শেখ মণি ও আরজু মণির প্রতিও শ্রদ্ধা
jugantor
শেখ মণি ও আরজু মণির প্রতিও শ্রদ্ধা

  ড. মুহম্মদ মনিরুল হক  

১৬ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ইচ্ছায় রাজনীতিতে আসা এবং বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে রাজনৈতিক দীক্ষা পাওয়া শেখ ফজলুল হক মণি ছিলেন মুজিববাদী রাজনীতিক ও দার্শনিক; মুজিববাদ চর্চা ও বিশ্লেষণের প্রাগ্রসর ব্যক্তিত্ব; মুজিবাদর্শের আলোকে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রভাবশালী ও নির্ভীক সংগঠক। আজীবন তিনি রাজনৈতিক শিক্ষক মুজিবের দর্শন বাস্তবায়নে সচেষ্ট থেকেছেন। ঘাতকরা বুঝে গিয়েছিল, শেখ ফজলুল হক মণি জীবিত থাকলে মুজিব আদর্শবিরোধী কোনো ষড়যন্ত্র এ দেশের মাটিতে বাস্তবায়িত হবে না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারের অন্য সদস্যসহ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার কিছু আগে শেখ মণির বাসভবনে গিয়ে ঘাতকরা হত্যা করেছিল শেখ ফজলুল হক মণি এবং তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রী সামসুন্নেসা আরজুকে। বরিশাল মহিলা কলেজ ছাত্রী সংসদের সাবেক জিএস এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পরীক্ষা সমাপ্তকারী সামসুন্নেসা আরজু মণিও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী ছিলেন। আরজু মণির পিতা আব্দুর রব সেরনিয়াবাতকেও ১৫ আগস্ট খুনি-ঘাতক চক্র নির্মমভাবে হত্যা করেছিল।

ধানমন্ডির ১৩ নম্বর সড়কের একটি বাড়িতে থাকতেন শেখ ফজলুল হক মণি ও তার পরিবার। ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট রাতেও তিনি বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়িতে গিয়েছেন। তার মাও ছিলেন সঙ্গে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘মণি, বুজিকে নিয়ে আমার সঙ্গে চারটে খেয়ে যাও।’ সে রাতে আর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাদের খাওয়া হয়নি। মাকে নিয়ে রাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনি বাসায় ফিরেন। বাসায় অপেক্ষমাণ নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেন : তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘বঙ্গবন্ধু আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন। ওখানে আমাকেও যেতে হবে।’

শেখ ফজলুল হক মণি নিয়মিত পড়াশোনা ও লেখালেখি করতেন। ঘুমাতে যাওয়ার আগে বই পড়া এবং খুব সকালে উঠে পত্রিকা দেখা ছিল তার অভ্যাস। শুয়ে শুয়ে তিনি পড়তেন। তার বাসায়ও ছিল গ্রন্থাগার। ‘দ্য লাস্ট বাটল’ বইটি হাতে নিয়ে সে রাতে তিনি শয়নকক্ষে গিয়েছেন। ভোর ৫টার দিকে খবরের কাগজ দেখতে তিনি নিচে নামলেন। তার পরনে তখন লুঙ্গি ও গেঞ্জি। গেট থেকে ২০-২৫ গজ দূরে আর্মি ল্যান্সার ফোর্সের একটি দল হঠাৎ তার চোখে পড়ল, তিনি দ্রুত উপরে উঠলেন। বেড রুমে ঢুকে ফোন করলেন, ফোন ওপাশে ব্যস্ত। এনগেইজড টোন শোনা যাচ্ছে। ফের ডায়াল করলেন, কিন্তু কোনো প্রত্যুত্তর নেই। হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। তিনি ফোন ধরলেন। অপর প্রান্ত থেকে জানানো হলো, ‘সেরনিয়াবাত সাহেবের বাড়ি আক্রান্ত।’ শেখ মণি ফোন ছাড়লেন। ঠিক সেসময়ে সেনাবাহিনীর ৬-৭ জন লোক দোতলায় উঠতে-উঠতে চিৎকার করে বলতে থাকল, ‘মণি সাহেব কোথায়? উনি আছেন?’

শেখ ফজলুল হক মণি দ্রুত বেড রুম থেকে বেরিয়ে তাদের মুখোমুখি হলেন। তেজদীপ্ত ও গম্ভীর কণ্ঠে জানতে চাইলেন, ‘আমি, কী হয়েছে?’ তিনি আবার বললেন, ‘কী হয়েছে বলুন’। ওদের মধ্যে থেকে একজন বলল, ‘ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট।’ শেখ মণি বললেন, ‘হোয়াই, কী অন্যায় করেছি আমি?’ কিছু বোঝার আগেই তাদের একজন শেখ মণির মাথায় আঘাত করল। ‘চুলের ঝুঁটি ঝাপটে ধরল।’ ছোটভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিম ছুটে এলেন। অন্তঃসত্ত্বা আরজু মণি বেড রুম থেকে ছুটে এসে স্বামীর পাশে দাঁড়ালেন। ওদের একজন আবার বলল, ‘আমাদের সঙ্গে যেতে হবে...।’ ‘ঠিক আছে, আমি আসছি’ বলে দৃঢ়-সাহসী শেখ মণি তার রুমের দিকে যাওয়ার জন্য মুখ ফেরালেন...। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘাতকের বার্স্ট ফায়ার...। প্রায় দুই গজ দূর থেকে গুলি। লুটিয়ে পড়লেন শেখ মণি ও তার স্ত্রী আরজু মণি। ঘাতকের চোখের আড়ালে ভাগ্যগুণে বেঁচে গিয়েছিলেন তাদের দুই শিশুপুত্র পরশ ও তাপস।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে দুর্বৃত্তরা জাতির পিতাকে সবান্ধব-সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মানব ইতিহাসের ঘৃণ্যতম এ হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সারা বাংলাদেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। এ দেশকে নতুন পাকিস্তান বানাতে খুন, ধর্ষণ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ, জুলুম চালিয়েছে। গলি থেকে রাজপথ, গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র একই চিত্র, একই নির্যাতন-নিষ্পেষণ চালিয়েছিল সামরিক-বেসামরিক ঘাতকচক্র। তারা নিষিদ্ধ করেছিল জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ। তাদের প্রধান টার্গেট ছিল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী; মুজিবপ্রেমী জনগণ; বঙ্গবন্ধুর আত্মীয়স্বজন। বিভীষিকাময় পরিবেশে কখনো আত্মীয়ের বাসায়, কখনো পলাতক থেকে, কখনো অন্য রাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়ে বড় হয়েছেন শেখ ফজলে শামস পরশ এবং শেখ ফজলে নূর তাপস। তারা মানুষ হয়েছেন-ক্ষমতা পেয়েও মা-বাবার হত্যাকারীদের বিচার আইনের মাধ্যমে চেয়েছেন। এদেশের বুকে আর কোনো শিশু যেন সর্বস্ব না হারায়, সেজন্য তারা নিরন্তর কাজ করে চলেছেন।

বাংলাদেশের সফলতার প্রতিটি ইতিহাস রচিত হোক শহিদদের মৃত্যুঞ্জয়ী চেতনায়, এ কামনা করি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, শেখ ফজলুল হক মণি এবং আরজু মণিসহ ১৫ আগস্টের শহিদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক : শিক্ষা ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ

শেখ মণি ও আরজু মণির প্রতিও শ্রদ্ধা

 ড. মুহম্মদ মনিরুল হক 
১৬ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ইচ্ছায় রাজনীতিতে আসা এবং বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে রাজনৈতিক দীক্ষা পাওয়া শেখ ফজলুল হক মণি ছিলেন মুজিববাদী রাজনীতিক ও দার্শনিক; মুজিববাদ চর্চা ও বিশ্লেষণের প্রাগ্রসর ব্যক্তিত্ব; মুজিবাদর্শের আলোকে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রভাবশালী ও নির্ভীক সংগঠক। আজীবন তিনি রাজনৈতিক শিক্ষক মুজিবের দর্শন বাস্তবায়নে সচেষ্ট থেকেছেন। ঘাতকরা বুঝে গিয়েছিল, শেখ ফজলুল হক মণি জীবিত থাকলে মুজিব আদর্শবিরোধী কোনো ষড়যন্ত্র এ দেশের মাটিতে বাস্তবায়িত হবে না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারের অন্য সদস্যসহ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার কিছু আগে শেখ মণির বাসভবনে গিয়ে ঘাতকরা হত্যা করেছিল শেখ ফজলুল হক মণি এবং তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রী সামসুন্নেসা আরজুকে। বরিশাল মহিলা কলেজ ছাত্রী সংসদের সাবেক জিএস এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পরীক্ষা সমাপ্তকারী সামসুন্নেসা আরজু মণিও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী ছিলেন। আরজু মণির পিতা আব্দুর রব সেরনিয়াবাতকেও ১৫ আগস্ট খুনি-ঘাতক চক্র নির্মমভাবে হত্যা করেছিল।

ধানমন্ডির ১৩ নম্বর সড়কের একটি বাড়িতে থাকতেন শেখ ফজলুল হক মণি ও তার পরিবার। ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট রাতেও তিনি বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়িতে গিয়েছেন। তার মাও ছিলেন সঙ্গে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘মণি, বুজিকে নিয়ে আমার সঙ্গে চারটে খেয়ে যাও।’ সে রাতে আর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাদের খাওয়া হয়নি। মাকে নিয়ে রাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনি বাসায় ফিরেন। বাসায় অপেক্ষমাণ নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেন : তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘বঙ্গবন্ধু আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন। ওখানে আমাকেও যেতে হবে।’

শেখ ফজলুল হক মণি নিয়মিত পড়াশোনা ও লেখালেখি করতেন। ঘুমাতে যাওয়ার আগে বই পড়া এবং খুব সকালে উঠে পত্রিকা দেখা ছিল তার অভ্যাস। শুয়ে শুয়ে তিনি পড়তেন। তার বাসায়ও ছিল গ্রন্থাগার। ‘দ্য লাস্ট বাটল’ বইটি হাতে নিয়ে সে রাতে তিনি শয়নকক্ষে গিয়েছেন। ভোর ৫টার দিকে খবরের কাগজ দেখতে তিনি নিচে নামলেন। তার পরনে তখন লুঙ্গি ও গেঞ্জি। গেট থেকে ২০-২৫ গজ দূরে আর্মি ল্যান্সার ফোর্সের একটি দল হঠাৎ তার চোখে পড়ল, তিনি দ্রুত উপরে উঠলেন। বেড রুমে ঢুকে ফোন করলেন, ফোন ওপাশে ব্যস্ত। এনগেইজড টোন শোনা যাচ্ছে। ফের ডায়াল করলেন, কিন্তু কোনো প্রত্যুত্তর নেই। হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। তিনি ফোন ধরলেন। অপর প্রান্ত থেকে জানানো হলো, ‘সেরনিয়াবাত সাহেবের বাড়ি আক্রান্ত।’ শেখ মণি ফোন ছাড়লেন। ঠিক সেসময়ে সেনাবাহিনীর ৬-৭ জন লোক দোতলায় উঠতে-উঠতে চিৎকার করে বলতে থাকল, ‘মণি সাহেব কোথায়? উনি আছেন?’

শেখ ফজলুল হক মণি দ্রুত বেড রুম থেকে বেরিয়ে তাদের মুখোমুখি হলেন। তেজদীপ্ত ও গম্ভীর কণ্ঠে জানতে চাইলেন, ‘আমি, কী হয়েছে?’ তিনি আবার বললেন, ‘কী হয়েছে বলুন’। ওদের মধ্যে থেকে একজন বলল, ‘ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট।’ শেখ মণি বললেন, ‘হোয়াই, কী অন্যায় করেছি আমি?’ কিছু বোঝার আগেই তাদের একজন শেখ মণির মাথায় আঘাত করল। ‘চুলের ঝুঁটি ঝাপটে ধরল।’ ছোটভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিম ছুটে এলেন। অন্তঃসত্ত্বা আরজু মণি বেড রুম থেকে ছুটে এসে স্বামীর পাশে দাঁড়ালেন। ওদের একজন আবার বলল, ‘আমাদের সঙ্গে যেতে হবে...।’ ‘ঠিক আছে, আমি আসছি’ বলে দৃঢ়-সাহসী শেখ মণি তার রুমের দিকে যাওয়ার জন্য মুখ ফেরালেন...। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘাতকের বার্স্ট ফায়ার...। প্রায় দুই গজ দূর থেকে গুলি। লুটিয়ে পড়লেন শেখ মণি ও তার স্ত্রী আরজু মণি। ঘাতকের চোখের আড়ালে ভাগ্যগুণে বেঁচে গিয়েছিলেন তাদের দুই শিশুপুত্র পরশ ও তাপস।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে দুর্বৃত্তরা জাতির পিতাকে সবান্ধব-সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মানব ইতিহাসের ঘৃণ্যতম এ হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সারা বাংলাদেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। এ দেশকে নতুন পাকিস্তান বানাতে খুন, ধর্ষণ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ, জুলুম চালিয়েছে। গলি থেকে রাজপথ, গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র একই চিত্র, একই নির্যাতন-নিষ্পেষণ চালিয়েছিল সামরিক-বেসামরিক ঘাতকচক্র। তারা নিষিদ্ধ করেছিল জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ। তাদের প্রধান টার্গেট ছিল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী; মুজিবপ্রেমী জনগণ; বঙ্গবন্ধুর আত্মীয়স্বজন। বিভীষিকাময় পরিবেশে কখনো আত্মীয়ের বাসায়, কখনো পলাতক থেকে, কখনো অন্য রাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়ে বড় হয়েছেন শেখ ফজলে শামস পরশ এবং শেখ ফজলে নূর তাপস। তারা মানুষ হয়েছেন-ক্ষমতা পেয়েও মা-বাবার হত্যাকারীদের বিচার আইনের মাধ্যমে চেয়েছেন। এদেশের বুকে আর কোনো শিশু যেন সর্বস্ব না হারায়, সেজন্য তারা নিরন্তর কাজ করে চলেছেন।

বাংলাদেশের সফলতার প্রতিটি ইতিহাস রচিত হোক শহিদদের মৃত্যুঞ্জয়ী চেতনায়, এ কামনা করি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, শেখ ফজলুল হক মণি এবং আরজু মণিসহ ১৫ আগস্টের শহিদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক : শিক্ষা ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন