শিশুর হাতের মোবাইল ফোন যেন এক ‘মারণাস্ত্র’!
jugantor
শিশুর হাতের মোবাইল ফোন যেন এক ‘মারণাস্ত্র’!

  ড. মো. ফখরুল ইসলাম  

২৮ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যুদ্ধবাজদের ভয়ংকর মারণাস্ত্র ব্যবহার নিয়ে বিশ্ব জনমনে যখন ভীতির সঞ্চার হচ্ছে, তখন ভিন্ন আরেকটি ‘মারণাস্ত্রে’র ব্যাপক ব্যবহার নিয়ে আমরা গভীরভাবে চিন্তিত হয়ে পড়েছি। সেটি হলো শিশুদের হাতে মোবাইল ফোন। এটি এখন কোনো সাধারণ খেলনা নয়, বরং ইন্টারনেট সংযুক্তিসহ দামি মোবাইল ফোনসেট। এটি এখন তাদের বায়না ধরার প্রধান আকর্ষণের বস্তু, যা তাদের হাতে না দিলে বিড়ম্বনা আর দিলে আরও বেশি বিড়ম্বনা ও বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বড়দের তুলনায় শিশুরাই এখন মোবাইল ফোন ব্যবহারে বেশি পটু। তারা কোনো কিছুর জন্য সমস্যায় পড়লে এখন আর ক্যান্ডি, লজেন্স, বিস্কুট দিয়ে তাদের মন ভোলানো যায় না, কান্নাও থামানো যায় না। কার্টুন দেখা, ছবি তোলা, ভিডিও করা, গান শোনা ইত্যাদির জন্য তাদের বড়দের মতো মোবাইল ফোন চাই। জেদ চাপলে যতই ডেস্কটপ, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, পামটপ, ট্যাব ইত্যাদি দিয়ে বসিয়ে দেওয়া হোক না কেন, ওদের আকর্ষণ বা নজর সেগুলোতে থাকে না। নজর চলে যায় মোবাইল ফোন সেটটির দিকে। আগ্রহ সেটাতেই বেশি। মা-বাবা, অভিভাবকরা ওদের জেদ থামাতে হাতে তুলে দেন দামি মোবাইল ফোনসেট। সঙ্গে উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ। তখন ওরা খাওয়া, পড়া, ঘুম ভুলে গিয়ে সেগুলো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ওদের মূল্যবান চোখ। কারণ, মজা পেলে ওরা অন্যদিকে চোখ ফেরাতে চায় না। আনমনে একদৃষ্টিতে ক্ষুদ্র ডিজিটাল পর্দায় চেয়ে থাকে। অবুঝ বাচ্চাদের দৃষ্টিশক্তি কমে যাচ্ছে দীর্ঘ সময়ব্যাপী মোবাইল ফোনের রঙিন আলোময় পর্দার দিকে তাকিয়ে থেকে কার্টুন, সিনেমা, নাটক, গান-বাজনা দেখে এবং গেম খেলে।

আমরা অভিভাবকরাও ওদের এ বিষয়ে বড় বেশি আশকারা দিচ্ছি। একটি ছবি বা গেম ভালো না লাগলে মুহূর্তেই এক বিষয় থেকে ওদের মনোযোগ চলে যাচ্ছে ভিন্নদিকে। কোনো কিছুতেই স্থির না থেকে হঠাৎ করে নতুন একটি অজানা জগতে বিচরণ করতে গিয়ে সেগুলোর আগামাথা কিছুই ঠাহর করতে পারে না। ফলে ওদের মস্তিষ্কের মধ্যে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে।

দেশে ধনী-দরিদ্র প্রায় সবার বাড়িতেই কমবেশি মোবাইল ফোনের ব্যবহার রয়েছে। সেই সঙ্গে ইন্টারনেটের সংযুক্তি অনেকটাই যেন বাধ্যতামূলক। ওয়াইফাই সব জায়গায় না থাকলেও মোবাইল ডেটা কিনে ইন্টারনেটের ব্যবহার বেড়েছে ব্যাপকভাবে। শহরে তো বটেই, গ্রাম-গঞ্জেও শিশু-কিশোরদের হাতে দামি মোবাইল ফোনসেট দেখতে পাওয়া যায়। করোনাকালে অনলাইন শিক্ষণ চালু হলেও এখন তেমন ভার্চুয়াল পড়ালেখা নেই। এখন ওরা দীর্ঘসময় ইন্টারনেট দিয়ে অহেতুক কী কাজ করে, তা অনেকাংশে বোধগম্য নয়। ওদের অনেকের বাবা-মা ইন্টারনেট সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। কিন্তু সন্তান আবদার করলে সেজন্য অর্থব্যয় করেন। এ বাড়তি অর্থ ব্যয় সবার জন্য সম্ভব হয়ে ওঠে না। অর্থ না পেলে শিশু-কিশোররা বেঁকে বসে এবং নানা অবৈধ উপায়ে টাকা জোগাড় করতে গ্যাং কালচার ও অপরাধ করে বসে। এটা এখন সবাইকে একটি জটিল প্রশ্নের সম্মুখীন করে তুলেছে।

সেদিন একটি বিরতিহীন ট্রেনের মধ্যে কয়েকজন জ্ঞানী মানুষের সঙ্গে সাড়ে চার ঘণ্টাব্যাপী একত্রে ভ্রমণ করছিলাম। সে সময় রাশিয়ার পারমাণবিক মারণাস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা নিয়ে একজন নানা কথা বলছিলেন। সবাই বেশ মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনছিলাম। কিন্তু আরেকজন যাত্রী তার বাড়িতে মোবাইল ফোন নামক মারণাস্ত্রের ব্যবহার বেশ কয়েক বছর আগেই শুরু হয়েছে বলে কথোপকথনের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন। পাশে বসা অন্য আরেকজন অনেক্ষণ ধরে সিটে বসেই ঘুমাচ্ছিলেন। কিন্তু মোবাইল ফোনের ‘মারণাস্ত্র’ নিয়ে আলোচনা শুরু হলে তিনি বেশ নড়েচড়ে বসে সরব হয়ে আলোচনায় শামিল হয়ে গেলেন। তার অবস্থা নাকি আরও বেশি ভয়ানক হয়েছিল। তিনি সেটার বর্ণনা দিতে থাকলেন এবং ওই সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে কী কৌশল

অবলম্বন করেছিলেন, তারও একটা মূল্যবান ফিরিস্তি দিলেন।

তিনি করোনাকালীন ঘরবন্দি থাকা অবস্থায় তার সন্তানদের মাথায় মোবাইল ফোনের নেশা ঢুকে যাওয়ায় বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। তার সন্তানরা ইন্টারনেট সংযোগের আগে মোবাইল ফোন দিয়ে কথা বলত, ছবি তুলত, গান শুনত। তাই তেমন একটা অসুবিধা হতো না। কিন্তু বাড়িতে ওয়াইফাই সংযুক্তির সুবাদে মোবাইল ফোনে সার্বক্ষণিক ইন্টারনেট থাকায় বিপদ ঘটা শুরু হতে থাকে। ওরা তিন শিশু নিজেদের জন্য বরাদ্দ একটি ফোনসেট ছাড়াও সুযোগ পেলে মা-বাবার ফোনসেট নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে শুরু করে। খাওয়া, পড়াশোনা, এমনকি ঘুমানোর সময়ও লুকিয়ে নেট ব্যবহার করতে শুরু করে। এটা ওদের ভয়ংকর নেশায় পরিণত হয়ে যায়।

সামনে সমূহ বিপদ দেখে ওদের বড় দুজনকে শাসন করে অনেকটা নিবৃত্ত করা গেলেও সবার ছোটজনকে কিছুতেই বাঁধ মানানো যাচ্ছিল না। তার হাতে সব সময়ের জন্য নেটযুক্ত দামি ফোনসেট চাই।

ওটা হাতে না দিলে সে কিছুতেই কান্না থামাত না।

উপায়ান্তর না দেখে ভদ্রলোককে শিশুদের সঙ্গে কিছুুটা অভিনয় বা ছলনা করতে হয়েছে। একদিন অফিসে যাওয়ার আগে ছাদবাগানে কাজ করার অজুহাতে উপরে উঠে ওয়াইফাইয়ের সংযোগ কর্ডটি খুলে ফেলেন তিনি। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে ইন্টারনেট সংযোগ না পাওয়ায় ওদের অভিযোগ শোনেন। এজন্য বাসায় তারা অনেক হইচই করেছে। ওদের অনুরোধে কর্ড কোথাও ছিঁড়েছে কি না, সেটা রাতেই টর্চ দিয়ে চেকআপ করে আসেন ভদ্রলোক। পরদিন ইন্টারনেটের লাইনম্যানকে ডেকে পুনরায় চেক করে দেওয়া হবে বলে আশ্ব^স্ত করে সবাইকে ঘুমাতে বলেন। বড়জন মোবাইল ডেটা কিনে দেওয়ার জন্য চাপাচাপি করলে সেটা কিনে দেননি। অন্য দুজন তখনও মোবাইল ডেটা ব্যবহারের কথা জানত না।

এরপর দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি ছিল। তাই টেকনিশিয়ান আসতে পারবে না বলে ভদ্রলোককে জানিয়ে দিয়েছিল। তারপর জানা গেল ওর পরিবারে করোনা হয়েছে। তাই তিনি আসতে পারবেন না। এ কথা জানতে পেরে ভদ্রলোক কিছুটা আশার আলো দেখেন। করোনার সময় টেকনিশিয়ানকে বাসার ভেতর ঢুকতে দেওয়া যাবে না বলে বাচ্চাদের আশ্বস্ত করেন। এভাবে ইন্টারনেটবিহীন পাঁচদিন কেটে যায়। তখন ওদের নানা ধরনের গল্পের বই দিয়ে পড়তে বলেন। এরপর রাতের খাবারের পর যে ভালো গল্প শুনিয়ে খুশি করতে পারবে, তার জন্য দামি গিফট দেওয়ার ঘোষণা দেন। কিছুদিন পর রমজান মাস শুরু হলে ওদের কেরাত, হামদ, নাত মুখস্থ করে শোনাতে বলেন। এজন্য ঈদে দামি পোশাক কিনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এভাবে এক মাস ইন্টারনেটের নেশা থেকে সন্তানদের মন ও দৃষ্টি সরিয়ে অন্য কাজে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেন। তবুও সবার ছোটজন একদিন বলে বসে, টেকনিশিয়ান কবে আসবে ইন্টারনেট ঠিক করে দিতে? ভদ্রলোক তাকে বলেন, নেটের লাইন ঠিক করে না দিলে ওদের আর বিল দেব না।

ছোটজন তখন পরপর কয়েকদিন শুনিয়েছে-আব্বু, লাইন ঠিক করে দিতে না এলে ওদের আর বিল দিও না। টাকাগুলো দিয়ে আমাকে ভালো গল্পের বই আর

জুতা কিনে দিও। ভদ্রলোক ওর কথায় বেশ খুশি হন।

এভাবে মাস দুয়েক কেটে গেলে ওরা মোবাইল ফোন দিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের কথা ভুলে যায়। তবে বড় সন্তানের অনলাইন ক্লাসের জন্য ডেস্কটপে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ দিয়ে শুধু ওকে পাসওয়ার্ড জানিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

ভদ্রলোকের গল্প শুনে আমরা তাকে জানালাম, আপনার এ প্রচেষ্টাটি বেশ শিক্ষণীয়। অবুঝ সন্তানদের মোবাইল নেশার ‘মারণাস্ত্র’ থেকে বাঁচানোর জন্য আমাদের সমাজে আর কারা কোন পদ্ধতি ব্যবহার করছেন, সেসব জানতে পারলে বেশ ভালো হতো। এজন্য আশু একটি গবেষণা চালানো প্রয়োজন। কারণ দিনদিন লাখ লাখ পরিবারের অগণিত শিশুর মনের কোণে ঠাঁই করে নিয়েছে মোবাইল ফোন নামক ‘মারণাস্ত্র’। তারা চোখের ক্ষতি করে মেতে থাকছে মোবাইল ফোন নিয়ে। এগুলো তদারকির জন্য কারও নেই কোনো তাগিদ, নেই কোনো পর্যবেক্ষণ, নেই কোনো গবেষণা। তাই এর ক্ষতিকর দিকটি সম্পর্কে আমরা অবহিত থাকলেও অবহেলা করে চলেছি। ব্যাপকভাবে হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়া এ ‘মারণাস্ত্র’ থেকে আমরা সন্তানদের দৃষ্টি ফেরাব কীভাবে? আর তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবই বা কীভাবে?

ড. মো. ফখরুল ইসলাম : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক; সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন

fakrul@ru.ac.bd

শিশুর হাতের মোবাইল ফোন যেন এক ‘মারণাস্ত্র’!

 ড. মো. ফখরুল ইসলাম 
২৮ নভেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যুদ্ধবাজদের ভয়ংকর মারণাস্ত্র ব্যবহার নিয়ে বিশ্ব জনমনে যখন ভীতির সঞ্চার হচ্ছে, তখন ভিন্ন আরেকটি ‘মারণাস্ত্রে’র ব্যাপক ব্যবহার নিয়ে আমরা গভীরভাবে চিন্তিত হয়ে পড়েছি। সেটি হলো শিশুদের হাতে মোবাইল ফোন। এটি এখন কোনো সাধারণ খেলনা নয়, বরং ইন্টারনেট সংযুক্তিসহ দামি মোবাইল ফোনসেট। এটি এখন তাদের বায়না ধরার প্রধান আকর্ষণের বস্তু, যা তাদের হাতে না দিলে বিড়ম্বনা আর দিলে আরও বেশি বিড়ম্বনা ও বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বড়দের তুলনায় শিশুরাই এখন মোবাইল ফোন ব্যবহারে বেশি পটু। তারা কোনো কিছুর জন্য সমস্যায় পড়লে এখন আর ক্যান্ডি, লজেন্স, বিস্কুট দিয়ে তাদের মন ভোলানো যায় না, কান্নাও থামানো যায় না। কার্টুন দেখা, ছবি তোলা, ভিডিও করা, গান শোনা ইত্যাদির জন্য তাদের বড়দের মতো মোবাইল ফোন চাই। জেদ চাপলে যতই ডেস্কটপ, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, পামটপ, ট্যাব ইত্যাদি দিয়ে বসিয়ে দেওয়া হোক না কেন, ওদের আকর্ষণ বা নজর সেগুলোতে থাকে না। নজর চলে যায় মোবাইল ফোন সেটটির দিকে। আগ্রহ সেটাতেই বেশি। মা-বাবা, অভিভাবকরা ওদের জেদ থামাতে হাতে তুলে দেন দামি মোবাইল ফোনসেট। সঙ্গে উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ। তখন ওরা খাওয়া, পড়া, ঘুম ভুলে গিয়ে সেগুলো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ওদের মূল্যবান চোখ। কারণ, মজা পেলে ওরা অন্যদিকে চোখ ফেরাতে চায় না। আনমনে একদৃষ্টিতে ক্ষুদ্র ডিজিটাল পর্দায় চেয়ে থাকে। অবুঝ বাচ্চাদের দৃষ্টিশক্তি কমে যাচ্ছে দীর্ঘ সময়ব্যাপী মোবাইল ফোনের রঙিন আলোময় পর্দার দিকে তাকিয়ে থেকে কার্টুন, সিনেমা, নাটক, গান-বাজনা দেখে এবং গেম খেলে।

আমরা অভিভাবকরাও ওদের এ বিষয়ে বড় বেশি আশকারা দিচ্ছি। একটি ছবি বা গেম ভালো না লাগলে মুহূর্তেই এক বিষয় থেকে ওদের মনোযোগ চলে যাচ্ছে ভিন্নদিকে। কোনো কিছুতেই স্থির না থেকে হঠাৎ করে নতুন একটি অজানা জগতে বিচরণ করতে গিয়ে সেগুলোর আগামাথা কিছুই ঠাহর করতে পারে না। ফলে ওদের মস্তিষ্কের মধ্যে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে।

দেশে ধনী-দরিদ্র প্রায় সবার বাড়িতেই কমবেশি মোবাইল ফোনের ব্যবহার রয়েছে। সেই সঙ্গে ইন্টারনেটের সংযুক্তি অনেকটাই যেন বাধ্যতামূলক। ওয়াইফাই সব জায়গায় না থাকলেও মোবাইল ডেটা কিনে ইন্টারনেটের ব্যবহার বেড়েছে ব্যাপকভাবে। শহরে তো বটেই, গ্রাম-গঞ্জেও শিশু-কিশোরদের হাতে দামি মোবাইল ফোনসেট দেখতে পাওয়া যায়। করোনাকালে অনলাইন শিক্ষণ চালু হলেও এখন তেমন ভার্চুয়াল পড়ালেখা নেই। এখন ওরা দীর্ঘসময় ইন্টারনেট দিয়ে অহেতুক কী কাজ করে, তা অনেকাংশে বোধগম্য নয়। ওদের অনেকের বাবা-মা ইন্টারনেট সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। কিন্তু সন্তান আবদার করলে সেজন্য অর্থব্যয় করেন। এ বাড়তি অর্থ ব্যয় সবার জন্য সম্ভব হয়ে ওঠে না। অর্থ না পেলে শিশু-কিশোররা বেঁকে বসে এবং নানা অবৈধ উপায়ে টাকা জোগাড় করতে গ্যাং কালচার ও অপরাধ করে বসে। এটা এখন সবাইকে একটি জটিল প্রশ্নের সম্মুখীন করে তুলেছে।

সেদিন একটি বিরতিহীন ট্রেনের মধ্যে কয়েকজন জ্ঞানী মানুষের সঙ্গে সাড়ে চার ঘণ্টাব্যাপী একত্রে ভ্রমণ করছিলাম। সে সময় রাশিয়ার পারমাণবিক মারণাস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা নিয়ে একজন নানা কথা বলছিলেন। সবাই বেশ মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনছিলাম। কিন্তু আরেকজন যাত্রী তার বাড়িতে মোবাইল ফোন নামক মারণাস্ত্রের ব্যবহার বেশ কয়েক বছর আগেই শুরু হয়েছে বলে কথোপকথনের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন। পাশে বসা অন্য আরেকজন অনেক্ষণ ধরে সিটে বসেই ঘুমাচ্ছিলেন। কিন্তু মোবাইল ফোনের ‘মারণাস্ত্র’ নিয়ে আলোচনা শুরু হলে তিনি বেশ নড়েচড়ে বসে সরব হয়ে আলোচনায় শামিল হয়ে গেলেন। তার অবস্থা নাকি আরও বেশি ভয়ানক হয়েছিল। তিনি সেটার বর্ণনা দিতে থাকলেন এবং ওই সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে কী কৌশল

অবলম্বন করেছিলেন, তারও একটা মূল্যবান ফিরিস্তি দিলেন।

তিনি করোনাকালীন ঘরবন্দি থাকা অবস্থায় তার সন্তানদের মাথায় মোবাইল ফোনের নেশা ঢুকে যাওয়ায় বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। তার সন্তানরা ইন্টারনেট সংযোগের আগে মোবাইল ফোন দিয়ে কথা বলত, ছবি তুলত, গান শুনত। তাই তেমন একটা অসুবিধা হতো না। কিন্তু বাড়িতে ওয়াইফাই সংযুক্তির সুবাদে মোবাইল ফোনে সার্বক্ষণিক ইন্টারনেট থাকায় বিপদ ঘটা শুরু হতে থাকে। ওরা তিন শিশু নিজেদের জন্য বরাদ্দ একটি ফোনসেট ছাড়াও সুযোগ পেলে মা-বাবার ফোনসেট নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে শুরু করে। খাওয়া, পড়াশোনা, এমনকি ঘুমানোর সময়ও লুকিয়ে নেট ব্যবহার করতে শুরু করে। এটা ওদের ভয়ংকর নেশায় পরিণত হয়ে যায়।

সামনে সমূহ বিপদ দেখে ওদের বড় দুজনকে শাসন করে অনেকটা নিবৃত্ত করা গেলেও সবার ছোটজনকে কিছুতেই বাঁধ মানানো যাচ্ছিল না। তার হাতে সব সময়ের জন্য নেটযুক্ত দামি ফোনসেট চাই।

ওটা হাতে না দিলে সে কিছুতেই কান্না থামাত না।

উপায়ান্তর না দেখে ভদ্রলোককে শিশুদের সঙ্গে কিছুুটা অভিনয় বা ছলনা করতে হয়েছে। একদিন অফিসে যাওয়ার আগে ছাদবাগানে কাজ করার অজুহাতে উপরে উঠে ওয়াইফাইয়ের সংযোগ কর্ডটি খুলে ফেলেন তিনি। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে ইন্টারনেট সংযোগ না পাওয়ায় ওদের অভিযোগ শোনেন। এজন্য বাসায় তারা অনেক হইচই করেছে। ওদের অনুরোধে কর্ড কোথাও ছিঁড়েছে কি না, সেটা রাতেই টর্চ দিয়ে চেকআপ করে আসেন ভদ্রলোক। পরদিন ইন্টারনেটের লাইনম্যানকে ডেকে পুনরায় চেক করে দেওয়া হবে বলে আশ্ব^স্ত করে সবাইকে ঘুমাতে বলেন। বড়জন মোবাইল ডেটা কিনে দেওয়ার জন্য চাপাচাপি করলে সেটা কিনে দেননি। অন্য দুজন তখনও মোবাইল ডেটা ব্যবহারের কথা জানত না।

এরপর দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি ছিল। তাই টেকনিশিয়ান আসতে পারবে না বলে ভদ্রলোককে জানিয়ে দিয়েছিল। তারপর জানা গেল ওর পরিবারে করোনা হয়েছে। তাই তিনি আসতে পারবেন না। এ কথা জানতে পেরে ভদ্রলোক কিছুটা আশার আলো দেখেন। করোনার সময় টেকনিশিয়ানকে বাসার ভেতর ঢুকতে দেওয়া যাবে না বলে বাচ্চাদের আশ্বস্ত করেন। এভাবে ইন্টারনেটবিহীন পাঁচদিন কেটে যায়। তখন ওদের নানা ধরনের গল্পের বই দিয়ে পড়তে বলেন। এরপর রাতের খাবারের পর যে ভালো গল্প শুনিয়ে খুশি করতে পারবে, তার জন্য দামি গিফট দেওয়ার ঘোষণা দেন। কিছুদিন পর রমজান মাস শুরু হলে ওদের কেরাত, হামদ, নাত মুখস্থ করে শোনাতে বলেন। এজন্য ঈদে দামি পোশাক কিনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এভাবে এক মাস ইন্টারনেটের নেশা থেকে সন্তানদের মন ও দৃষ্টি সরিয়ে অন্য কাজে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেন। তবুও সবার ছোটজন একদিন বলে বসে, টেকনিশিয়ান কবে আসবে ইন্টারনেট ঠিক করে দিতে? ভদ্রলোক তাকে বলেন, নেটের লাইন ঠিক করে না দিলে ওদের আর বিল দেব না।

ছোটজন তখন পরপর কয়েকদিন শুনিয়েছে-আব্বু, লাইন ঠিক করে দিতে না এলে ওদের আর বিল দিও না। টাকাগুলো দিয়ে আমাকে ভালো গল্পের বই আর

জুতা কিনে দিও। ভদ্রলোক ওর কথায় বেশ খুশি হন।

এভাবে মাস দুয়েক কেটে গেলে ওরা মোবাইল ফোন দিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের কথা ভুলে যায়। তবে বড় সন্তানের অনলাইন ক্লাসের জন্য ডেস্কটপে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ দিয়ে শুধু ওকে পাসওয়ার্ড জানিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

ভদ্রলোকের গল্প শুনে আমরা তাকে জানালাম, আপনার এ প্রচেষ্টাটি বেশ শিক্ষণীয়। অবুঝ সন্তানদের মোবাইল নেশার ‘মারণাস্ত্র’ থেকে বাঁচানোর জন্য আমাদের সমাজে আর কারা কোন পদ্ধতি ব্যবহার করছেন, সেসব জানতে পারলে বেশ ভালো হতো। এজন্য আশু একটি গবেষণা চালানো প্রয়োজন। কারণ দিনদিন লাখ লাখ পরিবারের অগণিত শিশুর মনের কোণে ঠাঁই করে নিয়েছে মোবাইল ফোন নামক ‘মারণাস্ত্র’। তারা চোখের ক্ষতি করে মেতে থাকছে মোবাইল ফোন নিয়ে। এগুলো তদারকির জন্য কারও নেই কোনো তাগিদ, নেই কোনো পর্যবেক্ষণ, নেই কোনো গবেষণা। তাই এর ক্ষতিকর দিকটি সম্পর্কে আমরা অবহিত থাকলেও অবহেলা করে চলেছি। ব্যাপকভাবে হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়া এ ‘মারণাস্ত্র’ থেকে আমরা সন্তানদের দৃষ্টি ফেরাব কীভাবে? আর তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবই বা কীভাবে?

ড. মো. ফখরুল ইসলাম : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক; সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন

fakrul@ru.ac.bd

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন