কিছু কিছু হার, আনন্দ অপার
jugantor
চেতনায় বুদ্বুদ
কিছু কিছু হার, আনন্দ অপার

  বদিউর রহমান  

০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হার-জিত কীভাবে যে মানুষের মগজে এলো, তা আমার মাথায় ধরে না। এসব আসলে বুদ্ধিশুদ্ধির বিষয়। ২ গোল ১ গোল থেকে বেশি-এ হিসাবটাই তো ঝামেলার সৃষ্টি করেছে, নাকি? ৩ রান ৫ রান থেকে কম-এটাই বা হলো কেন? কম-বেশির তুলনা বা হিসাব না থাকলে তো কোনো ঝামেলাই থাকত না, জয়-পরাজয়ও আর স্থির হতো না। খেলা খেলাই থাকত, আমরা দেখতাম কে কেমন খেলল, আমরা আনন্দ পেতাম। খেলা শেষে যে যার বাড়ি চলে যেতাম; আমরা জিতেছি, তোমরা হেরেছ-এসবের কাসুন্দি থাকত না, দলাদলি হতো না, মারামারি হতো না, চরমে গিয়ে হয়তো খুনখারাবিও হতো না। এই যে কোনো দল হেরে গেল আর তার কোনো গোঁড়া সমর্থক আত্মহত্যা করে ফেলল-এটা কি ভালো খবর হলো? হারজিত বড় কথা নয়; ভালো খেলা, পরিচ্ছন্ন খেলাই বড় কথা-এটা তো প্রতিপালিত হতো যদি হারজিতের কোনো মাপকাঠি না থাকত, কী বলেন? তবে হারজিতের ধারণা না থাকলে নাকি খেলার মজাই থাকত না। অতএব, হারজিত না থাকার ‘আঁতেল মার্কা’ কথা এখন অচল। ফলে লড়াই হবে, খেলা হবে; লড়তে হবে, খেলতে হবে; কাউকে হারতে হবে, কাউকে জিততে হবে।

কিন্তু সমস্যা হলো, হারলে যে মন খারাপ হয়, হারলে যে আনন্দ পাওয়া যায় না, হারলে নাকি জাত-মান সব শেষ হয়ে যায়! টানা ৩৬ ম্যাচে অপরাজিত থেকে মেসির আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে তাদের প্রথম খেলাতেই সৌদি আরবের কাছে ২-১ গোলে হেরে যায়-এটা কি সহজে মেনে নেওয়া যায়? মেনে তো নিতে হবে, না নিয়ে উপায় নেই। বাস্তবতা এমন যে, কে কখন কোন উচ্চতা থেকে ধপাস করে নিচে পড়ে যাবে তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। জাপানের কাছে জার্মানিও যে ২-১ গোলে হেরে যায়, তাতেই বা ক্ষতি কী? বিশ্বকাপ বিজয়ী হলে বুঝি ছোট দলের কাছে হারতে মানা আছে? ছোটরাও তো বড় হতে চায়, তাহলে মাঝেমধ্যে বড়দের না হারালে তারা বড় হবে কীভাবে? এতে মজাও আছে, বড়রা যে সব সময় একটা বড় বড় ভাব নিয়ে থাকে, সেটা এমন হারের মধ্য দিয়ে তারা একটু টের পেয়ে যাবে। অতএব, সৌদি আরবের কাছে আর্জেন্টিনার হার আর জাপানের কাছে জার্মানির হার আমাকে অপার আনন্দ দিয়েছে, আমি খুব খুশি হয়েছি।

আমাদের একটা খারাপ স্বভাব বলা চলে এই যে, আমরা নিজেদের চেয়ে অন্যদের নিয়ে বেশি মাতামাতি করি। কিন্তু এটা আবার অনেক বোদ্ধার মতে ভালো গুণ আমাদের। কেননা, ‘...প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’-কবির এ মহাকাব্যিক বাক্যের মাহাত্ম্য তো কেবল আমরাই ভালোভাবে অনুধান করতে পেরেছি! তাই আমরা আমাদের হার নিয়ে বেশি উচ্চবাচ্য করি না। এক্ষেত্রে হয়তো আমরা চোরের ‘কিল মতনে’ হজম করি। আমি বলি ভিন্নভাবে-না, আমরা তখন মহানুভব হই, আমরা তখন মাহাত্ম্য দেখাই-সবাই মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ। আমরা তখন বলি, খেলাই হলো কথা, হারই বা কী, জিতই বা কী। সবাই যদি কেবল জিততে চায় তাহলে হারবে কে? কাউকে না কাউকে তো হারতে হবে, তবে তো অন্য কেউ জিততে পারবে। অতএব, অন্যকে জিতিয়ে দেওয়ার জন্য যে মহানুভবতার প্রয়োজন হয়, এটার অর্জন সবার পক্ষে সম্ভব হয় না, হতে পারে না। এ জন্য হৃদয়ের ঔদার্য থাকতে হয়, দেহের চেয়ে কলিজাটা বড় হতে হয়, অন্যের আনন্দে নিজের আনন্দ পাওয়ার মতো বড় মনের অধিকারী হতে হয়। আমরা তাই অন্যকে জিতিয়ে দিয়ে, নিজেরা হেরে গিয়ে, মহান হতে চাই। তাই আমাদের সাকিব হারের ক্ষেত্রেও অলরাউন্ডার। তিনি হারের মাঝেই আনন্দ পাওয়ার গৌরবের অধিকারী হতে পারেন। তাই তিনি আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। সাকিব হারলে আমার যে কী অপার আনন্দ হয় তা প্রকাশে আমি অক্ষম। আমার মরহুম বন্ধু তালুকদার সাকিবকে একটুও সহ্য করতে পারত না। আমি তো হতবাক। পরে জানলাম, যত অলরাউন্ডারই হোক না কেন, সাকিবের ‘বেয়াদবি-কর্মকাণ্ড’, অহংকারী ভাব, খেলার মাঠের অশোভন আচরণ তাকে বন্ধুটির কাছে অপ্রিয় করে তুলেছে। সাকিবের নাকি একটা ‘ভাব’ আছে যে, তাকে ছাড়া আমাদের চলবে না। এটা আমরাও বুঝি, নচেৎ তার অনেক অগ্রহণযোগ্য আচরণের পরও আমাদের ক্রিকেট বোর্ড বারবার তার প্রতি কেন যে নমনীয় হয়ে পড়ে তা অন্তত আমার মাথায় আসে না। ক্রিকেট বোর্ড হয়তো এ নীতিতে বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকে যে, ‘গাভি দুধ দিয়ে লাথি দিলেও সহ্য করতে হয়।’ কিন্তু আমরা তো বলি, এ ধরনের ক্ষেত্রে ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো’ না হয়ে ‘পাগলা গোয়ালের থেকে শূন্য গোয়াল ভালো’ হওয়া উচিত। আবার হালে সাকিবের শেয়ারবাজারি ভিন্ন কর্মকাণ্ড, বাপের নামও ভুল লেখা-যা পত্রিকার রিপোর্টে দেখা যায়, আমাদের মাথা আরও হেঁট করে দেয়। অতএব, এমন একজন সাকিবকে বাদ দিয়ে দিলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে? আমাদের কি একটু ভাবতে হয় না? তাই আমার বন্ধুটির মতো সাকিবের পরাজয়ে আমারও অপার আনন্দ হয়। এটা অবশ্যই এভাবে নেওয়া ঠিক হবে না যে, আমি ঘরের শত্রু বিভীষণ কিংবা নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রাভঙ্গের খুশিতে মগ্ন। অলরাউন্ডার হওয়া আর শ্রদ্ধাভাজন হওয়া কিন্তু এক নয়-সাকিবের বোধকরি এটা মনে থাকে না।

একজীবনে মানুষ কী যে হতে চায়, তা অনেক অসাধারণ মানুষও বোধকরি সযত্নে বুঝে উঠতে চান না। গিনেজ বুকে নাম ওঠানোর মতো একটা উন্মাদনা একেকজনকে একেকভাবে পেয়ে বসে। তারা জীবনে অনেক উচ্চাসনে পৌঁছে গেলেও ছোটগল্পের শেষ হয়েও হলো না শেষের মতো কেবল আরও আরও উঠতে চান। কোথায় থামতে হবে, কখন থামতে হবে, কখন থামলে তাকে আর উচ্চাসন থেকে ধপাস করে পড়ে যেতে হবে না-এ বোধটুকু বোধকরি তাদের নেই বা থাকে না। অবশ্য আমি আদার ব্যাপারী আবার জাহাজের খবর নিয়ে যেন অন্যকে খাটো না করে ফেলি সে ভয়ে থাকি। এদের বেলায় আমার ধারণা, লাভের চেয়ে লোভটাই বেশি বিবেচ্য হয়ে যায়। লাভ পর্যন্ত ভালো, কিন্তু এ লাভের ‘ল’-এর আগে (এ-কার) যোগ হলেই যত বিপত্তি ঘটে যায়। চট করে মনে এসে গেল-লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। এমন লোকগুলো লোভ করেছে। অতএব, তাদের পাপ হয়েছে নির্ঘাত, আর পাপ তাদের মৃত্যু ঘটিয়ে দিয়েছে। নাম যখন বলব, তখন হয়তো আপনারা আমাকে বেকুব ভেবে বসবেন। বলবেন, এই ব্যাটা কী যে বলে, তারা তো এখনো জীবিত, মরল কেমন করে? আমি বলব, দৈহিকভাবে তারা জীবিত, কিন্তু নৈতিকভাবে বা শ্রদ্ধা-সম্মানের দিক থেকে তারা মরে গেছেন যে!

এবার নাম উল্লেখ করেই বলি, এই ধরুন আমাদের শ্রদ্ধাভাজন, এখন হয়তো সেই আগের শ্রদ্ধা অনেকেরই নেই, আমারও হয়তো বেশ কমেছে, ড. ইউনূস কেন যে বয়স পার হয়ে যাওয়ার পরও গ্রামীণের এমডি থাকার জন্য ব্যস্ত ছিলেন? তার কি ধারণা ছিল যে, তিনি না থাকলে গ্রামীণ চলত না? তিনি তো ট্র্যাকে তুলে দিয়েছেনই, একটা ভালো টিমও করে ফেলেছেন। আমাদের শ্রদ্ধেয় খালেদ শামসকেও অনেকের ভাষায় ‘ভাইস-ইউনূস’ করে নিয়েছিলেন। অতএব, যথানিয়মে যথাসময়ে এমডিগিরি ছেড়ে দিলে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হতো? আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন, তিনি এক গোত্র দিয়ে আরেক গোত্রকে দমিয়ে রাখেন। নচেৎ নাকি এ সৃষ্টি এত সুন্দর ও সুশৃঙ্খল থাকত না। এটাও হয়তো তাঁর এক খেলা। পবিত্র কুরআনের ২২নং সুরা-সুরা হাজ্জের ৪০নং আয়াতের ‘আল্লাহ যদি মানবজাতির এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন’, বাণীটি কী এক মহা ঘোষণা! এ ঘোষণা তিনি পবিত্র কুরআনে আরও দিয়েছেন। আর সীমা লঙ্ঘন না করতে তিনি বারবার সতর্কও করেছেন এ কুরআনে। ‘আল্লাহ সীমা লঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না’ (২নং সুরা বাকারা, আয়াত ১৯০)। সরাসরি এমন সতর্কের পরও মানুষ সীমা লঙ্ঘন করে এবং তার প্রতিফল ভোগ করতে বাধ্য হয়। ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন কারণে আল্লাহ সীমা লঙ্ঘনের পরিণাম নিয়ে কতবার বলেছেন এ কুরআনে, তারপরও আমরা তা অনুধাবন করি না। ড. ইউনূসও কি তাহলে সীমা লঙ্ঘন করেছেন? কী দরকার ছিল বয়সসীমার পর সীমা লঙ্ঘন করে অন্যের দ্বারা প্রতিহত হয়ে মান-ইজ্জত খোয়ানোর? অবশ্য এটাও আল্লাহর এক খেলা-তিনি যাকে ইচ্ছা ইজ্জত দান করেন, যাকে ইচ্ছা বেইজ্জত করেন। এক্ষেত্রে আমার/আমাদের কর্মফলও কি দায়ী নয়? অতএব, আমি ড. ইউনূসের এমন হারে অপার আনন্দ পেয়েছি।

আসুন এবার ডা. মাহাথিরের কথায়। মালয়েশিয়ার রূপকার বলা হয় তাকে। আশির দশকের শুরু থেকে একনাগাড়ে ২২ বছর প্রধানমন্ত্রিত্ব করে তিনি তার দেশে অদ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী বনে গেছেন বলা চলে। আমরাও কথায় কথায় একজন মাহাথির এবং একজন লিকুয়ানের (সিঙ্গাপুর) প্রয়োজনবোধ করতাম। কিন্তু তার ভীমরতি হলো, লোভ হলো। গতবার না হয় যে আনোয়ার ইব্রাহিমকে নাজেহাল করেছিলেন তার সঙ্গে আপস করেই আবার বছর দুয়েক ক্ষমতায় থাকলেন। কিন্তু এবার ৯৮ বছর বয়সে তার কী হলো? পাঁচজনের মধ্যে চতুর্থ, তা-ও আবার জামানত বাজেয়াপ্ত। লোভের খেসারত কেমন হলো, একটু ভাবুন তো! সসম্মানে যে চলে গিয়েছিলেন, তা কি ভালো ছিল না? নিজের নখে নিজের গা চুলকিয়ে অযথা রক্তাক্ত হয়ে এখন কেমন লাগছে তার? চোখ বুজে একটু ভাবতে পারেন? আমার-আপনার কি এমন হতে পারে না? অবশ্যই পারে। এমন ভাবার কোনো কারণ নেই যে, আমি অপরিহার্য, আমিই কেবল দেশসেবার জন্য আত্মোৎসর্গ করি, অন্য কেউ করে না। লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু-দেশসেবার দোহাইতেই হোক কিংবা অন্যভাবে-যেভাবেই হোক নিজেকে নিয়ে এত অহমিকা ভালো নয় কিন্তু।

বদিউর রহমান : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

চেতনায় বুদ্বুদ

কিছু কিছু হার, আনন্দ অপার

 বদিউর রহমান 
০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হার-জিত কীভাবে যে মানুষের মগজে এলো, তা আমার মাথায় ধরে না। এসব আসলে বুদ্ধিশুদ্ধির বিষয়। ২ গোল ১ গোল থেকে বেশি-এ হিসাবটাই তো ঝামেলার সৃষ্টি করেছে, নাকি? ৩ রান ৫ রান থেকে কম-এটাই বা হলো কেন? কম-বেশির তুলনা বা হিসাব না থাকলে তো কোনো ঝামেলাই থাকত না, জয়-পরাজয়ও আর স্থির হতো না। খেলা খেলাই থাকত, আমরা দেখতাম কে কেমন খেলল, আমরা আনন্দ পেতাম। খেলা শেষে যে যার বাড়ি চলে যেতাম; আমরা জিতেছি, তোমরা হেরেছ-এসবের কাসুন্দি থাকত না, দলাদলি হতো না, মারামারি হতো না, চরমে গিয়ে হয়তো খুনখারাবিও হতো না। এই যে কোনো দল হেরে গেল আর তার কোনো গোঁড়া সমর্থক আত্মহত্যা করে ফেলল-এটা কি ভালো খবর হলো? হারজিত বড় কথা নয়; ভালো খেলা, পরিচ্ছন্ন খেলাই বড় কথা-এটা তো প্রতিপালিত হতো যদি হারজিতের কোনো মাপকাঠি না থাকত, কী বলেন? তবে হারজিতের ধারণা না থাকলে নাকি খেলার মজাই থাকত না। অতএব, হারজিত না থাকার ‘আঁতেল মার্কা’ কথা এখন অচল। ফলে লড়াই হবে, খেলা হবে; লড়তে হবে, খেলতে হবে; কাউকে হারতে হবে, কাউকে জিততে হবে।

কিন্তু সমস্যা হলো, হারলে যে মন খারাপ হয়, হারলে যে আনন্দ পাওয়া যায় না, হারলে নাকি জাত-মান সব শেষ হয়ে যায়! টানা ৩৬ ম্যাচে অপরাজিত থেকে মেসির আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে তাদের প্রথম খেলাতেই সৌদি আরবের কাছে ২-১ গোলে হেরে যায়-এটা কি সহজে মেনে নেওয়া যায়? মেনে তো নিতে হবে, না নিয়ে উপায় নেই। বাস্তবতা এমন যে, কে কখন কোন উচ্চতা থেকে ধপাস করে নিচে পড়ে যাবে তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। জাপানের কাছে জার্মানিও যে ২-১ গোলে হেরে যায়, তাতেই বা ক্ষতি কী? বিশ্বকাপ বিজয়ী হলে বুঝি ছোট দলের কাছে হারতে মানা আছে? ছোটরাও তো বড় হতে চায়, তাহলে মাঝেমধ্যে বড়দের না হারালে তারা বড় হবে কীভাবে? এতে মজাও আছে, বড়রা যে সব সময় একটা বড় বড় ভাব নিয়ে থাকে, সেটা এমন হারের মধ্য দিয়ে তারা একটু টের পেয়ে যাবে। অতএব, সৌদি আরবের কাছে আর্জেন্টিনার হার আর জাপানের কাছে জার্মানির হার আমাকে অপার আনন্দ দিয়েছে, আমি খুব খুশি হয়েছি।

আমাদের একটা খারাপ স্বভাব বলা চলে এই যে, আমরা নিজেদের চেয়ে অন্যদের নিয়ে বেশি মাতামাতি করি। কিন্তু এটা আবার অনেক বোদ্ধার মতে ভালো গুণ আমাদের। কেননা, ‘...প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’-কবির এ মহাকাব্যিক বাক্যের মাহাত্ম্য তো কেবল আমরাই ভালোভাবে অনুধান করতে পেরেছি! তাই আমরা আমাদের হার নিয়ে বেশি উচ্চবাচ্য করি না। এক্ষেত্রে হয়তো আমরা চোরের ‘কিল মতনে’ হজম করি। আমি বলি ভিন্নভাবে-না, আমরা তখন মহানুভব হই, আমরা তখন মাহাত্ম্য দেখাই-সবাই মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ। আমরা তখন বলি, খেলাই হলো কথা, হারই বা কী, জিতই বা কী। সবাই যদি কেবল জিততে চায় তাহলে হারবে কে? কাউকে না কাউকে তো হারতে হবে, তবে তো অন্য কেউ জিততে পারবে। অতএব, অন্যকে জিতিয়ে দেওয়ার জন্য যে মহানুভবতার প্রয়োজন হয়, এটার অর্জন সবার পক্ষে সম্ভব হয় না, হতে পারে না। এ জন্য হৃদয়ের ঔদার্য থাকতে হয়, দেহের চেয়ে কলিজাটা বড় হতে হয়, অন্যের আনন্দে নিজের আনন্দ পাওয়ার মতো বড় মনের অধিকারী হতে হয়। আমরা তাই অন্যকে জিতিয়ে দিয়ে, নিজেরা হেরে গিয়ে, মহান হতে চাই। তাই আমাদের সাকিব হারের ক্ষেত্রেও অলরাউন্ডার। তিনি হারের মাঝেই আনন্দ পাওয়ার গৌরবের অধিকারী হতে পারেন। তাই তিনি আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। সাকিব হারলে আমার যে কী অপার আনন্দ হয় তা প্রকাশে আমি অক্ষম। আমার মরহুম বন্ধু তালুকদার সাকিবকে একটুও সহ্য করতে পারত না। আমি তো হতবাক। পরে জানলাম, যত অলরাউন্ডারই হোক না কেন, সাকিবের ‘বেয়াদবি-কর্মকাণ্ড’, অহংকারী ভাব, খেলার মাঠের অশোভন আচরণ তাকে বন্ধুটির কাছে অপ্রিয় করে তুলেছে। সাকিবের নাকি একটা ‘ভাব’ আছে যে, তাকে ছাড়া আমাদের চলবে না। এটা আমরাও বুঝি, নচেৎ তার অনেক অগ্রহণযোগ্য আচরণের পরও আমাদের ক্রিকেট বোর্ড বারবার তার প্রতি কেন যে নমনীয় হয়ে পড়ে তা অন্তত আমার মাথায় আসে না। ক্রিকেট বোর্ড হয়তো এ নীতিতে বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকে যে, ‘গাভি দুধ দিয়ে লাথি দিলেও সহ্য করতে হয়।’ কিন্তু আমরা তো বলি, এ ধরনের ক্ষেত্রে ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো’ না হয়ে ‘পাগলা গোয়ালের থেকে শূন্য গোয়াল ভালো’ হওয়া উচিত। আবার হালে সাকিবের শেয়ারবাজারি ভিন্ন কর্মকাণ্ড, বাপের নামও ভুল লেখা-যা পত্রিকার রিপোর্টে দেখা যায়, আমাদের মাথা আরও হেঁট করে দেয়। অতএব, এমন একজন সাকিবকে বাদ দিয়ে দিলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে? আমাদের কি একটু ভাবতে হয় না? তাই আমার বন্ধুটির মতো সাকিবের পরাজয়ে আমারও অপার আনন্দ হয়। এটা অবশ্যই এভাবে নেওয়া ঠিক হবে না যে, আমি ঘরের শত্রু বিভীষণ কিংবা নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রাভঙ্গের খুশিতে মগ্ন। অলরাউন্ডার হওয়া আর শ্রদ্ধাভাজন হওয়া কিন্তু এক নয়-সাকিবের বোধকরি এটা মনে থাকে না।

একজীবনে মানুষ কী যে হতে চায়, তা অনেক অসাধারণ মানুষও বোধকরি সযত্নে বুঝে উঠতে চান না। গিনেজ বুকে নাম ওঠানোর মতো একটা উন্মাদনা একেকজনকে একেকভাবে পেয়ে বসে। তারা জীবনে অনেক উচ্চাসনে পৌঁছে গেলেও ছোটগল্পের শেষ হয়েও হলো না শেষের মতো কেবল আরও আরও উঠতে চান। কোথায় থামতে হবে, কখন থামতে হবে, কখন থামলে তাকে আর উচ্চাসন থেকে ধপাস করে পড়ে যেতে হবে না-এ বোধটুকু বোধকরি তাদের নেই বা থাকে না। অবশ্য আমি আদার ব্যাপারী আবার জাহাজের খবর নিয়ে যেন অন্যকে খাটো না করে ফেলি সে ভয়ে থাকি। এদের বেলায় আমার ধারণা, লাভের চেয়ে লোভটাই বেশি বিবেচ্য হয়ে যায়। লাভ পর্যন্ত ভালো, কিন্তু এ লাভের ‘ল’-এর আগে (এ-কার) যোগ হলেই যত বিপত্তি ঘটে যায়। চট করে মনে এসে গেল-লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। এমন লোকগুলো লোভ করেছে। অতএব, তাদের পাপ হয়েছে নির্ঘাত, আর পাপ তাদের মৃত্যু ঘটিয়ে দিয়েছে। নাম যখন বলব, তখন হয়তো আপনারা আমাকে বেকুব ভেবে বসবেন। বলবেন, এই ব্যাটা কী যে বলে, তারা তো এখনো জীবিত, মরল কেমন করে? আমি বলব, দৈহিকভাবে তারা জীবিত, কিন্তু নৈতিকভাবে বা শ্রদ্ধা-সম্মানের দিক থেকে তারা মরে গেছেন যে!

এবার নাম উল্লেখ করেই বলি, এই ধরুন আমাদের শ্রদ্ধাভাজন, এখন হয়তো সেই আগের শ্রদ্ধা অনেকেরই নেই, আমারও হয়তো বেশ কমেছে, ড. ইউনূস কেন যে বয়স পার হয়ে যাওয়ার পরও গ্রামীণের এমডি থাকার জন্য ব্যস্ত ছিলেন? তার কি ধারণা ছিল যে, তিনি না থাকলে গ্রামীণ চলত না? তিনি তো ট্র্যাকে তুলে দিয়েছেনই, একটা ভালো টিমও করে ফেলেছেন। আমাদের শ্রদ্ধেয় খালেদ শামসকেও অনেকের ভাষায় ‘ভাইস-ইউনূস’ করে নিয়েছিলেন। অতএব, যথানিয়মে যথাসময়ে এমডিগিরি ছেড়ে দিলে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হতো? আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন, তিনি এক গোত্র দিয়ে আরেক গোত্রকে দমিয়ে রাখেন। নচেৎ নাকি এ সৃষ্টি এত সুন্দর ও সুশৃঙ্খল থাকত না। এটাও হয়তো তাঁর এক খেলা। পবিত্র কুরআনের ২২নং সুরা-সুরা হাজ্জের ৪০নং আয়াতের ‘আল্লাহ যদি মানবজাতির এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন’, বাণীটি কী এক মহা ঘোষণা! এ ঘোষণা তিনি পবিত্র কুরআনে আরও দিয়েছেন। আর সীমা লঙ্ঘন না করতে তিনি বারবার সতর্কও করেছেন এ কুরআনে। ‘আল্লাহ সীমা লঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না’ (২নং সুরা বাকারা, আয়াত ১৯০)। সরাসরি এমন সতর্কের পরও মানুষ সীমা লঙ্ঘন করে এবং তার প্রতিফল ভোগ করতে বাধ্য হয়। ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন কারণে আল্লাহ সীমা লঙ্ঘনের পরিণাম নিয়ে কতবার বলেছেন এ কুরআনে, তারপরও আমরা তা অনুধাবন করি না। ড. ইউনূসও কি তাহলে সীমা লঙ্ঘন করেছেন? কী দরকার ছিল বয়সসীমার পর সীমা লঙ্ঘন করে অন্যের দ্বারা প্রতিহত হয়ে মান-ইজ্জত খোয়ানোর? অবশ্য এটাও আল্লাহর এক খেলা-তিনি যাকে ইচ্ছা ইজ্জত দান করেন, যাকে ইচ্ছা বেইজ্জত করেন। এক্ষেত্রে আমার/আমাদের কর্মফলও কি দায়ী নয়? অতএব, আমি ড. ইউনূসের এমন হারে অপার আনন্দ পেয়েছি।

আসুন এবার ডা. মাহাথিরের কথায়। মালয়েশিয়ার রূপকার বলা হয় তাকে। আশির দশকের শুরু থেকে একনাগাড়ে ২২ বছর প্রধানমন্ত্রিত্ব করে তিনি তার দেশে অদ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী বনে গেছেন বলা চলে। আমরাও কথায় কথায় একজন মাহাথির এবং একজন লিকুয়ানের (সিঙ্গাপুর) প্রয়োজনবোধ করতাম। কিন্তু তার ভীমরতি হলো, লোভ হলো। গতবার না হয় যে আনোয়ার ইব্রাহিমকে নাজেহাল করেছিলেন তার সঙ্গে আপস করেই আবার বছর দুয়েক ক্ষমতায় থাকলেন। কিন্তু এবার ৯৮ বছর বয়সে তার কী হলো? পাঁচজনের মধ্যে চতুর্থ, তা-ও আবার জামানত বাজেয়াপ্ত। লোভের খেসারত কেমন হলো, একটু ভাবুন তো! সসম্মানে যে চলে গিয়েছিলেন, তা কি ভালো ছিল না? নিজের নখে নিজের গা চুলকিয়ে অযথা রক্তাক্ত হয়ে এখন কেমন লাগছে তার? চোখ বুজে একটু ভাবতে পারেন? আমার-আপনার কি এমন হতে পারে না? অবশ্যই পারে। এমন ভাবার কোনো কারণ নেই যে, আমি অপরিহার্য, আমিই কেবল দেশসেবার জন্য আত্মোৎসর্গ করি, অন্য কেউ করে না। লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু-দেশসেবার দোহাইতেই হোক কিংবা অন্যভাবে-যেভাবেই হোক নিজেকে নিয়ে এত অহমিকা ভালো নয় কিন্তু।

বদিউর রহমান : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন