অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
jugantor
অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল

  ড. জাহাঙ্গীর আলম  

২৫ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যান চলাচলের জন্য প্রস্তুত স্বপ্নের পদ্মা সেতু। এর ফলে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হলো।

এতদিন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে রাজধানী থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল খরস্রোতা পদ্মা। এ সেতুর কারণে মানুষের যোগাযোগের ক্ষেত্রে সূচিত হলো নতুন অধ্যায়ের। তাদের ভোগান্তি ও সময়ের অপচয় কম হবে। মাত্র ৪-৫ ঘণ্টার মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে ঢাকা পৌঁছে যাবে যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক।

ফলে সারা দেশের সঙ্গে ওই অঞ্চলের মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বন্ধন সুদৃঢ় হবে। কৃষি, শিল্প ও পর্যটন খাতে হবে ব্যাপক উন্নয়ন। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নতুন দুয়ার খুলবে। শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারিত হবে। মানুষের আয় বাড়বে। ফলে চাঙ্গা হবে স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতি। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে সারা দেশের মানুষ।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের হিসাবে এ সেতুর ফলে দেশের জিডিপি ১.২ শতাংশ এবং আঞ্চলিক জিডিপি ২.৩ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে। অন্য এক হিসাবে সারা দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে যাবে ২.২ শতাংশে। তাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান হবে। দারিদ্র্যের হার হ্রাস পাবে প্রায় ১ শতাংশ করে। দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও অর্থায়ন ত্বরান্বিত হবে। উন্নয়নের মূল ধারায় যুক্ত হবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষ।

জীবনধারায় ব্যাপক পরিবর্তন আনবে এ বহুমুখী পদ্মা সেতু। এ সেতুটি আমাদের গর্বের স্থাপনা। সক্ষমতার প্রতীক। এত বড় একটি প্রকল্প নিজ অর্থায়নে সম্পন্ন করে বাংলাদেশ আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে বিশ্ববাসীর সামনে। এটি আমাদের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে।

বিশ্বের ১১তম দীর্ঘ সেতু পদ্মা বহুমুখী সেতু। এশিয়ার দ্বিতীয় দীর্ঘতম সেতু এটি। দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিলোমিটার। সেতুর ওপর চলবে গাড়ি, নিচে চলবে রেল। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ যুক্ত হবে এশিয়ান হাইওয়েতে। এ সেতুর প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডি হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রথম দফায় (১৯৯৬-২০০১) রাষ্ট্র পরিচালনাকালে, ১৯৯৯ সালে। ২০০১ সালের ৪ জুলাই তিনি এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর পদ্মা সেতু নির্মাণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। এতে অর্থায়নের কথা ছিল এডিবি, জাইকা ও বিশ্বব্যাংকের। কিন্তু ২০১২ সালে দুর্নীতির চেষ্টার ধুয়া তুলে প্রথমে বিশ্বব্যাংক এবং পরে অন্যরা অর্থায়ন থেকে সরে যায়। ২০১৩ সালের ৪ মে নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইতোমধ্যে ২০১৪ সালে দুর্নীতির চেষ্টা অভিযোগকে মিথ্যা আখ্যা দিয়ে কানাডার আদালত থেকে রায় দেওয়া হয়।

অতঃপর বিশ্বব্যাংক সেতুটির অর্থায়নে ফিরে আসতে চাইলেও শেখ হাসিনার সরকার সে প্রস্তাবে সম্মত হয়নি। ওই বছর ১৭ জুন বাংলাদেশ সরকার এবং চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানির মধ্যে সেতু নির্মাণের আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুন্সীগঞ্জের মাওয়াপ্রান্তে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের মূল পাইলিং কাজের উদ্বোধন করেন। এরপর অনেক সমালোচনা ও অবজ্ঞা উপেক্ষা করে চলতি ২০২২ সালের এ জুন মাসে পদ্মা সেতুর উপরের তলার কাজ শেষ হয়।

আমাদের সংবিধানের ১৬ অনুচ্ছেদে কৃষিবিপ্লব বিকাশের কথা বলা হয়েছে। গত পঞ্চাশ বছরে দেশের অন্য অঞ্চলে তার অনেকটাই সফল হয়েছে। কিন্তু এ লক্ষ্যে পিছিয়ে আছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। এর প্রধান কারণ হলো, যোগাযোগের অসুবিধা। উপকরণ পরিবহণে দীর্ঘসূত্রতা।

উৎপাদিত পণ্য বিপণনের দুর্ভোগ। ফসলের মূল্যে অন্যায্যতা। চাষাবাদে কৃষকের কম লাভজনকতা। এসব কারণে ওই অঞ্চলে শস্য নিবিড়তা অপেক্ষাকৃত কম। পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে এ অঞ্চলে কৃষিবিপ্লবের অভিপ্রায় সফল হবে। নতুন প্রযুক্তি ধারণ ত্বরান্বিত হবে। দ্রুত বেড়ে যাবে শস্যের উৎপাদন। গড়ে উঠবে কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা। তাতে মানুষের কর্মসংস্থান হবে। আয় বাড়বে।

পদ্মা সেতুর কোলঘেঁষে থাকা শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও ফরিদপুরে রয়েছে ফসল চাষের বিস্তীর্ণ জমি। শাকসবজি ও মসলা ফসল উৎপাদনের জন্য এসব জমি খুবই উপযোগী। ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ উন্নত হওয়ায় এখানে ফসলের পচনশীলতা হ্রাস পাবে। বিভিন্ন শাকসবজি এবং মসলা ফসলের, বিশেষ করে পেঁয়াজ ও রসুনের উৎপাদন বাড়বে। তাছাড়া এখানকার গুরুত্বপূর্ণ ফসল পাটচাষে কৃষকের আগ্রহ বাড়বে। উৎসাহিত হবে পাটের উৎপাদন। গড়ে উঠবে পাটভিত্তিক শিল্প।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে বলা হয় খাদ্যভাণ্ডার। কিন্তু এ সুযোগ এতদিন পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। এখন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে সেখানে সবুজবিপ্লব ত্বরান্বিত হবে। ধানের ঘাতসহিষ্ণু ও উচ্চফলনশীল নতুন জাতগুলোর বিস্তার ঘটবে। ফলে চাল উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। বরিশাল ও পটুয়াখালীতে তরমুজের চাষ হয়; কিন্তু ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এবং রক্ষণাবেক্ষণের অসুবিধাসহ বিপণন সমস্যার কারণে কৃষক তরমুজ চাষে তেমন লাভবান হন না।

এখন এ সমস্যা দূর হবে এবং ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত তরমুজ পাঠানো সম্ভব হবে। তাতে কৃষকের তরমুজ বিক্রি করে ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিশ্চিত হবে। দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ চরে নারকেল ও সুপারির চাষ হয়। সমতলে হয় পান ও তেজপাতার চাষ। পটুয়াখালীতে মুগ ডালের চাষ হয় বাণিজ্যিকভাবে। জাপানসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে তা রপ্তানি করা হয়। তাছাড়া প্রচুর ফুলের চাষ হয় যশোরে। এখানকার ফুল রপ্তানি হয় বিদেশেও। পদ্মা সেতুর ফলে এসব কৃষিপণ্যের চাষ উৎসাহিত হবে।

যশোর ও ফরিদপুরের খেজুর গুড়ের কদর আছে দেশজুড়ে। এখন বিপণন ব্যবস্থার উন্নতি হলে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে খেজুর গাছের চাষ হবে। খেজুরের গুড়ভিক্তিক কুটির শিল্প সম্প্রসারিত হবে। পিরোজপুরে নারকেলের ছোবড়ার তৈরি পাপোশ ও দড়ি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি বিদেশেও বিপণন করা হয়। এখন যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের ফলে এ শিল্পের বিকাশ ঘটবে।

পদ্মা সেতুর কারণে জায়গা-জমির দাম অনেক বেড়ে গেছে। সেতুর এপাশে মুন্সীগঞ্জ এবং ওপাশে শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও ফরিদপুরে বহু মানুষ এখন নতুন স্বপ্ন দেখছে। লেবুখালী সেতু উদ্বোধনের পর বরিশালের সঙ্গে পটুয়াখালী জেলার আর কোনো ফেরি চলাচলের প্রয়োজন হচ্ছে না।

এখন ঢাকার সঙ্গেও যান চলাচল সহজ হয়ে গেছে। তাতে ফেরি পারপারের ও লঞ্চে চলাচলের দুর্ভোগ ঘোচানো সম্ভব হয়েছে। তাছাড়া পদ্মা সেতুর সঙ্গে সংযুক্ত এলাকায় নদীশাসনের ফলে অনেক কৃষিজমি নদীভাঙন থেকে রেহাই পেয়েছে।

প্রাণী-পাখি খাতে পদ্মা সেতুর প্রভাব হবে ইতিবাচক। সেতুটি চালু হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দুগ্ধ ও মাংস শিল্প বিকশিত হবে। গরু মোটাজাতাকরণ কর্মসূচি দ্রুত এগিয়ে যাবে। অনেক দুগ্ধ খামার গড়ে উঠবে। মাদারীপুরের টেকেরহাট এখন দুগ্ধ উৎপাদনকেন্দ্র হিসাবে বিবেচিত।

এর পরিধি শরীয়তপুর, ফরিদপুর এবং গোপালগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। তাছাড়া পোলট্রি শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। দানাদার খাদ্য সহজে পরিবহণ করার কারণে এর মূল্য হ্রাস পাবে। খামারিরা প্রাণী-পাখি প্রতিপালনে আগ্রহী হবে। দুধ ও মাংস প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের বিকাশ ঘটবে। তাতে বৃদ্ধি পাবে খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষের কর্মসংস্থান।

দেশের দক্ষিণাঞ্চল মৎস্য চাষ ও আহরণের জন্য খুবই গুরুপূর্ণ। এ দেশে উৎপাদিত চিংড়ি ও সামুদ্রিক মাছের সরবরাহ আসে মূলত দক্ষিণাঞ্চল থেকে। সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও খুলনা অঞ্চলে আছে অসংখ্য মাছের ঘের। সেখানে গড়ে উঠেছে অনেক প্রক্রিয়াকরণ শিল্প। তাতে কাজ করছে অসংখ্য গরিব মানুষ।

পদ্মা সেতুর ফলে নিবিড় মৎস্য চাষ উৎসাহিত হবে। রেণু পোনাসহ মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ও বিদেশে মৎস্য প্রেরণ সহজ ও ঝুঁকিমুক্ত হবে। তাতে মাছের অপচয় হ্রাস পাবে। আয় বাড়বে মৎস্য চাষিদের। তাছাড়া সুনীল অর্থনীতি গতিময় হবে। সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক আয় বৃদ্ধি পাবে মৎস্য খাতের।

পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাজের ক্ষেত্র অনেক সম্প্রসারিত হবে। কৃষি বহুধাকরণ ও শস্যের বৈচিত্র্যকরণ সহজ হবে। কৃষি ব্যবসায় মানুষের আগ্রহ বাড়বে। উপযুক্ত কাজ ও আয়ের অভাবে যারা নিজের এলাকা ছেড়ে ঢাকা বা অন্য কোনো এলাকায় চলে গিয়েছিলেন তারা নিজ ঘরবাড়িতে ফিরে আসবেন। আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ নেবেন। তাদের উৎপাদিকা শক্তি বৃদ্ধি পাবে।

দক্ষতা অর্জিত হবে। বিভিন্ন অর্থ উপার্জনের কাজে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। ইপিজেড, পাটকল, চালকল পুরো মাত্রায় বিকশিত হবে। মোংলা বন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। তাতে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। সুন্দরবন ও সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটায় পর্যটন শিল্প বিকশিত হবে। ফলে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। এগিয়ে যাবে সারা দেশ।

নিজ অর্থয়ানে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক সাহসী পদক্ষেপ। এর আগে তিনি ১৯৯৮ সালের ২৩ জুন যমুনার ওপর বঙ্গবন্ধু সেতুর উদ্বোধন করেছিলেন। ওই সেতুর দৈর্ঘ্য ৪.৮ কিলোমিটার। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেতু এটি।

এর মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ অনেক সহজ হয় এবং উত্তরবঙ্গের মানুষের বিপুল আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটে। সমগ্র দেশের উন্নয়নের মূল গতিধারার সঙ্গে একীভূত হয় উত্তরবঙ্গ। এবার পদ্মা সেতুর মাধ্যমে সারা দেশের উন্নয়নের সঙ্গে একীভূত হলো দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল।

ড. জাহাঙ্গীর আলম : কৃষি অর্থনীতিবিদ, গবেষণায় অবদানের জন্য একুশে পদকপ্রাপ্ত

অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল

 ড. জাহাঙ্গীর আলম 
২৫ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যান চলাচলের জন্য প্রস্তুত স্বপ্নের পদ্মা সেতু। এর ফলে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হলো।

এতদিন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে রাজধানী থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল খরস্রোতা পদ্মা। এ সেতুর কারণে মানুষের যোগাযোগের ক্ষেত্রে সূচিত হলো নতুন অধ্যায়ের। তাদের ভোগান্তি ও সময়ের অপচয় কম হবে। মাত্র ৪-৫ ঘণ্টার মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে ঢাকা পৌঁছে যাবে যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক।

ফলে সারা দেশের সঙ্গে ওই অঞ্চলের মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বন্ধন সুদৃঢ় হবে। কৃষি, শিল্প ও পর্যটন খাতে হবে ব্যাপক উন্নয়ন। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নতুন দুয়ার খুলবে। শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারিত হবে। মানুষের আয় বাড়বে। ফলে চাঙ্গা হবে স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতি। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে সারা দেশের মানুষ।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের হিসাবে এ সেতুর ফলে দেশের জিডিপি ১.২ শতাংশ এবং আঞ্চলিক জিডিপি ২.৩ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে। অন্য এক হিসাবে সারা দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে যাবে ২.২ শতাংশে। তাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান হবে। দারিদ্র্যের হার হ্রাস পাবে প্রায় ১ শতাংশ করে। দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও অর্থায়ন ত্বরান্বিত হবে। উন্নয়নের মূল ধারায় যুক্ত হবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষ।

জীবনধারায় ব্যাপক পরিবর্তন আনবে এ বহুমুখী পদ্মা সেতু। এ সেতুটি আমাদের গর্বের স্থাপনা। সক্ষমতার প্রতীক। এত বড় একটি প্রকল্প নিজ অর্থায়নে সম্পন্ন করে বাংলাদেশ আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে বিশ্ববাসীর সামনে। এটি আমাদের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে।

বিশ্বের ১১তম দীর্ঘ সেতু পদ্মা বহুমুখী সেতু। এশিয়ার দ্বিতীয় দীর্ঘতম সেতু এটি। দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিলোমিটার। সেতুর ওপর চলবে গাড়ি, নিচে চলবে রেল। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ যুক্ত হবে এশিয়ান হাইওয়েতে। এ সেতুর প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডি হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রথম দফায় (১৯৯৬-২০০১) রাষ্ট্র পরিচালনাকালে, ১৯৯৯ সালে। ২০০১ সালের ৪ জুলাই তিনি এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর পদ্মা সেতু নির্মাণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। এতে অর্থায়নের কথা ছিল এডিবি, জাইকা ও বিশ্বব্যাংকের। কিন্তু ২০১২ সালে দুর্নীতির চেষ্টার ধুয়া তুলে প্রথমে বিশ্বব্যাংক এবং পরে অন্যরা অর্থায়ন থেকে সরে যায়। ২০১৩ সালের ৪ মে নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইতোমধ্যে ২০১৪ সালে দুর্নীতির চেষ্টা অভিযোগকে মিথ্যা আখ্যা দিয়ে কানাডার আদালত থেকে রায় দেওয়া হয়।

অতঃপর বিশ্বব্যাংক সেতুটির অর্থায়নে ফিরে আসতে চাইলেও শেখ হাসিনার সরকার সে প্রস্তাবে সম্মত হয়নি। ওই বছর ১৭ জুন বাংলাদেশ সরকার এবং চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানির মধ্যে সেতু নির্মাণের আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুন্সীগঞ্জের মাওয়াপ্রান্তে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের মূল পাইলিং কাজের উদ্বোধন করেন। এরপর অনেক সমালোচনা ও অবজ্ঞা উপেক্ষা করে চলতি ২০২২ সালের এ জুন মাসে পদ্মা সেতুর উপরের তলার কাজ শেষ হয়।

আমাদের সংবিধানের ১৬ অনুচ্ছেদে কৃষিবিপ্লব বিকাশের কথা বলা হয়েছে। গত পঞ্চাশ বছরে দেশের অন্য অঞ্চলে তার অনেকটাই সফল হয়েছে। কিন্তু এ লক্ষ্যে পিছিয়ে আছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। এর প্রধান কারণ হলো, যোগাযোগের অসুবিধা। উপকরণ পরিবহণে দীর্ঘসূত্রতা।

উৎপাদিত পণ্য বিপণনের দুর্ভোগ। ফসলের মূল্যে অন্যায্যতা। চাষাবাদে কৃষকের কম লাভজনকতা। এসব কারণে ওই অঞ্চলে শস্য নিবিড়তা অপেক্ষাকৃত কম। পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে এ অঞ্চলে কৃষিবিপ্লবের অভিপ্রায় সফল হবে। নতুন প্রযুক্তি ধারণ ত্বরান্বিত হবে। দ্রুত বেড়ে যাবে শস্যের উৎপাদন। গড়ে উঠবে কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা। তাতে মানুষের কর্মসংস্থান হবে। আয় বাড়বে।

পদ্মা সেতুর কোলঘেঁষে থাকা শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও ফরিদপুরে রয়েছে ফসল চাষের বিস্তীর্ণ জমি। শাকসবজি ও মসলা ফসল উৎপাদনের জন্য এসব জমি খুবই উপযোগী। ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ উন্নত হওয়ায় এখানে ফসলের পচনশীলতা হ্রাস পাবে। বিভিন্ন শাকসবজি এবং মসলা ফসলের, বিশেষ করে পেঁয়াজ ও রসুনের উৎপাদন বাড়বে। তাছাড়া এখানকার গুরুত্বপূর্ণ ফসল পাটচাষে কৃষকের আগ্রহ বাড়বে। উৎসাহিত হবে পাটের উৎপাদন। গড়ে উঠবে পাটভিত্তিক শিল্প।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে বলা হয় খাদ্যভাণ্ডার। কিন্তু এ সুযোগ এতদিন পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। এখন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে সেখানে সবুজবিপ্লব ত্বরান্বিত হবে। ধানের ঘাতসহিষ্ণু ও উচ্চফলনশীল নতুন জাতগুলোর বিস্তার ঘটবে। ফলে চাল উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। বরিশাল ও পটুয়াখালীতে তরমুজের চাষ হয়; কিন্তু ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এবং রক্ষণাবেক্ষণের অসুবিধাসহ বিপণন সমস্যার কারণে কৃষক তরমুজ চাষে তেমন লাভবান হন না।

এখন এ সমস্যা দূর হবে এবং ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত তরমুজ পাঠানো সম্ভব হবে। তাতে কৃষকের তরমুজ বিক্রি করে ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিশ্চিত হবে। দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ চরে নারকেল ও সুপারির চাষ হয়। সমতলে হয় পান ও তেজপাতার চাষ। পটুয়াখালীতে মুগ ডালের চাষ হয় বাণিজ্যিকভাবে। জাপানসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে তা রপ্তানি করা হয়। তাছাড়া প্রচুর ফুলের চাষ হয় যশোরে। এখানকার ফুল রপ্তানি হয় বিদেশেও। পদ্মা সেতুর ফলে এসব কৃষিপণ্যের চাষ উৎসাহিত হবে।

যশোর ও ফরিদপুরের খেজুর গুড়ের কদর আছে দেশজুড়ে। এখন বিপণন ব্যবস্থার উন্নতি হলে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে খেজুর গাছের চাষ হবে। খেজুরের গুড়ভিক্তিক কুটির শিল্প সম্প্রসারিত হবে। পিরোজপুরে নারকেলের ছোবড়ার তৈরি পাপোশ ও দড়ি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি বিদেশেও বিপণন করা হয়। এখন যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের ফলে এ শিল্পের বিকাশ ঘটবে।

পদ্মা সেতুর কারণে জায়গা-জমির দাম অনেক বেড়ে গেছে। সেতুর এপাশে মুন্সীগঞ্জ এবং ওপাশে শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও ফরিদপুরে বহু মানুষ এখন নতুন স্বপ্ন দেখছে। লেবুখালী সেতু উদ্বোধনের পর বরিশালের সঙ্গে পটুয়াখালী জেলার আর কোনো ফেরি চলাচলের প্রয়োজন হচ্ছে না।

এখন ঢাকার সঙ্গেও যান চলাচল সহজ হয়ে গেছে। তাতে ফেরি পারপারের ও লঞ্চে চলাচলের দুর্ভোগ ঘোচানো সম্ভব হয়েছে। তাছাড়া পদ্মা সেতুর সঙ্গে সংযুক্ত এলাকায় নদীশাসনের ফলে অনেক কৃষিজমি নদীভাঙন থেকে রেহাই পেয়েছে।

প্রাণী-পাখি খাতে পদ্মা সেতুর প্রভাব হবে ইতিবাচক। সেতুটি চালু হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দুগ্ধ ও মাংস শিল্প বিকশিত হবে। গরু মোটাজাতাকরণ কর্মসূচি দ্রুত এগিয়ে যাবে। অনেক দুগ্ধ খামার গড়ে উঠবে। মাদারীপুরের টেকেরহাট এখন দুগ্ধ উৎপাদনকেন্দ্র হিসাবে বিবেচিত।

এর পরিধি শরীয়তপুর, ফরিদপুর এবং গোপালগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। তাছাড়া পোলট্রি শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। দানাদার খাদ্য সহজে পরিবহণ করার কারণে এর মূল্য হ্রাস পাবে। খামারিরা প্রাণী-পাখি প্রতিপালনে আগ্রহী হবে। দুধ ও মাংস প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের বিকাশ ঘটবে। তাতে বৃদ্ধি পাবে খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষের কর্মসংস্থান।

দেশের দক্ষিণাঞ্চল মৎস্য চাষ ও আহরণের জন্য খুবই গুরুপূর্ণ। এ দেশে উৎপাদিত চিংড়ি ও সামুদ্রিক মাছের সরবরাহ আসে মূলত দক্ষিণাঞ্চল থেকে। সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও খুলনা অঞ্চলে আছে অসংখ্য মাছের ঘের। সেখানে গড়ে উঠেছে অনেক প্রক্রিয়াকরণ শিল্প। তাতে কাজ করছে অসংখ্য গরিব মানুষ।

পদ্মা সেতুর ফলে নিবিড় মৎস্য চাষ উৎসাহিত হবে। রেণু পোনাসহ মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ও বিদেশে মৎস্য প্রেরণ সহজ ও ঝুঁকিমুক্ত হবে। তাতে মাছের অপচয় হ্রাস পাবে। আয় বাড়বে মৎস্য চাষিদের। তাছাড়া সুনীল অর্থনীতি গতিময় হবে। সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক আয় বৃদ্ধি পাবে মৎস্য খাতের।

পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাজের ক্ষেত্র অনেক সম্প্রসারিত হবে। কৃষি বহুধাকরণ ও শস্যের বৈচিত্র্যকরণ সহজ হবে। কৃষি ব্যবসায় মানুষের আগ্রহ বাড়বে। উপযুক্ত কাজ ও আয়ের অভাবে যারা নিজের এলাকা ছেড়ে ঢাকা বা অন্য কোনো এলাকায় চলে গিয়েছিলেন তারা নিজ ঘরবাড়িতে ফিরে আসবেন। আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ নেবেন। তাদের উৎপাদিকা শক্তি বৃদ্ধি পাবে।

দক্ষতা অর্জিত হবে। বিভিন্ন অর্থ উপার্জনের কাজে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। ইপিজেড, পাটকল, চালকল পুরো মাত্রায় বিকশিত হবে। মোংলা বন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। তাতে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। সুন্দরবন ও সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটায় পর্যটন শিল্প বিকশিত হবে। ফলে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। এগিয়ে যাবে সারা দেশ।

নিজ অর্থয়ানে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক সাহসী পদক্ষেপ। এর আগে তিনি ১৯৯৮ সালের ২৩ জুন যমুনার ওপর বঙ্গবন্ধু সেতুর উদ্বোধন করেছিলেন। ওই সেতুর দৈর্ঘ্য ৪.৮ কিলোমিটার। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেতু এটি।

এর মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ অনেক সহজ হয় এবং উত্তরবঙ্গের মানুষের বিপুল আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটে। সমগ্র দেশের উন্নয়নের মূল গতিধারার সঙ্গে একীভূত হয় উত্তরবঙ্গ। এবার পদ্মা সেতুর মাধ্যমে সারা দেশের উন্নয়নের সঙ্গে একীভূত হলো দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল।

ড. জাহাঙ্গীর আলম : কৃষি অর্থনীতিবিদ, গবেষণায় অবদানের জন্য একুশে পদকপ্রাপ্ত

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন