পর্যটনশিল্প ঘিরে নতুন সম্ভাবনা
jugantor
বিশ্ব পর্যটন দিবস
পর্যটনশিল্প ঘিরে নতুন সম্ভাবনা

  ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া  

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় শিল্প পর্যটন, যা বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। বিপুল সম্ভাবনাময় এ শিল্প শুধু উন্নত দেশই নয়; বরং অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। শুধু তাই নয়, বর্তমান বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে টিকে থাকার জন্য পর্যটনশিল্পের ভূমিকা অতুলনীয়। কোভিড-১৯ মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত সেক্টরগুলোর মধ্যে পর্যটন অন্যতম। পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব, যা একটি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে সহায়তা করতে পারে। এ কারণে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পর্যটনশিল্পকে পুনরায় উজ্জীবিত করা প্রয়োজন।

জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থার (ইউএনডব্লিউটিও) উদ্যোগে ১৯৮০ সাল থেকে প্রতিবছর ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস পালন করা হয়। লক্ষ্য-পর্যটনের ভূমিকা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উপযোগিতাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো ‘Rethinking Tourism’ অর্থাৎ পর্যটনে পুনর্ভাবনা। বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় পর্যটন আকর্ষণগুলোকে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে তুলে ধরার প্রয়াসে নতুনভাবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে কাজ করে যেতে হবে। বাংলাদেশে পর্যটনশিল্পের বিকাশের সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে দেশের পর্যটনশিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্বদরবারে দেশের পর্যটনশিল্পকে কার্যকরভাবে তুলে ধরতে হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় দুই শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। ইতোমধ্যে পর্যটন বিশ্বের বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর এক-তৃতীয়াংশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস পর্যটনশিল্প। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার প্রাক্কলন অনুযায়ী, সারা বিশ্বে প্রায় ১০০ মিলিয়নের বেশি মানুষ তাদের জীবন-জীবিকার জন্য এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। এ দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে পর্যটনশিল্প বড় নিয়ামক হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বহুমাত্রিক পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা রয়েছে শুধু কক্সবাজারে। বহুমাত্রিক পর্যটনে সাংস্কৃতিক, ইকো, স্পোর্টস, কমিউনিটি ও ভিলেজ ট্যুরিজম ব্যবস্থা অত্যাবশ্যক। বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পে বেসরকারি বিনিয়োগ ধীরে ধীরে বাড়ছে। পর্যটকদের আবাসন সুবিধা বৃদ্ধির অভিপ্রায়ে কক্সবাজারে রাজধানী নগরী ঢাকা থেকেও বেশি হোটেল-মোটেল গড়ে উঠেছে। সব পর্যটনকেন্দ্রেই বেসরকারি উদ্যোগের কারণে অভ্যন্তরীণ পর্যটকদের আকর্ষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে উল্লেখযোগ্য হারে।

বাংলাদেশ সরকার পর্যটনশিল্পের বিকাশ ও উন্নয়নকে গতিশীল করতে বহু প্রকল্প হাতে নিয়েছে। করোনা-পরবর্তী দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। সম্প্রতি সরকার পর্যটনশিল্পের ব্যাপক উন্নয়ন ও বিকাশের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের লক্ষ্যে একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড এ শিল্পের উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করছে। মহাপরিকল্পনার অংশ হিসাবে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী পর্যটন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে।

২০২৫ সালের মধ্যে পর্যটনশিল্পের সর্বোচ্চ বিকাশে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। পুরো দেশকে আটটি পর্যটন জোনে ভাগ করে প্রতিটি স্তরে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রথমবারের মতো সরকারি-বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসাবে কক্সবাজারে পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণে ২৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলোয় প্রায় প্রত্যক্ষভাবে বিনিয়োগ হবে ৩৭ হাজার কোটি টাকা। পরোক্ষভাবে বিনিয়োগ হবে ১ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া সরকারের প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন, আধুনিক হোটেল-মোটেল নির্মাণ, মহেশখালীতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, সোনাদিয়াকে বিশেষ পর্যটন এলাকা হিসাবে গড়ে তোলা, ইনানি সৈকতের উন্নয়ন, টেকনাফের সাবরাংয়ে ইকো ট্যুরিজম পার্ক নির্মাণ, শ্যামলাপুর সৈকতের উন্নয়ন, ঝিলংঝা সৈকতের উন্নয়ন, চট্টগ্রাম কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ, কুতুবদিয়ায় বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্প্রসারণ, চকরিয়ায় মিনি সুন্দরবনে পর্যটকদের গমনের জন্য যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, ডুলাহাজরা সাফারি পার্কের আধুনিকায়ন প্রভৃতি। এছাড়া আরও চারটি নতুন প্রকল্প নিতে যাচ্ছে সরকার। এসব বাস্তবায়ন হলে আগামী দিনে দেশের পর্যটন খাত আরও চাঙা হবে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও পিপিপির মাধ্যমে বিনিয়োগ করা হবে।

পর্যটনশিল্প-বিকাশে অবারিত সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশে। বিদেশি পর্যটক ছাড়াও দেশের পর্যটকদের নিরাপত্তা, যোগাযোগের সুবিধা ও আকর্ষণীয় অফার দিলে মানুষ আগ্রহ নিয়ে দেশ ঘুরে দেখতে চাইবে। ১৬ কোটির বেশি মানুষের মধ্যে গড়ে ১০ শতাংশও যদি প্রতিবছর দেশ ঘুরে দেখে, তাহলে বিশাল অঙ্কের অর্থনৈতিক তৎপরতা সৃষ্টি হবে। দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে পর্যটনশিল্প বিকাশের ফলে। ২০০৯ থেকে ২০১৭ এ আট বছরে ৬ হাজার ৬৯৯ দশমিক ১৬ কোটি টাকা পর্যটনশিল্পের মাধ্যমে আয় হয়েছে। বিভিন্ন উৎসবকালীন মানুষের ঘুরে বেড়ানোর যে প্রবণতা, তা এ অর্থনৈতিক বিকাশ আরও বাড়িয়ে দেবে।

বাংলাদেশের সৌন্দর্যে যুগ যুগ বহু পরিব্রাজক ও ভ্রমণকারী মুগ্ধ হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা অপরিসীম। আমাদের রয়েছে সুবিশাল সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, জলপ্রপাত, প্রত্নতত্ত্বের প্রাচুর্য, ঐতিহাসিক নিদর্শনসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থান; যা পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য যথেষ্ট। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস, বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি আমাদের দেশকে পরিণত করেছে একটি বহুমাত্রিক আকর্ষণসমৃদ্ধ অনন্য পর্যটন গন্তব্যে।

বিশ্ব পর্যটন সংস্থার প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২২ সাল নাগাদ পর্যটনশিল্প থেকে প্রতিবছর ২ ট্রিলিয়ন ডলার আয় হবে। ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের ৫১টি দেশের পর্যটকরা বাংলাদেশে ভ্রমণ করবেন, যা মোট জিডিপিতে ১০ শতাংশ অবদান রাখবে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৪ সালে মোট কর্মসংস্থানের ১ দশমিক ৯ শতাংশ হবে পর্যটনশিল্পের অবদান। পর্যটনশিল্পের অপার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার রোল মডেল। ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) তথ্যানুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ শিল্পের অবদান ৮ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০১৯ সালে পর্যটনশিল্প বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ২ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার অবদান রাখে, যা বিশ্ব জিডিপির ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ফলে সাধারণ মানুষের কাছে ভ্রমণপিপাসা অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে বিধায় আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে অনন্য অবদান রাখছে।

বাংলাদেশে পর্যটন খাতে সরাসরি কর্মরত আছেন প্রায় ১৫ লাখ মানুষ। এছাড়া পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় ২৩ লাখ মানুষ। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ১১০ কোটি। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২২ সাল নাগাদ এ সংখ্যা ২০০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। আর বিপুলসংখ্যক পর্যটকের প্রায় ৭৫ শতাংশ ভ্রমণ করবে এশিয়ার দেশগুলোয়। বাংলাদেশ যদি এ বিশাল বাজারে টিকে থাকতে পারে, তাহলে পর্যটনের হাত ধরেই বদলে যেতে পারে দেশের অর্থনীতির রূপরেখা।

বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশ এ শিল্পে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। তবে বাংলাদেশেও ভবিষ্যতে পর্যটকের সংখ্যা ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বৃদ্ধির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে পর্যটন খাতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পদক্ষেপগুলো হলো : ১. পর্যটনসমৃদ্ধ অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন, ২. সব ক্ষেত্রে পর্যটকদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা, ৩. পর্যটন এলাকায় পর্যটন পুলিশকেন্দ্র স্থাপন, ৪. বিমানবন্দর ও নৌবন্দর স্থাপন ও উন্নয়ন, ৫. পর্যটন স্পটে পর্যটকদের জন্য বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা, ৬. পর্যটন মেলার আয়োজন, ৭. বিদেশি পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক গাইডের ব্যবস্থা করা, ৮. বিদেশে বাংলাদেশের ট্যুরিজম প্রমোশনে রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারের উদ্যোগী ভূমিকা পালন, ৯. পাঠ্যপুস্তকে পর্যটন বিষয়ে কোর্সগুলো অন্তর্ভুক্তকরণ, ১০. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইন্টারনেট ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রচারণা, ১১. পর্যটন বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ, ১২. ট্যুরিস্ট জেনারেটিং দেশে পর্যটন অফিস স্থাপন, ১৩. পর্যটন এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস ও টেলিফোন ব্যবস্থা, ১৪. পর্যটন এলাকা বা এর আশপাশে সরকারি উদ্যোগে প্রয়োজনীয়সংখ্যক থ্রি-স্টার/ফাইভ-স্টার হোটেল নির্মাণ করা প্রভৃতি।

পর্যটন খাতে বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট করতে হবে। বিদেশিদের জন্য যথাযথ পরিবেশ, আলাদা আবাসিক ও বিনোদনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বে চীনা পর্যটকরা বেশি ব্যয় করে। চীনের নাগরিকের বেশির ভাগ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। তাই তাদের আকৃষ্ট করতে বৌদ্ধ স্থাপনাগুলোয় যোগাযোগ ও অন্যান্য সুবিধা বাড়াতে হবে। চীনা পর্যটকদের আনতে পারলে অর্থনীতিতে গতিসঞ্চার হবে। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া পর্যটন খাতে অনেক এগিয়ে। দেখা যায়, চীনা পর্যটকের হার অনেক বেশি এ দুই দেশে। ভারতেও পর্যটন থেকে অনেক আয় হয়। বাংলাদেশে পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে জাতীয় পরিকল্পনায় পর্যটনশিল্পকে অগ্রাধিকার প্রদান, জাতীয় বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা, ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পর্যটন পুলিশ গড়ে তোলা, পরিকল্পিত প্রচারণা চালানো, দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা এবং পরিকল্পিত বিনিয়োগ প্রয়োজন।

পর্যটন স্থানগুলোয় যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন অত্যাবশ্যক। নিরাপত্তার অভাব, চুরি বা ছিনতাই, রাস্তা বা ট্যুরিস্ট স্পটে নোংরা পরিবেশ প্রভৃতি বিদেশিদের কাছে চিন্তার কারণ। এগুলো দূর করতে পারলে বিদেশিদের আকৃষ্ট করা যাবে। ট্রেন যোগাযোগ বিদেশিরা পছন্দ করে। এটি আরামদায়ক। তাই রেলব্যবস্থার উন্নয়ন ও লাইন সম্প্রসারণ করতে হবে। দক্ষ ট্যুর গাইডের অভাব রয়েছে বাংলাদেশে। ইংরেজি বা বিদেশি ভাষায় দক্ষ গাইড বিদেশিদের সন্তুষ্ট করতে পারবে।

সময়োপযোগী ও পরিকল্পনামাফিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে দেশের পর্যটন স্পট যদি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা যায়, তাহলে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পে নবদিগন্তের সূচনা হবে। তবে পর্যটন বলতে শুধু ঘোরাফেরার ধারণা পরিবর্তন করে একে বহুমুখী করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। পর্যটনের বহু শাখা-প্রশাখার মধ্যে বিনোদন পর্যটন, শ্রান্তিবিনোদন পর্যটন, সাংস্কৃতিক পর্যটন, ইভেন্ট পর্যটন, সংস্কৃতিভিত্তিক পর্যটন, ক্রীড়া পর্যটন, নৌ পর্যটন, হাওড় পর্যটন, ধর্মভিত্তিক পর্যটনশিল্পকে গুরুত্ব দিতে হবে। এত সম্ভাবনা থাকার পরও আমরা পর্যটক আকর্ষণের মতো কোনো পন্থাই এখনো নির্ধারণ করে উঠতে পারছি না। আমরা একটু সচেতন হলেই নিজেদের পর্যটন ক্ষমতা বাড়িয়ে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটককে বাংলাদেশে আনতে পারি। পর্যটনকে বলা হয় অদৃশ্য অর্থনৈতিক শক্তি। একটু নজর দিলে এ খাত থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে অসামান্য অবদান রাখতে পারে।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া : ট্রেজারার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্ব পর্যটন দিবস

পর্যটনশিল্প ঘিরে নতুন সম্ভাবনা

 ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া 
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় শিল্প পর্যটন, যা বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। বিপুল সম্ভাবনাময় এ শিল্প শুধু উন্নত দেশই নয়; বরং অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। শুধু তাই নয়, বর্তমান বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে টিকে থাকার জন্য পর্যটনশিল্পের ভূমিকা অতুলনীয়। কোভিড-১৯ মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত সেক্টরগুলোর মধ্যে পর্যটন অন্যতম। পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব, যা একটি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে সহায়তা করতে পারে। এ কারণে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পর্যটনশিল্পকে পুনরায় উজ্জীবিত করা প্রয়োজন।

জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থার (ইউএনডব্লিউটিও) উদ্যোগে ১৯৮০ সাল থেকে প্রতিবছর ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস পালন করা হয়। লক্ষ্য-পর্যটনের ভূমিকা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উপযোগিতাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো ‘Rethinking Tourism’ অর্থাৎ পর্যটনে পুনর্ভাবনা। বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় পর্যটন আকর্ষণগুলোকে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে তুলে ধরার প্রয়াসে নতুনভাবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে কাজ করে যেতে হবে। বাংলাদেশে পর্যটনশিল্পের বিকাশের সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে দেশের পর্যটনশিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্বদরবারে দেশের পর্যটনশিল্পকে কার্যকরভাবে তুলে ধরতে হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় দুই শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। ইতোমধ্যে পর্যটন বিশ্বের বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর এক-তৃতীয়াংশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস পর্যটনশিল্প। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার প্রাক্কলন অনুযায়ী, সারা বিশ্বে প্রায় ১০০ মিলিয়নের বেশি মানুষ তাদের জীবন-জীবিকার জন্য এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। এ দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে পর্যটনশিল্প বড় নিয়ামক হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বহুমাত্রিক পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা রয়েছে শুধু কক্সবাজারে। বহুমাত্রিক পর্যটনে সাংস্কৃতিক, ইকো, স্পোর্টস, কমিউনিটি ও ভিলেজ ট্যুরিজম ব্যবস্থা অত্যাবশ্যক। বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পে বেসরকারি বিনিয়োগ ধীরে ধীরে বাড়ছে। পর্যটকদের আবাসন সুবিধা বৃদ্ধির অভিপ্রায়ে কক্সবাজারে রাজধানী নগরী ঢাকা থেকেও বেশি হোটেল-মোটেল গড়ে উঠেছে। সব পর্যটনকেন্দ্রেই বেসরকারি উদ্যোগের কারণে অভ্যন্তরীণ পর্যটকদের আকর্ষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে উল্লেখযোগ্য হারে।

বাংলাদেশ সরকার পর্যটনশিল্পের বিকাশ ও উন্নয়নকে গতিশীল করতে বহু প্রকল্প হাতে নিয়েছে। করোনা-পরবর্তী দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। সম্প্রতি সরকার পর্যটনশিল্পের ব্যাপক উন্নয়ন ও বিকাশের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের লক্ষ্যে একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড এ শিল্পের উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করছে। মহাপরিকল্পনার অংশ হিসাবে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী পর্যটন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে।

২০২৫ সালের মধ্যে পর্যটনশিল্পের সর্বোচ্চ বিকাশে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। পুরো দেশকে আটটি পর্যটন জোনে ভাগ করে প্রতিটি স্তরে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রথমবারের মতো সরকারি-বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসাবে কক্সবাজারে পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণে ২৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলোয় প্রায় প্রত্যক্ষভাবে বিনিয়োগ হবে ৩৭ হাজার কোটি টাকা। পরোক্ষভাবে বিনিয়োগ হবে ১ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া সরকারের প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন, আধুনিক হোটেল-মোটেল নির্মাণ, মহেশখালীতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, সোনাদিয়াকে বিশেষ পর্যটন এলাকা হিসাবে গড়ে তোলা, ইনানি সৈকতের উন্নয়ন, টেকনাফের সাবরাংয়ে ইকো ট্যুরিজম পার্ক নির্মাণ, শ্যামলাপুর সৈকতের উন্নয়ন, ঝিলংঝা সৈকতের উন্নয়ন, চট্টগ্রাম কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ, কুতুবদিয়ায় বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের সম্প্রসারণ, চকরিয়ায় মিনি সুন্দরবনে পর্যটকদের গমনের জন্য যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, ডুলাহাজরা সাফারি পার্কের আধুনিকায়ন প্রভৃতি। এছাড়া আরও চারটি নতুন প্রকল্প নিতে যাচ্ছে সরকার। এসব বাস্তবায়ন হলে আগামী দিনে দেশের পর্যটন খাত আরও চাঙা হবে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও পিপিপির মাধ্যমে বিনিয়োগ করা হবে।

পর্যটনশিল্প-বিকাশে অবারিত সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশে। বিদেশি পর্যটক ছাড়াও দেশের পর্যটকদের নিরাপত্তা, যোগাযোগের সুবিধা ও আকর্ষণীয় অফার দিলে মানুষ আগ্রহ নিয়ে দেশ ঘুরে দেখতে চাইবে। ১৬ কোটির বেশি মানুষের মধ্যে গড়ে ১০ শতাংশও যদি প্রতিবছর দেশ ঘুরে দেখে, তাহলে বিশাল অঙ্কের অর্থনৈতিক তৎপরতা সৃষ্টি হবে। দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে পর্যটনশিল্প বিকাশের ফলে। ২০০৯ থেকে ২০১৭ এ আট বছরে ৬ হাজার ৬৯৯ দশমিক ১৬ কোটি টাকা পর্যটনশিল্পের মাধ্যমে আয় হয়েছে। বিভিন্ন উৎসবকালীন মানুষের ঘুরে বেড়ানোর যে প্রবণতা, তা এ অর্থনৈতিক বিকাশ আরও বাড়িয়ে দেবে।

বাংলাদেশের সৌন্দর্যে যুগ যুগ বহু পরিব্রাজক ও ভ্রমণকারী মুগ্ধ হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা অপরিসীম। আমাদের রয়েছে সুবিশাল সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, জলপ্রপাত, প্রত্নতত্ত্বের প্রাচুর্য, ঐতিহাসিক নিদর্শনসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থান; যা পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য যথেষ্ট। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস, বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি আমাদের দেশকে পরিণত করেছে একটি বহুমাত্রিক আকর্ষণসমৃদ্ধ অনন্য পর্যটন গন্তব্যে।

বিশ্ব পর্যটন সংস্থার প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২২ সাল নাগাদ পর্যটনশিল্প থেকে প্রতিবছর ২ ট্রিলিয়ন ডলার আয় হবে। ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের ৫১টি দেশের পর্যটকরা বাংলাদেশে ভ্রমণ করবেন, যা মোট জিডিপিতে ১০ শতাংশ অবদান রাখবে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৪ সালে মোট কর্মসংস্থানের ১ দশমিক ৯ শতাংশ হবে পর্যটনশিল্পের অবদান। পর্যটনশিল্পের অপার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার রোল মডেল। ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) তথ্যানুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ শিল্পের অবদান ৮ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০১৯ সালে পর্যটনশিল্প বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ২ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার অবদান রাখে, যা বিশ্ব জিডিপির ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ফলে সাধারণ মানুষের কাছে ভ্রমণপিপাসা অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে বিধায় আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে অনন্য অবদান রাখছে।

বাংলাদেশে পর্যটন খাতে সরাসরি কর্মরত আছেন প্রায় ১৫ লাখ মানুষ। এছাড়া পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় ২৩ লাখ মানুষ। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ১১০ কোটি। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২২ সাল নাগাদ এ সংখ্যা ২০০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। আর বিপুলসংখ্যক পর্যটকের প্রায় ৭৫ শতাংশ ভ্রমণ করবে এশিয়ার দেশগুলোয়। বাংলাদেশ যদি এ বিশাল বাজারে টিকে থাকতে পারে, তাহলে পর্যটনের হাত ধরেই বদলে যেতে পারে দেশের অর্থনীতির রূপরেখা।

বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশ এ শিল্পে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। তবে বাংলাদেশেও ভবিষ্যতে পর্যটকের সংখ্যা ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বৃদ্ধির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে পর্যটন খাতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পদক্ষেপগুলো হলো : ১. পর্যটনসমৃদ্ধ অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন, ২. সব ক্ষেত্রে পর্যটকদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা, ৩. পর্যটন এলাকায় পর্যটন পুলিশকেন্দ্র স্থাপন, ৪. বিমানবন্দর ও নৌবন্দর স্থাপন ও উন্নয়ন, ৫. পর্যটন স্পটে পর্যটকদের জন্য বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা, ৬. পর্যটন মেলার আয়োজন, ৭. বিদেশি পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক গাইডের ব্যবস্থা করা, ৮. বিদেশে বাংলাদেশের ট্যুরিজম প্রমোশনে রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারের উদ্যোগী ভূমিকা পালন, ৯. পাঠ্যপুস্তকে পর্যটন বিষয়ে কোর্সগুলো অন্তর্ভুক্তকরণ, ১০. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইন্টারনেট ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রচারণা, ১১. পর্যটন বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ, ১২. ট্যুরিস্ট জেনারেটিং দেশে পর্যটন অফিস স্থাপন, ১৩. পর্যটন এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস ও টেলিফোন ব্যবস্থা, ১৪. পর্যটন এলাকা বা এর আশপাশে সরকারি উদ্যোগে প্রয়োজনীয়সংখ্যক থ্রি-স্টার/ফাইভ-স্টার হোটেল নির্মাণ করা প্রভৃতি।

পর্যটন খাতে বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট করতে হবে। বিদেশিদের জন্য যথাযথ পরিবেশ, আলাদা আবাসিক ও বিনোদনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বে চীনা পর্যটকরা বেশি ব্যয় করে। চীনের নাগরিকের বেশির ভাগ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। তাই তাদের আকৃষ্ট করতে বৌদ্ধ স্থাপনাগুলোয় যোগাযোগ ও অন্যান্য সুবিধা বাড়াতে হবে। চীনা পর্যটকদের আনতে পারলে অর্থনীতিতে গতিসঞ্চার হবে। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া পর্যটন খাতে অনেক এগিয়ে। দেখা যায়, চীনা পর্যটকের হার অনেক বেশি এ দুই দেশে। ভারতেও পর্যটন থেকে অনেক আয় হয়। বাংলাদেশে পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে জাতীয় পরিকল্পনায় পর্যটনশিল্পকে অগ্রাধিকার প্রদান, জাতীয় বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা, ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পর্যটন পুলিশ গড়ে তোলা, পরিকল্পিত প্রচারণা চালানো, দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা এবং পরিকল্পিত বিনিয়োগ প্রয়োজন।

পর্যটন স্থানগুলোয় যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন অত্যাবশ্যক। নিরাপত্তার অভাব, চুরি বা ছিনতাই, রাস্তা বা ট্যুরিস্ট স্পটে নোংরা পরিবেশ প্রভৃতি বিদেশিদের কাছে চিন্তার কারণ। এগুলো দূর করতে পারলে বিদেশিদের আকৃষ্ট করা যাবে। ট্রেন যোগাযোগ বিদেশিরা পছন্দ করে। এটি আরামদায়ক। তাই রেলব্যবস্থার উন্নয়ন ও লাইন সম্প্রসারণ করতে হবে। দক্ষ ট্যুর গাইডের অভাব রয়েছে বাংলাদেশে। ইংরেজি বা বিদেশি ভাষায় দক্ষ গাইড বিদেশিদের সন্তুষ্ট করতে পারবে।

সময়োপযোগী ও পরিকল্পনামাফিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে দেশের পর্যটন স্পট যদি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা যায়, তাহলে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পে নবদিগন্তের সূচনা হবে। তবে পর্যটন বলতে শুধু ঘোরাফেরার ধারণা পরিবর্তন করে একে বহুমুখী করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। পর্যটনের বহু শাখা-প্রশাখার মধ্যে বিনোদন পর্যটন, শ্রান্তিবিনোদন পর্যটন, সাংস্কৃতিক পর্যটন, ইভেন্ট পর্যটন, সংস্কৃতিভিত্তিক পর্যটন, ক্রীড়া পর্যটন, নৌ পর্যটন, হাওড় পর্যটন, ধর্মভিত্তিক পর্যটনশিল্পকে গুরুত্ব দিতে হবে। এত সম্ভাবনা থাকার পরও আমরা পর্যটক আকর্ষণের মতো কোনো পন্থাই এখনো নির্ধারণ করে উঠতে পারছি না। আমরা একটু সচেতন হলেই নিজেদের পর্যটন ক্ষমতা বাড়িয়ে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটককে বাংলাদেশে আনতে পারি। পর্যটনকে বলা হয় অদৃশ্য অর্থনৈতিক শক্তি। একটু নজর দিলে এ খাত থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে অসামান্য অবদান রাখতে পারে।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া : ট্রেজারার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন