এ বিজয় শুধুই নারীর নয় সমাজ প্রগতিরও
jugantor
এ বিজয় শুধুই নারীর নয় সমাজ প্রগতিরও

  মুঈদ রহমান  

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গেল সপ্তাহটি ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি গৌরবোজ্জ্বল সময়। একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তের সাক্ষী হয়ে রইল গত ১৯ সেপ্টেম্বর। পাহাড়িকন্যা নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল সাফ নারী ফুটবলের ফাইনাল খেলা। খেলায় যোগ্যতর দল হিসাবে বাংলাদেশের নারী দল চ্যাম্পিয়ন হয়। বাংলাদেশের নারী ফুটবলের ইতিহাসে এটি একটি নতুন মাইলফলক। বিজয়ী হওয়ার কতগুলো রকমফের আছে-ভাগ্যপ্রসন্ন বিজয়, কাকতালীয় বিজয় ও যথাযথ যোগ্যতার বিজয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তৃতীয় বিজয়টি প্রযোজ্য। বাংলাদেশ যোগ্যতর দল হিসাবেই বিজয় ছিনিয়ে এনেছে, আনন্দের জোয়ারে ভাসিয়ে দিয়েছে সারা বাংলাদেশ ও দেশের মানুষকে। নারী সাফ ফুটবলের অতীতটা দেখলেই যোগ্যতা বোঝা সহজ হবে। ২০১০ সাল থেকে চালু হওয়া নারী সাফ ফুটবল প্রতিযোগিতা ২০১৯ সাল নাগাদ অনুষ্ঠিত হয়েছে পাঁচটি ফাইনাল। পাঁচটি ফাইনালের সবক’টিতেই জয় পেয়েছে শক্তিশালী ভারত। আর চারটিতে রানারআপ হয়েছে নেপাল। ২০১৬ সালের চতুর্থ ফাইনালে আমরা ভারতের কাছে হেরে রানারআপ হয়েছিলাম। ২০২২ সালের ষষ্ঠ আসরের গ্রুপ পর্বে আমাদের মেয়েরা মালদ্বীপকে ৩-০, পাকিস্তানকে ৬-০, আর বিগত পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নকে হারিয়েছে ৩-০ গোলে। সেমিফাইনালে ভুটানকে হারিয়েছে ৮-০ গোলে। স্বপ্নের ফাইনালে প্রতিদ্বন্দ্বী নেপালকে নিজেদের মাঠে হারিয়েছে ৩-১ গোলের পরিষ্কার ব্যবধানে। সুতরাং পুরো টুর্নামেন্টের কোনো খেলাতেই তাদের ভাগ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়নি। দুর্বার, অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলকে জানাই আন্তরিক অভিবাদন। দেশমাতৃকার সম্মান ও মর্যাদা সমুন্নত রাখার জন্য জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

গর্বিত বিজয়ী দল দেশে ফেরে গত বুধবার, দুপুর ২টায়। সারা দেশের মানুষ উন্মুখ হয়েছিল তাদের অভিবাদন জানানোর জন্য; হয়েছেও তাই। বিমানবন্দর থেকে বাফুফের কার্যালয় পর্যন্ত দীর্ঘপথে উল্লসিত জনতা আনন্দে মাতোয়ারা ছিলেন; বীরকন্যাদের উষ্ণ অভিনন্দনে সিক্ত করেছিলেন। কোনো কোনো সংস্থা বা ব্যক্তি আকর্ষণীয় পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকারসহ বিশিষ্টজনরা অভিনন্দন বাণী দিয়ে খেলোয়াড়দের উৎসাহিত করেছেন। আমি অকৃপণভাবেই বলতে চাই, এমন একটি ঐতিহাসিক বিজয়ের পর নারী ফুটবল দলকে যতখানি মর্যাদা দেওয়ার দরকার ছিল তার প্রায় সবটুকুই করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো-এক. এ বিজয়কে আমরা দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে নিয়ে যেত চাই কিনা; দুই. নারী ফুটবলের জয় কি শুধুই একটি ফাইনাল খেলার আনন্দ, নাকি অন্য কোনো সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ভেঙে ফেলার বার্তা দেয়? আমি ফুটবল বিশেষজ্ঞ নই, তাই কৌশলগত মতামতের বাইরে একজন সাধারণ দর্শক ও নাগরিক হিসাবে আলোচনায় আগ্রহী।

প্রথম প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, মানুষের একটি জায়গায় স্থির থাকার সুযোগ নেই। পৃথিবীটা প্রতিযোগিতার; আমরা যেমন শত পরিশ্রম করে কাউকে কাউকে পেছনে ফেলে আজকের অর্জন সম্ভব করেছি, তেমন আমাদেরও পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অনেকেই দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। সুতরাং থেমে থাকার কোনো সুযোগ নেই। তাই অতিরিক্ত আত্মতৃপ্তিতে না ডুবে আমাদের নিরলস পরিশ্রম করে যেতে হবে। সেজন্য প্রয়োজন লজিস্টিক সাপোর্ট (অবকাঠামোগত, আর্থিক সুবিধা, যোগ্য প্রশিক্ষক ইত্যাদি) দেওয়া প্রয়োজন। সেরকম কিছু করতে হলে সরকারি-বেসরকারি উভয়ের পৃষ্ঠপোষকতা ও আন্তরিক সহযোগিতার প্রয়োজন পড়বে। তবে নারী ফুটবল দল যা পারে, পুরুষ ফুটবল দল তা কেন পারে না-এমন বিতর্কে জড়িয়ে পড়লে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন বাধাগ্রস্ত হবে।

দ্বিতীয় প্রশ্নের অবতারণায় বলতে হবে, আমরা যে দলটিকে বিজয়ীর বেশে দেখছি, তা কি আমাদের ভেতর শুধুই উচ্ছ্বাস আর আনন্দের খোরাক জোগাচ্ছে; নাকি একটি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সাক্ষ্য দিচ্ছে? আমার কাছে মনে হয়, নারী সম্পর্কে আমাদের রক্ষণশীল ধারণার পরিবর্তনের সময় এসেছে। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে হলে আমাদের প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় নারী-পুরুষের অবস্থান সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখতে হবে। এ বিষয়ে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ তার অনন্য গ্রন্থ ‘নারী, পুরুষ ও সমাজ’-এ একটি পরিচ্ছন্ন ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছেন। ভূমিকাতেই তিনি বলছেন, ‘নারী প্রশ্নকে একইভাবে পুরুষপ্রশ্ন হিসাবেও অভিহিত করা যায়। আবার নারীপ্রশ্ন একইভাবে সমাজপ্রশ্নও বটে। কেননা নারীপ্রশ্ন সমাজে, মনোজগতে পুরুষের অবস্থান এবং নারী-নারী, নারী-পুরুষ এবং পুরুষ-পুরুষ সম্পর্কও বিচার করে, টেনে আনে সমাজকে। নারীপ্রশ্ন নারী নামে পরিচিত মানুষদের নিছক কিছু অধিকার বা আর্তনাদের বিষয় নয়। এ প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত করে, টেনে আনে এমন অনেক বিষয়, যেগুলোকে কুয়াশার আড়ালে ঢেকে রাখার জন্য সমাজপ্রভুরা যুগ যুগ ধরে প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন। এ প্রশ্ন আবৃত, কুয়াশাচ্ছন্ন, ‘পবিত্র’ এমন অনেক বিষয় বিবেচনা করতে আমাদের বাধ্য করে যেগুলো খুব ‘বিপজ্জনক’, খুব ‘শক্তিধর’। পুরুষদের ‘পৌরুষত্ব’, নারীর ‘নারীত্ব’-কমনীয়ত্ব, ক্ষমতাবানদের ‘আভিজাত্য’, সমাজ প্রভুদের ‘মালিকত্ব’, সামাজিক বিধিবিধানের ‘ঐশীত্ব’, ভাবজগতের ‘অনড়ত্ব’-কর্তৃত্ব সবকিছুকেই এ নারীপ্রশ্ন প্রবলভাবে নাড়া দিতে সক্ষম, সক্ষম বিপর্যস্ত করতে।’ তাই আমাদের নারীদের কেবল মাঠের প্রতিপক্ষকেই মোকাবিলা করতে হয় না, এর সঙ্গে মোকাবিলা করতে হয় সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, কূপমণ্ডূকতা; ইচ্ছা যেখানে নিয়ন্ত্রিত।

শুধু সামাজিক প্রতিবন্ধকতা বলি কেন, পারিবারিকভাবেও তাকে দুই ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়। প্রথমত, পুরুষদের দিক থেকে; দ্বিতীয়ত, অনেক নারী নিজেই অধস্তন থাকতে পছন্দ করে। পরিবারের পুরুষ বলতে বোঝায় পিতা, স্বামী, ভাই, পুত্র ইত্যাদি। নারীকে অধস্তন করা, ঘরে আবদ্ধ রেখে নির্দিষ্ট কিছু কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে পুরুষ সুবিধাভোগ করে। এ নির্দিষ্ট সীমারেখার বাইরে এসে নারী কিছু করতে চাইলে পরিবারে পুরুষ সদস্যদের কর্তৃত্ব খর্ব করা হয় বলে মনে করা হয়ে থাকে। পুরুষের আধিপত্য খর্ব হওয়ার উপক্রম হলে সামাজিক মতাদর্শিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। প্রথমে মেয়েদের মেয়ে হিসাবে কী করা উচিত ইত্যাদি নীতিশাসন, তারপর সমাজ সংস্কৃতি-ঐতিহ্য সম্পর্কে বক্তব্য, এগুলোতেও কাজ না হলে ধর্ম। এসব জায়গায় এসে ‘আধুনিক’ পুরুষ ও ধর্মান্ধ পুরুষ অনেক সময় একাকার হয়ে যায়। অনেক ‘প্রগতিশীল’ ‘বিপ্লবী’ পুরুষের মধ্য থেকেও বেরিয়ে আসে পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতি (আনু মুহাম্মদ, ২০০৫)। এভাবে পুরুষের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে যে নারী, শিক্ষা-ডিগ্রিলাভ, কর্মজীবন কিছুই তাকে পূর্ণাঙ্গ মানুষের পরিচয় দিতে পারে না। নারী নিজেকে বিকশিত করার দ্বিতীয় প্রতিরোধটি আসে নারীদের অংশ থেকেই। এক ধরনের নারী আছে, যারা নিজে থেকেই পুরুষের অধস্তন হতে পছন্দ করেন। নিজের চিন্তার বিকাশকে অবহেলায় রেখে স্বামীর উপার্জন, খ্যাতি-যশকে নিজের ভেবে আত্মতৃপ্তি লাভ করে। কোনো নারী স্বাধীনভাবে বেরিয়ে আসতে চাইলে নারীর এ অংশটি বাধাগ্রস্ত করে। একজন বিকাশমান নারীকে তাদের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ অব্যাহত রাখতে হয়।

আলোচ্য বিষয় ফুটবল নিয়ে যদি বলি, তাহলে বলতে হবে যে, পারিবারিক পুরুষতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতার বাইরে সামাজিকভাবেও তাকে প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হয়েছে। আমাদের সমাজে এখনো নারীদের ফুটবল খেলাকে কোনো নান্দনিক দৃষ্টিতে দেখা হয় না। স্বাধীনতার মূল সনদে ‘মানবিক মর্যাদা’র কথা বলা হলেও স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও সৃষ্টিশীল নারীরা সামাজিকভাবে যথাযথ মর্যাদাবঞ্চিত। সমাজভাবনা নারী ফুটবলকে শুধু অবহেলা বা নিরুৎসাহিত করেই থেমে থাকে না বরং তিরস্কার জানানো ও নিন্দনীয় কাজের পর্যায়ে ফেলতেও দ্বিধা করে না।

রাষ্ট্র সরাসরি তিরস্কার করেনি, তবে অবহেলা করেছে। সমস্যা হলো সরকারের বাহ্যিক রূপটি যেমনই হোক, এর ভেতরে ঘাপটি মেরে আছে গুটিকয় পশ্চাৎপদ ধারণার মানুষ। এ ধারণার মানুষগুলোর সংখ্যা কম হলেও তারা যথেষ্ট প্রভাবশালী; নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখতে সক্ষম। কিছু রক্ষণশীল মানুষের প্রভাবে আমাদের শুধু নারী ক্রীড়ঙ্গনই নয়, সারাদেশে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। শিল্পকলার নামে কোটি কোটি টাকার ভবন হচ্ছে, কিন্তু শিল্পচর্চার কোনো নমুনা নেই।

সারা পৃথিবীতে মানুষে মানুষে সম্পর্কের যে ক্ষমতাকাঠামো, তা সব সময় একই ধারায় কিংবা মাত্রায় থাকেনি। নিষ্পেষণের এক ক্ষমতার বিপরীতে সৃষ্টি হয়েছে আরেক ক্ষমতা, ক্ষমতার ভারসাম্যে এসেছে নতুন মাত্রা। সুতরাং আজকের সাবিনা, কৃষ্ণা, রূপনা, আঁখি, মনিকারা পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়-এ তিন প্রতিবন্ধকতাকে মোকাবিলা করে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষে নিয়ে গেছে। তাদের নিদারুণ অর্থনৈতিক সংগ্রামের কথা নাই বা বললাম। তারা শুধু শিরোপা জেতেনি, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, কূপমন্ডূকতায় আচ্ছন্ন রীতিনীতির বেড়াজাল ছিন্ন করে দিয়েছে। কেবল আনন্দ দেওয়া নয়, সমাজ প্রগতিকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। তাই বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলকে স্যালুট। একই সঙ্গে কোচ গোলাম রাব্বানী ছোটনের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। জয় হোক বাংলার নারী সমাজের।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

এ বিজয় শুধুই নারীর নয় সমাজ প্রগতিরও

 মুঈদ রহমান 
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গেল সপ্তাহটি ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি গৌরবোজ্জ্বল সময়। একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তের সাক্ষী হয়ে রইল গত ১৯ সেপ্টেম্বর। পাহাড়িকন্যা নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল সাফ নারী ফুটবলের ফাইনাল খেলা। খেলায় যোগ্যতর দল হিসাবে বাংলাদেশের নারী দল চ্যাম্পিয়ন হয়। বাংলাদেশের নারী ফুটবলের ইতিহাসে এটি একটি নতুন মাইলফলক। বিজয়ী হওয়ার কতগুলো রকমফের আছে-ভাগ্যপ্রসন্ন বিজয়, কাকতালীয় বিজয় ও যথাযথ যোগ্যতার বিজয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তৃতীয় বিজয়টি প্রযোজ্য। বাংলাদেশ যোগ্যতর দল হিসাবেই বিজয় ছিনিয়ে এনেছে, আনন্দের জোয়ারে ভাসিয়ে দিয়েছে সারা বাংলাদেশ ও দেশের মানুষকে। নারী সাফ ফুটবলের অতীতটা দেখলেই যোগ্যতা বোঝা সহজ হবে। ২০১০ সাল থেকে চালু হওয়া নারী সাফ ফুটবল প্রতিযোগিতা ২০১৯ সাল নাগাদ অনুষ্ঠিত হয়েছে পাঁচটি ফাইনাল। পাঁচটি ফাইনালের সবক’টিতেই জয় পেয়েছে শক্তিশালী ভারত। আর চারটিতে রানারআপ হয়েছে নেপাল। ২০১৬ সালের চতুর্থ ফাইনালে আমরা ভারতের কাছে হেরে রানারআপ হয়েছিলাম। ২০২২ সালের ষষ্ঠ আসরের গ্রুপ পর্বে আমাদের মেয়েরা মালদ্বীপকে ৩-০, পাকিস্তানকে ৬-০, আর বিগত পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নকে হারিয়েছে ৩-০ গোলে। সেমিফাইনালে ভুটানকে হারিয়েছে ৮-০ গোলে। স্বপ্নের ফাইনালে প্রতিদ্বন্দ্বী নেপালকে নিজেদের মাঠে হারিয়েছে ৩-১ গোলের পরিষ্কার ব্যবধানে। সুতরাং পুরো টুর্নামেন্টের কোনো খেলাতেই তাদের ভাগ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়নি। দুর্বার, অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলকে জানাই আন্তরিক অভিবাদন। দেশমাতৃকার সম্মান ও মর্যাদা সমুন্নত রাখার জন্য জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

গর্বিত বিজয়ী দল দেশে ফেরে গত বুধবার, দুপুর ২টায়। সারা দেশের মানুষ উন্মুখ হয়েছিল তাদের অভিবাদন জানানোর জন্য; হয়েছেও তাই। বিমানবন্দর থেকে বাফুফের কার্যালয় পর্যন্ত দীর্ঘপথে উল্লসিত জনতা আনন্দে মাতোয়ারা ছিলেন; বীরকন্যাদের উষ্ণ অভিনন্দনে সিক্ত করেছিলেন। কোনো কোনো সংস্থা বা ব্যক্তি আকর্ষণীয় পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকারসহ বিশিষ্টজনরা অভিনন্দন বাণী দিয়ে খেলোয়াড়দের উৎসাহিত করেছেন। আমি অকৃপণভাবেই বলতে চাই, এমন একটি ঐতিহাসিক বিজয়ের পর নারী ফুটবল দলকে যতখানি মর্যাদা দেওয়ার দরকার ছিল তার প্রায় সবটুকুই করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো-এক. এ বিজয়কে আমরা দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে নিয়ে যেত চাই কিনা; দুই. নারী ফুটবলের জয় কি শুধুই একটি ফাইনাল খেলার আনন্দ, নাকি অন্য কোনো সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ভেঙে ফেলার বার্তা দেয়? আমি ফুটবল বিশেষজ্ঞ নই, তাই কৌশলগত মতামতের বাইরে একজন সাধারণ দর্শক ও নাগরিক হিসাবে আলোচনায় আগ্রহী।

প্রথম প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, মানুষের একটি জায়গায় স্থির থাকার সুযোগ নেই। পৃথিবীটা প্রতিযোগিতার; আমরা যেমন শত পরিশ্রম করে কাউকে কাউকে পেছনে ফেলে আজকের অর্জন সম্ভব করেছি, তেমন আমাদেরও পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অনেকেই দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। সুতরাং থেমে থাকার কোনো সুযোগ নেই। তাই অতিরিক্ত আত্মতৃপ্তিতে না ডুবে আমাদের নিরলস পরিশ্রম করে যেতে হবে। সেজন্য প্রয়োজন লজিস্টিক সাপোর্ট (অবকাঠামোগত, আর্থিক সুবিধা, যোগ্য প্রশিক্ষক ইত্যাদি) দেওয়া প্রয়োজন। সেরকম কিছু করতে হলে সরকারি-বেসরকারি উভয়ের পৃষ্ঠপোষকতা ও আন্তরিক সহযোগিতার প্রয়োজন পড়বে। তবে নারী ফুটবল দল যা পারে, পুরুষ ফুটবল দল তা কেন পারে না-এমন বিতর্কে জড়িয়ে পড়লে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন বাধাগ্রস্ত হবে।

দ্বিতীয় প্রশ্নের অবতারণায় বলতে হবে, আমরা যে দলটিকে বিজয়ীর বেশে দেখছি, তা কি আমাদের ভেতর শুধুই উচ্ছ্বাস আর আনন্দের খোরাক জোগাচ্ছে; নাকি একটি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সাক্ষ্য দিচ্ছে? আমার কাছে মনে হয়, নারী সম্পর্কে আমাদের রক্ষণশীল ধারণার পরিবর্তনের সময় এসেছে। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে হলে আমাদের প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় নারী-পুরুষের অবস্থান সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখতে হবে। এ বিষয়ে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ তার অনন্য গ্রন্থ ‘নারী, পুরুষ ও সমাজ’-এ একটি পরিচ্ছন্ন ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছেন। ভূমিকাতেই তিনি বলছেন, ‘নারী প্রশ্নকে একইভাবে পুরুষপ্রশ্ন হিসাবেও অভিহিত করা যায়। আবার নারীপ্রশ্ন একইভাবে সমাজপ্রশ্নও বটে। কেননা নারীপ্রশ্ন সমাজে, মনোজগতে পুরুষের অবস্থান এবং নারী-নারী, নারী-পুরুষ এবং পুরুষ-পুরুষ সম্পর্কও বিচার করে, টেনে আনে সমাজকে। নারীপ্রশ্ন নারী নামে পরিচিত মানুষদের নিছক কিছু অধিকার বা আর্তনাদের বিষয় নয়। এ প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত করে, টেনে আনে এমন অনেক বিষয়, যেগুলোকে কুয়াশার আড়ালে ঢেকে রাখার জন্য সমাজপ্রভুরা যুগ যুগ ধরে প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন। এ প্রশ্ন আবৃত, কুয়াশাচ্ছন্ন, ‘পবিত্র’ এমন অনেক বিষয় বিবেচনা করতে আমাদের বাধ্য করে যেগুলো খুব ‘বিপজ্জনক’, খুব ‘শক্তিধর’। পুরুষদের ‘পৌরুষত্ব’, নারীর ‘নারীত্ব’-কমনীয়ত্ব, ক্ষমতাবানদের ‘আভিজাত্য’, সমাজ প্রভুদের ‘মালিকত্ব’, সামাজিক বিধিবিধানের ‘ঐশীত্ব’, ভাবজগতের ‘অনড়ত্ব’-কর্তৃত্ব সবকিছুকেই এ নারীপ্রশ্ন প্রবলভাবে নাড়া দিতে সক্ষম, সক্ষম বিপর্যস্ত করতে।’ তাই আমাদের নারীদের কেবল মাঠের প্রতিপক্ষকেই মোকাবিলা করতে হয় না, এর সঙ্গে মোকাবিলা করতে হয় সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, কূপমণ্ডূকতা; ইচ্ছা যেখানে নিয়ন্ত্রিত।

শুধু সামাজিক প্রতিবন্ধকতা বলি কেন, পারিবারিকভাবেও তাকে দুই ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়। প্রথমত, পুরুষদের দিক থেকে; দ্বিতীয়ত, অনেক নারী নিজেই অধস্তন থাকতে পছন্দ করে। পরিবারের পুরুষ বলতে বোঝায় পিতা, স্বামী, ভাই, পুত্র ইত্যাদি। নারীকে অধস্তন করা, ঘরে আবদ্ধ রেখে নির্দিষ্ট কিছু কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে পুরুষ সুবিধাভোগ করে। এ নির্দিষ্ট সীমারেখার বাইরে এসে নারী কিছু করতে চাইলে পরিবারে পুরুষ সদস্যদের কর্তৃত্ব খর্ব করা হয় বলে মনে করা হয়ে থাকে। পুরুষের আধিপত্য খর্ব হওয়ার উপক্রম হলে সামাজিক মতাদর্শিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। প্রথমে মেয়েদের মেয়ে হিসাবে কী করা উচিত ইত্যাদি নীতিশাসন, তারপর সমাজ সংস্কৃতি-ঐতিহ্য সম্পর্কে বক্তব্য, এগুলোতেও কাজ না হলে ধর্ম। এসব জায়গায় এসে ‘আধুনিক’ পুরুষ ও ধর্মান্ধ পুরুষ অনেক সময় একাকার হয়ে যায়। অনেক ‘প্রগতিশীল’ ‘বিপ্লবী’ পুরুষের মধ্য থেকেও বেরিয়ে আসে পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতি (আনু মুহাম্মদ, ২০০৫)। এভাবে পুরুষের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে যে নারী, শিক্ষা-ডিগ্রিলাভ, কর্মজীবন কিছুই তাকে পূর্ণাঙ্গ মানুষের পরিচয় দিতে পারে না। নারী নিজেকে বিকশিত করার দ্বিতীয় প্রতিরোধটি আসে নারীদের অংশ থেকেই। এক ধরনের নারী আছে, যারা নিজে থেকেই পুরুষের অধস্তন হতে পছন্দ করেন। নিজের চিন্তার বিকাশকে অবহেলায় রেখে স্বামীর উপার্জন, খ্যাতি-যশকে নিজের ভেবে আত্মতৃপ্তি লাভ করে। কোনো নারী স্বাধীনভাবে বেরিয়ে আসতে চাইলে নারীর এ অংশটি বাধাগ্রস্ত করে। একজন বিকাশমান নারীকে তাদের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ অব্যাহত রাখতে হয়।

আলোচ্য বিষয় ফুটবল নিয়ে যদি বলি, তাহলে বলতে হবে যে, পারিবারিক পুরুষতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতার বাইরে সামাজিকভাবেও তাকে প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হয়েছে। আমাদের সমাজে এখনো নারীদের ফুটবল খেলাকে কোনো নান্দনিক দৃষ্টিতে দেখা হয় না। স্বাধীনতার মূল সনদে ‘মানবিক মর্যাদা’র কথা বলা হলেও স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও সৃষ্টিশীল নারীরা সামাজিকভাবে যথাযথ মর্যাদাবঞ্চিত। সমাজভাবনা নারী ফুটবলকে শুধু অবহেলা বা নিরুৎসাহিত করেই থেমে থাকে না বরং তিরস্কার জানানো ও নিন্দনীয় কাজের পর্যায়ে ফেলতেও দ্বিধা করে না।

রাষ্ট্র সরাসরি তিরস্কার করেনি, তবে অবহেলা করেছে। সমস্যা হলো সরকারের বাহ্যিক রূপটি যেমনই হোক, এর ভেতরে ঘাপটি মেরে আছে গুটিকয় পশ্চাৎপদ ধারণার মানুষ। এ ধারণার মানুষগুলোর সংখ্যা কম হলেও তারা যথেষ্ট প্রভাবশালী; নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখতে সক্ষম। কিছু রক্ষণশীল মানুষের প্রভাবে আমাদের শুধু নারী ক্রীড়ঙ্গনই নয়, সারাদেশে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। শিল্পকলার নামে কোটি কোটি টাকার ভবন হচ্ছে, কিন্তু শিল্পচর্চার কোনো নমুনা নেই।

সারা পৃথিবীতে মানুষে মানুষে সম্পর্কের যে ক্ষমতাকাঠামো, তা সব সময় একই ধারায় কিংবা মাত্রায় থাকেনি। নিষ্পেষণের এক ক্ষমতার বিপরীতে সৃষ্টি হয়েছে আরেক ক্ষমতা, ক্ষমতার ভারসাম্যে এসেছে নতুন মাত্রা। সুতরাং আজকের সাবিনা, কৃষ্ণা, রূপনা, আঁখি, মনিকারা পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়-এ তিন প্রতিবন্ধকতাকে মোকাবিলা করে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষে নিয়ে গেছে। তাদের নিদারুণ অর্থনৈতিক সংগ্রামের কথা নাই বা বললাম। তারা শুধু শিরোপা জেতেনি, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, কূপমন্ডূকতায় আচ্ছন্ন রীতিনীতির বেড়াজাল ছিন্ন করে দিয়েছে। কেবল আনন্দ দেওয়া নয়, সমাজ প্রগতিকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। তাই বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলকে স্যালুট। একই সঙ্গে কোচ গোলাম রাব্বানী ছোটনের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। জয় হোক বাংলার নারী সমাজের।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন