ভালো থাকুন প্রবীণরা
jugantor
ভালো থাকুন প্রবীণরা

  মনজু আরা বেগম  

০১ অক্টোবর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিবছর ভিন্ন ভিন্ন থিম বা শিরোনামে অক্টোবরের প্রথম দিনটি ‘প্রবীণ দিবস’ হিসাবে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী ঘটা করে পালিত হয়ে থাকে। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে জাতিসংঘ কর্তৃক নতুন নতুন স্লোগান বা প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়। এবারের প্রবীণ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ‘The resilience of older persons in a changing world’. এটাকে বাংলায় বলা হয়েছে, ‘পরিবর্তিত বিশ্বে প্রবীণ ব্যক্তির সহনশীলতা’। এ স্লোগান সামনে রেখে এবারে দিবসটি উদযাপিত হতে যাচ্ছে।

দেশের মোট জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ প্রবীণ। মানবজাতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বার্ধক্য। বার্ধক্য মানবজীবনের প্রধান চ্যালেঞ্জ বিবেচনা করে প্রবীণদের জীবনমান উন্নয়ন, সমাজে প্রবীণদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় প্রবীণ জনগোষ্ঠীর প্রতি সহনশীল আচরণ করার জন্য এবং এ সমস্যা সম্পর্কে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে জাতিসংঘ ১৯৯১ সাল থেকে প্রতিবছর ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হিসাবে পালন করে থাকে। কিন্তু আক্ষরিক অর্থে কাজের কাজ তেমন কিছুই হয় না। প্রবীণরা আজও পরিবার ও সমাজে অবহেলিত, নির্যাতিত ও অপাঙ্ক্তেয়।

বার্ধক্য প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। বেঁচে থাকলে বার্ধক্যের স্বাদ সবাইকে গ্রহণ করতে হবে। এ বাস্তবতা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আজ যারা নবীন, তাদের অনেকেই প্রবীণদের যথাযথ সম্মান বা মর্যাদা প্রদর্শন করে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্যানুসারে, ২০৩০ সালে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ হবে প্রবীণ। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা হবে দুই কোটি ৮০ লাখ এবং ২০৫০ সালে দাঁড়াবে প্রায় চার কোটি ৫০ লাখ।

প্রবীণরা আমাদের সমাজে সব সময়ই অবহেলিত ও নিগৃহীত হয়ে আসছে। এ জনগোষ্ঠীর কথা তেমন করে কেউ ভাবেন না। এটা উপলব্ধি করে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণের কথা ভেবে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর স্বপ্নদ্রষ্টা মহাপ্রাণ ডা. এ কে এম আবদুল ওয়াহেদ ঢাকায় ধানমন্ডিতে তার নিজ বাসভবনে ১৯৬০ সালে ‘প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। পরে এটি আগারগাঁওয়ের শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তরিত হয়। এ প্রতিষ্ঠানের জন্মলগ্নে মানুষের গড় আয়ু ছিল ৪২ বছর। ১৯২১ সালে এ দেশের মানুষের গড় আয়ুষ্কাল ছিল যেখানে ২০ বছর, বর্তমানে জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের ফলে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৭৩ বছর। ফলে দেখা যাচ্ছে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চেয়ে প্রবীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে বেশি।

আমরা স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী অতিক্রম করেছি। ১৯৭১ থেকে ২০২২ সময়ে আমরা অনেকদূর এগিয়ে গেছি। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। সেই সঙ্গে মধ্য আয়ের দেশে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। আমাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটেছে। মাথাপিছু আয়, গড় আয়ু, সর্বজনীন শিক্ষা, শিশুমৃত্যুর হার, কৃষি, শিল্প, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, প্রযুক্তি, প্রবাসী আয় ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশ এগিয়ে গেছে এবং যাচ্ছিল অবিরত। বাংলাদেশ বিশ্বে রোলমডেল হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে।

আমাদের স্বাধীনতার মূলমন্ত্রই ছিল দেশের মানুষের ক্ষুধা ও দারিদ্র্য থেকে মুক্তি, সামাজিক বৈষম্য থেকে মুক্তি, অশিক্ষা ও কুশিক্ষা থেকে মুক্তি, মানুষের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া ইত্যাদি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে সামনে রেখে দেশ এগিয়ে যাচ্ছিল; কিন্তু আমাদের এ অর্জন কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হয়েছে কোভিড-১৯ নামক এক অতিমারির কারণে। করোনা মানব ইতিহাসে ভয়াবহতম একটি ভাইরাস হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। এতে বিশ্বে লাখ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন। এ ভাইরাস পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে জনজীবনকে বিচ্ছিন্ন ও পঙ্গু করে দিয়েছে।

করোনায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন ও আক্রান্ত হয়েছেন প্রবীণ জনগোষ্ঠী। এ প্রাণঘাতী ভাইরাসের ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতেই শুরু হলো রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ। এ যুদ্ধের ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। এতে করে জনজীবনে অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে নিম্নবিত্ত ও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ওপর। আমাদের দেশে অনেক প্রবীণ ব্যক্তি রয়েছেন, যারা তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য সাধ্যমতো কোনো না কোনো কায়িক শ্রম করে থাকেন। এর পরও তারা পরিবারে নির্যাতনের শিকার হন।

বৃদ্ধ বয়সে যথাযথ চিকিৎসার অভাবে প্রাণ হারান, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। একইভাবে পরিবারে মহিলারা ভোর থেকে ভর সন্ধ্যা পর্যন্ত কায়িক শ্রম দিয়ে পরিবারের সদস্যদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার চেষ্টা করলেও তাদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। তারা পারিবারিক বা সামাজিক মর্যাদা পান না। উপরন্তু বিভিন্নভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হন। আমাদের মতো দারিদ্র্যপ্রবণ দেশে খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থানসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় প্রবীণ জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত জর্জরিত হচ্ছেন। তুলনামূলক বিশ্লেষণে প্রবীণ পুরুষদের চেয়ে প্রবীণ নারীরা দুঃখ, কষ্ট ও বিড়ম্বনার শিকার হন বেশি। দেশের উন্নয়নের অংশীদার সব বয়সের শ্রেণিপেশার মানুষ। কিন্তু বাস্তবে সমাজে বয়োবৃদ্ধ নাগরিকরা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও সব ধরনের সুযোগ সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত।

বর্তমান সরকার প্রবীণবান্ধব। এ সরকারের সময়ে প্রবীণদের জন্য বয়স্কভাতা, বিধবা ভাতাসহ বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০১৩ সালে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন ও প্রবীণদের সুযোগ সুবিধা দেওয়ার জন্য প্রবীণ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, বিগত নয় বছরেও এ আইনের বাস্তবায়ন নেই। বাংলাদেশে ৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব ব্যক্তিকে মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ইতোমধ্যে সিনিয়র সিটিজেন বা জ্যেষ্ঠ নাগরিক হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও বিস্ফোরণোন্মুখ অবস্থা হলো জনসংখ্যার বার্ধক্য।

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রতিটি পরিবারে, বিশেষ করে যারা একটু সচেতন, তাদের সন্তান সংখ্যা একটি বা দুটির বেশি না থাকায় পরিবারগুলো ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। এ ছাড়া এসব সন্তান বিদেশমুখী হওয়ায় প্রবীণরা সন্তানদের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর কারণ অর্থনৈতিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা। এ কারণে প্রবীণরা পরিবার ও সমাজে বিভিন্নভাবে নিগৃহীত হচ্ছেন। বিদেশের মতো আমাদের দেশে বৃদ্ধাশ্রম তেমন নেই বললেই চলে। বেসরকারি পর্যায়ে যে দু-চারটি আছে, সেগুলোও তেমন সুযোগ সুবিধা সংবলিত এবং মানসম্পন্ন নয়। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এ দেশে কয়েক হাজার ধনাঢ্য ব্যক্তি রয়েছেন, যারা শত শত কোটি টাকার মালিক।

অনেকে সুইস ব্যাংকে টাকার পাহাড় জমাচ্ছেন। বিদেশে সেকেন্ড হোম তৈরি করেছেন এবং সন্তানসন্ততি নিয়ে বিলাসবহুল আয়েশী জীবন কাটাচ্ছেন। তারা যদি প্রবীণদের নিয়ে একটু চিন্তা করেন বা উন্নত দেশগুলোর মতো এখানেও সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়ে বৃদ্ধাশ্রম বা নিবাস স্থাপনে অর্থ ব্যয় করেন, তাহলে আমাদের দেশের প্রবীণরা শেষ জীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তিতে-শান্তিতে দিন কাটাতে পারবেন।

প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন, সেই সঙ্গে অবহেলা, অযত্ন আর নির্যাতনের ঘটনা এবং করণীয়গুলো প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। গণমাধ্যমে প্রবীণদের প্রতি সহনশীল আচরণ প্রদর্শন করার বিষয়টি নিশ্চিত করাসহ কর্মক্ষম প্রবীণদের জন্য কর্মসংস্থানের দ্বার উন্মুক্ত, গণসেবা প্রাপ্তি, বিভিন্ন স্থানে চলাচল, সড়ক পারাপার, যানবাহনে আসন পাওয়া এবং বিপদাপন্ন প্রবীণের যে কোনো সহায়তায় বলিষ্ঠ ও ত্বরিৎ ব্যবস্থা নেওয়াসহ সিনিয়র সিটিজেন হিসাবে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদান এবং এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। পাশাপাশি সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য পৃথক পরিচয়পত্রও থাকা জরুরি। প্রবীণদের সুযোগ সুবিধা দেওয়া করুণা বা দয়া নয়, এটা তাদের অধিকার। এবারের প্রবীণ দিবসে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণার্থে উপরোক্ত সুযোগ সুবিধাগুলো নিশ্চিত ও প্রবীণ নীতিমালা-২০১৩ বাস্তবায়ন করা হলে দিবসটি উদযাপনের সার্থকতা পাবে বলে বিশ্বাস করি।

মনজু আরা বেগম : সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক; কার্যনির্বাহী সদস্য, বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান

monjuara2006@yahoo.com

ভালো থাকুন প্রবীণরা

 মনজু আরা বেগম 
০১ অক্টোবর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিবছর ভিন্ন ভিন্ন থিম বা শিরোনামে অক্টোবরের প্রথম দিনটি ‘প্রবীণ দিবস’ হিসাবে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী ঘটা করে পালিত হয়ে থাকে। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে জাতিসংঘ কর্তৃক নতুন নতুন স্লোগান বা প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়। এবারের প্রবীণ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ‘The resilience of older persons in a changing world’. এটাকে বাংলায় বলা হয়েছে, ‘পরিবর্তিত বিশ্বে প্রবীণ ব্যক্তির সহনশীলতা’। এ স্লোগান সামনে রেখে এবারে দিবসটি উদযাপিত হতে যাচ্ছে।

দেশের মোট জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ প্রবীণ। মানবজাতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বার্ধক্য। বার্ধক্য মানবজীবনের প্রধান চ্যালেঞ্জ বিবেচনা করে প্রবীণদের জীবনমান উন্নয়ন, সমাজে প্রবীণদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় প্রবীণ জনগোষ্ঠীর প্রতি সহনশীল আচরণ করার জন্য এবং এ সমস্যা সম্পর্কে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে জাতিসংঘ ১৯৯১ সাল থেকে প্রতিবছর ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হিসাবে পালন করে থাকে। কিন্তু আক্ষরিক অর্থে কাজের কাজ তেমন কিছুই হয় না। প্রবীণরা আজও পরিবার ও সমাজে অবহেলিত, নির্যাতিত ও অপাঙ্ক্তেয়।

বার্ধক্য প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। বেঁচে থাকলে বার্ধক্যের স্বাদ সবাইকে গ্রহণ করতে হবে। এ বাস্তবতা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আজ যারা নবীন, তাদের অনেকেই প্রবীণদের যথাযথ সম্মান বা মর্যাদা প্রদর্শন করে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্যানুসারে, ২০৩০ সালে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ হবে প্রবীণ। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা হবে দুই কোটি ৮০ লাখ এবং ২০৫০ সালে দাঁড়াবে প্রায় চার কোটি ৫০ লাখ।

প্রবীণরা আমাদের সমাজে সব সময়ই অবহেলিত ও নিগৃহীত হয়ে আসছে। এ জনগোষ্ঠীর কথা তেমন করে কেউ ভাবেন না। এটা উপলব্ধি করে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণের কথা ভেবে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর স্বপ্নদ্রষ্টা মহাপ্রাণ ডা. এ কে এম আবদুল ওয়াহেদ ঢাকায় ধানমন্ডিতে তার নিজ বাসভবনে ১৯৬০ সালে ‘প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। পরে এটি আগারগাঁওয়ের শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তরিত হয়। এ প্রতিষ্ঠানের জন্মলগ্নে মানুষের গড় আয়ু ছিল ৪২ বছর। ১৯২১ সালে এ দেশের মানুষের গড় আয়ুষ্কাল ছিল যেখানে ২০ বছর, বর্তমানে জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের ফলে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৭৩ বছর। ফলে দেখা যাচ্ছে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চেয়ে প্রবীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে বেশি।

আমরা স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী অতিক্রম করেছি। ১৯৭১ থেকে ২০২২ সময়ে আমরা অনেকদূর এগিয়ে গেছি। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। সেই সঙ্গে মধ্য আয়ের দেশে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। আমাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটেছে। মাথাপিছু আয়, গড় আয়ু, সর্বজনীন শিক্ষা, শিশুমৃত্যুর হার, কৃষি, শিল্প, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, প্রযুক্তি, প্রবাসী আয় ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশ এগিয়ে গেছে এবং যাচ্ছিল অবিরত। বাংলাদেশ বিশ্বে রোলমডেল হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে।

আমাদের স্বাধীনতার মূলমন্ত্রই ছিল দেশের মানুষের ক্ষুধা ও দারিদ্র্য থেকে মুক্তি, সামাজিক বৈষম্য থেকে মুক্তি, অশিক্ষা ও কুশিক্ষা থেকে মুক্তি, মানুষের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া ইত্যাদি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে সামনে রেখে দেশ এগিয়ে যাচ্ছিল; কিন্তু আমাদের এ অর্জন কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হয়েছে কোভিড-১৯ নামক এক অতিমারির কারণে। করোনা মানব ইতিহাসে ভয়াবহতম একটি ভাইরাস হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। এতে বিশ্বে লাখ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন। এ ভাইরাস পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে জনজীবনকে বিচ্ছিন্ন ও পঙ্গু করে দিয়েছে।

করোনায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন ও আক্রান্ত হয়েছেন প্রবীণ জনগোষ্ঠী। এ প্রাণঘাতী ভাইরাসের ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতেই শুরু হলো রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ। এ যুদ্ধের ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। এতে করে জনজীবনে অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে নিম্নবিত্ত ও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ওপর। আমাদের দেশে অনেক প্রবীণ ব্যক্তি রয়েছেন, যারা তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য সাধ্যমতো কোনো না কোনো কায়িক শ্রম করে থাকেন। এর পরও তারা পরিবারে নির্যাতনের শিকার হন।

বৃদ্ধ বয়সে যথাযথ চিকিৎসার অভাবে প্রাণ হারান, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। একইভাবে পরিবারে মহিলারা ভোর থেকে ভর সন্ধ্যা পর্যন্ত কায়িক শ্রম দিয়ে পরিবারের সদস্যদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার চেষ্টা করলেও তাদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। তারা পারিবারিক বা সামাজিক মর্যাদা পান না। উপরন্তু বিভিন্নভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হন। আমাদের মতো দারিদ্র্যপ্রবণ দেশে খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থানসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় প্রবীণ জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত জর্জরিত হচ্ছেন। তুলনামূলক বিশ্লেষণে প্রবীণ পুরুষদের চেয়ে প্রবীণ নারীরা দুঃখ, কষ্ট ও বিড়ম্বনার শিকার হন বেশি। দেশের উন্নয়নের অংশীদার সব বয়সের শ্রেণিপেশার মানুষ। কিন্তু বাস্তবে সমাজে বয়োবৃদ্ধ নাগরিকরা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও সব ধরনের সুযোগ সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত।

বর্তমান সরকার প্রবীণবান্ধব। এ সরকারের সময়ে প্রবীণদের জন্য বয়স্কভাতা, বিধবা ভাতাসহ বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০১৩ সালে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন ও প্রবীণদের সুযোগ সুবিধা দেওয়ার জন্য প্রবীণ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, বিগত নয় বছরেও এ আইনের বাস্তবায়ন নেই। বাংলাদেশে ৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব ব্যক্তিকে মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ইতোমধ্যে সিনিয়র সিটিজেন বা জ্যেষ্ঠ নাগরিক হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও বিস্ফোরণোন্মুখ অবস্থা হলো জনসংখ্যার বার্ধক্য।

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রতিটি পরিবারে, বিশেষ করে যারা একটু সচেতন, তাদের সন্তান সংখ্যা একটি বা দুটির বেশি না থাকায় পরিবারগুলো ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। এ ছাড়া এসব সন্তান বিদেশমুখী হওয়ায় প্রবীণরা সন্তানদের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর কারণ অর্থনৈতিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা। এ কারণে প্রবীণরা পরিবার ও সমাজে বিভিন্নভাবে নিগৃহীত হচ্ছেন। বিদেশের মতো আমাদের দেশে বৃদ্ধাশ্রম তেমন নেই বললেই চলে। বেসরকারি পর্যায়ে যে দু-চারটি আছে, সেগুলোও তেমন সুযোগ সুবিধা সংবলিত এবং মানসম্পন্ন নয়। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এ দেশে কয়েক হাজার ধনাঢ্য ব্যক্তি রয়েছেন, যারা শত শত কোটি টাকার মালিক।

অনেকে সুইস ব্যাংকে টাকার পাহাড় জমাচ্ছেন। বিদেশে সেকেন্ড হোম তৈরি করেছেন এবং সন্তানসন্ততি নিয়ে বিলাসবহুল আয়েশী জীবন কাটাচ্ছেন। তারা যদি প্রবীণদের নিয়ে একটু চিন্তা করেন বা উন্নত দেশগুলোর মতো এখানেও সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়ে বৃদ্ধাশ্রম বা নিবাস স্থাপনে অর্থ ব্যয় করেন, তাহলে আমাদের দেশের প্রবীণরা শেষ জীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তিতে-শান্তিতে দিন কাটাতে পারবেন।

প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন, সেই সঙ্গে অবহেলা, অযত্ন আর নির্যাতনের ঘটনা এবং করণীয়গুলো প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। গণমাধ্যমে প্রবীণদের প্রতি সহনশীল আচরণ প্রদর্শন করার বিষয়টি নিশ্চিত করাসহ কর্মক্ষম প্রবীণদের জন্য কর্মসংস্থানের দ্বার উন্মুক্ত, গণসেবা প্রাপ্তি, বিভিন্ন স্থানে চলাচল, সড়ক পারাপার, যানবাহনে আসন পাওয়া এবং বিপদাপন্ন প্রবীণের যে কোনো সহায়তায় বলিষ্ঠ ও ত্বরিৎ ব্যবস্থা নেওয়াসহ সিনিয়র সিটিজেন হিসাবে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদান এবং এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। পাশাপাশি সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য পৃথক পরিচয়পত্রও থাকা জরুরি। প্রবীণদের সুযোগ সুবিধা দেওয়া করুণা বা দয়া নয়, এটা তাদের অধিকার। এবারের প্রবীণ দিবসে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণার্থে উপরোক্ত সুযোগ সুবিধাগুলো নিশ্চিত ও প্রবীণ নীতিমালা-২০১৩ বাস্তবায়ন করা হলে দিবসটি উদযাপনের সার্থকতা পাবে বলে বিশ্বাস করি।

মনজু আরা বেগম : সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক; কার্যনির্বাহী সদস্য, বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান

monjuara2006@yahoo.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন