নকশা এক, পাল্টাচ্ছে শুধু নাম

  আনু মুহাম্মদ ০৪ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নকশা এক, পাল্টাচ্ছে শুধু নাম

যে সময়ে ‘ক্রসফায়ার’, ‘এনকাউন্টার’ ও ‘বন্দুকযুদ্ধ’ নামে হত্যাযজ্ঞের গতি বেড়েছে, ঠিক সে সময়েই রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পেয়ে এক আসামি দেশ ছেড়েছে। অর্থাৎ সন্ত্রাসী বা খুনি হিসেবে প্রমাণিত হলেও প্রভাব থাকলে তার মুক্তি সম্ভব। আর প্রভাব না থাকলে শুধু সন্দেহ হলেই কাউকে ধরে এনে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ খুন করতে পারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দুই সপ্তাহে শতাধিক জীবন এভাবে কেড়ে নেয়া হল। ঈদের আগে এই আতঙ্কের আবহাওয়ায়, নানাজনকে ভয় দেখিয়ে আটক করে বিভিন্ন বাহিনীর অর্থ উপার্জনের খবরাখবরও পাওয়া যাচ্ছে। বস্তুত মাদকবিরোধী অভিযানের নামে দেশে খুনের উৎসব চলছে।

অনেকে বুঝেও না বুঝতে চাইলেও প্রকৃতপক্ষে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডেরই একেকটি নাম ‘ক্রসফায়ার’, ‘এনকাউন্টার’ ও ‘বন্দুকযুদ্ধ’। এর সঙ্গে আছে হেফাজতে নির্যাতন করে হত্যা। ১৬ বছর ধরে নানা অসিলায়, নানা মাত্রায়, নানা নামে চলছে এই খুনযজ্ঞ। আইনি রক্ষাকবচ হিসেবে প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে একটি গল্প জুড়ে দেয়া হচ্ছে। নকশা এক, হয়তো একবারই কম্পোজ করা হয়েছিল, শুধু নাম পাল্টাচ্ছে। ঘটনার বর্ণনা বা কাহিনী একই থাকছে। সরকার পরিবর্তনে এর কোনো পরিবর্তন নেই।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে বহু দেশে পঞ্চাশের দশক থেকে সত্তরের দশক পর্যন্ত এমন হত্যাকাণ্ড ব্যাপক হারে সংঘটিত হয়েছে। তখন লাতিন আমেরিকা কিংবা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে সামরিক শাসক বা সামরিক আদলের সরকারগুলো বিরোধী মত দমনে এমন হত্যাকাণ্ডের পথ বেছে নেয়। সামরিক শাসন নিশ্চিত করাসহ বহুজাতিক পুঁজির আগ্রাসন নিশ্চিত করার জন্য আইন-আদালতকে তুচ্ছ করে সরাসরি হত্যাকাণ্ডের পথ বেছে নেয়ার উদাহরণ অনেক। এটা নিপীড়ন, নির্যাতনের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করার পথ। তবে আগের বহু দেশ নারকীয় এই অবস্থা থেকে বের হয়ে সভ্য হয়েছে।

২০০১-এর পর থেকে ‘ওয়ার অন টেরর’ নামে সারা বিশ্বে আধিপত্য কিংবা প্রভাব বিস্তারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাস বিস্তার করে। এর অংশ হিসেবে তারা বহু দেশে বিভিন্ন বাহিনী গঠন করেছে বা পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। অর্থ দিয়ে, প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের শক্তিশালী করেছে। ‘সন্ত্রাসী’ নাম লাগিয়ে দিতে পারলেই খুন, গুম, নির্যাতন সবকিছু বৈধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সারা বিশ্বে একটি ফ্যাসিবাদী আবহাওয়া তৈরি করা হয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর বিভিন্ন সময়ে এরকম ঘটনা ঘটলেও আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিনা বিচারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হত্যাকাণ্ড শুরু হয় ২০০২ সালে বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে। সে সময়ই বাংলাদেশে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নসহ (র‌্যাব) জানা-অজানা নানা বাহিনী গঠন করা হয়। যৌথ বাহিনী গঠন করে ২০০২ সালে বাংলাদেশে ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ নামে শুরু হয় এই হত্যাযজ্ঞ, বেশকিছু মানুষকে খুন করার পর যৌথ বাহিনীকে দায়মুক্তি দেয়া হয়। ওই সময়ে বিচারবহির্ভূত এসব হত্যাকাণ্ডের আনুষ্ঠানিক প্রধান ছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। বর্তমানে তিনি জেলে এবং দশ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। এরকম ব্যক্তিরাই প্রধান হিসেবে এসব হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। দুই দফায় বর্তমান সরকার সেই ধারাই আরও জোরদার করেছে।

বর্তমান সময়ে এরকম বর্বর হত্যাকাণ্ডে সবচেয়ে এগিয়ে ফিলিপাইন। মানুষ খুন করার জন্য বাহিনীর সদস্যদের নানা পরিমাণে অর্থ পুরস্কারও ঘোষণা করা আছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও পাকিস্তানেও চলছে এ হত্যাকাণ্ড। ভারতের কাশ্মীর, অন্ধ্রপ্রদেশসহ বিভিন্ন অঞ্চলে, প্রতিবাদী মানুষদের সন্ত্রাসী, জঙ্গি বা মাওবাদী নাম দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। পাকিস্তানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য সেনাবাহিনীকে বিশেষ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এ হত্যাকারীদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষভাবে আইনি বর্ম দেয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশে এরকম কথা চালু আছে যে, যেহেতু বিচার প্রক্রিয়ার ওপর পুরো ভরসা করা যায় না, আদালতের ফাঁকফোকর আছে, সন্ত্রাসীরা ক্ষমতাবান এবং ছাড়া পেয়ে যায় সেহেতু বিনা বিচারে এই হত্যাকাণ্ড যুক্তিযুক্ত। অনেকে বিশ্বাসও করেন এই ধরনের কথা। এই বক্তব্যের মধ্যে ধরে নেয়া হয়- যারা এসব হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে তারা সন্ত্রাসের ঊর্ধ্বে। প্রকৃতপক্ষে খেয়াল করলে দেখা যাবে, যেসব সন্ত্রাসী আইনের ফাঁক দিয়ে ছাড়া পেয়ে যায়, তারা এই সুযোগ পায় ক্ষমতাবানদের জন্যই। এর আগেও ফাঁসির আসামিকে রাষ্ট্র মুক্তি দিয়েছে। আদালতে চার্জশিট প্রদান কিংবা তদন্তে জালিয়াতির প্রায় সবই হয় ক্ষমতাবানদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে ও তত্ত্বাবধানে। সুতরাং আইন-আদালত প্রক্রিয়ার দুর্বলতার প্রধান কারণ হচ্ছে টাকা কিংবা ক্ষমতাবানদের প্রভাব। এ ক্ষমতাবানরাই যখন কাউকে সন্ত্রাসী বলে খুন করে, তখন তাদের কথা বিশ্বাস করা নির্বোধের কাজই বটে। প্রশ্ন হল, যদি আইনের মাধ্যমে সন্ত্রাসী বা দোষীদের বিচারের সঠিক ব্যবস্থা করা না যায়, তাহলে বাংলাদেশে আইন-আদালত আছে কেন? বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে যদি সরকার একটি পন্থা হিসেবে গ্রহণই করে তাহলে গণতন্ত্র, আদালত বা আইনের প্রহসন কেন? পুলিশ, র‌্যাব বা ক্ষমতাসীনরা রক্ষা না করলে যে কোনো অপরাধের বিচার আইনি প্রক্রিয়াতেই সম্ভব।

একটু চোখ খুলে দেখলেই আমরা দেখতে পাব যে, যারা সন্ত্রাসীদের তৈরি করে, লালনপালন করে, রক্ষা করে, তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত, তারাই বিভিন্ন সময়ে ক্রসফায়ার নামক বিনা বিচারে হত্যার এই প্রক্রিয়াটিকে সুবিধাজনকভাবে ব্যবহার করে। আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে মোটা দাগে এই হত্যাকাণ্ডের কয়েকটা ধরন চিহ্নিত করা যায় :

প্রথমত, রাজনৈতিক কর্মীদের হত্যাকাণ্ড। একটা দীর্ঘ সময় ধরে চরমপন্থী নাম দিয়ে অনেককে হত্যা করা হয়েছে। এমন অনেককেও হত্যা করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে থানায় একটি মামলা পর্যন্ত নেই। তাছাড়া রাজনীতি বা দলমত কীভাবে একটি সভ্য সমাজে অপরাধ হতে পারে? অপরাধ থাকলে তাদের প্রকাশ্যে আইনের প্রক্রিয়ায় আনতে কী সমস্যা?

দ্বিতীয়ত, দলছুট সন্ত্রাসীদেরও এভাবে হত্যা করা হয়েছে। রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির সঙ্গে যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল, পরবর্তী সময়ে ওই নেতাদের সঙ্গে সংঘাত হয়েছে, তাদের ক্রসফায়ারে মারা হয়েছে। আবার দলীয় কোন্দলের পর কেউ কেউ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।

তৃতীয়ত, অর্থের বিনিময়ে, চাঁদা না পেয়ে, লুটে বাধা পেয়ে ক্রসফায়ার নাম দিয়ে হত্যা করার অভিযোগও পাওয়া গেছে। হত্যা বা ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে বাণিজ্য করা হচ্ছে। পাইকারিভাবে ধরে এনে ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ বাড়ছেই।

কোনো হত্যা নিয়ে কথা উঠলে র‌্যাব-পুলিশ বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয় অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে। বিনা বিচারে হত্যার লাইসেন্স দেয়া হয়েছে যাদের, তাদের বিরুদ্ধে মানুষ কার ভরসায় অভিযোগ করবে? যারা অভিযোগ করবেন, তাদের নিরাপত্তা কে দেবে? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলে তাদের নিরাপত্তা কোথায়?

নামের ভুলে একজনের বদলে আরেকজন নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। কোনো বিচার না থাকার কারণে এ নিয়ে কোনো ভাবান্তর নেই। লিমনের ঘটনা স্মরণ করতে পারি। লিমনকে গুলি করা হয়েছিল একজন সন্ত্রাসী ধরা হচ্ছে বলে, ও নিহত হলে সন্ত্রাসী নামেই ওর পরিচিতি থাকত। কিন্তু যে সন্ত্রাসীকে ধরার কথা বলা হচ্ছিল, সেই সন্ত্রাসী এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।

সভ্যতার লেশমাত্র থাকলে কোনো সমাজে ক্রসফায়ারের নামে হত্যাকাণ্ড সমর্থিত হতে পারে না। সমাজের যেসব মানুষ সঠিক তথ্য না জানার ফলে এসব হত্যাকাণ্ড সমর্থন করছেন, তারা নিজেরাও বিপদ কাছে টেনে আনছেন। বিনা বিচারে হত্যার লাইসেন্স দিয়ে র‌্যাব ও পুলিশ বাহিনীকে এমন এক বাহিনীতে পরিণত করা হচ্ছে, যেখানে জবাবদিহিতা বা আইনি বাধ্যবাধকতা বলে কিছু নেই।

মানুষ ধরে ধরে খুন করার মধ্যে দক্ষতা বা উচ্চ প্রশিক্ষণের কিছু নেই। এসব বাহিনীর সদস্যরা নিজেরাও এখন এক ভয়ংকর ফাঁদের মধ্যে। গুম, গ্রেফতার বাণিজ্য ও হত্যাকাণ্ড যেভাবে চলছে, তাতে কোনো নাগরিকই নিরাপদ নন। বাহিনীর লোকজনও নন। যে কোনো সময় যে কোনো ব্যক্তি এর শিকার হতে পারেন। চিন্তাপ্রতিবন্ধী অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে দলমত নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের উচিত এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে শামিল হওয়া। সবাইকে, বিশেষত শিক্ষিত বিদ্বৎসমাজকে, এর দায়ভার অবশ্যই নিতে হবে।

আনু মুহাম্মদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

[email protected]

SELECT id,hl2,parent_cat_id,entry_time,tmp_photo FROM news WHERE ((spc_tags REGEXP '.*"event";s:[0-9]+:"মাদকবিরোধী অভিযান ২০১৮".*') AND publish = 1) AND id<>56057 ORDER BY id DESC

ঘটনাপ্রবাহ : মাদকবিরোধী অভিযান ২০১৮

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.