পদ্মা আমাদের শক্তি, আমাদের সংকল্প
jugantor
পদ্মা আমাদের শক্তি, আমাদের সংকল্প

  অমিত রায় চৌধুরী  

২৫ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পদ্মা সেতু নিয়ে মানুষের বাঁধভাঙা আবেগ মনে করিয়ে দিচ্ছে বিজয়ের বেশকিছু স্মরণীয় মুহূর্ত। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় দিবস, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, বিশ্বকাপ ক্রিকেটে পাকিস্তান বা ভারতকে হারানো!

কীভাবে বাঙালি আবেগে ফুঁসে উঠেছিল, কোন্ জাদুকাঠির ছোঁয়ায় গোটা দেশ একরেখায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, তা ভাবলে আজও শিহরিত হই। পদ্মা সেতু নিয়ে উন্মাদনা আছে, অহংকারও আছে-বাঙালির মনের গড়ন যারা চেনে, তাদের এ নিয়ে কোনো বিস্ময় নেই। কিন্তু এখানে কি শুধুই দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদী আবেগ?

নিশ্চয়ই না, এখানে জড়িয়ে আছে রুটি-রোজগারের প্রশ্ন। চাকরি, কাজ, শিক্ষা, চিকিৎসা-সবখানেই স্বপ্ন দেখে তারুণ্য। শিল্প, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য সব ক্ষেত্রেই সমৃদ্ধির হাতছানি। আবাসন, বিনোদন, জীবনমান, এমনকি জাতীয় প্রবৃদ্ধি-কোথায় নেই বিস্ময় সেতুর বরাভয়? দক্ষিণ-পশ্চিমের বিবর্ণ মানচিত্রটাকেই ঝাঁ-চকচকে করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। নেতা যখন স্বপ্ন দেখান, জনতা তখন স্বভাবতই উদ্বেল।

কিন্তু সবটাই কি সত্যি বলে মানে ঘরপোড়া গরু? হয়তো ভেবে নেয় একান্তে-এ তো রাজনৈতিক অঙ্গীকার! বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন স্বাধীনতার, সার্বভৌম ভূ-খণ্ডের মালিক হয়েছে বাঙালি। শত-সহস্র বছরের বঞ্চিত, হতভাগা এ জনগোষ্ঠী। তবে সোনার বাংলা গড়ার সুযোগ তিনি পাননি। দুঃখী বাঙালি তা বোঝে। অনেক ফাঁকা আওয়াজ শুনতে অভ্যস্ত হয়েছে এ দেশের মানুষ। দীর্ঘদিন এমন কপট সংস্কৃতিতে জারিত এ দেশ।

বঙ্গবন্ধুকন্যা এ মিথ ভেঙে ফেলতে মরিয়া। জাতির পিতা তার আদর্শের শিক্ষক। একের পর এক স্বপ্ন দেখেছেন। সে দৃষ্টি পাড়ি দিয়েছে অনেক পথ-‘আজি হতে শতবর্ষ পরে’।

সবকিছু ঠিকঠাক চলছে দেশে-এমন দাবি বোধহয় কেউ করে না। বেশকিছু প্রশ্নচিহ্নও হয়তো জমে গেছে শাসনকালের খেরোখাতায়। কিন্তু ওয়াদা পূরণে নেতা খেলাপি হননি-একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। আবার সেই প্রতিজ্ঞা পালনের মুহূর্ত। সেতু উদ্বোধনের রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা। কাউন্ট ডাউন শুরু।

খরস্রোতা নদী হিসাবে পর্যটকের কাছে পদ্মার জগৎজোড়া খ্যাতি। আকর্ষণ, ভয় আর মুগ্ধতার এক দুর্লভ মোহনা। জলস্রোতের ক্ষিপ্রতায় বিশ্বে আমাজনের পরই পদ্মার স্থান। কত সহজে এ অজেয় পদ্মাকে জয় করেছে এ সেতু, তা এক অপার বিস্ময়। নির্মাণশৈলীর পরতে পরতে শ্রেষ্ঠত্বের অঙ্ক।

দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম বৃহৎ সেতু। খেয়াল করেছি-গৃহস্থ নারী, ছাত্র-শিক্ষক, প্রান্তিক কৃষক, চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা ধনী ব্যবসায়ী-সবাই কেমন যেন বদলে যাওয়া দিনের প্রত্যাশায়। হাইওয়ের মাইলফলকে লেখা দক্ষিণ-পশ্চিমের একটি জনপদ ফকিরহাট থেকে ঢাকার দূরত্ব ১৪০ কিলোমিটার। কিন্তু এই তো সেদিনও ঢাকা যাওয়ার নাম শুনলেই যাত্রীরা আঁতকে উঠেছেন। দেড় দশক আগেও কয়েকটি নদী পার হতে হতো। ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা সময়। আরিচা হয়ে গেলেও প্রায় তা-ই। রাস্তা ভালো হওয়ায় পদ্মা বাদে নদী পারের ঝামেলা ছিল না।

রাজধানী যাত্রাও অপেক্ষাকৃত সহজ হয়ে উঠেছিল; কিন্তু প্রমত্তা পদ্মা বলে কথা! কখন যে সে কোন্ রূপ ধারণ করে, তা আন্দাজ করা কঠিন। ঝড়-বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই। উত্তাল এ নদী কত লঞ্চ, ট্রলার, স্পিডবোট, এমনকি ফেরি পর্যন্ত হেলাফেলায় ডুবিয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। দুর্যোগের সংকেত পেলে সারা রাত অপেক্ষা করেছে সারি সারি পরিবহণ। পণ্যবাহী ট্রাকগুলোর এ ধৈর্যের পরীক্ষা তো প্রাত্যহিক অনুশীলন।

যাত্রাপথে সীমাহীন দুর্ভোগ’-শব্দবন্ধটির যথার্থতা হয়তো পদ্মা পারেই কেবল উপলব্ধি করা যায়। শীতকালে কুয়াশার আশঙ্কা যাত্রীকে তটস্থ করে রাখত। আর মাঝ নদীতে যারা ঝড়ের সাক্ষী, কেবল তারাই হয়তো মরণকে খুব কাছ থেকে দেখেছে। আর বুঝেছে জীবনকে তারা কত ভালোবাসে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শূন্য থেকেই যাত্রা শুরু করেছিলেন জাতির পিতা। বিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠন করতে একের পর এক দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মুখে পড়েন বঙ্গবন্ধু। তবু কোনো কিছুই তাকে রুখতে পারেনি। একটি শোষণমুক্ত সমাজ গঠনে তিনি ছিলেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। দেশের শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিল্প, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, যোগাযোগ অবকাঠামো অথবা বৈদেশিক নীতি-এমন বিষয় নেই যেখানে তিনি হাত দেননি, ভাবেননি।

লক্ষ্য একটাই-নিপীড়িত মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন। এ কথাও ঠিক, বঙ্গবন্ধুর দল ছাড়াও অন্যান্য রাজনৈতিক দলও দেশের জন্য কোনো না কোনো কাজ করেছেন। কিন্তু এ কথা কি সবাই মুক্তকণ্ঠে বলেন-এ মানুষটির জন্ম না হলে আমরা সে কাজটুকুও করতে পারতাম না। আমরা সেই পাকিস্তান হয়েই থাকতাম, দারিদ্র্য, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ যাদের নিত্যসঙ্গী অথবা অন্য দেশের অনুকম্পাই যাদের একমাত্র পুঁজি।

আমরা এখন আর তেমন দেশের নাগরিক নই। স্বাধীন, সার্বভৌম ও মর্যাদাপূর্ণ একটা রাষ্ট্র। তবে কেন আমরা সবাই মিলে বঙ্গবন্ধুর অবদান বা অন্তত সেই ঐতিহাসিক সত্যটুকু স্বীকার করতে এত কুণ্ঠিত? কেন আমরা স্থলসীমানা চুক্তি বা সমুদ্রজয়ের মতো অমূল্য অর্জন সগৌরবে উদযাপন করতে পারি না? কেন আমাদের মনোজগতে এত দেউলিয়াপনা? আজ সত্যিই সেসব কথা মনে পড়ছে।

দেশে আজ খাদ্যনিরাপত্তা আছে। সামাজিক নিরাপত্তা মজবুত। দেশ আজ মঙ্গামুক্ত। মাথাপিছু আয়, শ্রম-মজুরি, ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো। চাকরিজীবীর বেতনভাতাও বেড়েছে। গ্রাম থেকে শহর-পাকা রাস্তায় মোড়া। বিদ্যুৎ, প্রযুক্তি, ইন্টারনেট, কমিউনিটি ক্লিনিক, হাসপাতাল, কেব্ল টিভি, খবরের কাগজ, তথ্যকেন্দ্র-এমন সেবার পরিধি এখন প্রত্যন্ত মফস্বল পর্যন্ত বিস্তৃত। কৃষি যথেষ্ট ভালো করেছে, গার্মেন্টস্ শক্ত হয়ে উঠেছে, প্রবাসী শ্রমিক দক্ষতা প্রমাণ করেছে-বিশেষজ্ঞরা তাতে অবাকই হয়েছেন। বিশ্বকাঁপানো করোনা মোকাবিলায়ও আমরা সক্ষমতার নজির গড়েছি।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা, তবুও খাদ্য সংকটের ভয় আমাদের গ্রাস করেনি। জ্বালানি-ভোজ্যতেলের হাহাকার এখন বিশ্বব্যাপী। উন্নত থেকে গরিব দেশ-সবাই ভুগছে। শ্রীলংকা, পাকিস্তান, নেপাল, আফগানিস্তান এবং আফ্রিকার কিছু দেশ রীতিমতো দিশাহীন। কিন্তু আমরা তো এখনো নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে, আত্মশক্তিতে বলীয়ান। দক্ষ হাতে কৌশলগত ভূ-রাজনীতি মোকাবিলা করছে দেশ। অগ্রযাত্রাও থেমে থাকেনি।

পদ্মা সেতুর অন্য গল্পটা বলি। একসময় বাংলা ছিল ঐশ্বর্যের লীলাভূমি। গোটা বিশ্বের নজর ছিল বাংলায়। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রশক্তির কাছে বাঙালি কখনোই মাথা নত করেনি। পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগ আনে বিশ্বব্যাংক। মন্ত্রী-সচিবকে পর্যন্ত চকিতে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পুরোদস্তুর অনুসন্ধানে প্রমাণ মেলে অভিযোগ ভিত্তিহীন। প্রবল জাত্যাভিমান জেগে ওঠে।

নেত্রী হয়ে ওঠেন বাঙালি অস্মিতার প্রতীক। ঠিক করে ফেলেন নিজের টাকায় এ সেতু করবেন। শুধু টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া নয়, বিশ্বের যেখানেই বাঙালি আছে-সবার আবেগকে নাড়িয়ে দেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। গড়ে ওঠে বিরল আদর্শিক ঐক্য। ২০১৭ সালে কানাডার আদালত অভিযোগকে গুজব বলে প্রত্যাখ্যান করলে বাঙালি দুনিয়া সেদিন আরও একটি বিজয় উদযাপন করেছিল। তাই ২৫ জুন শুধু সেতু উদ্বোধনের দিন নয়, বাঙালির রাজনৈতিক চেতনা পুনর্নির্মাণের দিন।

সেতু শুধু আর্থিক সমৃদ্ধি বা যোগাযোগ রক্ষাকারী উপলক্ষ্য নয়, এর সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বার্তা আরও গভীর। আর ‘বাস্কেট কেইস’ নয়, সম্ভাবনার উদীয়মান বিশ্বে নিশ্চিতভাবেই এখন বাংলাদেশ একটি সম্মানজনক পরিচয়।

সক্ষমতা, সাহস ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। প্রকৃতি বা মানুষ্যসৃষ্ট যে কোনো বৈরী পরিবেশে রুখে দাঁড়ানোর সংকল্প এ জনগোষ্ঠীর শিরায় শিরায়। বাঙালির সব অহংকার আগলে রেখে এ সেতু যেন অনাগত প্রজন্মকে ন্যায়ের লড়াইয়ে চিরকাল এগিয়ে রাখে-এমন আকাঙ্ক্ষা থাকবে।

অমিত রায় চৌধুরী : সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্তি অধ্যক্ষ, বাগেরহাট

পদ্মা আমাদের শক্তি, আমাদের সংকল্প

 অমিত রায় চৌধুরী 
২৫ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পদ্মা সেতু নিয়ে মানুষের বাঁধভাঙা আবেগ মনে করিয়ে দিচ্ছে বিজয়ের বেশকিছু স্মরণীয় মুহূর্ত। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় দিবস, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, বিশ্বকাপ ক্রিকেটে পাকিস্তান বা ভারতকে হারানো!

কীভাবে বাঙালি আবেগে ফুঁসে উঠেছিল, কোন্ জাদুকাঠির ছোঁয়ায় গোটা দেশ একরেখায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, তা ভাবলে আজও শিহরিত হই। পদ্মা সেতু নিয়ে উন্মাদনা আছে, অহংকারও আছে-বাঙালির মনের গড়ন যারা চেনে, তাদের এ নিয়ে কোনো বিস্ময় নেই। কিন্তু এখানে কি শুধুই দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদী আবেগ?

নিশ্চয়ই না, এখানে জড়িয়ে আছে রুটি-রোজগারের প্রশ্ন। চাকরি, কাজ, শিক্ষা, চিকিৎসা-সবখানেই স্বপ্ন দেখে তারুণ্য। শিল্প, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য সব ক্ষেত্রেই সমৃদ্ধির হাতছানি। আবাসন, বিনোদন, জীবনমান, এমনকি জাতীয় প্রবৃদ্ধি-কোথায় নেই বিস্ময় সেতুর বরাভয়? দক্ষিণ-পশ্চিমের বিবর্ণ মানচিত্রটাকেই ঝাঁ-চকচকে করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। নেতা যখন স্বপ্ন দেখান, জনতা তখন স্বভাবতই উদ্বেল।

কিন্তু সবটাই কি সত্যি বলে মানে ঘরপোড়া গরু? হয়তো ভেবে নেয় একান্তে-এ তো রাজনৈতিক অঙ্গীকার! বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন স্বাধীনতার, সার্বভৌম ভূ-খণ্ডের মালিক হয়েছে বাঙালি। শত-সহস্র বছরের বঞ্চিত, হতভাগা এ জনগোষ্ঠী। তবে সোনার বাংলা গড়ার সুযোগ তিনি পাননি। দুঃখী বাঙালি তা বোঝে। অনেক ফাঁকা আওয়াজ শুনতে অভ্যস্ত হয়েছে এ দেশের মানুষ। দীর্ঘদিন এমন কপট সংস্কৃতিতে জারিত এ দেশ।

বঙ্গবন্ধুকন্যা এ মিথ ভেঙে ফেলতে মরিয়া। জাতির পিতা তার আদর্শের শিক্ষক। একের পর এক স্বপ্ন দেখেছেন। সে দৃষ্টি পাড়ি দিয়েছে অনেক পথ-‘আজি হতে শতবর্ষ পরে’।

সবকিছু ঠিকঠাক চলছে দেশে-এমন দাবি বোধহয় কেউ করে না। বেশকিছু প্রশ্নচিহ্নও হয়তো জমে গেছে শাসনকালের খেরোখাতায়। কিন্তু ওয়াদা পূরণে নেতা খেলাপি হননি-একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। আবার সেই প্রতিজ্ঞা পালনের মুহূর্ত। সেতু উদ্বোধনের রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা। কাউন্ট ডাউন শুরু।

খরস্রোতা নদী হিসাবে পর্যটকের কাছে পদ্মার জগৎজোড়া খ্যাতি। আকর্ষণ, ভয় আর মুগ্ধতার এক দুর্লভ মোহনা। জলস্রোতের ক্ষিপ্রতায় বিশ্বে আমাজনের পরই পদ্মার স্থান। কত সহজে এ অজেয় পদ্মাকে জয় করেছে এ সেতু, তা এক অপার বিস্ময়। নির্মাণশৈলীর পরতে পরতে শ্রেষ্ঠত্বের অঙ্ক।

দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম বৃহৎ সেতু। খেয়াল করেছি-গৃহস্থ নারী, ছাত্র-শিক্ষক, প্রান্তিক কৃষক, চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা ধনী ব্যবসায়ী-সবাই কেমন যেন বদলে যাওয়া দিনের প্রত্যাশায়। হাইওয়ের মাইলফলকে লেখা দক্ষিণ-পশ্চিমের একটি জনপদ ফকিরহাট থেকে ঢাকার দূরত্ব ১৪০ কিলোমিটার। কিন্তু এই তো সেদিনও ঢাকা যাওয়ার নাম শুনলেই যাত্রীরা আঁতকে উঠেছেন। দেড় দশক আগেও কয়েকটি নদী পার হতে হতো। ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা সময়। আরিচা হয়ে গেলেও প্রায় তা-ই। রাস্তা ভালো হওয়ায় পদ্মা বাদে নদী পারের ঝামেলা ছিল না।

রাজধানী যাত্রাও অপেক্ষাকৃত সহজ হয়ে উঠেছিল; কিন্তু প্রমত্তা পদ্মা বলে কথা! কখন যে সে কোন্ রূপ ধারণ করে, তা আন্দাজ করা কঠিন। ঝড়-বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই। উত্তাল এ নদী কত লঞ্চ, ট্রলার, স্পিডবোট, এমনকি ফেরি পর্যন্ত হেলাফেলায় ডুবিয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। দুর্যোগের সংকেত পেলে সারা রাত অপেক্ষা করেছে সারি সারি পরিবহণ। পণ্যবাহী ট্রাকগুলোর এ ধৈর্যের পরীক্ষা তো প্রাত্যহিক অনুশীলন।

যাত্রাপথে সীমাহীন দুর্ভোগ’-শব্দবন্ধটির যথার্থতা হয়তো পদ্মা পারেই কেবল উপলব্ধি করা যায়। শীতকালে কুয়াশার আশঙ্কা যাত্রীকে তটস্থ করে রাখত। আর মাঝ নদীতে যারা ঝড়ের সাক্ষী, কেবল তারাই হয়তো মরণকে খুব কাছ থেকে দেখেছে। আর বুঝেছে জীবনকে তারা কত ভালোবাসে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শূন্য থেকেই যাত্রা শুরু করেছিলেন জাতির পিতা। বিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠন করতে একের পর এক দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মুখে পড়েন বঙ্গবন্ধু। তবু কোনো কিছুই তাকে রুখতে পারেনি। একটি শোষণমুক্ত সমাজ গঠনে তিনি ছিলেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। দেশের শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিল্প, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, যোগাযোগ অবকাঠামো অথবা বৈদেশিক নীতি-এমন বিষয় নেই যেখানে তিনি হাত দেননি, ভাবেননি।

লক্ষ্য একটাই-নিপীড়িত মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন। এ কথাও ঠিক, বঙ্গবন্ধুর দল ছাড়াও অন্যান্য রাজনৈতিক দলও দেশের জন্য কোনো না কোনো কাজ করেছেন। কিন্তু এ কথা কি সবাই মুক্তকণ্ঠে বলেন-এ মানুষটির জন্ম না হলে আমরা সে কাজটুকুও করতে পারতাম না। আমরা সেই পাকিস্তান হয়েই থাকতাম, দারিদ্র্য, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ যাদের নিত্যসঙ্গী অথবা অন্য দেশের অনুকম্পাই যাদের একমাত্র পুঁজি।

আমরা এখন আর তেমন দেশের নাগরিক নই। স্বাধীন, সার্বভৌম ও মর্যাদাপূর্ণ একটা রাষ্ট্র। তবে কেন আমরা সবাই মিলে বঙ্গবন্ধুর অবদান বা অন্তত সেই ঐতিহাসিক সত্যটুকু স্বীকার করতে এত কুণ্ঠিত? কেন আমরা স্থলসীমানা চুক্তি বা সমুদ্রজয়ের মতো অমূল্য অর্জন সগৌরবে উদযাপন করতে পারি না? কেন আমাদের মনোজগতে এত দেউলিয়াপনা? আজ সত্যিই সেসব কথা মনে পড়ছে।

দেশে আজ খাদ্যনিরাপত্তা আছে। সামাজিক নিরাপত্তা মজবুত। দেশ আজ মঙ্গামুক্ত। মাথাপিছু আয়, শ্রম-মজুরি, ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো। চাকরিজীবীর বেতনভাতাও বেড়েছে। গ্রাম থেকে শহর-পাকা রাস্তায় মোড়া। বিদ্যুৎ, প্রযুক্তি, ইন্টারনেট, কমিউনিটি ক্লিনিক, হাসপাতাল, কেব্ল টিভি, খবরের কাগজ, তথ্যকেন্দ্র-এমন সেবার পরিধি এখন প্রত্যন্ত মফস্বল পর্যন্ত বিস্তৃত। কৃষি যথেষ্ট ভালো করেছে, গার্মেন্টস্ শক্ত হয়ে উঠেছে, প্রবাসী শ্রমিক দক্ষতা প্রমাণ করেছে-বিশেষজ্ঞরা তাতে অবাকই হয়েছেন। বিশ্বকাঁপানো করোনা মোকাবিলায়ও আমরা সক্ষমতার নজির গড়েছি।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা, তবুও খাদ্য সংকটের ভয় আমাদের গ্রাস করেনি। জ্বালানি-ভোজ্যতেলের হাহাকার এখন বিশ্বব্যাপী। উন্নত থেকে গরিব দেশ-সবাই ভুগছে। শ্রীলংকা, পাকিস্তান, নেপাল, আফগানিস্তান এবং আফ্রিকার কিছু দেশ রীতিমতো দিশাহীন। কিন্তু আমরা তো এখনো নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে, আত্মশক্তিতে বলীয়ান। দক্ষ হাতে কৌশলগত ভূ-রাজনীতি মোকাবিলা করছে দেশ। অগ্রযাত্রাও থেমে থাকেনি।

পদ্মা সেতুর অন্য গল্পটা বলি। একসময় বাংলা ছিল ঐশ্বর্যের লীলাভূমি। গোটা বিশ্বের নজর ছিল বাংলায়। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রশক্তির কাছে বাঙালি কখনোই মাথা নত করেনি। পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগ আনে বিশ্বব্যাংক। মন্ত্রী-সচিবকে পর্যন্ত চকিতে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পুরোদস্তুর অনুসন্ধানে প্রমাণ মেলে অভিযোগ ভিত্তিহীন। প্রবল জাত্যাভিমান জেগে ওঠে।

নেত্রী হয়ে ওঠেন বাঙালি অস্মিতার প্রতীক। ঠিক করে ফেলেন নিজের টাকায় এ সেতু করবেন। শুধু টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া নয়, বিশ্বের যেখানেই বাঙালি আছে-সবার আবেগকে নাড়িয়ে দেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। গড়ে ওঠে বিরল আদর্শিক ঐক্য। ২০১৭ সালে কানাডার আদালত অভিযোগকে গুজব বলে প্রত্যাখ্যান করলে বাঙালি দুনিয়া সেদিন আরও একটি বিজয় উদযাপন করেছিল। তাই ২৫ জুন শুধু সেতু উদ্বোধনের দিন নয়, বাঙালির রাজনৈতিক চেতনা পুনর্নির্মাণের দিন।

সেতু শুধু আর্থিক সমৃদ্ধি বা যোগাযোগ রক্ষাকারী উপলক্ষ্য নয়, এর সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বার্তা আরও গভীর। আর ‘বাস্কেট কেইস’ নয়, সম্ভাবনার উদীয়মান বিশ্বে নিশ্চিতভাবেই এখন বাংলাদেশ একটি সম্মানজনক পরিচয়।

সক্ষমতা, সাহস ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। প্রকৃতি বা মানুষ্যসৃষ্ট যে কোনো বৈরী পরিবেশে রুখে দাঁড়ানোর সংকল্প এ জনগোষ্ঠীর শিরায় শিরায়। বাঙালির সব অহংকার আগলে রেখে এ সেতু যেন অনাগত প্রজন্মকে ন্যায়ের লড়াইয়ে চিরকাল এগিয়ে রাখে-এমন আকাঙ্ক্ষা থাকবে।

অমিত রায় চৌধুরী : সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্তি অধ্যক্ষ, বাগেরহাট

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন