বৃক্ষের আর্তনাদে ভারি হয় আকাশ
jugantor
বৃক্ষের আর্তনাদে ভারি হয় আকাশ

  গাজী মিজানুর রহমান  

২৬ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

লালমাটিয়া ব্লক-বি সংলগ্ন মাঠের পাশে কয়েকটা বৃক্ষ। বহুতল আবাসিক ভবন থেকে নামলেই এরা স্বাগত জানায়। ঝিরঝিরে হাওয়ার হালকা দোলায় গাছগুলোর তলায় বিছিয়ে রয়েছে ঝরাপাতা। ঝরাপাতার ওপর দিয়ে হেঁটে গেলে মচমচ শব্দ করে পাতারা বলে, দীর্ণ করো, পিষে দাও, তবু তুমি একটু মুড়মুড় শব্দের মুগ্ধতা নিয়ে যাও। লক্ষ করে দেখলে বোঝা যায়, ঝরে যাওয়ার পর পাতাগুলো মাটিতে মিশে গিয়ে মাটিকে সার দেবে, সেটুকু মাটি খুঁজে না পেয়ে ওরা ইটের উপরে আর দেওয়ালে গিয়ে মাথা কুটে মরছে। এই হচ্ছে আমাদের প্রিয় মহানগর।

এ মহানগরে যেসব গাছ আছে, তারা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের মতো বন্দি জীবনযাপন করে। ধুলো খাওয়া, গাড়ির ছেড়ে যাওয়া কার্বন খাওয়া, ডিশ লাইন আর বিদ্যুতের তারের আগ্রাসন মেনে নেওয়া জীবন এদের। তবু তাদের কাছে নগরবাসী অক্সিজেন চায়, বাতাস থেকে ক্ষতিকর কার্বন শুষে নিতে বলে। কাজের বিনিময়ে খাদ্য, তাও পর্যাপ্ত নয়। এরা যেন আগের দিনের দাস। কিংবা আধুনিক যুগের সশ্রম কারাদণ্ডভোগী কয়েদি। জেল খাটতে হবে এবং কাজ করে পুষিয়ে দিতে হবে।

এ মহানগরীর রমনা পার্ক এলাকা, চন্দ্রিমা উদ্যান, চিড়িয়াখানা ও বোটানিক্যাল গার্ডেনের সবুজ এলাকা ছাড়া বাকি এলাকায় সশ্রম কারাদণ্ডভোগী বৃক্ষদের বাস। কোথাও সড়কের পাশে, কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠের পাশে এক কোণে জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে এরা। সারা নগরীর ধুলো উড়িয়ে এনে যানবাহনগুলো এদের গায়ে কয়েদির পোশাক চাপিয়ে দেয়। মর্মান্তিক রকমের জীর্ণ সে গেরুয়া পোশাক শুধু বৃষ্টির দিনে ধোলাই করা হয়। আলো থেকে সূর্যের দেওয়া খাবার শুষে নিতে পাতাকে বিঘ্ন ঘটায় এ ধুলোর আগ্রাসী বাহিনী।

নগরীতে সড়কের পাশে বা আবাসিক এলাকায় যে বৃক্ষ পালন করা হয়, তাকে লোকদেখানো বনেদিগিরির মতো কাজের লোক রাখার সঙ্গে তুলনা করা যায়। আগের দিনে সম্ভ্রান্ত লোকেরা বাড়িতে দশটা-পাঁচটা মানুষ রাখত। ওরা কল্কে সেজে গড়গড়ার নল মনিবের মুখে পুরে দিত, কেউ চপ্পল খুলে দিত, কেউ স্নানের জল তুলে দিত। কিন্তু তাদের বেশিরভাগ বেঁচে থাকত অবহেলিতভাবে। রাতে দল বেঁধে একটা ঘরে ঘুমাত, হাত-পা মেলার সুযোগ থাকত না। প্রয়োজনের কাজগুলো যেখানে সারত, সেখানে ভালো বন্দোবস্ত খুব কমই থাকত। গাছগুলোরও এখানে সেরকম অবস্থা।

এদের কাছে দাবি-মহানগরীকে সবুজ রং দাও, অক্সিজেন দাও, ছায়া দাও, পরিবেশ বাঁচাও; কিন্তু তাদের বাঁচায় কে! সীমাহীন অবহেলা নিয়ে এরা বেঁচে থাকে। কোনো কোনো বৃক্ষ-শিশুর জন্মদিনে যদিওবা ভিআইপিদের দেখা মেলে, ক্যালিগ্রাফি করে লেখা পাথরে খোদাই করা রোপণ-স্মারক সেদিন কচি বৃক্ষের পদতলে শোভা পায়, রুয়ে দেওয়ার পর হাততালি পড়ে, দীর্ঘজীবন কামনা করে মোনাজাত হয়; কিন্তু মাস না যেতেই ওরা আর দশজন বৃক্ষের মতো কয়েদি হয়ে পড়ে। গৃহপালিত জন্তু আদর করে মুড়ে দিতে আসে, বেওয়ারিশ কুকুর আসে প্রস্রাব ছিটাতে।

এ বৃক্ষ-কয়েদিদের প্রতি বৃক্ষ-মমতায় যদি আমরা কাতর হই, তাহলে প্রথমেই মনে পড়বে মাঝেমধ্যে এদের শরীরে পানি ছিটিয়ে ধুলো ঝাড়বার কথা, যেমনটা সিটি করপোরেশনের গাড়িকে মাঝেমধ্যে সড়ক ভেজাতে দেখা যায়। এমন হলে ধুলো-সন্ত্রাস আর ধোঁয়া-সন্ত্রাস থেকে কিছুটা হলেও এরা রেহাই পেতে পারে। ড্রেন আর সড়ক বানাতে খোঁড়াখুঁড়ির শিকার হয়ে যেন কোনো বৃক্ষকে শিকড় উৎপাটনের জ্বালা সহ্য করতে না হয়, তা দেখতে হবে। এছাড়া নিত্যনতুন আবাসিক ভবন পত্তনের দ্বারা উৎখাতের শিকার হয়ে বৃক্ষসমাজকে যেন আহাজারি করে ঢাকার আকাশ ভারি করে তুলতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

এমন দেখা যায়, বৃক্ষ আগেই ছিল, তার পাশ দিয়ে বিদ্যুতের লাইন টেনে নেওয়া হলো, গাছটা একটু বাড়ল আর অমনি বিদ্যুতের লোক এসে মই বেয়ে সাবাড় করতে থাকল বড় বড় ডাল। বিদ্যুতের তার যখন টানা হলো, তখন কি তারা বুঝতে পারেনি গাছের সংসারটাও দুদিন পর বাড়তে পারে? আগে থেকে দুকূল রক্ষা করে কাজ করলেই তো হতো।

বিজ্ঞাপন ঝোলানো দরকার-পেরেক ঠুকে দেওয়া হলো গাছের গায়ে। ইট-বালু রাখার দরকার-একটা গাছের গুঁড়িকে কেন্দ্র করে সড়কে রেখে দেওয়া হলো। তাদের ধারণা, এখানে তো গাছ আছে, ইট-বালু রাখলে তাতে পথিকদের কিছু বলার থাকবে না। তাই যদি হয়, তাহলে যে মাটি থেকে গাছটা খাদ্য পাচ্ছে, রোদ পাচ্ছে, সে মাটিকে ছায়া দিয়ে, নয়তো রাবিশ দিয়ে বোঝাই করে ফেলা হলো! এভাবে আপনার-আমার-তার হাজার অত্যাচার সয়ে নাগরিক বৃক্ষ বেঁচে আছে। ওদের প্রতি মমতা না দেখালে আমাদেরই সবচেয়ে বড় ক্ষতি। তাই মহানগরীর এসব নিরীহ বৃক্ষের লালনপালনে নগরবাসীকে সচেতন হতে হবে।

গাজী মিজানুর রহমান : সাবেক যুগ্ম সচিব

বৃক্ষের আর্তনাদে ভারি হয় আকাশ

 গাজী মিজানুর রহমান 
২৬ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

লালমাটিয়া ব্লক-বি সংলগ্ন মাঠের পাশে কয়েকটা বৃক্ষ। বহুতল আবাসিক ভবন থেকে নামলেই এরা স্বাগত জানায়। ঝিরঝিরে হাওয়ার হালকা দোলায় গাছগুলোর তলায় বিছিয়ে রয়েছে ঝরাপাতা। ঝরাপাতার ওপর দিয়ে হেঁটে গেলে মচমচ শব্দ করে পাতারা বলে, দীর্ণ করো, পিষে দাও, তবু তুমি একটু মুড়মুড় শব্দের মুগ্ধতা নিয়ে যাও। লক্ষ করে দেখলে বোঝা যায়, ঝরে যাওয়ার পর পাতাগুলো মাটিতে মিশে গিয়ে মাটিকে সার দেবে, সেটুকু মাটি খুঁজে না পেয়ে ওরা ইটের উপরে আর দেওয়ালে গিয়ে মাথা কুটে মরছে। এই হচ্ছে আমাদের প্রিয় মহানগর।

এ মহানগরে যেসব গাছ আছে, তারা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের মতো বন্দি জীবনযাপন করে। ধুলো খাওয়া, গাড়ির ছেড়ে যাওয়া কার্বন খাওয়া, ডিশ লাইন আর বিদ্যুতের তারের আগ্রাসন মেনে নেওয়া জীবন এদের। তবু তাদের কাছে নগরবাসী অক্সিজেন চায়, বাতাস থেকে ক্ষতিকর কার্বন শুষে নিতে বলে। কাজের বিনিময়ে খাদ্য, তাও পর্যাপ্ত নয়। এরা যেন আগের দিনের দাস। কিংবা আধুনিক যুগের সশ্রম কারাদণ্ডভোগী কয়েদি। জেল খাটতে হবে এবং কাজ করে পুষিয়ে দিতে হবে।

এ মহানগরীর রমনা পার্ক এলাকা, চন্দ্রিমা উদ্যান, চিড়িয়াখানা ও বোটানিক্যাল গার্ডেনের সবুজ এলাকা ছাড়া বাকি এলাকায় সশ্রম কারাদণ্ডভোগী বৃক্ষদের বাস। কোথাও সড়কের পাশে, কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠের পাশে এক কোণে জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে এরা। সারা নগরীর ধুলো উড়িয়ে এনে যানবাহনগুলো এদের গায়ে কয়েদির পোশাক চাপিয়ে দেয়। মর্মান্তিক রকমের জীর্ণ সে গেরুয়া পোশাক শুধু বৃষ্টির দিনে ধোলাই করা হয়। আলো থেকে সূর্যের দেওয়া খাবার শুষে নিতে পাতাকে বিঘ্ন ঘটায় এ ধুলোর আগ্রাসী বাহিনী।

নগরীতে সড়কের পাশে বা আবাসিক এলাকায় যে বৃক্ষ পালন করা হয়, তাকে লোকদেখানো বনেদিগিরির মতো কাজের লোক রাখার সঙ্গে তুলনা করা যায়। আগের দিনে সম্ভ্রান্ত লোকেরা বাড়িতে দশটা-পাঁচটা মানুষ রাখত। ওরা কল্কে সেজে গড়গড়ার নল মনিবের মুখে পুরে দিত, কেউ চপ্পল খুলে দিত, কেউ স্নানের জল তুলে দিত। কিন্তু তাদের বেশিরভাগ বেঁচে থাকত অবহেলিতভাবে। রাতে দল বেঁধে একটা ঘরে ঘুমাত, হাত-পা মেলার সুযোগ থাকত না। প্রয়োজনের কাজগুলো যেখানে সারত, সেখানে ভালো বন্দোবস্ত খুব কমই থাকত। গাছগুলোরও এখানে সেরকম অবস্থা।

এদের কাছে দাবি-মহানগরীকে সবুজ রং দাও, অক্সিজেন দাও, ছায়া দাও, পরিবেশ বাঁচাও; কিন্তু তাদের বাঁচায় কে! সীমাহীন অবহেলা নিয়ে এরা বেঁচে থাকে। কোনো কোনো বৃক্ষ-শিশুর জন্মদিনে যদিওবা ভিআইপিদের দেখা মেলে, ক্যালিগ্রাফি করে লেখা পাথরে খোদাই করা রোপণ-স্মারক সেদিন কচি বৃক্ষের পদতলে শোভা পায়, রুয়ে দেওয়ার পর হাততালি পড়ে, দীর্ঘজীবন কামনা করে মোনাজাত হয়; কিন্তু মাস না যেতেই ওরা আর দশজন বৃক্ষের মতো কয়েদি হয়ে পড়ে। গৃহপালিত জন্তু আদর করে মুড়ে দিতে আসে, বেওয়ারিশ কুকুর আসে প্রস্রাব ছিটাতে।

এ বৃক্ষ-কয়েদিদের প্রতি বৃক্ষ-মমতায় যদি আমরা কাতর হই, তাহলে প্রথমেই মনে পড়বে মাঝেমধ্যে এদের শরীরে পানি ছিটিয়ে ধুলো ঝাড়বার কথা, যেমনটা সিটি করপোরেশনের গাড়িকে মাঝেমধ্যে সড়ক ভেজাতে দেখা যায়। এমন হলে ধুলো-সন্ত্রাস আর ধোঁয়া-সন্ত্রাস থেকে কিছুটা হলেও এরা রেহাই পেতে পারে। ড্রেন আর সড়ক বানাতে খোঁড়াখুঁড়ির শিকার হয়ে যেন কোনো বৃক্ষকে শিকড় উৎপাটনের জ্বালা সহ্য করতে না হয়, তা দেখতে হবে। এছাড়া নিত্যনতুন আবাসিক ভবন পত্তনের দ্বারা উৎখাতের শিকার হয়ে বৃক্ষসমাজকে যেন আহাজারি করে ঢাকার আকাশ ভারি করে তুলতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

এমন দেখা যায়, বৃক্ষ আগেই ছিল, তার পাশ দিয়ে বিদ্যুতের লাইন টেনে নেওয়া হলো, গাছটা একটু বাড়ল আর অমনি বিদ্যুতের লোক এসে মই বেয়ে সাবাড় করতে থাকল বড় বড় ডাল। বিদ্যুতের তার যখন টানা হলো, তখন কি তারা বুঝতে পারেনি গাছের সংসারটাও দুদিন পর বাড়তে পারে? আগে থেকে দুকূল রক্ষা করে কাজ করলেই তো হতো।

বিজ্ঞাপন ঝোলানো দরকার-পেরেক ঠুকে দেওয়া হলো গাছের গায়ে। ইট-বালু রাখার দরকার-একটা গাছের গুঁড়িকে কেন্দ্র করে সড়কে রেখে দেওয়া হলো। তাদের ধারণা, এখানে তো গাছ আছে, ইট-বালু রাখলে তাতে পথিকদের কিছু বলার থাকবে না। তাই যদি হয়, তাহলে যে মাটি থেকে গাছটা খাদ্য পাচ্ছে, রোদ পাচ্ছে, সে মাটিকে ছায়া দিয়ে, নয়তো রাবিশ দিয়ে বোঝাই করে ফেলা হলো! এভাবে আপনার-আমার-তার হাজার অত্যাচার সয়ে নাগরিক বৃক্ষ বেঁচে আছে। ওদের প্রতি মমতা না দেখালে আমাদেরই সবচেয়ে বড় ক্ষতি। তাই মহানগরীর এসব নিরীহ বৃক্ষের লালনপালনে নগরবাসীকে সচেতন হতে হবে।

গাজী মিজানুর রহমান : সাবেক যুগ্ম সচিব

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন