অদম্য বাংলাদেশ গঠনে শেখ হাসিনা অনুপ্রেরণায় বঙ্গমাতা
jugantor
অদম্য বাংলাদেশ গঠনে শেখ হাসিনা অনুপ্রেরণায় বঙ্গমাতা

  ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা  

০৮ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবন ছায়াসঙ্গী। তিনি বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পদক্ষেপে বঙ্গবন্ধুকে সক্রিয় সহযোগিতা করেছেন ও প্রেরণা দিয়েছেন। লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার পর দেশ পুনর্গঠনে রেখে গেছেন অনন্য ভূমিকা। একই পরিবারে বড় হয়ে ওঠা দুজনের একসঙ্গে পথচলা জীবনের শুরু থেকেই। বঙ্গমাতা একেবারে কৈশোর বয়সে শেখ মুজিবের সহধর্মিণী হয়েছিলেন। বেশি লেখাপড়া না করা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন শেখ মুজিবের যোগ্য সহধর্মিণী এবং সহযোদ্ধা। কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে বঙ্গবন্ধুর পড়াশোনা করা এবং তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই বঙ্গমাতার ছিল সহযোগিতা ও সমর্থন। তিনি শুধু স্বামী, সন্তান, সংসার ও আত্মীয়স্বজনের প্রতি নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনই করেননি, তিনি একদিকে যেমন সাধারণ একজন বাঙালি নারীর মতো স্বামী-সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে সর্বক্ষণের সহযোগী ও অনুপ্রেরণাদাত্রী হয়ে নিভৃতে কাজ করে গেছেন। জীবনের শুরু থেকেই যে সংসারের মাঝে নিজের জীবনের পূর্ণতা খুঁজে পেয়েছিলেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সে সংসারের হাল ধরে রেখেছিলেন দক্ষ নাবিকের মতো।

দেশ বিভাগের আগে ১৯৪৬ সালে দাঙ্গার সময় বঙ্গমাতা নিজে অসুস্থ থাকা অবস্থায়ও স্বামীকে দাঙ্গা উপদ্রুত এলাকায় কাজ করতে উৎসাহ দিয়েছেন। চিঠি লিখে দেশের কাজে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছেন এইভাবে, ‘আপনি শুধু আমার স্বামী হবার জন্য জন্ম নেননি, দেশের কাজ করার জন্য জন্ম নিয়েছেন। দেশের কাজই আপনার সবচাইতে বড় কাজ। আপনি নিশ্চিন্ত মনে সেই কাজে যান। আমার জন্য চিন্তা করবেন না। আল্লাহর উপর আমার ভার ছেড়ে দিন।’

১৯৭১ সালের ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের বক্তব্য কী হবে, তা নিয়ে নানাজন তাকে লিখিত-অলিখিতভাবে নানা পরামর্শ দিতে থাকেন। বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুকে বলেন, ‘সমগ্র দেশের মানুষ তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সবার ভাগ্য আজ তোমার ওপর নির্ভর করছে। ...তোমার মনে যে কথা আসবে সে কথা বলবে। বাংলাদেশের মানুষকে নিয়ে তোমার যে স্বপ্ন সেই কথাগুলো তুমি স্পষ্ট করে বলে দিবে।’ ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বিকাল ২টা ৪৫ মিনিটে শুরু হওয়া আঠারো মিনিটের ভাষণের প্রতিটি শব্দ ছিল সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার আগুনের গোলা। বঙ্গবন্ধু সেদিন সমগ্র বাঙালির মনের কথা বললেন, ... ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল, তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’ বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণটি শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসাবে ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কোর বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য দলিলে স্বীকৃতি পেয়েছে।

বঙ্গমাতা জাতির পিতা, একজন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও অতিসাধারণ জীবনযাপন করতেন। এমনকি ফার্স্ট লেডির পদ গ্রহণ বা ভূমিকা রাখেননি। ভোগ-বিলাসী জীবন কখনো তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। দলকে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করার জন্য বঙ্গবন্ধু ১৯৫৭ সালে মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। বঙ্গবন্ধু ইচ্ছা করলেই পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন। কিন্তু তা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। অন্য কোনো স্ত্রী হলে স্বামীর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করত। কিন্তু বঙ্গমাতা দ্বিমত পোষণ করেননি। কারণ লোভ-লালসা, বিলাসিতা, ভোগবাদিতা ও ক্ষমতা তার বিবেকের কাছে ছিল অবনত। দুই ছেলের বিয়েতে দামি অলংকারের পরিবর্তে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন। স্বামীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি সন্তানদের আদর্শ মানুষ হিসাবে গড়ে তোলেন। জাতিকে শেখ হাসিনার মতো বিশ্বমানের রাজনীতিবিদ উপহার দেন। আমি ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কাজে প্রায়ই ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যেতাম। রাষ্ট্রপতির স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তি জীবনে তিনি যে কতটা সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন তা নিজ চোখে দেখেছি। তিনি নিজে তরকারি কাটা, রান্না করা, নেতাকর্মীদের চা পরিবেশন করতেন। এক প্যাঁচে সাধারণ শাড়ি পড়তেন।

বঙ্গমাতা সামাজিক কাজেও আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তিনি নিজের স্বামী, সন্তান, সংসার, শ্বশুর-শাশুড়ি ও আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত ও আত্মত্যাগী নারীদের পুনর্বাসনের জন্য নারী পুনর্বাসন বোর্ড গঠন করেন। তাতে বঙ্গমাতার ছিল অসাধারণ ভূমিকা। তিনি নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে দক্ষতা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি ও কুটিরশিল্পসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বঙ্গমাতার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ বছরই ঢাকার নীলক্ষেত কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের নামকরণ বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল করা হয়েছে এবং কর্মজীবী নারীদের নিরাপদ আবাসন সুবিধা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ১০ তলাবিশিষ্ট নবনির্মিত ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় বঙ্গমাতার জন্মদিনে অসচ্ছল নারীদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে সেলাই মেশিন ও নগদ টাকা প্রদান করে আসছে। এবারও সাম্প্রতিক বন্যাকবলিত পাঁচটি জেলাসহ সারা দেশে অসচ্ছল ও অসহায় নারীদের প্রায় পাঁচ হাজার সেলাই মেশিন এবং পঞ্চাশ লাখ টাকা দেওয়া হচ্ছে।

২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতা ঘোষণার পর পাক-হানাদার বাহিনী ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসা থেকে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে। বাসার তিন তলায় ছিল শেখ কামাল ও শেখ জামাল। কিন্তু তারা টের পেয়ে বাসার পেছনের দেওয়াল টপকে বের হয়ে যায় এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। তিন তলায় তাদের শোবার ঘরে মশারি টানানো ছিল। হানাদার বাহিনী রুমে ঢুকেই গুলি চালাতে থাকে। পরে তেইশটি গুলির খোসা পাওয়া যায়। সেদিন শেখ কামাল ও শেখ জামাল রুমে থাকলে তাদেরও হত্যা করা হতো। বঙ্গমাতা শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও শেখ রাসেলসহ বাসা ছেড়ে চলে যান। বিভিন্ন জায়গায় গোপনে অবস্থান করেন। পরে তাদের ঢাকার মগবাজারের একটি বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়।

আগস্ট মাস শোকের মাস। স্বজন হারানোর মাস। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে মানবসভ্যতার ইতিহাসে ঘৃণ্য ও নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডে নিহত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব, শহিদ ক্যাপ্টেন শেখ কামাল, লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল, শেখ রাসেলসহ সব শহিদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি এবং তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার সময় ছোট শিশুপুত্র রাসেলসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবকেও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। বঙ্গমাতাকে খুনিরা বলেছিল, ‘আপনি চলেন।’ তিনি বললেন, ‘কোথাও যাব না। ওনাকে খুন করেছ, আমাকেও শেষ করে দাও। আমি এখান থেকে এক পাও নড়ব না।’

মৃত্যু অনিবার্য জেনেও সবাই এ পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে চায়। কারণ মানুষ তার নিজের জীবনকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে বলেই জীবনকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু বঙ্গমাতা জীবন বাঁচাতে আকুতি মিনতি করেননি। তিনি খুনিদের কাছে জীবন ভিক্ষা চাননি। বীরের মতো বুক পেতে দিয়েছিলেন বুলেটের সামনে। বঙ্গবন্ধুর আজীবন সুখে-দুঃখে, সংকটে, সংগ্রামের সহযাত্রী মৃত্যুকালেও তার সহযাত্রী হয়ে রইলেন। বিজয়ের আনন্দ ক্ষণস্থায়ী কিন্তু পরাজয়ের গ্লানি চিরস্থায়ী। তাই পরাজয়ের গ্লানি মোচন করার উদ্দেশ্যেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। বিশ্বে অনেক দেশে রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও রাজনৈতিক নেতাদের হত্যা করা হয়েছে, কিন্তু কোথাও সপরিবারে হত্যা করা হয়নি। বঙ্গবন্ধু পরিবারের কোনো সদস্যের নেতৃত্বে স্বাধীনতার মূল্যবোধ, অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যাতে ঘুরে দাঁড়াতে না পারে সে জন্যই সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। রাখে আল্লাহ মারে কে? জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য বিদেশে থাকার কারণে সেদিন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রাণে বেঁচে যান। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতি ফিরে পায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতার মূল্যবোধ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ।

প্রায় এক যুগ ধরে সারা বিশ্ব দেখছে বাংলাদেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সফলতার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ম্যাজিক। দেশের উন্নয়ন তিনি এমন একপর্যায়ে নিয়ে গেছেন যে, একাত্তরের পরাজিত পাকিস্তান এখন বাংলাদেশ হতে চায়। কেননা সামাজিক উন্নয়নের প্রধান ১০ সূচকের সবই পরাজিত পাকিস্তান এখন বাংলাদেশ থেকে পিছিয়ে। দেশি-বিদেশি সব ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত উপেক্ষা করে প্রমত্তা পদ্মার বুক চিরে নিজস্ব অর্থায়নে স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণ করে প্রমাণ করেছেন শেখ হাসিনাও পারেন। বাংলাদেশও পারে। পদ্মা সেতু নির্মাণের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের উক্তি ‘তোমরা আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না।’ বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৫ জুন ২০২২ তারিখে বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা এবং গৌরবের প্রতীক পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করে বাংলাদেশের সক্ষমতা প্রমাণ করেছেন। পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে ২১টি জেলার যোগাযোগ ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের জিডিপি অন্তত ২.৫ শতাংশ বাড়বে। সামগ্রিকভাবে দেশের জিডিপি আরও ১.২৩ শতাংশ বাড়বে। রাজধানীতে মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ একদম শেষের দিকে এবং উদ্বোধন হবে অতি শিগগির। দেশের ইতিহাসে জাতীয় প্রবৃদ্ধি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। নারীর ক্ষমতায়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পেয়েছেন বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও স্বীকৃতি।

এ বছরের ২৫ জুন স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন অনুষ্ঠানে মায়ের অনুপ্রেরণা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘সব সময় আমি এটা অনুভব করি যে আমার মা, আমার বাবা সব সময় তাদের দোয়া আমার উপরে রেখেছেন। তাদের আশীর্বাদের হাত আমার মাথায় আছে। নইলে আমার মতো একটা সাধারণ মানুষ যে অতি সাধারণ বাঙালি মেয়ে, এত কাজ করতে আমি পারতাম না যদি আমার বাবা-মায়ের দোয়া, আশীর্বাদের হাত আমার ওপর না থাকত।’ এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘মহীয়সী বঙ্গমাতার চেতনা, অদম্য বাংলাদেশের প্রেরণা’ যা যথার্থ এবং সময়োপযোগী।

বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে যেমন মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস লেখা যায় না, তেমনি বঙ্গমাতাকে বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

কোন রণে কত খুন দিল নর, লেখা আছে ইতিহাসে

কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর, লেখা নাই তার পাশে।

কত মাতা দিল হৃদয় উপড়ি, কত বোন দিল সেবা

বীর স্মৃতি স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা?

বঙ্গমাতার আত্মত্যাগ, সাহসিকতা, দেশপ্রেম ও মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান স্বাধীনতার একান্ন বছরে মূল্যায়ন করা হয়নি। জাতীয় কবির এ কথাটি বঙ্গমাতার ক্ষেত্রে শতভাগই প্রযোজ্য। ২০০৩ সাল থেকে বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, পরে আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক এবং প্রতিমন্ত্রী হিসাবে আমি বিভিন্ন সভা-সেমিনারে বঙ্গমাতার জন্মবার্ষিকী জাতীয় দিবস ঘোষণা এবং পদক প্রদান করার প্রস্তাব করেছিলাম। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞ যে, তিনি ২০২০ সালে ২০ সেপ্টেম্বর তারিখে ৮ আগস্ট বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব-এর জন্মদিবসকে ‘ক’ শ্রেণির জাতীয় দিবস ঘোষণা করেন। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে বঙ্গমাতার জন্মদিবসের অনুষ্ঠানটি আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়ায় ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সরকার ২০২১ সাল থেকে বঙ্গমাতার অবদান চিরস্মরণীয় করার লক্ষ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পাঁচজন বিশিষ্ট নারীকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব পদক প্রদান করছে।

বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব যে সততা, মহানুভবতা, উদারতা ও আদর্শের দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা যুগে যুগে বাঙালি নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তার সংগ্রামী জীবন, বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অনেক অজানা অধ্যায় সম্পর্কে নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে। এ মহীয়সী নারীর জীবনচর্চার মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে। ৯২তম শুভ জন্মদিনে তার স্মৃতির প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। আমি একই সঙ্গে প্রস্তাব করছি, বঙ্গমাতার গৌরবময় কর্মজীবন পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং গবেষণার মাধ্যমে তার বর্ণাঢ্য জীবনের অজানা দিকগুলো নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হোক। আমি দাবি করছি, অবিলম্বে দণ্ডপ্রাপ্ত ১৫ আগস্টের পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে ফাঁসির রায় কার্যকর করা এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনে ইন্ধনদাতা ও কুশীলবদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা এমপি : প্রতিমন্ত্রী, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, গবেষক ও রাজনীতিবিদ

অদম্য বাংলাদেশ গঠনে শেখ হাসিনা অনুপ্রেরণায় বঙ্গমাতা

 ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা 
০৮ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবন ছায়াসঙ্গী। তিনি বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পদক্ষেপে বঙ্গবন্ধুকে সক্রিয় সহযোগিতা করেছেন ও প্রেরণা দিয়েছেন। লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার পর দেশ পুনর্গঠনে রেখে গেছেন অনন্য ভূমিকা। একই পরিবারে বড় হয়ে ওঠা দুজনের একসঙ্গে পথচলা জীবনের শুরু থেকেই। বঙ্গমাতা একেবারে কৈশোর বয়সে শেখ মুজিবের সহধর্মিণী হয়েছিলেন। বেশি লেখাপড়া না করা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন শেখ মুজিবের যোগ্য সহধর্মিণী এবং সহযোদ্ধা। কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে বঙ্গবন্ধুর পড়াশোনা করা এবং তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই বঙ্গমাতার ছিল সহযোগিতা ও সমর্থন। তিনি শুধু স্বামী, সন্তান, সংসার ও আত্মীয়স্বজনের প্রতি নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনই করেননি, তিনি একদিকে যেমন সাধারণ একজন বাঙালি নারীর মতো স্বামী-সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে সর্বক্ষণের সহযোগী ও অনুপ্রেরণাদাত্রী হয়ে নিভৃতে কাজ করে গেছেন। জীবনের শুরু থেকেই যে সংসারের মাঝে নিজের জীবনের পূর্ণতা খুঁজে পেয়েছিলেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সে সংসারের হাল ধরে রেখেছিলেন দক্ষ নাবিকের মতো।

দেশ বিভাগের আগে ১৯৪৬ সালে দাঙ্গার সময় বঙ্গমাতা নিজে অসুস্থ থাকা অবস্থায়ও স্বামীকে দাঙ্গা উপদ্রুত এলাকায় কাজ করতে উৎসাহ দিয়েছেন। চিঠি লিখে দেশের কাজে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছেন এইভাবে, ‘আপনি শুধু আমার স্বামী হবার জন্য জন্ম নেননি, দেশের কাজ করার জন্য জন্ম নিয়েছেন। দেশের কাজই আপনার সবচাইতে বড় কাজ। আপনি নিশ্চিন্ত মনে সেই কাজে যান। আমার জন্য চিন্তা করবেন না। আল্লাহর উপর আমার ভার ছেড়ে দিন।’

১৯৭১ সালের ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের বক্তব্য কী হবে, তা নিয়ে নানাজন তাকে লিখিত-অলিখিতভাবে নানা পরামর্শ দিতে থাকেন। বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুকে বলেন, ‘সমগ্র দেশের মানুষ তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সবার ভাগ্য আজ তোমার ওপর নির্ভর করছে। ...তোমার মনে যে কথা আসবে সে কথা বলবে। বাংলাদেশের মানুষকে নিয়ে তোমার যে স্বপ্ন সেই কথাগুলো তুমি স্পষ্ট করে বলে দিবে।’ ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বিকাল ২টা ৪৫ মিনিটে শুরু হওয়া আঠারো মিনিটের ভাষণের প্রতিটি শব্দ ছিল সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার আগুনের গোলা। বঙ্গবন্ধু সেদিন সমগ্র বাঙালির মনের কথা বললেন, ... ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল, তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’ বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণটি শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসাবে ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কোর বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য দলিলে স্বীকৃতি পেয়েছে।

বঙ্গমাতা জাতির পিতা, একজন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও অতিসাধারণ জীবনযাপন করতেন। এমনকি ফার্স্ট লেডির পদ গ্রহণ বা ভূমিকা রাখেননি। ভোগ-বিলাসী জীবন কখনো তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। দলকে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করার জন্য বঙ্গবন্ধু ১৯৫৭ সালে মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। বঙ্গবন্ধু ইচ্ছা করলেই পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন। কিন্তু তা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। অন্য কোনো স্ত্রী হলে স্বামীর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করত। কিন্তু বঙ্গমাতা দ্বিমত পোষণ করেননি। কারণ লোভ-লালসা, বিলাসিতা, ভোগবাদিতা ও ক্ষমতা তার বিবেকের কাছে ছিল অবনত। দুই ছেলের বিয়েতে দামি অলংকারের পরিবর্তে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন। স্বামীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি সন্তানদের আদর্শ মানুষ হিসাবে গড়ে তোলেন। জাতিকে শেখ হাসিনার মতো বিশ্বমানের রাজনীতিবিদ উপহার দেন। আমি ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কাজে প্রায়ই ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যেতাম। রাষ্ট্রপতির স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তি জীবনে তিনি যে কতটা সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন তা নিজ চোখে দেখেছি। তিনি নিজে তরকারি কাটা, রান্না করা, নেতাকর্মীদের চা পরিবেশন করতেন। এক প্যাঁচে সাধারণ শাড়ি পড়তেন।

বঙ্গমাতা সামাজিক কাজেও আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তিনি নিজের স্বামী, সন্তান, সংসার, শ্বশুর-শাশুড়ি ও আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত ও আত্মত্যাগী নারীদের পুনর্বাসনের জন্য নারী পুনর্বাসন বোর্ড গঠন করেন। তাতে বঙ্গমাতার ছিল অসাধারণ ভূমিকা। তিনি নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে দক্ষতা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি ও কুটিরশিল্পসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বঙ্গমাতার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ বছরই ঢাকার নীলক্ষেত কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের নামকরণ বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল করা হয়েছে এবং কর্মজীবী নারীদের নিরাপদ আবাসন সুবিধা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ১০ তলাবিশিষ্ট নবনির্মিত ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় বঙ্গমাতার জন্মদিনে অসচ্ছল নারীদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে সেলাই মেশিন ও নগদ টাকা প্রদান করে আসছে। এবারও সাম্প্রতিক বন্যাকবলিত পাঁচটি জেলাসহ সারা দেশে অসচ্ছল ও অসহায় নারীদের প্রায় পাঁচ হাজার সেলাই মেশিন এবং পঞ্চাশ লাখ টাকা দেওয়া হচ্ছে।

২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতা ঘোষণার পর পাক-হানাদার বাহিনী ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসা থেকে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে। বাসার তিন তলায় ছিল শেখ কামাল ও শেখ জামাল। কিন্তু তারা টের পেয়ে বাসার পেছনের দেওয়াল টপকে বের হয়ে যায় এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। তিন তলায় তাদের শোবার ঘরে মশারি টানানো ছিল। হানাদার বাহিনী রুমে ঢুকেই গুলি চালাতে থাকে। পরে তেইশটি গুলির খোসা পাওয়া যায়। সেদিন শেখ কামাল ও শেখ জামাল রুমে থাকলে তাদেরও হত্যা করা হতো। বঙ্গমাতা শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও শেখ রাসেলসহ বাসা ছেড়ে চলে যান। বিভিন্ন জায়গায় গোপনে অবস্থান করেন। পরে তাদের ঢাকার মগবাজারের একটি বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়।

আগস্ট মাস শোকের মাস। স্বজন হারানোর মাস। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে মানবসভ্যতার ইতিহাসে ঘৃণ্য ও নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডে নিহত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব, শহিদ ক্যাপ্টেন শেখ কামাল, লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল, শেখ রাসেলসহ সব শহিদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি এবং তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার সময় ছোট শিশুপুত্র রাসেলসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবকেও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। বঙ্গমাতাকে খুনিরা বলেছিল, ‘আপনি চলেন।’ তিনি বললেন, ‘কোথাও যাব না। ওনাকে খুন করেছ, আমাকেও শেষ করে দাও। আমি এখান থেকে এক পাও নড়ব না।’

মৃত্যু অনিবার্য জেনেও সবাই এ পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে চায়। কারণ মানুষ তার নিজের জীবনকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে বলেই জীবনকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু বঙ্গমাতা জীবন বাঁচাতে আকুতি মিনতি করেননি। তিনি খুনিদের কাছে জীবন ভিক্ষা চাননি। বীরের মতো বুক পেতে দিয়েছিলেন বুলেটের সামনে। বঙ্গবন্ধুর আজীবন সুখে-দুঃখে, সংকটে, সংগ্রামের সহযাত্রী মৃত্যুকালেও তার সহযাত্রী হয়ে রইলেন। বিজয়ের আনন্দ ক্ষণস্থায়ী কিন্তু পরাজয়ের গ্লানি চিরস্থায়ী। তাই পরাজয়ের গ্লানি মোচন করার উদ্দেশ্যেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। বিশ্বে অনেক দেশে রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও রাজনৈতিক নেতাদের হত্যা করা হয়েছে, কিন্তু কোথাও সপরিবারে হত্যা করা হয়নি। বঙ্গবন্ধু পরিবারের কোনো সদস্যের নেতৃত্বে স্বাধীনতার মূল্যবোধ, অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যাতে ঘুরে দাঁড়াতে না পারে সে জন্যই সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। রাখে আল্লাহ মারে কে? জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য বিদেশে থাকার কারণে সেদিন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রাণে বেঁচে যান। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতি ফিরে পায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতার মূল্যবোধ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ।

প্রায় এক যুগ ধরে সারা বিশ্ব দেখছে বাংলাদেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সফলতার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ম্যাজিক। দেশের উন্নয়ন তিনি এমন একপর্যায়ে নিয়ে গেছেন যে, একাত্তরের পরাজিত পাকিস্তান এখন বাংলাদেশ হতে চায়। কেননা সামাজিক উন্নয়নের প্রধান ১০ সূচকের সবই পরাজিত পাকিস্তান এখন বাংলাদেশ থেকে পিছিয়ে। দেশি-বিদেশি সব ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত উপেক্ষা করে প্রমত্তা পদ্মার বুক চিরে নিজস্ব অর্থায়নে স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণ করে প্রমাণ করেছেন শেখ হাসিনাও পারেন। বাংলাদেশও পারে। পদ্মা সেতু নির্মাণের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের উক্তি ‘তোমরা আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না।’ বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৫ জুন ২০২২ তারিখে বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা এবং গৌরবের প্রতীক পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করে বাংলাদেশের সক্ষমতা প্রমাণ করেছেন। পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে ২১টি জেলার যোগাযোগ ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের জিডিপি অন্তত ২.৫ শতাংশ বাড়বে। সামগ্রিকভাবে দেশের জিডিপি আরও ১.২৩ শতাংশ বাড়বে। রাজধানীতে মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ একদম শেষের দিকে এবং উদ্বোধন হবে অতি শিগগির। দেশের ইতিহাসে জাতীয় প্রবৃদ্ধি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। নারীর ক্ষমতায়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পেয়েছেন বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও স্বীকৃতি।

এ বছরের ২৫ জুন স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন অনুষ্ঠানে মায়ের অনুপ্রেরণা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘সব সময় আমি এটা অনুভব করি যে আমার মা, আমার বাবা সব সময় তাদের দোয়া আমার উপরে রেখেছেন। তাদের আশীর্বাদের হাত আমার মাথায় আছে। নইলে আমার মতো একটা সাধারণ মানুষ যে অতি সাধারণ বাঙালি মেয়ে, এত কাজ করতে আমি পারতাম না যদি আমার বাবা-মায়ের দোয়া, আশীর্বাদের হাত আমার ওপর না থাকত।’ এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘মহীয়সী বঙ্গমাতার চেতনা, অদম্য বাংলাদেশের প্রেরণা’ যা যথার্থ এবং সময়োপযোগী।

বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে যেমন মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস লেখা যায় না, তেমনি বঙ্গমাতাকে বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

কোন রণে কত খুন দিল নর, লেখা আছে ইতিহাসে

কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর, লেখা নাই তার পাশে।

কত মাতা দিল হৃদয় উপড়ি, কত বোন দিল সেবা

বীর স্মৃতি স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা?

বঙ্গমাতার আত্মত্যাগ, সাহসিকতা, দেশপ্রেম ও মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান স্বাধীনতার একান্ন বছরে মূল্যায়ন করা হয়নি। জাতীয় কবির এ কথাটি বঙ্গমাতার ক্ষেত্রে শতভাগই প্রযোজ্য। ২০০৩ সাল থেকে বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, পরে আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক এবং প্রতিমন্ত্রী হিসাবে আমি বিভিন্ন সভা-সেমিনারে বঙ্গমাতার জন্মবার্ষিকী জাতীয় দিবস ঘোষণা এবং পদক প্রদান করার প্রস্তাব করেছিলাম। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞ যে, তিনি ২০২০ সালে ২০ সেপ্টেম্বর তারিখে ৮ আগস্ট বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব-এর জন্মদিবসকে ‘ক’ শ্রেণির জাতীয় দিবস ঘোষণা করেন। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে বঙ্গমাতার জন্মদিবসের অনুষ্ঠানটি আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়ায় ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সরকার ২০২১ সাল থেকে বঙ্গমাতার অবদান চিরস্মরণীয় করার লক্ষ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পাঁচজন বিশিষ্ট নারীকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব পদক প্রদান করছে।

বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব যে সততা, মহানুভবতা, উদারতা ও আদর্শের দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা যুগে যুগে বাঙালি নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তার সংগ্রামী জীবন, বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অনেক অজানা অধ্যায় সম্পর্কে নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে। এ মহীয়সী নারীর জীবনচর্চার মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে। ৯২তম শুভ জন্মদিনে তার স্মৃতির প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। আমি একই সঙ্গে প্রস্তাব করছি, বঙ্গমাতার গৌরবময় কর্মজীবন পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং গবেষণার মাধ্যমে তার বর্ণাঢ্য জীবনের অজানা দিকগুলো নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হোক। আমি দাবি করছি, অবিলম্বে দণ্ডপ্রাপ্ত ১৫ আগস্টের পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে ফাঁসির রায় কার্যকর করা এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনে ইন্ধনদাতা ও কুশীলবদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা এমপি : প্রতিমন্ত্রী, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, গবেষক ও রাজনীতিবিদ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন