আদর্শ মানুষ, আদর্শ শিক্ষক
jugantor
জন্মদিনের শুভেচ্ছা
আদর্শ মানুষ, আদর্শ শিক্ষক

  জুননু রাইন  

২৩ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী নিজের কাজ ও জীবনযাপনের মাধ্যমে এমন এক গ্রহণযোগ্যতায় উপনীত হয়েছেন, তার নামের আগে অধ্যাপক, লেখক, শিক্ষাবিদ-এ ধরনের অভিধা না লিখলেও নামটির ওজন কমে না। একজন আদর্শ শিক্ষক বা লেখক হিসাবেই শুধু নন, সমাজের যে কোনো সমস্যায় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী উপস্থিত থাকেন সশরীরে অথবা লেখার মাধ্যমে। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নন; বিপক্ষে যে কোনো অন্যায়ের। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অসংখ্য শিক্ষার্থীকে সমাজকল্যাণের জন্য তৈরি করেছেন, তার শিক্ষাদান তরুণদের জন্য সঠিক পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। তিনি শিক্ষার্থীকে শিষ্য মনে না করে বন্ধু ভাবেন।

শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনাই নয়, তার জীবনকেই তিনি তৈরি করেছেন অন্যের জন্য অনুসরণীয় হিসাবে। কোনো পদ-পদবির প্রলোভন প্রলুব্ধ করতে পারেনি এই আদর্শ শিক্ষককে। নীতির সঙ্গে আপস করতে হবে ভেবে দুইবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। পেশা হিসাবে শিক্ষকতা বেছে নেওয়ার ব্যাপারে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষকতা শুরুর পরই নিশ্চিত হলাম যে এখানেই থাকব এবং সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা না দেওয়ার পক্ষে বাবার কাছে এবং আমার কাছেও যুক্তি দাঁড় করাতে পারলাম। কারণ এটি স্থায়ী চাকরি, বদলি নেই, সারা জীবনই থাকতে পারব। দ্বিতীয় আকর্ষণ ছিল-এত বড় লাইব্রেরি! ছাত্রজীবনে যেটির বাইরে থাকতাম, বই আনা যেত কিন্তু ভেতরে ঢুকতে পারতাম না; তখন থেকেই আকর্ষণ ছিল-কখন লাইব্রেরি ব্যবহারের সুযোগ পাব। তৃতীয় কারণ হলো, এখানে থাকলে শিক্ষকদের সঙ্গে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে এবং ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ হবে। এতে জীবনটি বেশ প্রসারিত ও আনন্দময় হবে।’

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ছাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘স্যার শ্রেণিকক্ষে যখন পড়ান, তার বিষয় শুধু সাহিত্যে সীমাবদ্ধ থাকে না-সাহিত্যের নন্দনতত্ত্ব, সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব অথবা সাহিত্যের রাজনীতিতে তা পরিব্যাপ্ত হয়।’ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী পাঠ্যবিষয়কে বাস্তবতায় নিয়ে আসতে পারতেন। শিক্ষার্থীরা বুঝতেন এবং সেই মর্মে তাৎক্ষণিক নিজেদের পরবর্তী করণীয় ভেবে নিতে পারতেন।

তার ছাত্র সাহিত্যিক এবং অধ্যাপক আজফার হোসেন লিখেছেন, ‘স্যারের সঙ্গে হাজার হাজার কথোপকথনের স্মৃতি আছে, তবে একসময় তার সঙ্গে কথা বলে এটা টের পেয়েছিলাম সহজেই যে, বাংলাদেশে ইংরেজি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ অধ্যাপক হলেও বাংলা সাহিত্যে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতো অগাধ পড়াশোনা করা মানুষ খুব কমই আছেন। যদিও এও সত্য যে, তার লেখায় তিনি কতটা জানেন, তা তিনি ফলাতেন না মোটেই।’

‘পূবালী’ নামক মাসিক পত্রিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ‘ঢাকায় থাকি’ শিরোনামে ‘নাগরিক’ ছদ্মনামে প্রথম কলাম লেখার শুরু। প্রথম বই ‘অন্বেষণ’। প্রকাশ ১৯৬৪ সালে। ‘বেকনের মৌমাছিরা’, ‘বৃত্তের ভাঙ্গাগড়া’, ‘নিরাশ্রয়ী গৃহী’, ‘বাংলা সাহিত্য ও বাঙালী মধ্যবিত্ত’, ‘আরণ্যক দৃশ্যাবলী’, ‘শরৎচন্দ্র ও সামন্তবাদ’, ‘আমার পিতার মুখ’, ‘বঙ্কিমচন্দ্রের জমিদার ও কৃষক’, ‘স্বাধীনতা ও সংস্কৃতি’, ‘ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা গদ্যের সামাজিক ব্যাকরণ’, ‘বাঙালীকে কে বাঁচাবে’, ‘টলস্টয় অনেক প্রসঙ্গের কয়েকটি’, ‘নেতা, জনতা ও রাজনীতি’, ‘গণতন্ত্রের পক্ষ-বিপক্ষ’, ‘শেষ মীমাংসার আগে’, ‘শ্রেণী, সময় ও সাহিত্য’, ‘স্বপ্নের আলো ছায়া’, ‘কেউ বলে বৃক্ষ, কেউ বলে নদী’, ‘দ্বিজাতিতত্ত্বের সত্য-মিথ্যা’, ‘লেনিন কেন জরুরী’, ‘লিঙ্কনের বিষণ্ন মুখ’, ‘শেক্সপীয়রের মেয়েরা’, ‘জাতীয়তাবাদ সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি (১৯০৫-৪৭)’ ‘কুমুর বন্ধন’সহ তার প্রায় ১০০ গ্রন্থেই রয়েছে সৃষ্টিশীল গদ্যভাষার প্রয়োগ। প্রবন্ধের গদ্য শুধু অন্য লেখার ব্যখ্যা-বিশ্লেষণ বয়ে বেড়ালেও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রবন্ধের ভাষা একই সঙ্গে সৃষ্টিশীলতার স্বাদও দিতে সক্ষম।

বাংলাদেশের তিন মাধ্যমের শিক্ষার বিরুদ্ধে অনেকবার তিনি লিখেছেন। দেখিয়েছেন এই শিক্ষাব্যবস্থায় মানুষ যত শিক্ষিত হবে, শ্রেণিবৈষম্যও তত বাড়বে। বর্তমানে পণ্যে পরিণত হওয়া শিক্ষাকে যে অনেক উচ্চমূল্যে নিয়ে সাধারণ মানুষজনের ক্রয়ক্ষমতার অনেক বাইরে বিকানো হচ্ছে, তার ভয়াবহতা সম্পর্কে তিনি আমাদের অনেক আগেই সতর্ক করেছিলেন। এই উচ্চমূল্যের শিক্ষা মানুষকে স্বার্থপর করে দেয়, বিচ্ছিন্ন করে দেয়। আরও ভয়ানক যা, ব্যক্তি সেই শিক্ষার প্রভাবে সমষ্টিকে ব্যবহার ও শোষণ করতে শেখে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এখনো সবার আগে দেশের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে পারেন, শাসকের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে তাদের দুর্নীতির কথা লেখেন। নির্যাতিতের পক্ষে কথা বলেন। এমন একজন লেখকের আজ ৮৭তম জন্মদিন। আপনার দীর্ঘায়ু কামনা করি স্যার। আপনি আরও অনেক বছর দেশ ও মানুষের কল্যাণে বেঁচে থাকুন।

জুননু রাইন : কবি ও সাংবাদিক

জন্মদিনের শুভেচ্ছা

আদর্শ মানুষ, আদর্শ শিক্ষক

 জুননু রাইন 
২৩ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী নিজের কাজ ও জীবনযাপনের মাধ্যমে এমন এক গ্রহণযোগ্যতায় উপনীত হয়েছেন, তার নামের আগে অধ্যাপক, লেখক, শিক্ষাবিদ-এ ধরনের অভিধা না লিখলেও নামটির ওজন কমে না। একজন আদর্শ শিক্ষক বা লেখক হিসাবেই শুধু নন, সমাজের যে কোনো সমস্যায় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী উপস্থিত থাকেন সশরীরে অথবা লেখার মাধ্যমে। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নন; বিপক্ষে যে কোনো অন্যায়ের। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অসংখ্য শিক্ষার্থীকে সমাজকল্যাণের জন্য তৈরি করেছেন, তার শিক্ষাদান তরুণদের জন্য সঠিক পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। তিনি শিক্ষার্থীকে শিষ্য মনে না করে বন্ধু ভাবেন।

শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনাই নয়, তার জীবনকেই তিনি তৈরি করেছেন অন্যের জন্য অনুসরণীয় হিসাবে। কোনো পদ-পদবির প্রলোভন প্রলুব্ধ করতে পারেনি এই আদর্শ শিক্ষককে। নীতির সঙ্গে আপস করতে হবে ভেবে দুইবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। পেশা হিসাবে শিক্ষকতা বেছে নেওয়ার ব্যাপারে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষকতা শুরুর পরই নিশ্চিত হলাম যে এখানেই থাকব এবং সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা না দেওয়ার পক্ষে বাবার কাছে এবং আমার কাছেও যুক্তি দাঁড় করাতে পারলাম। কারণ এটি স্থায়ী চাকরি, বদলি নেই, সারা জীবনই থাকতে পারব। দ্বিতীয় আকর্ষণ ছিল-এত বড় লাইব্রেরি! ছাত্রজীবনে যেটির বাইরে থাকতাম, বই আনা যেত কিন্তু ভেতরে ঢুকতে পারতাম না; তখন থেকেই আকর্ষণ ছিল-কখন লাইব্রেরি ব্যবহারের সুযোগ পাব। তৃতীয় কারণ হলো, এখানে থাকলে শিক্ষকদের সঙ্গে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে এবং ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ হবে। এতে জীবনটি বেশ প্রসারিত ও আনন্দময় হবে।’

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ছাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘স্যার শ্রেণিকক্ষে যখন পড়ান, তার বিষয় শুধু সাহিত্যে সীমাবদ্ধ থাকে না-সাহিত্যের নন্দনতত্ত্ব, সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব অথবা সাহিত্যের রাজনীতিতে তা পরিব্যাপ্ত হয়।’ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী পাঠ্যবিষয়কে বাস্তবতায় নিয়ে আসতে পারতেন। শিক্ষার্থীরা বুঝতেন এবং সেই মর্মে তাৎক্ষণিক নিজেদের পরবর্তী করণীয় ভেবে নিতে পারতেন।

তার ছাত্র সাহিত্যিক এবং অধ্যাপক আজফার হোসেন লিখেছেন, ‘স্যারের সঙ্গে হাজার হাজার কথোপকথনের স্মৃতি আছে, তবে একসময় তার সঙ্গে কথা বলে এটা টের পেয়েছিলাম সহজেই যে, বাংলাদেশে ইংরেজি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ অধ্যাপক হলেও বাংলা সাহিত্যে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতো অগাধ পড়াশোনা করা মানুষ খুব কমই আছেন। যদিও এও সত্য যে, তার লেখায় তিনি কতটা জানেন, তা তিনি ফলাতেন না মোটেই।’

‘পূবালী’ নামক মাসিক পত্রিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ‘ঢাকায় থাকি’ শিরোনামে ‘নাগরিক’ ছদ্মনামে প্রথম কলাম লেখার শুরু। প্রথম বই ‘অন্বেষণ’। প্রকাশ ১৯৬৪ সালে। ‘বেকনের মৌমাছিরা’, ‘বৃত্তের ভাঙ্গাগড়া’, ‘নিরাশ্রয়ী গৃহী’, ‘বাংলা সাহিত্য ও বাঙালী মধ্যবিত্ত’, ‘আরণ্যক দৃশ্যাবলী’, ‘শরৎচন্দ্র ও সামন্তবাদ’, ‘আমার পিতার মুখ’, ‘বঙ্কিমচন্দ্রের জমিদার ও কৃষক’, ‘স্বাধীনতা ও সংস্কৃতি’, ‘ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা গদ্যের সামাজিক ব্যাকরণ’, ‘বাঙালীকে কে বাঁচাবে’, ‘টলস্টয় অনেক প্রসঙ্গের কয়েকটি’, ‘নেতা, জনতা ও রাজনীতি’, ‘গণতন্ত্রের পক্ষ-বিপক্ষ’, ‘শেষ মীমাংসার আগে’, ‘শ্রেণী, সময় ও সাহিত্য’, ‘স্বপ্নের আলো ছায়া’, ‘কেউ বলে বৃক্ষ, কেউ বলে নদী’, ‘দ্বিজাতিতত্ত্বের সত্য-মিথ্যা’, ‘লেনিন কেন জরুরী’, ‘লিঙ্কনের বিষণ্ন মুখ’, ‘শেক্সপীয়রের মেয়েরা’, ‘জাতীয়তাবাদ সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি (১৯০৫-৪৭)’ ‘কুমুর বন্ধন’সহ তার প্রায় ১০০ গ্রন্থেই রয়েছে সৃষ্টিশীল গদ্যভাষার প্রয়োগ। প্রবন্ধের গদ্য শুধু অন্য লেখার ব্যখ্যা-বিশ্লেষণ বয়ে বেড়ালেও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রবন্ধের ভাষা একই সঙ্গে সৃষ্টিশীলতার স্বাদও দিতে সক্ষম।

বাংলাদেশের তিন মাধ্যমের শিক্ষার বিরুদ্ধে অনেকবার তিনি লিখেছেন। দেখিয়েছেন এই শিক্ষাব্যবস্থায় মানুষ যত শিক্ষিত হবে, শ্রেণিবৈষম্যও তত বাড়বে। বর্তমানে পণ্যে পরিণত হওয়া শিক্ষাকে যে অনেক উচ্চমূল্যে নিয়ে সাধারণ মানুষজনের ক্রয়ক্ষমতার অনেক বাইরে বিকানো হচ্ছে, তার ভয়াবহতা সম্পর্কে তিনি আমাদের অনেক আগেই সতর্ক করেছিলেন। এই উচ্চমূল্যের শিক্ষা মানুষকে স্বার্থপর করে দেয়, বিচ্ছিন্ন করে দেয়। আরও ভয়ানক যা, ব্যক্তি সেই শিক্ষার প্রভাবে সমষ্টিকে ব্যবহার ও শোষণ করতে শেখে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এখনো সবার আগে দেশের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে পারেন, শাসকের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে তাদের দুর্নীতির কথা লেখেন। নির্যাতিতের পক্ষে কথা বলেন। এমন একজন লেখকের আজ ৮৭তম জন্মদিন। আপনার দীর্ঘায়ু কামনা করি স্যার। আপনি আরও অনেক বছর দেশ ও মানুষের কল্যাণে বেঁচে থাকুন।

জুননু রাইন : কবি ও সাংবাদিক

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন