আপনার ফুসফুস সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখুন
jugantor
বিশ্ব লাং দিবস
আপনার ফুসফুস সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখুন

  ডা. এসএম আবদুল্লাহ আল মামুন  

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বেঁচে থাকার জন্য শ্বাস-প্রশ্বাস অপরিহার্য। আর সেজন্য চাই সুস্থ ফুসফুস। বলা যায়, মানব শরীর নিয়ন্ত্রণ করে ফুসফুস। যথাসময়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে শ্বাসযন্ত্রের অধিকাংশ রোগই প্রতিরোধযোগ্য। আমরা প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক বাতাস থেকে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করি। এই বাতাসে ফুসফুসের রোগ সৃষ্টির জন্য অনেক উপাদান রয়েছে। বিশ্বব্যাপী ঘটে চলা বায়ুদূষণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমাদের ফুসফুসে বিভিন্ন রোগের বিস্তার ঘটাচ্ছে।

বায়ুদূষণের অনেক উৎস রয়েছে, যেমন-যানবাহন, কল-কারখানা, বসতবাড়ি ইত্যাদি। এসব থেকে সৃষ্ট ক্ষতিকারক নির্গমনের (পেট্রোল, ডিজেল, কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস, কাঠ, জৈববস্তু) ফলে বায়ুদূষণ দিন দিন ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিভিন্নভাবে ফুসফুসের ক্ষতি হতে পারে।

সাম্প্রতিক করোনা মহামারি এবং বিশ্বব্যাপী তীব্র বায়ুদূষণ আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। দেখা দিচ্ছে ফুসফুসের ব্যাধিসহ বিভিন্ন জটিল রোগ। ক্ষতির সম্মুখীন হতে হতে একসময় ফুসফুস ফাইব্রোসিস আক্রমণের শিকার হয় এবং অকেজো হয়ে যায়। পরিবেশ দূষণের ফলে ইন্টারস্টিশিয়াল লাং ডিজিজ, সিওপিডি, এমনকি ফুসফুসের ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও ফাঙ্গাস প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়ছে, যা নিউমোনিয়া সৃষ্টিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

ফুসফুসকে সুস্থ রাখতে করণীয়

সুষম খাদ্য, ভিটামিন-সি, ডি, জিঙ্কযুক্ত খাবার এবং ফলমূল খেতে হবে। বিশেষ করে প্রতিদিন ফলমূল খেলে ফুসফুসের উপকার হয়। যেমন, একটি আপেল শুধু ফুসফুস নয়, যে কোনো রোগের বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। তবে এর ভিটামিন, খনিজ, ফ্ল্যাভানয়েডস ইত্যাদি উপাদান ফুসফুসকে সুস্থ রাখতে বিশেষ সাহায্য করে। কলায় থাকা পটাশিয়াম ফুসফুসের নানা সমস্যার সমাধান করতে সাহায্য করে। আনারস বা আঙুরের রসে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ পদ্ধতি উন্নত করে। পেয়ারা ফুসফুসের জন্য ভীষণ উপকারী।

ধূমপান বর্জন করতে হবে। ধূমপানের ফলে শুধু ফুসফুস নয়, শরীরের অন্যান্য অঙ্গেরও ক্ষতি হয়। তাই সার্বিক সুস্থতার জন্য এ ত্যাগ স্বীকার করার কোনো বিকল্প নেই।

ফুসফুসের ব্যায়াম শরীরকে সতেজ-সবল রাখতে সাহায্য করে।

ফুসফুস ভালো রাখার ব্যায়াম

নিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম ফুসফুসকে সুস্থ রাখে। বিশেষত হাঁপানি বা ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসের রোগীদের ফুসফুসের কর্মক্ষমতা বাড়াতে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম কার্যকর। এমন কয়েকটি ব্যায়াম সম্পর্কে জেনে নিন :

৪-৭-৮ রিলাক্সিং ব্রিদিং : পিঠ সোজা রেখে আরাম করে বসুন। ‘হুস’ আওয়াজ করে মুখ দিয়ে ফুসফুসের সবটুকু বাতাস বের করে দিন। এবার নিঃশব্দে মনে মনে ১ থেকে ৪ পর্যন্ত গুনতে গুনতে গভীর শ্বাস নিন। সেটা ভেতরে আটকে রাখুন, মনে মনে ৭ পর্যন্ত গুনুন। এবার ঠোঁট গোল করে ৮ পর্যন্ত গুনতে গুনতে ‘হুস’ আওয়াজ করে সম্পূর্ণ বাতাস বের করে দিন। কয়েক সেকেন্ড বিশ্রাম নিয়ে পরপর ৪-৫ বার এভাবে নিঃশ্বাস নিন। এই ব্যায়াম দিনে দুবার করে করা ভালো। এতে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মানসিক চাপ কমে এবং ঘুম ভালো হয়।

শ্বাস গোনার ব্যায়াম : এ ব্যায়ামে ক্রমান্বয়ে প্রশ্বাসের সময় ধীর করে আনতে হয়। মেরুদণ্ড সোজা করে বসুন। চোখ বন্ধ করে পরপর কয়েকবার গভীর নিশ্বাস নিন। ধীরে ধীরে গতি কমিয়ে দিন। প্রথমে নিশ্বাস ছাড়ার সময় এক গুনবেন, এর পরের বার দুই, এভাবে পাঁচ পর্যন্ত গুনুন। অতঃপর আবার প্রথম থেকে শুরু করুন। এ ব্যায়ামটি দিনে ১০ মিনিট করবেন। এটি এক ধরনের মেডিটেশন, যা মস্তিষ্ককে চাঙ্গা করে, মনোসংযোগ বাড়ায় ও মানসিক চাপ কমায়।

বাষ্প থেরাপি : বাষ্প থেরাপি বা বাষ্প নিশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করলে সেটি ফুসফুসকে শ্লেষ্মা নিষ্কাশন করতে সাহায্য করে। অনেক সময় ফুসফুসের সমস্যার কারণে বা ঠাণ্ডা লাগলে অথবা শুষ্ক বাতাসে ফুসফুসের শ্লেষ্মা ঝিল্লি শুকিয়ে গিয়ে রক্ত প্রবাহ কমে যেতে পারে। বাষ্প থেরাপির মাধ্যমে ফুসফুসে উষ্ণতা ও আর্দ্রতা যোগ করলে নিশ্বাস প্রক্রিয়া উন্নত হয় এবং তাৎক্ষণিক স্বস্তি পাওয়া যায়।

ঐচ্ছিক কাশি : শুনতে একটু অবাক লাগলেও কাশি আপনার ফুসফুসকে পরিষ্কার রাখতে সহায়তা করতে পারে। শরীরের প্রাকৃতিকভাবে শ্লেষ্মা আটকে থাকা টক্সিনগুলোকে বের করে দেওয়ার উপায় হচ্ছে কাশি। আর নিয়ন্ত্রিত কাশি ফুসফুসে অতিরিক্ত শ্লেষ্মা শ্বাসনালি দিয়ে বের করে দিতে সাহায্য করে।

শারীরিক ব্যায়াম : নিয়মিত ব্যায়াম মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভীষণ উপকারী। এটি স্ট্রোক, হৃদরোগ, স্থূলতাসহ বিভিন্ন শারীরিক অবস্থা ও ক্ষতির ঝুঁকি হ্রাস করে। এছাড়া, ব্যায়াম শরীরের শ্বাস-প্রশ্বাসের হার বাড়িয়ে দিয়ে পেশিগুলোকে বাড়তি পরিশ্রম করতে সাহায্য করে। এতে করে পেশিগুলোতে অক্সিজেনের সরবরাহও বৃদ্ধি পায়।

ডা. এসএম আবদুল্লাহ আল মামুন : সিনিয়র কনসালটেন্ট, রেস্পিরেটরি মেডিসিন, এভারকেয়ার হাসপাতাল, ঢাকা

বিশ্ব লাং দিবস

আপনার ফুসফুস সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখুন

 ডা. এসএম আবদুল্লাহ আল মামুন 
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বেঁচে থাকার জন্য শ্বাস-প্রশ্বাস অপরিহার্য। আর সেজন্য চাই সুস্থ ফুসফুস। বলা যায়, মানব শরীর নিয়ন্ত্রণ করে ফুসফুস। যথাসময়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে শ্বাসযন্ত্রের অধিকাংশ রোগই প্রতিরোধযোগ্য। আমরা প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক বাতাস থেকে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করি। এই বাতাসে ফুসফুসের রোগ সৃষ্টির জন্য অনেক উপাদান রয়েছে। বিশ্বব্যাপী ঘটে চলা বায়ুদূষণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমাদের ফুসফুসে বিভিন্ন রোগের বিস্তার ঘটাচ্ছে।

বায়ুদূষণের অনেক উৎস রয়েছে, যেমন-যানবাহন, কল-কারখানা, বসতবাড়ি ইত্যাদি। এসব থেকে সৃষ্ট ক্ষতিকারক নির্গমনের (পেট্রোল, ডিজেল, কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস, কাঠ, জৈববস্তু) ফলে বায়ুদূষণ দিন দিন ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিভিন্নভাবে ফুসফুসের ক্ষতি হতে পারে।

সাম্প্রতিক করোনা মহামারি এবং বিশ্বব্যাপী তীব্র বায়ুদূষণ আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। দেখা দিচ্ছে ফুসফুসের ব্যাধিসহ বিভিন্ন জটিল রোগ। ক্ষতির সম্মুখীন হতে হতে একসময় ফুসফুস ফাইব্রোসিস আক্রমণের শিকার হয় এবং অকেজো হয়ে যায়। পরিবেশ দূষণের ফলে ইন্টারস্টিশিয়াল লাং ডিজিজ, সিওপিডি, এমনকি ফুসফুসের ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও ফাঙ্গাস প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়ছে, যা নিউমোনিয়া সৃষ্টিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

ফুসফুসকে সুস্থ রাখতে করণীয়

সুষম খাদ্য, ভিটামিন-সি, ডি, জিঙ্কযুক্ত খাবার এবং ফলমূল খেতে হবে। বিশেষ করে প্রতিদিন ফলমূল খেলে ফুসফুসের উপকার হয়। যেমন, একটি আপেল শুধু ফুসফুস নয়, যে কোনো রোগের বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। তবে এর ভিটামিন, খনিজ, ফ্ল্যাভানয়েডস ইত্যাদি উপাদান ফুসফুসকে সুস্থ রাখতে বিশেষ সাহায্য করে। কলায় থাকা পটাশিয়াম ফুসফুসের নানা সমস্যার সমাধান করতে সাহায্য করে। আনারস বা আঙুরের রসে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ পদ্ধতি উন্নত করে। পেয়ারা ফুসফুসের জন্য ভীষণ উপকারী।

ধূমপান বর্জন করতে হবে। ধূমপানের ফলে শুধু ফুসফুস নয়, শরীরের অন্যান্য অঙ্গেরও ক্ষতি হয়। তাই সার্বিক সুস্থতার জন্য এ ত্যাগ স্বীকার করার কোনো বিকল্প নেই।

ফুসফুসের ব্যায়াম শরীরকে সতেজ-সবল রাখতে সাহায্য করে।

ফুসফুস ভালো রাখার ব্যায়াম

নিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম ফুসফুসকে সুস্থ রাখে। বিশেষত হাঁপানি বা ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসের রোগীদের ফুসফুসের কর্মক্ষমতা বাড়াতে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম কার্যকর। এমন কয়েকটি ব্যায়াম সম্পর্কে জেনে নিন :

৪-৭-৮ রিলাক্সিং ব্রিদিং : পিঠ সোজা রেখে আরাম করে বসুন। ‘হুস’ আওয়াজ করে মুখ দিয়ে ফুসফুসের সবটুকু বাতাস বের করে দিন। এবার নিঃশব্দে মনে মনে ১ থেকে ৪ পর্যন্ত গুনতে গুনতে গভীর শ্বাস নিন। সেটা ভেতরে আটকে রাখুন, মনে মনে ৭ পর্যন্ত গুনুন। এবার ঠোঁট গোল করে ৮ পর্যন্ত গুনতে গুনতে ‘হুস’ আওয়াজ করে সম্পূর্ণ বাতাস বের করে দিন। কয়েক সেকেন্ড বিশ্রাম নিয়ে পরপর ৪-৫ বার এভাবে নিঃশ্বাস নিন। এই ব্যায়াম দিনে দুবার করে করা ভালো। এতে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মানসিক চাপ কমে এবং ঘুম ভালো হয়।

শ্বাস গোনার ব্যায়াম : এ ব্যায়ামে ক্রমান্বয়ে প্রশ্বাসের সময় ধীর করে আনতে হয়। মেরুদণ্ড সোজা করে বসুন। চোখ বন্ধ করে পরপর কয়েকবার গভীর নিশ্বাস নিন। ধীরে ধীরে গতি কমিয়ে দিন। প্রথমে নিশ্বাস ছাড়ার সময় এক গুনবেন, এর পরের বার দুই, এভাবে পাঁচ পর্যন্ত গুনুন। অতঃপর আবার প্রথম থেকে শুরু করুন। এ ব্যায়ামটি দিনে ১০ মিনিট করবেন। এটি এক ধরনের মেডিটেশন, যা মস্তিষ্ককে চাঙ্গা করে, মনোসংযোগ বাড়ায় ও মানসিক চাপ কমায়।

বাষ্প থেরাপি : বাষ্প থেরাপি বা বাষ্প নিশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করলে সেটি ফুসফুসকে শ্লেষ্মা নিষ্কাশন করতে সাহায্য করে। অনেক সময় ফুসফুসের সমস্যার কারণে বা ঠাণ্ডা লাগলে অথবা শুষ্ক বাতাসে ফুসফুসের শ্লেষ্মা ঝিল্লি শুকিয়ে গিয়ে রক্ত প্রবাহ কমে যেতে পারে। বাষ্প থেরাপির মাধ্যমে ফুসফুসে উষ্ণতা ও আর্দ্রতা যোগ করলে নিশ্বাস প্রক্রিয়া উন্নত হয় এবং তাৎক্ষণিক স্বস্তি পাওয়া যায়।

ঐচ্ছিক কাশি : শুনতে একটু অবাক লাগলেও কাশি আপনার ফুসফুসকে পরিষ্কার রাখতে সহায়তা করতে পারে। শরীরের প্রাকৃতিকভাবে শ্লেষ্মা আটকে থাকা টক্সিনগুলোকে বের করে দেওয়ার উপায় হচ্ছে কাশি। আর নিয়ন্ত্রিত কাশি ফুসফুসে অতিরিক্ত শ্লেষ্মা শ্বাসনালি দিয়ে বের করে দিতে সাহায্য করে।

শারীরিক ব্যায়াম : নিয়মিত ব্যায়াম মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভীষণ উপকারী। এটি স্ট্রোক, হৃদরোগ, স্থূলতাসহ বিভিন্ন শারীরিক অবস্থা ও ক্ষতির ঝুঁকি হ্রাস করে। এছাড়া, ব্যায়াম শরীরের শ্বাস-প্রশ্বাসের হার বাড়িয়ে দিয়ে পেশিগুলোকে বাড়তি পরিশ্রম করতে সাহায্য করে। এতে করে পেশিগুলোতে অক্সিজেনের সরবরাহও বৃদ্ধি পায়।

ডা. এসএম আবদুল্লাহ আল মামুন : সিনিয়র কনসালটেন্ট, রেস্পিরেটরি মেডিসিন, এভারকেয়ার হাসপাতাল, ঢাকা

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন