হৃদয় দিয়ে হৃৎকে ভালোবাসুন
jugantor
হৃদয় দিয়ে হৃৎকে ভালোবাসুন

  এস এম মোস্তফা জামান  

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হৃদরোগ বিশ্বের এক নম্বর মৃত্যুর কারণ। প্রতিবছর সারা বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ৮৬ লাখ মানুষ মারা যান হৃদরোগের কারণে। হৃদরোগ হওয়ার পেছনে অনেক কারণ থাকে যেমন: ধূমপান, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, স্থূলতা, মেটাবলিক সিনড্রোম, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, আধুনিক আরামপ্রিয় অলস জীবনযাপন, বায়ুদূষণ প্রভৃতি।

বিশ্বের প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ মানুষ, যারা হৃদরোগে আক্রান্ত, কোভিড-১৯ তাদের জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছে। হৃদরোগীদের মধ্যে মারাত্মক কোভিড হওয়ার প্রবণতা খুব বেশি। অনেকেই এজন্য ভীত হয়ে তাদের নিয়মিত ও জরুরি মেডিকেল ফলোআপ থেকে বিরত থাকছেন এবং দিনদিন বন্ধু, পরিবার থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।

এ বছর বিশ্ব হার্ট দিবসের মূল প্রতিপাদ্য-‘হৃদয় দিয়ে হৃৎকে ভালোবাসুন, প্রকৃতি ও পরিবেশকে রক্ষা করুন’। কোভিড অতিমারি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে স্বাস্থ্যসেবার দুর্বল দিক এবং হৃদরোগীদের জন্য ভিন্ন ও অত্যাধুনিক উপায় খুঁজে বের করার তাগিদ অনুভব করতে বাধ্য করেছে।

ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার অধিকতর উন্নয়নের মাধ্যমে হৃদরোগের বিষয়ে মানুষকে সচেতন করে বিশ্বের হৃদরোগের প্রতিরোধ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করাই বিশ্ব হার্ট দিবসের প্রধান উদ্দেশ্য। টেলি স্বাস্থ্যসেবা হৃদরোগ ও রক্তনালিজনিত রোগ প্রতিরোধে বিশাল ভূমিকা পালন করতে পারে।

হৃদরোগ প্রতিরোধে যা করণীয় : কিছু বিষয় আছে যা আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, তবে হৃদরোগের বেশ কয়েকটি মূল ঝুঁকির কারণ জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে কয়েকটি বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন-

১. সিগারেট ও তামাকজাতীয় দ্রব্য স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ধূমপান হৃদরোগ ও ক্যানসারের কারণ হতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সিগারেটের ধোঁয়া হৃৎপিণ্ড ও রক্তনালিগুলোকে সংকীর্ণ করে এবং রক্তের মাধ্যমে অঙ্গে অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ কঠিন করে তোলে। কাজেই হার্ট সুস্থ রাখার জন্য ধূমপান ত্যাগ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অর্ধেক কমানো সম্ভব।

২. যাদের রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রার ওপরে থাকে, তাদের উচ্চরক্তচাপ রয়েছে বলে মনে করা হয়। এর ফলে হৃৎপিণ্ড স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পাম্প দেয়, যা রক্ত দিয়ে দেহে প্রবেশ করে। উচ্চরক্তচাপের কোনো সতর্ক সংকেত নেই, তাই প্রত্যেকেরই রক্তচাপ নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত। শারীরিক ক্রিয়াকলাপ বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ এবং স্বাস্থ্যকর ওজন ধরে রাখার মাধ্যমে উচ্চরক্তচাপ হ্রাস করা যায়। নিয়মিত রক্তচাপের স্ক্রিনিংগুলো সাধারণত ৩০ বছর বয়সে শুরু হয়। তবে যদি আপনার উচ্চরক্তচাপের পারিবারিক ইতিহাস থাকে, তবে দ্রুত পরীক্ষা করা উচিত। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা হলে তা স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক বা কিডনি রোগের কারণ হতে পারে।

৩. প্রতিদিন নিয়মিত কিছু ব্যায়াম করা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে পারে। শারীরিক ক্রিয়াকলাপ ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে এবং হার্টকে উচ্চ চাপ দিতে পারে। এটি উচ্চরক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল ও ডায়াবেটিসের মতো পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা কমাতে সহায়তা করে। নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ স্ট্রেস থেকেও মুক্তি দেয় এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

৪. কোলেস্টেরল সর্বদা রক্তনালিগুলোর ক্ষতি করার চেষ্টা করে। এটি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। কিছু কোলেস্টেরল খাবার থেকে আসে। ফ্যাট ও কম কোলেস্টেরলযুক্ত খাবার খাওয়ার মাধ্যমে দেহে খারাপ কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমানো যেতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত ৪০ বছর বয়সে প্রতিবছর কমপক্ষে একবার কোলেস্টেরল পরিমাপ করা উচিত।

৫. ওজন বেশি হওয়ার কারণে রক্তে কোলেস্টেরল বৃদ্ধি, উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো মারাত্মক সমস্যা দেখা দিতে পারে। পুরুষদের কোমর পরিমাপ ৪০ ইঞ্চির (১০১.৬ সেন্টিমিটার) বেশি হলে সাধারণত ওজন বেশি বলে বিবেচিত হয়। মহিলাদের কোমর পরিমাপ ৩৫ ইঞ্চির (৮৮.৯ সেমি.) বেশি হলে ওজন বেশি হয়। ওজন মাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশ হ্রাস করা হলে তা ট্রাইগ্লিসারাইড, রক্তে শর্করা (গ্লুকোজ) ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। আরও বেশি ওজন কমানো হলে তা রক্তচাপ এবং রক্তের কোলেস্টেরলের স্তরকে হ্রাস করতে সহায়তা করে।

৬. ডায়াবেটিস হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। অতিরিক্ত ওজন ও শারীরিক নিষ্ক্রিতা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের কারণ হতে পারে। যদি আপনার ওজন স্বাভাবিক হয় এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির কারণ না থাকে, তবে আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন ৪০ বছর বয়সে স্ক্রিনিং শুরু করার এবং প্রতিবছর পুনরায় পরীক্ষা করার পরামর্শ দেয়।

৭. যেসব খাবারে প্রচুর পরিমাণে আঁশ আছে সেসব খাবার খাবেন। আঁশযুক্ত খাদ্য রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। বেশি আঁশ আছে এ রকম সবজির মধ্যে রয়েছে শিম ও মটরশুঁটি ধরনের সবজি, কলাই ও ডালজাতীয় শস্য এবং ফলমূল। পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বলছেন, আলু ও শেকড়জাতীয় সবজি খোসাসহ রান্না করলে সেগুলো থেকেও প্রচুর আঁশ পাওয়া যায়। এছাড়া তারা হোলগ্রেইন আটার রুটি এবং বাদামি চাল খাবারও পরামর্শ দিয়েছেন।

৮. স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা জমাট বাঁধা চর্বিজাতীয় খাবার কমিয়ে ফেলুন। খাদ্যবিজ্ঞানীরা বলছেন, যেসব খাবারে বেশি স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে, সেসব খাবার খেলে শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যায়। এর ফলে বেড়ে যায় হৃদরোগের ঝুঁকিও। চিজ, দই, লাল মাংস, মাখন, কেক, বিস্কুট ও নারকেল তেলে প্রচুর পরিমাণে স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে। তারা বলছেন, হৃদরোগ প্রতিরোধ করতে হলে স্যাচুরেটেড নয়-এমন চর্বিযুক্ত (যেসব খাবারের ওপর চর্বি জমাট বাঁধে না) খাবার খেতে হবে। এসব খাবারের মধ্যে রয়েছে সামুদ্রিক মাছ, বাদাম ও বীজ। অলিভ, সানফ্লাওয়ার, ভুট্টা ও ওয়ালনাট তেল দিয়ে রান্নার বিষয়ে তারা জোর দিয়েছেন।

দুধের বেলায় স্কিমড বা সেমি-স্কিমড (দুধ থেকে চর্বি সরিয়ে নেওয়া) দুধ খেতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে খাবারে যাতে বাইরে থেকে চিনি মেশানো না থাকে। লাল মাংসের বদলে খেতে হবে মুরগির মাংস। মুরগির চামড়া তুলে ফেলে দিন। গরুর মাংস খেলে তার ওপর থেকে চর্বি ফেলে দিয়ে রান্না করতে হবে। সপ্তাহে অন্তত একদিন এমন মাছ খেতে হবে, যাতে প্রচুর তেল আছে। ক্রিস্প ও বিস্কুটের বদলে নানা ধরনের বাদাম ও বীজ খেতে পারেন।

৯. লবণ বেশি খেলে শরীরে রক্তচাপ বেড়ে যায়। এর ফলে বৃদ্ধি পায় হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও। খাবার সময় পাতে আলগা লবণ খাবেন না এবং খাবার টেবিলে লবণদানি রাখবেন না। লবণ কাঁচা হোক বা ভাজা হোক, উভয়ই ক্ষতিকর। ব্রিটেনে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয় যে এনএইচএস থেকে, তাদের পরামর্শ হলো দিনে সর্বোচ্চ ৬ গ্রাম (এক চা চামচের পরিমাণ) লবণ খাওয়া যেতে পারে। তারা বলছে, লবণ কমবেশি খাওয়া একটি অভ্যাসের ব্যাপার। লবণ যত কম খাওয়া হবে, এর চাহিদাও তত কমে যাবে। এ অভ্যাস বদলাতে মাত্র চার সপ্তাহের মতো সময় লাগে। খাদ্য বিশেষজ্ঞ বলছেন, লবণের পরিবর্তে মসলা দিয়ে খাবার প্রস্তুত করলে তা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাবে।

১০. যেসব খাবারে ভিটামিন ও খনিজপদার্থ বেশি থাকে, সেগুলো আমাদের সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, এসব খাবার হৃদরোগের ঝুঁকিও কমিয়ে দেয়। ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো খনিজ উচ্চরক্তচাপ প্রতিরোধ করে। হৃদরোগের যেসব কারণ আছে সেগুলো ঠেকাতেও এসব খনিজ ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারে। অনেক খাদ্য বিশেষজ্ঞ মনে করেন, স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ ডায়েটের মাধ্যমেই এসব ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া সম্ভব।

এসবের জন্য ওষুধের ওপর নির্ভর করতে হবে না। তবে ব্যতিক্রম হচ্ছে ভিটামিন ডি। কারও শরীরে ভিটামিন ও মিনারেলের অভাব থাকলে প্রতিদিন পরিমিত ফল বা সবজি খেতে হবে। শিম ও ডালজাতীয় শস্যও খেতে পারেন। বাদাম ও বীজজাতীয় খাবারে থাকে ভিটামিন ই। মাছ, দুগ্ধজাত খাবার ও হোলগ্রেইনে পাওয়া যায় ভিটামিন বি। কলা, আলু ও মাছে পটাশিয়াম। ডাল ও হোলগ্রেইনে ম্যাগনেসিয়াম। দুগ্ধজাত খাবার ও সবুজ পাতার সবজি থেকে পাওয়া যায় ক্যালসিয়াম।

১১. শরীরের অতিরিক্ত মেদ কমিয়ে ফেলুন। নিয়মিত কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে শরীরের অতিরিক্ত মেদ কমানো সম্ভব। এছাড়া খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্যালোরি গ্রহণ কমিয়ে শরীরের অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

১২. পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে এবং মানসিক চাপমুক্ত থাকতে হবে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে। যে ব্যক্তি পর্যাপ্ত ঘুমায় না, তার স্থূলত্ব, উচ্চরক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক, ডায়াবেটিস ও হতাশার ঝুঁকি বেশি থাকে।

এসএম মোস্তফা জামান : অধ্যাপক, কার্ডিওলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়; সভাপতি, বাংলাদেশ কার্ডিওভাসকুলার রিসার্চ ফাউন্ডেশন

হৃদয় দিয়ে হৃৎকে ভালোবাসুন

 এস এম মোস্তফা জামান 
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হৃদরোগ বিশ্বের এক নম্বর মৃত্যুর কারণ। প্রতিবছর সারা বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ৮৬ লাখ মানুষ মারা যান হৃদরোগের কারণে। হৃদরোগ হওয়ার পেছনে অনেক কারণ থাকে যেমন: ধূমপান, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, স্থূলতা, মেটাবলিক সিনড্রোম, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, আধুনিক আরামপ্রিয় অলস জীবনযাপন, বায়ুদূষণ প্রভৃতি।

বিশ্বের প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ মানুষ, যারা হৃদরোগে আক্রান্ত, কোভিড-১৯ তাদের জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছে। হৃদরোগীদের মধ্যে মারাত্মক কোভিড হওয়ার প্রবণতা খুব বেশি। অনেকেই এজন্য ভীত হয়ে তাদের নিয়মিত ও জরুরি মেডিকেল ফলোআপ থেকে বিরত থাকছেন এবং দিনদিন বন্ধু, পরিবার থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।

এ বছর বিশ্ব হার্ট দিবসের মূল প্রতিপাদ্য-‘হৃদয় দিয়ে হৃৎকে ভালোবাসুন, প্রকৃতি ও পরিবেশকে রক্ষা করুন’। কোভিড অতিমারি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে স্বাস্থ্যসেবার দুর্বল দিক এবং হৃদরোগীদের জন্য ভিন্ন ও অত্যাধুনিক উপায় খুঁজে বের করার তাগিদ অনুভব করতে বাধ্য করেছে।

ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার অধিকতর উন্নয়নের মাধ্যমে হৃদরোগের বিষয়ে মানুষকে সচেতন করে বিশ্বের হৃদরোগের প্রতিরোধ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করাই বিশ্ব হার্ট দিবসের প্রধান উদ্দেশ্য। টেলি স্বাস্থ্যসেবা হৃদরোগ ও রক্তনালিজনিত রোগ প্রতিরোধে বিশাল ভূমিকা পালন করতে পারে।

হৃদরোগ প্রতিরোধে যা করণীয় : কিছু বিষয় আছে যা আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, তবে হৃদরোগের বেশ কয়েকটি মূল ঝুঁকির কারণ জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে কয়েকটি বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন-

১. সিগারেট ও তামাকজাতীয় দ্রব্য স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ধূমপান হৃদরোগ ও ক্যানসারের কারণ হতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সিগারেটের ধোঁয়া হৃৎপিণ্ড ও রক্তনালিগুলোকে সংকীর্ণ করে এবং রক্তের মাধ্যমে অঙ্গে অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ কঠিন করে তোলে। কাজেই হার্ট সুস্থ রাখার জন্য ধূমপান ত্যাগ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অর্ধেক কমানো সম্ভব।

২. যাদের রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রার ওপরে থাকে, তাদের উচ্চরক্তচাপ রয়েছে বলে মনে করা হয়। এর ফলে হৃৎপিণ্ড স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পাম্প দেয়, যা রক্ত দিয়ে দেহে প্রবেশ করে। উচ্চরক্তচাপের কোনো সতর্ক সংকেত নেই, তাই প্রত্যেকেরই রক্তচাপ নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত। শারীরিক ক্রিয়াকলাপ বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ এবং স্বাস্থ্যকর ওজন ধরে রাখার মাধ্যমে উচ্চরক্তচাপ হ্রাস করা যায়। নিয়মিত রক্তচাপের স্ক্রিনিংগুলো সাধারণত ৩০ বছর বয়সে শুরু হয়। তবে যদি আপনার উচ্চরক্তচাপের পারিবারিক ইতিহাস থাকে, তবে দ্রুত পরীক্ষা করা উচিত। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা হলে তা স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক বা কিডনি রোগের কারণ হতে পারে।

৩. প্রতিদিন নিয়মিত কিছু ব্যায়াম করা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে পারে। শারীরিক ক্রিয়াকলাপ ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে এবং হার্টকে উচ্চ চাপ দিতে পারে। এটি উচ্চরক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল ও ডায়াবেটিসের মতো পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা কমাতে সহায়তা করে। নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ স্ট্রেস থেকেও মুক্তি দেয় এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

৪. কোলেস্টেরল সর্বদা রক্তনালিগুলোর ক্ষতি করার চেষ্টা করে। এটি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। কিছু কোলেস্টেরল খাবার থেকে আসে। ফ্যাট ও কম কোলেস্টেরলযুক্ত খাবার খাওয়ার মাধ্যমে দেহে খারাপ কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমানো যেতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত ৪০ বছর বয়সে প্রতিবছর কমপক্ষে একবার কোলেস্টেরল পরিমাপ করা উচিত।

৫. ওজন বেশি হওয়ার কারণে রক্তে কোলেস্টেরল বৃদ্ধি, উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো মারাত্মক সমস্যা দেখা দিতে পারে। পুরুষদের কোমর পরিমাপ ৪০ ইঞ্চির (১০১.৬ সেন্টিমিটার) বেশি হলে সাধারণত ওজন বেশি বলে বিবেচিত হয়। মহিলাদের কোমর পরিমাপ ৩৫ ইঞ্চির (৮৮.৯ সেমি.) বেশি হলে ওজন বেশি হয়। ওজন মাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশ হ্রাস করা হলে তা ট্রাইগ্লিসারাইড, রক্তে শর্করা (গ্লুকোজ) ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। আরও বেশি ওজন কমানো হলে তা রক্তচাপ এবং রক্তের কোলেস্টেরলের স্তরকে হ্রাস করতে সহায়তা করে।

৬. ডায়াবেটিস হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। অতিরিক্ত ওজন ও শারীরিক নিষ্ক্রিতা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের কারণ হতে পারে। যদি আপনার ওজন স্বাভাবিক হয় এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির কারণ না থাকে, তবে আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন ৪০ বছর বয়সে স্ক্রিনিং শুরু করার এবং প্রতিবছর পুনরায় পরীক্ষা করার পরামর্শ দেয়।

৭. যেসব খাবারে প্রচুর পরিমাণে আঁশ আছে সেসব খাবার খাবেন। আঁশযুক্ত খাদ্য রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। বেশি আঁশ আছে এ রকম সবজির মধ্যে রয়েছে শিম ও মটরশুঁটি ধরনের সবজি, কলাই ও ডালজাতীয় শস্য এবং ফলমূল। পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বলছেন, আলু ও শেকড়জাতীয় সবজি খোসাসহ রান্না করলে সেগুলো থেকেও প্রচুর আঁশ পাওয়া যায়। এছাড়া তারা হোলগ্রেইন আটার রুটি এবং বাদামি চাল খাবারও পরামর্শ দিয়েছেন।

৮. স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা জমাট বাঁধা চর্বিজাতীয় খাবার কমিয়ে ফেলুন। খাদ্যবিজ্ঞানীরা বলছেন, যেসব খাবারে বেশি স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে, সেসব খাবার খেলে শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যায়। এর ফলে বেড়ে যায় হৃদরোগের ঝুঁকিও। চিজ, দই, লাল মাংস, মাখন, কেক, বিস্কুট ও নারকেল তেলে প্রচুর পরিমাণে স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে। তারা বলছেন, হৃদরোগ প্রতিরোধ করতে হলে স্যাচুরেটেড নয়-এমন চর্বিযুক্ত (যেসব খাবারের ওপর চর্বি জমাট বাঁধে না) খাবার খেতে হবে। এসব খাবারের মধ্যে রয়েছে সামুদ্রিক মাছ, বাদাম ও বীজ। অলিভ, সানফ্লাওয়ার, ভুট্টা ও ওয়ালনাট তেল দিয়ে রান্নার বিষয়ে তারা জোর দিয়েছেন।

দুধের বেলায় স্কিমড বা সেমি-স্কিমড (দুধ থেকে চর্বি সরিয়ে নেওয়া) দুধ খেতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে খাবারে যাতে বাইরে থেকে চিনি মেশানো না থাকে। লাল মাংসের বদলে খেতে হবে মুরগির মাংস। মুরগির চামড়া তুলে ফেলে দিন। গরুর মাংস খেলে তার ওপর থেকে চর্বি ফেলে দিয়ে রান্না করতে হবে। সপ্তাহে অন্তত একদিন এমন মাছ খেতে হবে, যাতে প্রচুর তেল আছে। ক্রিস্প ও বিস্কুটের বদলে নানা ধরনের বাদাম ও বীজ খেতে পারেন।

৯. লবণ বেশি খেলে শরীরে রক্তচাপ বেড়ে যায়। এর ফলে বৃদ্ধি পায় হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও। খাবার সময় পাতে আলগা লবণ খাবেন না এবং খাবার টেবিলে লবণদানি রাখবেন না। লবণ কাঁচা হোক বা ভাজা হোক, উভয়ই ক্ষতিকর। ব্রিটেনে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয় যে এনএইচএস থেকে, তাদের পরামর্শ হলো দিনে সর্বোচ্চ ৬ গ্রাম (এক চা চামচের পরিমাণ) লবণ খাওয়া যেতে পারে। তারা বলছে, লবণ কমবেশি খাওয়া একটি অভ্যাসের ব্যাপার। লবণ যত কম খাওয়া হবে, এর চাহিদাও তত কমে যাবে। এ অভ্যাস বদলাতে মাত্র চার সপ্তাহের মতো সময় লাগে। খাদ্য বিশেষজ্ঞ বলছেন, লবণের পরিবর্তে মসলা দিয়ে খাবার প্রস্তুত করলে তা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাবে।

১০. যেসব খাবারে ভিটামিন ও খনিজপদার্থ বেশি থাকে, সেগুলো আমাদের সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, এসব খাবার হৃদরোগের ঝুঁকিও কমিয়ে দেয়। ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো খনিজ উচ্চরক্তচাপ প্রতিরোধ করে। হৃদরোগের যেসব কারণ আছে সেগুলো ঠেকাতেও এসব খনিজ ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারে। অনেক খাদ্য বিশেষজ্ঞ মনে করেন, স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ ডায়েটের মাধ্যমেই এসব ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া সম্ভব।

এসবের জন্য ওষুধের ওপর নির্ভর করতে হবে না। তবে ব্যতিক্রম হচ্ছে ভিটামিন ডি। কারও শরীরে ভিটামিন ও মিনারেলের অভাব থাকলে প্রতিদিন পরিমিত ফল বা সবজি খেতে হবে। শিম ও ডালজাতীয় শস্যও খেতে পারেন। বাদাম ও বীজজাতীয় খাবারে থাকে ভিটামিন ই। মাছ, দুগ্ধজাত খাবার ও হোলগ্রেইনে পাওয়া যায় ভিটামিন বি। কলা, আলু ও মাছে পটাশিয়াম। ডাল ও হোলগ্রেইনে ম্যাগনেসিয়াম। দুগ্ধজাত খাবার ও সবুজ পাতার সবজি থেকে পাওয়া যায় ক্যালসিয়াম।

১১. শরীরের অতিরিক্ত মেদ কমিয়ে ফেলুন। নিয়মিত কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে শরীরের অতিরিক্ত মেদ কমানো সম্ভব। এছাড়া খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্যালোরি গ্রহণ কমিয়ে শরীরের অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

১২. পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে এবং মানসিক চাপমুক্ত থাকতে হবে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে। যে ব্যক্তি পর্যাপ্ত ঘুমায় না, তার স্থূলত্ব, উচ্চরক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক, ডায়াবেটিস ও হতাশার ঝুঁকি বেশি থাকে।

এসএম মোস্তফা জামান : অধ্যাপক, কার্ডিওলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়; সভাপতি, বাংলাদেশ কার্ডিওভাসকুলার রিসার্চ ফাউন্ডেশন

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন