‘ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান’ নিষিদ্ধ হোক
jugantor
‘ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান’ নিষিদ্ধ হোক

  ড. অরূপরতন চৌধুরী  

১১ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের ছোটবেলায় অগ্রজদের সামনে অনুজরা ধূমপান বা নেশাজাত দ্রব্য সেবন করত না। মূলত সেই সময়ে সমাজে কালচার ছিল-বড়দের সামনে ধূমপান করা চরম বেয়াদবি। কিন্তু বর্তমানে আমাদের অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। সামাজিক রীতিনীতির চরম অবক্ষয়ের কারণে অনেক সামাজিক ও পারিবারিক শিষ্টাচার অবলীলায় লঙ্ঘিত হচ্ছে। শিষ্টাচার লঙ্ঘনের প্রক্রিয়াকে উসকে দিচ্ছে ‘ধূমপান’।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৭ সালের তথ্যমতে, দেশে ৩৫.৩ শতাংশ (৩ কোটি ৭৮ লাখ) প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ধূমপান ও তামাক সেবন করে। এর সঙ্গে মানুষের আরও একটা অংশ রয়েছে, যারা এ গণনার বাইরে। অর্থাৎ শিশু-কিশোরদের মধ্যেও এ বদ অভ্যাস রয়েছে, যা একটি অশনিসংকেত! বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরিচালিত ‘Global School Based Student Health Survey-2014’ গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে ১৩-১৫ বছর বয়সি শিশু-কিশোরদের মধ্যে তামাক ব্যবহার করে ৯ দশমিক ২ শতাংশ।

কৌতূহল কিংবা প্ররোচনায় যে শিশু বা কিশোরটি ধূমপান দিয়ে নেশার জগতে পা রাখছে, জীবনে সাফল্যের পথকে পায়ে ঠেলে বিপথগামী হচ্ছে, তার জন্য কে বা কারা দায়ী? আমরা তার খোঁজ রাখছি না। মূলত এর জন্য দায়ী মৃত্যু বিপণনকারী তামাক কোম্পানিগুলো। এরা কৌশলে বিজ্ঞাপন ও নানা প্রলোভনে তামাকের মাধ্যমে আমাদের শিশু-কিশোরদের ক্ষতিকর নেশার জগতে ঠেলে দিচ্ছে।

আজকের দিনে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সবাই কম-বেশি রেস্টুরেন্টে খাবার খায়। উল্লেখ্য, এসব জায়গায় ইদানীং তরুণদের যাতায়াত তুলনামূলক বেড়েছে, যা ‘সুযোগ’ হিসাবে ব্যবহার করছে তামাক কোম্পানিগুলো। তরুণদের কাছে জনপ্রিয় এসব রেস্টুরেন্টে কোম্পানিগুলো স্পন্সরের মাধ্যমে ‘ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান’ বা ‘Designated Smoking Zone’ তৈরি করে দিচ্ছে। এসব স্থানে তামাকের বিজ্ঞাপনও প্রচার করতে দেখা যাচ্ছে। রেস্টুরেন্টে খাবার ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সময় কাটানোর স্থানে ধূমপানের স্থান রাখায় সেখানে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ থাকে না। কারণ, অধিকাংশ রেস্টুরেন্টে ‘ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান’ আশপাশের স্থানকে সুরক্ষিত রাখে না। ধূমপানের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে। ফলে পরোক্ষ ধূমপানে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারী, শিশু ও অধূমপায়ীরা।

গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস্) ২০১৭-তে দেখা যায়, কর্মক্ষেত্রে ৪২.৭ শতাংশ, গণপরিবহণে প্রায় ৪৪ শতাংশ এবং ৪৯.৭ শতাংশ মানুষ রেস্তোরাঁয় পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। বাড়ি, গণপরিবহণ, কর্মক্ষেত্র ও জনসমাগমস্থল মিলিয়ে এ সংখ্যা প্রায় ৮ কোটি! বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৬১ হাজার শিশু পরোক্ষ ধূমপানজনিত বিভিন্ন রোগে ভোগে। পরোক্ষ ধূমপানের কারণে পৃথিবীতে বছরে ১২ লাখ মানুষ অকালে মারা যায় (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা)।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) অনুসারে, আমাদের দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণীত হয়েছে। বাংলাদেশ এ চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী প্রথম দেশ। এফসিটিসির ধারা ৮ এবং এ সংক্রান্ত গাইডলাইন অনুযায়ী, পরোক্ষ ধূমপানের শিকার থেকে অধূমপায়ীদের রক্ষায় ‘পূর্ণাঙ্গ ধূমপানমুক্ত নীতিমালা’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

২০০৫ সালে প্রণীত (২০১৩ সালে সংশোধিত) ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন’ অনুসারে পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহণে ধূমপান নিষিদ্ধ। তবে কিছু পাবলিক প্লেস এবং একাধিক কামরাবিশিষ্ট পাবলিক পরিবহণে (ট্রেন, স্টিমার ইত্যাদি) ‘ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান’ বা ‘Designated Smoking Zone’ রাখার কথা বলা হয়েছে, যা তামাক নিয়ন্ত্রণের একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণ, জনবহুল পাবলিক প্লেস ও পরিবহণে ধূমপানের স্থান পরোক্ষ ধূমপানে ক্ষতির পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর প্রধান শিকার নারী ও শিশুরা। উপরন্তু, অধূমপায়ী এবং এসব স্থানে সেবা প্রদানকারী সেবাকর্মীরাও পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছেন। কারণ গবেষণা বলছে, আচ্ছাদিত ধূমপানে এলাকার আশপাশের স্থান কখনই ধোঁয়ামুক্ত হয় না। এ তামাকের ধোঁয়ায় ৭ হাজারের বেশি ক্ষতিকর রাসায়নিক রয়েছে, যার মধ্যে ৭০টি ক্যানসার সৃষ্টি করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পরোক্ষ ধূমপান অধূমপায়ীদের হৃদ্রোগের ঝুঁকি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় শতকরা ২০ থেকে ৩০ ভাগ। শিশুদের ‘সাডেন ইনফ্যান্ট ডেথ সিন্ড্রোম’ রোগেরও কারণ পরোক্ষ ধূমপান। পক্ষান্তরে কর্মক্ষেত্র, রেস্তোরাঁসহ সব পাবলিক প্লেসকে ১০০ শতাংশ ধূমপানমুক্ত করা সম্ভব হলে কর্মীদের হৃদ্রোগে আক্রান্তের ঝুঁকি ৮৫ শতাংশ হ্রাস পায়। মানুষের শ্বাসতন্ত্র ভালো থাকে এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুলাংশে কমে যায়। ধূমপানমুক্ত পরিবেশে ধূমপায়ী কর্মীর সিগারেট সেবনের মাত্রা দিনে গড়ে ২ থেকে ৪টা পর্যন্ত হ্রাস পায়, যা গবেষণায় প্রমাণিত।

বর্তমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে পাবলিক প্লেস ও পরিবহণে ধূমপানমুক্ত সাইনেজে ‘ধূমপান হইতে বিরত থাকুন, ইহা শাস্তিযোগ্য অপরাধ’ বার্তা উল্লেখ আছে। শাস্তিযোগ্য অপরাধ যে কোনো স্থানেই সংঘটিত হোক না কেন, সেটা কারও কাম্য নয়। সুতরাং ধূমপানের জন্য জনবহুল স্থানে আলাদা করে স্থান বরাদ্দ করতে হবে, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করেই ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান নিষিদ্ধ করা হোক। এতে ধূমপায়ীরা ধূমপান ত্যাগে উৎসাহিত হতে পারে এবং সুরক্ষিত থাকবে অধূমপায়ীরা।

সার্বিক দিক বিবেচনায় বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনটি অধিকতর শক্তিশালী করার মাধ্যমে পরোক্ষ ধূমপান থেকে অধূমপায়ীদের রক্ষায় পদক্ষেপ নিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়। তবে বিশ্বে এটি নতুন নয়, বরং আমরা এক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছি। বিশ্বে ৬৯টি দেশ আচ্ছাদিত পাবলিক প্লেসে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। বিমানবন্দরে ধূমপান নিষিদ্ধ করা হয়েছে ৪২টি দেশে। আমাদের দেশেও এ প্রক্রিয়া যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ, প্রধানমন্ত্রী ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত দেখতে চান।

ধূমপায়ীদের ধূমপান থেকে বিরত রাখতে ‘শতভাগ ধূমপানমুক্ত স্থান’ একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। তাই পাবলিক প্লেস ও পরিবহণে ধূমপানের নির্ধারিত স্থান নিষিদ্ধ করতে হবে। এজন্য বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের ধারা ৭ ও ৭ক বিলুপ্ত করা উচিত। এতে করে প্রধানমন্ত্রীর ‘তামাকমুক্ত বাংলাদেশ’ ঘোষণার বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের স্বাস্থ্য খাতে অসংক্রামক রোগের চাপ ও চিকিৎসা ব্যয় কমাবে। আগামী প্রজন্ম হবে সুস্বাস্থ্য ও সুনাগরিকের গুণাবলিসম্পন্ন দক্ষ ও কর্মক্ষম জনবল।

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী : প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস); সদস্য, জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ড (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) এবং জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ টাস্কফোর্স কমিটি (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়)

prof.arupratanchoudhury@yahoo.com

‘ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান’ নিষিদ্ধ হোক

 ড. অরূপরতন চৌধুরী 
১১ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের ছোটবেলায় অগ্রজদের সামনে অনুজরা ধূমপান বা নেশাজাত দ্রব্য সেবন করত না। মূলত সেই সময়ে সমাজে কালচার ছিল-বড়দের সামনে ধূমপান করা চরম বেয়াদবি। কিন্তু বর্তমানে আমাদের অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। সামাজিক রীতিনীতির চরম অবক্ষয়ের কারণে অনেক সামাজিক ও পারিবারিক শিষ্টাচার অবলীলায় লঙ্ঘিত হচ্ছে। শিষ্টাচার লঙ্ঘনের প্রক্রিয়াকে উসকে দিচ্ছে ‘ধূমপান’।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৭ সালের তথ্যমতে, দেশে ৩৫.৩ শতাংশ (৩ কোটি ৭৮ লাখ) প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ধূমপান ও তামাক সেবন করে। এর সঙ্গে মানুষের আরও একটা অংশ রয়েছে, যারা এ গণনার বাইরে। অর্থাৎ শিশু-কিশোরদের মধ্যেও এ বদ অভ্যাস রয়েছে, যা একটি অশনিসংকেত! বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরিচালিত ‘Global School Based Student Health Survey-2014’ গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে ১৩-১৫ বছর বয়সি শিশু-কিশোরদের মধ্যে তামাক ব্যবহার করে ৯ দশমিক ২ শতাংশ।

কৌতূহল কিংবা প্ররোচনায় যে শিশু বা কিশোরটি ধূমপান দিয়ে নেশার জগতে পা রাখছে, জীবনে সাফল্যের পথকে পায়ে ঠেলে বিপথগামী হচ্ছে, তার জন্য কে বা কারা দায়ী? আমরা তার খোঁজ রাখছি না। মূলত এর জন্য দায়ী মৃত্যু বিপণনকারী তামাক কোম্পানিগুলো। এরা কৌশলে বিজ্ঞাপন ও নানা প্রলোভনে তামাকের মাধ্যমে আমাদের শিশু-কিশোরদের ক্ষতিকর নেশার জগতে ঠেলে দিচ্ছে।

আজকের দিনে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সবাই কম-বেশি রেস্টুরেন্টে খাবার খায়। উল্লেখ্য, এসব জায়গায় ইদানীং তরুণদের যাতায়াত তুলনামূলক বেড়েছে, যা ‘সুযোগ’ হিসাবে ব্যবহার করছে তামাক কোম্পানিগুলো। তরুণদের কাছে জনপ্রিয় এসব রেস্টুরেন্টে কোম্পানিগুলো স্পন্সরের মাধ্যমে ‘ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান’ বা ‘Designated Smoking Zone’ তৈরি করে দিচ্ছে। এসব স্থানে তামাকের বিজ্ঞাপনও প্রচার করতে দেখা যাচ্ছে। রেস্টুরেন্টে খাবার ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সময় কাটানোর স্থানে ধূমপানের স্থান রাখায় সেখানে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ থাকে না। কারণ, অধিকাংশ রেস্টুরেন্টে ‘ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান’ আশপাশের স্থানকে সুরক্ষিত রাখে না। ধূমপানের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে। ফলে পরোক্ষ ধূমপানে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারী, শিশু ও অধূমপায়ীরা।

গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস্) ২০১৭-তে দেখা যায়, কর্মক্ষেত্রে ৪২.৭ শতাংশ, গণপরিবহণে প্রায় ৪৪ শতাংশ এবং ৪৯.৭ শতাংশ মানুষ রেস্তোরাঁয় পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। বাড়ি, গণপরিবহণ, কর্মক্ষেত্র ও জনসমাগমস্থল মিলিয়ে এ সংখ্যা প্রায় ৮ কোটি! বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৬১ হাজার শিশু পরোক্ষ ধূমপানজনিত বিভিন্ন রোগে ভোগে। পরোক্ষ ধূমপানের কারণে পৃথিবীতে বছরে ১২ লাখ মানুষ অকালে মারা যায় (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা)।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) অনুসারে, আমাদের দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণীত হয়েছে। বাংলাদেশ এ চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী প্রথম দেশ। এফসিটিসির ধারা ৮ এবং এ সংক্রান্ত গাইডলাইন অনুযায়ী, পরোক্ষ ধূমপানের শিকার থেকে অধূমপায়ীদের রক্ষায় ‘পূর্ণাঙ্গ ধূমপানমুক্ত নীতিমালা’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

২০০৫ সালে প্রণীত (২০১৩ সালে সংশোধিত) ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন’ অনুসারে পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহণে ধূমপান নিষিদ্ধ। তবে কিছু পাবলিক প্লেস এবং একাধিক কামরাবিশিষ্ট পাবলিক পরিবহণে (ট্রেন, স্টিমার ইত্যাদি) ‘ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান’ বা ‘Designated Smoking Zone’ রাখার কথা বলা হয়েছে, যা তামাক নিয়ন্ত্রণের একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণ, জনবহুল পাবলিক প্লেস ও পরিবহণে ধূমপানের স্থান পরোক্ষ ধূমপানে ক্ষতির পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর প্রধান শিকার নারী ও শিশুরা। উপরন্তু, অধূমপায়ী এবং এসব স্থানে সেবা প্রদানকারী সেবাকর্মীরাও পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছেন। কারণ গবেষণা বলছে, আচ্ছাদিত ধূমপানে এলাকার আশপাশের স্থান কখনই ধোঁয়ামুক্ত হয় না। এ তামাকের ধোঁয়ায় ৭ হাজারের বেশি ক্ষতিকর রাসায়নিক রয়েছে, যার মধ্যে ৭০টি ক্যানসার সৃষ্টি করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পরোক্ষ ধূমপান অধূমপায়ীদের হৃদ্রোগের ঝুঁকি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় শতকরা ২০ থেকে ৩০ ভাগ। শিশুদের ‘সাডেন ইনফ্যান্ট ডেথ সিন্ড্রোম’ রোগেরও কারণ পরোক্ষ ধূমপান। পক্ষান্তরে কর্মক্ষেত্র, রেস্তোরাঁসহ সব পাবলিক প্লেসকে ১০০ শতাংশ ধূমপানমুক্ত করা সম্ভব হলে কর্মীদের হৃদ্রোগে আক্রান্তের ঝুঁকি ৮৫ শতাংশ হ্রাস পায়। মানুষের শ্বাসতন্ত্র ভালো থাকে এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুলাংশে কমে যায়। ধূমপানমুক্ত পরিবেশে ধূমপায়ী কর্মীর সিগারেট সেবনের মাত্রা দিনে গড়ে ২ থেকে ৪টা পর্যন্ত হ্রাস পায়, যা গবেষণায় প্রমাণিত।

বর্তমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে পাবলিক প্লেস ও পরিবহণে ধূমপানমুক্ত সাইনেজে ‘ধূমপান হইতে বিরত থাকুন, ইহা শাস্তিযোগ্য অপরাধ’ বার্তা উল্লেখ আছে। শাস্তিযোগ্য অপরাধ যে কোনো স্থানেই সংঘটিত হোক না কেন, সেটা কারও কাম্য নয়। সুতরাং ধূমপানের জন্য জনবহুল স্থানে আলাদা করে স্থান বরাদ্দ করতে হবে, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করেই ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান নিষিদ্ধ করা হোক। এতে ধূমপায়ীরা ধূমপান ত্যাগে উৎসাহিত হতে পারে এবং সুরক্ষিত থাকবে অধূমপায়ীরা।

সার্বিক দিক বিবেচনায় বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনটি অধিকতর শক্তিশালী করার মাধ্যমে পরোক্ষ ধূমপান থেকে অধূমপায়ীদের রক্ষায় পদক্ষেপ নিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়। তবে বিশ্বে এটি নতুন নয়, বরং আমরা এক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছি। বিশ্বে ৬৯টি দেশ আচ্ছাদিত পাবলিক প্লেসে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। বিমানবন্দরে ধূমপান নিষিদ্ধ করা হয়েছে ৪২টি দেশে। আমাদের দেশেও এ প্রক্রিয়া যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ, প্রধানমন্ত্রী ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত দেখতে চান।

ধূমপায়ীদের ধূমপান থেকে বিরত রাখতে ‘শতভাগ ধূমপানমুক্ত স্থান’ একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। তাই পাবলিক প্লেস ও পরিবহণে ধূমপানের নির্ধারিত স্থান নিষিদ্ধ করতে হবে। এজন্য বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের ধারা ৭ ও ৭ক বিলুপ্ত করা উচিত। এতে করে প্রধানমন্ত্রীর ‘তামাকমুক্ত বাংলাদেশ’ ঘোষণার বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের স্বাস্থ্য খাতে অসংক্রামক রোগের চাপ ও চিকিৎসা ব্যয় কমাবে। আগামী প্রজন্ম হবে সুস্বাস্থ্য ও সুনাগরিকের গুণাবলিসম্পন্ন দক্ষ ও কর্মক্ষম জনবল।

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী : প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস); সদস্য, জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ড (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) এবং জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ টাস্কফোর্স কমিটি (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়)

prof.arupratanchoudhury@yahoo.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন