বঙ্গবন্ধুর বিশেষ কিছু গুণ-বৈশিষ্ট্য
jugantor
বঙ্গবন্ধুর বিশেষ কিছু গুণ-বৈশিষ্ট্য

  বিমল সরকার  

১৪ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এ কথা বলা যায় যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৈশোর থেকেই লেখাপড়ার চেয়ে বেশি মনোযোগী ছিলেন রাজনীতির প্রতি। রাজনীতি, খেলাধুলা ও নানা ধরনের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের প্রতি তার ঝোঁক ছিল। ইংরেজ শাসনামলে তিনি যখন গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলের ছাত্র, তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা একে ফজলুল হক গোপালগঞ্জ সফরে গেলে অন্যসব ছাত্রের মধ্য থেকে সহজেই তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে কিশোর মুজিব। তখন থেকেই তার নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক যোগ্যতার পরিচয় পাওয়া যায়। রাজনীতির অনেক অলিগলি, মেঠো ও বন্ধুর পথ অতিক্রম করে সামনের দিকে এগোতে হয়েছে তাকে। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের সঙ্গে, একটি গর্বিত জাতির সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নামটি অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত হওয়ার পেছনে তার উদারচিত্ত, নিখাদ দেশপ্রেম, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা এবং নিরলস কর্মপ্রচেষ্টা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। আর এভাবেই টুঙ্গিপাড়ার মুজিবুর রহমান ক্রমে রাজনীতির কবি হয়ে ওঠেন। হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু। জাতির পিতা। বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু নাম দুটি বাঙালির জাতীয় জীবনে হয়ে ওঠে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীসহ উপমহাদেশের অনেক বরেণ্য ও উদারচিত্ত রাজনীতিকের হাত ধরে রাজনীতিতে তার পথচলার শুরু। ধৈর্য আর সহনশীলতা, গণতান্ত্রিক রীতিনীতি এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচারের দিক থেকে বঙ্গবন্ধু এক অনুসরণীয় ও অত্যুজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব।

১৯৭০ সালে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত সব প্রতিনিধিকে (জাতীয় পরিষদ সদস্য ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য) বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ‘গণপরিষদ সদস্য’ বলে ঘোষণা করা হয়। ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে মওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের সভাপতিত্বে। এতে স্পিকার নির্বাচিত হন শাহ আব্দুল হামিদ। মাত্র দুদিনের সংক্ষিপ্ত এ অধিবেশনের সমাপ্তি ভাষণে গণপরিষদ নেতা প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন-‘গণতন্ত্রের রীতি অনুযায়ী পরিষদে একটি বিরোধী দল থাকা উচিত ছিল। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো বর্তমান পরিষদে কোনো বিরোধী দল নেই।’ ভাষণে সেদিন বঙ্গবন্ধু আরও বলেছিলেন, ‘গত নির্বাচনে জনগণ আওয়ামী লীগকে এমনভাবে সমর্থন দিয়েছে যে, এখন মাত্র একজন সদস্য (অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত) বিরোধী দলের আসনে বসতে পারছেন।’ বঙ্গবন্ধু দলীয় সদস্যদের উদ্দেশ করে ওই সদস্যটির মনোভাব ব্যক্ত করার সুযোগদানের আহ্বান জানান। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন-গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুযায়ী বিরোধীদলীয় সদস্যটিকে তার বক্তব্য পরিষদে পেশ করার যথাযথ সুযোগ দেওয়া হবে।

সমাপনী ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, কোনো সদস্যের অন্য কোনো সদস্যকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ বা কটাক্ষ করে কথা বলা উচিত নয়। তিনি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে শাসিত-শোষিত, বঞ্চিত-অবহেলিত এক জাতি। সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগ, সর্বোপরি মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আজ আমরা বিশ্বের বুকে স্বাধীন জাতি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছি। দীর্ঘদিন আমাদের কোনো পার্লামেন্ট ছিল না। এখন সুযোগ এসেছে। সবাই কিছু না কিছু বলতে আগ্রহী।’ তিনি সবাইকে সমান সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, তার দল এ ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে যাবে। বঙ্গবন্ধু বেশ স্পষ্ট করেই উচ্চারণ করেন-‘কোনো সদস্য স্পিকারের নির্দেশ অমান্য করলে তাকে স্পিকার কক্ষ থেকে বের করে দিতে পারবেন। দল, সরকার এবং সংসদের প্রধান ব্যক্তি হিসাবে স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র চার মাসের মাথায় সংসদে দাঁড়িয়ে সদস্যদের উদ্দেশে এমন কঠোর ভাষা প্রয়োগ বোধকরি একমাত্র বঙ্গবন্ধুর মতো ব্যক্তিত্বের পক্ষেই সম্ভব ছিল। স্বাধীন দেশের প্রথম সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংসদ নেতা হিসাবে বঙ্গবন্ধুর সেদিনের ভাষণটি সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য। একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিক হিসাবে, বিশেষ করে গণতান্ত্রিক রীতিনীতির চর্চা ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই হয়তো বঙ্গবন্ধু এতসব কথা বলেছিলেন।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে সমবেত লাখ লাখ জনতার সমাবেশে বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত ঐতিহাসিক ভাষণটি আমাদের মুক্তিসংগ্রাম এবং জাতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে রয়েছে। আর কোনো বাঙালি রাজনীতিক বক্তৃতা বা অন্য কোনো সাংগঠনিক কর্মতৎপরতার মাধ্যমে বাংলা ভাষাভাষী বিপুল জনগোষ্ঠীর মাঝে এমন জাগরণ সৃষ্টি করতে পারেননি। ভাষণটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, বঙ্গবন্ধু সেদিন জনগণের উদ্দেশে স্বাধীনতা সংগ্রামের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ এবং রাজনীতিকদের জন্য অনুসরণযোগ্য কিছু বিষয়ও উল্লেখ করেছিলেন। যেমন ধরা যাক জুলফিকার আলী ভুট্টো ও ইয়াহিয়া খানের কথা। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান, পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল টিক্কা খান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের মতো ব্যক্তিরা ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জন পর্যন্ত, এমনকি বিজয় অর্জনের পরও ঘৃণ্য ও ন্যক্কারজনক ভূমিকা পালন করেছেন। এ কারণে পরবর্তীকালে কোনো আলাপ-আলোচনায় কখনো তাদের নাম, বিশেষ করে ইয়াহিয়া-ভুট্টোর প্রসঙ্গ এলে সেসব নাম সেভাবেই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উচ্চারণ করেছেন এ দেশের সাধারণ মানুষ। এও এক বাস্তবতা। কিন্তু এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিনয় ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারের কথা একটুও বিস্মৃত হননি। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে পাকিস্তানি শাসক-শোষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অনেক কড়া কড়া কথা বলে তিনি তাদের হুশিয়ার করে দেন। লক্ষ করলে বোঝা যাবে, এ অভূতপূর্ব ভাষণে বঙ্গবন্ধু মোট তিনবার ইয়াহিয়া খানের নামটি উচ্চারণ করেছেন। এ সময় কখনো তিনি ইয়াহিয়া খানকে উপযুক্ত সম্মান দিতে কার্পণ্য করেননি। ‘ইয়াহিয়া খান সাহেব’, ‘প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাহেব’ এবং ‘জেনারেল ইয়াহিয়া খান সাহেব’-ঠিক এভাবেই ইয়াহিয়ার নামটি উল্লেখ করেন বঙ্গবন্ধু। এ ছাড়া ওই ভাষণে মোট দুবার উচ্চারিত ভুট্টোর নামটিও তিনি উল্লেখ করেন ‘ভুট্টো সাহেব’ বলে।

গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও সহনশীলতার আরও দৃষ্টান্ত রয়েছে ৭ মার্চের ভাষণে। যেমন, ‘তিনি (ইয়াহিয়া খান) বললেন, প্রথম সপ্তাহে, মার্চ মাসে সভা হবে। আমি বললাম ঠিক আছে, আমরা অ্যাসেম্বলিতে বসব। আমি বললাম অ্যাসেম্বলির মধ্যে আলোচনা করব, এমনকি আমি এ পর্যন্তও বললাম, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও, একজনও যদি সে হয়, তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব ...।’

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সারদা পুলিশ একাডেমি পরিদর্শনে গেছেন। সঙ্গে ছিলেন একাডেমির প্রধান এবিএম গোলাম কিবরিয়া আর আব্দুল খালেক আইজিপি (১৭ এপ্রিল ১৯৭১-২৭ এপ্রিল ১৯৭৩)। উৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তাদের কেউ কেউ আইজিপিকে বললেন, বঙ্গবন্ধুকে একটু স্মরণ করিয়ে দেওয়া দরকার যে, কিবরিয়া সাহেব মুসলিম লীগের নেতা নূরুল আমিনের মেয়েজামাই। আইজিপি বঙ্গবন্ধুকে কথাটি বলার পর বঙ্গবন্ধু বললেন, কিবরিয়া যে নূরুল আমিন সাহেবের মেয়েজামাই তা আমি জানি। তার সব জামাইকেই আমি চিনি। বঙ্গবন্ধু সারদা অনুষ্ঠানে গিয়ে কিবরিয়াকে সস্নেহে কাছে ডেকে জানতে চাইলেন তার বউ-ছেলেমেয়ে কেমন আছে। এক কথাতেই কিবরিয়ার সব শঙ্কা দূর হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু মানুষের মনস্তত্ত্ব ভালো বুঝতেন।

নিয়তির পরিহাস। জাতির দায়িত্বভার কাঁধে নেওয়ার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট একদল নরপশু রাতের আঁধারে তার ঐতিহাসিক বত্রিশ নম্বরের বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালিয়ে নৃশংসভাবে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে গোটা জাতির ললাটে দুরপনেয় কালিমা লেপে দেয়। এভাবে বঙ্গবন্ধুর মতো এক মহৎ হৃদয়ের জীবনাবসান ঘটে।

বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে আমরা কতটুকুই বা জানি। এ নিবন্ধে তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের দু-একটি ছিটেফোঁটা বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র। জাতির চরম সংকট, নিজের শত কর্মব্যস্ততা এবং আবেগের মুহূর্তটিতেও রাজনৈতিক শিষ্টাচার, গণতান্ত্রিক রীতিনীতি এবং সাধারণ সৌজন্যবোধ প্রদর্শনের বিষয়টি তিনি বিস্মৃত হতেন না। বঙ্গবন্ধুর এসব গুণ-বৈশিষ্ট্য দেশের রাজনীতিকদের জন্য অনুসরণীয় বৈকি।

বিমল সরকার : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক

বঙ্গবন্ধুর বিশেষ কিছু গুণ-বৈশিষ্ট্য

 বিমল সরকার 
১৪ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এ কথা বলা যায় যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৈশোর থেকেই লেখাপড়ার চেয়ে বেশি মনোযোগী ছিলেন রাজনীতির প্রতি। রাজনীতি, খেলাধুলা ও নানা ধরনের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের প্রতি তার ঝোঁক ছিল। ইংরেজ শাসনামলে তিনি যখন গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলের ছাত্র, তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা একে ফজলুল হক গোপালগঞ্জ সফরে গেলে অন্যসব ছাত্রের মধ্য থেকে সহজেই তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে কিশোর মুজিব। তখন থেকেই তার নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক যোগ্যতার পরিচয় পাওয়া যায়। রাজনীতির অনেক অলিগলি, মেঠো ও বন্ধুর পথ অতিক্রম করে সামনের দিকে এগোতে হয়েছে তাকে। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের সঙ্গে, একটি গর্বিত জাতির সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নামটি অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত হওয়ার পেছনে তার উদারচিত্ত, নিখাদ দেশপ্রেম, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা এবং নিরলস কর্মপ্রচেষ্টা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। আর এভাবেই টুঙ্গিপাড়ার মুজিবুর রহমান ক্রমে রাজনীতির কবি হয়ে ওঠেন। হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু। জাতির পিতা। বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু নাম দুটি বাঙালির জাতীয় জীবনে হয়ে ওঠে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীসহ উপমহাদেশের অনেক বরেণ্য ও উদারচিত্ত রাজনীতিকের হাত ধরে রাজনীতিতে তার পথচলার শুরু। ধৈর্য আর সহনশীলতা, গণতান্ত্রিক রীতিনীতি এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচারের দিক থেকে বঙ্গবন্ধু এক অনুসরণীয় ও অত্যুজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব।

১৯৭০ সালে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত সব প্রতিনিধিকে (জাতীয় পরিষদ সদস্য ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য) বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ‘গণপরিষদ সদস্য’ বলে ঘোষণা করা হয়। ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে মওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের সভাপতিত্বে। এতে স্পিকার নির্বাচিত হন শাহ আব্দুল হামিদ। মাত্র দুদিনের সংক্ষিপ্ত এ অধিবেশনের সমাপ্তি ভাষণে গণপরিষদ নেতা প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন-‘গণতন্ত্রের রীতি অনুযায়ী পরিষদে একটি বিরোধী দল থাকা উচিত ছিল। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো বর্তমান পরিষদে কোনো বিরোধী দল নেই।’ ভাষণে সেদিন বঙ্গবন্ধু আরও বলেছিলেন, ‘গত নির্বাচনে জনগণ আওয়ামী লীগকে এমনভাবে সমর্থন দিয়েছে যে, এখন মাত্র একজন সদস্য (অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত) বিরোধী দলের আসনে বসতে পারছেন।’ বঙ্গবন্ধু দলীয় সদস্যদের উদ্দেশ করে ওই সদস্যটির মনোভাব ব্যক্ত করার সুযোগদানের আহ্বান জানান। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন-গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুযায়ী বিরোধীদলীয় সদস্যটিকে তার বক্তব্য পরিষদে পেশ করার যথাযথ সুযোগ দেওয়া হবে।

সমাপনী ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, কোনো সদস্যের অন্য কোনো সদস্যকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ বা কটাক্ষ করে কথা বলা উচিত নয়। তিনি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে শাসিত-শোষিত, বঞ্চিত-অবহেলিত এক জাতি। সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগ, সর্বোপরি মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আজ আমরা বিশ্বের বুকে স্বাধীন জাতি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছি। দীর্ঘদিন আমাদের কোনো পার্লামেন্ট ছিল না। এখন সুযোগ এসেছে। সবাই কিছু না কিছু বলতে আগ্রহী।’ তিনি সবাইকে সমান সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, তার দল এ ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে যাবে। বঙ্গবন্ধু বেশ স্পষ্ট করেই উচ্চারণ করেন-‘কোনো সদস্য স্পিকারের নির্দেশ অমান্য করলে তাকে স্পিকার কক্ষ থেকে বের করে দিতে পারবেন। দল, সরকার এবং সংসদের প্রধান ব্যক্তি হিসাবে স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র চার মাসের মাথায় সংসদে দাঁড়িয়ে সদস্যদের উদ্দেশে এমন কঠোর ভাষা প্রয়োগ বোধকরি একমাত্র বঙ্গবন্ধুর মতো ব্যক্তিত্বের পক্ষেই সম্ভব ছিল। স্বাধীন দেশের প্রথম সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংসদ নেতা হিসাবে বঙ্গবন্ধুর সেদিনের ভাষণটি সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য। একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিক হিসাবে, বিশেষ করে গণতান্ত্রিক রীতিনীতির চর্চা ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই হয়তো বঙ্গবন্ধু এতসব কথা বলেছিলেন।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে সমবেত লাখ লাখ জনতার সমাবেশে বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত ঐতিহাসিক ভাষণটি আমাদের মুক্তিসংগ্রাম এবং জাতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে রয়েছে। আর কোনো বাঙালি রাজনীতিক বক্তৃতা বা অন্য কোনো সাংগঠনিক কর্মতৎপরতার মাধ্যমে বাংলা ভাষাভাষী বিপুল জনগোষ্ঠীর মাঝে এমন জাগরণ সৃষ্টি করতে পারেননি। ভাষণটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, বঙ্গবন্ধু সেদিন জনগণের উদ্দেশে স্বাধীনতা সংগ্রামের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ এবং রাজনীতিকদের জন্য অনুসরণযোগ্য কিছু বিষয়ও উল্লেখ করেছিলেন। যেমন ধরা যাক জুলফিকার আলী ভুট্টো ও ইয়াহিয়া খানের কথা। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান, পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল টিক্কা খান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের মতো ব্যক্তিরা ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জন পর্যন্ত, এমনকি বিজয় অর্জনের পরও ঘৃণ্য ও ন্যক্কারজনক ভূমিকা পালন করেছেন। এ কারণে পরবর্তীকালে কোনো আলাপ-আলোচনায় কখনো তাদের নাম, বিশেষ করে ইয়াহিয়া-ভুট্টোর প্রসঙ্গ এলে সেসব নাম সেভাবেই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উচ্চারণ করেছেন এ দেশের সাধারণ মানুষ। এও এক বাস্তবতা। কিন্তু এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিনয় ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারের কথা একটুও বিস্মৃত হননি। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে পাকিস্তানি শাসক-শোষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অনেক কড়া কড়া কথা বলে তিনি তাদের হুশিয়ার করে দেন। লক্ষ করলে বোঝা যাবে, এ অভূতপূর্ব ভাষণে বঙ্গবন্ধু মোট তিনবার ইয়াহিয়া খানের নামটি উচ্চারণ করেছেন। এ সময় কখনো তিনি ইয়াহিয়া খানকে উপযুক্ত সম্মান দিতে কার্পণ্য করেননি। ‘ইয়াহিয়া খান সাহেব’, ‘প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাহেব’ এবং ‘জেনারেল ইয়াহিয়া খান সাহেব’-ঠিক এভাবেই ইয়াহিয়ার নামটি উল্লেখ করেন বঙ্গবন্ধু। এ ছাড়া ওই ভাষণে মোট দুবার উচ্চারিত ভুট্টোর নামটিও তিনি উল্লেখ করেন ‘ভুট্টো সাহেব’ বলে।

গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও সহনশীলতার আরও দৃষ্টান্ত রয়েছে ৭ মার্চের ভাষণে। যেমন, ‘তিনি (ইয়াহিয়া খান) বললেন, প্রথম সপ্তাহে, মার্চ মাসে সভা হবে। আমি বললাম ঠিক আছে, আমরা অ্যাসেম্বলিতে বসব। আমি বললাম অ্যাসেম্বলির মধ্যে আলোচনা করব, এমনকি আমি এ পর্যন্তও বললাম, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও, একজনও যদি সে হয়, তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব ...।’

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সারদা পুলিশ একাডেমি পরিদর্শনে গেছেন। সঙ্গে ছিলেন একাডেমির প্রধান এবিএম গোলাম কিবরিয়া আর আব্দুল খালেক আইজিপি (১৭ এপ্রিল ১৯৭১-২৭ এপ্রিল ১৯৭৩)। উৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তাদের কেউ কেউ আইজিপিকে বললেন, বঙ্গবন্ধুকে একটু স্মরণ করিয়ে দেওয়া দরকার যে, কিবরিয়া সাহেব মুসলিম লীগের নেতা নূরুল আমিনের মেয়েজামাই। আইজিপি বঙ্গবন্ধুকে কথাটি বলার পর বঙ্গবন্ধু বললেন, কিবরিয়া যে নূরুল আমিন সাহেবের মেয়েজামাই তা আমি জানি। তার সব জামাইকেই আমি চিনি। বঙ্গবন্ধু সারদা অনুষ্ঠানে গিয়ে কিবরিয়াকে সস্নেহে কাছে ডেকে জানতে চাইলেন তার বউ-ছেলেমেয়ে কেমন আছে। এক কথাতেই কিবরিয়ার সব শঙ্কা দূর হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু মানুষের মনস্তত্ত্ব ভালো বুঝতেন।

নিয়তির পরিহাস। জাতির দায়িত্বভার কাঁধে নেওয়ার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট একদল নরপশু রাতের আঁধারে তার ঐতিহাসিক বত্রিশ নম্বরের বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালিয়ে নৃশংসভাবে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে গোটা জাতির ললাটে দুরপনেয় কালিমা লেপে দেয়। এভাবে বঙ্গবন্ধুর মতো এক মহৎ হৃদয়ের জীবনাবসান ঘটে।

বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে আমরা কতটুকুই বা জানি। এ নিবন্ধে তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের দু-একটি ছিটেফোঁটা বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র। জাতির চরম সংকট, নিজের শত কর্মব্যস্ততা এবং আবেগের মুহূর্তটিতেও রাজনৈতিক শিষ্টাচার, গণতান্ত্রিক রীতিনীতি এবং সাধারণ সৌজন্যবোধ প্রদর্শনের বিষয়টি তিনি বিস্মৃত হতেন না। বঙ্গবন্ধুর এসব গুণ-বৈশিষ্ট্য দেশের রাজনীতিকদের জন্য অনুসরণীয় বৈকি।

বিমল সরকার : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন