বঙ্গবন্ধু হত্যা ও আজকের বাংলাদেশ
jugantor
বঙ্গবন্ধু হত্যা ও আজকের বাংলাদেশ

  ড. মো. কামরুজ্জামান  

১৬ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্তভাবে স্বাধীনতা অর্জন করে। আর এ জয়ের মহানায়ক ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি বাহিনী এ মহানায়ককে বন্দি করে পাকিস্তানে নিয়ে যায়। ১০ জানুয়ারি তিনি কারগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। দেশে প্রত্যাবর্তন করে তিনি ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর আসন অলংকৃত করেন। প্রধানমন্ত্রিত্ব লাভের পর তিনি সদ্যস্বাধীন রাষ্ট্রে প্রথম মন্ত্রিসভা গঠন করেন। মন্ত্রিসভা গঠনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম সংসদীয় সরকারের যাত্রা শুরু হয়।

দেশের শাসনভার গ্রহণ ও মন্ত্রিসভা গঠনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু দেশ পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করেন। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধে বাংলাদেশ একটি বিধ্বস্ত ভূমিতে পরিণত হয়েছিল। তিনি এ বিধ্বস্ত ভূমিকে ‘মানব ইতিহাসের জঘন্যতম ধ্বংসযজ্ঞ’ বলে অভিহিত করেন। তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধে ৩০ লাখ শহিদ ও ২ লাখ নারী নির্যাতিত হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। সদ্যস্বাধীন বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠন করতে তিনি তার সব মেধা ও শ্রম বিনিয়োগ করেন। বিংশ শতাব্দীতে হাতেগোনা যে কজন মহানায়ক নিপীড়িত মানুষের মুক্তির জন্য পৃথিবীতে অমরত্ব লাভ করেছেন, তাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর নামটি অন্যতম। ক্ষণজন্মা ওইসব মহাবীরের নামের পাশে বঙ্গবন্ধুর নামটি জ্বলজ্বল করে ভাসছে। কেউ শত অপচেষ্টা করেও এ নামটি কখনো মুছতে পারবে না। শেখ মুজিবুর রহমান কেবল একজন ব্যক্তির নাম নয়, তিনি নিজেই এক অনন্যসাধারণ ব্যতিক্রমী ইতিহাস। সমাজ, দেশ ও কালের প্রেক্ষাপটে তিনি ব্যক্তি মুজিব থেকে হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক নেতা থেকে হয়ে ওঠেন ইতিহাসের মহানায়ক। দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের নেপথ্যের কারিগর বঙ্গবন্ধুর ডাকেই সমগ্র বাঙালি জাতি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্বাধীনতাযুদ্ধে। তার হাত ধরেই ১৯৭১ সালে বিশ্বের মানচিত্রে প্রথমবারের মতো অঙ্কিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে তার নাম লেখা হয়ে যায় স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতিরূপে।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব। তাকে বাংলাদেশের জাতির পিতা বলা হয়। তাকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসাবে বিবেচনা করা হয়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ-নির্বিশেষে সবার জন্যই বঙ্গবন্ধু হতে পেরেছিলেন জননেতা। হয়ে উঠেছিলেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা। তিনি ছিলেন হিমালয়তুল্য এক অনন্য উঁচু ব্যক্তিত্বের অধিকারী। কিউবার কিংবদন্তি বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো তাই বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, তবে শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসে মানুষটি ছিলেন হিমালয়সমান। সুতরাং আমি হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা লাভ করি।’

বঙ্গবন্ধু ছিলেন জনদরদি এক সংগ্রামী নেতা। তিনি তার সারাটা জীবন বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনে ব্যয় করেছেন। এ আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে তাকে ১৩ বছর জেল খাটতে হয়েছে। অথচ তারই প্রাণ কেড়ে নেয় ঘাতকের ১৮টি নির্মম বুলেট। নির্মম বুলেটের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় বঙ্গবন্ধুর সুগঠিত দেহ। শুধু তাকেই হত্যা করা হয়নি; হত্যা করা হয়েছে তার সঙ্গে পরিবারের মোট ১৮ জন সদস্যকে। অবশ্য ঘাতক দূরের কেউ ছিল না। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক গঠিত মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে পরিচালিত হয় নির্মম এ হত্যাকাণ্ড। বিপথগামী কতিপয় সেনাসদস্য মেতে ওঠে উন্মত্ত পৈশাচিকতায়। আর এ পৈশাচিকতার নির্মম বলি হন বাংলার ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। হঠাৎই যবনিকাপাত ঘটে যায় একটি জীবন্ত ইতিহাসের। মোশতাকের প্রত্যক্ষ মদদে পরিচালিত হয় রাষ্ট্রীয় রাইফেলের ১৮ রাউন্ড গুলি। আর তাতেই ঝাঁজরা হয়ে যায় বঙ্গবন্ধুর সুঠাম দেহ। রক্তাক্ত সিঁড়িতে পড়ে থাকে বঙ্গবন্ধুর নিথর দেহ। স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় বাংলার মহানায়কের অপমৃত্যু ঘটে। জঘন্য এ পৈশাচিকতায় গোটা বিশ্বে নেমে আসে শোকের ছায়া। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে প্রচণ্ড ঘৃণার ঝড়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর নোবেলজয়ী পশ্চিম জার্মানির নেতা উইলি ব্রানডিট বলেন, ‘মুজিবকে হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না। যে বাঙালি শেখ মুজিবকে হত্যা করতে পারে, তারা যে কোনো জঘন্য কাজ করতে পারে।’ ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক নীরদ শ্রী চৌধুরী বাঙালিদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসাবে বর্ণনা করে বলেন, ‘বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি বিশ্বের মানুষের কাছে নিজেদের আত্মঘাতী চরিত্রই তুলে ধরেছে।’ দ্য টাইমস অব লন্ডনের ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট সংখ্যায় উল্লেখ করা হয়-‘বঙ্গবন্ধুকে সব সময় স্মরণ করা হবে। কারণ, তাকে ছাড়া বাংলাদেশের বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নেই।’ একই দিন লন্ডন থেকে প্রকাশিত ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় বলা হয়, ‘বাংলাদেশের লাখ লাখ লোক শেখ মুজিবের জঘন্য হত্যাকাণ্ডকে অপূরণীয় ক্ষতি হিসাবে বিবেচনা করবে।’

বঙ্গবন্ধুর হত্যার সঙ্গে বিশ্বসেরা কয়েকজন রাষ্ট্রনায়কের হত্যার বড় অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস। জোটনিরপেক্ষ (ন্যাম) শীর্ষ সম্মেলন। ভেন্যু আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্স। উপস্থিত হন সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের গর্বিত স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেখানে আরও উপস্থিত ছিলেন সৌদি আরবের কিং ফয়সাল, মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত, ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাত, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট কর্নেল গাদ্দাফি। তারা ছিলেন নিজ নিজ দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়ক। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এসব নেতাকেই ঘাতকের নির্মম আঘাতে নিহত হতে হয়েছে। ১৯৭৫ সালে কিং ফয়সাল ঘাতকের হাতে নিহত হন। ঘাতক দূরের কেউ ছিল না। আপনজনের হাতেই তিনি নিহত হন। আনোয়ার সাদাত ছিলেন মিসরের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট। ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন মিসরের প্রেসিডেন্ট। ১৯৮১ সালের ৬ অক্টোবর আনোয়ার সাদাত নিজ বাহিনীর সদস্যদের হাতে নিহত হন। সামরিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে ৪ জন সেনা অফিসার তাকে গুলি ও গ্রেনেড ছুড়ে হত্যা করে। ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত ছিলেন সে দেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের নন্দিত নেতা। ২০০৪ সালে ৭৫ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তাকে বিষপ্রয়োগের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে মর্মে অভিযোগ পাওয়া যায়। মুয়াম্মার আল গাদ্দাফি ছিলেন লিবীয় নেতা। তাকে লৌহমানব বলা হয়ে থাকে। তিনি পাশ্চাত্যের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে দীর্ঘ ৪২ বছর দোর্দণ্ডপ্রতাপের সঙ্গে শাসনকার্য পরিচালনা করেছিলেন। তিনি শতধাবিভক্ত আরববিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা চালান। তার শাসনামলে লিবিয়ায় অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছিল। ২০১১ সালে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক চক্রের হাতে তিনি নিহত হন। ভারতের চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী আর আজ পর্যন্ত ভারতের একমাত্র মহিলা প্রধানমন্ত্রী তিনিই। তিনি ভারতের চারবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৭ সাল এবং ১৯৮০ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ভারতের প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭১ সালে সংঘটিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর নিজ দেহরক্ষীর হাতে তিনি নিহত হন। আর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কতিপয় সামরিক অফিসারের হাতে নিহত হন আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এদিন ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি; তাদের হাতে একে একে প্রাণ দেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা, বঙ্গবন্ধুর তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশু শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল। পৃথিবীর এই ঘৃণ্যতম হত্যাকাণ্ড থেকে বাঁচতে পারেননি বঙ্গবন্ধুর সহোদর শেখ নাসের, ভগ্নীপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, ভাগনে শেখ ফজলুল হক মণি, তার সহধর্মিণী আরজু মণিসহ পরিবারের ১৮ জন সদস্য ও আত্মীয়স্বজন। আরও প্রাণ হারান রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব কর্নেল জামিল।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাংলার ইতিহাসের এক মহান কিংবদন্তি। তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা দেশ ও জাতির জন্য জীবন দিয়ে গেছেন। তিনি সুনীতি, সুশান ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সারাটা জীবন সংগ্রাম করে গেছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি তার জীবনটা বিলিয়ে দিয়ে গেছেন। তিনি মানুষের মাঝে সমতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মহান ব্রত নিয়ে গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু তার অনুপস্থিতিতে সমগ্র বাংলা আজ শতাধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। তার হাতে গড়া বাংলা আজ খুব একটা ভালো নেই। তার রেখে যাওয়া আদর্শ আজ নীরবে নিভৃতে ঢুকরে কেঁদে মরছে। আমরা তার ৪৭তম শাহাদতবার্ষিকী পালন করেছি। তার জন্য আমরা কুরআনখানি ও কাঙালিভোজের আয়োজন করছি। তার জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করছি। হাটে-বাজারে, রাস্তাঘাটে তার উজ্জীবিত ভাষণ প্রচার করছি। কিন্তু সেই আমরাই আজ রাজনীতিকে বড়লোক হওয়ার উপায় বানিয়ে ফেলেছি। রাজনৈতিক নোংরামিতে তরুণ সমাজকে রাজনীতিবিমুখ করে ফেলেছি। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে ফেলেছি। নিজেদের সংশোধন করার পরিবর্তে ক্রমান্বয়ে আমরা অঘোষিত স্বৈরতন্ত্রের দিকে ধাবিত হচ্ছি।

গতকাল দেশে পালিত হয়েছে জাতীয় শোক দিবস। জাতির দুর্ভাগ্য, এ হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হতে সময় গড়িয়েছে দীর্ঘ ৩৪ বছর। যে কোনো খুনকে খুন হিসাবে বিবেচনা করা নৈতিকতার দায়। এ দায়কে সক্রিয় করে জাতীয় চেতনা ও দেশাত্মবোধ সৃষ্টি করতে হবে। শুধু মুখে নয়; বরং কাজ এবং আচরণ দিয়ে সেটা প্রমাণ করতে হবে। স্বাধীনতার মূলনীতিকে সমুন্নত করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর দর্শন ও চেতনাকে লালন করতে হবে। এই দর্শন ও চেতনা হলো সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।

দেশে আগামী ১৫ বছর পর হয়তো রণাঙ্গনে অংশ নেওয়া কোনো মুক্তিযোদ্ধা বেঁচে থাকবেন না। তাই রাষ্ট্রীয় সব অনিয়ম দূর করতে জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের এগিয়ে আসতে হবে। নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতার চেতনায় জাগিয়ে তুলতে হবে। অন্যায়-অবিচার রুখে দিতে হবে। সৃষ্টি করতে হবে একাত্তরের মতো ঐক্য ও সংহতি। তা না হলে স্বাধীনতা বিপন্ন হবে। দেশে সৃষ্টি হবে আরও অনেক কালো অধ্যায়। আর সে অন্ধকার থেকে জাতিকে মুক্ত করা কঠিন হয়ে পড়বে।

ড. মো. কামরুজ্জামান : অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

dr.knzaman@gmail.com

বঙ্গবন্ধু হত্যা ও আজকের বাংলাদেশ

 ড. মো. কামরুজ্জামান 
১৬ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্তভাবে স্বাধীনতা অর্জন করে। আর এ জয়ের মহানায়ক ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি বাহিনী এ মহানায়ককে বন্দি করে পাকিস্তানে নিয়ে যায়। ১০ জানুয়ারি তিনি কারগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। দেশে প্রত্যাবর্তন করে তিনি ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর আসন অলংকৃত করেন। প্রধানমন্ত্রিত্ব লাভের পর তিনি সদ্যস্বাধীন রাষ্ট্রে প্রথম মন্ত্রিসভা গঠন করেন। মন্ত্রিসভা গঠনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম সংসদীয় সরকারের যাত্রা শুরু হয়।

দেশের শাসনভার গ্রহণ ও মন্ত্রিসভা গঠনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু দেশ পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করেন। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধে বাংলাদেশ একটি বিধ্বস্ত ভূমিতে পরিণত হয়েছিল। তিনি এ বিধ্বস্ত ভূমিকে ‘মানব ইতিহাসের জঘন্যতম ধ্বংসযজ্ঞ’ বলে অভিহিত করেন। তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধে ৩০ লাখ শহিদ ও ২ লাখ নারী নির্যাতিত হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। সদ্যস্বাধীন বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠন করতে তিনি তার সব মেধা ও শ্রম বিনিয়োগ করেন। বিংশ শতাব্দীতে হাতেগোনা যে কজন মহানায়ক নিপীড়িত মানুষের মুক্তির জন্য পৃথিবীতে অমরত্ব লাভ করেছেন, তাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর নামটি অন্যতম। ক্ষণজন্মা ওইসব মহাবীরের নামের পাশে বঙ্গবন্ধুর নামটি জ্বলজ্বল করে ভাসছে। কেউ শত অপচেষ্টা করেও এ নামটি কখনো মুছতে পারবে না। শেখ মুজিবুর রহমান কেবল একজন ব্যক্তির নাম নয়, তিনি নিজেই এক অনন্যসাধারণ ব্যতিক্রমী ইতিহাস। সমাজ, দেশ ও কালের প্রেক্ষাপটে তিনি ব্যক্তি মুজিব থেকে হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক নেতা থেকে হয়ে ওঠেন ইতিহাসের মহানায়ক। দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের নেপথ্যের কারিগর বঙ্গবন্ধুর ডাকেই সমগ্র বাঙালি জাতি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্বাধীনতাযুদ্ধে। তার হাত ধরেই ১৯৭১ সালে বিশ্বের মানচিত্রে প্রথমবারের মতো অঙ্কিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে তার নাম লেখা হয়ে যায় স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতিরূপে।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব। তাকে বাংলাদেশের জাতির পিতা বলা হয়। তাকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসাবে বিবেচনা করা হয়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ-নির্বিশেষে সবার জন্যই বঙ্গবন্ধু হতে পেরেছিলেন জননেতা। হয়ে উঠেছিলেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা। তিনি ছিলেন হিমালয়তুল্য এক অনন্য উঁচু ব্যক্তিত্বের অধিকারী। কিউবার কিংবদন্তি বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো তাই বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, তবে শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসে মানুষটি ছিলেন হিমালয়সমান। সুতরাং আমি হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা লাভ করি।’

বঙ্গবন্ধু ছিলেন জনদরদি এক সংগ্রামী নেতা। তিনি তার সারাটা জীবন বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনে ব্যয় করেছেন। এ আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে তাকে ১৩ বছর জেল খাটতে হয়েছে। অথচ তারই প্রাণ কেড়ে নেয় ঘাতকের ১৮টি নির্মম বুলেট। নির্মম বুলেটের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় বঙ্গবন্ধুর সুগঠিত দেহ। শুধু তাকেই হত্যা করা হয়নি; হত্যা করা হয়েছে তার সঙ্গে পরিবারের মোট ১৮ জন সদস্যকে। অবশ্য ঘাতক দূরের কেউ ছিল না। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক গঠিত মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে পরিচালিত হয় নির্মম এ হত্যাকাণ্ড। বিপথগামী কতিপয় সেনাসদস্য মেতে ওঠে উন্মত্ত পৈশাচিকতায়। আর এ পৈশাচিকতার নির্মম বলি হন বাংলার ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। হঠাৎই যবনিকাপাত ঘটে যায় একটি জীবন্ত ইতিহাসের। মোশতাকের প্রত্যক্ষ মদদে পরিচালিত হয় রাষ্ট্রীয় রাইফেলের ১৮ রাউন্ড গুলি। আর তাতেই ঝাঁজরা হয়ে যায় বঙ্গবন্ধুর সুঠাম দেহ। রক্তাক্ত সিঁড়িতে পড়ে থাকে বঙ্গবন্ধুর নিথর দেহ। স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় বাংলার মহানায়কের অপমৃত্যু ঘটে। জঘন্য এ পৈশাচিকতায় গোটা বিশ্বে নেমে আসে শোকের ছায়া। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে প্রচণ্ড ঘৃণার ঝড়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর নোবেলজয়ী পশ্চিম জার্মানির নেতা উইলি ব্রানডিট বলেন, ‘মুজিবকে হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না। যে বাঙালি শেখ মুজিবকে হত্যা করতে পারে, তারা যে কোনো জঘন্য কাজ করতে পারে।’ ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক নীরদ শ্রী চৌধুরী বাঙালিদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসাবে বর্ণনা করে বলেন, ‘বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি বিশ্বের মানুষের কাছে নিজেদের আত্মঘাতী চরিত্রই তুলে ধরেছে।’ দ্য টাইমস অব লন্ডনের ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট সংখ্যায় উল্লেখ করা হয়-‘বঙ্গবন্ধুকে সব সময় স্মরণ করা হবে। কারণ, তাকে ছাড়া বাংলাদেশের বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নেই।’ একই দিন লন্ডন থেকে প্রকাশিত ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় বলা হয়, ‘বাংলাদেশের লাখ লাখ লোক শেখ মুজিবের জঘন্য হত্যাকাণ্ডকে অপূরণীয় ক্ষতি হিসাবে বিবেচনা করবে।’

বঙ্গবন্ধুর হত্যার সঙ্গে বিশ্বসেরা কয়েকজন রাষ্ট্রনায়কের হত্যার বড় অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস। জোটনিরপেক্ষ (ন্যাম) শীর্ষ সম্মেলন। ভেন্যু আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্স। উপস্থিত হন সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের গর্বিত স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেখানে আরও উপস্থিত ছিলেন সৌদি আরবের কিং ফয়সাল, মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত, ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাত, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট কর্নেল গাদ্দাফি। তারা ছিলেন নিজ নিজ দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়ক। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এসব নেতাকেই ঘাতকের নির্মম আঘাতে নিহত হতে হয়েছে। ১৯৭৫ সালে কিং ফয়সাল ঘাতকের হাতে নিহত হন। ঘাতক দূরের কেউ ছিল না। আপনজনের হাতেই তিনি নিহত হন। আনোয়ার সাদাত ছিলেন মিসরের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট। ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন মিসরের প্রেসিডেন্ট। ১৯৮১ সালের ৬ অক্টোবর আনোয়ার সাদাত নিজ বাহিনীর সদস্যদের হাতে নিহত হন। সামরিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে ৪ জন সেনা অফিসার তাকে গুলি ও গ্রেনেড ছুড়ে হত্যা করে। ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত ছিলেন সে দেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের নন্দিত নেতা। ২০০৪ সালে ৭৫ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তাকে বিষপ্রয়োগের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে মর্মে অভিযোগ পাওয়া যায়। মুয়াম্মার আল গাদ্দাফি ছিলেন লিবীয় নেতা। তাকে লৌহমানব বলা হয়ে থাকে। তিনি পাশ্চাত্যের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে দীর্ঘ ৪২ বছর দোর্দণ্ডপ্রতাপের সঙ্গে শাসনকার্য পরিচালনা করেছিলেন। তিনি শতধাবিভক্ত আরববিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা চালান। তার শাসনামলে লিবিয়ায় অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছিল। ২০১১ সালে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক চক্রের হাতে তিনি নিহত হন। ভারতের চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী আর আজ পর্যন্ত ভারতের একমাত্র মহিলা প্রধানমন্ত্রী তিনিই। তিনি ভারতের চারবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৭ সাল এবং ১৯৮০ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ভারতের প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭১ সালে সংঘটিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর নিজ দেহরক্ষীর হাতে তিনি নিহত হন। আর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কতিপয় সামরিক অফিসারের হাতে নিহত হন আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এদিন ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি; তাদের হাতে একে একে প্রাণ দেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা, বঙ্গবন্ধুর তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশু শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল। পৃথিবীর এই ঘৃণ্যতম হত্যাকাণ্ড থেকে বাঁচতে পারেননি বঙ্গবন্ধুর সহোদর শেখ নাসের, ভগ্নীপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, ভাগনে শেখ ফজলুল হক মণি, তার সহধর্মিণী আরজু মণিসহ পরিবারের ১৮ জন সদস্য ও আত্মীয়স্বজন। আরও প্রাণ হারান রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব কর্নেল জামিল।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাংলার ইতিহাসের এক মহান কিংবদন্তি। তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা দেশ ও জাতির জন্য জীবন দিয়ে গেছেন। তিনি সুনীতি, সুশান ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সারাটা জীবন সংগ্রাম করে গেছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি তার জীবনটা বিলিয়ে দিয়ে গেছেন। তিনি মানুষের মাঝে সমতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মহান ব্রত নিয়ে গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু তার অনুপস্থিতিতে সমগ্র বাংলা আজ শতাধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। তার হাতে গড়া বাংলা আজ খুব একটা ভালো নেই। তার রেখে যাওয়া আদর্শ আজ নীরবে নিভৃতে ঢুকরে কেঁদে মরছে। আমরা তার ৪৭তম শাহাদতবার্ষিকী পালন করেছি। তার জন্য আমরা কুরআনখানি ও কাঙালিভোজের আয়োজন করছি। তার জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করছি। হাটে-বাজারে, রাস্তাঘাটে তার উজ্জীবিত ভাষণ প্রচার করছি। কিন্তু সেই আমরাই আজ রাজনীতিকে বড়লোক হওয়ার উপায় বানিয়ে ফেলেছি। রাজনৈতিক নোংরামিতে তরুণ সমাজকে রাজনীতিবিমুখ করে ফেলেছি। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে ফেলেছি। নিজেদের সংশোধন করার পরিবর্তে ক্রমান্বয়ে আমরা অঘোষিত স্বৈরতন্ত্রের দিকে ধাবিত হচ্ছি।

গতকাল দেশে পালিত হয়েছে জাতীয় শোক দিবস। জাতির দুর্ভাগ্য, এ হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হতে সময় গড়িয়েছে দীর্ঘ ৩৪ বছর। যে কোনো খুনকে খুন হিসাবে বিবেচনা করা নৈতিকতার দায়। এ দায়কে সক্রিয় করে জাতীয় চেতনা ও দেশাত্মবোধ সৃষ্টি করতে হবে। শুধু মুখে নয়; বরং কাজ এবং আচরণ দিয়ে সেটা প্রমাণ করতে হবে। স্বাধীনতার মূলনীতিকে সমুন্নত করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর দর্শন ও চেতনাকে লালন করতে হবে। এই দর্শন ও চেতনা হলো সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।

দেশে আগামী ১৫ বছর পর হয়তো রণাঙ্গনে অংশ নেওয়া কোনো মুক্তিযোদ্ধা বেঁচে থাকবেন না। তাই রাষ্ট্রীয় সব অনিয়ম দূর করতে জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের এগিয়ে আসতে হবে। নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতার চেতনায় জাগিয়ে তুলতে হবে। অন্যায়-অবিচার রুখে দিতে হবে। সৃষ্টি করতে হবে একাত্তরের মতো ঐক্য ও সংহতি। তা না হলে স্বাধীনতা বিপন্ন হবে। দেশে সৃষ্টি হবে আরও অনেক কালো অধ্যায়। আর সে অন্ধকার থেকে জাতিকে মুক্ত করা কঠিন হয়ে পড়বে।

ড. মো. কামরুজ্জামান : অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

dr.knzaman@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন