ধর্ষণ ঠেকাতে প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ
jugantor
বাইফোকাল লেন্স
ধর্ষণ ঠেকাতে প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ

  একেএম শামসুদ্দিন  

১৪ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ২ আগস্ট দিবাগত রাতে কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা যাত্রীবাহী বাস ‘ঈগল’ পরিবহণে যে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, তা খুবই উদ্বেগের বিষয়। দুর্বৃত্তের দল যে কায়দায় বাসটি কয়েক ঘণ্টা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে যাত্রীদের মারধর ও লুটপাট করেছে, তাতে জনগণের রাত্রিকালীন দূরপাল্লার যাত্রায় নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডাকাত দলের সদস্যরা যাত্রীদের শুধু মারধর ও লুটপাটই করেনি, এক নারী যাত্রীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণও করেছে। কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা করে যমুনা সেতু পার হওয়ার পর ডাকাত দল বাসটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। ২৪ থেকে ২৫ জন যাত্রী নিয়ে কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে এলেও রাত দেড়টার দিকে সিরাজগঞ্জ থেকে ১০-১২ জন যাত্রীবেশী ডাকাত সদস্য বাসে ওঠে। বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার পর বাসের ড্রাইভারকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে একজন ড্রাইভিং সিটে বসে বাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। তারপর নারায়ণগঞ্জের দিকে না গিয়ে বাসটিকে নিয়ে তারা টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কে যাত্রা করে। ওদিকে অন্যান্য ডাকাত সদস্যরা যাত্রীদের হাত-পা বেঁধে মুঠোফোন, নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার লুটে নেয়। তল্লাশি করার সময় একজন নারী প্রতিবাদ করলে তারা ওই নারীর ওপর চড়াও হয় এবং ধর্ষণ করে। ডাকাত দলের সদস্য তিন ঘণ্টার মতো বাসটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। অতঃপর মধুপুর উপজেলার রক্তিপাড়ার কাছে সড়কের পাশে বাস রেখে চলে যায়। এ ঘটনার পর মামলা হলে পুলিশ ইতোমধ্যেই অধিকাংশ ডাকাত সদস্যকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে এসেছে। উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে ২৫ আগস্ট রাতে মধুপুরে চলন্ত বাসে এক ছাত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের পর হত্যা করে পাঁচমাইল এলাকার রাস্তায় ফেলে আসামিরা পালিয়ে গিয়েছিল। ওই ঘটনায় করা মামলায় ছোঁয়া পরিবহণের চার শ্রমিকের মৃত্যুদণ্ড ও একজনকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেন টাঙ্গাইল জেলা আদালত।

এ ঘটনার চার দিনের মাথায় গণপরিবহণে আরও একটি গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ৬ আগস্ট ভোরে নওগাঁ থেকে আসা দম্পতি গাজীপুর বাসন থানার ভোগড়া বাইপাস থেকে ‘তাকওয়া পরিবহন’-এ শ্রীপুর উপজেলার মাস্টারবাড়ির দিকে রওনা হন। বাসে ৫-৬ জন যাত্রী ছিল। পথে অন্যরা নেমে যায়। বাসটি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাওনা ফ্লাইওভার পার হওয়ার পর বাস চালকের সহকারীরা স্বামীকে মারধর করে জোর করে বাস থেকে ফেলে দেয়। তারপর বাসের চালক ও তার চার সহকারী পালাক্রমে নারীটিকে ধর্ষণ করে। অতঃপর ভুক্তভোগী নারীর কাছ থেকে মুঠোফোন, ব্যাগ ও ১০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তায় নামিয়ে দেয়।

একই তারিখ অর্থাৎ ৬ আগস্ট শনিবার সন্ধ্যায় পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা হনিদরপাড়া এলাকায় দশম শ্রেণির এক ছাত্রীকে প্রথমে প্রতারক প্রেমিক মো. হাসান ও পরে তার বন্ধু রাজু ধর্ষণ করে। এমন সময় সেখানে ৪-৫ জন লোক এসে উপস্থিত হলে সঙ্গে সঙ্গে হাসান ও রাজু মেয়েটিকে রেখে পালিয়ে যায়। মেয়েটি আগত পাঁ ব্যক্তির কাছে তাঁর অসহায়ত্বের কথা বর্ণনা করে সাহায্য চাইলে সাহায্য করা তো দূরে থাক, উলটো মেয়েটিকে ধর্ষণ করে। অতঃপর রাত একটার দিকে স্থানীয় এক ব্যক্তি ঘটনাস্থল থেকে মেয়েটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

বেশ কয়েক বছর ধরে গড়পড়তায় প্রায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও এমন ঘটনা ঘটে চলেছে। দেশে ধর্ষণের এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি সত্যিই খুব উদ্বেগজনক। দিন যতই গড়াচ্ছে, ধর্ষণের ঘটনা যেন ততই বেড়ে যাচ্ছে। এক জরিপে দেখা গেছে, ২০১৭ সাল থেকে ২০২২ সালে ৭ আগমস্ট পর্যন্ত গণপরিবহণ, অন্যান্য বাহন, বাসস্ট্যান্ড ও রেলস্টেশনে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩৫৭ জন ও খুন হয়েছেন ২৭ জন। পাশাপাশি ৪ হাজার ৬০১ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ‘সেভ দি রোড’ নামক একটি সংগঠন এ জরিপ কাজটি করে। সাম্প্রতিককালে ধর্ষণ নামের এ ব্যাধিটি বহুল আলোচিত একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রায় প্রতিদিন ধর্ষণের কোনো না কোনো ঘটনা শিরোনাম হচ্ছে। গ্রামে ও শহরে, বাড়িতে কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, লঞ্চঘাট, রেলস্টেশন, বাসে, টেনে কিংবা নৌযানে সর্বত্রই এ ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে চলেছে। ধর্ষণের মতো এই হিংসাত্মক কর্মটি মহামারির মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।

সমাজের চিত্রটি এখন এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, নারী-তিনি যে বয়সেরই হন না কেন, শিশু থেকে মধ্যবয়স্ক অসহায় সবাই যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন এলাকার বখাটে ছেলেদের দ্বারা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারা, এমনকি তার নিকটাত্মীয়ের দ্বারা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, ধর্ষণই ওই নারীর শেষ পরিণতি নয়, এরপরও তার ওপর চলে নানা ধরনের নির্যাতন অথবা হত্যাকাণ্ড। মানুষ কতটা পশু হলে এ ধরনের কাজ করতে পারে! মানুষের এ বিকৃত মানসিকতার ভয়ংকর রূপ অনেক সময় পশুকেও হার মানায়। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, পুরুষশাসিত সমাজে ধর্ষণের শিকার নারীরা প্রায়ই সামাজিকভাবে নিগৃহীত হয়ে থাকেন। দুর্ভাগা এ নারীদের ওপর যখন এ দুর্যোগ নেমে আসে, তখন তাদের সামাজিক গঞ্জনা সহ্য করতে হয়। নিজ পরিবারের কাছেও তিনি হয়ে পড়েন করুণার পাত্রী। সামাজিক বঞ্চনা তখন তার আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত হানে। এরূপ মর্যাদাহানিকর পরিস্থিতি নিজের প্রতি আস্থাহীনতার সৃষ্টি করায় ধর্ষণের শিকার নারীর জীবনে চরম বিপর্যয় ডেকে আনে।

আমাদের সমাজে অনেকেই ধর্ষণকে সামাজিক ব্যাধি বলার চেষ্টা করেন। প্রশ্ন হচ্ছে, ধর্ষণ সত্যিই কি কোনো সামাজিক ব্যাধি, নাকি বিকৃত মানসিকতার ভয়ংকর রূপ? সন্দেহ নেই, ধর্ষণ একটি ভয়াবহ অপরাধ। কিন্তু একে সামাজিক ব্যাধি বলে মূলত এ জঘন্য অপরাধকেই হালকা করে দেওয়া হয়। ধর্ষণকে সমাজিক ব্যাধি বলা হলে মনে হতে পারে সমাজই যেন ধর্ষণের জন্য দায়ী। মনে রাখতে হবে, আমাদের সমাজে ধর্ষণবিরোধী মানুষের সংখ্যাই বেশি। ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই; বরং এটাই প্রতিষ্ঠিত হোক-ধর্ষণ কখনোই সামাজিক ব্যাধি নয়, ধর্ষণ অসামাজিক, শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে, ঘর কিংবা বাইরে নারীর জন্য নিরাপদ স্থান কোনটি-তার উত্তর দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলার উপায় কী? প্রতিকারহীন এ সন্ত্রাসে আক্রান্ত সারা দেশ। ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন করা হলেও কমছে না ধর্ষণযজ্ঞ। এমনকি দ্রুত বিচারকাজ সম্পন্নের জন্য গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেও নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না এ অপকর্ম। আইন আছে, ট্রাইবুনালও আছে, তবে শাস্তি পাচ্ছে কজন? এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৬ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দেশজুড়ে ধর্ষণের ঘটনায় প্রায় ৩৫ হাজারেরও বেশি মামলা হয়েছে; কিন্তু বিচার কাজ শেষ হয়েছে কতটির? সাজা নিশ্চিত হয়েছে কতজন ধর্ষকের? এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। দেখা গেছে, আমাদের দেশে ধর্ষণের যত মামলা হয়, তার ৯৫ শতাংশের বিচারকাজ শুরুই হয় না। বিচারের দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি আদালতে ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণে সাক্ষীর দুর্বলতা ও সাক্ষীর অভাবেও অভিযুক্তরা শাস্তির হাত থেকে বেঁচে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, ধর্ষকরা ধর্ষণের এ হিংস কাজটি এমন সময় ও স্থানে সংগঠিত করে, সেখানে ভিক্টিম ছাড়া তার পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার কেউ থাকে না। ধর্ষণ মামলার বিচারকাজের দীর্ঘসূত্রতার অন্যান্য কারণগুলো হলো-তদন্ত দেরি হওয়া, তদন্তকারী ব্যক্তির ভুল প্রতিবেদন দেওয়া, তদন্তকারী পুলিশ সদস্যের বদলিজনিত কারণ, মেডিকেল রিপোর্ট দেরিতে পাওয়া, ভিক্টিমের আর্থ-সামাজিক অবস্থান এবং অনেক ক্ষেত্রে পুরো ঘটনায় ধর্ষকের প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা। ধর্ষণের মতো এ মারাত্মক অপরাধ ঠেকাতে হলে সরকারকেও ওপরে উল্লিখিত দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শুধু সরকার নয়, সমাজের সচেতন মানুষদেরও এ অপরাধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। পাশাপাশি সমাজে প্রচলিত কিছু চর্চাও বর্জন করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, সমাজের তথাকথিত কিছু চর্চা অপরাধীকে উপযুক্ত শাস্তি পাওয়া থেকে রেহাই দিয়ে দেয়। যেমন, ধর্ষণের মতো শাস্তিযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে গ্রামের মোড়ল বা জনপ্রতিনিধি কর্তৃক মধ্যস্থতা এবং ঘরোয়া সালিশের মাধ্যমে এমন বিচার করা হয়, যা অপরাধীকে কঠিন শাস্তিভোগ থেকে বাঁচিয়ে দেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, গ্রাম্য মাতব্বররা সালিশের নামে ভুক্তভোগীকে ওই ধর্ষকের সঙ্গেই বিয়ের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন, যা উলটো ভবিষ্যৎ অপরাধীদের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।

দেশে এক সময় এসিড সন্ত্রাসও মহামারির আকার ধারণ করেছিল। ২০০২ সালে এসিড অপরাধ দমন আইন ও পরে এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন করে এ সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে সাফল্য না এলেও পরে আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে বর্তমানে এসিড সন্ত্রাস বলা যায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এসিড অপরাধ দমনে সামাজিক সচেতনতা অন্যতম মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। ধর্ষণের মূলোৎপাটন করতে হলে চাই সামাজিক সচেতনতা। এ জন্য সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে সজাগ হতে হবে। এই ঘৃণ অপরাধের বিরুদ্ধে প্রবল সামাজিক প্রতিরোধ করতে হবে। ভুক্তভোগী নারীকে নিজ পরিবারের সদস্য গণ্য করে অপরাধীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে প্রতিরোধ গড়ে না উঠলে শুধু আইন দিয়ে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ ঠেকানো যাবে না।

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, কলাম লেখক

বাইফোকাল লেন্স

ধর্ষণ ঠেকাতে প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ

 একেএম শামসুদ্দিন 
১৪ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ২ আগস্ট দিবাগত রাতে কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা যাত্রীবাহী বাস ‘ঈগল’ পরিবহণে যে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, তা খুবই উদ্বেগের বিষয়। দুর্বৃত্তের দল যে কায়দায় বাসটি কয়েক ঘণ্টা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে যাত্রীদের মারধর ও লুটপাট করেছে, তাতে জনগণের রাত্রিকালীন দূরপাল্লার যাত্রায় নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডাকাত দলের সদস্যরা যাত্রীদের শুধু মারধর ও লুটপাটই করেনি, এক নারী যাত্রীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণও করেছে। কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা করে যমুনা সেতু পার হওয়ার পর ডাকাত দল বাসটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। ২৪ থেকে ২৫ জন যাত্রী নিয়ে কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে এলেও রাত দেড়টার দিকে সিরাজগঞ্জ থেকে ১০-১২ জন যাত্রীবেশী ডাকাত সদস্য বাসে ওঠে। বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার পর বাসের ড্রাইভারকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে একজন ড্রাইভিং সিটে বসে বাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। তারপর নারায়ণগঞ্জের দিকে না গিয়ে বাসটিকে নিয়ে তারা টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কে যাত্রা করে। ওদিকে অন্যান্য ডাকাত সদস্যরা যাত্রীদের হাত-পা বেঁধে মুঠোফোন, নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার লুটে নেয়। তল্লাশি করার সময় একজন নারী প্রতিবাদ করলে তারা ওই নারীর ওপর চড়াও হয় এবং ধর্ষণ করে। ডাকাত দলের সদস্য তিন ঘণ্টার মতো বাসটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। অতঃপর মধুপুর উপজেলার রক্তিপাড়ার কাছে সড়কের পাশে বাস রেখে চলে যায়। এ ঘটনার পর মামলা হলে পুলিশ ইতোমধ্যেই অধিকাংশ ডাকাত সদস্যকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে এসেছে। উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে ২৫ আগস্ট রাতে মধুপুরে চলন্ত বাসে এক ছাত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের পর হত্যা করে পাঁচমাইল এলাকার রাস্তায় ফেলে আসামিরা পালিয়ে গিয়েছিল। ওই ঘটনায় করা মামলায় ছোঁয়া পরিবহণের চার শ্রমিকের মৃত্যুদণ্ড ও একজনকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেন টাঙ্গাইল জেলা আদালত।

এ ঘটনার চার দিনের মাথায় গণপরিবহণে আরও একটি গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ৬ আগস্ট ভোরে নওগাঁ থেকে আসা দম্পতি গাজীপুর বাসন থানার ভোগড়া বাইপাস থেকে ‘তাকওয়া পরিবহন’-এ শ্রীপুর উপজেলার মাস্টারবাড়ির দিকে রওনা হন। বাসে ৫-৬ জন যাত্রী ছিল। পথে অন্যরা নেমে যায়। বাসটি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাওনা ফ্লাইওভার পার হওয়ার পর বাস চালকের সহকারীরা স্বামীকে মারধর করে জোর করে বাস থেকে ফেলে দেয়। তারপর বাসের চালক ও তার চার সহকারী পালাক্রমে নারীটিকে ধর্ষণ করে। অতঃপর ভুক্তভোগী নারীর কাছ থেকে মুঠোফোন, ব্যাগ ও ১০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তায় নামিয়ে দেয়।

একই তারিখ অর্থাৎ ৬ আগস্ট শনিবার সন্ধ্যায় পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা হনিদরপাড়া এলাকায় দশম শ্রেণির এক ছাত্রীকে প্রথমে প্রতারক প্রেমিক মো. হাসান ও পরে তার বন্ধু রাজু ধর্ষণ করে। এমন সময় সেখানে ৪-৫ জন লোক এসে উপস্থিত হলে সঙ্গে সঙ্গে হাসান ও রাজু মেয়েটিকে রেখে পালিয়ে যায়। মেয়েটি আগত পাঁ ব্যক্তির কাছে তাঁর অসহায়ত্বের কথা বর্ণনা করে সাহায্য চাইলে সাহায্য করা তো দূরে থাক, উলটো মেয়েটিকে ধর্ষণ করে। অতঃপর রাত একটার দিকে স্থানীয় এক ব্যক্তি ঘটনাস্থল থেকে মেয়েটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

বেশ কয়েক বছর ধরে গড়পড়তায় প্রায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও এমন ঘটনা ঘটে চলেছে। দেশে ধর্ষণের এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি সত্যিই খুব উদ্বেগজনক। দিন যতই গড়াচ্ছে, ধর্ষণের ঘটনা যেন ততই বেড়ে যাচ্ছে। এক জরিপে দেখা গেছে, ২০১৭ সাল থেকে ২০২২ সালে ৭ আগমস্ট পর্যন্ত গণপরিবহণ, অন্যান্য বাহন, বাসস্ট্যান্ড ও রেলস্টেশনে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩৫৭ জন ও খুন হয়েছেন ২৭ জন। পাশাপাশি ৪ হাজার ৬০১ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ‘সেভ দি রোড’ নামক একটি সংগঠন এ জরিপ কাজটি করে। সাম্প্রতিককালে ধর্ষণ নামের এ ব্যাধিটি বহুল আলোচিত একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রায় প্রতিদিন ধর্ষণের কোনো না কোনো ঘটনা শিরোনাম হচ্ছে। গ্রামে ও শহরে, বাড়িতে কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, লঞ্চঘাট, রেলস্টেশন, বাসে, টেনে কিংবা নৌযানে সর্বত্রই এ ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে চলেছে। ধর্ষণের মতো এই হিংসাত্মক কর্মটি মহামারির মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।

সমাজের চিত্রটি এখন এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, নারী-তিনি যে বয়সেরই হন না কেন, শিশু থেকে মধ্যবয়স্ক অসহায় সবাই যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন এলাকার বখাটে ছেলেদের দ্বারা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারা, এমনকি তার নিকটাত্মীয়ের দ্বারা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, ধর্ষণই ওই নারীর শেষ পরিণতি নয়, এরপরও তার ওপর চলে নানা ধরনের নির্যাতন অথবা হত্যাকাণ্ড। মানুষ কতটা পশু হলে এ ধরনের কাজ করতে পারে! মানুষের এ বিকৃত মানসিকতার ভয়ংকর রূপ অনেক সময় পশুকেও হার মানায়। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, পুরুষশাসিত সমাজে ধর্ষণের শিকার নারীরা প্রায়ই সামাজিকভাবে নিগৃহীত হয়ে থাকেন। দুর্ভাগা এ নারীদের ওপর যখন এ দুর্যোগ নেমে আসে, তখন তাদের সামাজিক গঞ্জনা সহ্য করতে হয়। নিজ পরিবারের কাছেও তিনি হয়ে পড়েন করুণার পাত্রী। সামাজিক বঞ্চনা তখন তার আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত হানে। এরূপ মর্যাদাহানিকর পরিস্থিতি নিজের প্রতি আস্থাহীনতার সৃষ্টি করায় ধর্ষণের শিকার নারীর জীবনে চরম বিপর্যয় ডেকে আনে।

আমাদের সমাজে অনেকেই ধর্ষণকে সামাজিক ব্যাধি বলার চেষ্টা করেন। প্রশ্ন হচ্ছে, ধর্ষণ সত্যিই কি কোনো সামাজিক ব্যাধি, নাকি বিকৃত মানসিকতার ভয়ংকর রূপ? সন্দেহ নেই, ধর্ষণ একটি ভয়াবহ অপরাধ। কিন্তু একে সামাজিক ব্যাধি বলে মূলত এ জঘন্য অপরাধকেই হালকা করে দেওয়া হয়। ধর্ষণকে সমাজিক ব্যাধি বলা হলে মনে হতে পারে সমাজই যেন ধর্ষণের জন্য দায়ী। মনে রাখতে হবে, আমাদের সমাজে ধর্ষণবিরোধী মানুষের সংখ্যাই বেশি। ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই; বরং এটাই প্রতিষ্ঠিত হোক-ধর্ষণ কখনোই সামাজিক ব্যাধি নয়, ধর্ষণ অসামাজিক, শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে, ঘর কিংবা বাইরে নারীর জন্য নিরাপদ স্থান কোনটি-তার উত্তর দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলার উপায় কী? প্রতিকারহীন এ সন্ত্রাসে আক্রান্ত সারা দেশ। ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন করা হলেও কমছে না ধর্ষণযজ্ঞ। এমনকি দ্রুত বিচারকাজ সম্পন্নের জন্য গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেও নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না এ অপকর্ম। আইন আছে, ট্রাইবুনালও আছে, তবে শাস্তি পাচ্ছে কজন? এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৬ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দেশজুড়ে ধর্ষণের ঘটনায় প্রায় ৩৫ হাজারেরও বেশি মামলা হয়েছে; কিন্তু বিচার কাজ শেষ হয়েছে কতটির? সাজা নিশ্চিত হয়েছে কতজন ধর্ষকের? এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। দেখা গেছে, আমাদের দেশে ধর্ষণের যত মামলা হয়, তার ৯৫ শতাংশের বিচারকাজ শুরুই হয় না। বিচারের দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি আদালতে ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণে সাক্ষীর দুর্বলতা ও সাক্ষীর অভাবেও অভিযুক্তরা শাস্তির হাত থেকে বেঁচে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, ধর্ষকরা ধর্ষণের এ হিংস কাজটি এমন সময় ও স্থানে সংগঠিত করে, সেখানে ভিক্টিম ছাড়া তার পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার কেউ থাকে না। ধর্ষণ মামলার বিচারকাজের দীর্ঘসূত্রতার অন্যান্য কারণগুলো হলো-তদন্ত দেরি হওয়া, তদন্তকারী ব্যক্তির ভুল প্রতিবেদন দেওয়া, তদন্তকারী পুলিশ সদস্যের বদলিজনিত কারণ, মেডিকেল রিপোর্ট দেরিতে পাওয়া, ভিক্টিমের আর্থ-সামাজিক অবস্থান এবং অনেক ক্ষেত্রে পুরো ঘটনায় ধর্ষকের প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা। ধর্ষণের মতো এ মারাত্মক অপরাধ ঠেকাতে হলে সরকারকেও ওপরে উল্লিখিত দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শুধু সরকার নয়, সমাজের সচেতন মানুষদেরও এ অপরাধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। পাশাপাশি সমাজে প্রচলিত কিছু চর্চাও বর্জন করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, সমাজের তথাকথিত কিছু চর্চা অপরাধীকে উপযুক্ত শাস্তি পাওয়া থেকে রেহাই দিয়ে দেয়। যেমন, ধর্ষণের মতো শাস্তিযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে গ্রামের মোড়ল বা জনপ্রতিনিধি কর্তৃক মধ্যস্থতা এবং ঘরোয়া সালিশের মাধ্যমে এমন বিচার করা হয়, যা অপরাধীকে কঠিন শাস্তিভোগ থেকে বাঁচিয়ে দেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, গ্রাম্য মাতব্বররা সালিশের নামে ভুক্তভোগীকে ওই ধর্ষকের সঙ্গেই বিয়ের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন, যা উলটো ভবিষ্যৎ অপরাধীদের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।

দেশে এক সময় এসিড সন্ত্রাসও মহামারির আকার ধারণ করেছিল। ২০০২ সালে এসিড অপরাধ দমন আইন ও পরে এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন করে এ সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে সাফল্য না এলেও পরে আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে বর্তমানে এসিড সন্ত্রাস বলা যায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এসিড অপরাধ দমনে সামাজিক সচেতনতা অন্যতম মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। ধর্ষণের মূলোৎপাটন করতে হলে চাই সামাজিক সচেতনতা। এ জন্য সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে সজাগ হতে হবে। এই ঘৃণ অপরাধের বিরুদ্ধে প্রবল সামাজিক প্রতিরোধ করতে হবে। ভুক্তভোগী নারীকে নিজ পরিবারের সদস্য গণ্য করে অপরাধীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে প্রতিরোধ গড়ে না উঠলে শুধু আইন দিয়ে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ ঠেকানো যাবে না।

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, কলাম লেখক

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন