বাংলাদেশ-ইইউ সংলাপ : যৌথ বিবৃতির অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হোক
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
বাংলাদেশ-ইইউ সংলাপ : যৌথ বিবৃতির অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হোক

  আবদুল লতিফ মণ্ডল  

৩০ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ২৪ নভেম্বর ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হলো।

২৫ নভেম্বর যুগান্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম রাজনৈতিক সংলাপে গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

এছাড়া বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি সামনে রেখে একটি অংশীদারত্ব সহযোগিতা চুক্তি (পার্টনারশিপ কো-অপারেশন) সই করতে উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছে।

সংলাপে গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের বিষয় যে ইউরোপীয় ইউনিয়নই উত্থাপন করেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ, এসব বিষয় সম্পর্কিত বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশ অত্যন্ত দুর্বল অবস্থানে রয়েছে এবং এ অবস্থার উন্নতি হওয়া প্রয়োজন।

প্রথমে দেখা যাক বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়। যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক সাময়িকী দি ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) ২০০৬ সাল থেকে Democracy Index তথা বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচক প্রকাশ করে আসছে।

নির্বাচনব্যবস্থা ও বহুদলীয় অবস্থান, সরকারের সক্রিয়তা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নাগরিক অধিকার-এই পাঁচ মানদণ্ডে একটি দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করে ১০ পয়েন্টভিত্তিক এ সূচক তৈরি করে ইআইইউ। সূচকে প্রাপ্ত স্কোরের ভিত্তিতে দেশগুলোকে যে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করে ইআইইউ, সেগুলো হলো-পূর্ণ গণতন্ত্র (full democracy), ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র (flawed democracy), মিশ্র শাসন (hybrid regime) এবং স্বৈরতন্ত্র (authoritarian regime)। সূচক নির্ধারণী মানদণ্ডে-অর্থাৎ নির্বাচনব্যবস্থা ও বহুদলীয় অবস্থান, সরকারের সক্রিয়তা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থান সন্তোষজনক নয়। ২০০৬ সালে বিএনপির শাসনামলে ইআইইউ প্রকাশিত প্রথম ডেমোক্রাসি ইনডেক্সে ৬.১১ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশ ‘flawed democracy’ বা ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র ক্যাটাগরিতে অবস্থান করলেও পরবর্তী প্রায় ১৬ বছর ধরে বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকে দেশটি নিচের ক্যাটাগরি ‘hybrid regime’ তথা মিশ্র শাসন ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে। সর্বশেষ গণতন্ত্র সূচক ২০২১-এ ১৬৭টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৭৫তম। দীর্ঘ এ সময়ে প্রথম দুবছর (২০০৭-২০০৮) সামরিক বাহিনী সমর্থিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশ শাসন করেছে। এরপর থেকে প্রায় ১৪ বছর ধরে বিরতিহীনভাবে রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছে আওয়ামী লীগ। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, নির্বাচনে দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে এমন একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে, যেখানে জনগণ স্বাধীনভাবে তাদের সরকার বেছে নেবে (a system of democracy where people choose their government freely)।

অথচ আওয়ামী লীগের অধীনে অনুষ্ঠিত দুটি সংসদ নির্বাচনের প্রথমটি (নবম সংসদ নির্বাচন, জানুয়ারি ২০১৪) অংশগ্রহণমূলক ছিল না; আর দ্বিতীয়টি (২০১৮ সালের ডিসেম্বর) অনুষ্ঠিত হয় নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগের মধ্য দিয়ে, যেখানে নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্ধারিত দিনের আগের রাতে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের ব্যালট বাক্সে ভোট প্রদান করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচক নির্ধারণী অন্যান্য মানদণ্ডে যেমন-সরকারের সক্রিয়তা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও বাংলাদেশ দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানে মৌলিক অধিকার সুরক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। সংবিধানে মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় ২২টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। এসব অনুচ্ছেদে মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় যেসব অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো-১. সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী; ২. প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকবে; ৩. আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে না; ৪. গ্রেফতারকৃত কোনো ব্যক্তিকে যথাসম্ভব শিগগির গ্রেফতারের কারণ জ্ঞাপন না করে প্রহরায় আটক রাখা যাবে না এবং ওই ব্যক্তিকে তার মনোনীত আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ ও তার দ্বারা আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না; ৫. প্রত্যেক নাগরিকের চলাফেরার, শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হওয়ার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদানের এবং সংগঠন করার অধিকার থাকবে; ৬. আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা থাকবে; ৭. আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের প্রবেশ, তল্লাশি ও আটক থেকে স্বীয় গৃহে নিরাপত্তা লাভের অধিকার থাকবে।

বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হওয়ার এক বছর পার না হতেই ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে জরুরি অবস্থা জারির বিধান সংযোজনের দ্বারা জরুরি অবস্থা ঘোষণার কার্যকারিতাকালে মৌলিক অধিকারসংক্রান্ত সংবিধানের ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০ ও ৪১ অনুচ্ছেদের কার্যকারিতা স্থগিত রাখা হয়। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার শুধু বহুদলীয় গণতন্ত্রের স্থলে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেনি, বরং সংবিধান প্রদত্ত অনেক মৌলিক অধিকার থেকে জনগণকে বঞ্চিত করে। সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদের ‘এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে’ কথাগুলো বিলুপ্তির মাধ্যমে প্রশাসনে জনগণের অংশগ্রহণের মৌলিক অধিকার খর্ব করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দুজন জেনারেলের সামরিক শাসনকালে জনগণ সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার ভোগ থেকে বঞ্চিত হন। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের খোলসে দুবছর (২০০৭ ও ২০০৮) সামরিক শাসন চলাকালে জনগণের মৌলিক অধিকার অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের একটানা ১৪ বছরের শাসনামলে সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারগুলো চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। সংবিধান মানুষের জানমাল রক্ষার নিশ্চয়তা, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা, বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা এবং সংগঠনের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিলেও বিভিন্নভাবে এগুলোর কার্যকারিতা বহুলাংশে খর্ব করা হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কারণে গণমাধ্যম কর্মী ও মুক্তচিন্তার মানুষ হয়রানির সম্মুখীন হচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও স্থানীয় প্রশাসনকে ব্যবহার করে নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের পক্ষে জয় ছিনিয়ে আনার অভিযোগ উঠছে। জনগণ ভোট প্রদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় আইনের শাসন নিশ্চিতকরণের অঙ্গীকার রয়েছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করা হয়েছে, ‘সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী।’ ৩১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহারলাভ যে কোনো স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষত আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।’ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার একটি পূর্বশর্ত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আইনের শাসনের বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান অনেকটা তলানিতে। আটটি ফ্যাক্টর বা বিষয় বিবেচনায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট আইনের শাসন সূচক তৈরি করে আসছে। এগুলো হলো-সরকারি ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি, উন্মুক্ত সরকারব্যবস্থা, মৌলিক অধিকার, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা, আইন প্রয়োগ, দেওয়ানি বিচার এবং ফৌজদারি বিচার। এগুলোর সার্বিক মূল্যায়নে আইনের শাসনের বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের ক্রমাগত অবনমন ঘটছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮ সালে আইনের শাসনের বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০২তম, ক্রমাগত অবনমনের মধ্য দিয়ে ২০১৯, ২০২০, ২০২১ ও ২০২২ সালে বাংলাদেশের অবস্থান দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১১২, ১১৫, ১২৪ ও ১২৭তম।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ অনুমোদিত মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত মানবাধিকারের শর্তাবলির মধ্যে রয়েছে-ক. সব মানুষ সমান মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে; খ. জীবন, স্বাধীনতা ও দৈহিক নিরাপত্তার অধিকার প্রত্যেকের রয়েছে; গ. আইনের সামনে প্রত্যেকেরই ব্যক্তি হিসাবে স্বীকৃতি লাভের অধিকার আছে; ঘ. আইনের চোখে সবাই সমান; ঙ. শাসনতন্ত্রে বা আইনে প্রদত্ত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে উপযুক্ত জাতীয় বিচার আদালতের কাছে প্রতিকার লাভের অধিকার প্রত্যেকেরই আছে; চ. কাউকে খেয়াল খুশিমতো গ্রেফতার বা অন্তরীণ করা কিংবা নির্বাসন দেওয়া যাবে না; ছ. প্রত্যেকেরই নিজের দেশসহ যে কোনো দেশ পরিত্যাগ বা স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের অধিকার রয়েছে।

বাংলাদেশে মানবাধিকার আগেও লঙ্ঘিত হয়েছে, এখনো হচ্ছে। তবে গত কয়েক বছরে এর মাত্রা বেড়ে গেছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর একটি দৈনিকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৮০ জন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ, গুম ও নিখোঁজের শিকার হয়েছেন সাতজন। ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৩২১ জন নারী। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ৪৭ জন এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন ৯ জন। যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ১২৮ নারী।

বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে অনুষ্ঠিত সংলাপ শেষে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। ‘বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়-গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় উভয়পক্ষ একমত ও জোর দেবে; এক্ষেত্রে মানবাধিকার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করবে (যুগান্তর, ২৫ নভেম্বর)। এটি নিঃসন্দেহে আশার কথা। যত তাড়াতাড়ি তা বাস্তবায়িত হবে, দেশের জন্য ততই মঙ্গল।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

স্বদেশ ভাবনা

বাংলাদেশ-ইইউ সংলাপ : যৌথ বিবৃতির অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হোক

 আবদুল লতিফ মণ্ডল 
৩০ নভেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ২৪ নভেম্বর ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হলো।

২৫ নভেম্বর যুগান্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম রাজনৈতিক সংলাপে গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

এছাড়া বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি সামনে রেখে একটি অংশীদারত্ব সহযোগিতা চুক্তি (পার্টনারশিপ কো-অপারেশন) সই করতে উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছে।

সংলাপে গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের বিষয় যে ইউরোপীয় ইউনিয়নই উত্থাপন করেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ, এসব বিষয় সম্পর্কিত বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশ অত্যন্ত দুর্বল অবস্থানে রয়েছে এবং এ অবস্থার উন্নতি হওয়া প্রয়োজন।

প্রথমে দেখা যাক বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়। যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক সাময়িকী দি ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) ২০০৬ সাল থেকে Democracy Index তথা বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচক প্রকাশ করে আসছে।

নির্বাচনব্যবস্থা ও বহুদলীয় অবস্থান, সরকারের সক্রিয়তা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নাগরিক অধিকার-এই পাঁচ মানদণ্ডে একটি দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করে ১০ পয়েন্টভিত্তিক এ সূচক তৈরি করে ইআইইউ। সূচকে প্রাপ্ত স্কোরের ভিত্তিতে দেশগুলোকে যে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করে ইআইইউ, সেগুলো হলো-পূর্ণ গণতন্ত্র (full democracy), ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র (flawed democracy), মিশ্র শাসন (hybrid regime) এবং স্বৈরতন্ত্র (authoritarian regime)। সূচক নির্ধারণী মানদণ্ডে-অর্থাৎ নির্বাচনব্যবস্থা ও বহুদলীয় অবস্থান, সরকারের সক্রিয়তা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থান সন্তোষজনক নয়। ২০০৬ সালে বিএনপির শাসনামলে ইআইইউ প্রকাশিত প্রথম ডেমোক্রাসি ইনডেক্সে ৬.১১ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশ ‘flawed democracy’ বা ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র ক্যাটাগরিতে অবস্থান করলেও পরবর্তী প্রায় ১৬ বছর ধরে বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকে দেশটি নিচের ক্যাটাগরি ‘hybrid regime’ তথা মিশ্র শাসন ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে। সর্বশেষ গণতন্ত্র সূচক ২০২১-এ ১৬৭টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৭৫তম। দীর্ঘ এ সময়ে প্রথম দুবছর (২০০৭-২০০৮) সামরিক বাহিনী সমর্থিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশ শাসন করেছে। এরপর থেকে প্রায় ১৪ বছর ধরে বিরতিহীনভাবে রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছে আওয়ামী লীগ। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, নির্বাচনে দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে এমন একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে, যেখানে জনগণ স্বাধীনভাবে তাদের সরকার বেছে নেবে (a system of democracy where people choose their government freely)।

অথচ আওয়ামী লীগের অধীনে অনুষ্ঠিত দুটি সংসদ নির্বাচনের প্রথমটি (নবম সংসদ নির্বাচন, জানুয়ারি ২০১৪) অংশগ্রহণমূলক ছিল না; আর দ্বিতীয়টি (২০১৮ সালের ডিসেম্বর) অনুষ্ঠিত হয় নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগের মধ্য দিয়ে, যেখানে নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্ধারিত দিনের আগের রাতে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের ব্যালট বাক্সে ভোট প্রদান করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচক নির্ধারণী অন্যান্য মানদণ্ডে যেমন-সরকারের সক্রিয়তা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও বাংলাদেশ দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানে মৌলিক অধিকার সুরক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। সংবিধানে মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় ২২টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। এসব অনুচ্ছেদে মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় যেসব অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো-১. সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী; ২. প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকবে; ৩. আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে না; ৪. গ্রেফতারকৃত কোনো ব্যক্তিকে যথাসম্ভব শিগগির গ্রেফতারের কারণ জ্ঞাপন না করে প্রহরায় আটক রাখা যাবে না এবং ওই ব্যক্তিকে তার মনোনীত আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ ও তার দ্বারা আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না; ৫. প্রত্যেক নাগরিকের চলাফেরার, শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হওয়ার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদানের এবং সংগঠন করার অধিকার থাকবে; ৬. আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা থাকবে; ৭. আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের প্রবেশ, তল্লাশি ও আটক থেকে স্বীয় গৃহে নিরাপত্তা লাভের অধিকার থাকবে।

বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হওয়ার এক বছর পার না হতেই ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে জরুরি অবস্থা জারির বিধান সংযোজনের দ্বারা জরুরি অবস্থা ঘোষণার কার্যকারিতাকালে মৌলিক অধিকারসংক্রান্ত সংবিধানের ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০ ও ৪১ অনুচ্ছেদের কার্যকারিতা স্থগিত রাখা হয়। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার শুধু বহুদলীয় গণতন্ত্রের স্থলে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেনি, বরং সংবিধান প্রদত্ত অনেক মৌলিক অধিকার থেকে জনগণকে বঞ্চিত করে। সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদের ‘এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে’ কথাগুলো বিলুপ্তির মাধ্যমে প্রশাসনে জনগণের অংশগ্রহণের মৌলিক অধিকার খর্ব করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দুজন জেনারেলের সামরিক শাসনকালে জনগণ সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার ভোগ থেকে বঞ্চিত হন। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের খোলসে দুবছর (২০০৭ ও ২০০৮) সামরিক শাসন চলাকালে জনগণের মৌলিক অধিকার অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের একটানা ১৪ বছরের শাসনামলে সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারগুলো চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। সংবিধান মানুষের জানমাল রক্ষার নিশ্চয়তা, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা, বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা এবং সংগঠনের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিলেও বিভিন্নভাবে এগুলোর কার্যকারিতা বহুলাংশে খর্ব করা হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কারণে গণমাধ্যম কর্মী ও মুক্তচিন্তার মানুষ হয়রানির সম্মুখীন হচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও স্থানীয় প্রশাসনকে ব্যবহার করে নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের পক্ষে জয় ছিনিয়ে আনার অভিযোগ উঠছে। জনগণ ভোট প্রদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় আইনের শাসন নিশ্চিতকরণের অঙ্গীকার রয়েছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করা হয়েছে, ‘সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী।’ ৩১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহারলাভ যে কোনো স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষত আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।’ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার একটি পূর্বশর্ত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আইনের শাসনের বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান অনেকটা তলানিতে। আটটি ফ্যাক্টর বা বিষয় বিবেচনায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট আইনের শাসন সূচক তৈরি করে আসছে। এগুলো হলো-সরকারি ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি, উন্মুক্ত সরকারব্যবস্থা, মৌলিক অধিকার, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা, আইন প্রয়োগ, দেওয়ানি বিচার এবং ফৌজদারি বিচার। এগুলোর সার্বিক মূল্যায়নে আইনের শাসনের বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের ক্রমাগত অবনমন ঘটছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮ সালে আইনের শাসনের বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০২তম, ক্রমাগত অবনমনের মধ্য দিয়ে ২০১৯, ২০২০, ২০২১ ও ২০২২ সালে বাংলাদেশের অবস্থান দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১১২, ১১৫, ১২৪ ও ১২৭তম।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ অনুমোদিত মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত মানবাধিকারের শর্তাবলির মধ্যে রয়েছে-ক. সব মানুষ সমান মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে; খ. জীবন, স্বাধীনতা ও দৈহিক নিরাপত্তার অধিকার প্রত্যেকের রয়েছে; গ. আইনের সামনে প্রত্যেকেরই ব্যক্তি হিসাবে স্বীকৃতি লাভের অধিকার আছে; ঘ. আইনের চোখে সবাই সমান; ঙ. শাসনতন্ত্রে বা আইনে প্রদত্ত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে উপযুক্ত জাতীয় বিচার আদালতের কাছে প্রতিকার লাভের অধিকার প্রত্যেকেরই আছে; চ. কাউকে খেয়াল খুশিমতো গ্রেফতার বা অন্তরীণ করা কিংবা নির্বাসন দেওয়া যাবে না; ছ. প্রত্যেকেরই নিজের দেশসহ যে কোনো দেশ পরিত্যাগ বা স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের অধিকার রয়েছে।

বাংলাদেশে মানবাধিকার আগেও লঙ্ঘিত হয়েছে, এখনো হচ্ছে। তবে গত কয়েক বছরে এর মাত্রা বেড়ে গেছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর একটি দৈনিকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৮০ জন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ, গুম ও নিখোঁজের শিকার হয়েছেন সাতজন। ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৩২১ জন নারী। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ৪৭ জন এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন ৯ জন। যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ১২৮ নারী।

বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে অনুষ্ঠিত সংলাপ শেষে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। ‘বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়-গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় উভয়পক্ষ একমত ও জোর দেবে; এক্ষেত্রে মানবাধিকার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করবে (যুগান্তর, ২৫ নভেম্বর)। এটি নিঃসন্দেহে আশার কথা। যত তাড়াতাড়ি তা বাস্তবায়িত হবে, দেশের জন্য ততই মঙ্গল।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন