সুযোগসন্ধানীদের অসৎ পন্থা রুখতে হবে
jugantor
সুযোগসন্ধানীদের অসৎ পন্থা রুখতে হবে

  ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী  

১১ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যুদ্ধ-দ্বন্দ্ব-সংঘাত পুরো বিশ্বকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, চীন-তাইওয়ানের যুদ্ধংদেহি মনোভাব, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটো জোটের দেশগুলো এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের নানামুখী তৎপরতায় বিশ্বব্যাপী গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সঞ্চারিত হচ্ছে। বিগত দুই বছরের বেশি সময়ব্যাপী করোনা অতিমারিতে বীভৎস মৃত্যুর মিছিল, অর্থনৈতিক মন্দা দৃশ্যত অনেকাংশে স্তিমিত হয়ে এলেও সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব প্রচণ্ড টালমাটাল।

জ্বালানি তেল-গ্যাস-খাদ্যশস্য-নিত্যপণ্যের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ফলে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। পৃথিবীর প্রতিটি দেশের সরকার উদ্ভূত সংকট উত্তরণে বিভিন্ন প্রায়োগিক পরিকল্পনা-উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দেশে বৃহত্তর জনস্বার্থে গৃহীত পদক্ষেপ অনেক ক্ষেত্রে নতুন করে জনদুর্ভোগ তৈরি করছে।

সামগ্রিক বিষয়ের যথার্থ গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ মূল্যায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দূরদর্শী মেধা-প্রজ্ঞার অভাব দৃশ্যমান। ফলে জনমনে বিভ্রান্তির বেড়াজালে দেশব্যাপী অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিতে দেশবিরোধী শক্তির হীন চক্রান্তের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দুঃসময়ে জনগণকে জিম্মি করে ঘোলাটে রাজনীতির ঘৃণ্য অপকৌশল কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

সচেতন জনগণ এ ব্যাপারে যথেষ্ট সজাগ থাকলেও বহুলাংশে দরিদ্র-নিুবিত্ত-কম শিক্ষিত-অসচেতন নিরীহ জনগণকে উসকে দিয়ে কোনো ধরনের অপতৎপরতা কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না। যথাসময়ে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা বাস্তবায়নে জনসম্পৃক্ততা-গণসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।

দেশীয় পরিপ্রেক্ষিত পর্যালোচনায় দেখা যায়, বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়ার আশঙ্কায় বাংলাদেশ সরকার আগাম সতর্কতামূলক প্রস্তুতি হিসাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। উদ্যোগগুলোর মধ্যে জ্বালানি খাতে লোকসান কমাতে ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমানো, সারা দেশে এলাকাভিত্তিক দিনে অন্তত এক থেকে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং, মার্কেটসহ সব দোকানপাট রাত ৮টার পর বন্ধ রাখা, সরকারি সব দপ্তরে বিদ্যুতের ২৫ শতাংশ ব্যবহার কমানো, অত্যাবশ্যক না হলে বিদেশ ভ্রমণ যথাসম্ভব পরিহার করা, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) কমপক্ষে ২০ শতাংশ জ্বালানি তেলের আমদানি কমানোর নির্দেশনা, অফিসের কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনা, ভার্চুয়ালি অফিস করা, সরকারি বিভিন্ন অফিসে জ্বালানির বাজেট বরাদ্দের ২০ শতাংশ কম ব্যবহার, অফিস-আদালতসহ সব প্রতিষ্ঠানে এসি ব্যবহারে সংযমী হওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী পরিবহণে ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার যৌক্তিকীকরণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক-শিল্প-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপে সাড়া দিয়ে নানামুখী পন্থা অবলম্বন করেছে এবং প্রশংসিতও হয়েছে।

বিপিসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩০ লাখ ৬৩ হাজার টন বিভিন্ন ধরনের পরিশোধিত এবং ৮ লাখ ৭০ হাজার টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরের ১১ মাসে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে পরিশোধ করা হয়েছে ৭ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন।

এ হিসাবে শতকরা হারে বেড়েছে ১০৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ওই সময় এলসি খোলার পরিমাণও বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের ৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারের বিপরীতে এ বছর বেড়েছে ১১১ শতাংশ। প্রসঙ্গত, গত ১৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘সারা দেশে যে ডিজেল ব্যবহার করা হয় এর মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে এবং বাকি ৯০ শতাংশ পরিবহণ-কৃষিকাজের সেচ ও অন্যান্য খাতে ব্যবহার করা হয়। বিদ্যুতের ১০ শতাংশ এবং অন্যান্য খাত থেকে আরও ১০ শতাংশ, মোট ২০ শতাংশ ডিজেল সাশ্রয় করতে পারলে যে পরিমাণ বিদেশি মুদ্রার সাশ্রয় হবে, সেটা অনেক বড় বিষয়।’

৫ আগস্ট জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করে জ্বালানি বিভাগ কর্তৃক প্রদত্ত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বাংলাদেশের তুলনায় অনেক হওয়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে পরিশোধিত ও আমদানি/ক্রয়কৃত ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের মূল্য সমন্বয় করে ভোক্তা পর্যায়ে এ মূল্য পুনঃনির্ধারণ করা হলো।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বগতির কারণে পার্শ্ববর্তী দেশসহ বিভিন্ন দেশ নিয়মিত তেলের মূল্য সমন্বয় করে থাকে। ভারত চলতি বছরের ২২ মে থেকে কলকাতায় ডিজেলের মূল্য প্রতি লিটার ৯২ দশমিক ৭৬ রুপি এবং পেট্রোল লিটারপ্রতি ১০৬ দশমিক ০৩ রুপি নির্ধারণ করেছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় যথাক্রমে ১১৪ দশমিক ০৯ টাকা এবং ১৩০ দশমিক ৪২ টাকা।

এ হিসাবে বাংলাদেশে কলকাতার তুলনায় ডিজেল লিটারপ্রতি ৩৪ দশমিক ০৯ এবং পেট্রোল লিটারপ্রতি ৪৪ দশমিক ৪২ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছিল। মূল্য কম থাকায় তেল পাচার হওয়ার আশঙ্কা থেকেও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে ব্যক্ত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই ২০২২ পর্যন্ত ছয় মাসে সব ধরনের জ্বালানি তেল বিক্রয়ে ৮ হাজার ১৪ দশমিক ৫১ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। এটি সবার বোধগম্য হওয়া উচিত যে, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় জ্বালানি তেল পাচার হলে আমাদের তেল ক্রয় ও আমদানিতে ক্রমবর্ধমান ডলার সংকটের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে।

এদিকে গত ৬ আগস্ট গণমাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৬ মাসের মধ্যে সর্বনিু মূল্যে বিক্রি হওয়ার সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে। অয়েল প্রাইস ডটকম সূত্রমতে, আন্তর্জাতিক বাজারে দুই ধরনের অপরিশোধিত তেল ১০০ ডলারের কমে বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট অপরিশোধিত তেল ব্যারেলপ্রতি ৮৮ ডলার ৫৪ সেন্ট এবং ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেল পাওয়া যাচ্ছে ৯৪ ডলার ১২ সেন্টে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে আবারও করোনার বিস্তার বৃদ্ধির কারণে তেলের চাহিদা হ্রাস পেতে শুরু করেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে গত ৭ আগস্ট গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে সিপিডির সম্মানিত ফেলো বলেন, ‘সরকার জ্বালানি তেলের দাম ৪০ থেকে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এটা ঠিক যে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছিল। একই সঙ্গে আমাদের টাকারও অবমূল্যায়ন হওয়ায় এখানে এত বড় সমন্বয়ের প্রয়োজন পড়ল। এ পরিস্থিতিতে সমন্বয়ের দরকার ছিল। তবে তা বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধাপে ধাপে করলে ভালো হতো। এর বাইরে আমদানি শুল্ক কিছুটা সমন্বয়ের মাধ্যমেও এ ভর্তুকি সামাল দেওয়া যেত।

পাশাপাশি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি আরেকটু সহনীয়ভাবে করা গেলে ভোক্তা, উৎপাদক ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করাটা সহজ হতো।’ অতিসম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যহ্রাসের পরিপ্রেক্ষিতে সামগ্রিক জনদুর্ভোগ আমলে নিয়ে সত্যের কাঠিন্যে দেশীয় বাজারে এর বৈরী প্রভাব থেকে পরিত্রাণ অপরিহার্য। অন্যথায় বিজ্ঞজনের মতে, অপাঙ্ক্তেয় নষ্ট চরিত্রের অর্থলিপ্সু অনৈতিক মানুষরূপী দানবগুলো অরাজকতা বিস্তারের আড়ালে জনগণের দুর্ভোগকে অধিকতর বাড়িয়ে দিতে পারে।

শুধু বাংলাদেশ নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে জার্মানি, ফ্রান্স, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো ধনী দেশগুলোয়ও। বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতিতে পড়া অনেক ধনী-উন্নত দেশেও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। এমনকি রাখা হয়েছে জরিমানার বিধান। জাপানে বিদ্যুতের চাহিদার ৯০ শতাংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় বিশাল অঙ্কের টাকা পরিশোধে দেশটিকে বিপাকে পড়তে হয়েছে।

জাপান সরকার জনগণের প্রতি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে একাধিক ঘরে এয়ারকন্ডিশনার ব্যবহার না করাসহ নানা আহ্বান জানিয়েছে। রাশিয়া গ্যাসের রপ্তানি কমিয়ে দেওয়ায় বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ জার্মানি ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটে নিপতিত। সংকট মোকাবিলায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র আবার সচল করাসহ বার্লিনে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য বহুবিধ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সেও গ্যাস ও জ্বালানি সংকট তীব্র হচ্ছে।

আগামী শীত মৌসুমে বিদ্যুৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সেদেশের সরকার। তাই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে ফ্রান্সজুড়ে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত দোকানগুলোকে দরজা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং নির্দেশ অমান্যকারীকে দিতে হবে ৭৫ ইউরো জরিমানা। স্পেনে জ্বালানি সাশ্রয়ের অংশ হিসাবে সরকারি কর্মচারীদের এয়ারকন্ডিশনার ব্যবহার না করে যতটা সম্ভব বাড়ি থেকে কাজ করা এবং অফিসে এসি চালালে তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রির বেশি রাখতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার সরকার সিডনি ও নিউ সাউথ ওয়েলসের বাসিন্দাদের দিনে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার না করার আহ্বান জানান। এছাড়া ইতালি, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন উন্নত দেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানির কঠিন সংকট পরিলক্ষিত হচ্ছে। দি ইকোনমিস্ট পত্রিকার সূত্রমতে, সম্প্রতি চীনে ৮০টির বেশি শহরে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে সতর্কতা জারি করা হয়। গত ১৩ জুলাই চীনের মধ্যাঞ্চলে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর্দ্রতার পরিপ্রেক্ষিতে তা ৫৪ ডিগ্রির মতো অনুভূত হয়।

ফলে উৎপাদন কারখানাসহ বেশ কয়েকটি ফ্যাক্টরিতে লোড রেশনিং করা হয়েছে। অনেক কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে এবং কিছু পরিবার ব্ল্যাক আউটের সম্মুখীন হয়েছে। ভারতের ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকদের ধারণা, বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দামের ওপর ভিত্তি করে অভ্যন্তরীণ তেল সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে ভারত বছরের দ্বিতীয়ার্ধে ডিজেল ও পেট্রোল রপ্তানি কমিয়ে আনছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রাজস্ব ও স্থানীয় সরবরাহ বাড়াতে ভারত চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে স্থানীয় তেল উৎপাদক ও শোধকদের ওপর একটি ‘উইন্ডফল’ ট্যাক্স আরোপ করেছে।

গত ২৩ জুলাই বঙ্গবন্ধু জনপ্রশাসন পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমাদের দেশে যেমন মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, উন্নত দেশগুলোতে অনেক বেশি বেড়েছে। বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কথা শুধু আমরাই নই, উন্নত দেশগুলোও সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে যে, বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে হবে। সেটা আপনি ইংল্যান্ড বলেন বা আমেরিকা বলেন বা ইউরোপের কথা বলেন, আমি উন্নত দেশগুলোর কথাই বলব। তাদের অবস্থাই এখন করুণ।’

গত ২৭ জুলাই ডি-৮ মন্ত্রীদের ২০তম কাউন্সিলের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বৈশ্বিক সুদৃঢ় সংহতি-সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন। অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘সারা বিশ্ব একটি কঠিন সময় পার করছে। কোভিড-১৯ মহামারির অভিঘাত এখনো শেষ হয়নি।

এরই মধ্যে দুটি দেশের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। তার ওপর বিভিন্ন বিষয়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, পালটা নিষেধাজ্ঞার ফলে সারা বিশ্বে খাদ্য, সার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি এবং অন্যান্য পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্বে সৃষ্ট মানবিক সংকট সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। খাদ্য ও জ্বালানি সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এ সময় বহুপাক্ষিক সহযোগিতা শক্তিশালী করার পাশাপাশি বৈশ্বিক সংহতি আগের চেয়ে বেশি মনোযোগের দাবি রাখে।’

দেশে বর্তমানে ২৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি সাশ্রয়ের পদক্ষেপ হিসাবে বিদ্যুতের উৎপাদন কমানোর সিদ্ধান্তকে বিশেষজ্ঞরা যথার্থ অর্থে যৌক্তিক বলে অবহিত করেছেন। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি সমস্যা দূরীভূত না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের বিকল্প অন্য কোনো পন্থা আছে বলে তাদের মনে হয় না।

একই সঙ্গে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে গ্যাসের অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন তারা। এ পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রেখে রপ্তানি বাণিজ্যের গতিশীলতা বজায় রাখার পরামর্শ এবং শিল্প-কারখানা লোডশেডিংয়ের আওতামুক্ত রাখার মতামত ব্যক্ত করেছেন। আলোচনা-সমালোচনা-গুজব-বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় গ্যাস-বিদ্যুৎ ব্যবহারে সবাইকে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ-সচেতন মহলের আহ্বান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

বৃহত্তর জনস্বার্থে সাময়িক দুর্ভোগ জনগণ সহনীয় মনে করলেও স্বল্পসংখ্যক ব্যক্তি-দল-প্রতিষ্ঠান সাশ্রয়ের উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করার লক্ষ্যে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর অরাজক পরিস্থিতি পরিহারে দ্রুততার সঙ্গে গণপরিবহণের ভাড়া সমন্বয় প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু তেল মজুত, জোরপূর্বক নির্ধারিত ভাড়ার অধিক ভাড়া আদায়, পণ্যবহনে অযাচিত চাঁদাবাজিতে যেন সুযোগসন্ধানীরা তৎপর হতে না পারে, সেজন্য সুপরিকল্পিত তদারকির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আবশ্যক। দুর্বিষহ জনজীবনকে কঠিনতর করার যে কোনো ধরনের অসৎ পন্থাকে নস্যাৎ করে দেশের মানুষের আস্থা অর্জনে সরকারের আন্তরিকতা দৃশ্যমান হওয়া সময়ের দাবি।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : সমাজ-অপরাধবিজ্ঞানী; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

সুযোগসন্ধানীদের অসৎ পন্থা রুখতে হবে

 ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী 
১১ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যুদ্ধ-দ্বন্দ্ব-সংঘাত পুরো বিশ্বকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, চীন-তাইওয়ানের যুদ্ধংদেহি মনোভাব, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটো জোটের দেশগুলো এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের নানামুখী তৎপরতায় বিশ্বব্যাপী গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সঞ্চারিত হচ্ছে। বিগত দুই বছরের বেশি সময়ব্যাপী করোনা অতিমারিতে বীভৎস মৃত্যুর মিছিল, অর্থনৈতিক মন্দা দৃশ্যত অনেকাংশে স্তিমিত হয়ে এলেও সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব প্রচণ্ড টালমাটাল।

জ্বালানি তেল-গ্যাস-খাদ্যশস্য-নিত্যপণ্যের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ফলে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। পৃথিবীর প্রতিটি দেশের সরকার উদ্ভূত সংকট উত্তরণে বিভিন্ন প্রায়োগিক পরিকল্পনা-উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দেশে বৃহত্তর জনস্বার্থে গৃহীত পদক্ষেপ অনেক ক্ষেত্রে নতুন করে জনদুর্ভোগ তৈরি করছে।

সামগ্রিক বিষয়ের যথার্থ গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ মূল্যায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দূরদর্শী মেধা-প্রজ্ঞার অভাব দৃশ্যমান। ফলে জনমনে বিভ্রান্তির বেড়াজালে দেশব্যাপী অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিতে দেশবিরোধী শক্তির হীন চক্রান্তের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দুঃসময়ে জনগণকে জিম্মি করে ঘোলাটে রাজনীতির ঘৃণ্য অপকৌশল কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

সচেতন জনগণ এ ব্যাপারে যথেষ্ট সজাগ থাকলেও বহুলাংশে দরিদ্র-নিুবিত্ত-কম শিক্ষিত-অসচেতন নিরীহ জনগণকে উসকে দিয়ে কোনো ধরনের অপতৎপরতা কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না। যথাসময়ে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা বাস্তবায়নে জনসম্পৃক্ততা-গণসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।

দেশীয় পরিপ্রেক্ষিত পর্যালোচনায় দেখা যায়, বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়ার আশঙ্কায় বাংলাদেশ সরকার আগাম সতর্কতামূলক প্রস্তুতি হিসাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। উদ্যোগগুলোর মধ্যে জ্বালানি খাতে লোকসান কমাতে ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমানো, সারা দেশে এলাকাভিত্তিক দিনে অন্তত এক থেকে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং, মার্কেটসহ সব দোকানপাট রাত ৮টার পর বন্ধ রাখা, সরকারি সব দপ্তরে বিদ্যুতের ২৫ শতাংশ ব্যবহার কমানো, অত্যাবশ্যক না হলে বিদেশ ভ্রমণ যথাসম্ভব পরিহার করা, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) কমপক্ষে ২০ শতাংশ জ্বালানি তেলের আমদানি কমানোর নির্দেশনা, অফিসের কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনা, ভার্চুয়ালি অফিস করা, সরকারি বিভিন্ন অফিসে জ্বালানির বাজেট বরাদ্দের ২০ শতাংশ কম ব্যবহার, অফিস-আদালতসহ সব প্রতিষ্ঠানে এসি ব্যবহারে সংযমী হওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী পরিবহণে ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার যৌক্তিকীকরণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক-শিল্প-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপে সাড়া দিয়ে নানামুখী পন্থা অবলম্বন করেছে এবং প্রশংসিতও হয়েছে।

বিপিসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩০ লাখ ৬৩ হাজার টন বিভিন্ন ধরনের পরিশোধিত এবং ৮ লাখ ৭০ হাজার টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরের ১১ মাসে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে পরিশোধ করা হয়েছে ৭ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন।

এ হিসাবে শতকরা হারে বেড়েছে ১০৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ওই সময় এলসি খোলার পরিমাণও বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের ৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারের বিপরীতে এ বছর বেড়েছে ১১১ শতাংশ। প্রসঙ্গত, গত ১৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘সারা দেশে যে ডিজেল ব্যবহার করা হয় এর মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে এবং বাকি ৯০ শতাংশ পরিবহণ-কৃষিকাজের সেচ ও অন্যান্য খাতে ব্যবহার করা হয়। বিদ্যুতের ১০ শতাংশ এবং অন্যান্য খাত থেকে আরও ১০ শতাংশ, মোট ২০ শতাংশ ডিজেল সাশ্রয় করতে পারলে যে পরিমাণ বিদেশি মুদ্রার সাশ্রয় হবে, সেটা অনেক বড় বিষয়।’

৫ আগস্ট জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করে জ্বালানি বিভাগ কর্তৃক প্রদত্ত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বাংলাদেশের তুলনায় অনেক হওয়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে পরিশোধিত ও আমদানি/ক্রয়কৃত ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের মূল্য সমন্বয় করে ভোক্তা পর্যায়ে এ মূল্য পুনঃনির্ধারণ করা হলো।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বগতির কারণে পার্শ্ববর্তী দেশসহ বিভিন্ন দেশ নিয়মিত তেলের মূল্য সমন্বয় করে থাকে। ভারত চলতি বছরের ২২ মে থেকে কলকাতায় ডিজেলের মূল্য প্রতি লিটার ৯২ দশমিক ৭৬ রুপি এবং পেট্রোল লিটারপ্রতি ১০৬ দশমিক ০৩ রুপি নির্ধারণ করেছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় যথাক্রমে ১১৪ দশমিক ০৯ টাকা এবং ১৩০ দশমিক ৪২ টাকা।

এ হিসাবে বাংলাদেশে কলকাতার তুলনায় ডিজেল লিটারপ্রতি ৩৪ দশমিক ০৯ এবং পেট্রোল লিটারপ্রতি ৪৪ দশমিক ৪২ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছিল। মূল্য কম থাকায় তেল পাচার হওয়ার আশঙ্কা থেকেও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে ব্যক্ত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই ২০২২ পর্যন্ত ছয় মাসে সব ধরনের জ্বালানি তেল বিক্রয়ে ৮ হাজার ১৪ দশমিক ৫১ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। এটি সবার বোধগম্য হওয়া উচিত যে, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় জ্বালানি তেল পাচার হলে আমাদের তেল ক্রয় ও আমদানিতে ক্রমবর্ধমান ডলার সংকটের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে।

এদিকে গত ৬ আগস্ট গণমাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৬ মাসের মধ্যে সর্বনিু মূল্যে বিক্রি হওয়ার সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে। অয়েল প্রাইস ডটকম সূত্রমতে, আন্তর্জাতিক বাজারে দুই ধরনের অপরিশোধিত তেল ১০০ ডলারের কমে বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট অপরিশোধিত তেল ব্যারেলপ্রতি ৮৮ ডলার ৫৪ সেন্ট এবং ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেল পাওয়া যাচ্ছে ৯৪ ডলার ১২ সেন্টে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে আবারও করোনার বিস্তার বৃদ্ধির কারণে তেলের চাহিদা হ্রাস পেতে শুরু করেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে গত ৭ আগস্ট গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে সিপিডির সম্মানিত ফেলো বলেন, ‘সরকার জ্বালানি তেলের দাম ৪০ থেকে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এটা ঠিক যে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছিল। একই সঙ্গে আমাদের টাকারও অবমূল্যায়ন হওয়ায় এখানে এত বড় সমন্বয়ের প্রয়োজন পড়ল। এ পরিস্থিতিতে সমন্বয়ের দরকার ছিল। তবে তা বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধাপে ধাপে করলে ভালো হতো। এর বাইরে আমদানি শুল্ক কিছুটা সমন্বয়ের মাধ্যমেও এ ভর্তুকি সামাল দেওয়া যেত।

পাশাপাশি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি আরেকটু সহনীয়ভাবে করা গেলে ভোক্তা, উৎপাদক ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করাটা সহজ হতো।’ অতিসম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যহ্রাসের পরিপ্রেক্ষিতে সামগ্রিক জনদুর্ভোগ আমলে নিয়ে সত্যের কাঠিন্যে দেশীয় বাজারে এর বৈরী প্রভাব থেকে পরিত্রাণ অপরিহার্য। অন্যথায় বিজ্ঞজনের মতে, অপাঙ্ক্তেয় নষ্ট চরিত্রের অর্থলিপ্সু অনৈতিক মানুষরূপী দানবগুলো অরাজকতা বিস্তারের আড়ালে জনগণের দুর্ভোগকে অধিকতর বাড়িয়ে দিতে পারে।

শুধু বাংলাদেশ নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে জার্মানি, ফ্রান্স, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো ধনী দেশগুলোয়ও। বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতিতে পড়া অনেক ধনী-উন্নত দেশেও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। এমনকি রাখা হয়েছে জরিমানার বিধান। জাপানে বিদ্যুতের চাহিদার ৯০ শতাংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় বিশাল অঙ্কের টাকা পরিশোধে দেশটিকে বিপাকে পড়তে হয়েছে।

জাপান সরকার জনগণের প্রতি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে একাধিক ঘরে এয়ারকন্ডিশনার ব্যবহার না করাসহ নানা আহ্বান জানিয়েছে। রাশিয়া গ্যাসের রপ্তানি কমিয়ে দেওয়ায় বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ জার্মানি ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটে নিপতিত। সংকট মোকাবিলায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র আবার সচল করাসহ বার্লিনে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য বহুবিধ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সেও গ্যাস ও জ্বালানি সংকট তীব্র হচ্ছে।

আগামী শীত মৌসুমে বিদ্যুৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সেদেশের সরকার। তাই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে ফ্রান্সজুড়ে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত দোকানগুলোকে দরজা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং নির্দেশ অমান্যকারীকে দিতে হবে ৭৫ ইউরো জরিমানা। স্পেনে জ্বালানি সাশ্রয়ের অংশ হিসাবে সরকারি কর্মচারীদের এয়ারকন্ডিশনার ব্যবহার না করে যতটা সম্ভব বাড়ি থেকে কাজ করা এবং অফিসে এসি চালালে তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রির বেশি রাখতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার সরকার সিডনি ও নিউ সাউথ ওয়েলসের বাসিন্দাদের দিনে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার না করার আহ্বান জানান। এছাড়া ইতালি, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন উন্নত দেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানির কঠিন সংকট পরিলক্ষিত হচ্ছে। দি ইকোনমিস্ট পত্রিকার সূত্রমতে, সম্প্রতি চীনে ৮০টির বেশি শহরে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে সতর্কতা জারি করা হয়। গত ১৩ জুলাই চীনের মধ্যাঞ্চলে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর্দ্রতার পরিপ্রেক্ষিতে তা ৫৪ ডিগ্রির মতো অনুভূত হয়।

ফলে উৎপাদন কারখানাসহ বেশ কয়েকটি ফ্যাক্টরিতে লোড রেশনিং করা হয়েছে। অনেক কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে এবং কিছু পরিবার ব্ল্যাক আউটের সম্মুখীন হয়েছে। ভারতের ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকদের ধারণা, বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দামের ওপর ভিত্তি করে অভ্যন্তরীণ তেল সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে ভারত বছরের দ্বিতীয়ার্ধে ডিজেল ও পেট্রোল রপ্তানি কমিয়ে আনছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রাজস্ব ও স্থানীয় সরবরাহ বাড়াতে ভারত চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে স্থানীয় তেল উৎপাদক ও শোধকদের ওপর একটি ‘উইন্ডফল’ ট্যাক্স আরোপ করেছে।

গত ২৩ জুলাই বঙ্গবন্ধু জনপ্রশাসন পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমাদের দেশে যেমন মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, উন্নত দেশগুলোতে অনেক বেশি বেড়েছে। বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কথা শুধু আমরাই নই, উন্নত দেশগুলোও সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে যে, বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে হবে। সেটা আপনি ইংল্যান্ড বলেন বা আমেরিকা বলেন বা ইউরোপের কথা বলেন, আমি উন্নত দেশগুলোর কথাই বলব। তাদের অবস্থাই এখন করুণ।’

গত ২৭ জুলাই ডি-৮ মন্ত্রীদের ২০তম কাউন্সিলের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বৈশ্বিক সুদৃঢ় সংহতি-সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন। অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘সারা বিশ্ব একটি কঠিন সময় পার করছে। কোভিড-১৯ মহামারির অভিঘাত এখনো শেষ হয়নি।

এরই মধ্যে দুটি দেশের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। তার ওপর বিভিন্ন বিষয়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, পালটা নিষেধাজ্ঞার ফলে সারা বিশ্বে খাদ্য, সার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি এবং অন্যান্য পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্বে সৃষ্ট মানবিক সংকট সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। খাদ্য ও জ্বালানি সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এ সময় বহুপাক্ষিক সহযোগিতা শক্তিশালী করার পাশাপাশি বৈশ্বিক সংহতি আগের চেয়ে বেশি মনোযোগের দাবি রাখে।’

দেশে বর্তমানে ২৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি সাশ্রয়ের পদক্ষেপ হিসাবে বিদ্যুতের উৎপাদন কমানোর সিদ্ধান্তকে বিশেষজ্ঞরা যথার্থ অর্থে যৌক্তিক বলে অবহিত করেছেন। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি সমস্যা দূরীভূত না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের বিকল্প অন্য কোনো পন্থা আছে বলে তাদের মনে হয় না।

একই সঙ্গে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে গ্যাসের অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন তারা। এ পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রেখে রপ্তানি বাণিজ্যের গতিশীলতা বজায় রাখার পরামর্শ এবং শিল্প-কারখানা লোডশেডিংয়ের আওতামুক্ত রাখার মতামত ব্যক্ত করেছেন। আলোচনা-সমালোচনা-গুজব-বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় গ্যাস-বিদ্যুৎ ব্যবহারে সবাইকে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ-সচেতন মহলের আহ্বান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

বৃহত্তর জনস্বার্থে সাময়িক দুর্ভোগ জনগণ সহনীয় মনে করলেও স্বল্পসংখ্যক ব্যক্তি-দল-প্রতিষ্ঠান সাশ্রয়ের উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করার লক্ষ্যে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর অরাজক পরিস্থিতি পরিহারে দ্রুততার সঙ্গে গণপরিবহণের ভাড়া সমন্বয় প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু তেল মজুত, জোরপূর্বক নির্ধারিত ভাড়ার অধিক ভাড়া আদায়, পণ্যবহনে অযাচিত চাঁদাবাজিতে যেন সুযোগসন্ধানীরা তৎপর হতে না পারে, সেজন্য সুপরিকল্পিত তদারকির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আবশ্যক। দুর্বিষহ জনজীবনকে কঠিনতর করার যে কোনো ধরনের অসৎ পন্থাকে নস্যাৎ করে দেশের মানুষের আস্থা অর্জনে সরকারের আন্তরিকতা দৃশ্যমান হওয়া সময়ের দাবি।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : সমাজ-অপরাধবিজ্ঞানী; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন