ক্রীড়াঙ্গনে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার
jugantor
ক্রীড়াঙ্গনে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার

  মোহাম্মদ সরওয়ার আলম চৌধুরী মনি  

১৬ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গতকাল ছিল ১৫ আগস্ট। প্রত্যেক বাঙালির হৃদয়ে রক্তক্ষরণের দিন। বাঙালি হারায় তাদের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। এদিন বাংলাদেশে সংঘটিত হয়েছে ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। ঘাতকের বুলেট বিদ্ধ করে কালজয়ী মানুষ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে। বিদ্ধ হয় গোটা বাঙালি, স্বাধীন বাংলাদেশ। রচিত হয় পৃথিবীর এ যাবৎকালের সবচেয়ে ঘৃণ্য ও জঘন্যতম ইতিহাস। স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে মানবতার শত্রু প্রতিক্রিয়াশীল ঘাতক চক্রের হাতে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। তিনি ছিলেন পরাধীন বাঙালি জাতির মুক্তি আন্দোলনের মহানায়ক, বিশ্বের লাঞ্ছিত-বঞ্চিত-নিপীড়িত মানুষের মহান নেতা, বাংলা ও বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান, বাঙালির প্রেরণার চিরন্তন উৎস ও অবিসংবাদিত নেতা।

বাংলার মানুষের ভাগ্যোন্ননের জন্য যিনি রাজনীতি বেছে নিয়েছেন, সেই মহৎ মানুষটি এবং তার পরিবারের সদস্যদের রয়েছে ক্রীড়াঙ্গনে বর্ণাঢ্য পদচারণা। রয়েছে স্বর্ণোজ্জ্বল অতীত, রয়েছে ক্রীড়ার প্রতি অনুরাগ আর অবদানের অসংখ্য স্বাক্ষর। বঙ্গবন্ধুর পরিবার এদেশের ক্রীড়াঙ্গনের বাতিঘর। বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান ছিলেন একজন পরিচিত ফুটবলার। পেশাগত জীবনে সেরেস্তাদার হলেও খেলাধুলার প্রতি ছিল বিশেষ অনুরাগ। তিনি গোপালগঞ্জ অফিসার্স ক্লাব ফুটবল টিমের অধিনায়ক ছিলেন। তিনি ক্লাবটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পিতার পথ ধরে বঙ্গবন্ধু স্কুলজীবনে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলের অধিনায়ক ছিলেন। বঙ্গবন্ধু ফুটবল, হকি ও ভলিবল খেলতেন। চল্লিশের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের যখন রমরমা অবস্থা, তখন বঙ্গবন্ধু এ ক্লাবের হয়েই ফুটবল মাঠ মাতিয়েছেন। তিনি ফুটবল খেলতেন স্ট্রাইকার পজিশনে। ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৪১ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত তিনি ফুটবল খেলেছেন ওয়ান্ডারার্সের হয়েই। অধিনায়কের দায়িত্বও পালন করেন। তার নেতৃত্বেই তখন ওয়ান্ডারার্স ক্লাব বগুড়ায় অনুষ্ঠিত একটি গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টের শিরোপা জয় করে। তিনি ধানমন্ডি ক্লাবেরও প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ফুটবলের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অনুরাগের কারণেই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠিত হয়েছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ভূমিকা আজও স্মরণীয়।

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ফুটবল ম্যাচ হয় ১৯৭২ সালে ১৩ ফেব্রুয়ারি। বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছায় স্বাধীনতাকামী ফুটবলারদের নিয়ে ঢাকা স্টেডিয়ামে এদিন একটি প্রদর্শনী ম্যাচের আয়োজন করা হয়। খেলায় মুজিবনগর একাদশ ও প্রেসিডেন্ট একাদশ অংশ নেয়। ম্যাচটি স্টেডিয়ামে উপস্থিত থেকে সরাসরি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপভোগ করেন। ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে কলকাতার মোহনবাগান দল এবং ১৯৭৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের মিন্সক ডায়নামো ক্লাব ঢাকা খেলতে এলেও খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।

ক্রীড়া অনুরাগী ছিলেন বিধায় বঙ্গবন্ধু নিজে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তদারকি করতেন। ফুটবলের উন্নতিকল্পে তিনি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন প্রতিষ্ঠা করেন। ফুটবলই নয়, দেশের অন্য সব খেলার প্রতি তিনি সচেতন ছিলেন। ’৭২ সালে তার উদ্যোগে বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড গঠিত হয়। এটির বর্তমান রূপ ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড’। একই বছর বাংলাদেশ ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। যার বর্তমান নাম ‘জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ’। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পরিচালিত এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত এই ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থা। এটি নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতাধীন ৫৩টি ভিন্ন ভিন্ন খেলাধুলাবিষয়ক সংস্থাকে। ১৯৭৪ সালে তিনি ‘বাংলাদেশ স্পোটর্স কাউন্সিল অ্যাক্ট’ পাশ করেন। ১৯৭৫ সালের ৬ আগস্ট ‘বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবী কল্যাণ ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অনুমোদন করেন। উদ্দেশ্য ক্রীড়া, খেলাধুলা ও শরীরচর্চার ক্ষেত্রে যারা বিশেষ অবদান রেখেছেন বা রাখছেন তাদের এবং তাদের পরিবারের কল্যাণ।

বঙ্গবন্ধু নিজে যেমন খেলাধুলা পছন্দ করতেন, তেমনই সবাইকে খেলাধুলার প্রতি উৎসাহ জোগাতেন। আজকের যে কলাবাগান মাঠ, স্বাধীনতার আগে সেটা ছিল সিএন্ডবির ডিপো। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টি পড়েছিল সেখানে। বঙ্গবন্ধু স্থানীয় কজনকে ডেকে বললেন, ‘তোরা এখানে খেলাধুলা করিস না ক্যান?’ সেই সময় ডলফিন কোচের স্বত্বাধিকারী ফজলুর রহমান রাজ, মরহুম রাশেদ মোশারফ, জালাল মেম্বার, হেলালউদ্দিন, বাবু প্রমুখ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করলেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ডিপো সরিয়ে নেওয়ার পর তার আর্থিক অনুদান এবং অনুপ্রেরণায় কলাবাগান মাঠ সংস্কার করা হয়। ১৯৭২ সালে শেখ কামাল ও শেখ জামাল মাঝে মাঝে এই মাঠে ফুটবল খেলতে আসতেন। ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরের কোনো একদিন বঙ্গবন্ধু নিজেই মাঠে নেমে পড়েছিলেন ফুটবল খেলার জন্য।

একটি পরিবারের বাবা যদি ক্রীড়াবিদ ও ক্রীড়ানুরাগী হন, তাহলে পরিবারের অন্য সদস্যরাও সে পথেই হাঁটবেন, এটাই স্বাভাবিক। বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথই অনুসরণ করে গেছেন তার দুই ছেলে শেখ কামাল ও শেখ জামাল। এ দুই ভাইয়ের মধ্যে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন শেখ কামাল। তিনি ফুটবল, ক্রিকেট ও বাস্কেটবল তিনটি খেলাতেই সমান পারদর্শী ছিলেন। তবে ফুটবলে আনুষ্ঠানিকভাবে লিগে না খেললেও আবাহনীর হয়ে তিনি ক্রিকেট খেলেছেন। ক্রিকেটের মাঠে একজন দক্ষ অফ স্পিনার হিসাবে তার যথেষ্ট সুনাম ছিল। আর বাস্কেটবল খেলেছেন ঢাকা ওয়ান্ডারার্সের হয়ে। তার অধিনায়কত্বে ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে বাস্কেটবল লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়। মহসীন স্মৃতি ট্রফিও ঢাকা ওয়ান্ডারার্স জয় করে তারই অধিনায়কত্বে। আজকের আবাহনী ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা শেখ কামাল। শুরু থেকে এ ক্লাব শুধু আবাহনী ক্লাব নামে পরিচিত ছিল না। সেই সময় এ ক্লাবের নাম ছিল আবাহনী সমাজ কল্যাণ সমিতি। অনেক চড়াই-উতরাইয়ের পর জন্ম নেয় আবাহনী ক্রীড়া চক্র (বর্তমানে যা আবাহনী লিমিটেড নামে পরিচিত)। শুধু ফুটবল নয়, ক্রীড়াব্যক্তিত্ব শেখ কামাল বাস্কেটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন ও অ্যাথলেটে পারদর্শী ছিলেন। ১৯৭৫ সালে ঢাকা ক্রিকেট লিগে চ্যাম্পিয়ন আবাহনী ক্রীড়া চক্র ও একই বছর বাস্কেটবল লিগে চ্যাম্পিয়ন ঢাকা ওয়ান্ডারার্স দলের খেলোয়াড় ছিলেন শেখ কামাল। সে বছর সলিমুল্লাহ হলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় হয়েছিলেন দ্রুততম মানব। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ব্যাডমিন্টন দ্বৈতে রানার্সআপ হয়েছিলেন। তিনি ঢাকা মেট্রোপলিটন ফুটবল খেলোয়াড় সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বে ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ১৯৭৩ ও ১৯৭৫ সালে বাস্কেটবল লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ক্রিকেটার শেখ কামাল একজন পেস বোলিংয়ের পাশাপাশি ব্যাট হাতেও স্বাক্ষর রেখেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু পরিবারের মধ্যে বেঁচে থাকা দুই মেয়ে শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানাও দারুণ রকম ক্রীড়ানুরাগী। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো সব সময়ই দেশের খেলাধুলার খোঁজ রাখেন। তিনি ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে আপনজন, দায়িত্বশীল অভিভাবক, নিবেদিতপ্রাণ দর্শক, ক্রীড়াঙ্গনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। তিনি এতটাই ক্রীড়াপ্রেমী যে, যেখানে খেলা, শত ব্যস্ততার মাঝেও সেখানেই ছুটে যান। উৎসাহ জোগান লাল-সবুজ ক্রীড়াবিদদের। ক্রীড়াবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্র পরিচালনাকালেই বাংলাদেশে ক্রীড়াঙ্গনে বড় অর্জনগুলো স্পর্শ করেছে।

মোহাম্মদ সরওয়ার আলম চৌধুরী মনি : কাউন্সিলর, চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থা

sarwarmoni71@gmail.com

ক্রীড়াঙ্গনে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার

 মোহাম্মদ সরওয়ার আলম চৌধুরী মনি 
১৬ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গতকাল ছিল ১৫ আগস্ট। প্রত্যেক বাঙালির হৃদয়ে রক্তক্ষরণের দিন। বাঙালি হারায় তাদের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। এদিন বাংলাদেশে সংঘটিত হয়েছে ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। ঘাতকের বুলেট বিদ্ধ করে কালজয়ী মানুষ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে। বিদ্ধ হয় গোটা বাঙালি, স্বাধীন বাংলাদেশ। রচিত হয় পৃথিবীর এ যাবৎকালের সবচেয়ে ঘৃণ্য ও জঘন্যতম ইতিহাস। স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে মানবতার শত্রু প্রতিক্রিয়াশীল ঘাতক চক্রের হাতে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। তিনি ছিলেন পরাধীন বাঙালি জাতির মুক্তি আন্দোলনের মহানায়ক, বিশ্বের লাঞ্ছিত-বঞ্চিত-নিপীড়িত মানুষের মহান নেতা, বাংলা ও বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান, বাঙালির প্রেরণার চিরন্তন উৎস ও অবিসংবাদিত নেতা।

বাংলার মানুষের ভাগ্যোন্ননের জন্য যিনি রাজনীতি বেছে নিয়েছেন, সেই মহৎ মানুষটি এবং তার পরিবারের সদস্যদের রয়েছে ক্রীড়াঙ্গনে বর্ণাঢ্য পদচারণা। রয়েছে স্বর্ণোজ্জ্বল অতীত, রয়েছে ক্রীড়ার প্রতি অনুরাগ আর অবদানের অসংখ্য স্বাক্ষর। বঙ্গবন্ধুর পরিবার এদেশের ক্রীড়াঙ্গনের বাতিঘর। বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান ছিলেন একজন পরিচিত ফুটবলার। পেশাগত জীবনে সেরেস্তাদার হলেও খেলাধুলার প্রতি ছিল বিশেষ অনুরাগ। তিনি গোপালগঞ্জ অফিসার্স ক্লাব ফুটবল টিমের অধিনায়ক ছিলেন। তিনি ক্লাবটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পিতার পথ ধরে বঙ্গবন্ধু স্কুলজীবনে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলের অধিনায়ক ছিলেন। বঙ্গবন্ধু ফুটবল, হকি ও ভলিবল খেলতেন। চল্লিশের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের যখন রমরমা অবস্থা, তখন বঙ্গবন্ধু এ ক্লাবের হয়েই ফুটবল মাঠ মাতিয়েছেন। তিনি ফুটবল খেলতেন স্ট্রাইকার পজিশনে। ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৪১ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত তিনি ফুটবল খেলেছেন ওয়ান্ডারার্সের হয়েই। অধিনায়কের দায়িত্বও পালন করেন। তার নেতৃত্বেই তখন ওয়ান্ডারার্স ক্লাব বগুড়ায় অনুষ্ঠিত একটি গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টের শিরোপা জয় করে। তিনি ধানমন্ডি ক্লাবেরও প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ফুটবলের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অনুরাগের কারণেই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠিত হয়েছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ভূমিকা আজও স্মরণীয়।

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ফুটবল ম্যাচ হয় ১৯৭২ সালে ১৩ ফেব্রুয়ারি। বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছায় স্বাধীনতাকামী ফুটবলারদের নিয়ে ঢাকা স্টেডিয়ামে এদিন একটি প্রদর্শনী ম্যাচের আয়োজন করা হয়। খেলায় মুজিবনগর একাদশ ও প্রেসিডেন্ট একাদশ অংশ নেয়। ম্যাচটি স্টেডিয়ামে উপস্থিত থেকে সরাসরি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপভোগ করেন। ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে কলকাতার মোহনবাগান দল এবং ১৯৭৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের মিন্সক ডায়নামো ক্লাব ঢাকা খেলতে এলেও খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।

ক্রীড়া অনুরাগী ছিলেন বিধায় বঙ্গবন্ধু নিজে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তদারকি করতেন। ফুটবলের উন্নতিকল্পে তিনি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন প্রতিষ্ঠা করেন। ফুটবলই নয়, দেশের অন্য সব খেলার প্রতি তিনি সচেতন ছিলেন। ’৭২ সালে তার উদ্যোগে বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড গঠিত হয়। এটির বর্তমান রূপ ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড’। একই বছর বাংলাদেশ ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। যার বর্তমান নাম ‘জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ’। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পরিচালিত এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত এই ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থা। এটি নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতাধীন ৫৩টি ভিন্ন ভিন্ন খেলাধুলাবিষয়ক সংস্থাকে। ১৯৭৪ সালে তিনি ‘বাংলাদেশ স্পোটর্স কাউন্সিল অ্যাক্ট’ পাশ করেন। ১৯৭৫ সালের ৬ আগস্ট ‘বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবী কল্যাণ ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অনুমোদন করেন। উদ্দেশ্য ক্রীড়া, খেলাধুলা ও শরীরচর্চার ক্ষেত্রে যারা বিশেষ অবদান রেখেছেন বা রাখছেন তাদের এবং তাদের পরিবারের কল্যাণ।

বঙ্গবন্ধু নিজে যেমন খেলাধুলা পছন্দ করতেন, তেমনই সবাইকে খেলাধুলার প্রতি উৎসাহ জোগাতেন। আজকের যে কলাবাগান মাঠ, স্বাধীনতার আগে সেটা ছিল সিএন্ডবির ডিপো। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টি পড়েছিল সেখানে। বঙ্গবন্ধু স্থানীয় কজনকে ডেকে বললেন, ‘তোরা এখানে খেলাধুলা করিস না ক্যান?’ সেই সময় ডলফিন কোচের স্বত্বাধিকারী ফজলুর রহমান রাজ, মরহুম রাশেদ মোশারফ, জালাল মেম্বার, হেলালউদ্দিন, বাবু প্রমুখ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করলেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ডিপো সরিয়ে নেওয়ার পর তার আর্থিক অনুদান এবং অনুপ্রেরণায় কলাবাগান মাঠ সংস্কার করা হয়। ১৯৭২ সালে শেখ কামাল ও শেখ জামাল মাঝে মাঝে এই মাঠে ফুটবল খেলতে আসতেন। ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরের কোনো একদিন বঙ্গবন্ধু নিজেই মাঠে নেমে পড়েছিলেন ফুটবল খেলার জন্য।

একটি পরিবারের বাবা যদি ক্রীড়াবিদ ও ক্রীড়ানুরাগী হন, তাহলে পরিবারের অন্য সদস্যরাও সে পথেই হাঁটবেন, এটাই স্বাভাবিক। বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথই অনুসরণ করে গেছেন তার দুই ছেলে শেখ কামাল ও শেখ জামাল। এ দুই ভাইয়ের মধ্যে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন শেখ কামাল। তিনি ফুটবল, ক্রিকেট ও বাস্কেটবল তিনটি খেলাতেই সমান পারদর্শী ছিলেন। তবে ফুটবলে আনুষ্ঠানিকভাবে লিগে না খেললেও আবাহনীর হয়ে তিনি ক্রিকেট খেলেছেন। ক্রিকেটের মাঠে একজন দক্ষ অফ স্পিনার হিসাবে তার যথেষ্ট সুনাম ছিল। আর বাস্কেটবল খেলেছেন ঢাকা ওয়ান্ডারার্সের হয়ে। তার অধিনায়কত্বে ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে বাস্কেটবল লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়। মহসীন স্মৃতি ট্রফিও ঢাকা ওয়ান্ডারার্স জয় করে তারই অধিনায়কত্বে। আজকের আবাহনী ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা শেখ কামাল। শুরু থেকে এ ক্লাব শুধু আবাহনী ক্লাব নামে পরিচিত ছিল না। সেই সময় এ ক্লাবের নাম ছিল আবাহনী সমাজ কল্যাণ সমিতি। অনেক চড়াই-উতরাইয়ের পর জন্ম নেয় আবাহনী ক্রীড়া চক্র (বর্তমানে যা আবাহনী লিমিটেড নামে পরিচিত)। শুধু ফুটবল নয়, ক্রীড়াব্যক্তিত্ব শেখ কামাল বাস্কেটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন ও অ্যাথলেটে পারদর্শী ছিলেন। ১৯৭৫ সালে ঢাকা ক্রিকেট লিগে চ্যাম্পিয়ন আবাহনী ক্রীড়া চক্র ও একই বছর বাস্কেটবল লিগে চ্যাম্পিয়ন ঢাকা ওয়ান্ডারার্স দলের খেলোয়াড় ছিলেন শেখ কামাল। সে বছর সলিমুল্লাহ হলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় হয়েছিলেন দ্রুততম মানব। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ব্যাডমিন্টন দ্বৈতে রানার্সআপ হয়েছিলেন। তিনি ঢাকা মেট্রোপলিটন ফুটবল খেলোয়াড় সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বে ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ১৯৭৩ ও ১৯৭৫ সালে বাস্কেটবল লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ক্রিকেটার শেখ কামাল একজন পেস বোলিংয়ের পাশাপাশি ব্যাট হাতেও স্বাক্ষর রেখেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু পরিবারের মধ্যে বেঁচে থাকা দুই মেয়ে শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানাও দারুণ রকম ক্রীড়ানুরাগী। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো সব সময়ই দেশের খেলাধুলার খোঁজ রাখেন। তিনি ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে আপনজন, দায়িত্বশীল অভিভাবক, নিবেদিতপ্রাণ দর্শক, ক্রীড়াঙ্গনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। তিনি এতটাই ক্রীড়াপ্রেমী যে, যেখানে খেলা, শত ব্যস্ততার মাঝেও সেখানেই ছুটে যান। উৎসাহ জোগান লাল-সবুজ ক্রীড়াবিদদের। ক্রীড়াবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্র পরিচালনাকালেই বাংলাদেশে ক্রীড়াঙ্গনে বড় অর্জনগুলো স্পর্শ করেছে।

মোহাম্মদ সরওয়ার আলম চৌধুরী মনি : কাউন্সিলর, চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থা

sarwarmoni71@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন