জনগণকে শান্তিতে থাকতে দিন
jugantor
আশেপাশে চারপাশে
জনগণকে শান্তিতে থাকতে দিন

  চপল বাশার  

০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘আচ্ছা, ডিসেম্বরের ১০ তারিখে ঢাকায় নাকি অনেক গোলমাল হবে, গোলমাল বাড়তেই থাকবে, সব কিছু বন্ধ হয়ে যাবে? কথাটা কি ঠিক?’ দুপুরে খাবার টেবিলে আমাকে প্রশ্নটা করলেন স্ত্রী। ‘তোমাকে এসব কে বলেছে?’ আমার পালটা প্রশ্ন।

‘কে আবার বলবে। সবাই বলাবলি করছে। আমাদের পাশের ফ্ল্যাটের পিনুর মা পঞ্চাশ কেজির এক বস্তা চাল আর পাঁচ কেজি ডাল কিনে রেখেছেন গতকাল। বললেন, হঠাৎ দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেলে বিপদে পড়ব। তাই আগেই কিনে রাখা।’

‘তুমি কিছু কেননি?’ আমার প্রশ্নে একটু আমতা আমতা করে গিন্নি স্বীকার করলেন যে তিনিও পঁচিশ কেজির এক বস্তা চাল আর তিন কেজি মসুর ডাল আনিয়েছেন। আর পাঁচ লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেলও কিনে রাখবেন বলে ঠিক করেছেন। আমাদের ছোট সংসার, এতেই তিন-চার মাস নিশ্চিন্ত থাকা যাবে। পরে যা হয় দেখা যাবে।

‘আচ্ছা, ১০ তারিখে কী হবে কিছু বললে না তো।’ গিন্নি তার মূল প্রশ্নে ফিরে গেলেন।

‘আমি কী করে বলব ১০ তারিখে কী হবে। আমি রাজনৈতিক নেতাও নই, সরকারের মন্ত্রীও নই।’

‘কিন্তু তুমি তো সাংবাদিক। সাংবাদিকদের সব কিছু আগেভাগেই জানতে হয়।’ গিন্নি আমার দুর্বল জায়গায় ঘা দিলেন। তিনি ঠিকই বলেছেন, সাংবাদিকদের সব কিছু আগেই জানতে হয়। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তথা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যে পথে অগ্রসর হচ্ছে, তা থেকে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না, কোনো উপসংহারেও আসা যাচ্ছে না। কোনো সাংবাদিক কি ঠিক এখনই বলতে পারবেন ১০ ডিসেম্বর কী হবে? দেশ কি সংঘাতের কবলে পড়বে, নাকি শান্তিপূর্ণভাবেই দিনটি পার হয়ে যাবে?

বিএনপি ঘোষিত ঢাকায় ১০ ডিসেম্বরের মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে সবার মধ্যেই অনিশ্চয়তা ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। খালেদা জিয়ার মুক্তি, দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার এবং অন্যান্য দাবিতে বিএনপি সারা দেশে বিভাগীয় গণসমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে। ৮ অক্টোবর চট্টগ্রামে গণসমাবেশ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হয়। চট্টগ্রাম ছাড়াও এ পর্যন্ত ময়মনসিংহ, খুলনা, রংপুর, বরিশাল, ফরিদপুর, সিলেট ও কুমিল্লায় গণসমাবেশ হয়েছে। ৩ ডিসেম্বর রাজশাহীতে গণসমাবেশ করার পর ১০ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগরীতে মহাসমাবেশ করবে বিএনপি। বিভাগীয় গণসমাবেশগুলো শান্তিপূর্ণভাবেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। যদিও বিএনপির অভিযোগ ছিল, সমাবেশগুলোতে যাতে জনসমাগম কম হয় সেজন্য সরকার ও সরকারি দল বিঘ্ন সৃষ্টির চেষ্টা করেছে।

আওয়ামী লীগ সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, বিএনপির কর্মসূচিতে কোনোরকম বাধা তারা দেয়নি। আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে যশোরে একটি বড় জনসভা করেছে, যেখানে দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাষণ দেন। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগ ও দলের অঙ্গ সংগঠনের সম্মেলন ও সমাবেশ হয়েছে এবং চলমান রয়েছে।

দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সাংগঠনিক তৎপরতায় সারা দেশে রাজনীতির অঙ্গন জমজমাট হয়েছে ঠিকই; কিন্তু সেই সঙ্গে জনগণের মধ্যে কিছু উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। উদ্বেগের সঙ্গে আছে গুজব ও জল্পনাকল্পনা। কারণটা হলো ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় বিএনপির মহাসমাবেশ। এ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে কোনো অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় কিনা সেটাই সবার চিন্তা।

বিএনপি ঘোষণা করেছে, ১০ ডিসেম্বর মহাসমাবেশ হবে নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনের রাজপথে। এজন্য দলের পক্ষ থেকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অনুমতি চাওয়া হয়েছে। কিন্তু ডিএমপি নয়াপল্টনে অনুমতি না দিয়ে অনুমতি দিয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। এজন্য ২৬টি শর্ত মেনে বিএনপি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাদের কর্মসূচি পালন করতে পারবে। বিএনপি এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তারা নয়াপল্টনেই মহাসমাবেশ করবে।

বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষই বক্তব্য-পালটা বক্তব্য দিচ্ছে এবং তা মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। সরকারপক্ষ বলছে, বিএনপি তাদের মহাসমাবেশে দশ লাখ লোক আনতে চায়। নয়াপল্টনের রাস্তায় এত লোকের স্থান সংকুলান হবে না, ফলে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের খোলা মাঠে স্থান সংকুলানের সমস্যা হবে না।

বিএনপি পালটা বক্তব্য দিয়ে বলেছে, সরকার বিএনপিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিতে এত উদগ্রীব কেন? তাদের বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য আছে। তাছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেখান থেকে ছাত্রলীগ দলবেঁধে এসে বিএনপির সভায় গোলযোগ সৃষ্টি করতে পারে। বিএনপি আরও কিছু কারণ দেখিয়ে বলেছে, নয়াপল্টনই তাদের পছন্দ, সেখানেই তারা ঘোষিত কর্মসূচি পালন করবে। পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিএনপির আলোচনা চলছে, কিন্তু কোনো মীমাংসা এখনো হয়নি।

এদিকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষনেতাদের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় চলছেই। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রায় প্রতিদিনই বলছেন, ‘খেলা হবে’। ‘কী খেলা, কোথায় খেলা, কখন খেলা হবে’ বিস্তারিত খুলে বলছেন না। এতে মানুষের মনে সংশয় ও উদ্বেগ বাড়ছে। দলের অন্য নেতারাও বলেছেন, আন্দোলনের নামে বিএনপি বাড়াবাড়ি করলে ছাড় দেওয়া হবে না।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২২ নভেম্বর নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে দলের এক সমাবেশে বলেন, ১০ ডিসেম্বর থেকে শুরু হবে এক দফার আন্দোলন। এখনো আসল ঘোষণা দেইনি। আসল ঘোষণা হবে ১০ তারিখে। সেদিন থেকে শুরু হবে এক দফার আন্দোলন। মির্জা ফখরুল তাদের ‘এক দফা’র বিস্তারিত না বললেও তার বক্তব্যে বোঝা যায় তারা সরকারের পদত্যাগের দাবি তুলতে পারেন এবং নতুন কর্মসূচিও ঘোষণা করবেন।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এখন মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে সংঘাত অনিবার্য হয়ে যাবে। সংঘাত সাধারণ মানুষ চায় না, তারা শান্তিতে থাকতে চায়, স্বস্তি চায়। রাজনীতিকদের এটি বুঝতে হবে। করোনা মহামারির মধ্যেই শুরু হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যার প্রভাব পড়েছে সারা বিশ্বে। বাংলাদেশও রেহাই পায়নি। জ্বালানি, নিত্যপণ্য, পরিবহণ-সব কিছুতেই মূল্যবৃদ্ধি। দাম শুধু বাড়ছে আর বাড়ছেই। সর্বশেষ বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। রান্নাঘরে গ্যাস নেই অথচ গ্যাসের বিল ঠিকই শোধ করতে হয়। না হলে সারচার্জ বা জরিমানা অথবা লাইন কর্তন।

এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ মানুষ তথা ৯৫ শতাংশ মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এ অবস্থার মধ্যে রাজনীতিকরা যদি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে তা সারা দেশ ও দেশবাসীকে বিপর্যস্ত করবে এবং একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।

লেখাটি শুরু করেছিলাম ১০ ডিসেম্বর নিয়ে মানুষের উদ্বেগ ও আতঙ্কের কথা দিয়ে। উদ্বিগ্ন মানুষ বিপদ থেকে রেহাই পেতে panic byuing বা অত্যাবশ্যকীয় পণ্য কিনে রাখার চিন্তা করবে, এটাই স্বাভাবিক। অতীতে এমন হয়েছে। এটি সমস্যা আরও বাড়ায়।

আশা করব, সরকার ও রাজনীতিকরা অসহায় মানুষের কথা একটু ভাববেন। তাদের সুখে রাখতে না পারেন, অন্তত শান্তিতে থাকতে দিন। আগেও বলেছি, আবার বলছি, জনগণ সংঘাত চায় না-জনগণ শান্তি চায়, স্বস্তি চায়।

চপল বাশার : সাংবাদিক, লেখক

basharbd@gmail.com

আশেপাশে চারপাশে

জনগণকে শান্তিতে থাকতে দিন

 চপল বাশার 
০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘আচ্ছা, ডিসেম্বরের ১০ তারিখে ঢাকায় নাকি অনেক গোলমাল হবে, গোলমাল বাড়তেই থাকবে, সব কিছু বন্ধ হয়ে যাবে? কথাটা কি ঠিক?’ দুপুরে খাবার টেবিলে আমাকে প্রশ্নটা করলেন স্ত্রী। ‘তোমাকে এসব কে বলেছে?’ আমার পালটা প্রশ্ন।

‘কে আবার বলবে। সবাই বলাবলি করছে। আমাদের পাশের ফ্ল্যাটের পিনুর মা পঞ্চাশ কেজির এক বস্তা চাল আর পাঁচ কেজি ডাল কিনে রেখেছেন গতকাল। বললেন, হঠাৎ দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেলে বিপদে পড়ব। তাই আগেই কিনে রাখা।’

‘তুমি কিছু কেননি?’ আমার প্রশ্নে একটু আমতা আমতা করে গিন্নি স্বীকার করলেন যে তিনিও পঁচিশ কেজির এক বস্তা চাল আর তিন কেজি মসুর ডাল আনিয়েছেন। আর পাঁচ লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেলও কিনে রাখবেন বলে ঠিক করেছেন। আমাদের ছোট সংসার, এতেই তিন-চার মাস নিশ্চিন্ত থাকা যাবে। পরে যা হয় দেখা যাবে।

‘আচ্ছা, ১০ তারিখে কী হবে কিছু বললে না তো।’ গিন্নি তার মূল প্রশ্নে ফিরে গেলেন।

‘আমি কী করে বলব ১০ তারিখে কী হবে। আমি রাজনৈতিক নেতাও নই, সরকারের মন্ত্রীও নই।’

‘কিন্তু তুমি তো সাংবাদিক। সাংবাদিকদের সব কিছু আগেভাগেই জানতে হয়।’ গিন্নি আমার দুর্বল জায়গায় ঘা দিলেন। তিনি ঠিকই বলেছেন, সাংবাদিকদের সব কিছু আগেই জানতে হয়। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তথা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যে পথে অগ্রসর হচ্ছে, তা থেকে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না, কোনো উপসংহারেও আসা যাচ্ছে না। কোনো সাংবাদিক কি ঠিক এখনই বলতে পারবেন ১০ ডিসেম্বর কী হবে? দেশ কি সংঘাতের কবলে পড়বে, নাকি শান্তিপূর্ণভাবেই দিনটি পার হয়ে যাবে?

বিএনপি ঘোষিত ঢাকায় ১০ ডিসেম্বরের মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে সবার মধ্যেই অনিশ্চয়তা ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। খালেদা জিয়ার মুক্তি, দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার এবং অন্যান্য দাবিতে বিএনপি সারা দেশে বিভাগীয় গণসমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে। ৮ অক্টোবর চট্টগ্রামে গণসমাবেশ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হয়। চট্টগ্রাম ছাড়াও এ পর্যন্ত ময়মনসিংহ, খুলনা, রংপুর, বরিশাল, ফরিদপুর, সিলেট ও কুমিল্লায় গণসমাবেশ হয়েছে। ৩ ডিসেম্বর রাজশাহীতে গণসমাবেশ করার পর ১০ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগরীতে মহাসমাবেশ করবে বিএনপি। বিভাগীয় গণসমাবেশগুলো শান্তিপূর্ণভাবেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। যদিও বিএনপির অভিযোগ ছিল, সমাবেশগুলোতে যাতে জনসমাগম কম হয় সেজন্য সরকার ও সরকারি দল বিঘ্ন সৃষ্টির চেষ্টা করেছে।

আওয়ামী লীগ সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, বিএনপির কর্মসূচিতে কোনোরকম বাধা তারা দেয়নি। আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে যশোরে একটি বড় জনসভা করেছে, যেখানে দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাষণ দেন। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগ ও দলের অঙ্গ সংগঠনের সম্মেলন ও সমাবেশ হয়েছে এবং চলমান রয়েছে।

দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সাংগঠনিক তৎপরতায় সারা দেশে রাজনীতির অঙ্গন জমজমাট হয়েছে ঠিকই; কিন্তু সেই সঙ্গে জনগণের মধ্যে কিছু উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। উদ্বেগের সঙ্গে আছে গুজব ও জল্পনাকল্পনা। কারণটা হলো ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় বিএনপির মহাসমাবেশ। এ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে কোনো অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় কিনা সেটাই সবার চিন্তা।

বিএনপি ঘোষণা করেছে, ১০ ডিসেম্বর মহাসমাবেশ হবে নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনের রাজপথে। এজন্য দলের পক্ষ থেকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অনুমতি চাওয়া হয়েছে। কিন্তু ডিএমপি নয়াপল্টনে অনুমতি না দিয়ে অনুমতি দিয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। এজন্য ২৬টি শর্ত মেনে বিএনপি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাদের কর্মসূচি পালন করতে পারবে। বিএনপি এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তারা নয়াপল্টনেই মহাসমাবেশ করবে।

বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষই বক্তব্য-পালটা বক্তব্য দিচ্ছে এবং তা মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। সরকারপক্ষ বলছে, বিএনপি তাদের মহাসমাবেশে দশ লাখ লোক আনতে চায়। নয়াপল্টনের রাস্তায় এত লোকের স্থান সংকুলান হবে না, ফলে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের খোলা মাঠে স্থান সংকুলানের সমস্যা হবে না।

বিএনপি পালটা বক্তব্য দিয়ে বলেছে, সরকার বিএনপিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিতে এত উদগ্রীব কেন? তাদের বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য আছে। তাছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেখান থেকে ছাত্রলীগ দলবেঁধে এসে বিএনপির সভায় গোলযোগ সৃষ্টি করতে পারে। বিএনপি আরও কিছু কারণ দেখিয়ে বলেছে, নয়াপল্টনই তাদের পছন্দ, সেখানেই তারা ঘোষিত কর্মসূচি পালন করবে। পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিএনপির আলোচনা চলছে, কিন্তু কোনো মীমাংসা এখনো হয়নি।

এদিকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষনেতাদের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় চলছেই। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রায় প্রতিদিনই বলছেন, ‘খেলা হবে’। ‘কী খেলা, কোথায় খেলা, কখন খেলা হবে’ বিস্তারিত খুলে বলছেন না। এতে মানুষের মনে সংশয় ও উদ্বেগ বাড়ছে। দলের অন্য নেতারাও বলেছেন, আন্দোলনের নামে বিএনপি বাড়াবাড়ি করলে ছাড় দেওয়া হবে না।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২২ নভেম্বর নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে দলের এক সমাবেশে বলেন, ১০ ডিসেম্বর থেকে শুরু হবে এক দফার আন্দোলন। এখনো আসল ঘোষণা দেইনি। আসল ঘোষণা হবে ১০ তারিখে। সেদিন থেকে শুরু হবে এক দফার আন্দোলন। মির্জা ফখরুল তাদের ‘এক দফা’র বিস্তারিত না বললেও তার বক্তব্যে বোঝা যায় তারা সরকারের পদত্যাগের দাবি তুলতে পারেন এবং নতুন কর্মসূচিও ঘোষণা করবেন।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এখন মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে সংঘাত অনিবার্য হয়ে যাবে। সংঘাত সাধারণ মানুষ চায় না, তারা শান্তিতে থাকতে চায়, স্বস্তি চায়। রাজনীতিকদের এটি বুঝতে হবে। করোনা মহামারির মধ্যেই শুরু হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যার প্রভাব পড়েছে সারা বিশ্বে। বাংলাদেশও রেহাই পায়নি। জ্বালানি, নিত্যপণ্য, পরিবহণ-সব কিছুতেই মূল্যবৃদ্ধি। দাম শুধু বাড়ছে আর বাড়ছেই। সর্বশেষ বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। রান্নাঘরে গ্যাস নেই অথচ গ্যাসের বিল ঠিকই শোধ করতে হয়। না হলে সারচার্জ বা জরিমানা অথবা লাইন কর্তন।

এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ মানুষ তথা ৯৫ শতাংশ মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এ অবস্থার মধ্যে রাজনীতিকরা যদি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে তা সারা দেশ ও দেশবাসীকে বিপর্যস্ত করবে এবং একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।

লেখাটি শুরু করেছিলাম ১০ ডিসেম্বর নিয়ে মানুষের উদ্বেগ ও আতঙ্কের কথা দিয়ে। উদ্বিগ্ন মানুষ বিপদ থেকে রেহাই পেতে panic byuing বা অত্যাবশ্যকীয় পণ্য কিনে রাখার চিন্তা করবে, এটাই স্বাভাবিক। অতীতে এমন হয়েছে। এটি সমস্যা আরও বাড়ায়।

আশা করব, সরকার ও রাজনীতিকরা অসহায় মানুষের কথা একটু ভাববেন। তাদের সুখে রাখতে না পারেন, অন্তত শান্তিতে থাকতে দিন। আগেও বলেছি, আবার বলছি, জনগণ সংঘাত চায় না-জনগণ শান্তি চায়, স্বস্তি চায়।

চপল বাশার : সাংবাদিক, লেখক

basharbd@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন