ঠেকেছে।

ভোজ্যতেল ছাড়াও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় চক্রাকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য ও খাদ্যদ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে গেছে। এসব ছাড়াও দেশীয় বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম একটি কারণ হলো সিন্ডিকেট। দেশীয় বাজারে একচেটিয়া আমদানিকারক, কারবারি, মজুতদার, মধ্যস্বত্বভোগী, খুচরা বিক্রেতারা নানা অজুহাতে পণ্যের সাপ্লাই চেনকে বাধাগ্রস্ত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। ফলে আমদানিকৃত এবং দেশীয় উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর মূল্য অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া

দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশই নিট তেল আমদানিকারক হওয়ার কারণে তেলসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে বেশ আঘাত হেনেছে। বাংলাদেশে ভোজ্যতেলের মোট চাহিদার ৯০ শতাংশ আমদানি হয়; যার মধ্যে রয়েছে সয়াবিন, পাম, সূর্যমুখী ও অন্যান্য তেল। মূলত ছয়টি প্রতিষ্ঠান এসব অপরিশোধিত তেল আমদানি করে এবং পরিশোধন শেষে বাজারজাত করে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের মোট সয়াবিনের ৭৩ শতাংশ আমদানি হয় আর্জেন্টিনা থেকে। আর দ্বিতীয় প্রধান সরবরাহকারী হিসাবে রয়েছে ব্রাজিল। এমনিতেই জোগান সংকটের কারণে বৃদ্ধি পেয়েছে তেলের দাম, এর ওপর আবার জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়ে শিপিং চার্জও বেড়েছে। তাই জাহাজ ভাড়াসহ আনুষঙ্গিক খরচ যোগ হয়ে দেশে লিটারপ্রতি সয়াবিন তেলের দাম ১৯৮ টাকায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে মার্কেট ইনসাইডারের তথ্য অনুযায়ী, তেলের দাম রেকর্ড মূল্য হওয়ার পরও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম সবচেয়ে কম। সাধারণত আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানিকৃত দামের ওপর নির্ভর করে ট্যারিফ কমিশনের সহায়তায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তেলের বাজারদর নির্ধারণ করে থাকে। বাজারে এখন যে সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে, তা মূলত দুই বা তিন মাস আগে আমদানি করা। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যের ঊর্ধ্বমুখিতা থাকা সত্ত্বেও সরকার রমজান মাস বিবেচনায় রেখে দাম বৃদ্ধি করেনি, ফলে ব্যবসায়ীরা সাময়িক ক্ষতির সম্মুখীন হন। আবার মার্চে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ১৭৫০ ডলারে উন্নীত হলেও সরকার ভোজ্যতেলের ওপর থেকে আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ, খুচরা পর্যায়ে ৫ শতাংশ এবং তেল পরিশোধনের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও শুল্ক প্রত্যাহারের পর দামে সমন্বয় করে। মূলত শুল্ক ও ভ্যাট উঠিয়ে নেওয়ায় দেশে ভোজ্যতেলের দাম পার্শ্ববর্তী অন্য দেশগুলোর তুলনায় কম রয়েছে। যদিও ক্রয়ক্ষমতার হিসাবে এটি এখনো অনেক বেশি।

পরিত্রাণের উপায়

নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি মূলত বৈশ্বিক পরিস্থিতির ফলাফল। অর্থনীতিবিদরা এর সাময়িক সমাধান হিসাবে দুটি উপায় দেখছেন। প্রথমত, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ভোজ্যতেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করা; দ্বিতীয়ত, দেশীয় প্রেক্ষাপটে সিন্ডিকেট বাণিজ্য এবং মজুতদারি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসাবে সরিষা ও বাদাম তেলকে বিকল্প ভোজ্যতেল হিসাবে প্রচলনেরও প্রস্তাব করেন কিছু অর্থনীতিবিদ। দেশে সরিষার চাষাবাদ জনপ্রিয় করার জন্য কৃষক পর্যায়ে স্বল্প সুদে ঋণ বিতরণ করা গেলে একদিকে কৃষকরা যেমন লাভবান হবেন, অন্যদিকে সরিষা চাষেও তারা উৎসাহিত হবেন। এতে ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমবে। তাছাড়া পণ্যপ্রাপ্তিতে সমতা নিশ্চিত করতে ইউরোপের দেশগুলোর মতো দেশীয় বাজারে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। পাশাপাশি আমদানির ক্ষেত্রে প্রথাগত দেশগুলোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প আমদানি গন্তব্যের দিকে নজর দিতে হবে।

২০০৭-০৮ সালের খাদ্য সংকটের সময় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল জানিয়েছিল, অত্যধিক আমদানিনির্ভরতা আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের উচ্চমূল্যের জন্য দায়ী। অতীতের সংকটের পরও টেকসই খাদ্যব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতাকে উৎসাহিত করার পরিবর্তে দেশগুলো বিশ্বব্যাপী কৃষি-সাপ্লাই চেন তৈরির দিকে মনোনিবেশ করেছে, যার ফলে মুষ্টিমেয় কিছু দেশ বা কোম্পানির ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই বৈশ্বিক এই সংকট থেকে উত্তরণে পরাশক্তিগুলোকে সংঘাতের পথ পরিহার করে দায়িত্বসচেতন হতে হবে। উৎপাদক দেশগুলোকেও সরবরাহের ক্ষেত্রে একক সিদ্ধান্তের জায়গা থেকে সরে আসতে হবে। তাছাড়া আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে অধিক গুরুত্বারোপ করতে হবে।

তন্ময় চৌধুরী : শরণার্থী, অর্থনীতি ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষক

ctonmoy555@gmail.com

বাজার অস্থিরতা : নেপথ্য চিত্র ও করণীয়

 তন্ময় চৌধুরী 
২২ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বায়নের এ যুগে জাতীয় বা আঞ্চলিক যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বা অনিয়ন্ত্রিত পরিবর্তন পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অভাবনীয় পরিবর্তন আনতে পারে, যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সব দেশকেই প্রভাবিত করে। আগে থেকে বিদ্যমান মহামারি-প্ররোচিত অর্থনৈতিক ধাক্কা এবং আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে বিরাজমান নানামুখী সংঘাতের দরুন বিশ্বব্যাপী পণ্যের সরবরাহ এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। ফলে বিশ্বব্যাপী অসম গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের মূল্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যে কয়েকটি ভোগ্যপণ্যের দাম সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে সয়াবিন ও পাম তেল। মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণ করাও নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশে গত রমজানের শুরু থেকেই সয়াবিন তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে অস্থির হয়ে ওঠে বাজার। কিন্তু ঈদ-পরবর্তী সময়ে সয়াবিন তেলের দাম আবার বাড়ানোর পর এবার তা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশের বাজারে সয়াবিন তেল ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের হঠাৎ এ অস্বাভাবিক দামবৃদ্ধির পেছনে কাজ করছে অনেক ফ্যাক্টর। এসব সম্পর্কে ধারণা রাখা নাগরিক হিসাবে আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্বও বটে।

দামবৃদ্ধির নেপথ্য কারণগুলো

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্য যুদ্ধের সময় থেকেই ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ছিল। এরপর করোনা মহামারির প্রভাবে পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে ব্যাঘাত ঘটার ফলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। তবে ফেব্রুয়ারি মাসের ইউক্রেন সংকটের পর পরিস্থিতি দ্রুত শোচনীয় হতে শুরু করে। এর ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেক তেল উৎপাদনকারী দেশ উত্তোলন না বাড়িয়ে উলটো তাদের স্বার্থ উদ্ধারে শর্ত জুড়ে দিচ্ছে। ফলে গোটা বিশ্বে সয়াবিনের ডিমান্ড-সাপ্লাইয়ে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর ফলাফল হলো, ভোগ্যপণ্যের লাগামহীন দামবৃদ্ধি।

বিশ্বের প্রায় ৭৫ শতাংশ সানফ্লাওয়ার অয়েলের উৎপাদক রাশিয়া ও ইউক্রেন। যুদ্ধ শুরু হলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সানফ্লাওয়ার অয়েলের সাপ্লাই চেন, যাতে ইউক্রেনের প্রায় ৯৫ শতাংশ রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় সানফ্লাওয়ারের দাম এবং বিকল্প হিসাবে বাড়তে থাকে সয়াবিন ও পাম অয়েলের চাহিদা। এর মধ্যে পাম তেলের সবচেয়ে বড় উৎপাদনকারী, শতকরা বিচারে যা প্রায় ৬০ শতাংশ, ও রপ্তানিকারক দেশ ইন্দোনেশিয়া তাদের নিজস্ব বাজারে তেলের দামবৃদ্ধির কারণে ২৮ এপ্রিল তা অনির্দিষ্টকালের জন্য রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করে। এরপর বিশ্ববাজারে পাম তেলের দাম ৫০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যায়। যদিও ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত পাম তেল উৎপাদনকারী দেশ, সেহেতু উদ্ভূত তেল সংকট বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইনে নাজুক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, করোনাকালীন কর্মী সংকটের কারণে দ্বিতীয় প্রধান সরবরাহকারী দেশ মালয়েশিয়াও আশানুরূপ তেল উৎপাদনে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে বাজারে পাম অয়েলের ঘাটতির কারণে চাহিদা বেড়ে যায় সয়াবিন তেলের। কিন্তু খরার কারণে সয়াবিনের মূল উৎপাদক লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয় গত এক বছরে উৎপাদন বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্চেই আর্জেন্টিনা সয়াবিন তেল রপ্তানি সীমিত করার ঘোষণা দিয়ে রপ্তানি বিরতিতে চলে গিয়েছিল। ফলস্বরূপ, এপ্রিলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ২২ শতাংশ বেড়ে প্রতি মেট্রিক টন দাম ১৪৯৭ ডলারে ওঠে, যা মাসের শেষে গিয়ে ১৯১৯ ডলারে ঠেকেছে।

ভোজ্যতেল ছাড়াও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় চক্রাকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য ও খাদ্যদ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে গেছে। এসব ছাড়াও দেশীয় বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম একটি কারণ হলো সিন্ডিকেট। দেশীয় বাজারে একচেটিয়া আমদানিকারক, কারবারি, মজুতদার, মধ্যস্বত্বভোগী, খুচরা বিক্রেতারা নানা অজুহাতে পণ্যের সাপ্লাই চেনকে বাধাগ্রস্ত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। ফলে আমদানিকৃত এবং দেশীয় উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর মূল্য অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া

দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশই নিট তেল আমদানিকারক হওয়ার কারণে তেলসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে বেশ আঘাত হেনেছে। বাংলাদেশে ভোজ্যতেলের মোট চাহিদার ৯০ শতাংশ আমদানি হয়; যার মধ্যে রয়েছে সয়াবিন, পাম, সূর্যমুখী ও অন্যান্য তেল। মূলত ছয়টি প্রতিষ্ঠান এসব অপরিশোধিত তেল আমদানি করে এবং পরিশোধন শেষে বাজারজাত করে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের মোট সয়াবিনের ৭৩ শতাংশ আমদানি হয় আর্জেন্টিনা থেকে। আর দ্বিতীয় প্রধান সরবরাহকারী হিসাবে রয়েছে ব্রাজিল। এমনিতেই জোগান সংকটের কারণে বৃদ্ধি পেয়েছে তেলের দাম, এর ওপর আবার জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়ে শিপিং চার্জও বেড়েছে। তাই জাহাজ ভাড়াসহ আনুষঙ্গিক খরচ যোগ হয়ে দেশে লিটারপ্রতি সয়াবিন তেলের দাম ১৯৮ টাকায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে মার্কেট ইনসাইডারের তথ্য অনুযায়ী, তেলের দাম রেকর্ড মূল্য হওয়ার পরও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম সবচেয়ে কম। সাধারণত আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানিকৃত দামের ওপর নির্ভর করে ট্যারিফ কমিশনের সহায়তায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তেলের বাজারদর নির্ধারণ করে থাকে। বাজারে এখন যে সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে, তা মূলত দুই বা তিন মাস আগে আমদানি করা। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যের ঊর্ধ্বমুখিতা থাকা সত্ত্বেও সরকার রমজান মাস বিবেচনায় রেখে দাম বৃদ্ধি করেনি, ফলে ব্যবসায়ীরা সাময়িক ক্ষতির সম্মুখীন হন। আবার মার্চে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ১৭৫০ ডলারে উন্নীত হলেও সরকার ভোজ্যতেলের ওপর থেকে আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ, খুচরা পর্যায়ে ৫ শতাংশ এবং তেল পরিশোধনের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও শুল্ক প্রত্যাহারের পর দামে সমন্বয় করে। মূলত শুল্ক ও ভ্যাট উঠিয়ে নেওয়ায় দেশে ভোজ্যতেলের দাম পার্শ্ববর্তী অন্য দেশগুলোর তুলনায় কম রয়েছে। যদিও ক্রয়ক্ষমতার হিসাবে এটি এখনো অনেক বেশি।

পরিত্রাণের উপায়

নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি মূলত বৈশ্বিক পরিস্থিতির ফলাফল। অর্থনীতিবিদরা এর সাময়িক সমাধান হিসাবে দুটি উপায় দেখছেন। প্রথমত, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ভোজ্যতেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করা; দ্বিতীয়ত, দেশীয় প্রেক্ষাপটে সিন্ডিকেট বাণিজ্য এবং মজুতদারি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসাবে সরিষা ও বাদাম তেলকে বিকল্প ভোজ্যতেল হিসাবে প্রচলনেরও প্রস্তাব করেন কিছু অর্থনীতিবিদ। দেশে সরিষার চাষাবাদ জনপ্রিয় করার জন্য কৃষক পর্যায়ে স্বল্প সুদে ঋণ বিতরণ করা গেলে একদিকে কৃষকরা যেমন লাভবান হবেন, অন্যদিকে সরিষা চাষেও তারা উৎসাহিত হবেন। এতে ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমবে। তাছাড়া পণ্যপ্রাপ্তিতে সমতা নিশ্চিত করতে ইউরোপের দেশগুলোর মতো দেশীয় বাজারে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। পাশাপাশি আমদানির ক্ষেত্রে প্রথাগত দেশগুলোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প আমদানি গন্তব্যের দিকে নজর দিতে হবে।

২০০৭-০৮ সালের খাদ্য সংকটের সময় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল জানিয়েছিল, অত্যধিক আমদানিনির্ভরতা আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের উচ্চমূল্যের জন্য দায়ী। অতীতের সংকটের পরও টেকসই খাদ্যব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতাকে উৎসাহিত করার পরিবর্তে দেশগুলো বিশ্বব্যাপী কৃষি-সাপ্লাই চেন তৈরির দিকে মনোনিবেশ করেছে, যার ফলে মুষ্টিমেয় কিছু দেশ বা কোম্পানির ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই বৈশ্বিক এই সংকট থেকে উত্তরণে পরাশক্তিগুলোকে সংঘাতের পথ পরিহার করে দায়িত্বসচেতন হতে হবে। উৎপাদক দেশগুলোকেও সরবরাহের ক্ষেত্রে একক সিদ্ধান্তের জায়গা থেকে সরে আসতে হবে। তাছাড়া আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে অধিক গুরুত্বারোপ করতে হবে।

তন্ময় চৌধুরী : শরণার্থী, অর্থনীতি ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষক

ctonmoy555@gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন