রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে লাভ কার
jugantor
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে লাভ কার

  মানিক চন্দ্র দে  

০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

একসময় ইউনিয়ন অব সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকভুক্ত (ইউএসএসআর) ইউক্রেন ছিল রাশিয়ার সবচেয়ে মেধাবী, সবচেয়ে প্রিয় এক ছোট ভাই। বড্ড ভালোবাসতো ইউক্রেনকে রাশিয়া। আর বাসবেই বা না কেন; খেরসন, দোনেৎস্কসহ বেশকটি রাজ্যে তো রুশ জাতিগোষ্ঠীরই সংখ্যাধিক্য। একই সংস্কৃতির ধারক ও বাহক দুটি দেশ। তাছাড়া ইউক্রেনের রয়েছে বিশাল সবুজ শস্যপ্রান্তর। ইউক্রেনের জনগণের রয়েছে চমৎকার মেধা-মনন। তাই ইউক্রেনকে ভালোবেসে একদিন কিয়েভসহ ইউক্রেনের নানা প্রদেশে ইউএসএসআর গড়ে তুলেছিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার ও নানা রাসায়নিক গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ফসল উৎপাদনে দেশটি ইউরোপের তৃতীয় স্থানের অধিকারী। তাই সমাজতান্ত্রিক পরিবারভুক্ত থাকাবস্থায় দেশটি ছিল সব কমিউনিস্টভুক্ত দেশের পরম আদরের।

কিন্তু কোথা থেকে যে কী ঘটে গেল! আমেরিকার ষড়যন্ত্রেই হোক, কিংবা সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার নেতাদের একচেটিয়া বৈষম্যপূর্ণ ক্ষমতা ভোগের কারণেই হোক, ফুঁসে উঠল ভেতরে ভেতরে কমিউনিস্ট দেশগুলোর জনগণ। গর্বাচেভ এলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে। তার গ্লাস্তনস্ত ও পেরেস্ত্রোইকার দাবানলে পুড়ে মুহূর্তেই ছাই হয়ে গেল ইউএসএসআর। জার্মানির দেওয়াল ভেঙে দুই জার্মানি আবার এক হয়ে গেল। ভেঙে গেল সমাজতন্ত্র। রাশিয়াকে একলা করে সবাই স্বাধীন হয়ে গেল। ইউএসএসআরভুক্ত দেশগুলোর সামরিক জোট ওয়ারশ প্যাক্টও ভেঙে গেল। কিন্তু বহাল তবিয়তেই তখনও রয়ে গেল পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো। ফলে স্নায়ুযুদ্ধের দিনগুলোয় যেমন একটা সামরিক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করছিল সারা বিশ্বে, পূর্ব ইউরোপভুক্ত সামরিক জোট ওয়ারশ ভেঙে যাওয়ায় তা আর রইল না (যদিও ওয়ারশ ভেঙে যাওয়ার পরও রাশিয়ার রয়েছে বিশাল সেনাবাহিনী)। অধিকন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে ন্যাটো একের পর এক তার সদস্যসংখ্যা বাড়াতে থাকল। সর্বশেষ তারা কিনা প্রলুব্ধ করে বসল রাশিয়ারই একসময়ের সহোদরপ্রতিম নিকটতম প্রতিবেশী ভাই ইউক্রেনকে! আর ইউক্রেনের নেতৃত্বও পা দিল যুক্তরাষ্ট্রের এ প্রলোভনে! কিন্তু তার ঘরের পাশে ন্যাটোর মতো শত্রুকে কেন মেনে নিতে যাবে রাশিয়া! আর কেউ কি তা মেনে নেয়?

রাশিয়া সুদূর জারের ভোগবাদী আমল থেকেই রুশ জাতিগোষ্ঠীর বিশাল সাম্রাজ্য, অঢেল সম্পদ আর পুশকিন, তলস্তয়, মাক্সিম গোর্কির মতো বিশ্বসেরা ঔপন্যাসিকের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে নেতৃত্বদানকারী একটি দেশ হিসাবে বিশ্বে সুপরিচিত। তাই তাদের আভিজাত্য আগে থেকেই সবার উপরে। সেই সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতক থেকেই। তারা ইউরোপ-আমেরিকাকে কখনো পাত্তা দিয়ে চলেনি। এটি যেমন জারের আমলে, তেমনই সমাজতান্ত্রিক শাসনামলে, এমনকি আজও সত্য। মঙ্গোলিয়ানদের দ্বারা তছনছ হওয়ার পরও দেশটির ঐক্য কেউ বিনষ্ট করতে পারেনি।

ইউক্রেন শুধু রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীই নয়, সেখানে আছে রুশভাষী কিছু রাজ্য; যেমন-দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ইত্যাদি। ভলোদিমির জেরুজালেস্কির সরকারের আগে ইউক্রেনে ক্ষমতায়ও ছিল রুশ সমর্থিত সরকার। তাদের হটিয়ে জেরুজালেস্কি ক্ষমতা দখল করে। ফলে সেখানে রুশ জাতিগোষ্ঠীর অসন্তোষ বাড়তে থাকে, যা রাশিয়ার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায় আগে থেকেই।

কিন্তু সারা বিশ্বে যেমন আধিপত্য ও অস্ত্র বিক্রির মদদদানকারী হিসাবে পরিচিত আমেরিকা একে একে পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, এমনকি সুইডেনকেও ন্যাটোভুক্ত করেছে, তেমনি ইউক্রেনকেও চাইল ন্যাটোভুক্ত করতে। যদিও ব্যতিক্রমী প্রেসিডেন্ট হিসাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প একসময় চেয়েছিলেন ধীরে ধীরে ন্যাটো ভেঙে দিতে। কারণ, স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর তিনি যথার্থই মনে করেছিলেন, আর এখানে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ অপচয়ের দরকার নেই। কারণ ন্যাটোর সামরিক ব্যয়ের সিংহভাগই আমেরিকা জোগান দিয়ে থাকে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এসে আবার তার পূর্ববর্তীদের পথই অবলম্বন করতে থাকেন।

এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধ ছাড়া রাশিয়ার বিকল্প কিছু চিন্তা করার ছিল না, আপাতদৃষ্টিতে এ কথা মনে হলেও প্রথমেই যুদ্ধে না জড়িয়ে মস্কোর উচিত ছিল কিয়েভের সঙ্গে আলোচনায় বসা। আলোচনায় ব্যর্থ হলে তবেই যুদ্ধের মতো চরম সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এখানে পুতিনের চরিত্রে জারের আমলের একনায়কের প্রভাব লক্ষ করা যায়। তাই তিনি অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে ইউক্রেন আক্রমণ করে বসলেন। সমস্যা হলো, ইউক্রেন ও রাশিয়া উভয় দেশের জনগণই শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। বিষয়টি এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচাগ্র মেদিনী। কিন্তু এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে রাশিয়া ও ইউক্রেন-যুদ্ধে কী ক্ষতি হচ্ছে তাদের। রাশিয়া বড় ও সম্পদশালী দেশ হিসাবে হয়তো এখন ক্ষতির ধাক্কা সামলাতে পারছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে কতক্ষণ সামলাতে পারবে সেই দুশ্চিন্তায় এখন চাচ্ছে ইউক্রেনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে। কিন্তু ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও অন্যান্য স্থাপনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি আবাসিক ভবনসহ লোকক্ষয় হতে থাকলেও এবং অর্থনীতি তলানিতে গিয়ে ঠেকলেও আমেরিকার ইশারা ছাড়া সে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারছে না। মোট কথা, ইউক্রেনের স্বকীয়তা বা স্বাধীনতা এখন আমেরিকার অঙ্গুলির ইশারায় ওঠানামা করছে।

পুতিন এখন আমেরিকা ও তার মিত্রদেশগুলো কর্তৃক ইউক্রেনকে অস্ত্র প্রদান এবং অর্থনৈতিক অবরোধের কবলে পড়ে উদ্বিগ্ন, কিন্তু তারপরও ইগোর লড়াই চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন তিনি। তাই দেওয়ালে পিঠ ঠেকার এ পর্যায়ে বিধ্বংসী পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োগেরও ভয় দেখাচ্ছে রাশিয়া। যদিও একান্ত মাথা খারাপের দশায় না পড়লে এ অস্ত্র প্রয়োগ করবে না দেশটি।

অপরদিকে ইউক্রেন ইউরোপের একটি দুর্বল দেশ। রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়ার মতো কোনো অবস্থাতেই তার যোগ্যতা নেই। কেবল আমেরিকা ও তার পশ্চিমা মিত্রদের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি। একসময় রাশিয়া ছিল সারা বিশ্বে প্রধান ক্ষমতাধর একটি দেশ, সোভিয়েত পতনের পরও তার রয়েছে বিশাল সৈন্যবাহিনী ও অস্ত্রভান্ডার। পারমাণবিক ক্ষমতাধর ও আকাশযুদ্ধে শ্রেষ্ঠতম একটি বিশাল রাষ্ট্র রাশিয়া। তার তো ইউক্রেনের মতো দেশের সঙ্গে হারার প্রশ্নই ওঠে না।

মুশকিল হলো, যুদ্ধ তো রাশিয়া এখন ইউক্রেনের সঙ্গে করছে না। করছে মূলত আমেরিকার সঙ্গে। কিন্তু বহু দূরে বসে আমেরিকা কতটুকুই বা পেরে উঠবে রাশিয়ার মতো শক্তিশালী একটি দেশের সঙ্গে! রাশিয়া ক্রমে ক্রমে ধ্বংস করে দিচ্ছে ইউক্রেনের সবুজ শস্যক্ষেত্র, বিদ্যুৎকেন্দ্র, এমনকি পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোও এখন রুশ আক্রমণ থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। আবার ইউক্রেনের বাণিজ্যিক জাহাজগুলো বাল্টিক সাগর দিয়ে যাওয়ার সময় রুশ আক্রমণের মুখে পড়ছে। ফলে বন্ধ হচ্ছে পৃথিবীতে ইউক্রেনের খাদ্যের চালান। যদিও তুরস্কের মধ্যস্থতায় রাশিয়ার সঙ্গে সাময়িক চুক্তির কারণে এখন সীমিত পর্যায়ে ইউক্রেনের খাদ্যবাহী জাহাজগুলো মালামাল নিয়ে বের হতে পারছে; কিন্তু এটিও বন্ধ করে দেওয়ার জন্য রাশিয়া মাঝেমধ্যে হুমকি দিচ্ছে চুক্তি ভেঙে দেওয়ার। ফলে আমাদের মতো দেশগুলোয় বাড়ছে খাদ্যপণ্যের দাম, সার, কীটনাশক, সিমেন্ট, কসমেটিকের মতো পণ্যের দাম। মূল্যস্ফীতি বাড়ছে হুহু করে। আবার রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল গোটা ইউরোপ পড়ছে রুশ জ্বালানি অবরোধের হুমকিতে। শীতে এ সমস্যা প্রকটতর হবে, সন্দেহ নেই। অবস্থা ‘পাটাপুতায় ঘষাঘষি মরিচের মরণের’ মতো।

দুই দেশের নেতাদের ইগোয়েস্টিক মনোভাবের কারণে শিগগিরই যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। রাশিয়া বা ইউক্রেনের নেতৃত্ব বদল হলে এ যুদ্ধ বন্ধ হলেও হতে পারে। কিন্তু দুই দেশের জনগণ যেভাবে তাদের বর্তমান নেতৃত্বকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, তাতে শিগগিরই নেতৃত্ব বদল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নিকট ভবিষ্যতে দেখা যাচ্ছে না। এর ফলে ক্ষতি হচ্ছে ইউক্রেনের যেমন, তেমনই রাশিয়ারও। আর এ অবরোধ ও পালটা অবরোধের কারণে আমাদের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো পড়ছে চরম বিপাকে। বিশেষত আমেরিকার ফেডারেল ব্যাংক ডলারের মূল্যমান বাড়িয়ে দিয়ে এ সংকটকে তীব্রতর করে তুলেছে। শীতের মৌসুমে চরম সংকটে পড়তে যাচ্ছে জার্মানি, ইতালি ও ইংল্যান্ডের মতো দেশগুলো। ইংল্যান্ডের অর্থনীতি তো এ যুদ্ধের ফলে ভেঙে পড়তেই বসেছে।

কিন্তু সবাই কম-বেশি ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হলেও লাভবান হচ্ছে কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তারা একদিকে যেমন রাশিয়ার দরজার কাছে চলে আসার প্রয়াস পাচ্ছে, তেমনি সারা বিশ্বে অস্ত্র বিক্রি ও ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে তাদের অর্থনীতিতে ফুরফুরে হাওয়া লাগিয়ে বেশ নিশ্চিন্তেই আছে। এদিকে চীন ও উত্তর কোরিয়াও সময় ও সুযোগ বুঝে কোরিয়া সাগর ও চীন সাগরকে উত্তপ্ত করার প্রয়াস পাচ্ছে। মোট কথা, সারা বিশ্বে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে আমেরিকা আজ নিশ্চিন্ত মনে সেই আগুনে আলু পোড়া দিয়ে খাচ্ছে।

মানিক চন্দ্র দে : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে লাভ কার

 মানিক চন্দ্র দে 
০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

একসময় ইউনিয়ন অব সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকভুক্ত (ইউএসএসআর) ইউক্রেন ছিল রাশিয়ার সবচেয়ে মেধাবী, সবচেয়ে প্রিয় এক ছোট ভাই। বড্ড ভালোবাসতো ইউক্রেনকে রাশিয়া। আর বাসবেই বা না কেন; খেরসন, দোনেৎস্কসহ বেশকটি রাজ্যে তো রুশ জাতিগোষ্ঠীরই সংখ্যাধিক্য। একই সংস্কৃতির ধারক ও বাহক দুটি দেশ। তাছাড়া ইউক্রেনের রয়েছে বিশাল সবুজ শস্যপ্রান্তর। ইউক্রেনের জনগণের রয়েছে চমৎকার মেধা-মনন। তাই ইউক্রেনকে ভালোবেসে একদিন কিয়েভসহ ইউক্রেনের নানা প্রদেশে ইউএসএসআর গড়ে তুলেছিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার ও নানা রাসায়নিক গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ফসল উৎপাদনে দেশটি ইউরোপের তৃতীয় স্থানের অধিকারী। তাই সমাজতান্ত্রিক পরিবারভুক্ত থাকাবস্থায় দেশটি ছিল সব কমিউনিস্টভুক্ত দেশের পরম আদরের।

কিন্তু কোথা থেকে যে কী ঘটে গেল! আমেরিকার ষড়যন্ত্রেই হোক, কিংবা সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার নেতাদের একচেটিয়া বৈষম্যপূর্ণ ক্ষমতা ভোগের কারণেই হোক, ফুঁসে উঠল ভেতরে ভেতরে কমিউনিস্ট দেশগুলোর জনগণ। গর্বাচেভ এলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে। তার গ্লাস্তনস্ত ও পেরেস্ত্রোইকার দাবানলে পুড়ে মুহূর্তেই ছাই হয়ে গেল ইউএসএসআর। জার্মানির দেওয়াল ভেঙে দুই জার্মানি আবার এক হয়ে গেল। ভেঙে গেল সমাজতন্ত্র। রাশিয়াকে একলা করে সবাই স্বাধীন হয়ে গেল। ইউএসএসআরভুক্ত দেশগুলোর সামরিক জোট ওয়ারশ প্যাক্টও ভেঙে গেল। কিন্তু বহাল তবিয়তেই তখনও রয়ে গেল পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো। ফলে স্নায়ুযুদ্ধের দিনগুলোয় যেমন একটা সামরিক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করছিল সারা বিশ্বে, পূর্ব ইউরোপভুক্ত সামরিক জোট ওয়ারশ ভেঙে যাওয়ায় তা আর রইল না (যদিও ওয়ারশ ভেঙে যাওয়ার পরও রাশিয়ার রয়েছে বিশাল সেনাবাহিনী)। অধিকন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে ন্যাটো একের পর এক তার সদস্যসংখ্যা বাড়াতে থাকল। সর্বশেষ তারা কিনা প্রলুব্ধ করে বসল রাশিয়ারই একসময়ের সহোদরপ্রতিম নিকটতম প্রতিবেশী ভাই ইউক্রেনকে! আর ইউক্রেনের নেতৃত্বও পা দিল যুক্তরাষ্ট্রের এ প্রলোভনে! কিন্তু তার ঘরের পাশে ন্যাটোর মতো শত্রুকে কেন মেনে নিতে যাবে রাশিয়া! আর কেউ কি তা মেনে নেয়?

রাশিয়া সুদূর জারের ভোগবাদী আমল থেকেই রুশ জাতিগোষ্ঠীর বিশাল সাম্রাজ্য, অঢেল সম্পদ আর পুশকিন, তলস্তয়, মাক্সিম গোর্কির মতো বিশ্বসেরা ঔপন্যাসিকের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে নেতৃত্বদানকারী একটি দেশ হিসাবে বিশ্বে সুপরিচিত। তাই তাদের আভিজাত্য আগে থেকেই সবার উপরে। সেই সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতক থেকেই। তারা ইউরোপ-আমেরিকাকে কখনো পাত্তা দিয়ে চলেনি। এটি যেমন জারের আমলে, তেমনই সমাজতান্ত্রিক শাসনামলে, এমনকি আজও সত্য। মঙ্গোলিয়ানদের দ্বারা তছনছ হওয়ার পরও দেশটির ঐক্য কেউ বিনষ্ট করতে পারেনি।

ইউক্রেন শুধু রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীই নয়, সেখানে আছে রুশভাষী কিছু রাজ্য; যেমন-দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ইত্যাদি। ভলোদিমির জেরুজালেস্কির সরকারের আগে ইউক্রেনে ক্ষমতায়ও ছিল রুশ সমর্থিত সরকার। তাদের হটিয়ে জেরুজালেস্কি ক্ষমতা দখল করে। ফলে সেখানে রুশ জাতিগোষ্ঠীর অসন্তোষ বাড়তে থাকে, যা রাশিয়ার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায় আগে থেকেই।

কিন্তু সারা বিশ্বে যেমন আধিপত্য ও অস্ত্র বিক্রির মদদদানকারী হিসাবে পরিচিত আমেরিকা একে একে পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, এমনকি সুইডেনকেও ন্যাটোভুক্ত করেছে, তেমনি ইউক্রেনকেও চাইল ন্যাটোভুক্ত করতে। যদিও ব্যতিক্রমী প্রেসিডেন্ট হিসাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প একসময় চেয়েছিলেন ধীরে ধীরে ন্যাটো ভেঙে দিতে। কারণ, স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর তিনি যথার্থই মনে করেছিলেন, আর এখানে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ অপচয়ের দরকার নেই। কারণ ন্যাটোর সামরিক ব্যয়ের সিংহভাগই আমেরিকা জোগান দিয়ে থাকে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এসে আবার তার পূর্ববর্তীদের পথই অবলম্বন করতে থাকেন।

এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধ ছাড়া রাশিয়ার বিকল্প কিছু চিন্তা করার ছিল না, আপাতদৃষ্টিতে এ কথা মনে হলেও প্রথমেই যুদ্ধে না জড়িয়ে মস্কোর উচিত ছিল কিয়েভের সঙ্গে আলোচনায় বসা। আলোচনায় ব্যর্থ হলে তবেই যুদ্ধের মতো চরম সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এখানে পুতিনের চরিত্রে জারের আমলের একনায়কের প্রভাব লক্ষ করা যায়। তাই তিনি অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে ইউক্রেন আক্রমণ করে বসলেন। সমস্যা হলো, ইউক্রেন ও রাশিয়া উভয় দেশের জনগণই শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। বিষয়টি এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচাগ্র মেদিনী। কিন্তু এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে রাশিয়া ও ইউক্রেন-যুদ্ধে কী ক্ষতি হচ্ছে তাদের। রাশিয়া বড় ও সম্পদশালী দেশ হিসাবে হয়তো এখন ক্ষতির ধাক্কা সামলাতে পারছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে কতক্ষণ সামলাতে পারবে সেই দুশ্চিন্তায় এখন চাচ্ছে ইউক্রেনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে। কিন্তু ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও অন্যান্য স্থাপনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি আবাসিক ভবনসহ লোকক্ষয় হতে থাকলেও এবং অর্থনীতি তলানিতে গিয়ে ঠেকলেও আমেরিকার ইশারা ছাড়া সে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারছে না। মোট কথা, ইউক্রেনের স্বকীয়তা বা স্বাধীনতা এখন আমেরিকার অঙ্গুলির ইশারায় ওঠানামা করছে।

পুতিন এখন আমেরিকা ও তার মিত্রদেশগুলো কর্তৃক ইউক্রেনকে অস্ত্র প্রদান এবং অর্থনৈতিক অবরোধের কবলে পড়ে উদ্বিগ্ন, কিন্তু তারপরও ইগোর লড়াই চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন তিনি। তাই দেওয়ালে পিঠ ঠেকার এ পর্যায়ে বিধ্বংসী পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োগেরও ভয় দেখাচ্ছে রাশিয়া। যদিও একান্ত মাথা খারাপের দশায় না পড়লে এ অস্ত্র প্রয়োগ করবে না দেশটি।

অপরদিকে ইউক্রেন ইউরোপের একটি দুর্বল দেশ। রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়ার মতো কোনো অবস্থাতেই তার যোগ্যতা নেই। কেবল আমেরিকা ও তার পশ্চিমা মিত্রদের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি। একসময় রাশিয়া ছিল সারা বিশ্বে প্রধান ক্ষমতাধর একটি দেশ, সোভিয়েত পতনের পরও তার রয়েছে বিশাল সৈন্যবাহিনী ও অস্ত্রভান্ডার। পারমাণবিক ক্ষমতাধর ও আকাশযুদ্ধে শ্রেষ্ঠতম একটি বিশাল রাষ্ট্র রাশিয়া। তার তো ইউক্রেনের মতো দেশের সঙ্গে হারার প্রশ্নই ওঠে না।

মুশকিল হলো, যুদ্ধ তো রাশিয়া এখন ইউক্রেনের সঙ্গে করছে না। করছে মূলত আমেরিকার সঙ্গে। কিন্তু বহু দূরে বসে আমেরিকা কতটুকুই বা পেরে উঠবে রাশিয়ার মতো শক্তিশালী একটি দেশের সঙ্গে! রাশিয়া ক্রমে ক্রমে ধ্বংস করে দিচ্ছে ইউক্রেনের সবুজ শস্যক্ষেত্র, বিদ্যুৎকেন্দ্র, এমনকি পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোও এখন রুশ আক্রমণ থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। আবার ইউক্রেনের বাণিজ্যিক জাহাজগুলো বাল্টিক সাগর দিয়ে যাওয়ার সময় রুশ আক্রমণের মুখে পড়ছে। ফলে বন্ধ হচ্ছে পৃথিবীতে ইউক্রেনের খাদ্যের চালান। যদিও তুরস্কের মধ্যস্থতায় রাশিয়ার সঙ্গে সাময়িক চুক্তির কারণে এখন সীমিত পর্যায়ে ইউক্রেনের খাদ্যবাহী জাহাজগুলো মালামাল নিয়ে বের হতে পারছে; কিন্তু এটিও বন্ধ করে দেওয়ার জন্য রাশিয়া মাঝেমধ্যে হুমকি দিচ্ছে চুক্তি ভেঙে দেওয়ার। ফলে আমাদের মতো দেশগুলোয় বাড়ছে খাদ্যপণ্যের দাম, সার, কীটনাশক, সিমেন্ট, কসমেটিকের মতো পণ্যের দাম। মূল্যস্ফীতি বাড়ছে হুহু করে। আবার রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল গোটা ইউরোপ পড়ছে রুশ জ্বালানি অবরোধের হুমকিতে। শীতে এ সমস্যা প্রকটতর হবে, সন্দেহ নেই। অবস্থা ‘পাটাপুতায় ঘষাঘষি মরিচের মরণের’ মতো।

দুই দেশের নেতাদের ইগোয়েস্টিক মনোভাবের কারণে শিগগিরই যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। রাশিয়া বা ইউক্রেনের নেতৃত্ব বদল হলে এ যুদ্ধ বন্ধ হলেও হতে পারে। কিন্তু দুই দেশের জনগণ যেভাবে তাদের বর্তমান নেতৃত্বকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, তাতে শিগগিরই নেতৃত্ব বদল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নিকট ভবিষ্যতে দেখা যাচ্ছে না। এর ফলে ক্ষতি হচ্ছে ইউক্রেনের যেমন, তেমনই রাশিয়ারও। আর এ অবরোধ ও পালটা অবরোধের কারণে আমাদের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো পড়ছে চরম বিপাকে। বিশেষত আমেরিকার ফেডারেল ব্যাংক ডলারের মূল্যমান বাড়িয়ে দিয়ে এ সংকটকে তীব্রতর করে তুলেছে। শীতের মৌসুমে চরম সংকটে পড়তে যাচ্ছে জার্মানি, ইতালি ও ইংল্যান্ডের মতো দেশগুলো। ইংল্যান্ডের অর্থনীতি তো এ যুদ্ধের ফলে ভেঙে পড়তেই বসেছে।

কিন্তু সবাই কম-বেশি ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হলেও লাভবান হচ্ছে কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তারা একদিকে যেমন রাশিয়ার দরজার কাছে চলে আসার প্রয়াস পাচ্ছে, তেমনি সারা বিশ্বে অস্ত্র বিক্রি ও ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে তাদের অর্থনীতিতে ফুরফুরে হাওয়া লাগিয়ে বেশ নিশ্চিন্তেই আছে। এদিকে চীন ও উত্তর কোরিয়াও সময় ও সুযোগ বুঝে কোরিয়া সাগর ও চীন সাগরকে উত্তপ্ত করার প্রয়াস পাচ্ছে। মোট কথা, সারা বিশ্বে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে আমেরিকা আজ নিশ্চিন্ত মনে সেই আগুনে আলু পোড়া দিয়ে খাচ্ছে।

মানিক চন্দ্র দে : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : রাশিয়া-ইউক্রেন উত্তেজনা

২৮ জানুয়ারি, ২০২৩