মাদকাসক্তি রোধে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পরিবারের সচেতনতা
jugantor
মাদকাসক্তি রোধে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পরিবারের সচেতনতা

  ডা. সামিনা আরিফ  

২৬ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নেশা নয়, স্বাস্থ্যই হোক জীবনের নতুন প্রত্যাশা-এ প্রত্যয় নিয়ে আজ বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস। যেসব প্রাকৃতিক বা রাসায়নিক দ্রব্য গ্রহণ করলে একজন মানুষের মনের অনুভূতি ও চিন্তাচেতনা স্বাভাবিক অবস্থা থেকে অস্বাভাবিক অবস্থায় চলে যায়; অর্থাৎ শারীরিক ও মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে, তাকেই মাদক বলে। উৎসভেদে মাদক অনেক ধরনের হয়ে থাকে-১. অপিওইডস : হেরোইন, মরফিন, কোডেইন; ২. মেথামফেটামিন : এটি মূলত ইয়াবার মূল উপাদান, মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইন মিশ্রিত করে ইয়াবা তৈরি করা হয়; ৩. ক্যানাবিওনিডস : এ ধরনের মাদকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে গাঁজা বা মারিজুয়ানা, ক্যান্নাবিস, হাশিস; ৪. বেনজোডায়াজেপাইনস : এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাদক হচ্ছে ডায়াজেপাম, ক্লোনাজেপাম, মিডাজোলাম; ৫. অ্যালকোহল : ডোপ টেস্টে ইথাইল অ্যালকোহল পরীক্ষার মাধ্যমে এ ধরনের পদার্থ শনাক্ত করা হয়।

এছাড়াও চলতি বছরে নতুন দুই ধরনের মাদকের সন্ধান পেয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। একটি হলো ডিলাইসার্জিক অ্যাসিড ডায়েথিলামাইড বা এলএসডি, যা রাসায়নিক সংশ্লেষণের মাধ্যমে তৈরি একটি পদার্থ এবং এটি বিভিন্ন ধরনের শরষের গায়ে জন্মানো এক বিশেষ ধরনের ছত্রাকের শরীরের লাইসার্জিক অ্যাসিড থেকে তৈরি করা হয়। এটি স্বচ্ছ, গন্ধহীন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের মতে, এটি পাউডার, তরল, ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলের আকারে পাওয়া যায়। সংস্থাটির মতে, এটি মানুষের মস্তিষ্কের সেরোটোনিন নামক রাসায়নিকের কার্যক্রম প্রভাবিত করায় ব্যবহার, অনুভূতি এবং পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে ধারণা পরিবর্তন হয়। এলসিডি নেওয়ার পর সাধারণত মানুষ হ্যালুসিনেট করে বা এমন দৃশ্য দেখে, যা বাস্তবে নেই। অনেক সময় অলীক দৃশ্য দেখার কারণে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে থাকে মানুষ। আরেকটি হলো ব্রাউনি, যা মাখন আর সেদ্ধ গাঁজার নির্যাস দিয়ে তৈরি; যা দেখতে একেবারে কেকের মতো এবং এটি শিশু-কিশোরদের কাছে খুবই আর্কষণীয়। এই মাদকটি ব্যয়বহুল হওয়ায় মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা এর মূল ভোক্তা।

মাদকাসক্তি প্রতিরোধে পরিবারের অগ্রণী ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। এ কারণে পরিবারের কিছু বিষয়ের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা জরুরি; যেমন-১. পারিবারিক জীবনে নৈতিকতার চর্চা করাতে হবে; ২. অভিভাবকদের যে কোনো ধরনের মাদক গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে; ৩. হাত খরচ হিসাবে অতিরিক্ত টাকা সন্তানকে না দেওয়া ভালো; ৪. সন্তানকে রাত জাগা বা একা থাকা থেকে নিরুৎসাহিত করতে হবে; ৫. সন্তানের যে কোনো ধরনের সমস্যা বা ভুল যেন অভিভাবকদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারে, এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে; ৬. সন্তানকে খেলাধুলা, ছবি আঁকা, বাগান করা, বই পড়া এবং সাংস্কৃতিকমনা করে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার জন্য উপদেশ দিতে হবে; ৭. আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, যাতে একটি সুন্দর পরিবেশে আপনার সন্তান বড় হতে পারে। ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করতে হবে; ৮. প্রতিটি স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি ও অফিসে মাদকসেবন থেকে বিরত থাকার জন্য বিভিন্ন রকম সাংকেতিক চিহ্ন, ব্যানার, সেমিনারের মাধ্যমে সচেতনার উদ্যোগ থাকা প্রয়োজন; ৯. স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পাঠাগার, সরকারি ও বেসরকারি অফিস, আদালত, বিমান বন্দর ইত্যাদিতে অতিসত্বর ডোপ টেস্ট চালু করা প্রয়োজন; ১০. পরিবারের কেউ মাদকাসক্ত হলে আত্মীয়স্বজন বা লোকলজ্জার ভয় না করে যত দ্রুত সম্ভব রিহ্যাব সেন্টারে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে লজ্জা বা ভয় পেয়ে আড়ালে রাখার চেয়ে উপযুক্ত চিকিৎসা করালে আপনার পরিবারের আপনজন খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবেন।

মাদকাসক্তি মূলত একটি রোগ বা ব্যাধি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাদকাসক্তিকে বলা হয়, ক্রনিক রিলাক্সিং ব্রেইন ডিজিজ বা বারবার হতে পারে এমন স্নায়ুবিক রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একজন ব্যক্তিকে মাদকাসক্ত হিসাবে চিহ্নিত করার জন্য কিছু শর্ত আছে-প্রথমত, যে কোনো উপায়েই হোক, নেশাজাতীয় দ্রব্য সংগ্রহ করতে হবে, যেটিকে ইংরেজিতে craving বলে। দ্বিতীয়ত, নেশাকারী নেশাজাতীয় বস্তু গ্রহণের মাত্রা ক্রমেই বাড়িয়ে দিতে বাধ্য হয়, যেটিকে টলারেন্স বলা হয়ে থাকে। তৃতীয়ত, নেশাজাতীয় বস্তুর প্রতি দৈহিক ও মানসিক নির্ভরতা গড়ে ওঠে। তখন ওই নেশাজাতীয় বস্তুটি গ্রহণ না করতে পারলে তার দৈহিক ও মানসিক অবস্থার ভারসাম্য নষ্ট হয়।

শিশু-কিশোরদের আবেগ অনিয়ন্ত্রিত এবং এ বয়সটিতে বন্ধুদের প্রভাব অনেক বেশি থাকে। অনেকে নিছক কৌতূহল এবং নতুন অভিজ্ঞতা লাভের জন্য নেশা করে। অনেকের ক্ষেত্রে সামাজিক বা ব্যক্তিগত কোনো হতাশা থেকে শুরু হয়। মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত হয়েও অনেকে মাদকে ঝুঁকে পড়ে। দেশে নানা জাতীয় মাদকের সহজলভ্যতাও মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ। এছাড়া মাদকাসক্ত হওয়ার পেছনে পারিবারিক অনেক কারণ আমরা উপেক্ষা করতে পারি না। যেমন, পারিবারিক কলহ দিনের পর দিন চলতে থাকলে; মা-বাবা কিংবা ভাই-বোনদের মধ্যে কেউ মাদকাসক্ত হলে; মা-বাবার কলহ দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে ইত্যাদি।

মাদক গ্রহণের ফলে প্রথমত স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বদলে যায়। এতে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে জীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলে। মাদক গ্রহণের ফলে ঘুমের প্যাটার্ন বদলে যায়, খাওয়ার রুচি কমে যায়। এ কারণে দিনদিন ওজন কমে যেতে থাকে। মেজাজ খুব উগ্র হয়। পরিবারের সদস্যদের প্রতি মায়া-মমতা বা শ্রদ্ধা থাকে না। মাদক গ্রহণের ফলে মস্তিষ্ক ও ফুসফুসের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। শ্বাসকষ্ট হতে পারে। মাদক নেওয়ার কারণে ফুসফুসে পানি জমে যায়। নিয়মিত ইয়াবা সেবনে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, নিদ্রাহীনতা, খিঁচুনি, মস্তিষ্ক বিকৃতি, রক্তচাপ বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন, হার্ট অ্যাটাক, ঘুমের ব্যাঘাত, অস্বস্তিকর মানসিক অবস্থা, কিডনি বিকল, চিরস্থায়ী যৌন অক্ষমতা, ফুসফুসে প্রদাহসহ ফুসফুসের টিউমার ও ক্যানসার হতে পারে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, একটি পরিবার, একটি জীবন ও সমাজ মূহূর্তে ক্ষতিগ্রস্ত বা শেষ হয়ে যেতে পারে মাদকের বিষাক্ত ছোবলে। তাই দেরি না করে দ্রুত স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিকভাবে মাদকাসক্তির বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ডোপ টেস্ট চালু করা উচিত। কারণ, শাস্তির প্রদানের চেয়ে প্রতিকার ব্যবস্থা গড়ে তোলাই উত্তম। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, যখন কেউ বিপথে যায়, তখন পরিবার থেকে তাকে উপেক্ষা বা অসহযোগিতা না করে বরং সহযোগিতা করে রেজিস্ট্রার্ড চিকিৎসক বা মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রের শরণাপন্ন হতে হবে। এর পাশাপাশি তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে কাউন্সেলিং এবং ভালোবাসার কোনো বিকল্প নেই। পরিবারকে দিতে হবে সেবা, চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, পুষ্টিকর খাদ্য এবং অপরিসীম ভালোবাসা। এভাবেই তাকে মাদকাসক্তির কালো থাবা থেকে বাস্তব জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে।

ডা. সামিনা আরিফ : সহযোগী অধ্যাপক, উপাধ্যক্ষ, ফেডারেল হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

saminaarif741@gmail.com

মাদকাসক্তি রোধে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পরিবারের সচেতনতা

 ডা. সামিনা আরিফ 
২৬ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নেশা নয়, স্বাস্থ্যই হোক জীবনের নতুন প্রত্যাশা-এ প্রত্যয় নিয়ে আজ বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস। যেসব প্রাকৃতিক বা রাসায়নিক দ্রব্য গ্রহণ করলে একজন মানুষের মনের অনুভূতি ও চিন্তাচেতনা স্বাভাবিক অবস্থা থেকে অস্বাভাবিক অবস্থায় চলে যায়; অর্থাৎ শারীরিক ও মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে, তাকেই মাদক বলে। উৎসভেদে মাদক অনেক ধরনের হয়ে থাকে-১. অপিওইডস : হেরোইন, মরফিন, কোডেইন; ২. মেথামফেটামিন : এটি মূলত ইয়াবার মূল উপাদান, মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইন মিশ্রিত করে ইয়াবা তৈরি করা হয়; ৩. ক্যানাবিওনিডস : এ ধরনের মাদকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে গাঁজা বা মারিজুয়ানা, ক্যান্নাবিস, হাশিস; ৪. বেনজোডায়াজেপাইনস : এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাদক হচ্ছে ডায়াজেপাম, ক্লোনাজেপাম, মিডাজোলাম; ৫. অ্যালকোহল : ডোপ টেস্টে ইথাইল অ্যালকোহল পরীক্ষার মাধ্যমে এ ধরনের পদার্থ শনাক্ত করা হয়।

এছাড়াও চলতি বছরে নতুন দুই ধরনের মাদকের সন্ধান পেয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। একটি হলো ডিলাইসার্জিক অ্যাসিড ডায়েথিলামাইড বা এলএসডি, যা রাসায়নিক সংশ্লেষণের মাধ্যমে তৈরি একটি পদার্থ এবং এটি বিভিন্ন ধরনের শরষের গায়ে জন্মানো এক বিশেষ ধরনের ছত্রাকের শরীরের লাইসার্জিক অ্যাসিড থেকে তৈরি করা হয়। এটি স্বচ্ছ, গন্ধহীন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের মতে, এটি পাউডার, তরল, ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলের আকারে পাওয়া যায়। সংস্থাটির মতে, এটি মানুষের মস্তিষ্কের সেরোটোনিন নামক রাসায়নিকের কার্যক্রম প্রভাবিত করায় ব্যবহার, অনুভূতি এবং পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে ধারণা পরিবর্তন হয়। এলসিডি নেওয়ার পর সাধারণত মানুষ হ্যালুসিনেট করে বা এমন দৃশ্য দেখে, যা বাস্তবে নেই। অনেক সময় অলীক দৃশ্য দেখার কারণে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে থাকে মানুষ। আরেকটি হলো ব্রাউনি, যা মাখন আর সেদ্ধ গাঁজার নির্যাস দিয়ে তৈরি; যা দেখতে একেবারে কেকের মতো এবং এটি শিশু-কিশোরদের কাছে খুবই আর্কষণীয়। এই মাদকটি ব্যয়বহুল হওয়ায় মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা এর মূল ভোক্তা।

মাদকাসক্তি প্রতিরোধে পরিবারের অগ্রণী ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। এ কারণে পরিবারের কিছু বিষয়ের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা জরুরি; যেমন-১. পারিবারিক জীবনে নৈতিকতার চর্চা করাতে হবে; ২. অভিভাবকদের যে কোনো ধরনের মাদক গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে; ৩. হাত খরচ হিসাবে অতিরিক্ত টাকা সন্তানকে না দেওয়া ভালো; ৪. সন্তানকে রাত জাগা বা একা থাকা থেকে নিরুৎসাহিত করতে হবে; ৫. সন্তানের যে কোনো ধরনের সমস্যা বা ভুল যেন অভিভাবকদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারে, এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে; ৬. সন্তানকে খেলাধুলা, ছবি আঁকা, বাগান করা, বই পড়া এবং সাংস্কৃতিকমনা করে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার জন্য উপদেশ দিতে হবে; ৭. আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, যাতে একটি সুন্দর পরিবেশে আপনার সন্তান বড় হতে পারে। ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করতে হবে; ৮. প্রতিটি স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি ও অফিসে মাদকসেবন থেকে বিরত থাকার জন্য বিভিন্ন রকম সাংকেতিক চিহ্ন, ব্যানার, সেমিনারের মাধ্যমে সচেতনার উদ্যোগ থাকা প্রয়োজন; ৯. স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পাঠাগার, সরকারি ও বেসরকারি অফিস, আদালত, বিমান বন্দর ইত্যাদিতে অতিসত্বর ডোপ টেস্ট চালু করা প্রয়োজন; ১০. পরিবারের কেউ মাদকাসক্ত হলে আত্মীয়স্বজন বা লোকলজ্জার ভয় না করে যত দ্রুত সম্ভব রিহ্যাব সেন্টারে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে লজ্জা বা ভয় পেয়ে আড়ালে রাখার চেয়ে উপযুক্ত চিকিৎসা করালে আপনার পরিবারের আপনজন খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবেন।

মাদকাসক্তি মূলত একটি রোগ বা ব্যাধি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাদকাসক্তিকে বলা হয়, ক্রনিক রিলাক্সিং ব্রেইন ডিজিজ বা বারবার হতে পারে এমন স্নায়ুবিক রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একজন ব্যক্তিকে মাদকাসক্ত হিসাবে চিহ্নিত করার জন্য কিছু শর্ত আছে-প্রথমত, যে কোনো উপায়েই হোক, নেশাজাতীয় দ্রব্য সংগ্রহ করতে হবে, যেটিকে ইংরেজিতে craving বলে। দ্বিতীয়ত, নেশাকারী নেশাজাতীয় বস্তু গ্রহণের মাত্রা ক্রমেই বাড়িয়ে দিতে বাধ্য হয়, যেটিকে টলারেন্স বলা হয়ে থাকে। তৃতীয়ত, নেশাজাতীয় বস্তুর প্রতি দৈহিক ও মানসিক নির্ভরতা গড়ে ওঠে। তখন ওই নেশাজাতীয় বস্তুটি গ্রহণ না করতে পারলে তার দৈহিক ও মানসিক অবস্থার ভারসাম্য নষ্ট হয়।

শিশু-কিশোরদের আবেগ অনিয়ন্ত্রিত এবং এ বয়সটিতে বন্ধুদের প্রভাব অনেক বেশি থাকে। অনেকে নিছক কৌতূহল এবং নতুন অভিজ্ঞতা লাভের জন্য নেশা করে। অনেকের ক্ষেত্রে সামাজিক বা ব্যক্তিগত কোনো হতাশা থেকে শুরু হয়। মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত হয়েও অনেকে মাদকে ঝুঁকে পড়ে। দেশে নানা জাতীয় মাদকের সহজলভ্যতাও মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ। এছাড়া মাদকাসক্ত হওয়ার পেছনে পারিবারিক অনেক কারণ আমরা উপেক্ষা করতে পারি না। যেমন, পারিবারিক কলহ দিনের পর দিন চলতে থাকলে; মা-বাবা কিংবা ভাই-বোনদের মধ্যে কেউ মাদকাসক্ত হলে; মা-বাবার কলহ দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে ইত্যাদি।

মাদক গ্রহণের ফলে প্রথমত স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বদলে যায়। এতে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে জীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলে। মাদক গ্রহণের ফলে ঘুমের প্যাটার্ন বদলে যায়, খাওয়ার রুচি কমে যায়। এ কারণে দিনদিন ওজন কমে যেতে থাকে। মেজাজ খুব উগ্র হয়। পরিবারের সদস্যদের প্রতি মায়া-মমতা বা শ্রদ্ধা থাকে না। মাদক গ্রহণের ফলে মস্তিষ্ক ও ফুসফুসের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। শ্বাসকষ্ট হতে পারে। মাদক নেওয়ার কারণে ফুসফুসে পানি জমে যায়। নিয়মিত ইয়াবা সেবনে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, নিদ্রাহীনতা, খিঁচুনি, মস্তিষ্ক বিকৃতি, রক্তচাপ বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন, হার্ট অ্যাটাক, ঘুমের ব্যাঘাত, অস্বস্তিকর মানসিক অবস্থা, কিডনি বিকল, চিরস্থায়ী যৌন অক্ষমতা, ফুসফুসে প্রদাহসহ ফুসফুসের টিউমার ও ক্যানসার হতে পারে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, একটি পরিবার, একটি জীবন ও সমাজ মূহূর্তে ক্ষতিগ্রস্ত বা শেষ হয়ে যেতে পারে মাদকের বিষাক্ত ছোবলে। তাই দেরি না করে দ্রুত স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিকভাবে মাদকাসক্তির বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ডোপ টেস্ট চালু করা উচিত। কারণ, শাস্তির প্রদানের চেয়ে প্রতিকার ব্যবস্থা গড়ে তোলাই উত্তম। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, যখন কেউ বিপথে যায়, তখন পরিবার থেকে তাকে উপেক্ষা বা অসহযোগিতা না করে বরং সহযোগিতা করে রেজিস্ট্রার্ড চিকিৎসক বা মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রের শরণাপন্ন হতে হবে। এর পাশাপাশি তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে কাউন্সেলিং এবং ভালোবাসার কোনো বিকল্প নেই। পরিবারকে দিতে হবে সেবা, চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, পুষ্টিকর খাদ্য এবং অপরিসীম ভালোবাসা। এভাবেই তাকে মাদকাসক্তির কালো থাবা থেকে বাস্তব জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে।

ডা. সামিনা আরিফ : সহযোগী অধ্যাপক, উপাধ্যক্ষ, ফেডারেল হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

saminaarif741@gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন