ঐক্যের পরীক্ষায় হারছে ইউরোপ
jugantor
ঐক্যের পরীক্ষায় হারছে ইউরোপ

  মারওয়ান বিশারা  

০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কী জবাব দেবে ইউরোপ? যখন ইউক্রেনে যুদ্ধ বাধিয়ে মহাদেশটিকে চমকে দিল রাশিয়া, ইউরোপীয় দেশগুলোর উচিত ছিল আগে নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়া। সেটি না করায় আন্তঃআটলান্টিক অংশীদারত্বে স্বাভাবিকভাবেই প্রাধান্য বিস্তার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে ইউক্রেন যুদ্ধের নামে মস্কো ও ওয়াশিংটনের মাঝে চালু হওয়া নতুন স্নায়ুযুদ্ধকালে উপমহাদেশটিকে পোহাতে হচ্ছে প্রবল শীত আক্ষরিক অর্থেই।

অস্থিতিশীল, কিংকর্তব্যবিমূঢ় এবং বিভক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন বুঝতেই পারছে না পরাশক্তিদ্বয়ের এ নতুন শত্রুতা মোকাবিলা করবে কীভাবে। যদিও ইউরোপ এ বিষয়ে মোটামুটি একমত যে, তারা ইউক্রেনের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে তার মুক্তিসংগ্রামকে সহায়তা দেবে। কিন্তু গোটা মহাদেশ এখন ইউক্রেন যুদ্ধের ফলাফলের ফাঁদে বিপর্যস্ত। অবস্থাদৃষ্টে এক দিকে হাঙ্গেরির মতো কিছু দেশ রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েছে; অন্য দিকে সুইডেন ও পোল্যান্ডের মতো কিছু দেশ খাতির বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে-অস্থির এ সময়ে দিক নির্ণয়ে অসমর্থ হয়ে সম্ভবত। অথচ ইউরোপীয় ইউনিয়নকে যদি ফলপ্রসূ করতে হয়, তাহলে নির্দিষ্ট কোনো পরাশক্তির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার কাছে নতি স্বীকার না করে প্রতিটি দেশের অধিকতর স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। মহাদেশটি সেটি বুঝতে পারছে না।

ফ্রান্স ও জার্মানি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিয়ে আসছিল ন্যাটোকে যেন ইউক্রেন পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা না হয়। ইউরোপের রুশভীতি কাজে লাগিয়ে এবং এর মাধ্যমে ইউরোপকে ব্যবহার করে আমেরিকার স্বার্থ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বাইডেন প্রশাসনের কূটকৌশলকে দীর্ঘদিন সমালোচনাও করেছে ওই দুই দেশ। এসব সত্ত্বেও আমেরিকা তার চলতি কৌশলে অটল শুধু নয় এবং ইউরোপের জন্য স্নায়ুযুদ্ধকালীন নতুন আরেকটি নিরাপত্তা কাঠামো পরিকল্পনা করছে তারা।

আমি যখন এ লেখাটি লিখছি, তখন রোমানিয়ায় ন্যাটো পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এন্টনি ব্লিনকেন। দেশটিতে কমপক্ষে তিন হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে এবং এ দেশটাতেই ২০০৮ সালে ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন চলাকালে ইউক্রেনকে ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত করতে প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকা খেয়াল করেনি, ওই চাপে ত্রাস সৃষ্টি হয় ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মনে।

ব্রিটিশ ম্যাগাজিন দি ইকোনমিস্ট প্রতিবেদন ছাপায়-‘আমেরিকার সস্তা অর্থনৈতিক বুলি এবং ভূরাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ইউরোপীয় ইউনিয়নের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।’ প্রভাবশালী ওই পত্রিকা একই সঙ্গে সতর্ক করে দেয়-‘ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের মাতবরসুলভ মনোভাব কেবল ইউরোপীয় মহাদেশের সমৃদ্ধিকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে না, একই সঙ্গে আন্তঃআটলান্টিক মৈত্রীকেও নাজুক করে ফেলে দিচ্ছে এটি।’

বাইডেন প্রশাসনের হয়তো নজর এড়িয়ে গেছে। জ্বালানি খাতে এরই মধ্যে রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে জার্মানির; চীনের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে রপ্তানি ও বিনিয়োগ খাতে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যখন মস্কো কিংবা বেইজিংয়ের সঙ্গে পশ্চিমা সম্পর্ক সীমাবদ্ধ করার কথা বলে, তখন নাখোশ হয় বার্লিন। নভেম্বর মাসের প্রথম দিকে জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজ চীন সফরে গিয়েছিলেন যাতে জার্মানি-চীন সম্পর্কে নিশ্চয়তা ও স্থিরতা বৃদ্ধি পায়।

জার্মানি হয়তো এ শীতের জন্য তার গ্যাসের মজুত নিশ্চিত করতে পেরেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকটে ভুগছে ইউরোপ। অধিকন্তু বৃদ্ধি পাচ্ছে জ্বালানির দাম। ইউরোপে গ্যাসের দাম এরই মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ছয়গুণ। এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে কমেছে রুশ গ্যাসের সরবরাহ। ফলে কীভাবে ২০২৩ সাল পার করবে ইউরোপের জ্বালানি খাত, সেটাই চিন্তার বিষয়।

এক দিকে জ্বালানি সংকোচন, অন্য দিকে প্রবল শীত ইউরোপে কমপক্ষে অতিরিক্ত এক লাখ লোকের মৃত্যুর কারণ হতে পারে, যা কিনা এখন পর্যন্ত ইউক্রেন যুদ্ধে উভয়পক্ষের যোদ্ধাদের সম্মিলিত মৃত্যুর তুলনায় বেশি। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ছিল তার মিত্র ইউরোপকে চলমান জ্বালানি সংকটে সহায়তা জোগানো। উলটো আমেরিকা নিজ বাজারে যে দামে প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রি করে, এখন ইউরোপের বাজারে সেই একই গ্যাস বিক্রি করছে অন্তত চারগুণ বেশি দামে।

কিছু দিন আগে মার্কিন কংগ্রেস প্রণয়ন করেছে ইনফ্লেশন রিডাকশন অ্যাক্ট। এ আইন বলে যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেট জায়ান্টগুলো কোটি কোটি ডলার পাবে আর্থিক ভর্তুকি। এতে করে তাদের ইউরোপীয় প্রতিযোগীরা কি চলমান বাজারে প্রতিযোগিতায় কুলিয়ে উঠতে পারবে? এরই মধ্যে তো ট্রাম্পের ‘মেইড ইন আমেরিকা’ স্লোগানের ভারে আন্তঃআটলান্টিক বাণিজ্য কাবু।

স্বভাবতই ইউরোপ এখন আমেরিকাকে দোষ দেয় যুদ্ধকে বাণিজ্যের হাতিয়ার হিসাবে মিত্রের ওপরই ব্যবহারের জন্য; ইউরোপের বাজারকে মার্কিন বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসাবে ব্যবহারের জন্য; বহুপক্ষীয় মুক্ত ও স্বচ্ছ বাণিজ্যকে খর্ব করার জন্য। একাধিক ইউরোপীয় দেশ প্রকাশ্যে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনের নীতিই গ্রহণ করে, তাহলে চীন অংশীদার হিসাবে খারাপ কীসে? ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ অবশ্য ইউরোপকে জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমেরিকা বা চীন কেউই আমাদের সহায়তায় এগিয়ে আসবে না; ইউরোপের সমস্যা মেটাতে হবে ইউরোপকেই। তার দেখাদেখি কিছু ইউরোপীয় দেশ আবার ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছে, ইউরোপের ভাগ্য নির্ধারণে বাইডেন যেন একা সিদ্ধান্ত না নেন, বিশেষত কৌশলগত ক্ষেত্রে, নইলে আন্তঃআটলান্টিক মৈত্রী টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।

যুক্তরাষ্ট্রকে যতটুকু দোষারোপ করা যায়, আমি মনে করি বড় দোষ গোটা ইউরোপেরই। তাদের নিজেদের মধ্যেই সমন্বয়, পরামর্শ ও ঐক্যের ঘাটতি প্রকট। নতুন বৈশ্বিক ক্ষমতা-সংগ্রাম চলাকালে যে ঐক্যবদ্ধভাবে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলার কৌশল নেওয়া দরকার, সে বিষয়ে তাদের উদ্যম অনুপস্থিত। ব্রিটেন এরই মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বিদায় নিয়েছে। ফ্রান্স ও ইতালির মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয় মাঝেমধ্যে। ইউরোপের উত্তর ও দক্ষিণাংশের মাঝে আস্থার অভাবও কম নেই। এদিকে ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যকার সম্পর্ক উত্তর মেরুর মতো শীতল। অথচ ২৭ জাতিবিশিষ্ট ইউরোপকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমি মনে করি প্যারিস ও বার্লিনকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রো ও চ্যান্সেলর শোলজের মধ্যে সমন্বয়ের যে অভাব, সেটি কিন্তু তাদের পূর্বসূরি ফ্রাসোয়া মিতেরাঁ ও হেলমুট কোহল কিংবা জ্যাঁক শিরাক ও গ্রেহার্ড শ্রোয়েডার, এমনকি ম্যাক্রোঁ ও মেরকেলের মাঝেও ছিল না। সম্পর্কের শীতলতায় ইউরোপ হয়েছে বিভক্ত এবং নাজুক। আর ইউরোপের এ নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়েছে আমেরিকা। বুশের যুদ্ধপ্রিয়তা, ওবামার ভাবলেশহীনতা এবং ট্রাম্পের ক্ষোভও ইউরোপে বিভক্তি বাড়িয়েছে কয়েকগুণ। বর্তমানে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র চাইছে রাশিয়াকে ইউরোপীয় মাঠের বাইরে রাখতে, জার্মানিকে মাঠেই নামায়নি, ফ্রান্সকে বসিয়ে রেখেছে সাইড লাইনে এবং নিজেকে বসিয়েছে বাজারের মধ্যখানে।

তবে আমি মনে করি, যে ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপকে একেবারে হতবিহ্বল করে ফেলেছে, সেটিই আবার তার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ হতে পারে। ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যে ধরনের বর্ণবাদ ও ফ্যাসিবাদ ছিল, এখন তার কিছুটা পুনরুত্থান লক্ষণীয়। আমার আশার জায়গাটা হচ্ছে, দুই বিশ্বযুদ্ধেও ইউরোপ শেষ হয়ে যায়নি। কারণ একক সত্তা হিসাবে ইউরোপ অনেক বেশি প্রজ্ঞাবান। আর সেই প্রজ্ঞাটাই তার এখন বেশি দরকার।

আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর : জায়েদ ইবনে আবুল ফজল

মারওয়ান বিশারা : সাবেক অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অফ প্যারিস

ঐক্যের পরীক্ষায় হারছে ইউরোপ

 মারওয়ান বিশারা 
০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কী জবাব দেবে ইউরোপ? যখন ইউক্রেনে যুদ্ধ বাধিয়ে মহাদেশটিকে চমকে দিল রাশিয়া, ইউরোপীয় দেশগুলোর উচিত ছিল আগে নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়া। সেটি না করায় আন্তঃআটলান্টিক অংশীদারত্বে স্বাভাবিকভাবেই প্রাধান্য বিস্তার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে ইউক্রেন যুদ্ধের নামে মস্কো ও ওয়াশিংটনের মাঝে চালু হওয়া নতুন স্নায়ুযুদ্ধকালে উপমহাদেশটিকে পোহাতে হচ্ছে প্রবল শীত আক্ষরিক অর্থেই।

অস্থিতিশীল, কিংকর্তব্যবিমূঢ় এবং বিভক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন বুঝতেই পারছে না পরাশক্তিদ্বয়ের এ নতুন শত্রুতা মোকাবিলা করবে কীভাবে। যদিও ইউরোপ এ বিষয়ে মোটামুটি একমত যে, তারা ইউক্রেনের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে তার মুক্তিসংগ্রামকে সহায়তা দেবে। কিন্তু গোটা মহাদেশ এখন ইউক্রেন যুদ্ধের ফলাফলের ফাঁদে বিপর্যস্ত। অবস্থাদৃষ্টে এক দিকে হাঙ্গেরির মতো কিছু দেশ রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েছে; অন্য দিকে সুইডেন ও পোল্যান্ডের মতো কিছু দেশ খাতির বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে-অস্থির এ সময়ে দিক নির্ণয়ে অসমর্থ হয়ে সম্ভবত। অথচ ইউরোপীয় ইউনিয়নকে যদি ফলপ্রসূ করতে হয়, তাহলে নির্দিষ্ট কোনো পরাশক্তির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার কাছে নতি স্বীকার না করে প্রতিটি দেশের অধিকতর স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। মহাদেশটি সেটি বুঝতে পারছে না।

ফ্রান্স ও জার্মানি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিয়ে আসছিল ন্যাটোকে যেন ইউক্রেন পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা না হয়। ইউরোপের রুশভীতি কাজে লাগিয়ে এবং এর মাধ্যমে ইউরোপকে ব্যবহার করে আমেরিকার স্বার্থ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বাইডেন প্রশাসনের কূটকৌশলকে দীর্ঘদিন সমালোচনাও করেছে ওই দুই দেশ। এসব সত্ত্বেও আমেরিকা তার চলতি কৌশলে অটল শুধু নয় এবং ইউরোপের জন্য স্নায়ুযুদ্ধকালীন নতুন আরেকটি নিরাপত্তা কাঠামো পরিকল্পনা করছে তারা।

আমি যখন এ লেখাটি লিখছি, তখন রোমানিয়ায় ন্যাটো পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এন্টনি ব্লিনকেন। দেশটিতে কমপক্ষে তিন হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে এবং এ দেশটাতেই ২০০৮ সালে ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন চলাকালে ইউক্রেনকে ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত করতে প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকা খেয়াল করেনি, ওই চাপে ত্রাস সৃষ্টি হয় ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মনে।

ব্রিটিশ ম্যাগাজিন দি ইকোনমিস্ট প্রতিবেদন ছাপায়-‘আমেরিকার সস্তা অর্থনৈতিক বুলি এবং ভূরাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ইউরোপীয় ইউনিয়নের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।’ প্রভাবশালী ওই পত্রিকা একই সঙ্গে সতর্ক করে দেয়-‘ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের মাতবরসুলভ মনোভাব কেবল ইউরোপীয় মহাদেশের সমৃদ্ধিকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে না, একই সঙ্গে আন্তঃআটলান্টিক মৈত্রীকেও নাজুক করে ফেলে দিচ্ছে এটি।’

বাইডেন প্রশাসনের হয়তো নজর এড়িয়ে গেছে। জ্বালানি খাতে এরই মধ্যে রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে জার্মানির; চীনের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে রপ্তানি ও বিনিয়োগ খাতে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যখন মস্কো কিংবা বেইজিংয়ের সঙ্গে পশ্চিমা সম্পর্ক সীমাবদ্ধ করার কথা বলে, তখন নাখোশ হয় বার্লিন। নভেম্বর মাসের প্রথম দিকে জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজ চীন সফরে গিয়েছিলেন যাতে জার্মানি-চীন সম্পর্কে নিশ্চয়তা ও স্থিরতা বৃদ্ধি পায়।

জার্মানি হয়তো এ শীতের জন্য তার গ্যাসের মজুত নিশ্চিত করতে পেরেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকটে ভুগছে ইউরোপ। অধিকন্তু বৃদ্ধি পাচ্ছে জ্বালানির দাম। ইউরোপে গ্যাসের দাম এরই মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ছয়গুণ। এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে কমেছে রুশ গ্যাসের সরবরাহ। ফলে কীভাবে ২০২৩ সাল পার করবে ইউরোপের জ্বালানি খাত, সেটাই চিন্তার বিষয়।

এক দিকে জ্বালানি সংকোচন, অন্য দিকে প্রবল শীত ইউরোপে কমপক্ষে অতিরিক্ত এক লাখ লোকের মৃত্যুর কারণ হতে পারে, যা কিনা এখন পর্যন্ত ইউক্রেন যুদ্ধে উভয়পক্ষের যোদ্ধাদের সম্মিলিত মৃত্যুর তুলনায় বেশি। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ছিল তার মিত্র ইউরোপকে চলমান জ্বালানি সংকটে সহায়তা জোগানো। উলটো আমেরিকা নিজ বাজারে যে দামে প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রি করে, এখন ইউরোপের বাজারে সেই একই গ্যাস বিক্রি করছে অন্তত চারগুণ বেশি দামে।

কিছু দিন আগে মার্কিন কংগ্রেস প্রণয়ন করেছে ইনফ্লেশন রিডাকশন অ্যাক্ট। এ আইন বলে যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেট জায়ান্টগুলো কোটি কোটি ডলার পাবে আর্থিক ভর্তুকি। এতে করে তাদের ইউরোপীয় প্রতিযোগীরা কি চলমান বাজারে প্রতিযোগিতায় কুলিয়ে উঠতে পারবে? এরই মধ্যে তো ট্রাম্পের ‘মেইড ইন আমেরিকা’ স্লোগানের ভারে আন্তঃআটলান্টিক বাণিজ্য কাবু।

স্বভাবতই ইউরোপ এখন আমেরিকাকে দোষ দেয় যুদ্ধকে বাণিজ্যের হাতিয়ার হিসাবে মিত্রের ওপরই ব্যবহারের জন্য; ইউরোপের বাজারকে মার্কিন বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসাবে ব্যবহারের জন্য; বহুপক্ষীয় মুক্ত ও স্বচ্ছ বাণিজ্যকে খর্ব করার জন্য। একাধিক ইউরোপীয় দেশ প্রকাশ্যে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনের নীতিই গ্রহণ করে, তাহলে চীন অংশীদার হিসাবে খারাপ কীসে? ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ অবশ্য ইউরোপকে জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমেরিকা বা চীন কেউই আমাদের সহায়তায় এগিয়ে আসবে না; ইউরোপের সমস্যা মেটাতে হবে ইউরোপকেই। তার দেখাদেখি কিছু ইউরোপীয় দেশ আবার ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছে, ইউরোপের ভাগ্য নির্ধারণে বাইডেন যেন একা সিদ্ধান্ত না নেন, বিশেষত কৌশলগত ক্ষেত্রে, নইলে আন্তঃআটলান্টিক মৈত্রী টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।

যুক্তরাষ্ট্রকে যতটুকু দোষারোপ করা যায়, আমি মনে করি বড় দোষ গোটা ইউরোপেরই। তাদের নিজেদের মধ্যেই সমন্বয়, পরামর্শ ও ঐক্যের ঘাটতি প্রকট। নতুন বৈশ্বিক ক্ষমতা-সংগ্রাম চলাকালে যে ঐক্যবদ্ধভাবে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলার কৌশল নেওয়া দরকার, সে বিষয়ে তাদের উদ্যম অনুপস্থিত। ব্রিটেন এরই মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বিদায় নিয়েছে। ফ্রান্স ও ইতালির মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয় মাঝেমধ্যে। ইউরোপের উত্তর ও দক্ষিণাংশের মাঝে আস্থার অভাবও কম নেই। এদিকে ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যকার সম্পর্ক উত্তর মেরুর মতো শীতল। অথচ ২৭ জাতিবিশিষ্ট ইউরোপকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমি মনে করি প্যারিস ও বার্লিনকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রো ও চ্যান্সেলর শোলজের মধ্যে সমন্বয়ের যে অভাব, সেটি কিন্তু তাদের পূর্বসূরি ফ্রাসোয়া মিতেরাঁ ও হেলমুট কোহল কিংবা জ্যাঁক শিরাক ও গ্রেহার্ড শ্রোয়েডার, এমনকি ম্যাক্রোঁ ও মেরকেলের মাঝেও ছিল না। সম্পর্কের শীতলতায় ইউরোপ হয়েছে বিভক্ত এবং নাজুক। আর ইউরোপের এ নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়েছে আমেরিকা। বুশের যুদ্ধপ্রিয়তা, ওবামার ভাবলেশহীনতা এবং ট্রাম্পের ক্ষোভও ইউরোপে বিভক্তি বাড়িয়েছে কয়েকগুণ। বর্তমানে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র চাইছে রাশিয়াকে ইউরোপীয় মাঠের বাইরে রাখতে, জার্মানিকে মাঠেই নামায়নি, ফ্রান্সকে বসিয়ে রেখেছে সাইড লাইনে এবং নিজেকে বসিয়েছে বাজারের মধ্যখানে।

তবে আমি মনে করি, যে ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপকে একেবারে হতবিহ্বল করে ফেলেছে, সেটিই আবার তার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ হতে পারে। ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যে ধরনের বর্ণবাদ ও ফ্যাসিবাদ ছিল, এখন তার কিছুটা পুনরুত্থান লক্ষণীয়। আমার আশার জায়গাটা হচ্ছে, দুই বিশ্বযুদ্ধেও ইউরোপ শেষ হয়ে যায়নি। কারণ একক সত্তা হিসাবে ইউরোপ অনেক বেশি প্রজ্ঞাবান। আর সেই প্রজ্ঞাটাই তার এখন বেশি দরকার।

আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর : জায়েদ ইবনে আবুল ফজল

মারওয়ান বিশারা : সাবেক অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অফ প্যারিস

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন