বঙ্গবন্ধুর প্রকৃতি দর্শন
jugantor
বঙ্গবন্ধুর প্রকৃতি দর্শন

  ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী  

১৮ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চলমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তন-বৈশ্বিক উষ্ণতা-প্রকৃতি নিধনের বৈরী প্রভাবে সমগ্র বিশ্ব প্রায় বিপন্ন-পর্যুদস্ত। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি-ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস-বন্যা-খরা-তীব্র তাপদাহে পৃথিবী নামক এ গ্রহের সর্বত্রই নানামুখী অনাকাঙ্ক্ষিত ভয়াবহ পরিবেশ-পরিস্থিতি পরিলক্ষিত। জনজীবনের স্বাভাবিক-সাবলীল গতিপ্রবাহে এসব মানবসৃষ্ট দুর্যোগ উন্নত বিশ্ব অনেকাংশে পরাভূত করলেও; উন্নয়নশীল-অনুন্নত দেশগুলো দুঃসহ যন্ত্রণাদগ্ধ। ভোগবাদী-বিনোদননির্ভর লুম্পেন পুঁজিবাদী আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় লণ্ডভণ্ড ঝুঁকি থেকে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিও মুক্ত নয়। এমন কোনো কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী-বিজ্ঞানী-প্রকৃতিপ্রেমী রাষ্ট্রনায়ক নেই, যারা অতীতে প্রকৃতির অসাধারণ সৌন্দর্য-বৈশিষ্ট্যগুলো ধারণ করে আগামীর জন্য একটি নিরাপদ ধরিত্রীর বিষয়ে নিগূঢ় ভাবিত ছিলেন না। বিশ্বকবি রবিঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, পল্লীকবি জসীমউদ্দীনসহ এদেশের প্রায় প্রত্যেকেরই গদ্য-পদ্য-রচনায় ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে প্রকৃতি-জীববৈচিত্র্যে অতুলনীয় বন্দনাগাথা বাঙালি জাতির সংস্কৃতি-কৃষ্টি-ঐতিহ্যকে করেছে নান্দনিকতায় অত্যুজ্জ্বল।

রবিঠাকুরের ‘বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’ কবিতায় ‘দিনের আলো নিবে এল সুয্যি ডোবে ডোবে।/আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।/মেঘের উপর মেঘ করেছে, রঙের উপর রঙ।/মন্দিরেতে কাঁসর ঘণ্টা বাজল ঠঙ্ ঠঙ্।/ও পারেতে বিষ্টি এল, ঝাপসা গাছপালা।/এ পারেতে মেঘের মাথায় একশো মানিক জ্বালা।/... আকাশ জুড়ে মেঘের খেলা, কোথায় বা সীমানা-/দেশে দেশে খেলে বেড়ায়, কেউ করে না মানা।/কত নতুন ফলের বনে বিষ্টি দিয়ে যায়,/পলে পলে নতুন খেলা কোথায় ভেবে যায়!/...মেঘের খেলা দেখে কত খেলা পড়ে মনে,/কত দিনের লুকোচুরি কত ঘরের কোণে!/ তারি সঙ্গে মনে পড়ে ছেলেবেলার গান-/বিষ্টি পড়ে টাপার টুপুর, নদেয় এল বান’ উল্লেখিত পঙ্ক্তিগুলো প্রকৃতি ভাবনায় প্রণিধানযোগ্য। কবি নজরুলের বৈশাখ-শ্রাবণকে নিয়ে অনবদ্য উচ্চারণ নানাভাবে জাতির প্রাণস্পন্দনকে জাগরূক রেখেছে। চলমান পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় প্রকৃতি বা পরিবেশ বিধ্বংসী কদাচার-অনুন্নয়নের উন্নয়ন সম্পৃক্ত অপরিকল্পিত দৃষ্টিভঙ্গিতে বিরাজমান সংকট মোকাবিলায় মুক্তির মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রকৃতি দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা বিশ্লেষণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেই দেশ পুনর্গঠনে নিবিড় মনোনিবেশ করেন। বিদেশি এক সাংবাদিকের ‘যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাকে কী করে গড়ে তুলবেন?’ প্রশ্নের জবাবে সেদিন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার আছে সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা বাংলার মাটি আর আছে সোনার মানুষ।’ মূলত বঙ্গবন্ধুর প্রেরণার মূল উৎসশক্তি ছিল এ দেশের মানুষের অফুরন্ত ভালোবাসা। বঙ্গবন্ধুও গভীরভাবে ভালোবেসেছিলেন এদেশের মাটি, মানুষ, পরিবেশ ও প্রকৃতিকে। তাই দেশ গঠনে সামগ্রিক উন্নয়নের কর্মকৌশলের পাশাপাশি যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত বনজসম্পদ উন্নয়নে নিয়েছিলেন নানামুখী পন্থা। বঙ্গবন্ধু সব উন্নয়ন কর্মযজ্ঞে সার্বক্ষণিক পরিবেশ উন্নয়নের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের ঘোড়দৌড় বন্ধ করে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ডেকে রেসিং ট্র্যাকের ওপর সারিবদ্ধভাবে নারিকেল গাছ লাগানোর নির্দেশনা দেন। গাছ লাগিয়ে বঙ্গবন্ধু এটির নাম দেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। দেশের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে গাছ লাগান গণভবন ও বঙ্গভবনে। প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণ, সবুজ-নির্মল পরিবেশ নিশ্চিতে দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু করে তিনি সবাইকে বাড়ির আশপাশ, পতিত জমিসহ সর্বস্তরে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সবুজ বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন।

বিশ্বকবি রবিঠাকুরের অমর পঙ্ক্তি ‘দেশকে ভালোবাসিবার প্রথম লক্ষণ ও প্রথম কর্তব্য পরিষ্কারভাবে জানা। দেশে জন্মালেই দেশ আপন হয় না। যতক্ষণ দেশকে না-জানি, ততক্ষণ সে দেশ আপনার নয়।’ এর নির্যাস উপলব্ধিতেই বঙ্গবন্ধু বাংলার প্রকৃতির অপরূপ রূপের প্রেমে মজেছিলেন। প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি বঙ্গবন্ধুর যে অসাধারণ ভালোবাসা, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইয়ে তা সুন্দরভাবে চিত্রিত হয়েছে। তার লেখা এ বইয়ে তিনি একাধিকবার মধুমতি নদীর কথা উল্লেখ করেছেন। বইয়ের ১৭১নং পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি একটা ফুলের বাগান শুরু করেছিলাম। এখানে কোনো ফুলের বাগান ছিল না। জমাদার, সিপাহীদের দিয়ে আমি ওয়ার্ড থেকে ফুলের গাছ আনতাম। আমার বাগানটা খুব সুন্দর হয়েছিল।’ একজন সত্যিকারের প্রকৃতিপ্রেমিক হিসাবে বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ কারাজীবনেও প্রকৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন, যার অনন্য নজির পাওয়া যায় ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থেও। বইয়ে ১৯৬৬ সালের ১৭ জুলাই বঙ্গবন্ধু লিখেছিলেন, ‘বাদলা ঘাসগুলি আমার দূর্বার বাগানটা নষ্ট করে দিতেছে। কত যে তুলে ফেললাম। তবুও শেষ করতে পারছি না। আমিও নাছোড়বান্দা। আজ আবার কয়েকজন কয়েদি নিয়ে বাদলা ঘাস ধ্বংসের অভিযান শুরু করলাম। অনেক তুললাম আজ। আমি কিছু সময় আরও কাজ করলাম ফুলের বাগানে।’ বঙ্গবন্ধুর জীবনচরিত পর্যালোচনায় তার প্রকৃতিপ্রেমের দৃশ্যমানতা সুস্পষ্ট। পরিবেশের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অকৃত্রিম ভালোবাসা সবার জন্য অনুকরণীয় হয়ে আছে। তৎকালীন গণভবনের এক কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, গণভবনে কোনো জেলা প্রশাসক এলে নানা কথার মধ্যে বঙ্গবন্ধু তাকে প্রচুর গাছ লাগানোর কথা বলতেন।

১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ কর্মসূচি উদ্বোধনের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমরা গাছ লাগাইয়া সুন্দরবন পয়দা করি নাই, স্বাভাবিক অবস্থায় প্রকৃতি এটাকে করে দিয়েছে বাংলাদেশকে রক্ষা করার জন্য। বঙ্গোপসাগরের পাশ দিয়া যে সুন্দরবনটা রয়েছে, এটা হলো বেরিয়ার, এটা যদি রক্ষা করা না হয়, তাহলে একদিন খুলনা, পটুয়াখালী, কুমিল্লার কিছু অংশ, ঢাকার কিছু অংশ পর্যন্ত এরিয়া সমুদ্রে তলিয়া যাবে এবং হাতিয়া ও সন্দ্বীপের মতো আইল্যান্ড হয়ে যাবে। একবার সুন্দরবন যদি শেষ হয়ে যায়, তাহলে সমুদ্র যে ভাঙন থেকে রক্ষা করার কোনো উপায় আর নাই।’ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বহুল আলোচিত জলবায়ু পরিবর্তন থেকে দেশকে প্রভাবমুক্ত রাখার বিষয়টি দূরদর্শী বঙ্গবন্ধু তখনই যথার্থ অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। ফলে তিনি উপকূলীয় এলাকায় সবুজায়নের উদ্যোগ গ্রহণ এবং বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব উপলব্ধিতে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টি করেন। তিনি উপকূলে বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি বেশি করে নারিকেল গাছ লাগানোর আহ্বান জানান। দেশের সমগ্র জাতীয়-আঞ্চলিক রাস্তার দুপাশে গাছপালা লাগানোর সূচনা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর হাতেই।

প্রকৃতিপ্রেমিক বঙ্গবন্ধু সুজলা-সুফলা বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের অত্যাধিক গুরুত্বারোপে দেশে বিভিন্ন আইন প্রণয়ন এবং বিধিমালা জারি করেন। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় বঙ্গবন্ধু কর্তৃক গৃহীত বহুমাত্রিক কর্মকাণ্ড এখনো চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। ধারাবাহিকভাবে পবিত্র সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে সংযোজিত হয় ‘রাষ্ট্র বর্তমান-ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি সংরক্ষণ ও নিরাপত্তাবিধান করিবেন।’ পরিবেশের গুরুত্ব বিবেচনায় ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু ‘ওয়াটার পলিউশন কন্ট্রোল অর্ডিনেন্স ১৯৭৩’ জারি করেন। একই বছর পানি দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রম সূচিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের বনজসম্পদের অবৈধ পাচার রোধে বঙ্গবন্ধু ‘চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস ফরেস্ট ট্রানজিট রুলস-১৯৭৩’ জারি করেন। এছাড়াও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন-১৯৭৪’ প্রণয়ন করা হয় বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে। ১৯৭৫ সালের ১ জুলাই বঙ্গবন্ধু প্রতিষ্ঠিত ‘ন্যাশনাল হার্বেরিয়াম’ উদ্ভিদ প্রজাতি সংরক্ষণ ও গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করে। পরে প্রতিষ্ঠিত হয় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ অধিদপ্তর। সুন্দরবনের বুক চিরে প্রবাহিত নৌপথ দিয়ে ভারী জাহাজ চলাচলে সুন্দরবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করার আশঙ্কায় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে লুপ কাটিং ড্রেজিংয়ের সাহায্যে বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার ঘষিয়াখালী থেকে রামপাল উপজেলার বেতবুনিয়া পর্যন্ত ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার সংযোগ খাল খনন করে ১৯৭৪ সালে মোংলা ঘষিয়াখালী বাণিজ্যিক নৌপথ চালু করা হয়।

সবুজ বিপ্লব সফল করতে ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে কৃষি গ্র্যাজুয়েটদের আহ্বান করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আপনারা যারা কৃষি শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছেন, আপনাদের গ্রামে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে মিশে যেতে হবে, মনোযোগ দিতে হবে তাদের চাহিদা আর কর্মের ওপর, তবেই তারা সাহসী হবে, আগ্রহী হবে, উন্নতি করবে, ফলাবে সোনার ফসল খেত ভরে। গ্রাম উন্নত হলে দেশ উন্নত হবে। কৃষককে বাঁচাতে হবে, উৎপাদন বাড়াতে হবে। তা না-হলে বাংলাদেশকে বাঁচাতে পারব না।’ বর্ষায় আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে বন্যার প্রাদুর্ভাব, চৈত্র মাসের খরা ও বৃষ্টিহীনতার দরুন পানির অভাব ইত্যাদি প্রকৃতির বিরূপ আচরণ মোকাবিলায় পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা গ্রহণে বঙ্গবন্ধু ইপি ওয়াপদার পানি উইং আলাদা করে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড গঠন করেন। বঙ্গবন্ধু দূরদর্শী চিন্তায় ১৯৭২ সালেই ভারতের সঙ্গে অভিন্ন নদীগুলোর পানির হিস্যা আদায়ে যৌথ নদী কমিশন গঠিত এবং নদীর নাব্য রক্ষার্থে নেদারল্যান্ডস সরকারের সঙ্গে নদী খননের জন্য ড্রেজিংয়ের চুক্তি সম্পাদিত হয়। নদীমাতৃক আবহমান বাংলার প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ হাওড় উন্নয়ন বোর্ড, নারায়ণগঞ্জ ড্রেজার পরিদপ্তর, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীন বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র, ঘূর্ণিঝড় থেকে জানমাল রক্ষায় ‘মুজিব কিল্লা’ নির্মাণ এবং ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিসি) প্রতিষ্ঠার মতো বহুবিধ কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশের প্রকৃতি-পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় যে সামাজিক সচেতনতা-আন্দোলনের শুভ সূচনা রচিত হয়েছিল, তা দৃঢ়ভাবে অব্যাহত রেখেছেন জাতির পিতার সুযোগ্য তনয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। সবুজায়নের চাদরে আচ্ছাদিত বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা আজ বিশ্বে অনন্য মর্যাদায় সমাসীন। প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বর্তমান সরকার বিভিন্ন যুগান্তকারী পদক্ষেপ বাস্তবায়িত করছে। পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় ২০১৫ সালে দেশরত্ন শেখ হাসিনা জাতিসংঘের ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ পুরস্কার পেয়েছেন। মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে সরকার একদিনে এক কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি পালন করেছে। বিরল, বিপদাপন্ন, বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণী প্রজাতি সংরক্ষণ, শিক্ষা-গবেষণা, সচেতনতা সৃষ্টি ইত্যাদিতে অসামান্য অবদানের জন্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ২০১০ সাল থেকে ‘বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন’ পুরস্কার প্রদান করে আসছে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশব্যাপী ২৮১টি মিউনিসিপ্যালটিতে ‘ভূমি অধিগ্রহণ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ পরিকল্পনা’ শীর্ষক প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ছিল-সড়ক উন্নয়ন, ব্রিজ-কালভার্ট-ড্রেন নির্মাণ, ভূমি অধিগ্রহণ-পুনর্বাসন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, খাল খনন, পাড় বাঁধানো, পুকুর সংস্কার, সৌন্দর্যবর্ধন, বৃক্ষরোপণ। এ ছাড়া জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পৌরসভার অবকাঠামো ও নাগরিক সুবিধা-কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে দারিদ্র্য হ্রাস এবং অপরিহার্য অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে পরিবেশগত উন্নয়ন। ওই প্রকল্প উপস্থাপনা প্রত্যক্ষকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ফসলের জমি যাতে নষ্ট না হয়, সেভাবে কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। তার পথ অনুসরণ করে পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি নিতে হবে। শুধু ইট-সুরকির স্থাপনা নির্মাণ নয়; বরং প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।’ ওই অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকন্যা নদীতে অপ্রয়োজনীয় সেতু ও বিলের পাশে সাগরপারের মতো উঁচু বাঁধ নির্মাণ না করার পরামর্শ এবং আবাদি জমি রক্ষার কথা মাথায় রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।

প্রসঙ্গত কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘উটপাখি’ কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি উপস্থাপন করতে চাই, ‘আমার কথা কি শুনতে পাও না তুমি?/কেন মুখ গুঁজে আছো তবে মিছে ছলে?/কোথায় লুকোবে? ধু-ধু মরুভূমি;/ক্ষ’য়ে ক্ষ’য়ে ছায়া ম’রে গেছে পদতলে।/ আজ দিগন্তে মরীচিকাও যে নেই;/ নির্বাক, নীল নির্মম মহাকাশ।/...নব সংসার পাতি গো আবার, চলো/যে-কোনো নিভৃত কণ্টকাবৃত বনে।/মিলবে সেখানে অনন্ত নোনা জলও,/ খসবে খেজুর মাটির আকর্ষণে,/... আমি জানি এই ধ্বংসের দায়ভাগে আমরা দুজনে সমান অংশীদার;/ অপরে পাওনা আদায় করেছে আগে, আমাদের দেনা শোধবার ভার।’ এটি স্পষ্ট যে, অতীতের পরিশুদ্ধ মানবসমাজ প্রকৃতি-পরিবেশকে যথার্থ অর্থে ধারণ করেছিল। দূর অতীতে সংঘটিত ধ্বংসযজ্ঞের দায়ভাগ তারা কিছু মিটিয়ে গেলেও চলমান সময়কালে সব দায়ভার আমাদের বহন করতেই হবে। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কদর্য অনাসৃষ্টির ফলে নিরাপদ-নিরাপত্তাহীন পর্যুদস্ত জীবন-জীবিকার প্রতিবন্ধকতায় সত্যের কাঠিন্যে আমাদের ব্যর্থতাকে অভিযুক্ত করবেই।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : সমাজ-অপরাধবিজ্ঞানী; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

বঙ্গবন্ধুর প্রকৃতি দর্শন

 ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী 
১৮ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চলমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তন-বৈশ্বিক উষ্ণতা-প্রকৃতি নিধনের বৈরী প্রভাবে সমগ্র বিশ্ব প্রায় বিপন্ন-পর্যুদস্ত। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি-ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস-বন্যা-খরা-তীব্র তাপদাহে পৃথিবী নামক এ গ্রহের সর্বত্রই নানামুখী অনাকাঙ্ক্ষিত ভয়াবহ পরিবেশ-পরিস্থিতি পরিলক্ষিত। জনজীবনের স্বাভাবিক-সাবলীল গতিপ্রবাহে এসব মানবসৃষ্ট দুর্যোগ উন্নত বিশ্ব অনেকাংশে পরাভূত করলেও; উন্নয়নশীল-অনুন্নত দেশগুলো দুঃসহ যন্ত্রণাদগ্ধ। ভোগবাদী-বিনোদননির্ভর লুম্পেন পুঁজিবাদী আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় লণ্ডভণ্ড ঝুঁকি থেকে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিও মুক্ত নয়। এমন কোনো কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী-বিজ্ঞানী-প্রকৃতিপ্রেমী রাষ্ট্রনায়ক নেই, যারা অতীতে প্রকৃতির অসাধারণ সৌন্দর্য-বৈশিষ্ট্যগুলো ধারণ করে আগামীর জন্য একটি নিরাপদ ধরিত্রীর বিষয়ে নিগূঢ় ভাবিত ছিলেন না। বিশ্বকবি রবিঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, পল্লীকবি জসীমউদ্দীনসহ এদেশের প্রায় প্রত্যেকেরই গদ্য-পদ্য-রচনায় ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে প্রকৃতি-জীববৈচিত্র্যে অতুলনীয় বন্দনাগাথা বাঙালি জাতির সংস্কৃতি-কৃষ্টি-ঐতিহ্যকে করেছে নান্দনিকতায় অত্যুজ্জ্বল।

রবিঠাকুরের ‘বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’ কবিতায় ‘দিনের আলো নিবে এল সুয্যি ডোবে ডোবে।/আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।/মেঘের উপর মেঘ করেছে, রঙের উপর রঙ।/মন্দিরেতে কাঁসর ঘণ্টা বাজল ঠঙ্ ঠঙ্।/ও পারেতে বিষ্টি এল, ঝাপসা গাছপালা।/এ পারেতে মেঘের মাথায় একশো মানিক জ্বালা।/... আকাশ জুড়ে মেঘের খেলা, কোথায় বা সীমানা-/দেশে দেশে খেলে বেড়ায়, কেউ করে না মানা।/কত নতুন ফলের বনে বিষ্টি দিয়ে যায়,/পলে পলে নতুন খেলা কোথায় ভেবে যায়!/...মেঘের খেলা দেখে কত খেলা পড়ে মনে,/কত দিনের লুকোচুরি কত ঘরের কোণে!/ তারি সঙ্গে মনে পড়ে ছেলেবেলার গান-/বিষ্টি পড়ে টাপার টুপুর, নদেয় এল বান’ উল্লেখিত পঙ্ক্তিগুলো প্রকৃতি ভাবনায় প্রণিধানযোগ্য। কবি নজরুলের বৈশাখ-শ্রাবণকে নিয়ে অনবদ্য উচ্চারণ নানাভাবে জাতির প্রাণস্পন্দনকে জাগরূক রেখেছে। চলমান পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় প্রকৃতি বা পরিবেশ বিধ্বংসী কদাচার-অনুন্নয়নের উন্নয়ন সম্পৃক্ত অপরিকল্পিত দৃষ্টিভঙ্গিতে বিরাজমান সংকট মোকাবিলায় মুক্তির মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রকৃতি দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা বিশ্লেষণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেই দেশ পুনর্গঠনে নিবিড় মনোনিবেশ করেন। বিদেশি এক সাংবাদিকের ‘যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাকে কী করে গড়ে তুলবেন?’ প্রশ্নের জবাবে সেদিন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার আছে সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা বাংলার মাটি আর আছে সোনার মানুষ।’ মূলত বঙ্গবন্ধুর প্রেরণার মূল উৎসশক্তি ছিল এ দেশের মানুষের অফুরন্ত ভালোবাসা। বঙ্গবন্ধুও গভীরভাবে ভালোবেসেছিলেন এদেশের মাটি, মানুষ, পরিবেশ ও প্রকৃতিকে। তাই দেশ গঠনে সামগ্রিক উন্নয়নের কর্মকৌশলের পাশাপাশি যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত বনজসম্পদ উন্নয়নে নিয়েছিলেন নানামুখী পন্থা। বঙ্গবন্ধু সব উন্নয়ন কর্মযজ্ঞে সার্বক্ষণিক পরিবেশ উন্নয়নের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের ঘোড়দৌড় বন্ধ করে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ডেকে রেসিং ট্র্যাকের ওপর সারিবদ্ধভাবে নারিকেল গাছ লাগানোর নির্দেশনা দেন। গাছ লাগিয়ে বঙ্গবন্ধু এটির নাম দেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। দেশের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে গাছ লাগান গণভবন ও বঙ্গভবনে। প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণ, সবুজ-নির্মল পরিবেশ নিশ্চিতে দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু করে তিনি সবাইকে বাড়ির আশপাশ, পতিত জমিসহ সর্বস্তরে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সবুজ বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন।

বিশ্বকবি রবিঠাকুরের অমর পঙ্ক্তি ‘দেশকে ভালোবাসিবার প্রথম লক্ষণ ও প্রথম কর্তব্য পরিষ্কারভাবে জানা। দেশে জন্মালেই দেশ আপন হয় না। যতক্ষণ দেশকে না-জানি, ততক্ষণ সে দেশ আপনার নয়।’ এর নির্যাস উপলব্ধিতেই বঙ্গবন্ধু বাংলার প্রকৃতির অপরূপ রূপের প্রেমে মজেছিলেন। প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি বঙ্গবন্ধুর যে অসাধারণ ভালোবাসা, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইয়ে তা সুন্দরভাবে চিত্রিত হয়েছে। তার লেখা এ বইয়ে তিনি একাধিকবার মধুমতি নদীর কথা উল্লেখ করেছেন। বইয়ের ১৭১নং পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি একটা ফুলের বাগান শুরু করেছিলাম। এখানে কোনো ফুলের বাগান ছিল না। জমাদার, সিপাহীদের দিয়ে আমি ওয়ার্ড থেকে ফুলের গাছ আনতাম। আমার বাগানটা খুব সুন্দর হয়েছিল।’ একজন সত্যিকারের প্রকৃতিপ্রেমিক হিসাবে বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ কারাজীবনেও প্রকৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন, যার অনন্য নজির পাওয়া যায় ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থেও। বইয়ে ১৯৬৬ সালের ১৭ জুলাই বঙ্গবন্ধু লিখেছিলেন, ‘বাদলা ঘাসগুলি আমার দূর্বার বাগানটা নষ্ট করে দিতেছে। কত যে তুলে ফেললাম। তবুও শেষ করতে পারছি না। আমিও নাছোড়বান্দা। আজ আবার কয়েকজন কয়েদি নিয়ে বাদলা ঘাস ধ্বংসের অভিযান শুরু করলাম। অনেক তুললাম আজ। আমি কিছু সময় আরও কাজ করলাম ফুলের বাগানে।’ বঙ্গবন্ধুর জীবনচরিত পর্যালোচনায় তার প্রকৃতিপ্রেমের দৃশ্যমানতা সুস্পষ্ট। পরিবেশের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অকৃত্রিম ভালোবাসা সবার জন্য অনুকরণীয় হয়ে আছে। তৎকালীন গণভবনের এক কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, গণভবনে কোনো জেলা প্রশাসক এলে নানা কথার মধ্যে বঙ্গবন্ধু তাকে প্রচুর গাছ লাগানোর কথা বলতেন।

১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ কর্মসূচি উদ্বোধনের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমরা গাছ লাগাইয়া সুন্দরবন পয়দা করি নাই, স্বাভাবিক অবস্থায় প্রকৃতি এটাকে করে দিয়েছে বাংলাদেশকে রক্ষা করার জন্য। বঙ্গোপসাগরের পাশ দিয়া যে সুন্দরবনটা রয়েছে, এটা হলো বেরিয়ার, এটা যদি রক্ষা করা না হয়, তাহলে একদিন খুলনা, পটুয়াখালী, কুমিল্লার কিছু অংশ, ঢাকার কিছু অংশ পর্যন্ত এরিয়া সমুদ্রে তলিয়া যাবে এবং হাতিয়া ও সন্দ্বীপের মতো আইল্যান্ড হয়ে যাবে। একবার সুন্দরবন যদি শেষ হয়ে যায়, তাহলে সমুদ্র যে ভাঙন থেকে রক্ষা করার কোনো উপায় আর নাই।’ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বহুল আলোচিত জলবায়ু পরিবর্তন থেকে দেশকে প্রভাবমুক্ত রাখার বিষয়টি দূরদর্শী বঙ্গবন্ধু তখনই যথার্থ অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। ফলে তিনি উপকূলীয় এলাকায় সবুজায়নের উদ্যোগ গ্রহণ এবং বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব উপলব্ধিতে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টি করেন। তিনি উপকূলে বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি বেশি করে নারিকেল গাছ লাগানোর আহ্বান জানান। দেশের সমগ্র জাতীয়-আঞ্চলিক রাস্তার দুপাশে গাছপালা লাগানোর সূচনা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর হাতেই।

প্রকৃতিপ্রেমিক বঙ্গবন্ধু সুজলা-সুফলা বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের অত্যাধিক গুরুত্বারোপে দেশে বিভিন্ন আইন প্রণয়ন এবং বিধিমালা জারি করেন। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় বঙ্গবন্ধু কর্তৃক গৃহীত বহুমাত্রিক কর্মকাণ্ড এখনো চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। ধারাবাহিকভাবে পবিত্র সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে সংযোজিত হয় ‘রাষ্ট্র বর্তমান-ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি সংরক্ষণ ও নিরাপত্তাবিধান করিবেন।’ পরিবেশের গুরুত্ব বিবেচনায় ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু ‘ওয়াটার পলিউশন কন্ট্রোল অর্ডিনেন্স ১৯৭৩’ জারি করেন। একই বছর পানি দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রম সূচিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের বনজসম্পদের অবৈধ পাচার রোধে বঙ্গবন্ধু ‘চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস ফরেস্ট ট্রানজিট রুলস-১৯৭৩’ জারি করেন। এছাড়াও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন-১৯৭৪’ প্রণয়ন করা হয় বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে। ১৯৭৫ সালের ১ জুলাই বঙ্গবন্ধু প্রতিষ্ঠিত ‘ন্যাশনাল হার্বেরিয়াম’ উদ্ভিদ প্রজাতি সংরক্ষণ ও গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করে। পরে প্রতিষ্ঠিত হয় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ অধিদপ্তর। সুন্দরবনের বুক চিরে প্রবাহিত নৌপথ দিয়ে ভারী জাহাজ চলাচলে সুন্দরবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করার আশঙ্কায় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে লুপ কাটিং ড্রেজিংয়ের সাহায্যে বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার ঘষিয়াখালী থেকে রামপাল উপজেলার বেতবুনিয়া পর্যন্ত ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার সংযোগ খাল খনন করে ১৯৭৪ সালে মোংলা ঘষিয়াখালী বাণিজ্যিক নৌপথ চালু করা হয়।

সবুজ বিপ্লব সফল করতে ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে কৃষি গ্র্যাজুয়েটদের আহ্বান করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আপনারা যারা কৃষি শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছেন, আপনাদের গ্রামে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে মিশে যেতে হবে, মনোযোগ দিতে হবে তাদের চাহিদা আর কর্মের ওপর, তবেই তারা সাহসী হবে, আগ্রহী হবে, উন্নতি করবে, ফলাবে সোনার ফসল খেত ভরে। গ্রাম উন্নত হলে দেশ উন্নত হবে। কৃষককে বাঁচাতে হবে, উৎপাদন বাড়াতে হবে। তা না-হলে বাংলাদেশকে বাঁচাতে পারব না।’ বর্ষায় আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে বন্যার প্রাদুর্ভাব, চৈত্র মাসের খরা ও বৃষ্টিহীনতার দরুন পানির অভাব ইত্যাদি প্রকৃতির বিরূপ আচরণ মোকাবিলায় পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা গ্রহণে বঙ্গবন্ধু ইপি ওয়াপদার পানি উইং আলাদা করে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড গঠন করেন। বঙ্গবন্ধু দূরদর্শী চিন্তায় ১৯৭২ সালেই ভারতের সঙ্গে অভিন্ন নদীগুলোর পানির হিস্যা আদায়ে যৌথ নদী কমিশন গঠিত এবং নদীর নাব্য রক্ষার্থে নেদারল্যান্ডস সরকারের সঙ্গে নদী খননের জন্য ড্রেজিংয়ের চুক্তি সম্পাদিত হয়। নদীমাতৃক আবহমান বাংলার প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ হাওড় উন্নয়ন বোর্ড, নারায়ণগঞ্জ ড্রেজার পরিদপ্তর, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীন বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র, ঘূর্ণিঝড় থেকে জানমাল রক্ষায় ‘মুজিব কিল্লা’ নির্মাণ এবং ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিসি) প্রতিষ্ঠার মতো বহুবিধ কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশের প্রকৃতি-পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় যে সামাজিক সচেতনতা-আন্দোলনের শুভ সূচনা রচিত হয়েছিল, তা দৃঢ়ভাবে অব্যাহত রেখেছেন জাতির পিতার সুযোগ্য তনয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। সবুজায়নের চাদরে আচ্ছাদিত বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা আজ বিশ্বে অনন্য মর্যাদায় সমাসীন। প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বর্তমান সরকার বিভিন্ন যুগান্তকারী পদক্ষেপ বাস্তবায়িত করছে। পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় ২০১৫ সালে দেশরত্ন শেখ হাসিনা জাতিসংঘের ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ পুরস্কার পেয়েছেন। মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে সরকার একদিনে এক কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি পালন করেছে। বিরল, বিপদাপন্ন, বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণী প্রজাতি সংরক্ষণ, শিক্ষা-গবেষণা, সচেতনতা সৃষ্টি ইত্যাদিতে অসামান্য অবদানের জন্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ২০১০ সাল থেকে ‘বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন’ পুরস্কার প্রদান করে আসছে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশব্যাপী ২৮১টি মিউনিসিপ্যালটিতে ‘ভূমি অধিগ্রহণ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ পরিকল্পনা’ শীর্ষক প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ছিল-সড়ক উন্নয়ন, ব্রিজ-কালভার্ট-ড্রেন নির্মাণ, ভূমি অধিগ্রহণ-পুনর্বাসন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, খাল খনন, পাড় বাঁধানো, পুকুর সংস্কার, সৌন্দর্যবর্ধন, বৃক্ষরোপণ। এ ছাড়া জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পৌরসভার অবকাঠামো ও নাগরিক সুবিধা-কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে দারিদ্র্য হ্রাস এবং অপরিহার্য অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে পরিবেশগত উন্নয়ন। ওই প্রকল্প উপস্থাপনা প্রত্যক্ষকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ফসলের জমি যাতে নষ্ট না হয়, সেভাবে কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। তার পথ অনুসরণ করে পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি নিতে হবে। শুধু ইট-সুরকির স্থাপনা নির্মাণ নয়; বরং প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।’ ওই অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকন্যা নদীতে অপ্রয়োজনীয় সেতু ও বিলের পাশে সাগরপারের মতো উঁচু বাঁধ নির্মাণ না করার পরামর্শ এবং আবাদি জমি রক্ষার কথা মাথায় রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।

প্রসঙ্গত কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘উটপাখি’ কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি উপস্থাপন করতে চাই, ‘আমার কথা কি শুনতে পাও না তুমি?/কেন মুখ গুঁজে আছো তবে মিছে ছলে?/কোথায় লুকোবে? ধু-ধু মরুভূমি;/ক্ষ’য়ে ক্ষ’য়ে ছায়া ম’রে গেছে পদতলে।/ আজ দিগন্তে মরীচিকাও যে নেই;/ নির্বাক, নীল নির্মম মহাকাশ।/...নব সংসার পাতি গো আবার, চলো/যে-কোনো নিভৃত কণ্টকাবৃত বনে।/মিলবে সেখানে অনন্ত নোনা জলও,/ খসবে খেজুর মাটির আকর্ষণে,/... আমি জানি এই ধ্বংসের দায়ভাগে আমরা দুজনে সমান অংশীদার;/ অপরে পাওনা আদায় করেছে আগে, আমাদের দেনা শোধবার ভার।’ এটি স্পষ্ট যে, অতীতের পরিশুদ্ধ মানবসমাজ প্রকৃতি-পরিবেশকে যথার্থ অর্থে ধারণ করেছিল। দূর অতীতে সংঘটিত ধ্বংসযজ্ঞের দায়ভাগ তারা কিছু মিটিয়ে গেলেও চলমান সময়কালে সব দায়ভার আমাদের বহন করতেই হবে। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কদর্য অনাসৃষ্টির ফলে নিরাপদ-নিরাপত্তাহীন পর্যুদস্ত জীবন-জীবিকার প্রতিবন্ধকতায় সত্যের কাঠিন্যে আমাদের ব্যর্থতাকে অভিযুক্ত করবেই।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : সমাজ-অপরাধবিজ্ঞানী; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন