জীবনটা আনন্দ-বেদনার সমাহার
jugantor
জীবনটা আনন্দ-বেদনার সমাহার

  মুঈদ রহমান  

২৬ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মহা আনন্দ ও উদ্দীপনার সঙ্গে গতকাল উদ্বোধন করা হলো ‘স্বপ্নের পদ্মা সেতু’। পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে আলোচনার মূল কারণ যতটা না অর্থনৈতিক, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক। কারণ দেশে চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে আর্থিক আকার বিবেচনায় পদ্মা সেতুর চেয়ে তিনগুণেরও বড় প্রকল্প আছে। পদ্মা সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি, আর আগামী বছর উৎপাদনে যাওয়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। তাই আর্থিক আকার বিবেচনায় নয়, বরং রাজনৈতিক বিবেচনায় পদ্মা সেতু দেশের সবচেয়ে আলোচিত প্রকল্প। প্রকল্পটি শুরু থেকেই রাজনৈতিক বৈরিতার শিকার। ২০১২ সালে এ প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংক তার প্রতিশ্রুত ১৯২ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা প্রত্যাহার করে নেয়। ২০১২ সালের ২৯ জুন চুক্তি বাতিলের কারণ হিসাবে বিশ্বব্যাংক ‘দুর্নীতির ষড়যন্ত্র’ চলছে বলে উল্লেখ করে। এর মানে হলো, দুর্নীতি হয়নি তবে হওয়ার ষড়যন্ত্র চলছিল। তাই যদি সত্যি হয়, তাহলে ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ করাটাই তো উত্তম পন্থা হতে পারত, চুক্তি বাতিলের প্রয়োজন ছিল না, যে কারণে বলা হয়ে থাকে বিশ্বব্যাংকের পুরো ভূমিকাটাই ছিল রাজনীতি-উদ্দিষ্ট। চুক্তি বাতিলের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো দল বা ব্যক্তিকে দায়ী করা হয়েছে। আমিও একমত, কিন্তু বিশ্বব্যাংককে নিষ্পাপ শিশু ভাবার কারণ নেই। ১৯৪৪ সালের জুলাইয়ে বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল একটি স্লোগানকে সামনে রেখে-বিশ্বকে দারিদ্র্যমুক্ত করা। কিন্তু শুরু থেকে আজ পর্যন্ত তারা পশ্চিমাদের স্বার্থের বাইরে কোনো কাজ করেনি। সুতরাং আমাদের মনে রাখতে হবে, আংশিক দায় কারও ওপর চাপিয়ে আমরা যেন মহাশত্রুকে বন্ধু মনে না করি। এর বাইরে বলতে হবে, পদ্মা সেতুর মতো এত বড় প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে সম্পন্ন করার কাজটি আমাদের মতো দুর্বল অর্থনীতির দেশে এক অনন্য নজির। সব দিক বিবেচনায় বর্তমান সরকার পদ্মা সেতু নির্মাণের কৃতিত্বের অধিকারী-এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে বিশ্বব্যাংককেও ধন্যবাদ জানানো প্রয়োজন। কেননা তারা আমাদের সঙ্গে বৈরী আচরণ না করলে আমরা আমাদের সক্ষমতার প্রমাণ দিতে পারতাম না।

এ মুহূর্তে পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় আনন্দের পাশাপাশি দেশের বন্যা পরিস্থিতি অনেকখানি বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শত বছর ধরে পৃথিবীর মানুষ প্রকৃতির ওপর অবিচার করে চলেছে; তার স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করেছে; প্রকৃতির প্রতি বৈরী আচরণ করা হয়েছে। এর ফল হিসাবে প্রকৃতি প্রতিশোধ নিতে সক্রিয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে, তা বিগত ১২২ বছরের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। আসামের ভাটিতে বাংলাদেশের অবস্থান। স্বাভাবিকভাবেই পানি গড়িয়ে ভাটিতে আসবে। আর বাংলাদেশের উজানের অঞ্চল হলো সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলা। তাই বন্যার প্রকোপে এ দুটি জেলার জীবনযাত্রা সম্পূর্ণরূপে বিপর্যস্ত। এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়ে গেছে। যুগান্তর বলছে, টানা ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত অধিকাংশ ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাটে এখনো পানি। গত মঙ্গলবার বৃষ্টি কম হওয়ায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে পানি প্রবাহের গতি ধীর হওয়ায় মানুষের জীবনের দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত হচ্ছে। বন্যাকবলিত প্রত্যন্ত এলাকায় ত্রাণসামগ্রী না পৌঁছানোয় গরিব ও অসহায় মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। তারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন, কষ্টে কাটছে দিন। যে কয়টি আশ্রয়কেন্দ্র আছে, তাতেও ত্রাণের পরিমাণ অপ্রতুল। তাই বানভাসিরা অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। ত্রাণের জন্য হাহাকারসহ দেখা দিয়েছে মানবিক বিপর্যয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রোগবালাই। যে কোনো বন্যার সঙ্গে রোগবালাইয়ের একটা প্রত্যক্ষ সম্পর্ক থাকে। সিলেটের ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। কিন্তু চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায়ও রয়েছে উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা।

বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই সিলেট অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে দেশের অন্য অঞ্চলগুলোয় প্লাবনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কারণ, এখনো প্রধান প্রধান নদনদীর পানি বাড়ছে। এ কারণে কিশোরঞ্জ, রংপুর, নীলফামারী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। তাছাড়া নতুন করে প্লাবিত হতে পারে ফরিদপুর, শরীয়তপুর ও রাজবাড়ী জেলার নিম্নাঞ্চলগুলো। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে নতুন নতুন এলাকা বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি উপজেলার ২৩টি গ্রাম বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এখনো দেশের ৮টি নদীর ১৮ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সিলেট পরিস্থিতির বিবরণটি হলো, ১৩টি উপজেলা ও ৫টি পৌরসভার পুরো এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। সিটি করপোরেশন এলাকা প্লাবিত হয়েছে ৮০ শতাংশ। পানিবন্দি অবস্থায় দিন যাপন করছে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ। পাঁচ শতাধিক আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বন্যার্তদের জন্য ৬১২ মেট্রিক টন চাল, ৭ হাজার ৯০০ প্যাকেট শুকনো খাবার ও ৩৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা একেবারেই অপ্রতুল। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের জেলা পর্যায়ের কর্মসূচি সিলেট ও সুনামগঞ্জে বাতিল করা হয়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ নতুন কোনো বিষয় নয়। মানুষের সঙ্গে অন্যান্য প্রাণীর পার্থক্য হলো, মানুষ প্রকৃতিকে জয় করতে পারে; প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলা করতে সক্ষম। মানুষের উদ্ভাবনী শক্তিই এই সক্ষমতার উৎস। তাই প্রশ্ন এসেছে, সরকার এই বিপর্যয় মোকাবিলায় কতটা সক্ষমতা দেখাতে পেরেছে? জবাবে বলতে হয়, আশানুরূপ নয়। এতদিন ধরে শুনে এসেছি যে, বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতায় অনেক দূর এগিয়েছে। সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেই সক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়নি। একথা সত্য যে, প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলেকয়ে আসে না। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দিতে পারে। সে পূর্বাভাস হয়তো ১০০ শতাংশ নির্ভুল হয় না, তবে অনুমান করা যায়। সিলেট অঞ্চলে যে বন্যার প্রাদুর্ভাব দেখা দেবে, এর পূর্বাভাস ছিল। এই পূর্বাভাসের ও সতর্কীকরণের কথা সরকারকে আগেই জানানো হয়েছিল। নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া গত ১৯ জুন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘একটা বন্যা যে হবে, সেটা অবশ্যই আমরা আগে থেকে আঁচ করতে পেরেছিলাম। তবে বৃষ্টির পরিমাণ যে এত বেশি হবে, সেটা আমাদের আইডিয়া ছিল না। ভারি বৃষ্টি যে হবে, সে ইঙ্গিত পেয়েছিলাম।’ আগেই বলেছি, ভয়াবহতার শতভাগ মাত্রা পূর্বাভাসে থাকে না। কিন্তু যতটুকু আভাস পাওয়া গিয়েছিল, তার প্রস্তুতিও তো সরকারি কর্মকাণ্ডে প্রকাশ পায়নি।

সরকারের দায়ের মধ্যে আরেকটি হলো, অবকাঠামো নির্মাণে প্রাকৃতিক অবস্থাকে আমলে না নেওয়া। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের ভাষ্য, ‘সিলেট বিভাগে বন্যা এতটা তীব্রতা পাওয়ার কারণ পানি নামতে বাধা পাওয়া। হাওড়ে নানা অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এটা পানিপ্রবাহে বাধার সৃষ্টি করছে। কারণ, এ অঞ্চলের পানি হাওড় হয়ে নদীতে নেমে যায়। শুধু এ অবকাঠামো নয়, পাশাপাশি নদী নাব্য হারিয়েছে। এতে পানি দ্রুত সরতে পারছে না।’ অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ ও নদীর নাব্য স্বাভাবিক মাত্রায় না রাখার দায় তো সরকারের কাঁধেই চাপবে। সুতরাং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক ও পরিবেশের ভারসাম্যের কথা উন্নয়ন দর্শনে থাকতে হবে। অর্থ বরাদ্দের দিকটিও চিন্তার বিষয়। সিলেট অঞ্চলে পানিবন্দি হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ। ত্রাণমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দের। অথচ দেশে এমন ব্যক্তিও আছেন, যিনি এককভাবেই এর চেয়ে বেশি অনুদান দিতে পারে। তাহলে আমাদের সরকারের সক্ষমতা কি ব্যক্তির চেয়েও কম? বিপর্যয়কে ঘিরে এ ধরনের প্রশ্নের অবতারণা হতেই পারে।

সর্বশেষ যে প্রশ্নটি আসে তা হলো, এত দুর্বলতার পরও বন্যার্তদের জন্য আমাদের বা সরকারের করণীয় কী? বিশেষজ্ঞদের মতামতের একটা সংক্ষিপ্তসার তুলে ধরা যেতে পারে। প্রথমেই বলে রাখা ভালো, আমাদের দেশের সরকারগুলোর কপাল ভালো। তাদের বিভাজিত রাজনৈতিক দর্শন চর্চার পরও আমাদের সমাজে এখনো সমাজবদ্ধতার উপস্থিতি আছে। যে কোনো দুর্যোগ বা বিপদ মোকাবিলায় একদল মানুষ আরেক দলের সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা পেশার মানুষ ত্রাণসহায়তায় এগিয়ে আসবে। এখানে একটা সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দেবে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি এই সমন্বয়ের দায়িত্বের কাজটি করতে পারে। একটি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থাপনা না হলে ত্রাণের অসম বিতরণ হতে পারে। প্রকৃত ত্রাণের দাবিদার তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হতে পারে। দ্বিতীয় বিবেচনার বিষয়টি হলো-ত্রাণ পরিবহণ। সিলেট অঞ্চলের বেলায় এ সময়ে নৌকার ব্যবহার বেশি প্রয়োজন হবে। সেক্ষেত্রে প্রশাসন রিকুইজিশনের ব্যবস্থা করবে। কিন্তু প্রশাসনের কাছ থেকে ন্যায্য ভাড়া না পাওয়া গেলে নৌকার মালিক ভাড়া দিতে আগ্রহী হবে না। তাই রিকুইজিশনের একটি স্বচ্ছ নীতি প্রণয়ন করা জরুরি। তৃতীয় বিবেচনার বিষয় হলো, ত্রাণ বিতরণ করার সময় শিশু, কিশোর, নারী, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের চাহিদা উপযোগী খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী বিতরণ করতে হবে। আমরা সেদিকে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

জীবনটা আনন্দ-বেদনার সমাহার

 মুঈদ রহমান 
২৬ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মহা আনন্দ ও উদ্দীপনার সঙ্গে গতকাল উদ্বোধন করা হলো ‘স্বপ্নের পদ্মা সেতু’। পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে আলোচনার মূল কারণ যতটা না অর্থনৈতিক, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক। কারণ দেশে চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে আর্থিক আকার বিবেচনায় পদ্মা সেতুর চেয়ে তিনগুণেরও বড় প্রকল্প আছে। পদ্মা সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি, আর আগামী বছর উৎপাদনে যাওয়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। তাই আর্থিক আকার বিবেচনায় নয়, বরং রাজনৈতিক বিবেচনায় পদ্মা সেতু দেশের সবচেয়ে আলোচিত প্রকল্প। প্রকল্পটি শুরু থেকেই রাজনৈতিক বৈরিতার শিকার। ২০১২ সালে এ প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংক তার প্রতিশ্রুত ১৯২ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা প্রত্যাহার করে নেয়। ২০১২ সালের ২৯ জুন চুক্তি বাতিলের কারণ হিসাবে বিশ্বব্যাংক ‘দুর্নীতির ষড়যন্ত্র’ চলছে বলে উল্লেখ করে। এর মানে হলো, দুর্নীতি হয়নি তবে হওয়ার ষড়যন্ত্র চলছিল। তাই যদি সত্যি হয়, তাহলে ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ করাটাই তো উত্তম পন্থা হতে পারত, চুক্তি বাতিলের প্রয়োজন ছিল না, যে কারণে বলা হয়ে থাকে বিশ্বব্যাংকের পুরো ভূমিকাটাই ছিল রাজনীতি-উদ্দিষ্ট। চুক্তি বাতিলের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো দল বা ব্যক্তিকে দায়ী করা হয়েছে। আমিও একমত, কিন্তু বিশ্বব্যাংককে নিষ্পাপ শিশু ভাবার কারণ নেই। ১৯৪৪ সালের জুলাইয়ে বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল একটি স্লোগানকে সামনে রেখে-বিশ্বকে দারিদ্র্যমুক্ত করা। কিন্তু শুরু থেকে আজ পর্যন্ত তারা পশ্চিমাদের স্বার্থের বাইরে কোনো কাজ করেনি। সুতরাং আমাদের মনে রাখতে হবে, আংশিক দায় কারও ওপর চাপিয়ে আমরা যেন মহাশত্রুকে বন্ধু মনে না করি। এর বাইরে বলতে হবে, পদ্মা সেতুর মতো এত বড় প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে সম্পন্ন করার কাজটি আমাদের মতো দুর্বল অর্থনীতির দেশে এক অনন্য নজির। সব দিক বিবেচনায় বর্তমান সরকার পদ্মা সেতু নির্মাণের কৃতিত্বের অধিকারী-এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে বিশ্বব্যাংককেও ধন্যবাদ জানানো প্রয়োজন। কেননা তারা আমাদের সঙ্গে বৈরী আচরণ না করলে আমরা আমাদের সক্ষমতার প্রমাণ দিতে পারতাম না।

এ মুহূর্তে পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় আনন্দের পাশাপাশি দেশের বন্যা পরিস্থিতি অনেকখানি বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শত বছর ধরে পৃথিবীর মানুষ প্রকৃতির ওপর অবিচার করে চলেছে; তার স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করেছে; প্রকৃতির প্রতি বৈরী আচরণ করা হয়েছে। এর ফল হিসাবে প্রকৃতি প্রতিশোধ নিতে সক্রিয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে, তা বিগত ১২২ বছরের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। আসামের ভাটিতে বাংলাদেশের অবস্থান। স্বাভাবিকভাবেই পানি গড়িয়ে ভাটিতে আসবে। আর বাংলাদেশের উজানের অঞ্চল হলো সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলা। তাই বন্যার প্রকোপে এ দুটি জেলার জীবনযাত্রা সম্পূর্ণরূপে বিপর্যস্ত। এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়ে গেছে। যুগান্তর বলছে, টানা ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত অধিকাংশ ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাটে এখনো পানি। গত মঙ্গলবার বৃষ্টি কম হওয়ায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে পানি প্রবাহের গতি ধীর হওয়ায় মানুষের জীবনের দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত হচ্ছে। বন্যাকবলিত প্রত্যন্ত এলাকায় ত্রাণসামগ্রী না পৌঁছানোয় গরিব ও অসহায় মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। তারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন, কষ্টে কাটছে দিন। যে কয়টি আশ্রয়কেন্দ্র আছে, তাতেও ত্রাণের পরিমাণ অপ্রতুল। তাই বানভাসিরা অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। ত্রাণের জন্য হাহাকারসহ দেখা দিয়েছে মানবিক বিপর্যয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রোগবালাই। যে কোনো বন্যার সঙ্গে রোগবালাইয়ের একটা প্রত্যক্ষ সম্পর্ক থাকে। সিলেটের ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। কিন্তু চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায়ও রয়েছে উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা।

বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই সিলেট অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে দেশের অন্য অঞ্চলগুলোয় প্লাবনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কারণ, এখনো প্রধান প্রধান নদনদীর পানি বাড়ছে। এ কারণে কিশোরঞ্জ, রংপুর, নীলফামারী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। তাছাড়া নতুন করে প্লাবিত হতে পারে ফরিদপুর, শরীয়তপুর ও রাজবাড়ী জেলার নিম্নাঞ্চলগুলো। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে নতুন নতুন এলাকা বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি উপজেলার ২৩টি গ্রাম বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এখনো দেশের ৮টি নদীর ১৮ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সিলেট পরিস্থিতির বিবরণটি হলো, ১৩টি উপজেলা ও ৫টি পৌরসভার পুরো এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। সিটি করপোরেশন এলাকা প্লাবিত হয়েছে ৮০ শতাংশ। পানিবন্দি অবস্থায় দিন যাপন করছে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ। পাঁচ শতাধিক আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বন্যার্তদের জন্য ৬১২ মেট্রিক টন চাল, ৭ হাজার ৯০০ প্যাকেট শুকনো খাবার ও ৩৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা একেবারেই অপ্রতুল। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের জেলা পর্যায়ের কর্মসূচি সিলেট ও সুনামগঞ্জে বাতিল করা হয়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ নতুন কোনো বিষয় নয়। মানুষের সঙ্গে অন্যান্য প্রাণীর পার্থক্য হলো, মানুষ প্রকৃতিকে জয় করতে পারে; প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলা করতে সক্ষম। মানুষের উদ্ভাবনী শক্তিই এই সক্ষমতার উৎস। তাই প্রশ্ন এসেছে, সরকার এই বিপর্যয় মোকাবিলায় কতটা সক্ষমতা দেখাতে পেরেছে? জবাবে বলতে হয়, আশানুরূপ নয়। এতদিন ধরে শুনে এসেছি যে, বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতায় অনেক দূর এগিয়েছে। সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেই সক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়নি। একথা সত্য যে, প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলেকয়ে আসে না। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দিতে পারে। সে পূর্বাভাস হয়তো ১০০ শতাংশ নির্ভুল হয় না, তবে অনুমান করা যায়। সিলেট অঞ্চলে যে বন্যার প্রাদুর্ভাব দেখা দেবে, এর পূর্বাভাস ছিল। এই পূর্বাভাসের ও সতর্কীকরণের কথা সরকারকে আগেই জানানো হয়েছিল। নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া গত ১৯ জুন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘একটা বন্যা যে হবে, সেটা অবশ্যই আমরা আগে থেকে আঁচ করতে পেরেছিলাম। তবে বৃষ্টির পরিমাণ যে এত বেশি হবে, সেটা আমাদের আইডিয়া ছিল না। ভারি বৃষ্টি যে হবে, সে ইঙ্গিত পেয়েছিলাম।’ আগেই বলেছি, ভয়াবহতার শতভাগ মাত্রা পূর্বাভাসে থাকে না। কিন্তু যতটুকু আভাস পাওয়া গিয়েছিল, তার প্রস্তুতিও তো সরকারি কর্মকাণ্ডে প্রকাশ পায়নি।

সরকারের দায়ের মধ্যে আরেকটি হলো, অবকাঠামো নির্মাণে প্রাকৃতিক অবস্থাকে আমলে না নেওয়া। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের ভাষ্য, ‘সিলেট বিভাগে বন্যা এতটা তীব্রতা পাওয়ার কারণ পানি নামতে বাধা পাওয়া। হাওড়ে নানা অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এটা পানিপ্রবাহে বাধার সৃষ্টি করছে। কারণ, এ অঞ্চলের পানি হাওড় হয়ে নদীতে নেমে যায়। শুধু এ অবকাঠামো নয়, পাশাপাশি নদী নাব্য হারিয়েছে। এতে পানি দ্রুত সরতে পারছে না।’ অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ ও নদীর নাব্য স্বাভাবিক মাত্রায় না রাখার দায় তো সরকারের কাঁধেই চাপবে। সুতরাং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক ও পরিবেশের ভারসাম্যের কথা উন্নয়ন দর্শনে থাকতে হবে। অর্থ বরাদ্দের দিকটিও চিন্তার বিষয়। সিলেট অঞ্চলে পানিবন্দি হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ। ত্রাণমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দের। অথচ দেশে এমন ব্যক্তিও আছেন, যিনি এককভাবেই এর চেয়ে বেশি অনুদান দিতে পারে। তাহলে আমাদের সরকারের সক্ষমতা কি ব্যক্তির চেয়েও কম? বিপর্যয়কে ঘিরে এ ধরনের প্রশ্নের অবতারণা হতেই পারে।

সর্বশেষ যে প্রশ্নটি আসে তা হলো, এত দুর্বলতার পরও বন্যার্তদের জন্য আমাদের বা সরকারের করণীয় কী? বিশেষজ্ঞদের মতামতের একটা সংক্ষিপ্তসার তুলে ধরা যেতে পারে। প্রথমেই বলে রাখা ভালো, আমাদের দেশের সরকারগুলোর কপাল ভালো। তাদের বিভাজিত রাজনৈতিক দর্শন চর্চার পরও আমাদের সমাজে এখনো সমাজবদ্ধতার উপস্থিতি আছে। যে কোনো দুর্যোগ বা বিপদ মোকাবিলায় একদল মানুষ আরেক দলের সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা পেশার মানুষ ত্রাণসহায়তায় এগিয়ে আসবে। এখানে একটা সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দেবে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি এই সমন্বয়ের দায়িত্বের কাজটি করতে পারে। একটি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থাপনা না হলে ত্রাণের অসম বিতরণ হতে পারে। প্রকৃত ত্রাণের দাবিদার তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হতে পারে। দ্বিতীয় বিবেচনার বিষয়টি হলো-ত্রাণ পরিবহণ। সিলেট অঞ্চলের বেলায় এ সময়ে নৌকার ব্যবহার বেশি প্রয়োজন হবে। সেক্ষেত্রে প্রশাসন রিকুইজিশনের ব্যবস্থা করবে। কিন্তু প্রশাসনের কাছ থেকে ন্যায্য ভাড়া না পাওয়া গেলে নৌকার মালিক ভাড়া দিতে আগ্রহী হবে না। তাই রিকুইজিশনের একটি স্বচ্ছ নীতি প্রণয়ন করা জরুরি। তৃতীয় বিবেচনার বিষয় হলো, ত্রাণ বিতরণ করার সময় শিশু, কিশোর, নারী, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের চাহিদা উপযোগী খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী বিতরণ করতে হবে। আমরা সেদিকে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন