কমিশন গঠন করে পরিকল্পনাকারীদের খুঁজে বের করা জরুরি: ব্যারিস্টার ইমতিয়াজ উদ্দিন আহমেদ আসিফ
jugantor
সাক্ষাৎকার
কমিশন গঠন করে পরিকল্পনাকারীদের খুঁজে বের করা জরুরি: ব্যারিস্টার ইমতিয়াজ উদ্দিন আহমেদ আসিফ

  শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার  

১৬ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে আইন বিশেষজ্ঞদের যে শক্তিশালী টিম কাজ করেছে, সে টিমের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য ছিলেন ব্যারিস্টার ইমতিয়াজ উদ্দিন আহমেদ আসিফ। চট্টগ্রামের চন্দনাইশের বাসিন্দা সাবেক সংসদ-সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার আফসার উদ্দিন আহমেদের ছেলে তিনি। অ্যাডভোকেট আনিসুল হকের (বর্তমানে আইনমন্ত্রী) জুনিয়র হিসাবে থাকার সুবাদে তিনি ২০০৬ সালে এ মামলা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হন। রায় হওয়া পর্যন্ত সার্বক্ষণিকভাবে এ মামলার কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। ঐতিহাসিক এ মামলা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত থাকাটাকে নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন বলে মনে করেন এ আইনজীবী। তবে তিনি মনে করেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে যারা সরাসরি জড়িত ছিল, মামলায় তাদের বিচার হয়েছে; কিন্তু যারা পরিকল্পনাকারী ছিলেন, যারা এখনো দম্ভ করে বেড়ান জিয়াউর রহমান ও তার পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসাবে, তাদের খুঁজে বের করা উচিত। প্রয়োজনে কমিশন গঠনের মাধ্যমে তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে; তবেই জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার যে কলঙ্কতিলক বাঙালির কপালে লেগে আছে, তা পুরোপুরি মুছবে বলে মনে করেন এ আইনজীবী। চট্টগ্রাম থেকে একমাত্র আইনজীবী, যিনি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা পরিচালনার সঙ্গে শেষ পর্যন্ত যুক্ত ছিলেন-ওই মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে তার অভিজ্ঞতা, অর্জনসহ বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার

যুগান্তর : বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা পরিচালনার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হলেন?

ব্যারিস্টার আসিফ : ২০০৬ সাল থেকে আনিসুল হকের জুনিয়র হিসাবে কাজ করতাম। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭-এ যখন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার লিভ টু আপিল শুনানি শুরু হলো, তখন কোনো রকম অফিসিয়ালি নিয়োগ ছাড়াই এ মামলার সঙ্গে যুক্ত হই। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের এই জঘন্য হত্যা, যা বাংলার ইতিহাসের একটি স্থায়ী কালো দাগ, সেই হত্যার বিচারের সঙ্গে যুক্ত হতে অফিসিয়াল চিঠির অপেক্ষা করিনি। যার সর্বোচ্চ ত্যাগের কারণে বাংলাদেশ, সেই মহামানবের হত্যার বিচারের মামলায় কাজ করা একজন বাংলাদেশি হিসাবে আমার কর্তব্য। তবে ২০০৯ সালে আপিল বিভাগে পূর্ণাঙ্গ শুনানির সময় স্পেশাল র‌্যাঙ্ক-জি হিসাবে অফিসিয়ালি সরকারিভাবে নিয়োগ পাই।

যুগান্তর : টিমের নেতৃত্বে কে কে ছিলেন; আপনার দায়িত্ব কী ছিল?

ব্যারিস্টার আসিফ : আমাদের টিমের প্রধান এবং নেতৃত্বে ছিলেন বর্তমান আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। এছাড়া টিমের অন্যতম সদস্য ছিলেন বর্তমান রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসসহ অনেকে। তবে আমি ছিলাম টিমের সর্বকনিষ্ট সদস্য এবং আমার জানামতে, চট্টগ্রাম থেকে আমি ছিলাম এ মামলার আইনজীবী প্যানেলের একমাত্র সদস্য।

আপিল বিভাগে শুনানি শুরু হয় ৫ অক্টোবর ২০০৯ এবং ২৯ কার্যদিবস ধরে শুনানি হয়। ২৯ দিন শুনানির পর মাননীয় আপিল বিভাগ আসামিদের আপিল খারিজ করে চূড়ান্ত রায় দেন এবং ১২ জনের ফাঁসির আদেশ দেন। বিচার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতিদিন শুনানির পর পরের দিনের জন্য আমরা রাতে মামলার জন্য রিসার্চ এবং সাবমিশন তৈরি করতাম। এমনও হয়েছে, রিসার্চ করে সাবমিশন তৈরি করতে করতে ভোর ৪টা হয়ে যেত। পরের দিন ঠিক সকাল ৮টায় সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে হাজির হতাম। যেহেতু বাংলাদেশে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে সিনিয়র আইনজীবীরা মূলত সাবমিশন দেন; আমার কাজ ছিল মামলার সব রিসার্চ, কেস-রেকর্ডের ব্যাপারে পূর্ণ জ্ঞান রাখা, যাতে তাৎক্ষণিকভাবে মাননীয় বিচারপতিদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায়। এছাড়া কোর্টের কাছে পেশ করার জন্য সব সাবমিশন আনিসুল হক স্যারের পরামর্শ মোতাবেক তৈরি করাই ছিল অন্যতম কাজ।

যুগান্তর : মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন কি না?

ব্যারিস্টার আসিফ : বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক মামলা। এ মামলা থেকে বড় কোনো মামলা কেবল আমার জীবনে নয়, বাংলাদেশে কোনো আইনজীবীর জীবনেই আসবে না। জাতির পিতার হত্যা মামলায় সম্পৃক্ত হতে পেরেছি-নিজের কাছে এটাই ছিল আমার জীবনের সর্বোচ্চ অর্জন। আইনের দিক থেকে বললে বলতে হবে, ফৌজদারি আইনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু এ মামলায় জড়িত ছিল। তাই আমাদের টিমের লক্ষ্য ছিল, আসামিপক্ষ যেসব গ্রাউন্ডে আপিল করেছে, সেসব গ্রাউন্ড খণ্ডনের জন্য আমাদের উপমহাদেশসহ ইংল্যান্ডের কোর্টে যে কেস ল (case law) আছে, সেগুলোর ব্যাপারে অবহিত থাকা এবং মাননীয় বিচারপতিদের বিবেচনার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ পিকচার দাখিল করা। কারণ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সব সময় চেয়েছেন একটি ন্যায়বিচার। তিনি চাইলে আলাদা ট্রাইব্যুনাল করে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার করতে পারতেন; কিন্তু তিনি সেটি করেননি। তিনি প্রচলিত আইনে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার বিচার চেয়েছেন। তাই আমরাও আমাদের সাবমিশনে কোনো রকম ফাঁক-ফোকর বা ত্রুটি রাখতে চাইনি। আমরা কিছু কিছু ইস্যুতে ২০০-২৫০ বছর অর্থাৎ ১৮০০ সালের ‘কেস ল’ মহামান্য আপিল বিভাগে দাখিল করি।

যুগান্তর : মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের হুমকিধমকি বা ভয়ভীতি তাড়া করেছিল কি না কিংবা ঝুঁকি মনে করেছিলেন কি না?

ব্যারিস্টার আসিফ : বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা বন্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক এবং দেশের ভেতরে বহু ষড়যন্ত্র হয়েছে। প্রায় ২২ বছর তো ইনডেমনিটি আইনের মতো একটি কালো আইন দিয়ে খুনিদের অব্যাহতি দিয়ে রাখা হয়েছিল। তাই হুমকিধমকি আসবে, সেটা জেনেই মামলা পরিচালনায় একজন কনিষ্ঠ আইনজীবী হয়ে যুক্ত হই। আমার বাবা বঙ্গবন্ধুর ডাকে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা মামলা পরিচালনা করব; এটার জন্য কেউ হুমকিধমকি দেবে-এটা আমি কেয়ার করিনি। আমাদের টিমের অনেকেই হুমকির শিকার হয়েছেন। তাপস ভাইয়ের ওপর তো বাংলার বাণীর অফিসের বাইরে বোমা হামলা হয়েছে; কিন্তু আমরা পিছপা হইনি। আমার চিন্তা ছিল একটাই-যে দায়িত্ব পেয়েছিলাম, সেটা পূর্ণ নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে পারছি কি না।

যুগান্তর : দণ্ডপ্রাপ্ত যেসব আসামি দেশের বাইরে আছে, তাদের আনার প্রক্রিয়া কতদূর? তাদের রায় কার্যকর করতে না পারলে তারা বাইরে বসে দেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে কি না?

ব্যারিস্টার আসিফ : আমার জানামতে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো, আইন, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে বাকি ৫ ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত খুনিকে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে, বিভিন্ন দেশের নিজস্ব আইনের কারণে খুনিদের ফিরিয়ে আনাটা সময়সাপেক্ষ হয়ে যাচ্ছে। তবে এটা সত্য, এদের দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর না করলে এরা যে কোনো সময় ছোবল মারতে পারে। তারা দেশের বিরুদ্ধে সব সময়ই ষড়যন্ত্র করে যাবে।

যুগান্তর : বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় সরাসরি জড়িত খুনিদের বিচার হয়েছে, পরিকল্পনাকারীদের কী হবে?

ব্যারিস্টার আসিফ : বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িতদের বিচার হয়েছে; কিন্তু যারা পরিকল্পনাকারী ছিল, অন্তরালে ছিল, তারা বিচারের বাইরে রয়ে গেছে। আমি মনে করি, তাদের নাম উন্মোচন করা এখন সময়ের দাবি। এটা করার জন্য ট্রুথ কমিশনের আদলে একটা কমিশন করে এদের নাম জনসমক্ষে উন্মোচন করা উচিত। তাদের বিচারের মুখোমুখি করা উচিত। আমরা জানি, খন্দকার মোশতাক বা জিয়াউর রহমান জীবিত না থাকার কারণে তাদের মামলার আসামি হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এখনো অনেকে জীবিত আছেন এবং দম্ভ করে বলেন, তারা ঘটনার সময়ও জিয়াউর রহমানের বা জিয়া পরিবারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাদের সঙ্গে পরামর্শ করা ছাড়া জিয়াউর রহমান কোনো সিদ্ধান্ত নিতেন না। ষড়যন্ত্রকারী ও পরিল্পনাকারীদের খুঁজে বের করতে কমিশন গঠনের ব্যাপারে ইতঃপূর্বে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু সেই কমিশন এখনো হয়নি। এটা খুব শিগ্গির গঠন হওয়া দরকার। আমাদের মনে রাখতে হবে, যাদের মাধ্যমে সত্যটা উদ্ঘাটিত হবে, তারা অনেক বয়স্ক এবং তাদের জবানবন্দি সত্য উদ্ঘাটনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এদের জবানবন্দি ছাড়া কমিশন সফলতা পাবে না।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের অন্তরালে কারা ছিল-এটা পরবর্তী প্রজন্মকে আমরা এখনো জানাতে পারিনি। পূর্ণাঙ্গ সত্য জানাতে এবং ভবিষ্যতে ইতিহাস বিকৃত হওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কারণ, পরবর্তী প্রজন্মকে বুঝতে হবে-কেন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল; কারা করেছিল। বিশ্বের অন্য কোনো দেশে এ রকম জঘন্য হত্যাকাণ্ড ঘটেনি-যেখানে শুধু রাষ্ট্রনায়ককে নয়; তার পুরো পরিবারকে হত্যা করা হয়েছে। মহাত্মা গান্ধী হত্যার বিচার করতে লেগেছিল মাত্র ৮ মাস। অথচ সেখানে আমাদের জাতির পিতার হত্যার বিচার করতে লেগেছে ৩৫ বছর; ভাবা যায়? কাজেই এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।

ব্যারিস্টার আসিফ : ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার

কমিশন গঠন করে পরিকল্পনাকারীদের খুঁজে বের করা জরুরি: ব্যারিস্টার ইমতিয়াজ উদ্দিন আহমেদ আসিফ

 শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার 
১৬ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে আইন বিশেষজ্ঞদের যে শক্তিশালী টিম কাজ করেছে, সে টিমের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য ছিলেন ব্যারিস্টার ইমতিয়াজ উদ্দিন আহমেদ আসিফ। চট্টগ্রামের চন্দনাইশের বাসিন্দা সাবেক সংসদ-সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার আফসার উদ্দিন আহমেদের ছেলে তিনি। অ্যাডভোকেট আনিসুল হকের (বর্তমানে আইনমন্ত্রী) জুনিয়র হিসাবে থাকার সুবাদে তিনি ২০০৬ সালে এ মামলা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হন। রায় হওয়া পর্যন্ত সার্বক্ষণিকভাবে এ মামলার কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। ঐতিহাসিক এ মামলা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত থাকাটাকে নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন বলে মনে করেন এ আইনজীবী। তবে তিনি মনে করেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে যারা সরাসরি জড়িত ছিল, মামলায় তাদের বিচার হয়েছে; কিন্তু যারা পরিকল্পনাকারী ছিলেন, যারা এখনো দম্ভ করে বেড়ান জিয়াউর রহমান ও তার পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসাবে, তাদের খুঁজে বের করা উচিত। প্রয়োজনে কমিশন গঠনের মাধ্যমে তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে; তবেই জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার যে কলঙ্কতিলক বাঙালির কপালে লেগে আছে, তা পুরোপুরি মুছবে বলে মনে করেন এ আইনজীবী। চট্টগ্রাম থেকে একমাত্র আইনজীবী, যিনি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা পরিচালনার সঙ্গে শেষ পর্যন্ত যুক্ত ছিলেন-ওই মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে তার অভিজ্ঞতা, অর্জনসহ বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার

যুগান্তর : বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা পরিচালনার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হলেন?

ব্যারিস্টার আসিফ : ২০০৬ সাল থেকে আনিসুল হকের জুনিয়র হিসাবে কাজ করতাম। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭-এ যখন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার লিভ টু আপিল শুনানি শুরু হলো, তখন কোনো রকম অফিসিয়ালি নিয়োগ ছাড়াই এ মামলার সঙ্গে যুক্ত হই। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের এই জঘন্য হত্যা, যা বাংলার ইতিহাসের একটি স্থায়ী কালো দাগ, সেই হত্যার বিচারের সঙ্গে যুক্ত হতে অফিসিয়াল চিঠির অপেক্ষা করিনি। যার সর্বোচ্চ ত্যাগের কারণে বাংলাদেশ, সেই মহামানবের হত্যার বিচারের মামলায় কাজ করা একজন বাংলাদেশি হিসাবে আমার কর্তব্য। তবে ২০০৯ সালে আপিল বিভাগে পূর্ণাঙ্গ শুনানির সময় স্পেশাল র‌্যাঙ্ক-জি হিসাবে অফিসিয়ালি সরকারিভাবে নিয়োগ পাই।

যুগান্তর : টিমের নেতৃত্বে কে কে ছিলেন; আপনার দায়িত্ব কী ছিল?

ব্যারিস্টার আসিফ : আমাদের টিমের প্রধান এবং নেতৃত্বে ছিলেন বর্তমান আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। এছাড়া টিমের অন্যতম সদস্য ছিলেন বর্তমান রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসসহ অনেকে। তবে আমি ছিলাম টিমের সর্বকনিষ্ট সদস্য এবং আমার জানামতে, চট্টগ্রাম থেকে আমি ছিলাম এ মামলার আইনজীবী প্যানেলের একমাত্র সদস্য।

আপিল বিভাগে শুনানি শুরু হয় ৫ অক্টোবর ২০০৯ এবং ২৯ কার্যদিবস ধরে শুনানি হয়। ২৯ দিন শুনানির পর মাননীয় আপিল বিভাগ আসামিদের আপিল খারিজ করে চূড়ান্ত রায় দেন এবং ১২ জনের ফাঁসির আদেশ দেন। বিচার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতিদিন শুনানির পর পরের দিনের জন্য আমরা রাতে মামলার জন্য রিসার্চ এবং সাবমিশন তৈরি করতাম। এমনও হয়েছে, রিসার্চ করে সাবমিশন তৈরি করতে করতে ভোর ৪টা হয়ে যেত। পরের দিন ঠিক সকাল ৮টায় সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে হাজির হতাম। যেহেতু বাংলাদেশে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে সিনিয়র আইনজীবীরা মূলত সাবমিশন দেন; আমার কাজ ছিল মামলার সব রিসার্চ, কেস-রেকর্ডের ব্যাপারে পূর্ণ জ্ঞান রাখা, যাতে তাৎক্ষণিকভাবে মাননীয় বিচারপতিদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায়। এছাড়া কোর্টের কাছে পেশ করার জন্য সব সাবমিশন আনিসুল হক স্যারের পরামর্শ মোতাবেক তৈরি করাই ছিল অন্যতম কাজ।

যুগান্তর : মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন কি না?

ব্যারিস্টার আসিফ : বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক মামলা। এ মামলা থেকে বড় কোনো মামলা কেবল আমার জীবনে নয়, বাংলাদেশে কোনো আইনজীবীর জীবনেই আসবে না। জাতির পিতার হত্যা মামলায় সম্পৃক্ত হতে পেরেছি-নিজের কাছে এটাই ছিল আমার জীবনের সর্বোচ্চ অর্জন। আইনের দিক থেকে বললে বলতে হবে, ফৌজদারি আইনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু এ মামলায় জড়িত ছিল। তাই আমাদের টিমের লক্ষ্য ছিল, আসামিপক্ষ যেসব গ্রাউন্ডে আপিল করেছে, সেসব গ্রাউন্ড খণ্ডনের জন্য আমাদের উপমহাদেশসহ ইংল্যান্ডের কোর্টে যে কেস ল (case law) আছে, সেগুলোর ব্যাপারে অবহিত থাকা এবং মাননীয় বিচারপতিদের বিবেচনার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ পিকচার দাখিল করা। কারণ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সব সময় চেয়েছেন একটি ন্যায়বিচার। তিনি চাইলে আলাদা ট্রাইব্যুনাল করে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার করতে পারতেন; কিন্তু তিনি সেটি করেননি। তিনি প্রচলিত আইনে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার বিচার চেয়েছেন। তাই আমরাও আমাদের সাবমিশনে কোনো রকম ফাঁক-ফোকর বা ত্রুটি রাখতে চাইনি। আমরা কিছু কিছু ইস্যুতে ২০০-২৫০ বছর অর্থাৎ ১৮০০ সালের ‘কেস ল’ মহামান্য আপিল বিভাগে দাখিল করি।

যুগান্তর : মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের হুমকিধমকি বা ভয়ভীতি তাড়া করেছিল কি না কিংবা ঝুঁকি মনে করেছিলেন কি না?

ব্যারিস্টার আসিফ : বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা বন্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক এবং দেশের ভেতরে বহু ষড়যন্ত্র হয়েছে। প্রায় ২২ বছর তো ইনডেমনিটি আইনের মতো একটি কালো আইন দিয়ে খুনিদের অব্যাহতি দিয়ে রাখা হয়েছিল। তাই হুমকিধমকি আসবে, সেটা জেনেই মামলা পরিচালনায় একজন কনিষ্ঠ আইনজীবী হয়ে যুক্ত হই। আমার বাবা বঙ্গবন্ধুর ডাকে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা মামলা পরিচালনা করব; এটার জন্য কেউ হুমকিধমকি দেবে-এটা আমি কেয়ার করিনি। আমাদের টিমের অনেকেই হুমকির শিকার হয়েছেন। তাপস ভাইয়ের ওপর তো বাংলার বাণীর অফিসের বাইরে বোমা হামলা হয়েছে; কিন্তু আমরা পিছপা হইনি। আমার চিন্তা ছিল একটাই-যে দায়িত্ব পেয়েছিলাম, সেটা পূর্ণ নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে পারছি কি না।

যুগান্তর : দণ্ডপ্রাপ্ত যেসব আসামি দেশের বাইরে আছে, তাদের আনার প্রক্রিয়া কতদূর? তাদের রায় কার্যকর করতে না পারলে তারা বাইরে বসে দেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে কি না?

ব্যারিস্টার আসিফ : আমার জানামতে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো, আইন, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে বাকি ৫ ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত খুনিকে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে, বিভিন্ন দেশের নিজস্ব আইনের কারণে খুনিদের ফিরিয়ে আনাটা সময়সাপেক্ষ হয়ে যাচ্ছে। তবে এটা সত্য, এদের দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর না করলে এরা যে কোনো সময় ছোবল মারতে পারে। তারা দেশের বিরুদ্ধে সব সময়ই ষড়যন্ত্র করে যাবে।

যুগান্তর : বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় সরাসরি জড়িত খুনিদের বিচার হয়েছে, পরিকল্পনাকারীদের কী হবে?

ব্যারিস্টার আসিফ : বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িতদের বিচার হয়েছে; কিন্তু যারা পরিকল্পনাকারী ছিল, অন্তরালে ছিল, তারা বিচারের বাইরে রয়ে গেছে। আমি মনে করি, তাদের নাম উন্মোচন করা এখন সময়ের দাবি। এটা করার জন্য ট্রুথ কমিশনের আদলে একটা কমিশন করে এদের নাম জনসমক্ষে উন্মোচন করা উচিত। তাদের বিচারের মুখোমুখি করা উচিত। আমরা জানি, খন্দকার মোশতাক বা জিয়াউর রহমান জীবিত না থাকার কারণে তাদের মামলার আসামি হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এখনো অনেকে জীবিত আছেন এবং দম্ভ করে বলেন, তারা ঘটনার সময়ও জিয়াউর রহমানের বা জিয়া পরিবারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাদের সঙ্গে পরামর্শ করা ছাড়া জিয়াউর রহমান কোনো সিদ্ধান্ত নিতেন না। ষড়যন্ত্রকারী ও পরিল্পনাকারীদের খুঁজে বের করতে কমিশন গঠনের ব্যাপারে ইতঃপূর্বে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু সেই কমিশন এখনো হয়নি। এটা খুব শিগ্গির গঠন হওয়া দরকার। আমাদের মনে রাখতে হবে, যাদের মাধ্যমে সত্যটা উদ্ঘাটিত হবে, তারা অনেক বয়স্ক এবং তাদের জবানবন্দি সত্য উদ্ঘাটনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এদের জবানবন্দি ছাড়া কমিশন সফলতা পাবে না।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের অন্তরালে কারা ছিল-এটা পরবর্তী প্রজন্মকে আমরা এখনো জানাতে পারিনি। পূর্ণাঙ্গ সত্য জানাতে এবং ভবিষ্যতে ইতিহাস বিকৃত হওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কারণ, পরবর্তী প্রজন্মকে বুঝতে হবে-কেন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল; কারা করেছিল। বিশ্বের অন্য কোনো দেশে এ রকম জঘন্য হত্যাকাণ্ড ঘটেনি-যেখানে শুধু রাষ্ট্রনায়ককে নয়; তার পুরো পরিবারকে হত্যা করা হয়েছে। মহাত্মা গান্ধী হত্যার বিচার করতে লেগেছিল মাত্র ৮ মাস। অথচ সেখানে আমাদের জাতির পিতার হত্যার বিচার করতে লেগেছে ৩৫ বছর; ভাবা যায়? কাজেই এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।

ব্যারিস্টার আসিফ : ধন্যবাদ।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন