ধনে ধনী, মনে ধনী
jugantor
ধনে ধনী, মনে ধনী

  ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী  

০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সত্যিকারের ধনী কারা? প্রশ্নটি করলেই প্রথাগতভাবে উত্তর আসবে-যাদের প্রচুর অর্থ, ধন-সম্পদ, বাড়ি-গাড়ি রয়েছে তারাই তো ধনী। ধনী সম্পর্কিত এ ধরনের মতবাদ আমাদের পুঁজিবাদী ও ভোগবাদী মনোভাবের কারণেই তৈরি হয়েছে। প্রকৃত অর্থে ধন থাকলেই মানুষ ধনী হয় না, একটা সাদাসিধে দয়ালু মন থাকতে হয়। যে মন মানুষের জন্য কাঁদে, আকুলি বিকুলি করে, বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অস্থিরতা সমুদ্রের স্রোতের মতো আছাড়িবিছাড়ি খায়।

মানুষ অনুভব করে একটা ঝড় তার মনকে ভেঙেচুরে ছাড়খার করে দিচ্ছে, অথচ তার পরও সেখানে অলৌকিক একটা আনন্দ গোপনে গোপনে সুখের নতুন থিওরি আবিষ্কার করে ফেলেছে। যে থিওরি বিজ্ঞান বোঝে না, দর্শন বোঝে না, মনস্তত্ব বোঝে না, অর্থনীতি-রাজনীতি বোঝে না। সে থিওরি বোঝে মন কত বড় হতে পারে। মানুষটা হয়তো খুব বড় নয়, কিন্তু উথাল-পাথাল মনটা এতটাই বড়, যার কোনো সীমা নেই, সীমান্ত নেই।

সে মন যে পথেই পা বাড়ায় সে পথেই নতুন নতুন চিন্তার পথ তৈরি করতে করতে চলতে থাকে। সে মন যেদিকে তাকায় সেদিকেই নতুন নতুন পৃথিবীর জন্ম দিতে দিতে রেলগাড়ির মতো ছুটতেই থাকে। সে মন যতটা হাত বাড়ায়, সে হাত ততটাই অভাব পূরণ করতে করতে সব মানুষের মুখের হাসির উৎসব হয়ে যায়। সে মন যতই আলো ভেঙে ভেঙে অন্ধকারে প্রবেশ করে থাকে, ততই মানুষ স্বপ্ন দেখতে দেখতে স্বপ্নবাজ হয়ে যায়।

সে স্বপ্নে প্রতারণা নেই, পূর্ণতা আছে। সে স্বপ্নে দীনতা নেই, দাসত্ব নেই, নিজেকে চেনার অচেনা আয়না আছে। সে স্বপ্ন পলাতক স্বপ্নের মতো অলস হয়ে মাথায় হাত দিয়ে ভাগ্যের দোহাই দিয়ে বসে থাকে না, সে স্বপ্ন টুকরো টুকরো কাচের ওপর পা ফেলতে ফেলতে অনুভব করে স্বপ্নকে বাস্তব করতে হলে কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, খুব কঠিন পরীক্ষায় প্রশ্ন কমন না পেয়েও উতরে যেতে হয়।

একজন দরিদ্র মানুষও ধনী, যদি তার প্রাচুর্যপূর্ণ মন থাকে। আবার মন না থাকলে আমাদের সমাজের তথাকথিত বড়লোকেরাও দরিদ্র। ফেসবুক থেকে সংগৃহীত একটা ঘটনা মনে পড়ল-একবার এক লোক বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি বিল গেটসকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘পৃথিবীতে তোমার চেয়ে ধনী আর কেউ আছে কি?’ বিল গেটস জবাব দিয়েছিলেন-‘হ্যাঁ, এমন একজন আছেন যিনি আমার চেয়েও ধনী।’ তারপর তিনি একটি গল্প বললেন-

‘একটা সময় ছিল যখন আমি ধনাঢ্য বা বিখ্যাত ছিলাম না। একবার নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে একজন সংবাদপত্র বিক্রেতার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হলো। আমি একটি সংবাদপত্র কিনতে চেয়েছিলাম, কিন্তু দেখেছি আমার কাছে যথেষ্ট টাকা নেই। তাই আমি কেনার সিদ্ধান্ত ছেড়ে পত্রিকাটি বিক্রেতার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। আমি তাকে আমার অবস্থার কথা বলেছি। বিক্রেতা বললেন, আমি আপনাকে বিনামূল্যে দিচ্ছি। আমি পত্রিকাটি নিয়েছিলাম। দুই থেকে তিন মাস পর আমি একই বিমানবন্দরে আবার অবতরণ করেছি এবং কাকতালীয়ভাবে আবারও সেই পত্রিকা বিক্রেতার সঙ্গে দেখা হলো। বিক্রেতা আমাকে আজও একটি পত্রিকা অফার করলেন। আমি অপারগতা প্রকাশ করেছিলাম এবং বলেছিলাম, আমি এটি নিতে পারি না, কারণ এখনো আমার পরিবর্তন আসেনি। তিনি বললেন, আপনি এটি নিতে পারেন, আমি এটি আমার লভ্যাংশ থেকে আপনাকে দিচ্ছি, আমার ক্ষতি হবে না। বিক্রেতার আগ্রহে আমি পত্রিকাটি নিয়েছিলাম। ওই ঘটনার ১৯ বছর পর আমি বিখ্যাত এবং মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠি। হঠাৎ একদিন মনে পড়ে গেল সেই পত্রিকা বিক্রেতার কথা। আমি তাকে খুঁজতে শুরু করে দিলাম এবং প্রায় দেড় মাস অনুসন্ধানের পর তাকে খুঁজে পেলাম। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম-আপনি কি আমাকে চেনেন? তিনি বলেছিলেন, হ্যাঁ, আপনি বিল গেটস। আমি তাকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, আপনার কি মনে আছে একবার আমাকে বিনামূল্যে একটি পত্রিকা দিয়েছিলেন? বিক্রেতা বললেন, হ্যাঁ, মনে আছে। আপনাকে দু’বার দিয়েছি। আমি বললাম, আপনি যে আমাকে বিনামূল্যে পত্রিকা দিয়েছিলেন, তা আমি ফিরিয়ে দিতে চাই। আপনি আপনার নিজের জন্য কী চান বলুন? আমি তা পূরণ করব। বিক্রেতা বললেন, স্যার, আপনি এমন কিছু দিতে পারবেন না, যা আমার সাহায্যের সমান হবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন? তিনি বলেছিলেন, আমি আপনাকে সংবাদপত্র দিয়েছিলাম আমার দরিদ্র অবস্থান থেকে। আর আপনি এখন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হয়ে আমাকে সাহায্য করার চেষ্টা করছেন। আপনার সাহায্য কিভাবে আমার সাহায্যের সমান হবে? সেদিন আমি বুঝতে পেরেছিলাম, সংবাদপত্রের ওই বিক্রেতা আমার চেয়েও বেশি ধনী, কারণ তিনি কাউকে সাহায্য করার জন্য ধনী হওয়ার অপেক্ষা করেননি।’

ধনী হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না, যদি মনটা সবসময় ধনী থাকে।

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

ধনে ধনী, মনে ধনী

 ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী 
০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সত্যিকারের ধনী কারা? প্রশ্নটি করলেই প্রথাগতভাবে উত্তর আসবে-যাদের প্রচুর অর্থ, ধন-সম্পদ, বাড়ি-গাড়ি রয়েছে তারাই তো ধনী। ধনী সম্পর্কিত এ ধরনের মতবাদ আমাদের পুঁজিবাদী ও ভোগবাদী মনোভাবের কারণেই তৈরি হয়েছে। প্রকৃত অর্থে ধন থাকলেই মানুষ ধনী হয় না, একটা সাদাসিধে দয়ালু মন থাকতে হয়। যে মন মানুষের জন্য কাঁদে, আকুলি বিকুলি করে, বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অস্থিরতা সমুদ্রের স্রোতের মতো আছাড়িবিছাড়ি খায়।

মানুষ অনুভব করে একটা ঝড় তার মনকে ভেঙেচুরে ছাড়খার করে দিচ্ছে, অথচ তার পরও সেখানে অলৌকিক একটা আনন্দ গোপনে গোপনে সুখের নতুন থিওরি আবিষ্কার করে ফেলেছে। যে থিওরি বিজ্ঞান বোঝে না, দর্শন বোঝে না, মনস্তত্ব বোঝে না, অর্থনীতি-রাজনীতি বোঝে না। সে থিওরি বোঝে মন কত বড় হতে পারে। মানুষটা হয়তো খুব বড় নয়, কিন্তু উথাল-পাথাল মনটা এতটাই বড়, যার কোনো সীমা নেই, সীমান্ত নেই।

সে মন যে পথেই পা বাড়ায় সে পথেই নতুন নতুন চিন্তার পথ তৈরি করতে করতে চলতে থাকে। সে মন যেদিকে তাকায় সেদিকেই নতুন নতুন পৃথিবীর জন্ম দিতে দিতে রেলগাড়ির মতো ছুটতেই থাকে। সে মন যতটা হাত বাড়ায়, সে হাত ততটাই অভাব পূরণ করতে করতে সব মানুষের মুখের হাসির উৎসব হয়ে যায়। সে মন যতই আলো ভেঙে ভেঙে অন্ধকারে প্রবেশ করে থাকে, ততই মানুষ স্বপ্ন দেখতে দেখতে স্বপ্নবাজ হয়ে যায়।

সে স্বপ্নে প্রতারণা নেই, পূর্ণতা আছে। সে স্বপ্নে দীনতা নেই, দাসত্ব নেই, নিজেকে চেনার অচেনা আয়না আছে। সে স্বপ্ন পলাতক স্বপ্নের মতো অলস হয়ে মাথায় হাত দিয়ে ভাগ্যের দোহাই দিয়ে বসে থাকে না, সে স্বপ্ন টুকরো টুকরো কাচের ওপর পা ফেলতে ফেলতে অনুভব করে স্বপ্নকে বাস্তব করতে হলে কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, খুব কঠিন পরীক্ষায় প্রশ্ন কমন না পেয়েও উতরে যেতে হয়।

একজন দরিদ্র মানুষও ধনী, যদি তার প্রাচুর্যপূর্ণ মন থাকে। আবার মন না থাকলে আমাদের সমাজের তথাকথিত বড়লোকেরাও দরিদ্র। ফেসবুক থেকে সংগৃহীত একটা ঘটনা মনে পড়ল-একবার এক লোক বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি বিল গেটসকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘পৃথিবীতে তোমার চেয়ে ধনী আর কেউ আছে কি?’ বিল গেটস জবাব দিয়েছিলেন-‘হ্যাঁ, এমন একজন আছেন যিনি আমার চেয়েও ধনী।’ তারপর তিনি একটি গল্প বললেন-

‘একটা সময় ছিল যখন আমি ধনাঢ্য বা বিখ্যাত ছিলাম না। একবার নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে একজন সংবাদপত্র বিক্রেতার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হলো। আমি একটি সংবাদপত্র কিনতে চেয়েছিলাম, কিন্তু দেখেছি আমার কাছে যথেষ্ট টাকা নেই। তাই আমি কেনার সিদ্ধান্ত ছেড়ে পত্রিকাটি বিক্রেতার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। আমি তাকে আমার অবস্থার কথা বলেছি। বিক্রেতা বললেন, আমি আপনাকে বিনামূল্যে দিচ্ছি। আমি পত্রিকাটি নিয়েছিলাম। দুই থেকে তিন মাস পর আমি একই বিমানবন্দরে আবার অবতরণ করেছি এবং কাকতালীয়ভাবে আবারও সেই পত্রিকা বিক্রেতার সঙ্গে দেখা হলো। বিক্রেতা আমাকে আজও একটি পত্রিকা অফার করলেন। আমি অপারগতা প্রকাশ করেছিলাম এবং বলেছিলাম, আমি এটি নিতে পারি না, কারণ এখনো আমার পরিবর্তন আসেনি। তিনি বললেন, আপনি এটি নিতে পারেন, আমি এটি আমার লভ্যাংশ থেকে আপনাকে দিচ্ছি, আমার ক্ষতি হবে না। বিক্রেতার আগ্রহে আমি পত্রিকাটি নিয়েছিলাম। ওই ঘটনার ১৯ বছর পর আমি বিখ্যাত এবং মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠি। হঠাৎ একদিন মনে পড়ে গেল সেই পত্রিকা বিক্রেতার কথা। আমি তাকে খুঁজতে শুরু করে দিলাম এবং প্রায় দেড় মাস অনুসন্ধানের পর তাকে খুঁজে পেলাম। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম-আপনি কি আমাকে চেনেন? তিনি বলেছিলেন, হ্যাঁ, আপনি বিল গেটস। আমি তাকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, আপনার কি মনে আছে একবার আমাকে বিনামূল্যে একটি পত্রিকা দিয়েছিলেন? বিক্রেতা বললেন, হ্যাঁ, মনে আছে। আপনাকে দু’বার দিয়েছি। আমি বললাম, আপনি যে আমাকে বিনামূল্যে পত্রিকা দিয়েছিলেন, তা আমি ফিরিয়ে দিতে চাই। আপনি আপনার নিজের জন্য কী চান বলুন? আমি তা পূরণ করব। বিক্রেতা বললেন, স্যার, আপনি এমন কিছু দিতে পারবেন না, যা আমার সাহায্যের সমান হবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন? তিনি বলেছিলেন, আমি আপনাকে সংবাদপত্র দিয়েছিলাম আমার দরিদ্র অবস্থান থেকে। আর আপনি এখন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হয়ে আমাকে সাহায্য করার চেষ্টা করছেন। আপনার সাহায্য কিভাবে আমার সাহায্যের সমান হবে? সেদিন আমি বুঝতে পেরেছিলাম, সংবাদপত্রের ওই বিক্রেতা আমার চেয়েও বেশি ধনী, কারণ তিনি কাউকে সাহায্য করার জন্য ধনী হওয়ার অপেক্ষা করেননি।’

ধনী হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না, যদি মনটা সবসময় ধনী থাকে।

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন