ধারণাপত্র : ‘লজ্জাশরম উন্নয়ন প্রকল্প’
jugantor
ধারণাপত্র : ‘লজ্জাশরম উন্নয়ন প্রকল্প’

  আশাফা সেলিম  

২৮ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রকল্পটির পুরো শিরোনাম হবে ‘আদর্শ মানবিক রাষ্ট্র গঠনে নীতিনৈতিকতা-লাজলজ্জাশরম-মানবতা-সততা-মূল্যবোধ-মমত্ববোধ-বিবেক-বিনয় ও ঘৃণা উন্নয়ন প্রকল্প’। কয়েকটি পর্বে বাস্তবায়নযোগ্য এ প্রকল্পের সংক্ষিপ্ত নাম হবে- ‘লজ্জাশরম উন্নয়ন প্রকল্প’।

এ প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্যারিশম্যাটিক নির্দেশনা প্রয়োজন হবে। কারণ, বর্তমানে তিনিই এদেশের মানুষের সর্বশেষ ভরসাস্থল। কেবল তিনিই বলতে পেরেছেন-‘যারা গরিবের ৫ কেজি চালের লোভ সামলাতে পারে না, তাদের রাজনীতি ছেড়ে ভিক্ষা করা উচিত’ কিংবা ‘অসৎ পথে উপার্জিত অর্থ দিয়ে বিরিয়ানি খাওয়ার থেকে, সৎ পথে নুন-ভাত খাওয়া অনেক মর্যাদার, অনেক সম্মানের, অনেক ভালো’।

শুধু বলতে পারেনই বা বলছি কেন; সবক্ষেত্রেই তো তার নির্দেশনাই কার্যকর হয়, অন্য কারোটা ততটা নয়। কেবল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চাইলেই, হস্তক্ষেপ করলেই বহু অসম্ভবও সম্ভব হয় এদেশে। কারণ, কেবল তারই রয়েছে এক অনুপম ক্ষমতা; যে ক্ষমতাবলে তিনি সহজেই অনেক মহাসমস্যার সমাধান করে ফেলেন!

যেমন-হেফাজতে ইসলাম, গণজাগরণ মঞ্চ, নিরাপদ সড়ক, কোটা আন্দোলন, স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের আন্দোলন, ২০১৮-র জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিপরীতমুখী চিন্তার অনেককে সংলাপে বসানো ইত্যাদি। এমনকি, যুবলীগ-ছাত্রলীগের মতো শক্তিধর সংগঠনের দোর্দণ্ড প্রতাপ ও মহাপরাক্রমশালী শীর্ষ নেতাদেরও চোখের নিমিষে মিইয়ে দিতে পারেন! পারেন জেলে পুরতে।

বাঘা বাঘা মন্ত্রী-এমপিদের কঠোর বিচার করতেও ছাড়েননি। বিডিআর বিদ্রোহ, হলি আর্টিজান জঙ্গি হামলা এবং রিফাত-নুসরাত-আবরার হত্যাকাণ্ডের আগুন নেভাতে তাকে বেগ পেতে হয়নি। বাংলাদেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে আর কোনো শাসনকালে কিংবা শাসকের এমন সাহসী কৃতিত্ব নেই। একচিলতে এক মেয়েশিশুর চিঠির জবাবও তিনি আন্তরিকতার সঙ্গেই দেন।

তিনি এতসব মহাগুণ অর্জন করেছেন তার অসামান্য, পূর্বদৃষ্টান্তহীন সততা আর সাহসের আউটপুট হিসাবে। সন্দেহ নেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি মহামানবের রক্ত শরীরে ধারণ করে, অনেকটা জিনেটিকভাবে প্রাপ্ত তার এই পরশপাথরী ক্ষমতা তিনি দেশের কল্যাণে বিলিয়ে দিচ্ছেন।

এটি একটি ভিন্ন ধরনের প্রকল্প প্রস্তাবনার (পিপি) ধারণা। পিপি সাধারণত ‘ফোর বাই ফোর ম্যাট্রিক্স’-এর কাঠামোয়, লগ ফ্রেম বা লজিক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী হয়। তাই, শুরুতেই পিপি না দিয়ে, নিয়ম অনুযায়ী দিচ্ছি ধারণাপত্র বা কনসেপ্ট পেপার (সিপি)। ধারণাপত্র গৃহীত হলে, প্রকল্প প্রস্তাবনা দেওয়া যাবে।

দেশে নানা উন্নয়ন প্রকল্প, মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। পদ্মাসেতু বহুমুখী প্রকল্প, বঙ্গবন্ধু/কর্ণফুলী টানেল, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ আরও নানা মেগা প্রকল্প। মোট হিসাবে লাখ লাখ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে অনেক উন্নয়নই হয়েছে দেশে।

অভাব-অনটন-মঙ্গা অনেকটাই দূর হয়েছে। সে রকম অর্থাভাব বা কর্মসংস্থানের অভাব বা অতিদারিদ্র্যও নেই (আছে মাত্র ২০-২৫ শতাংশ, মতান্তরে)। এসবের সুফল তো দেশের মানুষই ভোগ করছে। তাহলে এর প্রভাবে ঘুস, দুর্নীতি, অর্থ কেলেঙ্কারি তো কমছে না! বরং দুঃখজনক ও দুশ্চিন্তাজনক ব্যাপার হলো উল্লিখিত মেগা প্রকল্পগুলো এবং এসব উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে অতিলোভ-হিংসা-বিদ্বেষ-নির্মমতা, নির্লজ্জতা-অমানবিকতা-নিষ্ঠুরতা, স্বার্থপরতা, মূল্যবোধের অবক্ষয় সমান্তরালভাবেই কিংবা ততোধিক গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে! এসবের কারণ হলো, যাবতীয় অপকর্মের মূলেই দেখি লজ্জাশরমের বিশাল ঘাটতি!

আদর্শ মানবিক রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম নিয়ামক হলো মনুষ্যত্ব। আর মনুষ্যত্বের জন্য অতি জরুরি উল্লিখিত এসব উপকরণের ঘাটতি কিন্তু একদিনে সৃষ্টি হয়নি। হয়েছে আরও তিন/চার দশক বা তারও বেশি আগে থেকে। তখন ভাবতাম, এসব ঘটছে মূলত দারিদ্র্য বা আর্থিক অনটনের কারণে। আমাদের অভাব-অনটন কমে এলে, ধীরে ধীরে এক সময় এসব নোংড়া-দুষ্টপ্রকৃতির-দুর্নীতিপরায়ণ-স্বার্থপর-অমানবিক এবং অন্যকে ঠকানোর মতো অকল্যাণকর নিচু স্বভাবগুলো এমনিতেই এক সময় ঝরে পড়বে।

আমরা তখন আর মেয়ের বিয়ে দিতে আদর্শবান ছেলের বদলে, চরম নির্লজ্জের মতো করে ‘উপরি’খোর পাত্র খুঁজব না। কারণ, উপরিখোর খোঁজাটাও উপরি খাওয়ার মতোই জঘন্য অপরাধ। মহালজ্জার ব্যাপার। তাই, ‘উপরি’ খোরদের মনেপ্রাণে ঘৃণা করব। উপরিখোর বা ঘুষখোররাও যখন বুঝতে পারবে যে, সমাজ-সংসারে মানুষ তাদের সম্মান করে না; বরং ঘৃণা করে!

বিয়ের বাজারে দুর্নীতিবাজ পাত্র-পাত্রী কিংবা দুর্নীতিকে প্রশ্রয়দাতা অভিভাবকদের অবস্থানও একদম তলানিতে নেমেছে। অবৈধ উপার্জনকারীদের দান করা এসি/এয়ারকুলার/টাইলস কোনো মসজিদ-মন্দিরে লাগানো হয় না। তখন ধীরে ধীরে এক সময় তারাও ওই নোংড়া মনোবৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হবে। কিন্তু সে আশায় তো দেখছি এখনো পর্যন্ত ওই গুড়ে বালিই বহাল থাকছে!

মসজিদের ইমাম কিংবা পুলিশ অফিসার কর্তৃক অনেক বলাৎকারের ঘটনা আমরা জানতে পারি। নিশ্চয়ই লজ্জাশরমের সবটুকু খুইয়েই তারা এই জঘন্য কাজ করতে পেরেছে। জানতে পারি ফুট ফুটে নবজাতককে ঢাকার এক হাসপাতালের টয়লেটে পাওয়া যাওয়ার খবর (যুগান্তর, ১৫ মে ২০১৯)! কারা এ শিশুটিকে পৃথিবীতে আনল? নিশ্চয়ই প্রচলিত সামাজিক রীতিতে আনেনি। এনেছে নির্লজ্জ কোনো উপায়ে।

কিন্তু ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুটির পরিচয় দিতে কত লজ্জা! তাই নির্মমভাবে টয়লেটে ফেলে রেখে গেছে। যে কর্মে লজ্জা পাওয়ার কথা, সেখানে নির্লজ্জ! আর যেখানে হওয়ার কথা মানবিক, সেখানেই চূড়ান্ত নির্মমতা! ‘বেওয়ারিশ’ নবজাতকের খোঁজ পাওয়ার ঘটনা অবশ্য এ দেশে অহরহই ঘটেছে, ঘটছে।

ডাস্টবিনে নবজাতককে কুকুরের খাবার হওয়ার খবরও আমরা পেয়েছি। তবে আশার কথা, এসব শিশুকে দত্তক নিতে আসা মানুষও আছেন এই সমাজে। মিডিয়া/গণমাধ্যমের কল্যাণে এসব ঘটনার মাত্র কিঞ্চিত সংবাদ আমরা পাই। আর সবই থাকে আমাদের জানার আড়ালে। ঘুষ, ঋণ খেলাপ, অর্থ আত্মসাৎ, মানি লন্ডারিং, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ অন্যান্য দুর্নীতি যারাই করেন, নির্ভয়ে করেন। করেন, লজ্জাশরমের মাথা খেয়েই।

ধনী-গরিব বৈষম্য অনেক বেড়ে যাওয়ার বিপরীতে আজকাল অধিকাংশ শ্রমিক তাদের ভাত-কাপড়ের প্রয়োজন মেটাতে পারছেন। পারছেন উপার্জনের অবশিষ্ট অর্থে কিছুটা সখ বা বিনোদন চাহিদা পূরণ করতেও। কৃষি শ্রমিকরা তো আজকাল নিজেরাই নিজেদের শ্রমমূল্য বাড়িয়ে দিয়ে কৃষকদের নাভিশ্বাস তুলে দিতে সক্ষম। কিন্তু এতকিছুর পরও তাদের মানসিকতাও তো সেই অর্থে লোভ বা দুর্নীতিমুক্ত হতে পারেনি!

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। কিন্তু ঘুষখোর কর্মকর্তারা কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন যে, বেতন দ্বিগুণ হওয়ার পর থেকে তারা আর ঘুস খান না? আমার তো মনে হয়, বেতন আরও চারগুণ বাড়ালেও ঘুস খেয়ে অভ্যস্তরা এমনকি হজ করে আসার পরও ঘুস খাওয়া ছাড়ছেন না! কারণ, ঘুস খাওয়া মাদকাসক্তির চেয়েও ভয়ানক এক আসক্তি।

মাদকাসক্ত ব্যক্তির যেমন কোনো লজ্জাশরম বা চোখের পর্দা থাকে না, ছাল ওঠা কুকুরদের যেমন শরীরের চামড়াহীনতাই একসময় স্বাভাবিক লাগে, তেমনি ঘুসখোর বা অবৈধ উপার্জনকারীদেরও চক্ষুলজ্জা বলতে কিছুই থাকে না। তারা হয়ে যান ‘কানকাটা রমজান’। বলা চলে, যে কোনো ধরনের অবৈধ আয়ই অর্থলোভীদের নির্লজ্জতার ফসল।

সাংবাদিক মাহবুব কামালের ‘জাত নিমের পাতা’ কলামে ‘তবে কি মানুষ অপমরণশীল প্রাণী?’ শিরোনামের একটি লেখা যুগান্তরে (১৬ মে ২০১৯) ছাপা হয়েছে। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘কী বিচিত্র উপায়েই না শেষ হয়ে যাচ্ছে মানুষের জীবন! গুলিতে, পুড়িয়ে, শ্বাসরোধ করে, পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে, পানিতে চুবিয়ে, ধর্ষণ শেষে ধর্ষিতারই ওড়না পেঁচিয়ে, আরও কত নিয়ম যে বের হয়েছে...।’

প্রধানত অপমৃত্যু ও নানা নির্মম কায়দায় অসংখ্য হত্যাকাণ্ড নিয়ে নিজের উৎকণ্ঠার মাত্রা বোঝাতে ও সমাধান খুঁজতে গিয়ে, লেখাটির একপর্যায়ে তিনি বলেছেন, ‘প্রয়োজনে ডাক দিতে হবে এক সর্বদিকবিস্তৃত সাংস্কৃতিক বিপ্লবের...।’ এসব নির্মমতাগুলোসহ সমাজের জঘন্যতম ঘটনাগুলোর পেছনের অন্য অনেক কারণের মধ্যে নির্লজ্জতা ও মূল্যবোধহীনতাও উল্লেখযোগ্য বলে মনে করি।

আশাফা সেলিম : ছড়াকার, সংস্কৃতিকর্মী

ashafa.salim@gmail.com

ধারণাপত্র : ‘লজ্জাশরম উন্নয়ন প্রকল্প’

 আশাফা সেলিম 
২৮ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রকল্পটির পুরো শিরোনাম হবে ‘আদর্শ মানবিক রাষ্ট্র গঠনে নীতিনৈতিকতা-লাজলজ্জাশরম-মানবতা-সততা-মূল্যবোধ-মমত্ববোধ-বিবেক-বিনয় ও ঘৃণা উন্নয়ন প্রকল্প’। কয়েকটি পর্বে বাস্তবায়নযোগ্য এ প্রকল্পের সংক্ষিপ্ত নাম হবে- ‘লজ্জাশরম উন্নয়ন প্রকল্প’।

এ প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্যারিশম্যাটিক নির্দেশনা প্রয়োজন হবে। কারণ, বর্তমানে তিনিই এদেশের মানুষের সর্বশেষ ভরসাস্থল। কেবল তিনিই বলতে পেরেছেন-‘যারা গরিবের ৫ কেজি চালের লোভ সামলাতে পারে না, তাদের রাজনীতি ছেড়ে ভিক্ষা করা উচিত’ কিংবা ‘অসৎ পথে উপার্জিত অর্থ দিয়ে বিরিয়ানি খাওয়ার থেকে, সৎ পথে নুন-ভাত খাওয়া অনেক মর্যাদার, অনেক সম্মানের, অনেক ভালো’।

শুধু বলতে পারেনই বা বলছি কেন; সবক্ষেত্রেই তো তার নির্দেশনাই কার্যকর হয়, অন্য কারোটা ততটা নয়। কেবল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চাইলেই, হস্তক্ষেপ করলেই বহু অসম্ভবও সম্ভব হয় এদেশে। কারণ, কেবল তারই রয়েছে এক অনুপম ক্ষমতা; যে ক্ষমতাবলে তিনি সহজেই অনেক মহাসমস্যার সমাধান করে ফেলেন!

যেমন-হেফাজতে ইসলাম, গণজাগরণ মঞ্চ, নিরাপদ সড়ক, কোটা আন্দোলন, স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের আন্দোলন, ২০১৮-র জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিপরীতমুখী চিন্তার অনেককে সংলাপে বসানো ইত্যাদি। এমনকি, যুবলীগ-ছাত্রলীগের মতো শক্তিধর সংগঠনের দোর্দণ্ড প্রতাপ ও মহাপরাক্রমশালী শীর্ষ নেতাদেরও চোখের নিমিষে মিইয়ে দিতে পারেন! পারেন জেলে পুরতে।

বাঘা বাঘা মন্ত্রী-এমপিদের কঠোর বিচার করতেও ছাড়েননি। বিডিআর বিদ্রোহ, হলি আর্টিজান জঙ্গি হামলা এবং রিফাত-নুসরাত-আবরার হত্যাকাণ্ডের আগুন নেভাতে তাকে বেগ পেতে হয়নি। বাংলাদেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে আর কোনো শাসনকালে কিংবা শাসকের এমন সাহসী কৃতিত্ব নেই। একচিলতে এক মেয়েশিশুর চিঠির জবাবও তিনি আন্তরিকতার সঙ্গেই দেন।

তিনি এতসব মহাগুণ অর্জন করেছেন তার অসামান্য, পূর্বদৃষ্টান্তহীন সততা আর সাহসের আউটপুট হিসাবে। সন্দেহ নেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি মহামানবের রক্ত শরীরে ধারণ করে, অনেকটা জিনেটিকভাবে প্রাপ্ত তার এই পরশপাথরী ক্ষমতা তিনি দেশের কল্যাণে বিলিয়ে দিচ্ছেন।

এটি একটি ভিন্ন ধরনের প্রকল্প প্রস্তাবনার (পিপি) ধারণা। পিপি সাধারণত ‘ফোর বাই ফোর ম্যাট্রিক্স’-এর কাঠামোয়, লগ ফ্রেম বা লজিক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী হয়। তাই, শুরুতেই পিপি না দিয়ে, নিয়ম অনুযায়ী দিচ্ছি ধারণাপত্র বা কনসেপ্ট পেপার (সিপি)। ধারণাপত্র গৃহীত হলে, প্রকল্প প্রস্তাবনা দেওয়া যাবে।

দেশে নানা উন্নয়ন প্রকল্প, মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। পদ্মাসেতু বহুমুখী প্রকল্প, বঙ্গবন্ধু/কর্ণফুলী টানেল, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ আরও নানা মেগা প্রকল্প। মোট হিসাবে লাখ লাখ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে অনেক উন্নয়নই হয়েছে দেশে।

অভাব-অনটন-মঙ্গা অনেকটাই দূর হয়েছে। সে রকম অর্থাভাব বা কর্মসংস্থানের অভাব বা অতিদারিদ্র্যও নেই (আছে মাত্র ২০-২৫ শতাংশ, মতান্তরে)। এসবের সুফল তো দেশের মানুষই ভোগ করছে। তাহলে এর প্রভাবে ঘুস, দুর্নীতি, অর্থ কেলেঙ্কারি তো কমছে না! বরং দুঃখজনক ও দুশ্চিন্তাজনক ব্যাপার হলো উল্লিখিত মেগা প্রকল্পগুলো এবং এসব উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে অতিলোভ-হিংসা-বিদ্বেষ-নির্মমতা, নির্লজ্জতা-অমানবিকতা-নিষ্ঠুরতা, স্বার্থপরতা, মূল্যবোধের অবক্ষয় সমান্তরালভাবেই কিংবা ততোধিক গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে! এসবের কারণ হলো, যাবতীয় অপকর্মের মূলেই দেখি লজ্জাশরমের বিশাল ঘাটতি!

আদর্শ মানবিক রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম নিয়ামক হলো মনুষ্যত্ব। আর মনুষ্যত্বের জন্য অতি জরুরি উল্লিখিত এসব উপকরণের ঘাটতি কিন্তু একদিনে সৃষ্টি হয়নি। হয়েছে আরও তিন/চার দশক বা তারও বেশি আগে থেকে। তখন ভাবতাম, এসব ঘটছে মূলত দারিদ্র্য বা আর্থিক অনটনের কারণে। আমাদের অভাব-অনটন কমে এলে, ধীরে ধীরে এক সময় এসব নোংড়া-দুষ্টপ্রকৃতির-দুর্নীতিপরায়ণ-স্বার্থপর-অমানবিক এবং অন্যকে ঠকানোর মতো অকল্যাণকর নিচু স্বভাবগুলো এমনিতেই এক সময় ঝরে পড়বে।

আমরা তখন আর মেয়ের বিয়ে দিতে আদর্শবান ছেলের বদলে, চরম নির্লজ্জের মতো করে ‘উপরি’খোর পাত্র খুঁজব না। কারণ, উপরিখোর খোঁজাটাও উপরি খাওয়ার মতোই জঘন্য অপরাধ। মহালজ্জার ব্যাপার। তাই, ‘উপরি’ খোরদের মনেপ্রাণে ঘৃণা করব। উপরিখোর বা ঘুষখোররাও যখন বুঝতে পারবে যে, সমাজ-সংসারে মানুষ তাদের সম্মান করে না; বরং ঘৃণা করে!

বিয়ের বাজারে দুর্নীতিবাজ পাত্র-পাত্রী কিংবা দুর্নীতিকে প্রশ্রয়দাতা অভিভাবকদের অবস্থানও একদম তলানিতে নেমেছে। অবৈধ উপার্জনকারীদের দান করা এসি/এয়ারকুলার/টাইলস কোনো মসজিদ-মন্দিরে লাগানো হয় না। তখন ধীরে ধীরে এক সময় তারাও ওই নোংড়া মনোবৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হবে। কিন্তু সে আশায় তো দেখছি এখনো পর্যন্ত ওই গুড়ে বালিই বহাল থাকছে!

মসজিদের ইমাম কিংবা পুলিশ অফিসার কর্তৃক অনেক বলাৎকারের ঘটনা আমরা জানতে পারি। নিশ্চয়ই লজ্জাশরমের সবটুকু খুইয়েই তারা এই জঘন্য কাজ করতে পেরেছে। জানতে পারি ফুট ফুটে নবজাতককে ঢাকার এক হাসপাতালের টয়লেটে পাওয়া যাওয়ার খবর (যুগান্তর, ১৫ মে ২০১৯)! কারা এ শিশুটিকে পৃথিবীতে আনল? নিশ্চয়ই প্রচলিত সামাজিক রীতিতে আনেনি। এনেছে নির্লজ্জ কোনো উপায়ে।

কিন্তু ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুটির পরিচয় দিতে কত লজ্জা! তাই নির্মমভাবে টয়লেটে ফেলে রেখে গেছে। যে কর্মে লজ্জা পাওয়ার কথা, সেখানে নির্লজ্জ! আর যেখানে হওয়ার কথা মানবিক, সেখানেই চূড়ান্ত নির্মমতা! ‘বেওয়ারিশ’ নবজাতকের খোঁজ পাওয়ার ঘটনা অবশ্য এ দেশে অহরহই ঘটেছে, ঘটছে।

ডাস্টবিনে নবজাতককে কুকুরের খাবার হওয়ার খবরও আমরা পেয়েছি। তবে আশার কথা, এসব শিশুকে দত্তক নিতে আসা মানুষও আছেন এই সমাজে। মিডিয়া/গণমাধ্যমের কল্যাণে এসব ঘটনার মাত্র কিঞ্চিত সংবাদ আমরা পাই। আর সবই থাকে আমাদের জানার আড়ালে। ঘুষ, ঋণ খেলাপ, অর্থ আত্মসাৎ, মানি লন্ডারিং, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ অন্যান্য দুর্নীতি যারাই করেন, নির্ভয়ে করেন। করেন, লজ্জাশরমের মাথা খেয়েই।

ধনী-গরিব বৈষম্য অনেক বেড়ে যাওয়ার বিপরীতে আজকাল অধিকাংশ শ্রমিক তাদের ভাত-কাপড়ের প্রয়োজন মেটাতে পারছেন। পারছেন উপার্জনের অবশিষ্ট অর্থে কিছুটা সখ বা বিনোদন চাহিদা পূরণ করতেও। কৃষি শ্রমিকরা তো আজকাল নিজেরাই নিজেদের শ্রমমূল্য বাড়িয়ে দিয়ে কৃষকদের নাভিশ্বাস তুলে দিতে সক্ষম। কিন্তু এতকিছুর পরও তাদের মানসিকতাও তো সেই অর্থে লোভ বা দুর্নীতিমুক্ত হতে পারেনি!

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। কিন্তু ঘুষখোর কর্মকর্তারা কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন যে, বেতন দ্বিগুণ হওয়ার পর থেকে তারা আর ঘুস খান না? আমার তো মনে হয়, বেতন আরও চারগুণ বাড়ালেও ঘুস খেয়ে অভ্যস্তরা এমনকি হজ করে আসার পরও ঘুস খাওয়া ছাড়ছেন না! কারণ, ঘুস খাওয়া মাদকাসক্তির চেয়েও ভয়ানক এক আসক্তি।

মাদকাসক্ত ব্যক্তির যেমন কোনো লজ্জাশরম বা চোখের পর্দা থাকে না, ছাল ওঠা কুকুরদের যেমন শরীরের চামড়াহীনতাই একসময় স্বাভাবিক লাগে, তেমনি ঘুসখোর বা অবৈধ উপার্জনকারীদেরও চক্ষুলজ্জা বলতে কিছুই থাকে না। তারা হয়ে যান ‘কানকাটা রমজান’। বলা চলে, যে কোনো ধরনের অবৈধ আয়ই অর্থলোভীদের নির্লজ্জতার ফসল।

সাংবাদিক মাহবুব কামালের ‘জাত নিমের পাতা’ কলামে ‘তবে কি মানুষ অপমরণশীল প্রাণী?’ শিরোনামের একটি লেখা যুগান্তরে (১৬ মে ২০১৯) ছাপা হয়েছে। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘কী বিচিত্র উপায়েই না শেষ হয়ে যাচ্ছে মানুষের জীবন! গুলিতে, পুড়িয়ে, শ্বাসরোধ করে, পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে, পানিতে চুবিয়ে, ধর্ষণ শেষে ধর্ষিতারই ওড়না পেঁচিয়ে, আরও কত নিয়ম যে বের হয়েছে...।’

প্রধানত অপমৃত্যু ও নানা নির্মম কায়দায় অসংখ্য হত্যাকাণ্ড নিয়ে নিজের উৎকণ্ঠার মাত্রা বোঝাতে ও সমাধান খুঁজতে গিয়ে, লেখাটির একপর্যায়ে তিনি বলেছেন, ‘প্রয়োজনে ডাক দিতে হবে এক সর্বদিকবিস্তৃত সাংস্কৃতিক বিপ্লবের...।’ এসব নির্মমতাগুলোসহ সমাজের জঘন্যতম ঘটনাগুলোর পেছনের অন্য অনেক কারণের মধ্যে নির্লজ্জতা ও মূল্যবোধহীনতাও উল্লেখযোগ্য বলে মনে করি।

আশাফা সেলিম : ছড়াকার, সংস্কৃতিকর্মী

ashafa.salim@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন