সুবিধাভোগী পরিবারের সংখ্যা বাড়ানো হোক
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
সুবিধাভোগী পরিবারের সংখ্যা বাড়ানো হোক

  আবদুল লতিফ মন্ডল  

১৭ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আগামী ১ সেপ্টেম্বর সারা দেশে সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি শুরু হচ্ছে বলে জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার।

১৪ আগস্ট বাংলাদেশ সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ তথ্য জানান। নিম্ন আয়ের জনসাধারণের মধ্যে স্বল্পমূল্যে চাল বিতরণ করে তাদের খাদ্য সহায়তা প্রদান করা এ কর্মসূচির লক্ষ্য। এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

তবে দেশে বিদ্যমান নিম্ন আয়ের মানুষের তুলনায় কর্মসূচির আওতাভুক্ত নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যা অনেক কম হওয়ায় এই শ্রেণিভুক্ত অধিকাংশ মানুষ তথা পরিবার এ কর্মসূচির সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাছাড়া কর্মসূচিটি বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতিতে ভুগছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অধিকসংখ্যক নিম্ন ্নআয়ের মানুষ তথা পরিবারকে এ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তি এবং অনিয়ম-দুর্নীতির মাত্রা হ্রাস করে কর্মসূচির কার্যকারিতা বৃদ্ধির বিষয়টি পর্যালোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি নীতিমালা ২০১৭ অনুযায়ী, ইউনিয়ন পর্যায়ে বসবাসরত নিম্ন আয়ের দরিদ্র জনসাধারণের মধ্যে হতদরিদ্র পরিবারগুলো এ কর্মসূচির সুবিধাভোগী হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য। হতদরিদ্র পরিবার বলতে ভূমিহীন, কৃষি শ্রমিক, দিনমজুর, ভিক্ষুক ইত্যাদি পরিবারকে বোঝাবে। কেবল তালিকাভুক্ত ও কার্ডপ্রাপ্ত পরিবার খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সুবিধা ভোগ করবে। যারা এ কর্মসূচির সুবিধাভোগী হিসাবে তালিকাভুক্ত হবেন না তারা হলেন-ক. সচ্ছল ও অবস্থাপন্ন পরিবার; খ. একই পরিবারের একাধিক সদস্য; গ. ভিজিডি কর্মসূচির সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি। কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণে রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ইউনিয়ন খাদ্যবান্ধব কমিটি, জাতীয় সংসদ-সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যানকে যথাক্রমে প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা রেখে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সভাপতিত্বে উপজেলা খাদ্যবান্ধব কমিটি এবং জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে জেলা খাদ্যবান্ধব মনিটরিং কমিটি।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে শুরু হওয়া খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির গুরুত্ব বেড়ে যায় ২০১৯-২০ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে দেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ দেখা দেওয়ার পর। বাড়ানো হয় খাদ্য বাজেটের বরাদ্দ। ৯ জুন ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল চলতি অর্থবছরে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি সম্পর্কে সরকারের চিন্তাভাবনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সরকার ২০২২-২৩ অর্থবছরেও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে। ৫০ লাখ নিম্ন আয়ের পরিবারকে বছরে কর্মাভাবকালীন সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর এবং মার্চ ও এপ্রিল, অর্থাৎ ৫ মাসব্যাপী ১৫ টাকা কেজি দরে পরিবারপ্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল বিতরণপূর্বক খাদ্য সহায়তা প্রদান করবে। উল্লেখ্য, এর আগে এ কর্মসূচিতে বিতরণ করা চালের দাম ছিল কেজিপ্রতি ১০ টাকা।

১৪ আগস্ট সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে খাদ্যমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি শুরু হলে বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে। আসলে দেশের বাজারে চালের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে যেসব ফ্যাক্টর ভূমিকা রাখে সেগুলো হলো-এক. কৃষক পর্যায়ে ধান উৎপাদনে ব্যয় হ্রাস : ধান উৎপাদনে ব্যয় কমলে উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়েই লাভবান হন। কিন্তু দেখা যায়, দেশে কৃষক পর্যায়ে ধান উৎপাদন ব্যয় ক্রমে বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি সার ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে ধান উৎপাদন ব্যয় নতুন করে বেড়ে যাবে। দুই. দেশে চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হার বৃদ্ধি : সরকারি তথ্য মোতাবেক, কৃষি খাতে (শস্য উপখাত, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য উপখাত এবং বন উপখাত নিয়ে গঠিত) প্রবৃদ্ধি হার ২০০৯-১০ অর্থবছরের ৬.৫৫ শতাংশ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ৩.১৭ শতাংশে, যা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক প্রাক্কলন অনুযায়ী হ্রাস পেয়ে সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে ২.২০ শতাংশে নেমে আসবে। কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হার তলানিতে পৌঁছানোর প্রভাব পড়েছে শস্য উপখাতের প্রধান ফসল চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হারে। একটি দৈনিকের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে খাদ্যশস্যের (চাল, গম) উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হার জনসংখ্যা বৃদ্ধি হারের (২০২০ সালে ১.৩৭ শতাংশ) চেয়ে কম। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) বাংলাদেশে চালের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার আভাস দিয়েছে। ইউএসডিএ বলেছে, সদ্যসমাপ্ত বোরো মৌসুমে চালের উৎপাদন দাঁড়াবে এক কোটি ৯৭ লাখ টনে। ইউএসডিএ’র এ আভাস সঠিক হলে বোরো চালের উৎপাদন সরকারের দুই কোটি ৯ লাখ টন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ লাখ টন কম হবে। ইউএসডিএ’র মতে, জুনে বন্যার কারণে আউশের উৎপাদনও সরকারি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হবে। দীর্ঘ খরার কারণে চলতি আমন ফসল নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আমন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশ প্রধান খাদ্য চাল নিয়ে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে। তিন. চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর ভূমিকা : বলতে দ্বিধা নেই, দেশে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে মূলত চালকল মালিকরা। সরকার দেশে উৎপাদিত ধান-চালের খুব সামান্য পরিমাণ সংগ্রহ করায় ধান (বোরো ও আমন) কাটা-মাড়ার মৌসুমে চালকল মালিকরা সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে কম দামে প্রচুর পরিমাণে ধান কিনে তা চালে রূপান্তর করে। সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে মৌসুম শেষে উচ্চদরে চাল বিক্রি করে প্রচুর পরিমাণে লাভ করে। এ অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। চার. আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম : বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়েছে চালের দাম। প্রায় প্রতি বছরের মতো এবারও চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উচ্চমূল্যে আমদানি করা এসব চাল বাজারে মূল্য হ্রাসে তেমন ভূমিকা রাখতে পারবে না। এসব কারণে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে বিতরণ করা আট থেকে ১০ লাখ টন চাল বাজারে পণ্যটির উচ্চমূল্য হ্রাসে তেমন ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে হয় না।

বিশ্বব্যাংক প্রণীত সবচেয়ে বেশি হতদরিদ্র ১০ দেশের তালিকার বরাত দিয়ে ২০১৯ সালের ১৯ জানুয়ারি একটি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা বলা হয়, হতদরিদ্র মানুষের বসবাসের দিক থেকে বিশ্বে পঞ্চম বাংলাদেশ এবং দেশটিতে হতদরিদ্রের সংখ্যা দুই কোটি ৪১ লাখ। এ তথ্য করোনাভাইরাসের প্রকোপকালের আগের। গত দুই বছরে করোনার প্রাদুর্ভাবে দেশের অর্থনীতি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং কর্মসংস্থানে মূল ভূমিকা পালনকারী বেসরকারি খাতে চাকরিচ্যুতি, বেতন/মজুরি হ্রাস এবং অন্যান্য কারণে মানুষের আয় কমেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ পরিচালিত ‘স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ওয়ার্কপ্লেস ২০২১’ অনুযায়ী, করোনার সময় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৫৫ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে। এর ফলে দারিদ্র্যসীমার সামান্য উপরে থাকা মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে আসে, অর্থাৎ তারা দরিদ্র শ্রেণিভুক্ত হয়ে যায়। অন্যদিকে দরিদ্ররা অতিদরিদ্রদের কাতারভুক্ত হয়। ২০১৬ সালে বিবিএস প্রণীত হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিউচার সার্ভে (হায়েস) ২০১৬ অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে দরিদ্র মানুষের হার দাঁড়ায় ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে। করোনাকালীন তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে নতুন করে হায়েস প্রণীত না হওয়ায় জানা যাচ্ছে না দেশে বর্তমানে দরিদ্র ও হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ও শতকরা হার কত। এদিকে দেশের কয়েকটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান/সংস্থা যেমন-সিপিডি, পিপিআরসি, বিআইজিডির মতে, করোনা মহামারির কারণে ২০২০-২১ অর্থবছরে দারিদ্র্য হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ থেকে ৪২ শতাংশে। সে ক্ষেত্রে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা সাত কোটি বা তার উপরে। বিগত ছয় বছরে নতুন করে হায়েস প্রকাশিত না হওয়ায় জনগণ বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যে বিশ্বাস করা শুরু করেছে। দরিদ্র মানুষের সংখ্যায় উল্লম্ফন ঘটে থাকলে হতদরিদ্রের সংখ্যাও বেড়েছে।

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে-এক. সচ্ছল ও অবস্থাপন্ন পরিবারকে সুবিধাভোগী হিসাবে অন্তর্ভুক্তি : গত ১৫ ফেব্রুয়ারি যুগান্তরের সম্পাদকীয়তে বলা হয়, সরকার বিশাল ভর্তুকি দিয়ে অতি দরিদ্রদের জন্য ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি’ চালু করলেও বিভিন্ন স্থানে অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে প্রকৃত দরিদ্ররা এর সুবিধা পাচ্ছে না। যুগান্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এর সুবিধা পাচ্ছে মূলত সম্পদশালী ব্যক্তি, সচ্ছল ব্যবসায়ী, চেয়ারম্যান-মেম্বারদের আত্মীয়স্বজনরা। ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, নাটোর, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, দিনাজপুর ইত্যাদি জেলার বিভিন্ন স্থান পরিদর্শনে এ চিত্র দেখা গেছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এদিকটিতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের দৃষ্টি দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। দুই. কর্মসূচির চাল কালোবাজারে বিক্রি : সাধারণত সরকারি দলের সমর্থকদের মধ্য থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত ডিলারদের কালোবাজারে চাল বিক্রির খবর প্রায়ই পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কালোবাজারে চাল বিক্রির কারণে অনেক সুবিধাভোগী চালপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন এবং সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়।

সবশেষে যা বলতে চাই তা হলো, বিশাল হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর ন্যূনতম খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপকারভোগী পরিবারের সংখ্যা আরও বাড়ানো হোক। এতে দেশে হতদরিদ্রদের খাদ্যনিরাপত্তা অনেকটা নিশ্চিত হবে এবং তাদের শতকরা হার হ্রাস পাবে। তাছাড়া কর্মসূচির সুফল টার্গেট গ্রুপের কাছে পৌঁছাতে এর অনিয়ম-দুর্নীতি দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক খাদ্য সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

স্বদেশ ভাবনা

সুবিধাভোগী পরিবারের সংখ্যা বাড়ানো হোক

 আবদুল লতিফ মন্ডল 
১৭ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আগামী ১ সেপ্টেম্বর সারা দেশে সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি শুরু হচ্ছে বলে জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার।

১৪ আগস্ট বাংলাদেশ সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ তথ্য জানান। নিম্ন আয়ের জনসাধারণের মধ্যে স্বল্পমূল্যে চাল বিতরণ করে তাদের খাদ্য সহায়তা প্রদান করা এ কর্মসূচির লক্ষ্য। এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

তবে দেশে বিদ্যমান নিম্ন আয়ের মানুষের তুলনায় কর্মসূচির আওতাভুক্ত নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যা অনেক কম হওয়ায় এই শ্রেণিভুক্ত অধিকাংশ মানুষ তথা পরিবার এ কর্মসূচির সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাছাড়া কর্মসূচিটি বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতিতে ভুগছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অধিকসংখ্যক নিম্ন ্নআয়ের মানুষ তথা পরিবারকে এ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তি এবং অনিয়ম-দুর্নীতির মাত্রা হ্রাস করে কর্মসূচির কার্যকারিতা বৃদ্ধির বিষয়টি পর্যালোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি নীতিমালা ২০১৭ অনুযায়ী, ইউনিয়ন পর্যায়ে বসবাসরত নিম্ন আয়ের দরিদ্র জনসাধারণের মধ্যে হতদরিদ্র পরিবারগুলো এ কর্মসূচির সুবিধাভোগী হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য। হতদরিদ্র পরিবার বলতে ভূমিহীন, কৃষি শ্রমিক, দিনমজুর, ভিক্ষুক ইত্যাদি পরিবারকে বোঝাবে। কেবল তালিকাভুক্ত ও কার্ডপ্রাপ্ত পরিবার খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সুবিধা ভোগ করবে। যারা এ কর্মসূচির সুবিধাভোগী হিসাবে তালিকাভুক্ত হবেন না তারা হলেন-ক. সচ্ছল ও অবস্থাপন্ন পরিবার; খ. একই পরিবারের একাধিক সদস্য; গ. ভিজিডি কর্মসূচির সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি। কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণে রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ইউনিয়ন খাদ্যবান্ধব কমিটি, জাতীয় সংসদ-সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যানকে যথাক্রমে প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা রেখে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সভাপতিত্বে উপজেলা খাদ্যবান্ধব কমিটি এবং জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে জেলা খাদ্যবান্ধব মনিটরিং কমিটি।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে শুরু হওয়া খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির গুরুত্ব বেড়ে যায় ২০১৯-২০ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে দেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ দেখা দেওয়ার পর। বাড়ানো হয় খাদ্য বাজেটের বরাদ্দ। ৯ জুন ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল চলতি অর্থবছরে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি সম্পর্কে সরকারের চিন্তাভাবনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সরকার ২০২২-২৩ অর্থবছরেও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে। ৫০ লাখ নিম্ন আয়ের পরিবারকে বছরে কর্মাভাবকালীন সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর এবং মার্চ ও এপ্রিল, অর্থাৎ ৫ মাসব্যাপী ১৫ টাকা কেজি দরে পরিবারপ্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল বিতরণপূর্বক খাদ্য সহায়তা প্রদান করবে। উল্লেখ্য, এর আগে এ কর্মসূচিতে বিতরণ করা চালের দাম ছিল কেজিপ্রতি ১০ টাকা।

১৪ আগস্ট সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে খাদ্যমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি শুরু হলে বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে। আসলে দেশের বাজারে চালের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে যেসব ফ্যাক্টর ভূমিকা রাখে সেগুলো হলো-এক. কৃষক পর্যায়ে ধান উৎপাদনে ব্যয় হ্রাস : ধান উৎপাদনে ব্যয় কমলে উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়েই লাভবান হন। কিন্তু দেখা যায়, দেশে কৃষক পর্যায়ে ধান উৎপাদন ব্যয় ক্রমে বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি সার ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে ধান উৎপাদন ব্যয় নতুন করে বেড়ে যাবে। দুই. দেশে চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হার বৃদ্ধি : সরকারি তথ্য মোতাবেক, কৃষি খাতে (শস্য উপখাত, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য উপখাত এবং বন উপখাত নিয়ে গঠিত) প্রবৃদ্ধি হার ২০০৯-১০ অর্থবছরের ৬.৫৫ শতাংশ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ৩.১৭ শতাংশে, যা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক প্রাক্কলন অনুযায়ী হ্রাস পেয়ে সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে ২.২০ শতাংশে নেমে আসবে। কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হার তলানিতে পৌঁছানোর প্রভাব পড়েছে শস্য উপখাতের প্রধান ফসল চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হারে। একটি দৈনিকের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে খাদ্যশস্যের (চাল, গম) উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হার জনসংখ্যা বৃদ্ধি হারের (২০২০ সালে ১.৩৭ শতাংশ) চেয়ে কম। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) বাংলাদেশে চালের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার আভাস দিয়েছে। ইউএসডিএ বলেছে, সদ্যসমাপ্ত বোরো মৌসুমে চালের উৎপাদন দাঁড়াবে এক কোটি ৯৭ লাখ টনে। ইউএসডিএ’র এ আভাস সঠিক হলে বোরো চালের উৎপাদন সরকারের দুই কোটি ৯ লাখ টন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ লাখ টন কম হবে। ইউএসডিএ’র মতে, জুনে বন্যার কারণে আউশের উৎপাদনও সরকারি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হবে। দীর্ঘ খরার কারণে চলতি আমন ফসল নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আমন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশ প্রধান খাদ্য চাল নিয়ে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে। তিন. চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর ভূমিকা : বলতে দ্বিধা নেই, দেশে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে মূলত চালকল মালিকরা। সরকার দেশে উৎপাদিত ধান-চালের খুব সামান্য পরিমাণ সংগ্রহ করায় ধান (বোরো ও আমন) কাটা-মাড়ার মৌসুমে চালকল মালিকরা সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে কম দামে প্রচুর পরিমাণে ধান কিনে তা চালে রূপান্তর করে। সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে মৌসুম শেষে উচ্চদরে চাল বিক্রি করে প্রচুর পরিমাণে লাভ করে। এ অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। চার. আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম : বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়েছে চালের দাম। প্রায় প্রতি বছরের মতো এবারও চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উচ্চমূল্যে আমদানি করা এসব চাল বাজারে মূল্য হ্রাসে তেমন ভূমিকা রাখতে পারবে না। এসব কারণে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে বিতরণ করা আট থেকে ১০ লাখ টন চাল বাজারে পণ্যটির উচ্চমূল্য হ্রাসে তেমন ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে হয় না।

বিশ্বব্যাংক প্রণীত সবচেয়ে বেশি হতদরিদ্র ১০ দেশের তালিকার বরাত দিয়ে ২০১৯ সালের ১৯ জানুয়ারি একটি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা বলা হয়, হতদরিদ্র মানুষের বসবাসের দিক থেকে বিশ্বে পঞ্চম বাংলাদেশ এবং দেশটিতে হতদরিদ্রের সংখ্যা দুই কোটি ৪১ লাখ। এ তথ্য করোনাভাইরাসের প্রকোপকালের আগের। গত দুই বছরে করোনার প্রাদুর্ভাবে দেশের অর্থনীতি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং কর্মসংস্থানে মূল ভূমিকা পালনকারী বেসরকারি খাতে চাকরিচ্যুতি, বেতন/মজুরি হ্রাস এবং অন্যান্য কারণে মানুষের আয় কমেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ পরিচালিত ‘স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ওয়ার্কপ্লেস ২০২১’ অনুযায়ী, করোনার সময় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৫৫ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে। এর ফলে দারিদ্র্যসীমার সামান্য উপরে থাকা মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে আসে, অর্থাৎ তারা দরিদ্র শ্রেণিভুক্ত হয়ে যায়। অন্যদিকে দরিদ্ররা অতিদরিদ্রদের কাতারভুক্ত হয়। ২০১৬ সালে বিবিএস প্রণীত হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিউচার সার্ভে (হায়েস) ২০১৬ অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে দরিদ্র মানুষের হার দাঁড়ায় ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে। করোনাকালীন তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে নতুন করে হায়েস প্রণীত না হওয়ায় জানা যাচ্ছে না দেশে বর্তমানে দরিদ্র ও হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ও শতকরা হার কত। এদিকে দেশের কয়েকটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান/সংস্থা যেমন-সিপিডি, পিপিআরসি, বিআইজিডির মতে, করোনা মহামারির কারণে ২০২০-২১ অর্থবছরে দারিদ্র্য হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ থেকে ৪২ শতাংশে। সে ক্ষেত্রে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা সাত কোটি বা তার উপরে। বিগত ছয় বছরে নতুন করে হায়েস প্রকাশিত না হওয়ায় জনগণ বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যে বিশ্বাস করা শুরু করেছে। দরিদ্র মানুষের সংখ্যায় উল্লম্ফন ঘটে থাকলে হতদরিদ্রের সংখ্যাও বেড়েছে।

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে-এক. সচ্ছল ও অবস্থাপন্ন পরিবারকে সুবিধাভোগী হিসাবে অন্তর্ভুক্তি : গত ১৫ ফেব্রুয়ারি যুগান্তরের সম্পাদকীয়তে বলা হয়, সরকার বিশাল ভর্তুকি দিয়ে অতি দরিদ্রদের জন্য ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি’ চালু করলেও বিভিন্ন স্থানে অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে প্রকৃত দরিদ্ররা এর সুবিধা পাচ্ছে না। যুগান্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এর সুবিধা পাচ্ছে মূলত সম্পদশালী ব্যক্তি, সচ্ছল ব্যবসায়ী, চেয়ারম্যান-মেম্বারদের আত্মীয়স্বজনরা। ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, নাটোর, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, দিনাজপুর ইত্যাদি জেলার বিভিন্ন স্থান পরিদর্শনে এ চিত্র দেখা গেছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এদিকটিতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের দৃষ্টি দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। দুই. কর্মসূচির চাল কালোবাজারে বিক্রি : সাধারণত সরকারি দলের সমর্থকদের মধ্য থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত ডিলারদের কালোবাজারে চাল বিক্রির খবর প্রায়ই পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কালোবাজারে চাল বিক্রির কারণে অনেক সুবিধাভোগী চালপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন এবং সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়।

সবশেষে যা বলতে চাই তা হলো, বিশাল হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর ন্যূনতম খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপকারভোগী পরিবারের সংখ্যা আরও বাড়ানো হোক। এতে দেশে হতদরিদ্রদের খাদ্যনিরাপত্তা অনেকটা নিশ্চিত হবে এবং তাদের শতকরা হার হ্রাস পাবে। তাছাড়া কর্মসূচির সুফল টার্গেট গ্রুপের কাছে পৌঁছাতে এর অনিয়ম-দুর্নীতি দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক খাদ্য সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন