ক্রিপ্টোকারেন্সি : নৈরাজ্য, না ধনতন্ত্রের নতুন চমক?
jugantor
ক্রিপ্টোকারেন্সি : নৈরাজ্য, না ধনতন্ত্রের নতুন চমক?

  সুধীর সাহা  

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ক্রিপ্টোকারেন্সি : নৈরাজ্য, না ধনতন্ত্রের নতুন চমক?

টিভি খুললে ক্রিকেটের ফাঁকে, হাতের মুঠোয় ধরা স্মার্টফোনে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে বিটকয়েনের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রা লেনদেনের বিজ্ঞাপন। মিলছে এক্সচেঞ্জের সন্ধান, যেখানে চাইলেই লেনদেন করা যাবে এ ডিজিটাল মুদ্রা; যা অনেকেরই চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, অধিকাংশ দেশের সরকারের স্বীকৃতি না থাকা এ মুদ্রা কতটা সুরক্ষিত। কেননা, স্বীকৃতি নেই বলে এর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায়ও সরকারের কোনো হাত নেই। বিপুল মুনাফার হাতছানিতে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নতুন এবং বিকল্প ক্ষেত্র হিসাবে জনপ্রিয় হচ্ছে বিটকয়েন, ইথারিয়াম, ম্যাটিকের মতো ডিজিটাল মুদ্রা। বাংলাদেশে এর লেনদেন করার কোনো বৈধতা নেই। ভারতে ২০১৮ সালে এর লেনদেনকে বেআইনি বলে ঘোষণা করেছিল সে দেশের রিজার্ভ ক্রিপ্টোকারেন্সি : নৈরাজ্য, না ধনতন্ত্রের নতুন চমক?ব্যাংক। কিন্তু এ আদেশের বিরুদ্ধে হওয়া মামলায় ওই নির্দেশকে অবৈধ বলে জানায় ভারতের সুপ্রিমকোর্ট। তাই ভারতে ওই মুদ্রাকে বেআইনি বলে আখ্যা দেওয়ার সুযোগ নেই। আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে ডিজিটাল মুদ্রা দিয়ে পণ্য কেনাবেচাকে স্বীকৃতি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল মুদ্রার লেনদেনে সরকারি হস্তক্ষেপ না থাকায় এবং এ মুদ্রা লেনদেনের বিষয়ে আয়করসংক্রান্ত আইন না থাকায় (অর্থাৎ এর আয়ের ওপর কোনো কর দিতে হয় না) বিভিন্ন এক্সচেঞ্জের প্রচার করা হচ্ছে বিভিন্ন মাধ্যমে।

সম্প্রতি চীন তার দেশে সব ধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি নিষিদ্ধ করেছে। অন্যদিকে আমেরিকার নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে ছাড়া হয়েছে বিটকয়েন ইটিএফ। বিটকয়েনের দাম অতি দ্রুত ওঠানামা করে। ২০১৮ সালে প্রতিটি বিটকয়েনের দাম যেখানে ছিল ১৬ হাজার ডলার, সেখানে ২০১৯ সালে সেই বিটকয়েনেরই দাম দাঁড়িয়েছিল ৩ হাজার ৩৩৩ ডলারে। বর্তমানে প্রতিটি বিটকয়েনের দাম ঘুরছে ৬৩ হাজার ডলারের আশপাশে। বিটকয়েনের লেনদেনে লেনদেনকারীর পরিচয় জানা যায় না। তার পরিবর্তে ব্লকচেন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয় সংকেতলিপি। এর কেনাবেচা চলে কম্পিউটার, স্মার্টফোন এবং ট্যাবলেটে। নির্দিষ্ট বিটকয়েন এক্সচেঞ্জে ডিজিটাল ওয়ালেট মারফত বিটকয়েন কিনতে হয়, সেখানেই তা জমা থাকে। ওয়ালেটের আইডি এবং পাসওয়ার্ড থাকে, যা ব্যবহার করে তা খুলতে হয়। ওই মুদ্রা বিক্রি করতে হলে ক্রেতাকে ডিজিটাল চাবি (আইডি ও পাসওয়ার্ড) জানাতে হয় বিক্রেতাকে। বিটকয়েনের কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা নেই। তাই এতে লগ্নি করে অর্থ মার গেলে কারও কাছে অভিযোগ জানানো যায় না।

গত কয়েক বছর থেকেই বিটকয়েনের মতো ভার্চুয়াল মুদ্রা নিয়ে আগ্রহ বাড়তে শুরু করেছে। এ মুদ্রা জোগানের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে গাণিতিক ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের জ্ঞানসমৃদ্ধ ও তৎসম্পর্কিত মেধাসম্পন্ন মানুষজনের হাতে। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, ধারণাটা মন্দ নয়। এর ফলে বাজারে নগদের জোগান বাড়বে। তারা মনে করেন, হাতে অতিরিক্ত পয়সা এলে লোকে বেশি জিনিস কিনবে। তাতে বিক্রি না হওয়া জিনিস এবং কাজ না পাওয়া মানুষ সবারই উপকার হবে। বাজারে চাহিদা বাড়লে যে যে জিনিসের উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব-উৎপাদন বাড়বে, ফলে মূল্যবৃদ্ধি কমে যাবে। যেখানে সেটা সম্ভব নয়, সেখানে দাম বেশি বাড়বে। কিন্তু সার্বিকভাবে অর্থব্যবস্থার চাকা গড়াতে আরম্ভ করবে। অন্য একদল অর্থনীতিবিদ মনে করেন, ঠিক এর উলটোটা। তারা মনে করেন, কোনো দেশের অর্থব্যবস্থা যখন বিপদে পড়ে, তখন সুদের হার কমিয়ে, অর্থের জোগান বাড়িয়ে অর্থব্যবস্থাকে চাঙা করার কাজটি সব দেশের সরকারকেই করতে হয়। ক্রিপ্টো মুদ্রা যদি আইনি মুদ্রার মর্যাদা পায় এবং কালক্রমে যদি দেশের মুদ্রার ওপর মানুষের বিশ্বাস কমে যায়, তাহলে অর্থের জোগান বাড়িয়ে অর্থব্যবস্থাকে চাঙা করে তোলার ওষুধটি দুর্বল হয়ে পড়বে। সরকারের কল্যাণমূলক কাজকর্ম, দেশের সংকটাবস্থায় মানুষকে স্বস্তি দেওয়া, দেশের অর্থনীতিকে ঠিকপথে চালিত করা সবকিছুতেই সরকারের একটি বিশেষ ভূমিকা থাকে। কোনো দেশের অর্থব্যবস্থায় সেই দেশের সার্বভৌম গণ্ডির বাইরের একটি মুদ্রাব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হলে, সেই দেশের স্বাধীন আর্থিক নীতি বিপর্যস্ত হতে পারে। অন্যদিকে, দেশের টাকা ও ক্রিপ্টো মুদ্রা এ দুয়ের বিনিময়মূল্য স্থির করা শক্ত। ক্রিপ্টো মুদ্রার জোগানের পরিমাণ বাড়লে-কমলে অথবা আন্তর্জাতিক চাহিদার পরিবর্তন ঘটলে টাকার অনুপাতে তার তখন দামও পালটাবে।

ক্রিপ্টো মুদ্রার জোগানের বৃদ্ধির হার এখন পর্যন্ত গাণিতিকভাবে স্বনিয়ন্ত্রিত। সমস্যা হলো, এক ক্ষুদ্রগোষ্ঠী ভবিষ্যতে যদি ক্রিপ্টো মুদ্রার সিংহভাগ কুক্ষিগত করে ফেলে এবং ক্রিপ্টো মুদ্রা যদি বিনিময়ের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তাহলে বিশ্বের আর্থিক ব্যবস্থা ওই ক্ষুদ্রগোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। দৃশ্যত অবাস্তব, অথচ কোটি কোটি টাকার ব্যবসায় কোনো ধরনের কর বসানো ভীষণ শক্ত। কেউ কেউ মনে করেন, বিটকয়েনের ষোলো আনাই ভাঁওতাবাজি। বিল গেটসও এমনটাই মনে করেন। ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে টেক সামিটে এসে এমনই বলেছিলেন বিল গেটস। অন্যদিকে ইলন মাস্ক, কিম কার্দাশিয়ানের মতো সেলিব্রিটিরা ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রমোট করেছেন।

ক্রিপ্টোকারেন্সির সমর্থকরা মনে করেন, ক্রিপ্টোকারেন্সি অপরিহার্যভাবে অর্থনৈতিক লেনদেনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তারা ব্যাখ্যা করেন এভাবে-ধরুন, আপনি মেহনত করেন। সেই মেহনত কায়িক কিংবা মেধাগত। আর সেই মেহনতের বিনিময়ে আপনি আয় করেন। আয় মানে টাকা। অর্থাৎ আপনার আয় ও মেহনত পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। এটাই হলো সমীকরণ। এবার আপনি আয় অর্থাৎ টাকা খরচ করেন নিজের চাহিদা পূরণে। প্রথমে মৌলিক চাহিদা, তারপর সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য-বিলাসিতা। আপনি টাকা দিয়ে কিনতে পারেন, কারণ টাকার মূল্য আছে। আপনি যাকে টাকা দিচ্ছেন, তিনি বিশ্বাস করেন ওই টাকা তিনি আবার ভবিষ্যতে ব্যবহার করতে পারবেন। ব্যাংক আছে, তাই আপনার টাকার মূল্য আছে। গুগল পে বা অন্য কোনো ওয়ালেট থেকে ডিজিটাল লেনদেনেও আপনার ভার্চুয়াল অ্যাকাউন্ট থেকেই ক্রিপ্টোকারেন্সি বিযুক্ত হয়ে অন্য কারও অ্যাকাউন্টে যুক্ত হয়। সাধারণ নিয়মে যখন আপনি খরচ করেন, তখন ব্যাংকের কাজ-যিনি খরচ করবেন তার অ্যাকাউন্টে সেই পরিমাণ খরচ করার মতো টাকা আছে কি না সেটা দেখা। টাকা খরচ হলে সেই পরিমাণ টাকা বিযুক্ত করে যিনি পাচ্ছেন তার অ্যাকাউন্টে যুক্ত করা হয়।

ক্রিপ্টোকারেন্সির পক্ষে যাদের মতামত, তারা বলেন-ক্রিপ্টোকারেন্সির দুনিয়ায় ব্যাংক নেই। ক্রিপ্টোকারেন্সি হিসাবের কাজটি করবেন ক্রিপ্টোকারেন্সি যারা ব্যবহার করেন, তারা সবাই। সবাই মিলে প্রকাশ্যে-এ হিসাব রাখার পোশাকি নাম ‘ব্লকচেন’। ব্লকচেনের প্রত্যেকের নির্দিষ্ট আইডির পাশে লেখা থাকবে-কার কাছে কত ক্রিপ্টোকারেন্সি আছে, কে কত ক্রিপ্টোকারেন্সি খরচ করেছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি খরচ হলে প্রতিবার খরচের পরই ডিজিটাল মাইনিং-এর মাধ্যমে ওই ব্লকচেন আপডেট হবে। ব্লকচেন আপডেট করার জন্য যে যত ডিজিটাল মাইনিং করতে পারবে, তার অ্যাকাউন্টে তত ক্রিপ্টোকারেন্সি আসবে। কম্পিউটার সায়েন্সের গেম থিয়োরিতে বিখ্যাত ‘বাইজেন্টাইন জেনারেল প্রোবলেম’ ডিজিটাল মাইনিং-এর বেসিক কথা। ব্যাপক সংখ্যায় সুপার কম্পিউটার, উন্নত মাইনিং সফটওয়্যার, প্রচুর ডেটা স্টোরেজ এবং অভাবনীয় পরিমাণ ইলেকট্রিসিটির জোগান ছাড়া এ ডিজিটাল মাইনিং অসম্ভব। কেবল বিটকয়েনের ব্লকচেন আপডেট করতে খরচ হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার সারা বছরের সমপরিমাণ ইলেকট্রিসিটি। ফলে ডিজিটাল মাইনিংয়ের মনোপলি থাকার সম্ভাবনা বিগ বিজনেস হাউজ আর করপোরেটগুলোরই।

টাকার হিসাব ব্যাংক করলে সেই ব্যাংক কন্ট্রোল করার রশি থাকে সরকারের হাতে কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে। কিন্তু ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্লকচেন নিয়ন্ত্রণ করার করপোরেট হাউজকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা নেই। ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্লকচেনে নাম-পরিচয় না থাকায় জালিয়াতি করা সহজ। রেন্ডম নম্বরের আড়ালে ব্যবসা করছে মাদক ব্যবসায়ীরা, বেআইনি অস্ত্র পাচারকারীরা বেছে নিচ্ছে ক্রিপ্টোকে। কালোটাকা সাদা হচ্ছে ক্রিপ্টোর ফটকা বাজারে। সম্প্রতি এমন এক স্ক্যামে, লুনা এবং টেরা ইউএসডির নামে দুটি ক্রিপ্টোকারেন্সি কয়েক ঘণ্টায় স্ক্যামের পাল্লায় পড়ে ৫০ বিলিয়ন ইউএসডি হারিয়েছে। এতে সর্বস্বান্ত হয়েছেন কিছু সাধারণ ক্রিপ্টো অ্যাকাউন্ট হোল্ডার।

২০০৮-২০০৯ অর্থনৈতিক মন্দার পর ক্রিপ্টোকারেন্সির হয়ে সাফাই গেয়েছিলেন যারা, তারা সবাই হলেন আমেরিকার লিবারেল পার্টির সদস্য। চরম দক্ষিণপন্থি আমেরিকার এ লিবারেল পার্টির মতাদর্শের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বেসরকারীকরণ। তারা মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা ছাড়া সমাজের বাকি সবকিছুই বেসরকারীকরণ জরুরি। ঠিক এ আঙ্গিকেই আর্থিক ব্যবস্থার বেসরকারীকরণের লক্ষ্যে আমদানি হয়েছিল ক্রিপ্টোকারেন্সির। এরা মনে করেন, ডিজিটাল যুগের কারেন্সির ডিজিটালাইজেশন হবে সেটাই স্বাভাবিক। এ মতামতের বিরোধিতাকারীরা মনে করেন-সেন্ট্রাল ব্যাংককে বাদ দিয়ে কোনো বিগ বিজনেস হাউজ কিংবা করপোরেট সংস্থার মুনাফার জন্য যে ক্রিপ্টোকারেন্সির থিম তৈরি হয়েছে, তা মানুষের উপকারে তো লাগবেই না; বরং সুস্থ আর্থিক অবস্থানটাকেই নড়বড়ে করে তুলবে।

সুধীর সাহা : কলাম লেখক

ceo@ilcb.net

ক্রিপ্টোকারেন্সি : নৈরাজ্য, না ধনতন্ত্রের নতুন চমক?

 সুধীর সাহা 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
ক্রিপ্টোকারেন্সি : নৈরাজ্য, না ধনতন্ত্রের নতুন চমক?
ফাইল ছবি

টিভি খুললে ক্রিকেটের ফাঁকে, হাতের মুঠোয় ধরা স্মার্টফোনে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে বিটকয়েনের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রা লেনদেনের বিজ্ঞাপন। মিলছে এক্সচেঞ্জের সন্ধান, যেখানে চাইলেই লেনদেন করা যাবে এ ডিজিটাল মুদ্রা; যা অনেকেরই চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, অধিকাংশ দেশের সরকারের স্বীকৃতি না থাকা এ মুদ্রা কতটা সুরক্ষিত। কেননা, স্বীকৃতি নেই বলে এর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায়ও সরকারের কোনো হাত নেই। বিপুল মুনাফার হাতছানিতে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নতুন এবং বিকল্প ক্ষেত্র হিসাবে জনপ্রিয় হচ্ছে বিটকয়েন, ইথারিয়াম, ম্যাটিকের মতো ডিজিটাল মুদ্রা। বাংলাদেশে এর লেনদেন করার কোনো বৈধতা নেই। ভারতে ২০১৮ সালে এর লেনদেনকে বেআইনি বলে ঘোষণা করেছিল সে দেশের রিজার্ভ ক্রিপ্টোকারেন্সি : নৈরাজ্য, না ধনতন্ত্রের নতুন চমক?ব্যাংক। কিন্তু এ আদেশের বিরুদ্ধে হওয়া মামলায় ওই নির্দেশকে অবৈধ বলে জানায় ভারতের সুপ্রিমকোর্ট। তাই ভারতে ওই মুদ্রাকে বেআইনি বলে আখ্যা দেওয়ার সুযোগ নেই। আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে ডিজিটাল মুদ্রা দিয়ে পণ্য কেনাবেচাকে স্বীকৃতি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল মুদ্রার লেনদেনে সরকারি হস্তক্ষেপ না থাকায় এবং এ মুদ্রা লেনদেনের বিষয়ে আয়করসংক্রান্ত আইন না থাকায় (অর্থাৎ এর আয়ের ওপর কোনো কর দিতে হয় না) বিভিন্ন এক্সচেঞ্জের প্রচার করা হচ্ছে বিভিন্ন মাধ্যমে।

সম্প্রতি চীন তার দেশে সব ধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি নিষিদ্ধ করেছে। অন্যদিকে আমেরিকার নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে ছাড়া হয়েছে বিটকয়েন ইটিএফ। বিটকয়েনের দাম অতি দ্রুত ওঠানামা করে। ২০১৮ সালে প্রতিটি বিটকয়েনের দাম যেখানে ছিল ১৬ হাজার ডলার, সেখানে ২০১৯ সালে সেই বিটকয়েনেরই দাম দাঁড়িয়েছিল ৩ হাজার ৩৩৩ ডলারে। বর্তমানে প্রতিটি বিটকয়েনের দাম ঘুরছে ৬৩ হাজার ডলারের আশপাশে। বিটকয়েনের লেনদেনে লেনদেনকারীর পরিচয় জানা যায় না। তার পরিবর্তে ব্লকচেন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয় সংকেতলিপি। এর কেনাবেচা চলে কম্পিউটার, স্মার্টফোন এবং ট্যাবলেটে। নির্দিষ্ট বিটকয়েন এক্সচেঞ্জে ডিজিটাল ওয়ালেট মারফত বিটকয়েন কিনতে হয়, সেখানেই তা জমা থাকে। ওয়ালেটের আইডি এবং পাসওয়ার্ড থাকে, যা ব্যবহার করে তা খুলতে হয়। ওই মুদ্রা বিক্রি করতে হলে ক্রেতাকে ডিজিটাল চাবি (আইডি ও পাসওয়ার্ড) জানাতে হয় বিক্রেতাকে। বিটকয়েনের কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা নেই। তাই এতে লগ্নি করে অর্থ মার গেলে কারও কাছে অভিযোগ জানানো যায় না।

গত কয়েক বছর থেকেই বিটকয়েনের মতো ভার্চুয়াল মুদ্রা নিয়ে আগ্রহ বাড়তে শুরু করেছে। এ মুদ্রা জোগানের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে গাণিতিক ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের জ্ঞানসমৃদ্ধ ও তৎসম্পর্কিত মেধাসম্পন্ন মানুষজনের হাতে। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, ধারণাটা মন্দ নয়। এর ফলে বাজারে নগদের জোগান বাড়বে। তারা মনে করেন, হাতে অতিরিক্ত পয়সা এলে লোকে বেশি জিনিস কিনবে। তাতে বিক্রি না হওয়া জিনিস এবং কাজ না পাওয়া মানুষ সবারই উপকার হবে। বাজারে চাহিদা বাড়লে যে যে জিনিসের উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব-উৎপাদন বাড়বে, ফলে মূল্যবৃদ্ধি কমে যাবে। যেখানে সেটা সম্ভব নয়, সেখানে দাম বেশি বাড়বে। কিন্তু সার্বিকভাবে অর্থব্যবস্থার চাকা গড়াতে আরম্ভ করবে। অন্য একদল অর্থনীতিবিদ মনে করেন, ঠিক এর উলটোটা। তারা মনে করেন, কোনো দেশের অর্থব্যবস্থা যখন বিপদে পড়ে, তখন সুদের হার কমিয়ে, অর্থের জোগান বাড়িয়ে অর্থব্যবস্থাকে চাঙা করার কাজটি সব দেশের সরকারকেই করতে হয়। ক্রিপ্টো মুদ্রা যদি আইনি মুদ্রার মর্যাদা পায় এবং কালক্রমে যদি দেশের মুদ্রার ওপর মানুষের বিশ্বাস কমে যায়, তাহলে অর্থের জোগান বাড়িয়ে অর্থব্যবস্থাকে চাঙা করে তোলার ওষুধটি দুর্বল হয়ে পড়বে। সরকারের কল্যাণমূলক কাজকর্ম, দেশের সংকটাবস্থায় মানুষকে স্বস্তি দেওয়া, দেশের অর্থনীতিকে ঠিকপথে চালিত করা সবকিছুতেই সরকারের একটি বিশেষ ভূমিকা থাকে। কোনো দেশের অর্থব্যবস্থায় সেই দেশের সার্বভৌম গণ্ডির বাইরের একটি মুদ্রাব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হলে, সেই দেশের স্বাধীন আর্থিক নীতি বিপর্যস্ত হতে পারে। অন্যদিকে, দেশের টাকা ও ক্রিপ্টো মুদ্রা এ দুয়ের বিনিময়মূল্য স্থির করা শক্ত। ক্রিপ্টো মুদ্রার জোগানের পরিমাণ বাড়লে-কমলে অথবা আন্তর্জাতিক চাহিদার পরিবর্তন ঘটলে টাকার অনুপাতে তার তখন দামও পালটাবে।

ক্রিপ্টো মুদ্রার জোগানের বৃদ্ধির হার এখন পর্যন্ত গাণিতিকভাবে স্বনিয়ন্ত্রিত। সমস্যা হলো, এক ক্ষুদ্রগোষ্ঠী ভবিষ্যতে যদি ক্রিপ্টো মুদ্রার সিংহভাগ কুক্ষিগত করে ফেলে এবং ক্রিপ্টো মুদ্রা যদি বিনিময়ের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তাহলে বিশ্বের আর্থিক ব্যবস্থা ওই ক্ষুদ্রগোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। দৃশ্যত অবাস্তব, অথচ কোটি কোটি টাকার ব্যবসায় কোনো ধরনের কর বসানো ভীষণ শক্ত। কেউ কেউ মনে করেন, বিটকয়েনের ষোলো আনাই ভাঁওতাবাজি। বিল গেটসও এমনটাই মনে করেন। ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে টেক সামিটে এসে এমনই বলেছিলেন বিল গেটস। অন্যদিকে ইলন মাস্ক, কিম কার্দাশিয়ানের মতো সেলিব্রিটিরা ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রমোট করেছেন।

ক্রিপ্টোকারেন্সির সমর্থকরা মনে করেন, ক্রিপ্টোকারেন্সি অপরিহার্যভাবে অর্থনৈতিক লেনদেনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তারা ব্যাখ্যা করেন এভাবে-ধরুন, আপনি মেহনত করেন। সেই মেহনত কায়িক কিংবা মেধাগত। আর সেই মেহনতের বিনিময়ে আপনি আয় করেন। আয় মানে টাকা। অর্থাৎ আপনার আয় ও মেহনত পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। এটাই হলো সমীকরণ। এবার আপনি আয় অর্থাৎ টাকা খরচ করেন নিজের চাহিদা পূরণে। প্রথমে মৌলিক চাহিদা, তারপর সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য-বিলাসিতা। আপনি টাকা দিয়ে কিনতে পারেন, কারণ টাকার মূল্য আছে। আপনি যাকে টাকা দিচ্ছেন, তিনি বিশ্বাস করেন ওই টাকা তিনি আবার ভবিষ্যতে ব্যবহার করতে পারবেন। ব্যাংক আছে, তাই আপনার টাকার মূল্য আছে। গুগল পে বা অন্য কোনো ওয়ালেট থেকে ডিজিটাল লেনদেনেও আপনার ভার্চুয়াল অ্যাকাউন্ট থেকেই ক্রিপ্টোকারেন্সি বিযুক্ত হয়ে অন্য কারও অ্যাকাউন্টে যুক্ত হয়। সাধারণ নিয়মে যখন আপনি খরচ করেন, তখন ব্যাংকের কাজ-যিনি খরচ করবেন তার অ্যাকাউন্টে সেই পরিমাণ খরচ করার মতো টাকা আছে কি না সেটা দেখা। টাকা খরচ হলে সেই পরিমাণ টাকা বিযুক্ত করে যিনি পাচ্ছেন তার অ্যাকাউন্টে যুক্ত করা হয়।

ক্রিপ্টোকারেন্সির পক্ষে যাদের মতামত, তারা বলেন-ক্রিপ্টোকারেন্সির দুনিয়ায় ব্যাংক নেই। ক্রিপ্টোকারেন্সি হিসাবের কাজটি করবেন ক্রিপ্টোকারেন্সি যারা ব্যবহার করেন, তারা সবাই। সবাই মিলে প্রকাশ্যে-এ হিসাব রাখার পোশাকি নাম ‘ব্লকচেন’। ব্লকচেনের প্রত্যেকের নির্দিষ্ট আইডির পাশে লেখা থাকবে-কার কাছে কত ক্রিপ্টোকারেন্সি আছে, কে কত ক্রিপ্টোকারেন্সি খরচ করেছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি খরচ হলে প্রতিবার খরচের পরই ডিজিটাল মাইনিং-এর মাধ্যমে ওই ব্লকচেন আপডেট হবে। ব্লকচেন আপডেট করার জন্য যে যত ডিজিটাল মাইনিং করতে পারবে, তার অ্যাকাউন্টে তত ক্রিপ্টোকারেন্সি আসবে। কম্পিউটার সায়েন্সের গেম থিয়োরিতে বিখ্যাত ‘বাইজেন্টাইন জেনারেল প্রোবলেম’ ডিজিটাল মাইনিং-এর বেসিক কথা। ব্যাপক সংখ্যায় সুপার কম্পিউটার, উন্নত মাইনিং সফটওয়্যার, প্রচুর ডেটা স্টোরেজ এবং অভাবনীয় পরিমাণ ইলেকট্রিসিটির জোগান ছাড়া এ ডিজিটাল মাইনিং অসম্ভব। কেবল বিটকয়েনের ব্লকচেন আপডেট করতে খরচ হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার সারা বছরের সমপরিমাণ ইলেকট্রিসিটি। ফলে ডিজিটাল মাইনিংয়ের মনোপলি থাকার সম্ভাবনা বিগ বিজনেস হাউজ আর করপোরেটগুলোরই।

টাকার হিসাব ব্যাংক করলে সেই ব্যাংক কন্ট্রোল করার রশি থাকে সরকারের হাতে কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে। কিন্তু ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্লকচেন নিয়ন্ত্রণ করার করপোরেট হাউজকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা নেই। ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্লকচেনে নাম-পরিচয় না থাকায় জালিয়াতি করা সহজ। রেন্ডম নম্বরের আড়ালে ব্যবসা করছে মাদক ব্যবসায়ীরা, বেআইনি অস্ত্র পাচারকারীরা বেছে নিচ্ছে ক্রিপ্টোকে। কালোটাকা সাদা হচ্ছে ক্রিপ্টোর ফটকা বাজারে। সম্প্রতি এমন এক স্ক্যামে, লুনা এবং টেরা ইউএসডির নামে দুটি ক্রিপ্টোকারেন্সি কয়েক ঘণ্টায় স্ক্যামের পাল্লায় পড়ে ৫০ বিলিয়ন ইউএসডি হারিয়েছে। এতে সর্বস্বান্ত হয়েছেন কিছু সাধারণ ক্রিপ্টো অ্যাকাউন্ট হোল্ডার।

২০০৮-২০০৯ অর্থনৈতিক মন্দার পর ক্রিপ্টোকারেন্সির হয়ে সাফাই গেয়েছিলেন যারা, তারা সবাই হলেন আমেরিকার লিবারেল পার্টির সদস্য। চরম দক্ষিণপন্থি আমেরিকার এ লিবারেল পার্টির মতাদর্শের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বেসরকারীকরণ। তারা মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা ছাড়া সমাজের বাকি সবকিছুই বেসরকারীকরণ জরুরি। ঠিক এ আঙ্গিকেই আর্থিক ব্যবস্থার বেসরকারীকরণের লক্ষ্যে আমদানি হয়েছিল ক্রিপ্টোকারেন্সির। এরা মনে করেন, ডিজিটাল যুগের কারেন্সির ডিজিটালাইজেশন হবে সেটাই স্বাভাবিক। এ মতামতের বিরোধিতাকারীরা মনে করেন-সেন্ট্রাল ব্যাংককে বাদ দিয়ে কোনো বিগ বিজনেস হাউজ কিংবা করপোরেট সংস্থার মুনাফার জন্য যে ক্রিপ্টোকারেন্সির থিম তৈরি হয়েছে, তা মানুষের উপকারে তো লাগবেই না; বরং সুস্থ আর্থিক অবস্থানটাকেই নড়বড়ে করে তুলবে।

সুধীর সাহা : কলাম লেখক

ceo@ilcb.net

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন