ভোটবিহীন জেলা পরিষদ নির্বাচন!
jugantor
মিঠে কড়া সংলাপ
ভোটবিহীন জেলা পরিষদ নির্বাচন!

  ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন  

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের ৬১ জেলায় জেলা পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ২২টিতে ইতোমধ্যেই ২২ জন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে জানা গেছে। এখন বাকি ৩৯ জেলায় একাধিক প্রার্থী থাকলেও সে ক্ষেত্রেও প্রায় প্রতিটি জেলাতেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাই একে অপরের বিরুদ্ধে প্রার্থিতা দাখিল করায় আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনে হয়তো দেখা যাবে বাদবাকি সবক’টি জেলার জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

কারণ দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগের যেসব প্রার্থী এখনো প্রার্থিতা ধরে রেখেছেন, তাদের সবাই চাপের মুখে আছেন। বিদ্রোহী প্রার্থীরা যাতে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন সেজন্য দলীয় হাইকমান্ড তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখায় শেষ পর্যন্ত সেসব বিদ্রোহী প্রার্থীর কয়জন নির্বাচনি ময়দানে থাকবেন বা থাকতে পারবেন, ২৫ সেপ্টেম্বর দিন শেষেই তা জানা যাবে। আর সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রায় সবাই যদি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন, তাহলে দেশ ও জাতি আরও একবার ভোটবিহীন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান উপহার পাবেন!

দু-একটি জেলায় ভিন্ন দলের প্রার্থী থাকলেও তারা কোনো ভোট পাবেন না। কারণ জেলা পরিষদ নির্বাচনে যেসব ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার, উপজেলা চেয়ারম্যান ইত্যাদি ভোটাররা ভোট দেবেন, তাদের প্রায় ৯৫ শতাংশই আওয়ামী লীগদলীয় ব্যক্তি। ভিন্ন দলের ২/৪ জন প্রার্থী নির্বাচনি ময়দানে থাকলেও তাদের দলের ভোটার সংখ্যা একেবারে নেই বললেই চলে। এ অবস্থায় সেসব প্রার্থীর নীরবে প্রস্থান ছাড়া কোনো গতি থাকবে না।

সুতরাং আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা ২৫ তারিখের মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিলে ২৬ সেপ্টেম্বরই জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রায় সব জেলাতেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে যাবেন। আর নির্বাচন কমিশনও ঘরে বসেই জেলা পরিষদ নির্বাচনের কাজটি সেরে ফেলবেন! ইভিএম মেশিন নিয়ে মাঠে দৌড়ানোর কাজটি ঘরে বসে করে ফেলতে পারায় তারাও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারবেন।

অথচ যুগ যুগ ধরে অপেক্ষা করে মাত্র কিছুদিন হলো জেলা পরিষদে নির্বাচন শুরু হয়েছিল। অনেক দাবি-দাওয়া, লেখালেখিসহ বুদ্ধিজীবী, গণতান্ত্রিক এবং রাজনৈতিক চিন্তাচেতনার সাধকদের অনেক দিনের স্বপ্নের ফসল ছিল জেলা পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠান। কিন্তু সেই নির্বাচনও এখন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে চলেছে। বারবার প্রশাসক বসানোসহ একের পর এক সেখানে বিনা ভোটে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান অধিষ্ঠিত হচ্ছেন।

জেলা পরিষদের ভোটেও ভোটাররা ভোট দিতে পারছেন না বা ভোটারদের ভোট দিতে হচ্ছে না। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বারবার এভাবে ভোটবিহীন অধিষ্ঠান দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও যে অন্তরায় সৃষ্টি করে চলেছে, সে কথাটিও ভেবে দেখা হচ্ছে না। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের নিজ নিজ সুবিধামতো অবস্থান নিয়ে দায়সারা কর্মকাণ্ড এবং বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে চলেছে। আর সরকারি দলও সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে হয়তো বলবে, ‘কেউ নির্বাচনে না এলে তো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতেই হবে, এতে দোষের কী!’

অথচ এসব সুবিধাবাদী চিন্তাধারার বাইরে এসে সরকারি দল, বিরোধী দল কেউই ভেবে দেখছে না, তাহলে গণতন্ত্রের অবস্থা, অবস্থানই বা কী বা কোথায়? তাহলে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এত হইচই, চেঁচামেচি, মায়াকান্নারই বা দরকার কী! দীর্ঘদিন ধরে দেশের মানুষ যে ভোট দিতে যেতে পারছেন না, বা ভোট দিতে যাচ্ছেন না, সেসবেরও তো অবসান হওয়া উচিত। লক্ষণীয় বিষয় হলো, জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও এবারের জেলা পরিষদ নির্বাচনে না আসায় এই নির্বাচনের মাঠ একতরফা আওয়ামী লীগের হাতেই রয়ে গেল। এ অবস্থায় এসব কীসের লক্ষণ, সে বিষয়টিও কিন্তু ভেবে দেখার সময় পার হয়ে যাচ্ছে। কারণ, সবকিছু একতরফা হয়ে গেলে তারও একটা উলটো ফল আছে।

আমার লেখায় এসব কথা উল্লেখ করার কারণ, দেশের গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়লে স্বার্থান্বেষী মহল ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের সুযোগ পেয়ে যাবেন। সরকারবিরোধীরা বলতে পারবেন, জেলা পরিষদ নির্বাচনের নামে সরকার প্রহসন করেছে। ভোটাভুটি ছাড়াই জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে লোক বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বারবার এভাবে ভোটবিহীন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হলে দেশের জনগণও তা সহজভাবে মেনে নেবেন বলে মনে হয় না। সে ক্ষেত্রে জনসাধারণের মনেও এ ধারণা জন্মাতে পারে যে, ‘দেশের নির্বাচনি ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে’। এ অবস্থায় সরকারি দল তথা সরকারের উচিত ছিল, অন্তত বর্তমান জাতীয় সংসদের বিরোধী দলকে আস্থায় এনে জেলা পরিষদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। কিন্তু তা-ও করা হয়নি। ফলে আসন্ন জেলা পরিষদ নির্বাচনও সরকারি দলের লোকদের মাঝে চেয়ার বণ্টনের আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আজকের লেখাটির প্রস্তুতি হিসাবে আসন্ন জেলা পরিষদ নির্বাচনে সরকারি দলের মনোনয়ন বোর্ডের সভার দিনে আমি মনোনয়ন বোর্ডের অন্যতম সদস্য কাজী জাফরুল্লাহ সাহেবকে টেলিফোনে পেয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, আজকের সভায় মনোনয়নের ক্ষেত্রে কোন ধরনের প্রার্থীকে প্রাধান্য দেওয়া হবে? স্থানীয় প্রভাবশালী সংসদ-সদস্যদের সুপারিশে, নাকি দেশদরদি, পরোপকারী ব্যক্তি যারা দীর্ঘকাল ধরে মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন, মানুষের উপকার করে চলেছেন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করে চলেছেন, এমন সব প্রার্থীর বিষয়টি বিবেচনায় আনা হবে? আমার প্রশ্ন শুনে সরাসরি তিনি বলেছিলেন, সবকিছু নেত্রীর ওপর নির্ভরশীল। সেখানে প্রভাবশালী কোনো এমপি বা এ ধরনের কারও কোনো প্রভাবের কোনো সুযোগ নেই।

বলা বাহুল্য, সেদিন প্রশ্নের জবাবে তার কথাগুলো শুনে আমার বেশ ভালোই লেগেছিল। কারণ, আমিও চাচ্ছিলাম, দেখেশুনে জনসেবাদানকারী নিঃস্বার্থ রাজনৈতিক ব্যক্তিরাই যেন আসন্ন জেলা পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন পান। কিন্তু মনোনয়ন-পরবর্তীকালে যা দেখেছি, তাতে আমার সে ধারণা ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুল ব্যক্তি, এমনকি হঠাৎ করে উড়ে এসে জুড়ে বসা ব্যক্তিও মনোনয়ন পেয়েছেন। আর সে অবস্থায়, এবারের জেলা পরিষদ নির্বাচনে সরকারি দলের মনোনয়ন প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব-প্রতিপত্তি কাজ করেনি, এমন ধারণাও আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। বরং আমার কাছে সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে যে, অনেক ক্ষেত্রেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যাদের বিশ্বাস করেন, এমন কোনো কাছের ব্যক্তির কথাতেই কেউ কেউ মনোনয়ন পেয়েছেন। যাক সে কথা।

এবারে জেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে আমার নিজ জেলা ‘পাবনার’ কিছু কথা বলেই লেখাটি শেষ করতে চাই। সপ্তাহখানেক আগে আমি পাবনা এসেছি। এখানে এসেই জেলা পরিষদ নির্বাচনের হালচাল সংগ্রহ করতে গিয়ে যা বুঝলাম, তাতে সরকারি দল থেকে যিনি মনোনয়ন পেয়েছেন, তিনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেছেন। কারণ জেলা কমিটির সাবেক প্রচার সম্পাদক কিছুতেই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে চাচ্ছেন না। উল্লেখ্য, পাবনায় এবার জেলা কমিটির একজন উপদেষ্টা সদস্যকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

আর আমার বয়সি এমন একজন প্রবীণ ব্যক্তিকে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দেওয়ায় আমি মনেপ্রাণে খুশিই হয়েছিলাম। কিন্তু তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিদ্রোহী প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষদিনেও হয়তো দেখা যাবে তা প্রত্যাহার করেননি। বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ এ প্রার্থীর প্রচুর সমর্থক, তথা লোকবল থাকায় তিনি দিনরাত শোডাউন করে চলেছেন! এমনকি জেলা কমিটি কর্তৃক মিটিং করে তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তাকে জানিয়ে দেওয়ার পরও তিনি নিজস্ব কর্মী-সমর্থক নিয়ে পালটা মিটিং করে প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করার পক্ষে অটল রয়েছেন।

এ বিষয়ে আমি তার এক সমর্থক নেতাকে প্রশ্ন করলে, তিনি বললেন, ভুল ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিলে এমনটি হবেই। আমরা কেউ কেউ ত্রিশ-চল্লিশ বছর ধরে দলের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করে চলেছি অথচ যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, স্বাধীনতার পর তিনি দেশত্যাগ করে বিদেশ চলে যান এবং সেখানে বাড়িঘর করে সপরিবারে সেটেল্ড হয়ে একনাগাড়ে দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর বিদেশে থেকে পরিবার-পরিজন সেখানে রেখে মাত্র কয়েক বছর আগে দেশে ফিরে জেলা কমিটির উপদেষ্টা সদস্য পদ গ্রহণ করাসহ সাবেক মিত্রদের মাধ্যমে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের মনোনয়ন বাগিয়ে নিয়েছেন। ইউরোপপ্রবাসী এ দ্বৈত নাগরিকের কোনো জনসমর্থন নেই, কোনো কর্মী-সমর্থকও নেই।

প্রায় ৫০ বছর আগে তিনি ছাত্রলীগ করতেন, শুধু এ বিষয়টি কাজে লাগিয়েই তার সাবেক মিত্ররা প্রভাব খাটিয়ে তাকে মনোনয়ন পাইয়ে দিয়েছেন। অথচ তিনি দেশ ছেড়ে প্রায় ৪০ বছর প্রবাসে থাকায় এ দেশের মাটি-মানুষের সঙ্গে তিনি যে সম্পর্কহীন হয়ে পড়েছেন, মনোনয়ন বোর্ডে এ কথাটি কেউ তুলে ধরেননি। প্রায় এক নিশ্বাসে তিনি এসব বলে ফেলায়, মাঝখানে আমি কিছু বলার সুযোগ না পেয়ে তার কথার শেষে শুধু এটুকু বললাম যে, ‘যেহেতু দল থেকে তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, সুতরাং এসব কথা এখন না বলাই ভালো’। কিন্তু আমার কথায় তার মন গললো বলে মনে হলো না। এ বিষয়ে তাকে কট্টরপন্থি বলেই মনে হলো।

পাদটীকা : আমাদের দেশে সরকারি দল পরিচালনা একটি কঠিন কাজই বটে। আর সরকার চালানো, সে তো আরও কঠিন, ভীষণ কঠিন। অথচ কঠিন থেকে কঠিনতর সেই কাজটিই এখন বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রায় এক হাতে সামলাতে হচ্ছে এবং সেক্ষেত্রে হয়তো কিছু ভুলভ্রান্তিও হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় সেসব ভুলভ্রান্তি তিনি কীভাবে সমাধান করবেন, সে বিষয়টিও ভেবেচিন্তে তাকেই বের করতে হবে। তবে আমি বলতে চাই, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার থিঙ্কট্যাঙ্কটিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে কাজে লাগাতে পারেন এবং প্রয়োজনে আরও একটি সংক্ষিপ্ত স্পেশাল থিঙ্কট্যাঙ্ক গঠন করতে পারেন।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

মিঠে কড়া সংলাপ

ভোটবিহীন জেলা পরিষদ নির্বাচন!

 ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন 
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের ৬১ জেলায় জেলা পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ২২টিতে ইতোমধ্যেই ২২ জন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে জানা গেছে। এখন বাকি ৩৯ জেলায় একাধিক প্রার্থী থাকলেও সে ক্ষেত্রেও প্রায় প্রতিটি জেলাতেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাই একে অপরের বিরুদ্ধে প্রার্থিতা দাখিল করায় আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনে হয়তো দেখা যাবে বাদবাকি সবক’টি জেলার জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

কারণ দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগের যেসব প্রার্থী এখনো প্রার্থিতা ধরে রেখেছেন, তাদের সবাই চাপের মুখে আছেন। বিদ্রোহী প্রার্থীরা যাতে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন সেজন্য দলীয় হাইকমান্ড তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখায় শেষ পর্যন্ত সেসব বিদ্রোহী প্রার্থীর কয়জন নির্বাচনি ময়দানে থাকবেন বা থাকতে পারবেন, ২৫ সেপ্টেম্বর দিন শেষেই তা জানা যাবে। আর সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রায় সবাই যদি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন, তাহলে দেশ ও জাতি আরও একবার ভোটবিহীন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান উপহার পাবেন!

দু-একটি জেলায় ভিন্ন দলের প্রার্থী থাকলেও তারা কোনো ভোট পাবেন না। কারণ জেলা পরিষদ নির্বাচনে যেসব ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার, উপজেলা চেয়ারম্যান ইত্যাদি ভোটাররা ভোট দেবেন, তাদের প্রায় ৯৫ শতাংশই আওয়ামী লীগদলীয় ব্যক্তি। ভিন্ন দলের ২/৪ জন প্রার্থী নির্বাচনি ময়দানে থাকলেও তাদের দলের ভোটার সংখ্যা একেবারে নেই বললেই চলে। এ অবস্থায় সেসব প্রার্থীর নীরবে প্রস্থান ছাড়া কোনো গতি থাকবে না।

সুতরাং আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা ২৫ তারিখের মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিলে ২৬ সেপ্টেম্বরই জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রায় সব জেলাতেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে যাবেন। আর নির্বাচন কমিশনও ঘরে বসেই জেলা পরিষদ নির্বাচনের কাজটি সেরে ফেলবেন! ইভিএম মেশিন নিয়ে মাঠে দৌড়ানোর কাজটি ঘরে বসে করে ফেলতে পারায় তারাও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারবেন।

অথচ যুগ যুগ ধরে অপেক্ষা করে মাত্র কিছুদিন হলো জেলা পরিষদে নির্বাচন শুরু হয়েছিল। অনেক দাবি-দাওয়া, লেখালেখিসহ বুদ্ধিজীবী, গণতান্ত্রিক এবং রাজনৈতিক চিন্তাচেতনার সাধকদের অনেক দিনের স্বপ্নের ফসল ছিল জেলা পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠান। কিন্তু সেই নির্বাচনও এখন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে চলেছে। বারবার প্রশাসক বসানোসহ একের পর এক সেখানে বিনা ভোটে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান অধিষ্ঠিত হচ্ছেন।

জেলা পরিষদের ভোটেও ভোটাররা ভোট দিতে পারছেন না বা ভোটারদের ভোট দিতে হচ্ছে না। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বারবার এভাবে ভোটবিহীন অধিষ্ঠান দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও যে অন্তরায় সৃষ্টি করে চলেছে, সে কথাটিও ভেবে দেখা হচ্ছে না। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের নিজ নিজ সুবিধামতো অবস্থান নিয়ে দায়সারা কর্মকাণ্ড এবং বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে চলেছে। আর সরকারি দলও সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে হয়তো বলবে, ‘কেউ নির্বাচনে না এলে তো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতেই হবে, এতে দোষের কী!’

অথচ এসব সুবিধাবাদী চিন্তাধারার বাইরে এসে সরকারি দল, বিরোধী দল কেউই ভেবে দেখছে না, তাহলে গণতন্ত্রের অবস্থা, অবস্থানই বা কী বা কোথায়? তাহলে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এত হইচই, চেঁচামেচি, মায়াকান্নারই বা দরকার কী! দীর্ঘদিন ধরে দেশের মানুষ যে ভোট দিতে যেতে পারছেন না, বা ভোট দিতে যাচ্ছেন না, সেসবেরও তো অবসান হওয়া উচিত। লক্ষণীয় বিষয় হলো, জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও এবারের জেলা পরিষদ নির্বাচনে না আসায় এই নির্বাচনের মাঠ একতরফা আওয়ামী লীগের হাতেই রয়ে গেল। এ অবস্থায় এসব কীসের লক্ষণ, সে বিষয়টিও কিন্তু ভেবে দেখার সময় পার হয়ে যাচ্ছে। কারণ, সবকিছু একতরফা হয়ে গেলে তারও একটা উলটো ফল আছে।

আমার লেখায় এসব কথা উল্লেখ করার কারণ, দেশের গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়লে স্বার্থান্বেষী মহল ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের সুযোগ পেয়ে যাবেন। সরকারবিরোধীরা বলতে পারবেন, জেলা পরিষদ নির্বাচনের নামে সরকার প্রহসন করেছে। ভোটাভুটি ছাড়াই জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে লোক বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বারবার এভাবে ভোটবিহীন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হলে দেশের জনগণও তা সহজভাবে মেনে নেবেন বলে মনে হয় না। সে ক্ষেত্রে জনসাধারণের মনেও এ ধারণা জন্মাতে পারে যে, ‘দেশের নির্বাচনি ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে’। এ অবস্থায় সরকারি দল তথা সরকারের উচিত ছিল, অন্তত বর্তমান জাতীয় সংসদের বিরোধী দলকে আস্থায় এনে জেলা পরিষদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। কিন্তু তা-ও করা হয়নি। ফলে আসন্ন জেলা পরিষদ নির্বাচনও সরকারি দলের লোকদের মাঝে চেয়ার বণ্টনের আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আজকের লেখাটির প্রস্তুতি হিসাবে আসন্ন জেলা পরিষদ নির্বাচনে সরকারি দলের মনোনয়ন বোর্ডের সভার দিনে আমি মনোনয়ন বোর্ডের অন্যতম সদস্য কাজী জাফরুল্লাহ সাহেবকে টেলিফোনে পেয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, আজকের সভায় মনোনয়নের ক্ষেত্রে কোন ধরনের প্রার্থীকে প্রাধান্য দেওয়া হবে? স্থানীয় প্রভাবশালী সংসদ-সদস্যদের সুপারিশে, নাকি দেশদরদি, পরোপকারী ব্যক্তি যারা দীর্ঘকাল ধরে মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন, মানুষের উপকার করে চলেছেন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করে চলেছেন, এমন সব প্রার্থীর বিষয়টি বিবেচনায় আনা হবে? আমার প্রশ্ন শুনে সরাসরি তিনি বলেছিলেন, সবকিছু নেত্রীর ওপর নির্ভরশীল। সেখানে প্রভাবশালী কোনো এমপি বা এ ধরনের কারও কোনো প্রভাবের কোনো সুযোগ নেই।

বলা বাহুল্য, সেদিন প্রশ্নের জবাবে তার কথাগুলো শুনে আমার বেশ ভালোই লেগেছিল। কারণ, আমিও চাচ্ছিলাম, দেখেশুনে জনসেবাদানকারী নিঃস্বার্থ রাজনৈতিক ব্যক্তিরাই যেন আসন্ন জেলা পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন পান। কিন্তু মনোনয়ন-পরবর্তীকালে যা দেখেছি, তাতে আমার সে ধারণা ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুল ব্যক্তি, এমনকি হঠাৎ করে উড়ে এসে জুড়ে বসা ব্যক্তিও মনোনয়ন পেয়েছেন। আর সে অবস্থায়, এবারের জেলা পরিষদ নির্বাচনে সরকারি দলের মনোনয়ন প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব-প্রতিপত্তি কাজ করেনি, এমন ধারণাও আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। বরং আমার কাছে সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে যে, অনেক ক্ষেত্রেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যাদের বিশ্বাস করেন, এমন কোনো কাছের ব্যক্তির কথাতেই কেউ কেউ মনোনয়ন পেয়েছেন। যাক সে কথা।

এবারে জেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে আমার নিজ জেলা ‘পাবনার’ কিছু কথা বলেই লেখাটি শেষ করতে চাই। সপ্তাহখানেক আগে আমি পাবনা এসেছি। এখানে এসেই জেলা পরিষদ নির্বাচনের হালচাল সংগ্রহ করতে গিয়ে যা বুঝলাম, তাতে সরকারি দল থেকে যিনি মনোনয়ন পেয়েছেন, তিনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেছেন। কারণ জেলা কমিটির সাবেক প্রচার সম্পাদক কিছুতেই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে চাচ্ছেন না। উল্লেখ্য, পাবনায় এবার জেলা কমিটির একজন উপদেষ্টা সদস্যকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

আর আমার বয়সি এমন একজন প্রবীণ ব্যক্তিকে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দেওয়ায় আমি মনেপ্রাণে খুশিই হয়েছিলাম। কিন্তু তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিদ্রোহী প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষদিনেও হয়তো দেখা যাবে তা প্রত্যাহার করেননি। বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ এ প্রার্থীর প্রচুর সমর্থক, তথা লোকবল থাকায় তিনি দিনরাত শোডাউন করে চলেছেন! এমনকি জেলা কমিটি কর্তৃক মিটিং করে তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তাকে জানিয়ে দেওয়ার পরও তিনি নিজস্ব কর্মী-সমর্থক নিয়ে পালটা মিটিং করে প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করার পক্ষে অটল রয়েছেন।

এ বিষয়ে আমি তার এক সমর্থক নেতাকে প্রশ্ন করলে, তিনি বললেন, ভুল ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিলে এমনটি হবেই। আমরা কেউ কেউ ত্রিশ-চল্লিশ বছর ধরে দলের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করে চলেছি অথচ যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, স্বাধীনতার পর তিনি দেশত্যাগ করে বিদেশ চলে যান এবং সেখানে বাড়িঘর করে সপরিবারে সেটেল্ড হয়ে একনাগাড়ে দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর বিদেশে থেকে পরিবার-পরিজন সেখানে রেখে মাত্র কয়েক বছর আগে দেশে ফিরে জেলা কমিটির উপদেষ্টা সদস্য পদ গ্রহণ করাসহ সাবেক মিত্রদের মাধ্যমে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের মনোনয়ন বাগিয়ে নিয়েছেন। ইউরোপপ্রবাসী এ দ্বৈত নাগরিকের কোনো জনসমর্থন নেই, কোনো কর্মী-সমর্থকও নেই।

প্রায় ৫০ বছর আগে তিনি ছাত্রলীগ করতেন, শুধু এ বিষয়টি কাজে লাগিয়েই তার সাবেক মিত্ররা প্রভাব খাটিয়ে তাকে মনোনয়ন পাইয়ে দিয়েছেন। অথচ তিনি দেশ ছেড়ে প্রায় ৪০ বছর প্রবাসে থাকায় এ দেশের মাটি-মানুষের সঙ্গে তিনি যে সম্পর্কহীন হয়ে পড়েছেন, মনোনয়ন বোর্ডে এ কথাটি কেউ তুলে ধরেননি। প্রায় এক নিশ্বাসে তিনি এসব বলে ফেলায়, মাঝখানে আমি কিছু বলার সুযোগ না পেয়ে তার কথার শেষে শুধু এটুকু বললাম যে, ‘যেহেতু দল থেকে তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, সুতরাং এসব কথা এখন না বলাই ভালো’। কিন্তু আমার কথায় তার মন গললো বলে মনে হলো না। এ বিষয়ে তাকে কট্টরপন্থি বলেই মনে হলো।

পাদটীকা : আমাদের দেশে সরকারি দল পরিচালনা একটি কঠিন কাজই বটে। আর সরকার চালানো, সে তো আরও কঠিন, ভীষণ কঠিন। অথচ কঠিন থেকে কঠিনতর সেই কাজটিই এখন বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রায় এক হাতে সামলাতে হচ্ছে এবং সেক্ষেত্রে হয়তো কিছু ভুলভ্রান্তিও হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় সেসব ভুলভ্রান্তি তিনি কীভাবে সমাধান করবেন, সে বিষয়টিও ভেবেচিন্তে তাকেই বের করতে হবে। তবে আমি বলতে চাই, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার থিঙ্কট্যাঙ্কটিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে কাজে লাগাতে পারেন এবং প্রয়োজনে আরও একটি সংক্ষিপ্ত স্পেশাল থিঙ্কট্যাঙ্ক গঠন করতে পারেন।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন